#রাগে_অনুরাগে_তুমি [ ২৮ ]
#ইসরাত_জাহান_এশা
.....
সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশ । গ্রামের পরিবেশ মানেই আলাদা সৌন্দর্য ফুটে উঠে। ভরের নরম আলো, সূর্যের চিকন রশ্নি ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে। সকালের শীতল হাওয়া মন ও শরীর কে শীতল করে দেয় একদম ভিতর থেকে। গ্রামে ঘুম থেকে উঠার জন্য কৃতিম এলার্ম ঘড়ির প্রয়োজন হয় না। স্বাধীন পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ, মোরগ মুরগির ডাক। সেগুলোতে গ্রামিণ মানুষের ঘুম ভাঙ্গে। নীরা গোসল শেষ করে নামাজ আদায় করে নিলো। কমলা রাঙা শাড়ি পড়েছে আধ পোড়ে। লুছ খোপা করে মাথায় ঘোমটা দিয়েছে। শ্বাশুড়ির দেওয়া হাতে চিকন বালা পড়েছে গলায় মোটর মালা। ঠোঁটে পিংক লিপগ্লোস। তৈরী হয়ে তূর্যর দিকে তাকালো। লোকটা উপর হয়ে ঘুমাচ্ছে। বালিসে গালের এক পাশ পড়ে থাকায় ঠোট হা হয়ে আছে। একদম বাচ্চাদের মতো। ঘেমে গেছে, সারাবছর এসির নিচে থাকা লোকটার কী এই সাধারণ সিলিং ফ্যানের বাতাশ গায়ে লাগে বুঝি। নীরা তাকিয়ে রইলো তার পূরুষের দিকে। একটু কোতুহল জাগলো তাকে ছুয়ে দেওয়ার জন্য। নীরা আর নিজেকে আটকালো না, তূর্যের কপালে গালে তার ঠোট ছুয়ে দিলো। তূর্য একটু নড়ে চরে উঠল। নীরা তূর্যের চুলে হাত বুলিয়ে বাহিরে চলে গেলো।
বসার ঘরে আমেনা, জমেলা, রূম্পা, সিমিন, রুশা সবাই বসে আছে। নীরা কিছুটা থেমে গেলো এই সকালে তারা সবাই এভাবে বসে আছে কেনো। রুশা নীরাকে দেখতেই উঠে নীরার কাছে গেলো। হাসি মুখে বললো,
" আরে বড় ভাবি ঘুম ভাঙলো তাহলে। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি সেই কখন থেকে। কাল আমি অনেক অসুস্থ ছিলাম তাই দেখা হয় নি। ভালো লাগছে এই বাড়ি। "
রুশা খুব আনন্দ নিয়ে কথা গুলো বললো। নীরাও খুব খুশি হয়। তাই নিজের থেকে রুশা কে জড়িয়ে ধরে বললো,
" খুব ভালো লাগছে বুবু। এখন কেমন আছো তুমি। "
রুশা প্রথমে চমকালো বুবু ডাক শুনে। সেও জড়িয়ে ধরলো। হাসি মুখে বললো
" আলহামদুলিল্লাহ ভাবি ভালো আছি এখন। "
রুশা নীরাকে ছেড়ে দিয়ে থুতনিতে হাত রেখে আমেনা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললো
" বড় মা ভাবি তো আমাদের বেশ পছন্দ। ট্রিট দিতে হবে কিন্তু । ভাবিকে দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেলো মাশাআল্লাহ। "
নীরা লজ্জা পেলেও প্রকাশ করলো না। আমেনা চৌধুরী হেসে বললো
" যার বউ তার কাছে ট্রিট চাইস। দেখবি দিয়ে দিবে। "
" তাহলে তো চাইতেই হচ্ছে। "
সিমিন, রূম্পা এগিয়ে এসে বললো,
" কাল রাতে যেমন দেখেছিলাম তার থেকেও দেখি বাচ্চা। তার উপর আধ পোড়ে শাড়ি পড়েছে। এতো দেখি নিতান্তই বাচ্চা একটি মেয়ে। "
