#রাগে_অনুরাগে_তুমি [৩৫]
#ইসরাত_জাহান_এশা
সময় গড়িয়ে যায়। দিন থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস, আবার মাস পেরিয়ে বছর। ঋতুগুলোও ঠিক সেভাবেই আসে আর যায়—কখনো রঙিন, কখনো ম্লান, তবুও থেমে থাকে না কিছুই। দুই বছর… দেখতে খুব ছোট সময় মনে হলেও, এই সময়ের ভেতরেই অনেক কিছু বদলে যায়। মানুষ বদলায়, অনুভূতি বদলায়, সম্পর্কের রঙ বদলায়। কিছু কাছের মানুষ দূরে সরে যায়, আবার অচেনা কেউ খুব আপন হয়ে ওঠে। জীবন নিঃশব্দেই নিজের গল্পটা নতুন করে লিখতে থাকে। আজ১২ ডিসেম্বর। পুরোপুরি শীতকাল। শীতের এক শান্ত সকাল। চারপাশে হালকা কুয়াশা, যেন পৃথিবীটা নরম সাদা পর্দায় ঢাকা। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কুয়াশা ভেদ করে বেরোতে চাইছে, পুরোটা দেখা যায় না, তবুও তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু ঠান্ডা বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে ঝিলমিল করে। পাখির মৃদু ডাক মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তির আবহ তৈরি করে। শীতের হালকা কাঁপুনি গায়ে মেখে মানুষ গরম কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেয়, আর এই নীরব, ধীর সকালের ভেতর দিয়ে নতুন একটা দিনের শুরু হয়।
নীরা ঘুমের আড়মোড়া ভেঙে শুয়া থেকে উঠে বসলো। শীতের সকালে উঠতে মনে না চাইলেও উঠতে হয়। দূর থেকে ফজরের আজান শুনা যাচ্ছে। নীরা টেবিল ঘড়িতে সময় দেখলো মাত্র ৫:১৫। নীরা ঘাড় ঘুড়িয়ে তূর্যকে দেখলো যে কিনা কম্ফোর্ট দিয়ে ঢেকে ঘুমাচ্ছে। পাশে তাকালে দেখলো নাহিয়ান নেই। বুকের ভিতর মোচর দিয়ে উঠে নীরার। বিছানা থেকে উঠে লাইট জ্বালিয়ে ওয়াশরুম, বারান্দা, স্টাডি রুম সব চেক করলো। নাহ নাহিয়ান কোথাও নেই। নীরা দ্রুত পায়ে এসে তূর্যকে ডাকলো।
“ নাহিয়ানের বাবা , এই নাহিয়ানের বাবা। আরে ভ্যাটকা মেরে না শুয়ে থেকে উঠুন। “
লাস্টের কথাটি জোরেই বললো। তূর্য ধরফরিয়ে উঠলো। চোখে এখনো ঘুম। আবার বালিশে মাথা রাখতেই নীরা খ্যাঁক করে উঠে চিল্লিয়ে বললো
“ আবার বালিশে মাথা রাখলে এই ঠান্ডায় বাহিরে ছুরে ফেলবো আপনাকে। এতো ঘুম কীসের আপনার? “
তূর্যের ঘুম পুরোপুরি ছুটে যায়। নীরার দিকে তাকিয়ে দেখলো রাগে ফুসছে। গাল, নাক লাল হয়ে আছে৷ ঠান্ডায় নাকি রাগে বুঝা যাচ্ছে না। তূর্য বালিশ বুকে চেপে তাকিয়ে রইলো নীরার দিকে। নীরার রাগ আরো বেরে গেলো। বেড সাইড টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি তূর্যের মুখের ছুড়ে ফেলে। তূর্য হকচকিয়ে উঠে। কী মনে করে চিল্লিয়ে বললো,
