#আপনি_যে_আমার_ই
#writer_Drm_Shohag
#পর্ব_২৭
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
“আম্মু কি করছ?”
মনিরা শুয়ে ছিল। চোখ বুজে ভাবছিল আসলেই কী তার বিয়ে হয়ে যাবে? সত্যিই যদি সে ছেলের মেয়েদের সাথে প্রেম থাকে! তাহলে তো তার কপাল পুড়ে ছাই হয়ে যাবে! না না। এখনই বিয়ে করবেনা সে। আর পরে করলেও একদম সব খোঁজ-খবর নিয়ে তবেই বিয়ে করবে। ওই ইমন বেয়াদব এর কথা জীবনেও সত্যি হতে দিবেনা। পারলে ওই লোকটার জন্য এমন মেয়ে এনে তার কপাল পুড়িয়ে দিবে। তার পিছে লাগা সবসময় তাই-না!
নাফিসা বেগমের কথা শুনে শোয়া থেকে উঠে বসল। ওড়না ঠিক করে মৃদু হেসে বলল,
“এইতো আন্টি শুয়ে ছিলাম। ভেতরে আসুন না!”
নাফিসা বেগম এগিয়ে গেল। মনিরার পাশে বসে ভাবলো তার আরেকটা ছেলে থাকলে মনিরাকে তার ছোট ছেলের বউ করতো। কিন্তুু তা তো সম্ভব নয়। তবে তার তো মেয়ে নেই। মৌ তার বড় মেয়ে আর মনিরা মৌ এর ছোট বোন তার মানে তারই ছোট মেয়ে। মনিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
”আম্মু তোমার দুলাভাই এর কথায় কথায় কিছু মনে করনা কেমন?”
মনিরার তখনকার ওই মহিলার কথা মনে পরল। তিনি কী মিন করেছিল! ভাবলেই কেমন লাগে! আর একটু আগে তো নিজের ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছে। সে ইমনের কথা তখন উড়িয়ে দিলেও এখন বুঝেছে ভুল কিছু বলেনি সে। মনিরাকে ভাবনায় মশগুল হতে দেখে নাফিসা বেগম মনিরার থুতনিতে হাত রেখে বলল,
”কী ভাবছ আম্মু?”
মনিরা ভাবনা রেখে মৃদু হেসে বলল,
“না আন্টি কিছু মনে করিনি। তিনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় হবেন। সমস্যা নেই আন্টি।”
”আচ্ছা তোমাকে কী এখানে খাবার দিয়ে যাব? আসলে আজকে সোহাগ এর বন্ধুর বাবা সিঙ্গাপুর থেকে আসছে, তাকে ইনভাইট করেছি। তুমি সবার মাঝে গিয়ে খাবে?”
মনিরা মিনমিন করে বলল,
“আন্টি আমাকে ঘরেই দিয়েন। ওতো মানুষের মধ্যে তো ঠিকঠাক খেতে পারব না।”
নাফিসা বেগম মনিরার থুনতিতে হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন,
“আচ্ছা আম্মু।”
★
রাতের খাবার খেয়ে মৌ মনিরার ঘরে আসল। সোহাগ তার বন্ধু আঙ্কেলদের সাথে ড্রয়িং রুমে গল্প করছে। মৌ নামাজ পড়ে কুরআন পড়ে ভাবল মনিরার সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আসবে। তাই মনিরার ঘরের দিকে অগ্রসর হলো।
”কি করছিস?”
মনিরা নামাজ পড়ে জায়নামাজ ভাজ করে রাখছিল। মৌ কে দেখে মৃদু হেসে বলল,
“নামাজ পড়লাম আপু। কিছু বলবে?”
এমনিই আসলাম। কিছু ভেবে বলল,
”ছাদে যাবি?”
মনিরা সম্মতি দিলে মৌ মনিরাকে হিজাব পড়ে নিতে বলল। অতঃপর ছাদের দিকে গেল। ছাদের সিড়ি ড্রয়িংরুমের অপরদিকে। তারা ছাদে গেলে ড্রয়িংরুম থেকে দেখা যাবেনা। এজন্য মৌ এর যেতে ইচ্ছে করল। তাদের বাড়িতেও রাতের বেলা দু'বোন একসাথে ছাদে গিয়েছে। রাতের ছাদে গিয়ে এমনি দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক ভালো লাগে। মনিরার হাত ধরে ধীরপায়ে ছাদে চলে গেল মৌ।
রেলিঙের সাথে কনুই ঠেকিয়ে মৌ প্রশ্ন করল,
”তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?”
”চলছে আপু। তোমার বিয়ের জন্য ঘাটতি পড়ে গেছে। কভার করে নিব ইনশাআল্লাহ।”
”হুম ভালো করে পড়। এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট চাই কিন্তুু।”
”ইনশাআল্লাহ আপু।”
মনিরার হঠাৎ সোহাগের ফুপির কথাটা মাথায় এলো। ভাবলো তার আপুকে বলবে। আন্টিকে বলা না গেলেও আপুকে বলাই যায়, অতঃপর বলল,
”আপু একটা কথা বলার ছিল।”
“হ্যাঁ বল।”
”আপু দুলাভাইয়ের যে ফুপি শ্বাশুড়ি আছে সে আম্মুর নাম্বার নিয়েছে আমার থেকে। আবার আমার ব্যাপারেও বেশ কিছু বলল।”
তখনকার সবকিছু মনিরা মৌ কে বলল। সব শুনে মৌ কিছুটা অবাক হলো। মনিরা তো ছোট। এসএসসি-ই দিল না। এখনি মনিরার বিয়ের কথা ভাবছে না তারা কেউই। আর ছেলে যে কেমন তাও তো জানেনা। মনিরার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
”এসব চিন্তা বাদ দিয়ে মন দিয়ে পড়। আম্মু আব্বু আমি কেউই তোর বিয়ের কথা ভাবছিনা। এসবের দেরি আছে। আম্মুর সাথে এ ব্যাপারে আমি কথা বলব ইনশাআল্লাহ।”
এখনি তার বিয়ে হবেনা ভেবে মনিরা খুশি হলো। আর ওই মহিলাকে তার একটুও পছন্দ না। তার আপু একটু কম ফর্সা হওয়ায় কেমন কমেন্ট করেছে। আর তার ছেলে না জানি আরও কেমন না কেমন হবে! ওই ইমনের কথা যদি আবার সতয়ি হয়ে যায়! না না! বিয়েই হবেনা ওখানে। আপু তো বলেছে।
ভাবনা ছেড়ে মৌ এর দুইহাত ধরে বলল,
“আপু আসো ঘুরব। অনেকদিন হলো এভাবে ঘোরা হয়না। তোমার বিয়ের জন্য এইটা ভুলেই গেছি।”
মৌ মৃদু হাসল। সময় পেলেই তারা সেই বাচ্চাদের মতো করে দু'জন হাত ধরে ঘুরতে থাকে। অতঃপর মনিরার দু'হাত ধরে দু'জন ঘুরতে লাগলো। ধীরে ধীরে ঘোরার গতি বাড়ল। দু'বোন প্রাণখোলা হাসি হাসছে। মনিরা বলল,
"আপু হাত ছেড়ে দিলাম।”
”মার খাবি। এখন ছাড়লে ছিটকে ছাদ থেকেই পড়ে যাব, সাথে তুইও।”
“পড়বেনা রেলিঙ আছে। তবে ব্যাথা পাবা। আর দুলাভাই এসে আমাকে ধোলাই দিবে তার বউকে আঘাত করার জন্য। আজ আমার কেউ নেই বলে তোমার বরের মতো কেউ এসে আমার হয়ে কিছু বলবে না।”
মনিরার দুঃখী দুঃখী মুখ করে কথা বলার অ্যাক্টিং দেখে মৌ হেসে বলল,
“তাহলে কী আমি আম্মুকে বলব তোর বিয়ে পাকাপাকি করতে!”
“এই না না আপু। আমি মজা করলাম গো।”
”হয়েছে। গতি কমা। ধীরে ঘোর। মাথা ঘুরছে। পড়ে যাব যেকোনো সময়।”
অতঃপর দু'বোন ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে আনল। একপর্যায়ে দু'জন দু'জনকে ধরে ছাদে বসে পড়ল। মাথা ঘুরছে। কিন্তুু দু'বোন প্রাণখোলা হাসি হাসছে। কতদিন পর এভাবে সময় কাটালো!
★
সোহাগ তার ইমন, অয়ন, অয়নের বাবা তার ফুফাতো ভাই সবার সাথে গল্পগুজব করে ড্ররিংরুম থেকে বেরিয়ে ঠিক করল তারা তিন বন্ধু আর নাবিল ছাদে গিয়ে আড্ডা দিবে কিছুক্ষণ। আর তাই ছাদের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো। একদম ছাদের কাছের সিড়িতে দাঁড়িয়ে সোহাগ শুনতে মেয়ে কণ্ঠের হাসির আওয়াজ। খুব বেশি শোনা যাচ্ছে না। প্রথমে ভাবলো অন্য বাসার হয়তো। কিন্তুু মৌ এর গলা চিনতে পেরে আর সামনে এগোলো না। দাঁড়িয়ে পরল। পিছন থেকে ইমন বলল,
”কী রে দাঁড়িয়ে পরলি কেন?”
“তোরা নিচে যা।”
অয়ন কিছু বলতে গেলে নিজেও হাসির আওয়াজ শুনে বুঝল সোহাগ এর নাকচ করার কারণ। ইমনও শুনতে পেয়ে আর কথা বাড়ালো না। সোহাগ কেমন তা তো তারা জানেই। অতঃপর অয়ন আর ইমন উল্টো ঘুরে নিচে নামতে গেলে নাবিল বলল,
”কী হলো তোমরা ছাদে যাবে না?”
নাবিলের কথা শুনে অয়ন ভ্রু কোঁচকালো। এই ছেলে সারাদিন ফোনের মধয়ে ডুবে থাকে। কী করে আল্লাহ জানে! অতঃপর বলল,
”না। ওদিক ফিরে চলো।”
”কিন্তুু আমাদের আড্ডা!”
অয়ন আর ইমন দু'পাশ থেকে নাবিল এর হাত ধরল। ইমন মজার ছলে বলল,
”ভাবি আছে যেখানে আমাদের জায়গা নাই সেখানে।”
নাবিল অবুঝ গলায় বলল,
”মানে?”
”এতো মানে মানে না করে চুপচাপ ভদ্র বাবুর মতো ঘুমাও। রাত বিরাতে ছাদে গিয়ে কী করবে হ্যাঁ?”
অয়নের কথা শুনে নাবিল হা করে চেয়ে রইল। এরাই তো তাকে সাথে আনল। আবার এরাই বলছে ছাদে কী হ্যাঁ! অদ্ভুদ তো!
ইমন নাবিল এর কাঁধ চাপড়ে বলল,
”ছাদ আপাতত মিঙ্গেলদের জন্য বুঝলে, সিঙ্গেলদের জন্য ঘর।”
নাবিলের সব মাথার উপর দিয়ে গেল। ওতো না ভেবে আবার ফোনের দিকে মনোযোগ দিল।
★
সবাই চলে গেলে সোহাগ ছাদে প্রবেশ করল। অপরপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে মৌ এর নাম ধরে ডাকলো। মৌ একা আসবে না। মনিরা ছাড়া আর কেউ নেই যে মৌ এর সাথে আসবে। আন্দাজ করেই বুঝতে পারল মৌ এর সাথে মনিরা আছে। তাই সরাসরি মৌ এর কাছে না গিয়ে মৌ কে ডাকল।
মৌ সোহাগের গলা শুনে দ্রুত ছাদের মেঝে থেকে উঠে মনিরাকে বলল,
”তোর দুলাভাই ছাদে এসেছে। তুই নিচে যা।”
মনিরা তার আপুর কথা শুনে নিচে চলে গেল।
মনিরা গেলে মৌ সোহাগের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
”আপনি এখানে?”
সোহাগ এর প্রথমে একটু রাগ হলেও পরে ভাবল যে মৌ এর হয়তো একা একা ভালো লাগছিল না। সারাদিন তো ঘরেই থাকে। এখন বোনের সাথে একটু সময় কাটাতে এসেছে বলে রাগ করলে ব্যাপারটা সোহাগের নিজের কাছেই খারাপ লাগবে। মৌ এর ডাকে পিছন ফিরে তাকালো। মৃদু হেসে বলল,
”ছাদে কখন এসেছ?”
”এইতো কিছুক্ষণ আগে। আপনি ছিলেন না। তাই ভাবলাম মনিরার সাথে ছাদে আসি। ভালো লাগবে।”
”ভালো করেছ।
এই বলে মৌ কে নিজের কাছে এনে রেলিঙের দিক করে দাঁড় করালো। তারপর মৌ এর পিছনে দাঁড়িয়ে নিজের বাহুবন্ধনে মৌ কে আবদ্ধ করে নিয়ে মৌ এর কাঁধে তার থুতনি রেখে বলল,
”রাতের রাস্তা কত সুন্দর দেখেছ? একদিন হাঁটতে বের হবো ইনশাআল্লাহ। অনেক রাতে, যখন একটা মানুষও থাকবেনা।”
মৌ মৃদু হেসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। সোহাগ আকাশপানে চেয়ে বলল,
”আকাশের তারা গুনতে গুনতে ঘুমানোর জন্য এখানে একটা বিছানা প্রয়োজন।”
মৌ অবাক হয়ে বলল,
”বিছানা! ছাদে কেউ বিছানা রাখে?”
”রাখেনা! তাহলে দোলনা কিনতে হবে। এতোদিন বউ ছিল না ছাদে আসিনি তেমন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম মেঝেতে বসেই। এখন দোলনা লাগবে।”
”কেন বউ কে কি মেঝেতে বসানো যায়না?”
”যায়। কিন্তুু আমার বউ আদরের মানুষ, যত্নের মানুষ, আগলে রাখার মানুষ, বউকে আলতো করে সাজিয়ে রেখেছি আমার বক্ষপিঞ্জরে। আমার সামর্থ্য আছে তাই আমি দোলনা কিনব, তাতে না পোষালে তুলোর মধ্যে হাবুডুবু খাওয়াবো।
এগুলো করব আমার সাধ্য আছে আছে বলে, সামর্থ্য আছে বলে। আর যদি সামর্থ্য না থাকতো তাহলে হয়তো এই ছাদের মেঝেও জুটতো না, কাঁচা মাটিতে থাকতে হতো। বউ তার স্বামীর কাছে ভালোবাসার বস্তুু, খুবই আদরের। প্রতিটি স্বামী তার বউকে নিজের বেস্টটা দিয়েই ভালো রাখতে চায়। সেটা তাদের নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী। কারো বেস্ট টা টিনের ঘর। আবার কারো রাজপ্রাসাদ। ভালোবাসা তো দু'জায়গায়ই সমান। কারণ আমাদের কাছে যা সামর্থ্য আছে তার সবটাই নিজের বউ এর জন্য করি।”
একটু থেমে আবার বলল,
”আমার বেস্ট টা হলো ইট সিমেন্ট দিয়ে গড়া একটা ছোট বাড়ি, সেই বাড়ির ছাদে একটা ছোট দোলনা যেখানে বসে আমি আর আমার বউ আকাশ দেখব, আকাশের তারা গুণব, তোমায় ক্লান্তি ভর করলে আমার বুকে তোমায় ঠায় দিব।
বুঝেছ মৌ বউ?”
মৌ মন দিয়ে সোহাগের প্রতিটি কথা শুনলো। মানুষটা কী সুন্দর কথা বলে! মৃদু হেসে বলল,
”বুঝেছি।”
সোহাগ মৌ কে ছেড়ে নুজের দিকে ঘুরিয়ে চোখ মুখে হাত বুলিয়ে বলল,
”আমার ঘরে একটা ছোট্ট জান্নাত বসবাস করে। সেই জান্নাতকে দেখলে তোমার এই বর এর বুকে শুধু প্রশান্তির আবির্ভাব হয়। অশান্ত মন শান্ত হয়ে যায়। দুঃশ্চিন্তারা পালিয়ে যায়। আর আমার এই ছোট্ট জান্নাতটা হলো মৌ বউ।”
মৌ কী বলবে ভাষা হারিয়েছে। মানুষটা তাকে এতো ভালোবাসে কীভাবে! তার স্বামীর মনটা খুব সুন্দর।
সে আল্লাহর কাছে যতটা চেয়েছে তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি পেয়েছে।
সোহাগ কিছু মনে পরায় বলল,
”ফুপি তোমাকে কিছু বলেছিল?”
সোহাগ এই কথাটা জিজ্ঞেস করার কারণ সে তার ফুপিকে ভালো করেই চেনে। তার মাকে যে ফুপির পছন্দ ছিল না, মুখের উপর কথা বলে দেয় এসব সোহাগের জানা।
মৌ এর হঠাৎ সকালের ফুপির কথাটা মনে পরল। সোহাগ যেমন, ছেলেদের তেমনি ভালো লাগে। কিন্তুু সে তো সবার মতো অনেক ফর্সা নয়। সোহাগ সবদিক থেকেই কত ভালো! মন- মানসিকতা থেকে শুরু করে দেখাশুনা, আর্থিক স্বচ্ছলতা সবকিছুতে তার চেয়ে অনেক এগিয়ে। আর সোহাগের তো তাকে প্রথমে পছন্দ হয়নি। যদিও এর আগের দিন সে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছিল। মৌ বুঝেছেও। কিন্তুু ফুপির কথাটা এভাবে বলায় আবার সেই কথাটা মনে পড়ল। চোখের কোণে পানি জমলো।
চারদিকে অন্ধকার হওয়ায় মৌ এর চোখের কোণে থাকা পানি সোহাগের চোখে পরল না। মৌ নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
”আপনি আর পাঁচটা ছেলের মতোই নরমাল, যেমনটা হলে ছেলেদের পার্ফেক্ট লাগে, কিন্তুু আমি তেমন নই। মেয়েরা ৯০% এর বেশি ফর্সা হয়, আমি তেমন নই। এতে আপনার খারাপ লাগেনা?
প্রথমে আপনার আমাকে পছন্দ হয়নি বলে তো বিয়ে করতে চাননি। এটা সবাই জানে। সবাই হয়তো ভাবে আপনার আম্মু আপনাকে আমার সাথে জোর করে বিয়ে দিয়েছে।”
মৌ এর কথা শুনে সোহাগ মৌ কে ছেড়ে দিল। চোখ বুজল। এতোক্ষণ এই মেয়েকে সে কী বললো! আর ও কী বলছে! চোখ খুলে রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
”আমি তোমাকে কারণ টা বলিনি মৌ?”
মৌ মাথা নিচু করে রইল। সোহাগ চোখ বুজে মৌ এর কথাগুলো ভাবলো। আর বুঝতেও পারল মৌ এর প্রত্যেকটা কথা তার ফুপির বলা। উল্টো ঘুরে যেতে নিল, এখনই তার ফুপিকে সবকিছুর জবাব দিবে। আর এটাও ক্লিয়ার করবে সে নিজের ইচ্ছেয় নিজে পছন্দ করেই মৌ কে বিয়ে করেছে। মৌ তার পছন্দ করা বউ, আর সে তাকে ভালোবাসে। আর তার ভালোবাসার মানুষকে কেউ কষ্ট দিয়ে কথা বলে পার পেয়ে যাবে শুধুমাত্র গুরুজন বলে এতোটা ভদ্র সে হতে পারবেনা। আর না চায়। প্রত্যেকটি কথার জবাব দিবে তবে ভদ্রতার সহিত।
মৌ সোহাগকে সামনে এগোতে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। মানুষটার যা রাগ! নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছে তার ফুপি এসব বলেছে, এজন্যই হয়তো জিজ্ঞেস করল ফুপি তাকে কিছু বলেছে কী-না! বাড়িতে এখন তার বন্ধুর বাবা আছে। সবাই আছে। এর মধ্যে মাথা গরম হয়ে গিয়ে কিছু করলে ব্যাপারটা খুবই খারাপ হবে। এই ভেবে মৌ দৌড়ে গিয়ে সোহাগের সামনে দাঁড়ালো। মৌ হুট করে তার সামনে আসায় বুঝতে পারেনি সে। যার ফলে মৌ সোহাগের সাথে ধাক্কা খেয়ে কিছুটা পিছিয়ে যায়, পায়ের গোড়ালিতে বেকায়দায় ব্যাথা পায়। সাথে সাথে বসে পড়ে। সোহাগ বুঝতে পেরেই দ্রুত মৌ এর কাছে গিয়ে বলল,
”তুমি কী বোকা! এভাবে কথা না বলে হঠাৎ কেউ সামনে আসে! বেশি ব্যাথা পেয়েছ? সরি! আমি দেখতে পাইনি।”
অতঃপর মৌ এর পা ভালোভাবে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখল।
মৌ পাত্তা দিল না। সাথে সাথে একটু ব্যাথা পেয়েছে। আহামরি ব্যাথা পায়নি।
”আপনি কই যাচ্ছিলেন?”
”ফুপির সাথে কথা বলতে।”
”দরকার নেই বলার। আপনি মাথা ঠান্ডা রেখে তো কথা বলতে পারবেন না। আপনার বন্ধুর বাবা আছে সে কী ভাববে!”
সোহাগ ভেবে দেখল মৌ ভুল বলেনি। তাই এই ডিসিশন চেন্ঞ্জ করল। সুযোগ বুঝে তার ফুপিকে বলবে। অতঃপর মৌ কে কোলে নিতে গেলে মৌ বলল,
”কী করছেন? আমি হাঁটতে পারব।”
”পায়ে ব্যাথা পেয়েছ তো! হাঁটতে হবে না। তোমার বর এর কোল তোমার জন্য রেডি।”
”আমার তো পা ভাঙেনি, ব্যাথাও তেমন পাইনি। লাগবে না কোলে নেয়া। আমি হেঁটে যেতে পারব।”
সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,
”আমি আমার সুস্থ বউকেই কোলে নিব। এতো কথা বলো কেন?”
এই বলে মৌ কে কোলে তুলে নিল। অতঃপর বলল,
”চোখ বোজ। এই আঁধার রাতে পুরো ছাদ তোমায় কোলে নিয়ে হাঁটব। দেখবে অনেক ভালো লাগবে। নাও চোখ বোজ।”
“চোখ মেলেই থাকব। বুজতে হবে কেন?”
”তুমি অনেক কথা বলো। আমার তোতা পাখি।”
এই বলে ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে দু'চোখের পাতায় চুমু আঁকলো।
এতেই মৌ চোখ বুজে নেয়। আর খোলে না। সোহাগের জানা আছে তার বউকে কীভাবে তার কথা শোনাতে হয়! কথার মাঝে হঠাৎ এভাবে চুমু আঁকলে মৌ অনেক লজ্জা পায়। চোখ খোলার নাম থাকেনা আর।
মৌ এর মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
”আমার তোতা পাখি বোবা পাখি হয়ে গেল!”
মৌ চুপ। সোহাগ মৃদু হেসে পুরো ছাদ ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলো। আর বলতে লাগলো,
“তোমায় নিয়ে হাঁটলে শান্তি, বসলে শান্তি, তোমার দিকে তাকালে শান্তি, কথা বললে শান্তি যা-ই করি যদি সেখানে তুমি থাকো, তোমার উপস্থিতি থাকে আমি শান্তির সাগরে ভাসি। কী অসাধারণ অনুভূতি!”
মৌ নিঃশব্দে সোহাগকর বুকে মাথা ঠেকালো আলতোভাবে। সোহাগ যেন বুঝতে না পারে সে ইচ্ছে করে রেখেছে তাই এতো আলতো করে রাখল। হার্টবিট এর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। অন্ধকার রাত, মৃদু বাতাস, সে তার বর এর কোলে বুকের স্পন্দন শুনছে, আর তার বর তাকে নিয়ে হাঁটছে। এমন রাত স্মৃতির পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
”চোখ খোলো বোবা পাখি। অনেক সুন্দর কিছু দেখতে পাবে!”
মৌ সময় নিয়ে চোখ খুললে সোহাগ ইশারায় সামনে তাকাতে বলে, মৌ ঘাড় ফিরিয়ে ওদিক তাকিয়েই মৃদু চিৎকার দিয়ে সোহাগের গলা জড়িয়ে ধরে। বিড়বিড় করে বলে,
”আপনি আমাকে ছাদ থেকে ফেলে দিবেন নাকি? নামান আমায়।”
সোহাগ মৌ এর কান্ডে হাসল। কেমন ভয় পেয়ে তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে। সে মৌকে পুরোটা বাইরে ধরেনি। শরীরের বেশি অর্ধেক ছাদের ভিতরে কিন্তুু মৌ কোলো থাকায় বুঝতে পারেনি। ভেবেছে পুরো ছাদের সীমানার বাইরে রেখেছে। স্বাভাবিক থাকলে তার হাতটাও ঘাড়ে রাখে না। দুষ্ট হেসে বলল,
"ফেলে দিই?"
মৌ আরও শক্ত করে সোহাগের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
”প্লিজ নামান আমায়। পরে যাব তো! ভয় লাগছে অনেক।”
সোহাগ মৃদু হেসে মৌ কে ছাদের মাঝে এনে নামিয়ে দেয়। মৌ সোহাকে জড়িয়েই হাঁপাতে থাকে। ইশ! অনেক ভয় পেয়েছে। তাকে ছাদের বাইরে কীভাবে ধরে ছিল!
সোহাগ মৃদু হেসে বলল,
”ভয় পেলে বউ আমায় ছাড়তেই চায় না। বউকে কাছে আনার নিনজা টেকনিক এটা বুঝলে!”
মৌ সোহাগের কথা শুনে সোহাগকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
”খারাপ লোক একটা। আমার হার্ট-অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল। আর আপনি মজা নিচ্ছেন।”
এই বলে সোহাগের বুকে থাপ্পড় দিতে লাগলো আর বলতে লাগলো,
“আপনি একটা খারাপ লোক। সবসময় আমায় ভয় দেখান শুধু। যদি পড়ে যেতাম, তখন তো আরেকটা বিয়ে করে সুখেই থাকতেন। আর আমার আব্বু-আম্মুর কি হতো!”
সোহাগ মৌ এর দু'হাত নিজের দু'হাতের মধ্যে আবদ্ধ করে নিয়ে বলল,
“আর কখনো এ কথা বলবে না বুঝেছ পাখি? তোমার কিচ্ছু হবে না ইনশাআল্লাহ, আর না-তো আমি আরেকজনকে নিয়ে ভাববো। ভাগ্যে কী আছে জানিনা। জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তবে দোয়া ভাগ্য পরিবর্তন করে। আমি দোয়া করি আমি তুমি যেন একসাথেই আল্লাহর কাছে যেতে পারি। আর যদি এটা কবুল নাও হয়, তবুও আরেকজনকে টেনে আনবেনা, কারণ আমাদের গন্তব্য মাত্র কয়েক বছরের দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের গন্তব্য চিরস্থায়ী জান্নাত। জান্নাতে তার স্বামী শেষ স্ত্রীর সাথে থাকবে। তুমিই আমার প্রথম স্ত্রী, তুমিই আমার শেষ স্ত্রী থাকবে ইনশাআল্লাহ।”
মৌ মুগ্ধ সাথে অবাক নয়নে নিজ স্বামীর পানে চেয়ে রইল। সে ঠিক কীভাবে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করবে তা ভেবে পাচ্ছে না। মৌ কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সোহাগ মৃদু হেসে হঠাৎ করেই টুপ করে মৌ এর নাকে চুমু খেল। মৌ সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল।
এই মানুষ তাকে একটু শান্তি করে দেখতেও দিবেনা। সোহাগ হাসল তার বউ এর দিকে তাকিয়ে। সে হাসিখুশি একটা ছেলে তবে এতো হাসতো না। কিন্তুু বিয়ের পর যেন তার উপর ভূত ভর করেছে সবসময় হাসতেই থাকে। এমন প্রশান্তিকর বউ সাথে থাকলে মুখ থেকে হাসি সরবেই বা কীভাবে?
★★
সকাল সকাল মনিরা উঠে নামাজ পড়ে নিল। অতঃপর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে ভাবল ছাদে যাবে, মত পাল্টে বাগানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এতো সকালে তো কেউ ওঠেনি। বাগানে অনেক ফুলের গাছ আছে। যা মনিরার বেশ ভালো লেগেছে। তাই আপাতত ছাদে যাওয়ার ইচ্ছে বাদ দিয়ে বাগানের দিকে গেল।
ফুলের গাছে হাত ছোঁয়ালো, পুরো বাগান ঘুরে ঘুরে দেখল, আবার একটুখানি দৌঁড়ালো। এমন বাগান তার স্বপ্ন। ভবিষ্যতে যাকে বিয়ে করবে দেখে নিবে তার এমন ফুলের বাগান আছে-কীনা। এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে দিল বাগানে। সূর্যের দেখা মিলেছে কিছুক্ষণ আগে। মনিরা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মাথা তুলে অপরিচিত একজন ছেলেকে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। এই ছেলে আবার কোথা থেকে আমদানি হলো? একে তো দেখেনি আগে! দুলাভাইয়ের দুটো বন্ধুর একজনকে তো হাড়ে হাড়ে চেনে, আরেকজনের মুখ চেনে। তাহলে এই লোক কে!
নাবিল এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হাই! আমি নাবিল।”
মনিরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
”আমি আপনার নাম শুনতে চেয়েছি?”
মনিরার কথায় নাবিল এর হাসি হাসি মুখ বাংলা পাঁচের মতো হলো। মুখের উপর কেউ এভাবে বলে!
অতঃপর আমতা আমতা করে বলল,
”আসলে পরিচিত হওয়ার জন্য নাম বললাম। তোমার নাম মনিরা তাই-না?”
মনিরা অবাক হলো। এই লোক তার নামটাও জানে। “আপনি আমার নামও জানেন?”
নাবিল মাথা চুলকে বলল,
“হ্যাঁ। আম্মু তোমার কথা বলেছে আমাকে।”
“কে আপনার আম্মু? আর আপনি কে ভাই?”
“আমি সোহাগ ভাইয়ার ফুপাতো ভাই। ভাই ডাকছ কেন? নাম ধরেই ডাকতে পারো। আমি মাইন্ড করবনা।”
মনিরা কিছু ভাবল। সেই মহিলার কথা মনে পরল। তার মানে এই ছেলের সাথেই তাকে বিয়ে দিবে বলে তার থেকে তার আম্মুর নাম্বার নিয়েছে। চোখ বড় বড় করে তাকালো নাবিল এর দিকে। আবার ভাই ডাকতে নিষেধ করছে।
নাবিল ভ্রু কুঁচকে বলল,
”কি হয়েছে?”
মনিরা নাবিলের বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে তাকালো। চোখ তুলে নাবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
”আপনার হাত ব্যাথা করছেনা?”
মনিরার কথায় নাবিল বোকা হেসে হাত সরিয়ে নিল। অতঃপর বলল,
”তোমার আমাকে কেমন লেগেছে? আসলে আমাদের বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা আছে তো! আমার তোমাকে একদম পাক্কা পছন্দ হয়েছে।”
মনিরার ইচ্ছে করল বলতে আমার ১০০ টা বয়ফ্রেন্ড। কেমন ক্যাবলা মার্কা হাসি হাসছে। গায়ে পরছে। তাকে না-কি মনিরা বিয়ে করবে খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই। কিন্তুু এটা বললে তো সবাইকে বলে দেবে। তার বাড়িতেও এ খবর পৌঁছে যাবে। অতঃপর মেকি হেসে বলল,
“হেহে! আসলে আমি আমার ফ্যামিলির পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করব। এ ব্যাপারে আমার সাথে কথা বলে লাভ নেই।”
নাবিল মনিরার কথা শুনে হাসল। মনিরাকে তার পছন্দ হয়ছে। কথাও বলে কী সুন্দর। এখন তার মাকে বলতে হবে শুধু।
“আপনি কী জব করেন?”
নাবিল হেসে বলল,
“আমার বাবার বিজনেস আছে। আর আমি টোটো কম্পানির ম্যানেজার।”
মনিরা বিড়বিড় করল,
“টোটো কোম্পানি! এই কোম্পানি টা আবার কোথায়?”
এরই মধ্যে নাবিলের ফোন বেজে উঠলে বলল,
”আচ্ছা ভালো থেকো। আসছি। আবার দেখা হবে। বাই বাই। সি ইউ!”
মনিরা উপরে উপরে হাসল আর ভিতরে ভিতরে ভাবতে লাগলো, এই কোম্পানি কোথায়! যদি সত্যি সত্যি বিয়ে হয়, তাহলে তো খোঁজ নিতে হবে।
ইমন ঘুম থেকে উঠে ছাদে এসে দাঁড়িয়েছিল। নাবিল এর সাথে মনিরাকে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে বিরক্ত হলো। এই মেয়েকে এই ছেলের সাথে হাসতে হবে কেন? সকাল সকাল ঘুম বাদ দিয়ে ছেলেদের সাথে হাসাহাসি করছে! পাত্তা দিবে না ভাবলো, কিন্তুু বার বার চোখ ওদিকেই যাচ্ছে। না পেরে নিচে নেমে আসল। ইচ্ছে করছে এই মেয়েকে থাপ্পড় দিতে। চেনেনা জানেনা অপরিচিত এক ছেলের সাথে হাসাহাসি শুরু করেছে। বিড়বিড় করল,
”কী এমন কথা বলছে, প্রথমদিনেই এতো হেসে হেসে। আর তার সাথে শুধু ঝগড়া করে। বেয়াদব মেয়ে একটা! হাসাচ্ছি তোমাকে দাঁড়াও।”
নিচে নেমে বাগানে এসে দেখল নাবিল নেই। আর মনিরাও এদিকেই আসছে। ইমন দ্রুত মনিরার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
”কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
হঠাৎ করে এভাবে সামনে এসে প্রশ্ন করায় মনিরা ভয় পেয়ে গেল। ইমনকে দেখে কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,
“যেখানে ইচ্ছে যাব, আপনাকে কেন বলব?”
মনিরার ত্যাড়া কথায় রাগ হলো ইমনের। একটু আগেই ওই ছেলের সাথে হেসে কথা বলল আর তার সাথে দেখো কীভাবে কথা বলছে! দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
”নাবিলের সাথে হেসে হেসে কী বলছিলে এতোক্ষণ?”
মনিরার নাবিলের কথা মনে পরায় আনমনা হলো। ভাবলো ইমনকে বলুক যাতে ওই ছেলেকে কিছু বুঝিয়ে দেয় তাহলে আর তার বাড়িতেও বিয়ের কথা উঠবেনা। অতঃপর উৎফুল্ল হয়ে ইনোসেন্ট মুখ করে বলল,
”ভাইয়া আপনি ঠিকই বলেছিলেন ওই ছেলের বিয়ের কথা হচ্ছে আমার সাথে। আপনি একটু ভেঙে দিন না বিয়েটা। আমি কত ছোট! এখনি বিয়ে করবনা আমি।”
মনিরার হঠাৎ এহেন কথায় ইমন অদ্ভুদ চোখে তাকালো। কি সুন্দর করে আবদার করতে পারে মেয়েটা! ওই ছেলের সাথে হেসে কথা বলা মোটেও তার ভালো লাগেনি। মনে হলেই রাগ হচ্ছে। অতঃপর গম্ভীরমুখে বলল,
“আমি কেন বিয়ে ভাঙতে যাব? আমার অনেক কাজ। এইসব ফালতু কাজ করার সময় নেই আমার।”
ইমনের কথা শুনে মনিরা রেগে গেল। এই লোককে বলাই ভুল হয়েছে। বিড়বিড় করে বলল,
”লেজ কাটা বাদর একটা।”
”আর তুমি লেজ কাটা ইঁদুর।"
মনিরা চিন্তিত হলো। তাকে যদি বিয়েটা করা লাগে! তার আম্মুর ডায়লগ, ভালো পাইলে বিয়ে দিয়ে দিবে। যদি বিয়ে করাই লাগে ওই কোম্পানি কোথায় সেটা জেনে নিক। এই ভেবে বলল,
”আচ্ছা টোটো কোম্পানি কোথায় জানেন?”
মনিরার কথা শুনে ইমন ভ্রু কোঁচকালো। এই নামে কোনো কোম্পানি আছে নাকি!
”মানে!”
”মানে ওই ছেলে টোটা কোম্পানির ম্যানেজার। বলুন কোম্পানিটা কোথায়! খোঁজ নিয়ে দেখব ছেলের ক্যারেক্টার কেমন!”
মনিরার কথা শুনে ইমন জোরে হেসে উঠল। হাসি থামছে না। মনিরা ইমনকে এভাবে হাসতে দেখে হা করে তাকিয়ে রইল। সে কী এমন হাস্যকর কথা বলছে যার ফলে এই লোক হাসতে হাসতে পরে যাচ্ছে। ইমন কোনোরকমে হাসি থামিয়ে বলল,
“সিরিয়াসলি তুমি জানোনা টোটো কোম্পানির ম্যানেজারের অর্থ!”
”জানিনা বলেই তো আক্স করছি। না বলে এমন পাগলের মতো হাসছেন কেন?”
ইমন অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল,
”প্রত্যেকটা বেকার ছেলেই টোটো কোম্পানির ম্যানেজার।”
”বেকার ছেলেরা টোটো কোম্পানির ম্যানেজার হলে তারা আবার বেকার হয় কীভাবে?”
মনিরার কথা শুনে ইমন আবারো জোরে হেসে উঠল। মনে হচ্ছে মনিরা একটা করে জোক্স বলছে আর ইমন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরছে।
“টোটো মানে ফাঁকা। টোটো করে ঘুরে বেড়ায়, কোনো কাজ করেনা তাদের বলে টোটো কোম্পানির ম্যানেজার। এইটা আন্ঞ্চলিক ভাষা বুঝেছ। উফ আল্লাহ! হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গেছে।”
মনিরা বোকা চোখে তাকিয়ে রইল ইমনের দিকে। সে এটা তার আম্মুদের মুখে শুনেছিল। কিন্তুু মাথায় ছিল না। আর ওই ছেলে যেমন সিরিয়াসভাবে বলল, তাতে তো মনে হয়নি সে ফাজলামি করে বলেছে। বিরক্ত লাগছে সবকিছু মনিরার। ইমনকে হাসতে দেখে বলল,
”একদম হাসবেন না। আপনার দাঁত কেউ দেখতে চেয়েছে?”
ইমন হাসি থামিয়ে বলল,
”দেখবে দাঁত! এই যে দেখ ইইইইইইই, একদম ঝকঝকে তকতকে দাঁত।”
মনিরা রেগে বলল,
”আপনি একটা অসহ্য মানুষ।”
”সেম ঠু ইউ। যাইহোক শোনো তোমার বিয়ে তাহলে হচ্ছে তাই-না! আবার একটা বিয়ের দাওয়াত পেতে যাচ্ছি! ভাবতেই ভালো লাগে!”
”আপনাকে আমি জীবনেও দাওয়াত দিব না।”
”দিতে হবেনা। এমনিই যাব। তোমার বিয়েতে আমার দাওয়াত লাগবে না।”
”আপনার সমস্যাটা কী! এমনিতেই চিন্তায় মরে যাচ্ছি। তার মধ্যে আপনি এসে জ্বালানো শুরু করেছেন। বিরক্তিকর!”
ইমন মনিরার কথায় শীতল চোখে তাকালো। চিন্তিত মুখটা তার ভালো লাগছেনা! রাগান্বিত মুখ, হাসি হাসি মুখ, চোখে পানি ভর্তি মুখ সবরকমভাবেই মনিরাকে ভালো লাগলেও চিন্তিত মুখে একদমই মানাচ্ছেনা।
বিড়বিড় করে বলল,
”এভাবে একটুও মানাচ্ছেনা!”
মনিরা শুনতে পেয়ে বলল,
”কী?”
ইমন মৃদু হেসে নরম সুরে বলল,
”আমার তোমাকে জ্বালাতে ভালো লাগে বুঝেছ মিষ্টি-ঝাল মেয়ে? তুমি বিরক্ত হলেও জ্বালাবো।”
মনিরা অবাক হলো। এই ছেলে এতো নরম করে কথা বলতে পারে! আবার কী সুন্দর হেসেও কথা বলছে! হেসে কথা বলতে পারে সেটা তো জানে! কিন্তুু তার হেসে হেসে কথা বলছে ব্যাপারটা আশ্চর্যের! মনিরাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইমন মনিরার মাথায় দু'আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে বলল,
”এতো চিন্তা করো না। বিয়েটা হবেনা। মিলিয়ে নিও। চিন্তিত মুখে তোমায় মানায় না।”
মনিরা ইমনের কথাগুলো হজম করতে পারছেনা। আর তার সাথে এতো সুন্দর নরম সুরে কথা বলায় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ইমন মনিরার অবাক চাহনির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে উল্টো ঘুরে চলে গেল।
কিছুদূর গিয়ে আবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল মনিরা তার দিকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সত্যি বলতে তার নিজের কর্মকাণ্ডে নিজেরও অবাক লাগছে নিজের কাছেই। সে এভাবে কেন কথা বললো মনিরার সাথে আবার বিয়েটা হবেনা সেটাও বললো, ওর বিয়ে হলে তার কী! আবার বললো ও বিরক্ত হলেও জ্বালাবে সবমিলিয়ে ইমনের নিজেরই পাগল লাগছে নিজেকে। কিন্তুু মনিরার চিন্তিত মুখটা ভালো না লাগলেও অবাক করা মুখটা বেশ মনে ধরল তার। মনিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উল্টো ঘুরে স্থান ত্যাগ করল।
ইমন যাওয়ার পর মনিরা বিয়ের ব্যাপার বাদ দিয়ে ইমনের বিহেভ ভাবতে লাগলো। এমন অদ্ভুদভাবে কথা বললো কেন! মনে হলো তাকে ওই লোকের ভালো লেগেছে। কিছু সময়ের জন্য মনিরার অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল। কিন্তুু এটা অসম্ভব। নিশ্চয়ই নাটক করে গেল, তাকে ভুলভাল বুঝিয়ে সুযোগ নিবে! মনিরা এতো বোকা নাকি! ওই লোক কিছু করার আগে সই ডোজ দিবে। হুহ! বলে কী না তার সময় নেই ফালতু কাজের! এটা ফালতু কাজ! লেজ কাটা বাঁদর একটা। কিন্তুু শেষে কেন বললো বিয়েটা হবেনা মিলিয়ে নিও, কী সুন্দর করে হাসলো তার দিকে তাকিয়ে! হাদিটা সুন্দর আছে। মনিরা নিজেই নিজের মাথা থাপ্পড় দিয়ে বলল,
’কার প্রশংসা করছিস মনিরা? লেজ কাটা বাঁদরের হাসি কখনো সুন্দর হয়না।’
★
নাফিসা বেগম মৌ এর পুরো পরিবারকে দাওয়াত করেছে আজ। ইমনের বাবাকে কাল যেতে দেয়নি। সবাইকে একসঙ্গে খাওয়াবে।
সবাই দুপুরে আসলে নাফিসা বেগম তাদের আয়োজন করেন বেশ পরিপাটিভাবে। মৌ সাথে থেকেছে। কিন্তুু বেশিরভাগ কাজ নাফিসা বেগম আর কাজের মেয়ে করেছে। মনিরাও অনেক সাহায্য করেছে। নাফিসা বেগম বার বার নিষেধ করছিল। কিন্তুু মনিরার রান্না করতে ভালো লাগে। যদিও সব রান্না পারেনা। তবে চুপচাপ বসে থাকার মেয়ে সে না। রান্নাবান্না শেষে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। তাই মনিরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে নিজ ঘরে যেতে গেলে নাবিলের ডাকে দাঁড়িয়ে যায়।
”রান্না করলে মনিরা?”
মনিরা বিরক্ত হলো। দেখলোই রান্নাঘর থেকে আসছে ঘেমে। তবুও এই প্রশ্ন করার মানে কী! জোর করে হেসে বলল,
”না তো! দৌড়াদৌড়ি খেলে আসলাম রান্নাঘর থেকে।”
মনিরার কথায় নাবিল থতমত খেয়ে তাকায়। এই মেয়ে এমন ত্যাড়াভাবে উত্তর দেয় কেন? মজা করছে হয়তো! তাই মৃদু হেসে বলল,
”তুমি খুব মজার মানুষ মনিরা। আমার তোমাকে খুব ভালো লেগেছে।”
মনিরা বিরক্ত হলো। এমন গায়ে পরা ছেলে মনিরার একদম পছন্দ না। কিন্তুু মেকি হাসল।
ইমন ঘর থেকে বেরিয়ে এদিকেই আসছিল। মনিরাকে আবার নাবিলের সাথে দাঁড়িয়ে হাসতে দেখে রাগ হলো। ইচ্ছে করল এই মেয়ে জীবনে যেন না হাসতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে।
বিড়বিড় করল,
’তোমার সব দাঁত খুলে নিয়ে চানাচুর ভাজি করব মিষ্টি-ঝাল মেয়ে। এতো হাসি কই পাও?
আর এই নাবিল এর বাচ্চা মেয়ে দেখলেই গায়ে পরছে, তোকে ছাড়ব না নাবিলের বাচ্চা।’
মনিরা মৃদু হেসে বলল,
“বুঝেছি ভাইয়া। ফ্রেশ হতে হবে। বাই।”
এই বলে কয়েক কদম পা বাড়ালে নাবিল বলে উঠল,
“আর কত ভাইয়া ডাকবা? অন্যকিছু ডাকার অভ্যাস কর।”
মনিরার ইচ্ছে করল কষিয়ে দু'টে থাপ্পড় দিতে। এমন ভাব করছে যেন কালকে তার সাথে বিয়ে। অসহ্য। দুলাভাইয়ের আত্মীয় বলে কিছু বলতেও পারছে না। নাবিল এর কথায় থেমে গিয়ে পিছন ফিরে কিছু বলার জন্য মুখ খুললে কানের কাছে মৃদু আওয়াজে কিছু কথা আসল,
”এখনি যদি ঘরে না যাও। আমাকে যে দু'টো থাপ্পড় দিয়েছিল, গুণে গুণে দুইশোটা থাপ্পড় দিয়ে তার শোধ নিব।”
দাঁতে দাঁত চেপে ইমন কথাটা বলল। আস্তে বলায় কথাটা শুধু মনিরাই শুনতে পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমনের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো। দেখল তার দিকে রেগে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে নিলে ইমন ধমক দিয়ে বলল,
”যেতে বলেছি।”
মনিরা আর কথা বাড়ালো না। বুঝল না তাকে এমন রাগ দেখালো কেন! আবার থাপ্পড় দিতে চাইছে। এমন শক্ত হাতে দু'টো থাপ্পড় খেলেই তার কী হবে! সেখানে দুইশোটা। রেগে গেলে কেমন একটু ভয় ভয়ই লাগে। সবসময় তো হাসে। এখন আবার কী হলো কে জানে! ভাবতে ভাবতে ঘরে চলে গেল।
মনিরা যেতেই ইমন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। সে জানেনা কেন রাগ দেখালো মনিরাকে। আর এই নাবিলের বাচ্চাটাকে সহ্যই হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে উস্টা দিয়ে চাঁদের দেশে পাঠিয়ে দিতে। অতঃপর নাবিল এর পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আর নাবিল তো অনেকক্ষণ আগেই ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে।
★
বিকেলে অয়ন বেরিয়ে যায়। নাফিসা বেগম বার বার বলে দিয়েছে রাতে যেন আসে। রাতে না খেয়ে ইমনের বাবাকেও যেতে দেয়নি। অয়ন আসবে বলে বিকালবেলা বেরলো। ইশরাত কে না দেখলে তার চলে না যে এখন! দেড় ঘণ্টার পথ জার্নি করে পৌছালো ইশরাতের হোস্টেলে। ইশরাতকে ফোন করলে সে মিনিট পনেরো এর মধ্যে বোরখা হিজাব পরে রেডি হয়ে নিচে নেমে আসে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে প্রায় ঘণ্টাখানিক হলো। ইশরাত এসে জিজ্ঞেস করল,
মাগরিব এর নামাজ পড়েছ?
“রাস্তায় ছিলাম। পড়তে পারিনি।”
ইশরাত বিড়বিড় করে বলল,
”অজুহাত।”
অয়ন শুনতে পেয়ে হাসল। কেমন তার সবকিছুর খোঁজ নিচ্ছে। আবার তার ব্যাপারে কমেন্ট করছে।
ইশরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
”অয়ন ভাইয়া তোমার আম্মু আর অমিত ভাইয়াকে তুমি ভালোবাসো না?”
ইশরাতের মুখে এমন কথা শুনে অয়ন অবাক হলো।
ইশরাত অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি জানি অনেক ভালোবাসো। আর চাও তারা যেন ভালো থাকে। এজন্য তোমার সবার আগে নামাজ পড়া জরুরি। এরপর অন্যান্য ভালো কাজ। এইসবকিছুর সওয়াব তোমার আম্মুর কবরে যাবে। অমিত ভাইয়ার জন্য দোয়া করবা তুমি দুনিয়াতে, সে আখিরাতে ভালো থাকবে। তাহলে বলো তো তুমি আর আল্লাহর ইবাদতে অবহেলা করবা? আর সবথেকে বড় কথা আল্লাহ আমাদের কত কিছু দিয়েছে তার বিনিময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারব না বলো?
আর আমি চাই আমার কাছের মানুষ ঠিকঠিক সময়ে নামাজ পড়ুক।”
অয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার ভালোবাসার মানুষটার দিকে। তার চেয়ে প্রায় সাত বছরের ছোট হবে ইশরাত। অথচ বুদ্ধি মেেয়েটার চিন্তা-ভাবনা কী সুন্দর! মৃদু হেসে বলল,
”আর কখনো অজুহাত দেখিয়ে নামাজ মিস করব না ইনশাআল্লাহ। সর্বপ্রথম আল্লাহর জন্য, তারপর আমার আম্মু-ভাইয়ের জন্য, তারপর আমার সবচেয়ে কাছের প্রিয় মানুষটার জন্য।”
ইশরাত হাসল অয়নের কথা শুনে। অতঃপর বলল,
”আমি ভিতরে অপেক্ষা করছি। তুমি পাশের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে আসো।”
অয়ন মিনিট পনেরোর মধ্যে নামাজ পড়ে আসলে ইশরাত বেরিয়ে আসে। অতঃপর অয়ন বাইক নিয়ে একটা ফুসকার স্টলের সামনে দাঁড়ায়। অয়ন জানে ইশরাত ফুসকা পাগলি। এর আগেও অনেক খাইয়েছে। এই দোকানের ফুসকা খুবই ভালো।
কিন্তুু এবার নতুন অনুভূতি কাজ করছে। মানুষটা একজনই। কিন্তুু অনুভূতি বদলেছে। দেড় বছর আগে কখনো কল্পনাও করেনি তার বন্ধুর বোনকে ছাড়া তার পথ চলা অচল হয়ে যাবে।
বাইক থেকে নেমে ইশরাতের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ইশরাত ঘাড় ঘুরিয়ে অয়নের দিকে তাকালো। অয়ন ইশরাতকে নিয়ে রাস্তা পার করতে ব্যস্ত। রাস্তা পার হয়ে অয়ন খেয়াল করল ইশরাত তার দিকে চেয়ে আছে। অয়ন ইশরাতের চোখের সামনে চুটকি বাজালো। ইশরাত লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। অয়ন হাসল ইশরাতের কাণ্ডে। আর লজ্জা না দিয়ে দোকানে প্রবেশ করল। ইশরাত নিজেই আগ বারিয়ে বলল,
”তিন প্লেট ঝাল ফুসকা দিন মামা। আর এক প্লেট দই ফুসকা।”
অয়ন অবাক হয়নি। এই ফুসকা পাগলি এতো ফুসকা নিমিষেই শেষ করে ফেলে। দই ফুসকা মূলত তার জন্য অর্ডার দিয়েছে। দই ফুসকা অয়নের খুব পছন্দের। অয়ন ইশরাত একে-অপরকে খুব ভালোই চেনে।
কিছুক্ষণ পর তাদের টেবিলে ফুসকা দিয়ে গেলে ইশরাত খেতে আরম্ভ করল। অয়ন হাসল। ইশরাত এক প্লেট খেয়ে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছল। অয়ন অবাক হয়নি। এসবই তার জানা। খাবে আর চোখ মুছবে। এতো ঝাল খাওয়ার কী দরকার!
ইশরাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
”খাচ্ছ না কেন?”
অয়ন গালে হাত দিয়ে বলল,
“তোর খাওয়া দেখছি। আগে আড়চোখে ভয়ে ভয়ে দেখেছি। এখন নির্ভয়ে দেখছি। ডিস্টার্ব করিস না।”
ইশরাত লজ্জা পেল। এভাবে তাকিয়ে থাকলে খাওয়া যায় নাকি। কিছু ভেবে নিজের প্লেট থেকে একটা ফুসকা উঠিয়ে অয়নের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
”এটা খাও।”
”খাবো। শর্ত আছে।”
”কী?”
”নিজের হাতে খাওয়া।”
ইশরাত মেনে নিল। অয়নকে সে একটা ঝাল ফুসকা খাওয়াতে চায়। এতো মজার ফুসকা কখনো খাওয়াতে পারেনি অয়নকে। হাত বাড়িয়ে অয়নের মুখে দিল।
অয়ন ইশরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে ফুসকা চিবোতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ড পর অয়ন মুখ নাড়ানো থামিয়ে দিল। এতো ঝাল কেমনে সহ্য করবে!
ইশরাত হেসে বলল,
”মজা না? বলেছিলাম আমি একটা খেয়ে দেখ। আর খাবা?”
অয়ন মুখের মধ্যে নিয়ে আছে। ভালোবাসলে ঝাল খাওয়া লাগে! কী ভয়ানক! ইশরাতের হাতে খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে ঝাল ফুসকা মুখে তো নিল। খাবে কীভাবে? মুখের মঊ্যে মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে। কোনোরকমে মুখের ফুসকা গিলে নিল। দ্রুত পানি নিয়ে খেতে নিলে ইশরাত গ্লাস নিয়ে বলল,
”আরে কী করছ? পানি খেলে পেট জ্বলবে।”
অয়নের ইচ্ছে করছে এই মেয়েকে আছাড় মারতে। কেন দই ফুসকা খাইয়ে দেয়া যেত না! সে তো এর হাতে খাওয়ার লোভে ঝাল টাই খেয়ে নিয়েছে। ওর কি খেয়াল নেই সে ঝাল খেতে পারেনা!
দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কানের নিচে থাপ্পড় খেতে না চাইলে গ্লাস দে।”
ইশরাত গ্লাস ছেড়ে দিল। বিড়বিড় করল,
‘ভালোবাসা পালিয়ে গেছে এখনই। দু'দিন না যেতেই থাপ্পড় দিচ্ছে।’
কথাটা অয়নের কানে গেল। মনে মনে হাসল। আগে মুখের ঝাল কমিয়ে নিক। এরপর ভালোবাসার মানুষের অভিমান কমিয়ে দিবে।
চলবে ইনশাআল্লাহ~~~~~~~