নীরা এবার বেশ লজ্জা পায়। সে কি এতটাই ছোট সবাই তাকে বাচ্চা বাচ্চা বলবে ১৯ বছর তার। সে একটা সংসার সামলাতে পারবে ১ টা বাচ্চা সহ বাচ্চার বাপকে সামলায় আর তাকে কিনা বাচ্চা বলা হচ্ছে। নীরা গাল রাঙা হতে শুরু করলো। চোখ নামিয়ে নিলো। রুশা বললো
" থাক ভাবি লজ্জা পেয়ো না। তোমার সোয়ামি ঘুম থেকে উঠেছে "
নীরা মাথা দুই পাশে নাড়ায়। অর্থাৎ এখনো উঠে নাই। আমেনা চৌধুরী নীরার উদ্দেশ্যে বললেন
" নীরা যা তূর্যকে ডেকে নিয়ে আয়। এখন আর ঘুমাতে হবে না। বাসায় অনেক লোক আসবে এখন। "
নীরা আমতা আমতা করে বললো
" মা নাহিয়ানের বাবা কাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছে। অফিসের কাজ করছিলো বসে বসে। এখন না ডেকে পড়ে ডেকে দেই। এখ.... "
" থাক মা পতী ভক্তি পত্নী ডাকতে হবে না। আপনার সোয়ামি ঘুমাক এখন। এই মেজো, সেজো , ছোট চল সবাই। কাজ আছে অনেক। "
এই বলে তারা চলে গেলো। নীরা আরেক দফা শ্বাশুড়ির কাছ থেকে লজ্জা পেলো। রুশা হেসে বললো
" ভাবি ভাইয়া কি শুধু কাজ করেছে নাকি..."
" ধুর বুবু লজ্জা দিয়ো না। আর লজ্জা নিতে পারছি না। "
এই বলে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো। রুশা হেসে ফেললো। নীরা লজ্জা কাটিয়ে বললো
" বুবু বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠেছে। "
" না ভাবি তিন বাচ্চা এক সাথে ঘুমাচ্ছে। "
" ও.... আর তোমার ছোট বাচ্চা। কালকে কোলে নিতে চেয়েছিলাম পারলাম না। "
" ও ঘুমাচ্ছে এখন উঠবে না তার উঠতে বেলা হবে। সারা রাত ঘুমায় না আর সারা সকাল ঘুমায়। "
"বাচ্চা তো এমনি হবে বুবু। "
" কতো জ্বালায় আমায় জানো না ভাবি। "
" আচ্ছা যে কয়দিন আছি সেই কয়দিন তোমার জ্বালানোর ভাগ আমি নিবো। "
" নিয়ে নিয়ো ভাবি। "
" আচ্ছা বুবু আমার বাকি দুই ননদ কোথায়? দেখছি না যে। "
" ও আচ্ছা অবন্তি আর ঊষা তাদের খালার বাসায় গিয়েছে আজকেই সবাই চলে আসবে। "
" ও আচ্ছা । মায়েরা তখন কোথায় গেলো? "
"উঠোনে গিয়েছে পিঠে বানাতে। যাবে তুমি? "
" হুম যেতে চাই তো "
" তাহলে নাস্তা করে নাও। আব্বা, সেজো কাকা, ছোট চাচা বার বার বলে গিয়েছে তোমার যেনো কোনো দিকে অসুবিধা না হয় সেদিকের খেয়াল রাখতে। "
" না বুবু এখন খাবো না। বাচ্চারা উঠুক তখন খাবো। "
রুশা মুচকি হেসে বললো
" শুধু বাচ্চা নাকি বাচ্চার বাবাও সাথে আছে। "
নীরা বেশ বুঝতে পারলো এখন তাকে নিয়ে মজা করছে তাই নীরাও আশে পাশে চোখ ঘুড়িয়ে কাওকে না দেখে বললো
" বুঝলে বুবু তোমার ভাই যদি আমায় না খাইয়ে দেয় তাহলে পেট ভরেই না। তারউপর আমায় কোলের উপর বসিয়ে খাইয়ে দেয় তো। অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেসে আমার। "
রুশাও বুঝতে পেরে অবাকের ন্যায় বললো
" ও হো তাই বুঝি... হাও লুমান্টিক ভাসুর আমার। "
এই বলে দুই জা এক সাথে হেসে ফেলে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে উঠোনে আসলো রুশা আর নীরা। চৌধুরী ভবন টা একদম গ্রামের ভিতরে পড়েছে। বাড়ির উঠোন থেকেই চারদিকের প্রকৃতিটা যেন চোখের সামনে এক জীবন্ত ছবির মতো ধরা দেয়। চারপাশ জুড়ে শস্য-শ্যামল বিস্তীর্ণ মাঠ, যেখানে কচি সবুজ ধানের চারা বাতাসে দুলে দুলে ঢেউ তোলে। হালকা বাতাস বয়ে গেলে ধানক্ষেতের মাথাগুলো একসাথে নেচে ওঠে, যেন প্রকৃতি নিজেই সুর তুলে গান গাইছে। দূরে তাল আর নারকেল গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঝিলমিল করে পড়ছে জমিনে। পাখিদের কিচিরমিচির আর গরুর ঘণ্টার মৃদু শব্দ মিলিয়ে চারপাশে তৈরি হয়েছে শান্ত, স্নিগ্ধ এক গ্রাম্য আবহ। মাটির গন্ধে ভরা সেই পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে দেয়, আর সবুজের সমারোহ যেন চোখ জুড়িয়ে দেয় বারবার। বাড়ির গিন্নিরা উঠোনে বসে ফুল পিঠা, সিরিস পিঠা, শামুক পিঠা, চিরুনি পিঠা বানাতে ব্যাস্ত। গ্রামের কয়েকজন মহিলারাও সাহায্যা করছে। গ্রামে বিয়ে মানেই আলাদা সুন্দর। নীরা গিয়ে শ্বাশুড়ির পাশে বসলো। তার শ্বাশুড়ি কতো সুন্দর করে নকশি পিঠা বানাচ্ছে। নীরার ইচ্ছা জাগলো সেও বানাবে। রুশা ইতিমধ্যে বানানো শুরু করে দিয়েছে। তাই নীরা আমতা আমতা করে বলেই ফেললো ।
" মা "
আমেনা চৌধুরী নীরার পানে তাকিয়ে বললো
" কিছু বলবি "
" হুম "
" বল "
" আমিও পিঠা বানাতে চাই। শিখিয়ে দিবে আমায়। "
" কেনো দিবো না অবশ্যই দিবো। আমার পাশে বস দেখিয়ে দিচ্ছি। "
নীরা খুশি খুশি মনে বসলো শ্বাশুড়ির পাশে। আমেনা চৌধুরী দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে বানাতে হবে নীরা চেষ্টা করেও যেনো পারছে না সে। নীরার মন খারাপ হয়ে গেলো। রুশার দিকে তাকিয়ে দেখলো কতো সুন্দর করে বানাচ্ছে সে। জমেলা বাকা হেসে আমেনার উদ্দেশ্যে বললো ,
" কি লো ভাবি আফনের পুত্র বধু দেহি এই সামান্য পিডাও বানাইতে পারে না । কী কইরা খাইবো। "
" আমার বউ আমার মাথার উপর বসে খাবে। তার স্বামীর টাকায় পায়ের উপর পা তুলে খাবে। দরকার পড়লে কোলে নিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো। "
সবাই মেইন ফটকে তাকালো, পুরো ফিটফাট হয়ে মুখে গাম্ভীর্য ভাব ফুটে উঠেছে। কিন্তু তূর্য স্বাভাবিক ভাবেই আছে। নীরা চমকে উঠলো কিছু বলে ফেলবে নাতো আবার। নীরা উঠে দাঁড়ালো। আমেনা চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজের ছেলের দিকে। শুনতে চাচ্ছে তার পরবর্তি কথা। তূর্য এক পলক তার ভয়ার্ত অর্ধাঙ্গিনীর মুখ খানা দেখে বললো,
" শুনতে পেলেন চাচি। আমি আমার বউকে রাজ রাণি বানাবো । চাকরানী না। সে আমার বিয়ে করা বউ। আমার তিন কবুলের সঙ্গী , আমার বাচ্চার মা, আমার সম্মান। তাকে আমি মাথায় করে রাখবো। পায়ের নিচে পিষে ফেলবো না। "
একটু থেমে জমেলার সামনে গিয়ে সিনা টানটান করে বললো,
"আপনি যদি এমন কথা আবার বলেন তাহলে আপনি তূর্য চৌধুরীর আসল রুপ দেখবেন। শান্ত আছি বলে কিছুই ভুলে যায় নি। এতটাও স্মৃতি লোপ পায়নি আমার। "
এই বলে নীরার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলো। সবার সামনে থেকে। আমেনা চৌধুরীর মুখে হাসি ফুটলো। সে খুব খুশি। তার ছেলের কাজে। জমেলা থমথমে মুখে বসে আছে। রুশা তার শ্বাশুড়ির কাজে খুব বিরক্ত । সে সব সময় এমন করে। মুখ থেকে সব সময় তিতা ঝড়ে। মিষ্টি ব্যবহার তো করতেই পারে না।
★
তূর্য নীরাকে ঘরে এনে খাটের উপর বসিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষন করতে ব্যাস্ত। হঠাতেই তূর্যের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। নীরার দিকে বেশ অনেকটাই ঝুকে যায়। নাক ছুই ছুই। নীরার অবাধ্য চুল গুলো কপালে এসে আছড়ে পরছে । তূর্য নীরার মুখের উপর ফু দিতেই নীরা আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তূর্য বাকা হেসে নীরার নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে ছোট চুমু দেয়। হাত বাড়িয়ে নীরার শাড়ি ভেদ করে কোমড়ে হালকা চাপ প্রয়োগ করে। নীরা চোখ খুলে ফেলে তরাগ করে। তূর্যের দিকে তাকাতেই দেখে সে মিটিমিটি হাসছে। নীরা যেনো আজ লজ্জা পেতে পেতে ম''রেই যাবে। এতো লজ্জা কীভাবে আসে তার। তূর্য কোমড়ে হাত রেখে বৃদ্ধ আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে বললো,
" গ্রামের বউ লাগছে আমার নুড়ি ফুলকে। "
নীরা লজ্জা মিশ্রিত নয়নে তাকালো তার স্বামীর বদন পানে। নিচু স্বরে বললো
" গ্রামের বউ সাজতে পেরেছি কিনা জানা নেই আমার। তবে আমি আপনার বউ সাজতে পেরেছি তো? "
নীরার এই প্রশ্নে তূর্য নীরার ললাটে চুম্বন করে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো
" হু এই তূর্য চৌধুরীর বউ সাজতে পেরেছো। "
"আমার উপহার? "
" আমার যদি সেই সামর্থ্য থাকতো তাহলে আমার এই হৃদয় তোমার নামে লিখে দিতাম। আমার হৃদয়ে নাহয় তুমি বেচে থাকতে আমরণ। ""
নীরা তূর্যের কোমড় জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। পেটে মুখ গুজে ফিসফিস করে বলে।
" মিস্টার তূর্য চৌধুরীর হৃদয়ে আজীবন আমরণ এই নুড়ি ফুলের বসবাস হবে। কারণ নুড়ি ফুল যে তার স্বামীকে ছাড়া বাচতে পারবে না। "
★
বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ পেয়ে নীরা দ্রুত করে ঘর থেকে বসার ঘরে যায় পাল্লা দিয়ে কান্না করছে সব বাচ্চারা। তিশা কাকে রেখে কাকে ধরবে বেচারি বুঝেই পারছে না। নীরা মুন্নি আর নাহিয়ানকে আগলে নিলো। দুটো বাচ্চাই ফুপাচ্ছে। নীরা ওদের দুইজনকেই বুকে আগলে নেয়। ফুপানি বন্ধ হলে নীরার উদ্দেশ্যে নাহিয়ান বলে,
" আম্মু ও আম্মু কোথায় ছিলে তুমি। "
" আমি তো ঘরে ছিলাম বাবা। তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই ডাকি নাই। "
" আম্মু তুমি আমায় ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি তোমায় কোথাও যেতে দিবো না। তুমি সুধু আমার কাছেই থাকবে। "
বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজে উঠোন থেকে সবাই বসার ঘরে উপস্থিত হয়েছে। রুশা মেয়েকে কোলে নিলো। তূর্য নীরার পিছন পিছন এসেছে। মুন্নি তার তুনা বাইকে দেখে ঠোট উলটে জেদে গিয়ে পা জড়িয়ে ধরে। আদুরে কন্ঠে বলে
" তুনা বাইই কুলে "
তূর্য হেসে ফোলা ফোলা গালে চুমু দিয়ে কোলে নিল। মুন্নি তূর্যের ঘাড়ে মাথা রাখলো নীরা নাহিয়ানকে কোলের উপর বসিয়ে চোখের পানি নাকের পানি শাড়ির আচল দিয়ে মুছিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
" আব্বু কাদছিলে কেনো? খারাপ স্বপ্ন দেখেছো আম্মুকে নিয়ে ? "
নাহিয়ান মাথা উপর নিচ করলো। অর্থাৎ সে স্বপ্ন দেখেছে। নীরা নাহিয়ানের মাথা নিজের বুকে চেপে ধরলো। মাথার উপরিভাগে চুমু দিয়ে বললো
" আম্মু এখানেই আছি। আম্মুর কিচ্ছু হয় নাই বাবা। কাদে না আমার সোনা ছেলে না তুমি। "
নাহিয়ান নীরাকে তার ছোট হাত ধারা জড়িয়ে ধরলো। বুকে মুখ গুজে বললো
" নাহিয়ান তার আম্মুকে খুব ভালোবাসে। "
নীরা হেসে বললো
" নাহিয়ানের আম্মুও নাহিয়ানকে খুউউউব ভালো বাসে। "
নাহিয়ান হেসে নীরার গালে চুমু দিলো। তূর্য এবার মুন্নির উদ্দেশ্যে বললো,
" শালিকা তুমি কাদছিলে কেনো। "
মুন্নি কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বললো
" মুন্নির মামা কান্দে তাই মুন্নিও কান্দে হুম্মমম। "
সবাই হেসে ফেললো মুন্নির কথায়। নীরা মেঘলার উদ্দেশ্যে বললো,
" মেঘলা বুড়ি তুমি কাদছিলে কেনো? "
মেঘলা কী বলবে এখন সে কিছু বলে না নীরার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে
" কুলে "
নীরা মুচকি হেসে মেঘলাকে কোলে নেয়। মেঘলা তার ফোকলা দাত দেখিয়ে হাসে। উপর নিচে মোট ৮ টা দার উঠেছে। নীরা মেঘলার গালে চুমু দিলে মেঘলাও সাথে সাথে নীরাকে চুমু দিয়ে দিলো। চুমু দিয়ে আবার হাসে। নাহিয়ান সেটা দেখে রাগ হচ্ছে। তার আম্মুকে কেনো অন্য বাচ্চা চুমু দিবে? নাহিয়ান নীরাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো।
" আম্মু ও তোমায় পাপ্পা দিলো কেনো? "
নীরা ছেলের চুল য়হিক করতে করতে বললো
" এই বাবু তো তোমার ছোট বোন হয়। আর আমি তার চাচি তাই আমাকে পাপ্পা দিয়েছে। রুশা বুবু যেমন তোমার চাচি মণি। আমিও তেমন এই মেঘলা বুড়ির চাচি। বুঝেছো বাবা "
নাহিয়ান এবার বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নাড়ায়। তিশা হামি তুলে বললো
" বড় ভাবি এই বাচ্চারা হাড়ে বজ্জাত। কাল রাতে মারামারি করেছে এই তিন জনে। জানো কি একটা অবস্থা। "
নীরা নাহিয়ানের দিকে তাকালে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বললো
" আম্মু নাহিয়ান গুড বয়। মুন্নি গুড গার্ল আমরা কিছু করি নাই। যা করেছে এই বাবু করেছে। "
"ও তাই বুঝি "
" হুম আম্মু। "
" আপুই এই বাবু পচা। কাল নাতে আমাল মামালে কাম্পু দিসে। আমাল তুল তেনেছে। "
নীরা নাহিয়ানের হাতে দেখলো ছোট ছোট ইঁদুরের দাতের মতো কামড় দেওয়া। ছাপ বসে গেছে। ইসস ছেলেটা কেদেছে মনে হয়। নীরা নাহিয়ানের হাতে চুমু দিয়ে বললো
" আব্বু তুমি না বড় ভাইয়া। একটু কামড় দিতেছে তুমি তোমার বনু কে মারবে না কেমন। আদর করবে সব সময়। "
" আচ্ছা আম্মু। "
নীরা মুন্নির দিকে তাকিয়ে বললো
" বুড়ি সোনা এই বাবুটা তোমার মতো তোমার সখি সে। তাকে ব্যাথা দিবে না কেমন। যদি মারো তাহলে আপুই আর কথা বলবে না তার বুড়ি সোনার সাথে। " মুন্নি কান ধরে বললো
" আপুই আমি আল মালমু না। তুমি কুতা কুইবা আমাল তাথে কেমুন "
" আচ্ছা আমার লক্ষি বোন "
এবার মেঘলার দিকে তাকিয়ে বোলোলো
" এই যে ছোট বুড়ি, তোমার ভাইয়াকে কামড় দিয়েছো কেনো। আবার দিলে এই ছোট ছোট ইঁদুরের মতো দাত তুলে দিবো কিন্তু "
মেঘলা কী বুঝলো কে জানে খিল খিল করে হেসে দিলো। মেঘলার সাথে বাসার সবাই হাসলো। রুশা নীরার উদ্দেশ্যে বললো
" ভাবি যে কয়দিন আছো এই বাচ্চারা তোমার কাছে থাকবে । আমাকে অনেক জ্বালায়। এখন তোমার কোলে শান্ত হয়ে আছে কেমন। "
নীরা মেঘলার গালে চুমু দিয়ে বললো
" আচ্ছা দিয়ে রেখো তোমার ছাওদের "
★
গ্রামের দুপুর যেন এক শান্ত, ধীরলয়ের গল্প। সকালবেলার কোলাহল ধীরে ধীরে থেমে গিয়ে চারদিকে নেমে আসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। আকাশের মাঝখানে জ্বলজ্বল করে রোদ্দুর—সূর্যটা যেন মাথার ওপর দাঁড়িয়ে সবকিছুকে সোনালি আলোয় ভরিয়ে দেয়।
ধানক্ষেতের সবুজ পাতাগুলো রোদের তাপে ঝিমিয়ে পড়ে, হালকা বাতাস এলে তারা মৃদু দুলে ওঠে। দূরে কোথাও শোনা যায় গরুর ঘন্টাধ্বনি, আবার কোথাও কৃষকরা গাছের ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নেয়। মাটির রাস্তা গরম হয়ে ওঠে, যেন খালি পায়ে হাঁটা যায় না।
পুকুরের পানি রোদে চিকচিক করে, মাঝে মাঝে মাছ লাফিয়ে উঠে আবার ডুব দেয়। পুকুরপাড়ের তালগাছ আর নারিকেল গাছগুলো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে, শুধু পাতার ফাঁকে ফাঁকে হালকা বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ শোনা যায়।
বাড়ির উঠোনে এই সময়টা একদম শান্ত—মায়েরা রান্না শেষ করে একটু বিশ্রাম নেয়, শিশুরা খাওয়া শেষে ঘুমে ঢুলে পড়ে। দূরে কোথাও কোয়েলের ডাক, আবার কোথাও শালিকের ডাক ভেসে আসে।
গ্রামের দুপুর মানেই এক টুকরো অলসতা, এক মায়াবী নিস্তব্ধতা—যেখানে সময় যেন একটু থেমে যায়, আর প্রকৃতি নিজের মতো করে বিশ্রাম নেয়।
~~~~~~~~~
নীরা সোফায় বসে বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিলো। পিছন থেকে এসে ঊষ, অবন্তি তিশা এক সাথে এসে নীরাকে পিছন থেকে ঝাপড়ে ধরে যার ফলে নীরা কিছুটা না অনেকটাই ভয় পায়। হার্টবিট বেরে গেসে। নীরা পিছন ঘুড়ে তাকায়। দুই জনকে না চিনলেও তিশা কে চিনতে পারে। নীরার চাহনি দেখে অবন্তি বলে উঠে,
" বড় ভাবি আমি অবন্তি তোমার ননদ। "
ঊষাও সেম ভাবে বলে
" বড় ভাবি আমি ঊষা। যার বিয়ে খেতে সদূর থেকে এখানে এসেছো। "
নীরা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,
" মাশা আল্লাহ আমার ননদরা তো আকাশের পরি। "
ঊষা মুখ বেকিয়ে বলে
" মেজো ভাবি ফোনে যেভাবে তোমার রুপ বর্ননা করেছে তার থেকে তুমি বেশি সুন্দর। ভাইয়ার কপাল খুলে গেসে। "
নীরা চুপ হয়ে গেলো। কী বলবে সে। বললে আবার ফিরে লজ্জা দিবে। নীরা তার ননদ গুলোর উদ্দেশ্যে বললো
" যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। "
"জ্বী ভাবি যাচ্ছি বিকেলে অনেক গল্প করবো কিন্তু "
" আচ্ছা"
নীরা আবার বাচ্চাদের খাওয়াবে তখনি এক কিশোর ছেলের কন্ঠো শুনা যায়। তূর্য বোনদের আওয়াজ পেয়ে নিচে নেমে আসে। মেঘলা আদো আদো বুলিতে বলে
" তাতু তাতু "
আদি ছুটে এসে মেঘলাকে কোলে নেয়। গালে আদর দিয়ে ভরিয়ে দেয়। নীরার দিকে চোখ পরতেই মেঘলাকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। নীরার দিকে অবাকের ন্যায় চেয়ে রইলো। নীরা এতে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। তূর্য তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। আদি নীরার চারপাশে ঘুরে বললো,
" হ্যা সুন্দরী রমণি কোথায় তোমার বাসা বলে দাও আমায়। বিয়ের প্রস্তাব পাঠাই। এই মাটির ঘরে এমন আসমানে চাঁদ আসলো কিভাবে। কী নাম তোমার। কোথায় তোমার গ্রাম। তোমার চাহনিতে যে আমার বুকে বাধলো তীর। হবে কি আমার মনের রাণি।
চলবে.............!