ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার গল্পের রাজা তুমি

৪র্থ পর্ব

লেখক: Tesha Money

✍️ tesha mony

আমার গল্পের রাজা তুমি

পর্ব–৪ : রাহাতের বাড়িতে প্রথম সকাল

সকালের নরম রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকতেই তিথির ঘুম ভাঙল।

চোখ খুলেই সে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর পাশ ফিরে শুতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।

এটা তার নিজের ঘর নয়।

তার নিজের বিছানাও নয়।

তারপর গত রাতের ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়তেই তিথি ধড়মড় করে উঠে বসল।

“ওহ…”

সে চারপাশে তাকাল।

বড় একটা ঘর।

দেয়ালের পাশে বইয়ের তাক।

জানালার পাশে একটা টেবিল।

আর—

সোফায় কেউ একজন ঘুমিয়ে আছে।

তিথি চোখ ছোট করে তাকাল।

রাহাত।

গত রাতে সে সোফায় ঘুমিয়েছে।

চোখ বন্ধ।

মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।

তিথি বিছানায় বসেই কয়েক সেকেন্ড তাকে দেখল।

তারপর নিজের মনে ফিসফিস করে বলল,

“বইয়ে যতটা গম্ভীর মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,

“তবে দেখতে…”

সে থেমে গেল।

নিজের গালে হাত দিয়ে বলল,

“তিথি! কী ভাবছিস?”

তারপর খুব আস্তে হাসল।

“উফ! আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

সে বিছানা থেকে নামল।

পায়ের শব্দে রাহাতের ঘুম ভেঙে গেল।

চোখ খুলেই সে দেখল তিথি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

“সকালে এত শব্দ করছেন কেন?”

তিথি ঘুরে বলল,

“আমি তো কোনো শব্দ করিনি!”

“আপনি হাঁটছিলেন।”

“মানুষ হাঁটলে শব্দ হয়?”

“আপনার হয়।”

তিথি চোখ বড় করে তাকাল।

“আমার পায়ে কি ঘণ্টা বাঁধা আছে?”

রাহাত কিছু না বলে উঠে বসল।

তিথি হেসে ফেলল।

“আপনি সকালে উঠেও রাগী থাকেন?”

“আমি সবসময় এমন।”

“ভয়ংকর।”

রাহাত উঠে দাঁড়াল।

“আপনি আমার ঘরে আছেন—এটা মনে আছে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমার জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করবেন না।”

তিথি নির্দোষ মুখে বলল,

“আমি তো শুধু জানালার বাইরে দেখছিলাম।”

“ভালো।”

“আর একটা কথা।”

রাহাত তাকাল।

“কী?”

“সকালে নাশতা কী হয়?”

রাহাত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

“আপনার জন্যই কি পুরো বাড়ির রান্নাঘরকে রিপোর্ট দিতে হবে?”

তিথি মুখ ফুলিয়ে বলল,

“আমি ক্ষুধার্ত।”

রাহাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“নিচে যান।”

“আপনি যাবেন না?”

“আমি পরে আসছি।”

“কেন?”

“আমার কাজ আছে।”

তিথি দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

“আপনি কি সবসময় এত কাজ করেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে বিয়ে করবেন কবে?”

রাহাত থমকে গেল।

তিথিও বুঝল প্রশ্নটা একটু বেশি হয়ে গেছে।

রাহাত ধীরে ধীরে বলল,

“এই প্রশ্ন কেন?”

তিথি হাসল।

“এমনিই।”

“আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এত আগ্রহের দরকার নেই।”

“আচ্ছা।”

তিথি বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হতেই রাহাত কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের অজান্তেই মৃদু হাসল।

“অদ্ভুত মেয়ে!”


নিচে নামতেই তিথি রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার আগেই একটা কণ্ঠ শুনল।

“এই যে নতুন আপু!”

তিথি তাকিয়ে দেখল রাহাতের ছোট ভাই দাঁড়িয়ে আছে।

হাতে একটা আপেল।

মুখে দুষ্টু হাসি।

“সুপ্রভাত।”

তিথি হাসল।

“সুপ্রভাত।”

ছেলেটা কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,

“ভাইয়া কি আপনাকে খুব বিরক্ত করছে?”

তিথি মাথা নাড়ল।

“অনেক।”

“আমি জানতাম!”

“আপনি কীভাবে জানলেন?”

“কারণ আমার ভাইয়া মানুষ না।”

তিথি চোখ বড় করল।

“তাহলে?”

সে গম্ভীর মুখ করে বলল,

“সে একটা হাঁটাচলা করা রাগ।”

তিথি হেসে ফেলল।

“আপনার নামটা তো এখনও জানা হলো না।”

“আমার নাম রাফি।”

তিথি মাথা নাড়ল।

“ওহ, রাফি।”

রাফি বলল,

“আপনি আমাকে ভাইয়া বলবেন না।”

“কেন?”

“বয়স মাত্র বাইশ। ভাইয়া শুনলে নিজেকে বুড়ো মনে হয়।”

তিথি হেসে বলল,

“তাহলে কী বলব?”

“রাফি।”

“ঠিক আছে, রাফি।”

রাফি খুশি হয়ে বলল,

“এই তো!”

তারপর সে হঠাৎ তিথির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপু, একটা কথা বলি?”

“বলো।”

“আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি আমাদের বাড়িতে অনেকদিন থাকবেন।”

তিথির হাসি একটু থেমে গেল।

“কেন?”

“জানি না। এমনিই মনে হলো।”

তিথি কিছু বলল না।

কেন যেন কথাটা তার বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি করল।


নাশতার টেবিলে সবাই বসে ছিল।

রাহাতের মা তিথিকে নিজের পাশে বসালেন।

“মা, কাল রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়েছে?”

তিথি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

তারপর একটু থেমে বলল,

“আন্টি, আপনাকে একটা কথা বলি?”

“বলো।”

“আপনি আমাকে এত সহজে বিশ্বাস করছেন কেন?”

রাহাতের মা মৃদু হেসে বললেন,

“সব মানুষকে তো সন্দেহ করে জীবন কাটানো যায় না।”

তিথি চুপ করে গেল।

মায়ের কথাটা তার ভালো লাগল।

রাহাতের বাবা খবরের কাগজ নামিয়ে বললেন,

“রাহাত বলেছে তুমি কাজের জন্য এখানে থাকবে।”

“জি।”

“কাজটা কেমন?”

তিথি একটু থেমে বলল,

“ভালো।”

রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“আপু, আপনি আসলে কী কাজ করেন?”

তিথি থমকাল।

সে তো কোনো কাজই জানে না!

রাহাত দ্রুত বলে উঠল,

“আমার কাজগুলো গুছিয়ে দেয়।”

রাফি মাথা নাড়ল।

“ওহ! মানে ভাইয়ার বিশৃঙ্খলা গুছিয়ে দেয়।”

তিথি হেসে বলল,

“ঠিক তাই।”

রাহাত ততক্ষণে টেবিলের অন্য পাশে এসে বসেছে।

“তোমার কথা বলার খুব শখ হয়েছে দেখছি।”

রাফি বলল,

“না ভাইয়া। আমার শখ ছিল। এখন নতুন আপু এসেছে, তাই তার সঙ্গে শেয়ার করছি।”

তিথি হেসে ফেলল।

রাহাত চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি কেন এই বাড়িতে জন্মেছিলাম?”

রাফি সঙ্গে সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে বলল,

“রাগী ভাইয়া বসে খায় ভাত,
রাগ করলে কাঁপে গোটা জাত!”

তিথি মুখ চেপে হাসতে লাগল।

রাহাত টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,

“রাফি।”

“জি?”

“খাও।”

“খাচ্ছি তো।”

“চুপচাপ।”

“জি।”

দুই সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর রাফি আবার বলল,

“কিন্তু ছন্দটা খারাপ হয়নি।”

তিথি এবার এত জোরে হাসল যে রাহাতও নিজের অজান্তে ঠোঁটের কোণে হাসি লুকাতে পারল না।

রাহাতের মা সেটা লক্ষ্য করলেন।

তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

অনেকদিন পর রাহাতকে এভাবে হাসতে দেখলেন তিনি।


নাশতার পর তিথি বাড়িটা ঘুরে দেখতে বের হলো।

রাহাতের বাড়িটা বিশাল।

একদিকে সুন্দর বাগান।

অন্যদিকে একটা ছোট লাইব্রেরি।

লাইব্রেরি দেখেই তিথির চোখ চকচক করে উঠল।

সে দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।

দেয়ালজুড়ে বই।

পুরোনো বইয়ের গন্ধ।

তিথি একটা বই হাতে নিল।

তারপর আরেকটা।

“ওয়াও!”

তার মুখে এমন আনন্দ যেন সে নিজের পৃথিবী খুঁজে পেয়েছে।

ঠিক তখন পেছন থেকে রাহাতের কণ্ঠ এলো,

“আপনি এখানে?”

তিথি ঘুরে তাকাল।

“আপনাদের বাড়িতে লাইব্রেরি আছে, আর আমাকে বলেননি?”

রাহাত বলল,

“আমি জানতাম না এটা আপনাকে বলতে হবে।”

তিথি একটা বই হাতে নিয়ে বলল,

“আপনি বই পড়েন?”

“সময় পেলে।”

“কী ধরনের?”

“যা দরকার।”

তিথি বিরক্ত মুখে বলল,

“বই আবার দরকারি-অদরকারি হয়?”

“হয়।”

“উপন্যাস?”

“কম।”

তিথি মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“আপনি জীবনে অনেক কিছু মিস করছেন।”

রাহাত তাকিয়ে রইল।

“কী?”

“গল্প।”

রাহাত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

“হয়তো।”

তিথি একটা বই বের করতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।

তার চোখ আটকে গেছে একটা পুরোনো তাকের ওপর।

সেখানে বইয়ের মাঝে একটা বই রাখা।

কালো মলাট।

তিথির বুক ধক করে উঠল।

সে ধীরে ধীরে বইটা টেনে বের করল।

মলাটে কোনো নাম নেই।

তিথি বইটা উল্টেপাল্টে দেখল।

“এটা কী?”

রাহাত বইটার দিকে তাকিয়েই থমকে গেল।

তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“ওটা রেখে দিন।”

তিথি অবাক।

“কেন?”

“কারণ ওটা পড়ার বই নয়।”

“তাহলে?”

রাহাত ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে বইটা নিয়ে নিল।

“ওটা আমার নয়।”

তিথি অবাক হয়ে বলল,

“আপনার লাইব্রেরিতে আপনার নয় এমন বই?”

রাহাত কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বইটা তাকের একদম ভেতরে রেখে দিল।

তিথি এবার খেয়াল করল—

বইটার মলাটের কোণায় খুব ক্ষীণ অক্ষরে কিছু লেখা আছে।

সে ঠিকমতো পড়তে পারল না।

শুধু একটা শব্দ চোখে পড়ল—

“রাহাত…”

তিথি কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রাহাত তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“চলুন।”

“কিন্তু—”

“চলুন।”

তিথি আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মনে প্রশ্নটা থেকে গেল।

এই বাড়িতে আসার পর থেকেই যেন একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে।

রাহাত তার নাম জানে।

তারপর সেই অচেনা বই।

আর এখন—

রাহাত কেন বইটা দেখেই এত অস্বস্তি পেল?

তিথি ধীরে ধীরে রাহাতের পেছনে হাঁটতে লাগল।

কিন্তু সে জানত না—

লাইব্রেরির তাকের ভেতরে রাখা সেই বইয়ের পাতায় তখন নতুন একটা বাক্য ফুটে উঠছে।

“সে যত বেশি সত্যের কাছে যাবে, তত বেশি তার নিজের পৃথিবী তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।”


চলবে..........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন