ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

৩৩তম পর্ব

লেখক: সালমা চৌধুরী

#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

(২৮ এর শেষাংশ)

নৌমি থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাজের হাবভাব স্বাভাবিক। ভদ্রমহিলা নৌমিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

" খাও।"

নৌমি চুপচাপ খাওয়া শুরু করল। দৃষ্টি এখনও তাজের পানে স্থির। কিছু সময়ের জন্য মনের ভেতর যে ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছিল তার অবসান হয়েছে। মিনিট ৩০ এর মতো আলাপচারিতা চলল। বেশিরভাগ কথা তাজই বলছে। ভদ্রলোক সঙ্গে তাল দিচ্ছেন। ভদ্র মহিলা হঠাৎ বললেন,

" তোমাদের বিয়েতে দাওয়াত দিবে না আমাদের? "

নৌমি আমতা আমতা করে বলল,

" পোগ্রাম হবে না।"

নৌমিকে থামিয়ে দিয়ে তাজ উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে শুরু করল,

" তোকে কে বলেছে পোগ্রাম হবে না! আব্বু নিজে আমার সাথে কথা বলেছেন। কোথায় পোগ্রাম হবে, কতদিন ব্যাপী পোগ্রাম চলবে এমনকি হানিমুনে কোথায় যাব সেটাও পর্যন্ত ঠিক করা হয়ে গেছে।"

নৌমির দু-চোখ প্রশস্ত হলো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। শুকনো গলায় আওড়াল,

" কোথায় যাব?"

"কি কোথায় যাবি?"

" হানিমুনে.."

ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা মিটিমিটি হাসছে। তাজ ভ্রু কুঁচকে নিরস কণ্ঠে বলল,

" তোকে তো কতবার বলেছিলাম, পাসপোর্ট টা করে নে। পাসপোর্ট থাকলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা পাশের দেশের কাশ্মীরে অন্তত যেতে পারতাম। যেহেতু পাসপোর্ট নেই তাই আপাতত লন্ডনই যেতে হবে।"

নৌমি অতর্কিত কণ্ঠে শুধালো,

" লন্ডন! "

" গরীবের লন্ডল মানে সিলেট।"

নৌমি নির্বাক। হা হয়ে আছে। ভদ্রলোক হেসে বললেন,

" জানো, আমাদের বিয়ের পর আমরা কোথায় হানিমুনে গিয়েছিলাম?"

তাজ কৌতুহলী কণ্ঠে আওড়াল,

"কোথায়?"

" গাবতলি।"

"সেটা আবার কোথায়?"

" আমাদের পাশের গ্রামে।"

" ওয়াও! তারপর?"

" তারপর আর কি! ঘুরতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছিলাম।

ভাঙাচোরা একটা টিনের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। একদিকে বাতাসের ভয়, অন্যদিকে সাপ, ব্যাঙের লড়াই। কি ভয়াবহ ঘটনা মনে পড়লেই গা শিউরে ওঠে এখনও।"

"বেঁচে ফিরলেন কি করে?"

" ভাগ্য ভালো ছিল তাই কোনো না কোনোভাবে বেঁচেই গেলাম।"

ভদ্রমহিলা অভিমানের স্বরে বললেন,

" কোনো না কোনোভাবে কি! বলো আমি তোমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছি।"

" হ্যাঁ হ্যাঁ তাই তো।"

" তাই তো আবার কি!"

ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন,

" তুমি না থাকলে যে আমার কি হতো....!

তাই তো বলি,

ভালোবাসি তোমায়

ভালোবেসে যাব

জনম জনমে সাথী হবো।"

ভদ্রমহিলা লাজুক হেসে ওঠে গেলেন। নৌমি, তাজরাও হাসল। কিছুক্ষণ গল্প চলল। রাত গভীর ভোরে ওঠে বাস ধরতে হবে।

★

ড্রয়িং রুমে শুভ্র, সুমি, রাফিরা সবাই উপস্থিত। সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে চলল এখনও তাজদের কোনো খোঁজ খবর নেই। তাজের আব্বু গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে সোফায় বসে আছেন। শুভ্র তাজের নাম্বারে কলের পর কল দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু ফোন বন্ধ।

রাফি শুভ্র'র কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল,

" আমাদের কি পুলিশকে জানানো উচিত!"

তাজের আম্মু আর্তনাদ করে ওঠলেন,

" পুলিশ জানাবি মানে, ওঁরা কোথায় তোরা কি জানিস না?"

শুভ্র মাথা নিচু করে বলল,

" খুব বৃষ্টি ছিল গতকাল। ঠিকমতো আলোও ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম ওঁরা বাসে ওঠেছে.."

এটুকু বলেই থামলো শুভ্র। এরপরের কথা বলার আগেই চোখ পড়ল তাজের আব্বুর পানে। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি৷ নিঃশ্বাস গাঢ়। শুভ্র নিঃশব্দে ঢোক গিলল। তাজের আব্বু গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

" রাতে কিছু জানাও নি কেন?"

শুভ্র এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,

" ভেবেছিলাম ওঁরা হয়তো রাতের মধ্যে চলে আসবে। কিন্তু এখনও কেন আসতেছে না তাই বুঝতে পারছি না। "

তাজের আব্বু কিছু বলতে যাবে তৎক্ষনাৎ নজর পড়ল সদর দরজায়। নৌমি আর তাজ দাঁড়িয়ে আছে৷ নৌমির পড়নে শাড়ি, তাজের পড়নে পাঞ্জাবি দেখে বাড়ির সবাই অবাক চোখে তাকাল। তাজকে দেখেই ছুটে গেল শুভ্র। দাঁড়াল ঠিক তাদের সামনে গিয়ে৷ নিঃশব্দে কয়েকবার দু'জনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল,

" কোথায় ছিলি সারারাত? "

" মতিন মিয়ার বাড়িতে।"

" মতিন মিয়া কে? আর তোরা বাস মিস করেছিলি কিভাবে?"

তাজ নৌমির দিকে ইশারা করে বলল,

" ও পড়ে গিয়েছিল।"

" পরের বাসে ফিরতে পারতি।"

" ওইটাই শেষ বাস ছিল।"

শুভ্র আর কিছু বলতে পারল না। শুধু কয়েকবার আড়চোখে নৌমির দিকে তাকালো। নৌমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ মলিন চেহারা, নির্বাক চাউনি। ড্রয়িং রুমে দুই মিনিট দাঁড়ালো কি না! সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাসায় চলে গেল। তাজের আব্বু স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

" কোনো সমস্যা হয় নি তো?"

" না আব্বু। কোনো সমস্যা হয়নি। বৃষ্টি ছিল খুব। এলাকায় কারেন্ট ছিল না। পানিতে ভিজে ফোন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যে বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম তাঁরা অন্য জগতের মানুষ। ফোন ব্যবহার করেন না।"

" রুমে যাও।"

তাজ ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওঠতে লাগল। পেছন পেছন রাফিরাও যাচ্ছে। শুভ্র যেইমাত্র সিঁড়ির কাছে পৌঁছাল তখনই শুনতে পেল,

" এবার ওঁদের বিয়েটা দেওয়া দরকার। সাথে কাবিননামা থাকলে যেখানেই যাক নিশ্চিন্তে থাকতে পারব।"

কথাটা কানে যেতেই থামলো শুভ্র। আড়চোখে তাকিয়ে তাজের আব্বু আম্মুকে খানিক দেখে নিল। জবাবে তাজের আম্মু বললেন,

" ছেলেটা তো বেকার। নৌমির কষ্ট হবে না!"

" আমি আছি না! তাজ আমার একমাত্র ছেলে। আমার যা আছে সবই তাজের। নৌমি এইটুকু মেয়ে। ও আর কি খাবে, কি পড়বে!"

" তারপরও.."

" তোমরা মেয়ে মানুষের আসলে মনেই সমস্যা। "

শুভ্র দূর থেকে মুচকি হেসে ওঠে গেল। তাজের আম্মু ধীর গলায় বললেন,

" আমার আবার কি সমস্যা? "

" তোমার কি নৌমিকে পছন্দ না?"

তাজের আম্মু কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে বললেন,

" ভুলে যাবেন না, নৌমির কথা সর্বপ্রথম আমিই আপনাকে বলেছিলাম।"

" সে আমি ভুলিনি। কিন্তু এখন বারণ করছ কেন!"

" আমি বারণ করছি না একটু সময় নিতে বলছি।"

" আর কত সময় নিবে বলো! আমার বোন রাজি, বোনের জামাই রাজি। আমার ছেলে, ছেলের বউ দু'জনেই রাজি। আমরাও রাজি। তাহলে বিয়েটা দিতে বারণ কোথায়!

আমার মেয়েটা শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে এই বাড়িটা ফাঁকা হয়ে গেছে। নৌমি যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ মনে হয় বাড়িতে প্রাণ আছে। নৌমি না থাকলেই নিশ্চুপ। এক গ্লাস পানি চাইলে পাবো এমন একটা মানুষও নেই।"

তাজের আম্মু চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,

" বেশ! আপনি চাইলে যেকোনো তারিখে বিয়ে পড়াতে পারেন। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।"

" যাক, আলহামদুলিল্লাহ। "

এদিকে শুভ্র তাজের রুমে ঢুকে ঘুরঘুর করছে। তাজ গোসলে গিয়েছে। কয়েক মিনিট পর বের হলো তাজ। রুমে পা রাখা মাত্রই গর্জে ওঠল শুভ্র,

" তুই নিলুকে কবে বিয়ে করছিস?"

" হঠাৎ এই প্রশ্ন? "

" আমার প্রশ্নের উত্তর দে।"

" এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।"

শুভ্র রাগান্বিত কণ্ঠে চিৎকার করল,

" তোর শরীরে তোর বাবার রক্ত বইছে তো?"

" মানে?"

" তিন বছর এক মেয়ের পেছনে ঘুরলি। প্রেম, ভালোবাসা, ঘুরাঘুরি, মন দেওয়ানেওয়া সবই করলি। এমনকি বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়ে নিলি। অথচ এখন তুই আরেক মেয়ের পেছনে ঘুরিস।"

" কোন মেয়ের পেছনে ঘুরেছি?"

"কোনো লুকোচুরি না। আজ আমি সরাসরি বলছি, আমি যেদিন থেকে এই বাড়িতে পা রেখেছি সেদিন থেকে দেখছি তুই নৌমির প্রতি আলাদা কেয়ার করিস। সবকিছুতে নৌমিকে প্রায়োরিটি দিস। আমি আর তুই দু'জনেই নৌমির কাছে সমান তাহলে তুই কেন গুরুত্ব বেশি পাবি। আমি নৌমিকে নিয়ে একা কোথাও যেতে চাইলে তুই বাঁধা হয়ে দাঁড়াস। কেন? তুই তোর নিলুকে সময় দে। নিলুর কথা বাসায় জানা। দুই নৌকায় পা দিয়ে কতদিন চলবি! এখনও সময় আছে নিজের চরিত্র ঠিক কর। নয়তো আমি চাচ্চুকে বলতে বাধ্য হবো..."

অকস্মাৎ শুভ্রর গালে থাপ্পড় পড়ল। দ্বিতীয় থাপ্পড়টা দিতে গেলে শুভ্র তাজের হাত ধরে ফেলল৷ কণ্ঠস্বর দ্বিগুণ ভারী করে চিৎকার করল,

" আমাকে থাপ্পড় দিলেই কি তোর সাত খু* ন মাফ হয়ে যাবে?"

#চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন