#আপনি_যে_আমার_ই
#writer_Drm_Shohag
#পর্ব_২২
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
সোহাগ মৌ কে নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। বাইকে বসে মৌ কে বসতে বললে মৌ বলে উঠল আমার একটা শর্ত আছে। সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
”কী শর্ত? সবাই বাইকে ওঠার জন্য শর্ত মেনে নেয়। আর তুমি উঠবে বলে আমাকেই শর্ত দিচ্ছ?”
মৌ বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কোমড়ে দুইহাত রেখে বলল,
”আপনার এতো এক্সপেরিয়েন্স কীভাবে বলুন তো!”
সোহাগ মৃদু হেসে বলল,
”এটা তো কমনসেন্সের ব্যাপার বউ। আচ্ছা এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো তো কিছুক্ষণ।”
”কেন?”
”ল্যামপোস্টের আলোয় কালো বোরখা পরিহিতা আমার হালাল বউ এর কৃত্রিম কাজলবিহীন কাজল কালো দু'চোখে আমার চোখ রাখার ব্যাপারটাই আলাদা,অন্যরকম অনুভূতি।”
হাত বাড়িয়ে মৌ কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে মৌ এর কাঁধে দুহাত রেখে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
”আমার চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকবে।”
মৌ চোখ নামিয়ে নেয়।
সোহাগ মন খারাপ করে বলল,
”আমার কথা মানা হচ্ছে না।”
মৌ মৃদু হেসে বলল,
”আচ্ছা তাকিয়েছি। এখন আমার কথা শুনুন।”
”বলুন ম্যাডাম।”
মৌ মৃদু হেসে বলতে নিয়ে থেমে গিয়ে রেগে বলল,
”আপনি মাক্স পরেননি কেন?”
সোহাগ মৌ কে এই হাসতে দেখে হুট করে রেগে যেতে দেখে থতমত খেয়ে যায়। অতঃপর বলল,
”মাক্স তো কিনতে হবে। আর তাছাড়া এখানে তো মানুষ নাই। রাতের বেলা মেয়েরা তেমন থাকেনা। বুঝনাই?”
“হু!”
“তোমার শর্ত বলো।”
”যাওয়ার পথে কোনো ফাঁকা রাস্তায়, সুন্দর কোনো জায়গায় ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর ফুসকা খাওয়াতে হবে।”
”প্রথমটা তো ঠিক আছে। কিন্তুু দ্বিতীয়টা রেস্টুরেন্টের হতে হবে কিন্তুু। রাস্তার পাশের টার না।”
মৌ ভেবে বলল,
”আমি রাস্তার পাশ থেকেই খাই। অনেক মজা। আমি সেটাই খাব।”
”পেট খারাপ হবে।”
”হবেনা। আপনি বেশি বুঝেন। আপনাকেও খাওয়াব।”
”আমি খাবনা। আর রাস্তার পাশের এসব খাবার খেতে নাই। ওরা হাত না ধুয়েই সবকাজ করে।”
”আপনাকে সেটাই খাওয়াব আমি। একদম জমিদারি চলবে না আমার সাথেে।”
”আমি কোথায় জমিদারি করলাম?”
”রাস্তার পাশে যাদের দোকান তাদের টাকা কম বলে তারা অপরিষ্কার এটা কে বলল আপনাকে?”
”আচ্ছা চলো রাস্তার পাশের ফুসকাই খেও।”
”হু!”
এরপর সোহাগ বাইক স্টার্ট দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার পাশে একজায়গায় বাইক থামালো সোহাগ। মৌ ভ্রু কুঁচকে বলল,
”এখানে বাইক থামালেন কেন?”
”আগে নামো। তারপর বলছি।”
মৌ বাইক থেকে নেমে পাশে দাঁড়ালো। সোহাগ নেমে মৌ এর হাত ধরে রাস্তা থেকে ডান দিকে যেতে লাগলো।
”আরে কই নিয়ে যাচ্ছেন? ওদিকে তো অন্ধকার।”
”তোমায় জ্বীন ধরিয়ে দিব। আসো।”
মৌ মুখ বেঁকিয়ে বলল,
”আমি কী ছোট বাচ্চা! আপনি ভয় দেখাচ্ছেন আর আমি ভয় পাব?”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
”ভয় পাবানা? তাহলে ১০ মিনিট এখানে একা থাকো। আমি বাইক নিয়ে আশেপাশে ঘুরে আসি।”
মৌ কোমড়ে দুইহাত রেখে বলল,
”যান। আমি ভয় পাইনা। আমি দোয়া পড়েছি। কেউ কিছু করতে পারবেনা আমার। জ্বীনও না। জ্বীন এর সৃষ্টিকর্তা ও আল্লাহ আর আমার সৃষ্টিকর্তারও আল্লাহ। আল্লাহ আমাকে বাঁচালে জ্বীন কী করবে!”
সোহাগ দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল,
”কথায় যুক্তি আছে। তাহলে তুমি এখানে কিছুক্ষণ থাকো। আমি বাইক নিয়ে আশেপাশে দেখে আসছি। কী বলো!”
মৌ ভাবলো তাকে রেখে যাবে না-কী! ফাও ভয় দেখাচ্ছে। অতঃপর ভাব নিয়ে বলল,
”ঠিক আছে।”
সোহাগ মনে মনে হেসে উল্টো পথে পা বাড়ালো। মৌ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মানে সে বলল আর তার এই বর তাকে একা রেখে চলে যাচ্ছে। ভাবলো এখন হয়তো ঘুরে তার কাছে আসবে। ওমা এ দেখি এগোচ্ছে তো এগোচ্ছেই! আশেপাশে তাকালো। কেমন গা ছমছম করছে। চারিদিকে অন্ধকার। কোথাও কেউ নেই।
পাশ থেকে হুট করেই কি যেন দুইচোখ ওয়ালা লাফ দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেল আর ডেকে উঠলো,
’মিআউ!’
মৌ কে আর পায় কে! গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে সামনের দিকে দৌড় লাগালো। সোহাগ মৌ এর চিৎকার শুনে নিজেও ভয় পেয়ে গেছে। দ্রুত পিছন ফিরে মৌ এর দিকে তাকালে দেখল কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে তা দিকে আসছে। সোহাগ দ্রুত এগোলো মৌ এর দিকে।
মৌ সোহাগকে কাছে পেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।
সোহাগ নিজেও জড়িয়ে নিল মৌকে। খারাপ লাগছে। সে মজা করছিল। আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে দেখত মৌ কে। সে কী পাগল এইখানে তার বউকে একা রেখে যাবে। মৌ অনেক ভয় পেয়েছে বুঝল। মজা করা উচিৎ হয়নি। শরীর কাঁপছে মেয়েটার।
”শান্ত হও বউ। আমি তো যাইনি। এই দেখ।”
মৌ এর কানে কথা গেল কী-না। শান্ত হয়ে সোহাগের উপর শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছে।
সোহাগ বলল,
”কথা বল, কি দেখে ভয় পেয়েছ?”
মৌ এর মাথা উঠিয়ে মুখ থেকে হিজাব সরিয়ে দিল। ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। সোহাগ হাত দিয়ে মৌ এর মুখ থেকে ঘাম মুছে দিল।
মৌ এর চোখ বন্ধ। সোহাগ মৌ এর মুখে কয়েকবার ফু দিল।
মৌ বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে স্বাভাবিক করে সোহাগকে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ালো।
সোহাগ মৌ এর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
”কী হয়েছে? কথা বলছো না কেন?”
মৌ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
”একদদম আআমার কাছে আসবেন না আপনি। আমায় রেখে চলে যাচ্ছিলেন। আপনার সাথে কথা নেই আমার। একদম আমার কাছে আসবেন না।”
পাশ থেকে কী যেন মিআউ করে উঠলে মৌ আবার সোহাগের সাথে লেপ্টে দু'হাতে শার্ট খামচে ধরল। ভীত কণ্ঠে বলল,
”আমি এখানে থাকবনা। প্লিজ আমায় এখান থেকে নিয়ে চলুন। আমি বাড়ি যাব।”
মৌ এর কাণ্ড দেখে সোহাগ হাসল। নিজেই বলছে একদম আমার কাছে আসবেন না। আবার নিজেই তার সাথে লেপ্টে আছে।
অতঃপর পকেট থেকে ফোন বের করে ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে মৌ এর পাশে ধরলে দেখল একটা কালো বিড়াল। এটা দেখে হেসে বলল,
“যে জ্বীন দেখে ভয় পায়না। সে সামান্য একটা কালো বিড়াল দেখে ভয় পেয়েছে। সত্যিই আমার বউ এর অনেক সাহস! এতো সাহসী বউ পেয়ে আমি গর্বিত।”
মৌ মাথা উঠিয়ে সোহাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
”একদম আমার সাথে মজা করবেন না।”
সোহাগকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলে সোহাগ জোর করে মৌ এর দু'হাত ধরে হেসে বলল,
”আচ্ছা রাগ কর না। যেখানে নিয়ে যেতে চাইলাম তার আগেই এ অবস্থা। চলো। সামনে অনেক সুন্দর একটা জায়গা আছে।”
এই বলে মৌ এর হাত ধরতে নিলে মৌ হাত সরিয়ে নেয়।
”আমি যাবনা আপনার সাথে কোথাও। আমায় রেখে চলে যান কেন? খারাপ লোক একটা।”
মৌ এর কথায় সোহাগ শব্দ করে হেসে ফেলল।
একহাতে মৌ কে জড়িয়ে নিল নিজের সাথে। অতঃপর বলল,
”আমি যাইনি তো। লুকিয়ে থেকে তোমার সাহসের পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম।”
”আপনি আসলেই একটা খারাপ লোক।”
এই বলে মৌ নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে সোহাগ দাঁড়িয়ে দু'হাতে মৌ কে শক্ত করে নিজের সাথে আগলে নিয়ে বলল,
”এমন করছ কেন! মজা করেছি। আর করব না।”
মৌ অভিমানী চোখে একবার সোহাগের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
সোহাগ মৃদু হেসে মৌ এর দু'গালে হাত রেখে বলল,
”এতো ভয় পাবে বুঝলে মজা করতাম না।”
মৌ এর মাথা উঁচু করে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। চোখ বুজল দু'জনেই। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই থাকলো। নিস্তব্ধ রাত, কোনোদিকে কোনো কোলাহল নেই। মৃদু বাতাস বইছে। জোৎস্না রাতে চাঁদের আলোয় দু'জন হালাল বর বউ দাঁড়িয়ে একান্তে সময় পার করছে। একে-অপরে অনুভূতি আদান-প্রদান করছে। কী সুন্দর মুহূর্ত!
সোহাগ মৌ এর কপাল থেকে ঠোঁট সরিয়ে মৌ এর দিকে তাকিয়ে দেখল মৌ চোখ বুজে। সোহাগ তা দেখে মৃদু হাসল। চাঁদের আলোয় মেয়েটাকে কী স্নিগ্ধ লাগছে! হালাল বউ তার। অন্তরে অদ্ভুত প্রশান্তি পায় মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে। পাবে নাই বা কেন! আল্লাহ যে তার হালাল বউ এর মধ্যেই তার সুখ-শান্তি লিখে রেখেছে।
সোহাগ বেশ কিছুক্ষণ মায়া ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
অতঃপর মৌ কে একহাতে জড়িয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো।
কিছুক্ষণ সামনে যাওয়ার পর দেখল অনেক বড় মাঠ। বেশ গাছপালা। মিটমিট বাতাস। সামনে একটা পুকুড়। মৌ এর জায়গাটা বেশ পছন্দ হয়েছে। সোহাগ একহাত জড়িয়ে বলল,
”জাজাকাল্লাহ খয়রন (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক) আমাকে এত সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য।”
মৌ এর উৎফুল্ল মুখের দিকে তাকিয়ে সোহাগ মৃদু হেসে বলল,
”ওয়া ইয়্যাকি বউ (তোমাকেও আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিক)”
সোহাগ মৌ এর পিছনে দাঁড়িয়ে পিছন থেকে দুহাতে জড়িয়ে আকাশপানে চেয়ে বলল,
”একটা গজল গেয়ে শোনাও বউ। অনেক ইচ্ছে করছে।”
মৌ লজ্জা পেয়ে বলল,
”আমি পারিনা।”
”তোমার স্বামী যে বাহানা শোনেনা।”
মৌ বলল,
“গাইতেই হবে!”
“হু, নয়তো স্বামীর আবদারে ঘাটতি রাখলে আল্লাহ আমাদের এতোক্ষণ দেখে খুশি হয়ে রহমত নাজিল করছিল।
আমার মন খারাপ হলে আল্লাহ অখুশি হয়ে তো বরকত নাজিল করবে না।”
মৌ মুখ বেঁকিয়ে বলল,
”হু, গাইছি।”
সোহাগ মৌ এর গাল এর সাথে নিজের গাল লাগিয়ে বলল,
”গাও”
”আপনি একটু দূরে সরুন।”
”এভাবেই গাইতে হবে, স্বামীর আবদার।”
মৌ আর কিছু না বলে চোখ বুজে গাইতে শুরু করল,
“প্রেম মোহনায় ভাসবো চলো বাঁধবো দুটি মন,
সন্ধ্যারাতে তারার মেলায় হারাবো দুজন।
বলবো জমা যত কথা, ভুলে যাবো দুঃখ ব্যাথা
সুখের পরশ মাখবো গায়ে যুগল এই জীবন।
ইবাদতে থাকবো বিভোর থাকবো নিশিরাতে
প্রভুর কাছে চাইবো রহম কেঁদে মোনাজাতে।
আঁকবো স্বপ্ন দুজন মিলে, বাঁধবো যুগল প্রণয় দিলে
ভাঙবো না এই পণ।
জীবন সাথী হয়ে থেকো, আগলে রেখ আমায়
জড়িয়ে রেখ এই হ্রদয়ে মিষ্টি ভালোবাসায়
এভাবেই যাক কেটে যুগ দুটি হ্রদয় সুখে ভাসুক
কভু সারাক্ষণ।
প্রেম মোহনায় ভাসবো চলো বাঁধবো দুটি মন,
সন্ধ্যারাতে তারার মেলায় হারাবো দুজন।”
সোহাগ হেসে বলল,
”আমার বউ এর ভয়েস মাশাআল্লাহ। এবার থেকে নিয়মিত শুনতে হবে মনে হচ্ছে।”
”হা করে বসে থাকুন।”
”হা করে বসে থাকলে তো খেতে পাওয়া যাবে। শোনার জন্য তো কান লাগে।
অতঃপর মৌ এর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
তোমার বর এর মিষ্টি ভালোবাসায় সারাজীবন এই হ্রদয়ে তোমায় আগলে রাখব ইনশাআল্লাহ।
মৌ মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
”আল্লাহুম্মা আমিন।”
আকাশপানে চেয়ে মনে মনে বলল,
’আল্লাহ তুমি আমাদের জীবন এভাবেই সুখে-শান্তিতে ভরপুর রেখ।’
অতঃপর মৌ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
”হয়েছে। চলুন এবার। অনেক দেরি হয়ে যাবে নয়তো।”
সোহাগ মৌ এর মুখ ঢেকে দিয়ে হাত ধরে সামনে এগোলো।
★★
ইশরাত চাবি নিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে দেখল ভেতর থেকে দরজা আটকানো। হালিমা খালা তো চলে যাওয়ার কথা। তাহলে কে?
ওতো না ভেবে বেল চাপলো। দ্বিতীয়বার বেল চাপার আগেই দরজা খুলে গেল। ওপাশে অয়নকে দেখে ইশরাত হেসে বলল,
”অয়ন ভাইয়া তুমি?”
“কেন আসতে পারিনা”
ইশরাত থতমত খেয়ে বলল,
”না সেভাবে বলতে চাইনি। এসেছ ভালো করেছ।” অতঃপর ভেতরে গিয়ে দ্রুত বাথরুমে গেল।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আবার বেরিয়ে যেতে নিল অয়ন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
”আবার কই যাচ্ছিস?”
ইশরাত পিছন ফিরে বলল,
”মনিরা আমাদের সাথে এসেছে। ওকে সোহাগ ভাইয়াদের বাড়িতে রেখে আসব।”
”তোকে কেন যেতে হবে! ইমন রেখে আসুক।”
“আসলে মনিরা ভাইয়ার সাথে একা যেতে সংকোচ করছে। বেশি সময় লাগবে না।”
পানি পিপাসা পেয়েছে। অতঃপর টেবিল থেকে একগ্লাস পানি নিয়ে খেতে লাগলো।
অয়নের ভয়ংকর রেগে গেছে। এই মেয়ের জন্য বিকাল থেকে এ বাড়ি এসে বসে আছে। আর ও এসেছে তো এতো রাতে। এসেই আবার যাচ্ছে। যাওয়াচ্ছি তোকে।
অতঃপর কিছুটা চিৎকার করেই বলল,
”একপা বাসা থেকে বের করলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবেনা ইশরাত।”
হঠাৎ এভাবে চিৎকার করায় ইশরাত ভয় পেয়ে যায়, হাত থেকে আধ খাওয়া গ্লাস পরে যায়। গ্লাসটা গিয়ে পড়ে একদম পায়ের উপর। কাঁচের গ্লাস। একদম সোজা পায়ের উপর গিয়ে পরায় অনেক বেশি ব্যাথা পেয়েছে।
আহ!
মৃদু আওয়াজ করে সাথে সাথে বসে পরেছে।
অয়ন গ্লাস পরার আওয়াজ পেয়ে দ্রুত ইশরাতের কাছে গিয়ে বসে পরল। পায়ে হাত দিয়ে দেখল কাটেনি। কিন্তুু সোজা পুরো গ্লাসটা পায়ের উপর পরায় বেশি ব্যাথা পেয়েছে।
রেগে গিয়ে বলল,
”একটু কী সাবধানে চলাফেরা করা যায়না?”
আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়।
পানিভর্তি চোখে কেমন মায়া ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পায়ের ব্যাথায় ইশরাত চোখ নামিয়ে পায়ের দিকে তাকালো। চোখ থেকে পানি পরছে। অয়ন দাঁড়িয়ে দ্রুত বরফ আনতে গেল। বরফ এনে ইশরাতের পায়ে ধরল। অতঃপর বলল,
সাবধানে চলতে পারিস না?
ইশরাত মুখ বেঁকিয়ে বলল,
সাবধানেই তো চলি। তুমিই তো ষাড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলে, আর আমার হাত ফসকে গ্লাস পরে গেল।
অয়ন রেগে বলল,
আমি কী?
ইশরাত মেকি হেসে বলল,
স্যার, স্যার। ওই যে স্কুলের স্যারেরা যেমন আগে হুট করে চেঁচিয়ে উঠত, সেটাই বললাম।
চোখে পানি, ঠোঁটে হাসি। ভালোই লাগছে দেখতে।
অয়ন মৃদু হাসল।
ইশরাত তার দিকে তাকিয়ে এমন হাসতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
কী হলো? হাসছ কেন ভাইয়া?
অয়ন ইশরাতের পায়ে বরফ ঘষে দিয়ে বলল,
চোখে পানি নিয়ে হাসতে শিখে গেছিস, তাই ভালো লাগলো।
অতঃপর কিছুক্ষণ বরফ দিয়ে দেয়ার পর ইশরাতকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল।
আর বলল,
”চুপচাপ রেস্ট নিবি।”
”মনিরা তো ভাইয়ার সাথে একা যাবে না।”
“না গেলে এখানে থাকবে।”
”এখানেও থাকবে না। আন্টি নিষেধ করেছে।”
তাহলে রাস্তায় থাকবে। তুই চুপচাপ রেস্ট কর।
এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইশরাত হা করে চেয়ে রইল। রাস্তায় থাকবে মানে কী?
বিড়বিড় করল,
”এই অয়ন ভাইয়ার আজ হয়েছে কী? শুধু ত্যাড়া কথা বলছে। অদ্ভুদ!”
★
অয়ন ইমনের গাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
”ইশরাত যাবে না। ও পায়ে ব্যাথা পেয়েছে।”
ইমন চিন্তিত স্বরে বলল,
”কীভাবে? বেশি ব্যাথা পেয়েছে?”
এই বলে গাড়ি থেকে নামতে গেলে অয়ন বলল,
“আমি সামলে নিয়েছি। তুই সোহাগের শালিকে রেখে আয়। ”
অয়নের কথা শুনে ইমন মাথা নেড়ে সায় জানালো। কিন্তুু গাড়ি থেকে নেমে বলল,
”আচ্ছা ইশরাতকে একবার দেখে আসি। তুই দুই মিনিট অপেক্ষা কর।”
ইমন চলে গেলে গাড়ির ভেতর মনিরা গুটিশুটি হয়ে বসে রইল। তার আসাটাই ভুল হয়েছে মনে হচ্ছে। এই ছেলেকে তো চেনেনা। ইশরাত আপুর ভাইকে তো আজকে চিনল। সে খারাপ না। ভালো। ক্যারেক্টার খারাপ না। মা মারা গিয়ে কতো কেঁদেছিল। মনিরার মায়াও লেগেছে অনেক। আবার একটা ভুল করে তাকে সরিও বলল। সবমিলিয়ে ইমনকে তার ভালো মানুষ মনে হয়েছে। কিন্তু এই ছেলে যে কেমন! একা একা রেখে দুই ভাই-বোন গেল।
ইশরাত আপু না-কি ব্যাথা পেয়েছে, গকবার ভাবলো যাবে। কিন্তুু এটা তো অপরিচিত মানুষদের বাড়ি। আর বাইরে বের হওয়াও সেভ লাগছে। অতঃপর চগপচাপ গাড়ির এককোণে বসে রইল।
”ব্যাথা পেয়েছিস কীভাবে?”
ভাইয়ের গলা পেয়ে ইশরাত চোখ খুলল। মৃদু হেসে বলল,
”সামান্য ব্যাথা পেয়েছি ভাইয়া। পানি খেতে গিয়ে গ্লাস পায়ের উপর পরে গিয়েছিল।”
ইমন ইশরাতের পায়ের কাছে বসল। অতঃপর তার পা ভালোভাবে ঘুরিয়ে দেখল, হাত বুলিয়ে বলল,
”আচ্ছা একটু অপেক্ষা কর। আমি ওই আপদকে রেখেই চলে আসব। তাছাড়া অয়ন আছে। কিছু লাগলে ওকে বলিস কেমন?”
ইশরাত হেসে মাথা নেড়ে বলল,
”আচ্ছা। তুমি মনিরাকে এমন আপদ আপদ ডাক কেন! ওর শুনলে খারাপ লাগবে।
”ওর কথা এতো ভাবতে হবে না। সোহাগের বিয়ের পর থেকে এই মেয়ে আমায় জ্বালিয়ে মারছে। এর চেয়ে ভালে নামে আর ডাকতে পারবনা ওকে।
আসার সময় খাবার আর ব্যাথার ওষুধ আনব।”
এই বলে ইমন চলে গেল।
ভাইয়ের প্রস্থানে ইশরাত মলিন হাসল।
আজ যদি তার আম্মু বেঁচে থাকতো, এভাবেই তার খেয়াল রাখত।
চোখ বুজে বিড়বিড় করে বলল,
‘তোমার থেকে পাওনা আদর জমিয়ে রাখছি আম্মু। জান্নাতে গিয়ে সব আদায় করে নিব ইনশাআল্লাহ।’
চোখের কোণ ঘেষে পানি গড়িয়ে পরল।
★
ইমন আসলে অয়ন আবার বাড়ির ভিতর যায়। ইমন গাড়িতে উঠলে মনিরা মৃদু স্বরে ডাকল,
”ভাইয়া?”
মনিরার মুখে প্রথমবার ডাক শুনে একটু অন্যরকম লাগলো ইমনের। অতঃপর পিছন দিকে তাকিয়ে বলল,
”বলো”
মনিরা আমতা আমতা করে বলল,
”বলছিলাম আপু তো অসুস্থ। আমি আপুকে একটু দেখে আসি? আর আপনাকে আজকে কষ্ট করে যেতে হবে না। কালকে রেখে আসবেন। আমি আজ আপুর সাথে থেকে যাই। আপুকেও দেখে রাখতে পারব।”
মনিরার কথা ইমনের ভালো লাগলো। কিন্তুু দুষ্ট হেসে বলল,
”বললেই হয়, আমাদের বাড়িতে থাকবে। যেতে ইচ্ছে করছে না বাড়ির গেট দেখে। এতো সুন্দর বাড়িতে না গেলে তো আফসোস এর শেষ থাকবে না।”
ইমনের কথা শুনে মনিরা দাঁত কিড়মিড় করে তাকালো ইমনের দিকে। মানছে বাড়িটা একটু সুন্দর, তাই বলে না যেতে পারলে সে আফসোস করবে!
তার সাথে মজা নিচ্ছে এই লোক। একা একাও তো যেতে পারবে না।
অতঃপর রেগে বলল,
”থাকবই তো। আমাদের বাড়িতে এতোদিন যে থাকলেন তখন? আর আমাকে একবেলাও থাকতে দিবেন না! কিপ্টে লোক একটা।”
এই বলে রেগেমেগে মনিরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। তখনই পাশ থেকে দুটো বাইকে গেল, একটা বাইকে দুটো করে ছেলে বসা।
মনিরার পাশ দিয়েই যাওয়ার সময় চারজন একসাথে চিল্লিয়ে বলে উঠল,
“হেই বোরখাওয়ালী!”
এই বলে পিছনের বাইক থেকে একজন মনিরার হিজাব ধরে টান দেয়।
এতে মনিরার হিজাব মুখ থেকে খুলে যায়। সাথে সাথে মনিরা পিছন ফিরে মাথা নিচু করে নেয়।
ইমন নেমে মনিরাকে ডাকতে নিয়েছিল ওপাশে যাওয়ার জন্য। তখনই এই ঘটনা চোখে পরে। বোরখাওয়ালী শুনেছে। এমন ইভটিজিং নরমাল লেগেছে। কিন্তুু হিজাব ধরে টান দেয়ার ব্যাপারটায় যেন ইমনের পায়ের রক্ত মাথায় উঠল।
দ্রুত বাইকের পিছনে ছুটতে ছুটতে বলল,
“এই বেয়াদবের দল দাঁড়া, শালা কু*ত্তার দল, জানো*য়ার পালাচ্ছিস কই!”
রাস্তা থেকে ছোট ইটের টুকরো নিয়ে ছুঁড়ে মারল। ততক্ষণে বাইক নিয়ে সব হাওয়া।
চলবে ইনশাআল্লাহ~~~~~~~~