“ এই, এই বউ তোমার উপর কী জিন ভর করলো নাকি? আমার বউতো এমন না। নিশ্চই বদ জিন ভর করেছে। হায় আল্লাহ! এই জিন দূর হো। আমার আলাভোলা বউকে ছেরে দে। নিশ্চিত আমি, জিন তোমায় দিয়ে এসব করাচ্ছে। আমি ঝাটা নিয়ে আসছি। ঝাটা দিয়ে দুইটা পাছায় বারি মারলে জিন বাপ বাপ করে পালবে। “
এই বলে ঝাটা খুজতে বিছানা থেকে নামলো। নীরা আহাম্মক হয়ে রইলো। তার উপর জিন ভর করেছে? ভাবতেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে। নীরা পরক্ষণেই চেচিয়ে বলে উঠে,
“ ওই ঝাটা দিয়ে আপনার ভুত ছাড়াবো। চুপচাপ বসুন বলছি। “
তূর্য বউয়ের ঝাড়ি খেয়ে বুকে থুথু দিলো। বিছানার কোণায় বসলো। নীরা নিজেকে ধাতস্থ করল। নীরা নিজের মেজাজ এর উপর নিজেই বিরক্ত। আজ কাল মুড সুয়িং হচ্ছে শুধু কেনো হচ্ছে সেটা নিজেই জানেনা। বার কয়েক জোরে নিশ্বাস ফেলে তূর্যর উদ্দেশ্যে বলল,
“নাহিয়ানের বাবা আমার ছেলে কোথায়? “
তূর্য ভ্রু উচিয়ে বলল ,
“বউ তোমার কী ভুলে যাওয়ার রোগ হয়েছে নাকি? “
“যেই প্রশ্ন করেছি সেটার উত্তর দিন। “
“ ছেলে আমাদের তার নিজের ঘরে কয়েক মাস আগে তার জন্য আলাদা করে ঘর দেওয়া হয়েছে তুমি কি সেটা ভুলে গেছো বউ। “
নীরা একটু শান্ত হয়ে বিছানায় বসলো। কয়েক সেকেন্ড পর নীরা উঠে দরজা খুলে নাহিয়ানের ঘরের উদ্দেশ্যে চলে যায়। তূর্য নীরার পিছু পিছু যায় নীরা নাহিয়ানের ঘরে গিয়ে নাহিয়ান এর উপর থেকে কমফোর্ট সরিয়ে দিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় কপালে গালে চুমু এঁকে দেয়। নাহিয়ান আদরের স্পর্শ পেয়ে পিট পিট করে চোখ খুলে। চোখ খুলতেই তার আম্মুকে দেখে অধর কোণে হাসি ফুটে উঠে। নীরা হাসে ছেলের হাসি দেখে। নীরা নাহিয়ানের কপালে আবার চুমু একে দিয়ে বলে,
“হ্যাপি বার্থডে আমার মানিক সোনা। “
নাহিয়ান খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় তার আম্মুকে জড়িয়ে ধরে। নাহিয়ান নীরাকে বললো,
“আম্মু আজকে স্কুলে যাবো না? “
“ না বাবা আজকে স্কুলে যেতে হবে না। “
নাহিয়ান নীরাকে জড়িয়ে ধরলো আবার। নীরা নাহিয়ানের কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“বাবা উঠো নামাজ পড়বে না “
নাহিয়ান মাথা উচু করে নীরার দিকে চেয়ে বললো,
“ আম্মু সূর্যি মামা কি উঠেছে? “
“না তো বাবা। “
“আরেকটু পড়ে উঠলে নামাজ পড়া যাবে? “
“ হুম আব্বু পড়া যাবে। “
“আম্মু তাহলে একটা কথা বলি। “
“হুম মানিক সোনা বলো। “
নাহিয়ান নীরার বুকে মাথা রেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
“ আমি আরেকটু তোমার বুকে ঘুমাই। তোমার বুকে ঘুমাতে আমার অনেক ভালো লাগে আম্মু। “
নীরার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। নীরা কোমফর্ট দিয়ে নাহিয়ানকে আপাদমস্তক ঢেকে দিলো। চুলে হাত বুলিয়ে বললো,
