#রাগে_অনুরাগে_তুমি [৩৮]
#ইসরাত_জাহান_এশা
রাতের শেষ প্রহরে নেমে আসা বৃষ্টির ছোঁয়া এখনো যেন ভেজা হয়ে লেগে আছে সকালের গায়ে। শীতের বিদায়বেলার সেই হালকা ঠান্ডা আর বৃষ্টির মিশ্রণে ভোরটা হয়ে উঠেছে এক অন্যরকম কোমল। ঘাসের ডগায় ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু আর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মিলে ঝলমল করছে প্রথম সূর্যের আলোয়। মাটির গন্ধটা আজ একটু বেশি গভীর, যেন রাতভর বৃষ্টি মাটির বুক খুলে দিয়েছে। দূরে কোথাও পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে ডেকে উঠছে, তবে সেই ডাকেও আছে একধরনের নরমতা—যেন তারাও বুঝে গেছে ঋতুর এই বদলের গল্প। গাছের পাতাগুলো ধুয়ে মুছে একেবারে সতেজ, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এক ধরনের শীতল শান্তি। রোদের আলোটাও আজ কেমন ম্লান-নরম, চোখে লাগে না—বরং ছুঁয়ে যায় আলতো করে। এমন একটা সকাল, যেখানে শীতের শেষ আর বসন্তের আগমনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সময়টা নিজেই একটু থমকে গেছে—ভেজা, শান্ত, আর অদ্ভুত সুন্দর।
••
নীরা সকালে খালি পায়ে বাগানে হেটে বেরাচ্ছে ৪ মাসের উচু পেট নিয়ে। গায়ে একটা পাতলা চাঁদর জড়ানো। বাগান থেকে একটা রক্তকাঞ্চন ফুল ছিরে কানে গুজলো। আরেকটা লাল গোলাপ ছিরে তার পছন্দের দোলনায় গিয়ে বসলো। আগে থেকে এমনিতেই একটু গোলুমলু তারউপর প্রেগন্যান্সির সময় আরো মোটা হয়েছে। কেউ বলবে না তার চার মাস চলছে। নীরা আস্তে আস্তে দোল খাচ্ছে আর চার মাস আগের কথা ভাবছে,
চার মাস আগে :.....
নাহিয়ানের ফাইনাল এক্সামের শেষের দিন । নীরা নাহিয়ানকে নিয়ে পরিক্ষা শেষে রেস্টুরেন্টে যায় খাবার খাওয়ানোর জন্য । নীরা অর্ডার দিয়ে নাহিয়ানের প্রশ্নপত্র দেখছে আর নাহিয়ানকে কিছু কিছু প্রশ্ন করছে। নাহিয়ানও হাসি মুখে উত্তর দিচ্ছে। অর্ডার আসতেই নাহিয়ানকে নীরা খাইয়ে দিচ্ছে যত্ন করে। খাওয়ার কিছু মুহূর্ত পর নীরাদের টেবিলে আসে কণিকা। নীরা প্রথমে দেখা পাত্তা দেয় না। ভাবলেশহীন ভাবে তার ছেলেকে খাইয়ে দিতে থাকে। নাহিয়ান ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। নীরা দেখতেই নাহিয়ানের কপালে চুমু দিয়ে বলে।
“ আব্বু কী হয়েছে? “
নাহিয়ান নীরার দিকে আরো সেটে যায়। নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ আম্মু এই আন্টিকে যেতে বলো। এই আন্টি ভালো না খুব পচা। তারাতারি যেতে বলো। “
নীরা কণিকার দিকে তাকিয়ে দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি লেপ্টে আছে। নীরার বুঝতে বাকি থাকে না। নীরা কিচ্ছু বলে না। নাহিয়ানকে নিঃশব্দে খাইয়ে দিতে থাকে। কণিকার যেনো এই ব্যবহার সহ্য হলো না। নীরার উদ্দেশ্যে বললো
“ আমি যে এখানে বসে আছি চোখে দেখো না। “
নীরা আপনমনে তার ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছে। কণিকা আবার বললো
“ হেয় ইউ “
“ গলা নামিয়ে কথা বলুন। “
“ তোমার সাথে আমার কথা আছে “
“ আই ডোন্ট হ্যাভ ইট। ইউ মে গো। “
” আই'ম ইনসাল্টিং ইউ”
“ ডু ইউ থিঙ্ক উড রেসপেক্ট ইউ । আর আমার কোনো মেয়েদের দিকে কোনো অ্যা-ট্র্যাকশন নেই। “
কণিকা চুপ হয়ে গেলো কী বলবে সে। নীরা যে অপমান করছে এটা ভালোই বুঝতে পারছে। নীরা নাহিয়ানকে খাইয়ে দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলো। নাহিয়ানের উদ্দেশ্যে নীরা বললো
“ আব্বু ডেজার্ট অর্ডার করে দিচ্ছি সেটা আস্তেধীরে খাবে। আম্মু একটু বাহিরে যাবো। এখানেই থাকবে কোথাও যাবে না কেমন। “
নাহিয়ান বাধ্য ছেলের মতো মাথা নারে। নীরা ডেজার্ট অর্ডার দিয়ে ছেলের কপালে চুমু দিয়ে কণিকার হাত ধরে এক প্রকার টেনে রেস্টুরেন্টের পাশে নিয়ে যায়।
নীরা কণিকাকে বেঞ্চে বসতে বললো চোখের ইশারায়। কণিকা বসলো। নীরা আসেপাশে তাকিয়ে এক কঞ্চি তুলে নিলো। কঞ্চি নিতে দেখে কণিকা একটু চমকে উঠলো। নীরা কঞ্চি নিয়ে বেঞ্চের হাতলে বারি দিয়ে বললো,
“ কালনাগিনী আবার সংসারে আগুন লাগাতে আসছিস। তোকে সেদিন ঝাড়ু পেটা করা উচিত ছিলো। তোর সাহস কত বড় তুই আমার ছেলের কান ভাঙাস। এই তোর কলিজা কত বড় দেখাতো আমায়। “
কণিকা নীরাকে বললো,
“ মুখ সামলিয়ে কথা বলো। আর নিজের ছেলে নিজের ছেলে বলছো কোন হিসেবে। হি ইজ নট ইউওর স'ন। হি ইজ মাই সন। “
“ এই চামচিকি চুপ কর। ওলুকুথার ঘরে ওলুকুথা। “
কণিকা হা হয়ে গেলো নীরার কথা শুনে। এসব কী ধরণের ভাষা। কণিকা নিজেকে সামলে বলল,
“ দেখো তোমায় ভালো ভাবে বলছি। আমি জানি তূর্য তোমায় ভালোবাসে না। ও তোমায় মেনে নেয় নি। ও শুধু ছেলের জন্য তোমায় বিয়ে করেছে। তাই ভালোই বলছি চলে যাও ওর জীবন থেকে নাহলে আ… “
“ আইসে আমার কুমড়িমুখি, পচা ধেমরি , ঢেমসি মুখি, শাকচুন্নির ঘরে শাকচুন্নি । আরে রাক্ষসী তোকে যদি আমি পচা নর্দমায় না চুবিয়েছি তাহলে আমার নামও নীরা চৌধুরী না। কী জানি বলছিলি আমার জামাই আমারে ভালোবাসে না দারা মুখ পুড়ি। “
এই বলে তূর্যকে কল করলো। তূর্য অফিসে মিটিং কঅরছিলো। নীরার কল পেয়ে মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সবার থেকে এক্লটু বিরতি নিয়ে দূরে গিয়ে ফোল রিসিভ করলো। ফোন রিসিভ করতেই নীরা ফোন লাউড স্পিকারে দিয়ে দিলো৷ তূর্য হাসি মুখে বললো
“ বলো ডার্লিং। “
নীরা অবাক হয়ে বললো,
“ কী বললেন? “
“ বলো ডার্লিং , আমার জানু “
“ আমি আপনার জানু লাগি? “
“ তুমি আমার জানু, সুইটহার্ট, ডার্লিং , আমার বাচ্চার মা, আমার মনের রাণি, আমার ফুল তুমি। আমার হৃদয়ের পুস্প তুমি। “
নীরা কিছুটা লজ্জা পায়। কণিকা সব কথাই শুনলো। তূর্য শুধু ওরে নাম ধরেই ডাকতো এসব নামে ডাকেনি কখনো। নীরা হাসি মুখে বললো
“ কোথায় আছেন এখন? “
“ অফিসে মিটিং করছিলাম। আমার বাচ্চার মায়ের ফোন পেয়ে ছুটে আসলাম। “
“ নাহিয়ানের স্কুলের পাশে যে রেস্টুরেন্টে আচগে সেখানে আসবেন এখন “
“ ১০ মিনিট সময় দাও বউ আসছি আমি। “
এই বলে ফোন কেটে দেয়। নীরা কণিকার দিকে তাকালো। কণিকা ভোতা মুখে বসে আছে। নীরা হেসে বললো
“ কে জানো বলেছিলো আমায় আমার স্বামী ভালোবাসে না। এখন তার চেহারাটা আমার দেখা দরকার। “
কণিকা কটমট দৃষ্টিতে তাকালো নীরার দিকে। নীরা কপাল কুচকে কঞ্চি দিয়ে হাতে বারি দিয়ে বলে,
" মানুষের রক্ত চুষে খাওয়া শাকচুন্নি এভাবে তাকাস কেন তুই? আমি তোর তাকানোতে ভয় পাই কালনাগিনী। "
কণিকা ব্যাথা পায় হাতে। নীরাকে কিছু বলতে যাবে তখনি দূর থেকে তূর্যর গাড়ি দেখতে পেলে থেমে যায়। গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে তূর্য। কালো শার্ট কালো পেন্ট সাদা ব্লেজার চুল জেল দিয়ে সেট করা চোখে নেভি ব্লু গ্লাস। তূর্য চশমা খুলে বুকের সামনে রাখে। কণিকা পুরোটা সময় তূর্যকে দেখলো। নীরা কণিকার চোখের নিসানা দেখে তাকালে দেখতে পায় তূর্যকে সে গিলে খাচ্ছে। নীরার মাথা গরম হয়ে যায়। তূর্য নীরার কাছে এসে বলে,
" ফুল এখানে কী করছো? নাহিয়ান কোথায়। "
নীরা বলার আগেই কণিকা বলে,
" ছেলে রেস্টুরেন্টের ভিতর তূর্য। তুমি কেমন আছো? "
তূর্য তাকায় কণিকার পানে। কণিকার দিকে তাকাতেই চোখ কুচকে তাকায় নীরার পানে। নীরার নায়াকের পাটা ফুলছে। তূর্য কিছু বলে না। কণিকা আবার বলে
" তুমি সেই আগের মতোই আছো তূর্য। বললে না যে কেমন আ... "
কণিকা আর কিছু বলতে পারে না। নীরা ঠাস করে বাম গালে থাপ্পড় দেয়। দাত খিচে বলে,
" পোড়া মুখি, ড্রেন থেকে উঠে আসা পেত্নি। শেওরা কাছের শাকচুন্নি। আমার জামাইয়ের দিকে নজর দেস কোন হিসেবে তুই। তোর চোখ তুলে নিবো আমি। "
কণিকা এতে অপমান বোধ করে। কণিকা হাত তুলে নীরার দিকে এগোতে নিলে তূর্য ডান গালে থাপ্পড়ে দিয়ে বলে
" আমার বউয়ের থেকে দুরে থাকুন। আমার ফ্যামিলির দিকে আপনার মতো অসুভ ছায়া পরতে দিবো না আমি। কথা না শুনলে অম্য পদক্ষেপকারী বেছে নিবো আমি। "
তূর্য আর বলার সুযোগ দেয় না। নীরার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যায়।
নীরা এগুলো ভাবছে। হঠাতেই কাধে হাত রাখায় চমকে উঠে। পিছন ফিরে দেখে আমেনা চৌধুরী এসেছে। নীরা হেসে আমেনা চৌধুরীর কোমর জড়িয়ে পেটে মাথা রাখে। আমেনা চৌধুরী কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
" এই সাত সকালে বাগানে কি করছিস? শরীর ঠান্ডা হিয়ে গেসে। আবার পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়েছিস। কথা শুনিস না কেনো আমার? "
নীরা হেসে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
" তোমার থেকে এই শাসন পাওয়ার লোভে কথা শুনি না। "
" মাইরা খেতে মন চাচ্ছে বুঝি। "
" না মা আমার এখন মায়ের আদর পেতে মন চাচ্ছে। "
" পাগলি মেয়ে একটা "
" তোমার মেয়ে না বুঝি? "
" হুম আমার মেয়েই তো। লক্ষি একটা মেয়ে আমার। এখন ভিতরে আয়। তোর পছন্দের আলুর পরোটা বানিয়েছি। সাথে ঝাল করে টমেটোর চাটনি । সকালের নাস্তা করবি এখন চল "
চলবে............!