“ আমার আব্বু যতক্ষণ মনে চাইবে ততক্ষণেই তার মায়ের বুকে ঘুমাবে। “
নাহিয়ান হেসে বললো
“ আই লাভ আম্মু। “
নীরা নাহিয়ানের কপালে শব্দ করে চুমু দিয়ে বললো
“ আই লাভ ইউ টু বাবা। “
মা ছেলের খুনশুটি গুলো দরজার বাহিরে দাড়িয়ে সব দেখছিলো তূর্য। তার সুখ সুখ লাগছে ভিষন। আর লাগবেই তো যার এমন বুঝদার বউ আছে। যে কিনা স্বামীর আগের স্ত্রীর সন্তানকে খুব যত্ন করে ভালোবাসে অবহেলা করে না। তার সংসার সুখের নদীতে ভাসছে। তারই তো সুখ লাগবে। তূর্য আর দাঁড়ালো না। ঘরে চলে গেলো। মা ছেলে থাকুক একা। ছেলেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা নাহয় পড়ে জানাবে।
★
বেলা বাজবে সকাল ৮ টা । নীরা নাহিয়ানকে বাচ্চাদের সাদা পাঞ্জাবী পড়িয়ে দিবে । সাথে কালো কটি বাচ্চাদের । সাদা পায়জামা । নীরা নাহিয়ানকে রেডি করিয়ে বার কয়েক শুধু চুমু দিয়ে আর মাশাআল্লাহ আওরালো । নীরা নাহিয়ানকে রেডি করিয়ে নিচে নামে । রুশা , তিশা , অবন্তী , লিপি,অনু ,ঊষা , রাজু , রিজবি , রিহান , আদি, তৈসির, বর্ষা সাথে আড়াই বছরের ছোট মেঘলা, মুন্নি, নিলয়। সবাই কালকে এসেছে। মুন্নি এগিয়ে এসে নাহিয়ানকে শুভেচ্ছা জানায়
" শুভ জন্মদিন মামা। "
নাহিয়ান হেসে মুন্নিকে বলে
" ধন্যবাদ আন্নি। "
একে একে সবাই শুভেচ্ছা জানায়। নাহিয়ানের মুখ থেকে আজ হাসি সরছে না। আমেনা চৌধুরী পায়েসের বাটি নিয়ে এসে নাহিয়ানকে খাইয়ে দিয়ে বসলে।
" আমার দাদুভাই শুভ শুভ জন্মদিন । দোয়া করি তুমি এভাবেই হাসি খুশি থেকো। "
নাহিয়ান আমেনা চৌধুরীকে বলে,
" দাদু একটু নিচু হবে। "
আমেনা চৌধুরী কথা না বারিয়ে নিচু হলো। নাহিয়ান টুপ করে গালে চুমু দিয়ে বললো,
" তুমি আমার জন্য এতো গুলো করে দোয়া করবে কেমন। তুমি দোয়া করলে আমি আরো বড় হবো। আমি উকিল হবো। দোয়া করবে আমার জন্য। "
নাহিয়ানের কথা শুনে সবাই নীরার দিকে তাকালো। নীরা ভরকে গেলো। রিজবি এসে নাহিয়ানকে কোলে নিয়ে বললো
"চ্যাম্প এই কথা কে বলেছে তোমায়? যে দোয়া করলে বড় হয়। আবার উকিল হবে। "
" আমার আম্মু বলেছে বড়রা দোয়া করলে অনেক বড় হয়। "
" আর উকিল হবে এটাও আম্মু বলেছে? "
" হ্যা তো! আম্মু বলেছে ভালো করে পড়াশোনা করতে। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। বড় হয়ে টাকা পয়সা আয় করে বাবা আর আম্মুকে দেখাশোনা করতে হবে। আমি তাদের একটা ছেলে না। "
সবাই হা হয়ে গেলো এই কথা গুলো শুনে। রুশা নীরার দিকে তাকিয়ে বললো
" ভাবি ওরে এখন থেকেই এসব বলছো কেনো? "
নীরা বুঝলো সবাই ব্যাপারটা অন্য ভাবে নিচ্ছে। বাবার ব্যাবসা আছে সেটাই দেখবে ছেলে। আবার ছেলেকে উকিল বানাতে চায়। তাই নীরা নাহিয়ানকে নিজের কোলে নিয়ে খাবারের টেবিলে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে বললো
" আমিতো ওর মা। মা হয়ে ছেলেকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া আমার কর্তব্য। ছেলে যদি বুঝদার হওয়ার পরে জানতে পারে তার বাবার ব্যবসা সেই দেখবে তাহলে তার মাথায় ভালো কিছু আসবে না। বড় হয়ে আজেবাজে জিনিসের প্রতি আক্রোশ বারবে। পড়াশোনায় মন দিবে না। আমি চাই না আমার ছেলে বাজে কোনো কাজ করুক। ও, ওর নিজের পায়ে দাঁড়াবে। দরকার পরলে ওর বাবার ব্যাবসাও দেখাশোনা করবে। আমি ছোট থেকে ওর ক্যারিয়ারের দিকে ফোকাস দিচ্ছি। আমি চাই না সমাজ আমার ছেলেকে নিয়ে বাজে কথা বলুক। ওর দিকে কেউ আঙুল তুলুক। আমি চাই না আমার ছেলে কটু কথা শুনুক। আমি চাই না সমাজ বলুক আমি ওরে ভালো শিক্ষা দিতে পারি নাই। ও সমাজে মাথা উচু করে বাচবে। দশ টা মানুষ ওরে চিনবে ভালো কাজের জন্য। সমাজ যেনো আমার ছেলেকে বাজে কথা বলার সুযোগ না পায়। আমি চাই আমার ছেলে সবসময় সৎ পথে থাকুক। আর উকিল বানানোর একটা কারণ আছে বটে। সেটা নাই বললাম। এমন না আমি এই সিদ্ধান্ত একাই নিয়েছি। ওর বাবাকে জানিয়ে তারপর নিয়েছি। ব্যাবসা আছে থাকবে। কিন্তু একবার লাইফ নষ্ট হয়ে গেলে সেটা ঠিক করা যায় না সহজে। আমার ছেলে বড় হয়ে সত্যি ঠিকি জানবে একদিন। সে যেনো বলতে না পারে আমার আম্মু আমায় সঠিক পথে চালনা দেয় নি। আমায় খারাপ পথে যেতে দিয়েছে। এখানে না আছে আমার সার্থ আর না কোনো কিছুর আশা। আমি কিছুই আশা করি না। আমি আমার ছেলেকে মন থেকে খুবই করে ভালোবাসি। "
সবাই নীরার কথা সবাই চুপ হয়ে গেলো। কেউ কিছু বলার ভাষা খুজে পেলো না। নীরা যা যা বলেছে সবই সঠিক কথা। ভুল কিছুই নেই। নীরা হাসিমুখে ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছে। সকালে নামাজ পড়ে ছেলের পছন্দের নাস্তা বানিয়ে রেখেছে। ছেলেও হাসি মুখে মায়ের হাতে খাচ্ছে।
•••
শীতের বিকেলটা তখন আস্তে আস্তে গাঢ় হয়ে আসছে। আকাশে রোদের আলোটা মলিন সোনালি রঙে মিশে গেছে, আর হালকা কুয়াশা চারপাশটাকে যেন নরম একটা চাদরে ঢেকে দিয়েছে। ঠান্ডা হাওয়াটা বারবার জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ঘরের ভেতরটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে। বাড়িটা আজ অন্য দিনের মতো নয়—আজ এখানে ছোট্ট একটা আনন্দ উৎসব। জন্মদিন বলে পুরো ঘরজুড়ে সাজসজ্জার ব্যস্ততা। দেয়ালে রঙিন বেলুন, ঝলমলে। নানা রঙের ফিতা ঝুলছে। কোথাও চকচকে স্টার শেপের ডেকোরেশন, কোথাও আবার ছোট ছোট আলো ঝিলমিল করছে। বাচ্চাদের হাসির শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসছে।
..
নীরা নাহিয়ানকে কালো শার্ট, পেন্ট, ব্লেজার পড়িয়ে দিলো। তাকে খুব যত্ন করে রেডি করছে। চুলে হালকা জেল নিয়ে চুল গুলো সেট করে দিলো। হাতে পড়িয়ে দিলো সিলভার চেইনের ঘড়ি। রেডি করিয়ে নীরা তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে। নাহিয়ান হেসে বললো,
“ আম্মু কী দেখছো? “
“ আমার রাজকুমারকে দেখছি বাবা। “
“ আমি রাজকুমার? “
“ হুম মিসেস নীরা চৌধুরীর রাজকুমার। “
নাহিয়ান নীরাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“ নাহিয়ান তার আম্মুকে অনেক ভালোবাসে। “
নীরাও জড়িয়ে ধরে বললো,
“ নাহিয়ানের আম্মুও তার রাজকুমারকে ভালোবাসে। “
এই বলে চোখের কোণা থেকে কাজল কানের গোড়ায় দিয়ে দিলো। বদ নজরের দোয়া পড়ে ফু দিলো। আজ অনেক লোক আসবে। সবার নজর এক না। সেই হিসেব করেই নীরা সেই কাজ টা করলো। রিজবি, রিহান এসে নাহিয়ানকে নিয়ে গেলো। নাহিয়ান যাওয়ার পর গুটি গুটি পায়ে ৫ বছরের মুন্নি আসলো। পরনে তার নীল কালারের বার্বিডলের গাউন। কাল তূর্য মুন্নি, মেঘলা, বর্ষার জন্য কিনে এনেছে। তিন বাচ্চাদের সেম কালারের গাউন। মুন্নি এখন আগের ন্যায় স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে। মুন্নি নীরার সামনে এসেই বললো,
“ আপুই এবার আমাকে সাজিয়ে দাও। “
নীরা হেসে মুন্নির গালে চুমু দিলো। মেয়েটা আগে থেকে বেশ নাদুসনুদুস হয়েছে। দেখতে পুরো রসগোল্লা লাগে। গাল দুটো ফুলে টস টস করে। দেখলেই আদর করতে মনে চাইবে। নীরা মুন্নিকে বিছানার উপর বসিয়ে চুল সুন্দর করে বেধে দিলো। মুখে শুধু বেবি ক্রিম লাগিয়ে দিলো আর পিংক লিপ বাম দিয়ে দিলো। মুন্নির পিছু পিছু বর্ষাও এলো। সেও সাজবে তার বম্মার কাছে। বর্ষা এসেছে দেখে আড়াই বছরের মেঘলাও চলে এসেছে। মেঘলা, বর্ষা নীরাকে বম্মা বলে ডাকে। নীরাও খুব খুশি হয় এই ডাকে। মুন্নিকে রেডি করিয়ে বাকি দুই বাচ্চাকেও সুন্দর করে রেডি করিয়ে দিলো। তিনজনেই চলে গেলো। বাহিরে উকি মেরে দেখলো নাহিয়ানের সাথে সবাই আছে। তূর্যকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মানুষটা দুপুর থেকে বাসায় নেই। দরজা ভিরিয়ে দিয়ে আলমারির কাছে যায়। আলমারি থেকে কালো মসলিন শাড়ি বের করে। তূর্য এই শাড়িটা এনে দিয়েছিলো আজকে পড়ার জন্য। শাড়িটি সুন্দর করে পড়ে নিলো। চুল গুলো খোপা করলো। কানে ছোট সাদা ঝুমকো। ঠোটে পিংক লিপ্সটিক। আর চোখে গাঢ় করে কাজল। যা তূর্যর অনেক পছন্দ। মুখে কোনো প্রসাধনী দিলো না। আয়নার সামনে দাড়ালো। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলো। হাতে চুড়ি পরবে তখনি ১ বছরের আহির আসলো। আদো বুলিতে বুলিতে মাম্মি মাম্মি বলে আসছে। আহির লিপির ছেলে। বছর ঘুরতেই আহির আসার সংবাদ জানায়। সবাই এতে অবশ্য খুশি হয়। রিহান বিয়ের এক মাস পর বিভিন্ন স্কুল কলেজে ইন্টারভিউ দিয়েছে। সিলেটের নামকরা কলেজে তার চাকরি হয়ে যায়। সে এখন ইংরেজির প্রফেসর। আহিরের পিছনে লিপি আসছে এক প্রকার দৌড়ে। লিপির হাতে আহিরের খাবারের বাটি। ছেলে একদমি খেতেই চায় না। নীরা গিয়ে আহিরকে কোলে নিয়ে বলে,
“ হ্যাঁ বাবা"
"কাবো না"
"কী খাবে না "
"কাবার "
"কেনো"
"কেনো"
“ মাম্মি কাবো না। পতা কেতে। “
নীরা হেসে গালে চুমু দিলো। পুরো লিপির ডুবলিকেট। নীরা আহিরকে নিয়ে বিছানায় বসতে বসতে বললো
“কে পচা বাবা? “
“ মা “
লিপি এসে ছেলের গালে মিছি মাইর দিয়ে বললো
“ আমি পচা। আর তুই ভালো তাই না। “
আহির ঠোঁট উলটে কেদে দিলো। শব্দ করেই কাদছে। কিন্তু চোখে এক বিন্দু পরিমাণে পানি নেই। নীরা আহিরকে বুকে জড়িয়ে দিয়ে বললো
“ হ্যাঁ বাবা, মা পচা। নাহলে কী তোমায় মারে বলো। আসো মাম্মি খাইয়ে দেই তোমায়। “
আহির মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। লিপির কাছ থেকে খাবারের বাটি নিলো। লিপি ধরাম করে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। নীরার উদ্দেশ্যে বললো
“ভাবি এই পুচকের খাওয়া হলে বইলো আমায়। আমি একটু পিঠ লাগাই। এই বাপ ছেলে আমায় শান্তি দেয় না। “
নীরা মুচকি হাসলো। আহির নীরার হাতেই সুন্দর করে খাবার খাচ্ছে। নীরা কতো কথা বলছে আহির মনোযোগ দিয়ে শুনছে আর খাবার খাচ্ছে। লিপি আরচোখে তাকিয়ে দেখলো সেটা। লিপি বিছানায় উঠে বসে বললো,
“ ভাবি “
নীরা লিপির দিকে তাকিয়ে বললো
“ হুম আপু বলো। “
“ তোমার কোল আলো করে কবে আসবে? “
নীরা হাত থমকে গেলো। শুকনো ঢোক গিললো। কোনোমতে বললো
“ এখনো ভাবি নাই আমি আপু। আমার গ্রেজুয়েট শেষ হোক আগে। তারপর ভাববো।”
লিপি নীরার দিকে তাকিয়ে রইলো। নীরা কিছু যে লুকাচ্ছে সেটা লিপি বেশ বুঝতে পারছে। লিপি কিছু বললো না। আহির ঘুমিয়ে পরেছে। লিপি আহিরকে কোলে নিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে দরজা আটকিয়ে দেয়। লিপি চলে যেতেই নীরার হাত আজান্তেই চলে যায় পেটে। যেখানে ২ সপ্তাহের ভ্রুন উপস্থিত । যার কথা কেউ জানে না। চোখে পানি টলমল করছে। কান্নারা দলা পাকিয়ে আসছে। কথাও বলতে পারছে না। কোনোমতে গলা দিয়ে কিছু লাইন আওরিয়ে বললো,
“ মা, বাবা কে আছো আমার এই গর্ভে? তোমার বাবা শুনলে খুশি হবে জানো। কিন্তু তোমার ভাই? সে যদি নারাজ হয় তোমার মায়ের উপর? তোমার মাকে যদি তোমার ভাই ভুল বুঝে? তোমার ভাই যদি মনে করে আমি তোমার ভাইকে ভালোবাসি না তখন? তখন তোমার মায়ের কী হবে? তোমার মা যে তোমার ভাইয়াকে খুব ভালোবাসে। তোমার মাকে তো তোমার ভাইয়া আগে আম্মু বলে ডেকেছিলো। এই অনুভূতির কথা প্রকাশ করার মতো না। আমি তোমায় পৃথিবীতে আনতে চাই তো। কিন্তু আমি, আমি কী করবো বলে দাও মাকে। আমি যে পথ খুজে পাচ্ছি না। “
এই বলে ডুকরে কেদে উঠে। মেঝেতে বসে মৃদু স্বরে কাদছে । তূর্য কেবল উপরে আসছিলো হাতে শপিং ব্যাগ। ঘরের ভিতরে যাবে তখনি নীরার বলা কথা গুলো শুনতে পায়। নীরা যে কাদছে সেটাও সে শুনতে পায়। তূর্যর হাত পা কাপছে। তার আরেকটা সন্তান আসতে চলেছে। তার ছোট সংসারে আরেজন ক্ষুদ্র সদস্য আসছে। কিন্তু নীরা? সে বললো না কেনো? নাহিয়ানের জন্য? নাহিয়ান নীরাকে ভুল বুঝবে এর জন্য জানায় নি? আচ্ছা নীরা কি এই সন্তান রাখবে না? ন’ষ্ট করে ফেলবে নাতো? এই কথা ভাবতেই তূর্যর শরীর কাটা দিয়ে উঠে। সব চিন্তা ভাবনা সাইডে রেখে ঘরে যায়। ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। তূর্য ঘরে এসেছে দেখে চোখ মুছে ফেললো যেনো তূর্য না বুঝতে পারে। মিছি মিছি কিছু খুজতে লাগলো। যেনো বুঝে কিছু পড়ে গিয়েছে। তূর্য স্বাভাবিক ভাবেই বললো
“ কি খুজছো? “
নীরা আমতা আমতা করে বললো,
“ ওই ওই আমার কাজল খুজছি। চোখে লাগাবো। পড়ে গেছে খুজেই পাচ্ছি না। “
তূর্য হাসে। ড্রেসিং টেবিল থেকে কাজল নিয়ে নীরার কাছে দিয়ে বললো,
“ এই নাও ড্রেসিং টেবিলের উপরেই ছিলো। “
নীরা হেসে বললো,
“ এটা উপরে ছিলো আর আমি খুজে হয়রান হচ্ছি। দিন আমায়। আর গিয়ে রেডি হন। আপনার কাপড় সব বের করে রেখেছি। “
এই বলে কাজল নিয়ে টেবিলে রেখে চলে যেতে নিলে তূর্য নীরার হাত ধর বললো
“কাজল দিবে না? “
“দিবো আসছি আমি “
এই বলে হাত ছুটানোর চেষ্টা করে। তূর্য নীরার হাত ধরে টেনে সামনে দার করায়। তূর্য নীরার চোখের দিকে তাকায়। নীরা তাকায় না। চোখ এদিক সেদিক করে। তূর্য শান্ত গলায় বললো
“ আমার দিকে তাকাও ফুল। “
নীরা তাকায় না। তূর্য নীরার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎই নীরার সামনে বসে পড়লো। কোমড় জড়িয়ে পেটে মুখ গুজে বলে উঠে,.....
চলবে………