ফন্ট সাইজ:
থিম:
আপনি যে আমার-ই

২৮তম পর্ব

লেখক: DRM Shohag

#আপনি_যে_আমার_ই

#writer_Drm_Shohag

#পর্ব_২৯ (Page - DrmShohagHoney)

(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)

রাত ১১ টার ঘটনা~

__________

১১ টার পর পর কাজ শেষে অয়ন আর ইমন বাসায় ফিরছে। অয়ন বাইক এর সামনে, ইমন পিছনে বসে। অয়ন বলল,

"তোর এতো পছন্দের পায়েস না খেয়ে উঠলি কেন?"

"পায়েসে লবণ মিশিয়ে দিয়েছিল।"

অয়ন অবাক হয়ে বলল,

"লবণ! কই আমাদের পায়েস তো অনেক মজা লেগেছে। সোহাগের শালি রেঁধেছিল না-কি। সত্যিই মেয়েটার হাতের রান্নায় অনেক টেস্ট।"

পিছন থেকে ইমন অয়নের পিঠে জোরে থাপ্পড় দিল। রেগে বলল,

"তোর বন্ধু সমান ভাইকে ওই মেয়ে লবণ দিয়ে পায়েস খাওয়ালো, আর তুই সেই মেয়ের প্রশংসা করছিস! বেয়াদব।"

"তুই ওর পিছে লাগিস বলেই তো খাইয়েছে, আমাদের তো খাওয়ায় নি। তোর বাদরামির জন্য তোর পছন্দের খাবার তার আবার ফার্স্ট ক্লাস রান্না মিস করলি!"

"ওই মেয়েকে আমি যা খাওয়াবো! সেটা এ জীবনে কোনো মানুষ খায়নি, দেখে নিস।"

অয়ন পিছন থেকে ভ্রু কুঁচকে বলল,

"তোরা কী বাচ্চা? একবার তুই ওর পিছে লাগছিস, আরেকবার ও। মানলাম ও বাচ্চা মেয়ে। তুই বুড়োগাধা হয়ে ওর পিছে লাগছিস কেন!"

ইমন পিছন থেকে অয়নের পিঠে আরো দুটো থাপ্পড় দিয়ে বলল,

"খবরদার আমাকে বুড়ো বলবি না। আমার মেসেঞ্জারে এখনো কত মেয়ের লাইন জানিস! আমি ভদ্র ছেলে বলে পাত্তা দিইনা।"

হেসে বলল,

"আর গাধা কাকে বলছিস! ওই মেয়ের জন্য যে প্লান বের করেছি না! শুধু দেখতে থাক কী হয়!"

অয়ন ইমনের কথা পাত্তা দিল না। 'বাঁচাল একটা।' হঠাৎ সামনে থেকে একটা গাড়ির আলো এসে অয়নের চোখে পরে। অয়ন নিজেকে সামলে নিতে চাইলেও একপর্যায়ে গিয়ে বাইকসহ পড়ে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে গাড়িটি তাদের পাস করে চলে যায়। ইমন তেমন ব্যাথা পায়নি। কিন্তুু অয়ন সামনে থাকায় বাইক পরে যাওয়া থেকে আটকাতে গিয়ে বেশি ব্যাথা পেয়েছে। ইমন কোনো রকম বাইক পরার আগেই নিজে বাইক থেকে নামতে পারলেও অয়নের উপর এসে বাইক পরে। ইমন বাম পায়ে হালকা ব্যাথা পেলেও অয়নকে পরতে দেখে দ্রুত বাইকে টেনে তোলে। অতঃপর অয়নকে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,

"কই লেগেছে ভাই? মাথায় লেগেছে?"

পায়ের প্যান্ট উপর দিকে উঠাতে গেলে অয়ন বলে ওঠে,

"উঠাস না। ব্যাথা লাগছে।"

ইমনের মাথা কাজ করছেনা। কথা বলতে বলতে কী হয়ে গেল এটা? অয়নের মাথা তার কোলে নিয়ে বলে,

"আরে ঠিক করে কথা বল। আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। কোথায় ব্যাথা পেয়েছিস?"

অয়ন হাঁপিয়ে গেছে। বাইককে উঠাতে গিয়ে নিজেই যেভাবে পরেছে কথা বলতে পারছে না। একটু সময় নিয়ে মৃদু আওয়াজে বলল,

"আমাকে উঠা বেয়াদব। ঠিক আছি আমি। কিন্তুু কোমড় ভাঙলো কী-না!"

ইমন আপাতত অয়নের কথা পাত্তা দিল না। বেয়াদব ছাড়াও আরও হাজারখানেক গালি দিলেও তার গায়ে লাগবে না এখন। বন্ধুর এক্সিডেন্ট এ কাতর সে। দ্রুত অয়নকে ধরে উঠালো। তার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড় করাল। অয়ন দাঁড়াতেই পারছে না। তাকে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে দ্রুত সোহাগকে কল দিল ইমন।

সবাই কাজ করে একসাথেই বাড়ি ফিরছিল। সোহাগ তার বাড়ির দিকে গেছে। অয়ন আর ইমন ভেবেছিল একটা রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাড়ি ফিরবে।

তার আগেই কী হয়ে গেল!

ওপাশ থেকে সোহাগ ফোন রিসিভ করলে ইমন অসহায় কণ্ঠে বলল,

"সোহাগ কই তুই? তাড়াতাড়ি অফিস থেকে পিছন দিকে আয়। আমাদের ভাই এক্সিডেন্ট করেছে। আর পারলে গাড়ি আনিস। অয়ন বাইকে বসতে পারবে না।"

সোহাগ প্রায় বাসায় পৌঁছে গিয়েছিল। অফিস থেকে খুব বেশি সময় লাগেনা তার বাড়িতে ফিরতে। ইমনের কথা শুনে দ্রুত বাসায় গিয়ে বাইক রেখে গাড়ি নিয়ে বের হলো। ঘরে গিয়ে মৌ কে শুধু বলে এসেছে,

"অয়নের এক্সিডেন্ট হয়েছে। আজ ফিরতেও পারি, নাও ফিরতে পারি। রাত জেগে থেক না। ঘুমিয়ে যেও।"

গাড়ি নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সোহাগ তাদের কাছে পৌঁছালো। অতঃপর দ্রুত অয়নকে নিয়ে দুই বন্ধু হসপিটাল গেলে তাকে ভর্তি করে নেয়। হাত পায়ের বেশ অনেক জায়গায় বাজেভাবে ইনজুরি হয়েছে। রাতে সোহাগ আর ইমন বাড়ি ফেরে না।

সোহাগ নিচ থেকে তিনজনের জন্য খাবার কিনে আনে, সাথে অয়নের ওষুধ। এরপর ইমন অয়নকে খাইয়ে দিতে গেলে অয়ন বলে,

"খেতে ইচ্ছে করছে না। আমার ফোনটা খুঁজে দে।"

ইমন রেগে বলল,

"একদম ন্যাকামি করবি না বেয়াদব। আমি তোর গার্লফ্রেন্ড লাগি না ঢং করে খাওয়াব। চুপচাপ খেয়ে নে।"

অয়নের বিরক্ত লাগলো। ইশরাতেের সাথে কথা না বললে তার ভালো লাগছে না। শরীরের ব্যাথায় কিছু ভালো লাগছে না। তার উপর আবার ইশরাতের সাথে কথা নেই। ইমন অয়নের কথা পাত্তা না দিয়ে জোর করে মুখে খাবার দিতে নিলে অয়ন কিছুটা রেগে বলল,

"ইমন তুই সবসময় এমন বিহেভ করা ছাড়বি। আমার ভালো লাগছে না। দয়া করে ফোন টা খুঁজে দে। নয়তো আর কিছু করতে হবেনা।"

অয়নের কথায় ইমন অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। সোহাগ রুমের বাইরে গিয়েছিল। মৌ এর সাথে কথা বলে রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে অয়নকে ইমনের সাথে এভাবে কথা বলতে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। ভেতরে গিয়ে ইমনের দিকে খেয়াল করলে দেখল ইমন ঝাপসা চোখে অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে। আর অয়ন চোখ বুজে আছে।

ইমন হাতের খাবার রেখে বাম হাত দিয়ে দু'চোখ মুছল। অতঃপর ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে সোহাগকে ভাঙা গলায় বলল,

"তোর বন্ধুকে খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিস সোহাগ।"

সোহাগ অয়নের কাছে গিয়ে বলল,

"তোর প্রবলেম কী অয়ন? তুই ইমনের সাথে এভাবে কথা বললি কেন?"

অয়ন কথা বলল না।

সোহাগ ইমনের কাঁধে হাত রেখে বলল,

"ওর শরীর ভালো নেই। ধরিস না ওর কথা।"

"ধরিনি। ঘুম পেয়েছে আমার। ঘুমাচ্ছি।"

অয়ন মৃদু আর্তনাদ করে উঠলে ইমন দ্রুত ঘুরে অয়নের কাছে গিয়ে বলল,

"কি হলো! ঠিক আছিস? ডক্টরকে ডাকব?"

অয়ন ব্যাথা শরীর নিয়েই মৃদু হেসে বলল,

"ঠিক নেই। বন্ধুকে কষ্ট দিয়ে ঠিক থাকতে পারিনা। কি করব!"

ইমন ভ্রু কুঁচকে ইমনের দিকে তাকিয়ে বলল,

"নাটক করছিস! আমি গলব না। যা মর। এই ইমন দেখতেও আসবে না।"

"এইজন্যই সামান্য ব্যাথাতে ছুটে এলি বুঝেছি।"

ইমন আনমনে বলতে লাগলো,

"তুই, সোহাগ, ইশরাত, বাবা সবাই আমার একটা ফ্যামিলি। তোর এক্সিডেন্টে আমি অনেক ভয় পেয়েছি। বাইক এক্সিডেন্ট খুব খারাপ। কত মানুষ যে মারা যায়।"

বলতে বলতে কথা জড়িয়ে এলো ইমনের। সোহাগ ইমনকে জড়িয়ে ধরল। সে তো সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে তার দু'টো ভাইয়ের জন্য। বাইক এক্সিডেন্ট কী স্বাভাবিক নাকি! শুনেই তো তার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। ভাগ্য ভালো থাকায় হাত পা কিছু ভাঙেনি। মাথায়ও ব্যাথা পায়নি। সবকিছু শরীরের উপর দিয়ে কেটে গেছে।

অয়ন হাসল তাদের মাঝের এমন সম্পর্কের গভীরতা দেখে! দুর্বল কণ্ঠে বলল,

"আজ আমি অসুস্থ বলে জড়াজড়ি করতে পারছি না!"

ইমন সেহাগকে ছেড়ে বলল,

"তোর হরমোন প্রবলেম এর ট্রিটমেন্ট এবার নিয়েই যাব। হসপিটালে যখন এসেছি। এর ট্রিটমেন্ট না নিয়ে যাব না।"

অয়ন রেগে বলল,

"আমি অসুস্থ বলে বেঁচে গেলি।"

সোহাগ বলল,

"আরে ভাই আমাদের তিনজনেরই হরমোন একটু বেশিই। তাই সবার চেয়ে সম্পর্কের গভীরতাও বেশি। এই অসুখ থাকাই ভালো। যাদের নেই তাদের চিকিৎসা করে বাড়ানো উচিৎ বুঝলি?"

সোহাগের কথা শুনে সোহাগসহ ইমন অয়ন হেসে উঠল। অয়ন দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালে দেখল ঘড়ির কাটা ১ টার ঘর পেরিয়েছে। ভাবল ইশরাত হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। তাই ইশরাতকে ফোন দেয়ার ব্যাপার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। সকালে উঠে কল করবে।

ইমন অয়নকে খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে, সাথে একটা ঘুমের ওষুধ দেয়ায় কিছুক্ষণের মাঝেই অয়ন ঘুমিয়ে যায়।

★★

চোখের উপর সূর্যের কিরণ এসে পরায় অয়ন চোখমুখ কুঁচকে নিল। পিটপিট করে চোখ খুলে আশেপাশে তাকালো। মনে পরল হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। সোহাগ আর অয়নকে পাশের বেডে ঘুমোতে দেখল। সারা শরীরে ব্যাথা। চোখের উপর হাত দিয়ে চোখ বুজল।

গত দুইদিন কাজের অনেক ব্যস্ততা গেছে। এই দুইদিন ইশরাতের সাথে ঠিকভাবে কথাও বলতে পারেনি। ভেবেছিল কাল রাতে বাড়িতে গিয়ে ইশরাতের সাথে মন খুলে কথা বলবে। মনের অশান্তি দূর করবে। কিন্তুু কী থেকে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝল না।

কিছুক্ষণ পর চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে অয়ন বিছানায় ফোন খুঁজল। ফোনটা আস্ত আছে কী-না! গায়ের নিচে পরে আছে। ফোন অন আছে। কিন্তুু ডিসপ্লে গেছে। কেউ ফোন দিয়েছে কী-না তাও দেখতে পারছে না। সে যে ফোন দিবে তারও স্কোপ নেই। আস্তে ধীরে শোয়া থেকে উঠে বসল। বিছানা থেকে নেমে পাশের বেড থেকে ইমনের ফোন নিয়ে ইশরাতের নাম্বারে কল করল। ওপাশ থেকে সাথেই সাথেই রিসিভ হলো, যেন ফোনের অপেক্ষায় ছিল মেয়েটা।

ইশরাত নামাজ পরে বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে অয়নের পিক দেখছিল। ভীষণ খারাপ লাগছে তার। কি হলো অয়ন ভাইয়ার? ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজে নেয়।

হাত থেকে ফোন আলগা হয়ে যায়। চোখের কোণ ঘেষে পানি গড়িয়ে পরে। এভাবে একসম ঘুমিয়ে যায়। অয়নকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। চিৎকার করে অয়ন তাকে বলছে,

"ভীষণ ভালোবাসি আমার ফুলের রাণীকে।"

সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে আশেপাশে তাকায়। কোথায় অয়ন ভাইয়া। নেই তো! বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর ফোন হাতে অয়নের পিক এর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

"কখনো কথা বলবনা তোমার সাথে অয়ন ভাইয়া। তুমি অনলাইনে আসার সুযোগ পেয়েছ, অথচ আমার খোঁজ নিতে পারনি, নিজের একটা খোঁজ দিতে পারনি।"

হাতের মুঠোয় থাকা ফোন কেঁপে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল ইমনের ফোন। দু'হাতে চোখমুখ মুছে ফোন রিসিভ করল। ভাবল যদি অয়ন ভাইয়ার একটা খোঁজ পায়। মনটা একটুখানি ভালো হলো। অতঃপর রিসিভ করে কানে ধরলে ওপাশ থেকে অয়নের কণ্ঠ ভেসে আসে।

"ফুলের রাণী!"

অয়নের কণ্ঠ শুনে ইশরাত ফুঁপিয়ে ওঠে। অয়নের কানে স্পষ্ট যায় ইশরাতের ফুঁপানোর আওয়াজ। অয়নের বুকে কেউ যেন আঘাত করল।

কোনোরকমে বলল,

"তুই কাঁদলে পানি ঝরে তোর চোখ বেয়ে, আর রক্তক্ষরণ হয় আমার হৃদয়ে ফুলের রাণী।"

ইশরাত সাথে সাথে ফোন কেটে দিল। চায়না সে এই স্বার্থপর মানুষের সাথে কথা বলতে। কালকে থেকে তার কী অবস্থা হয়েছে সেটা সে আর তার আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা।

লাইন কেটে যাওয়ায় অয়ন সমানে কল করতে লাগলো। আর রিসিভ হয়না। অয়নের নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। তার ফুলের রাণী এতো কষ্ট পেয়েছে! কী করবে এখন সে? ফোনে মেসেজ দিল ইমনের ফোন থেকে। কোনো রিপ্লে আসেনা। অয়ন কী করবে ভেবে পাচ্ছেনা।

ভাবলো মেসেজে বলবে তার এক্সিডেন্ট এর কথা। লিখতে গিয়েও থেমে গেল। ইশরাত ওখানে একা থাকে। এটা বললে আরও খুব কাঁদবে নিশ্চয়ই। অতঃপর ইমনের ফোন পকেটে ঢুকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। কীভাবে যাবে জানেনা। হাঁটু তো ভাজ করতে পারছে না। কোনোরকমে ধীরে ধীরে হাঁটতে পারছে। কিন্তুু সে আর এক মুহূর্ত থাকতে পারবে না। কী করে সে চপুচাপ বসে তার ফুলের রাণীর কান্না সহ্য করবে! ওতো শক্তি যে তার নেই! শরীরের ব্যাথা শয়ে নিতে পারে। কিন্তুু মনের ব্যাথা নিয়ে একদন্ড শান্তিতে বসতে পারবেনা।

সকাল হওয়ায় রাস্তাঘাটে তেমন গাড়িঘোড়াও নেই। সোহাগের গাড়ি আছে। কিন্তুু সে তো এ অবস্থায় গাড়ি চালাতে পারবেনা। বেশ কিছুক্ষণ রাস্তার পাশের খাম্বা ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা সিএনজি দেখতে পেল। এগিয়ে এসে সিনজিতে উঠে বসল। বসতে পারছে না। দুই পা ভাজ করতে গেলে মনে হচ্ছে জীবন বের হয়ে যাচ্ছে। তখনই ইশরাতের ফুঁপানোর আওয়াজ কানে এসে বাজল যেন। বুকটা হুহু করে উঠল। তার এই কষ্ট ইশরাতের কন্নার চেয়ে তুচ্ছ।

সিএনজির এক সাইড দিকে বসে দুই পা কোনোরকম মেলে দিয়ে বসল। চোখ মুখ কুঁচকে বসে রইল। কখন তার ফুলের রাণীকে দেখতে পাবে! সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনতে লাগলো।

★★

সোহাগের ঘুম ভাঙলে দেখল ইমন তার গায়ের উপর এক পা উঠিয়ে রেখেছে। এক ধাক্কা দিল। ইমন ঘুমের ঘোরে ঠাস করে মেঝেতে পরে গেল। কোমড়ে ব্যাথা পেয়ে চোখ খুলে নিজেকে মেঝেতে দেখে বলল,

"আমি মেঝেতে আসলাম কী করে?"

সোহাগ ভ্রু কুঁচকে বলল,

"আমি পাঠালাম। তুই এতো ভদ্র না যে নিজে নিজে যাবি?"

ইমন কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,

"ইশ! কোমড়ের বারোটা বাজল মনে হয়।"

সেহাগের কথা শুনে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

"তোদের দু'টোর প্রবলেম কী রে? শালা বন্ধু নামের শত্রুর দল। সুযোগ পেলেই আমার মতো মাসুম নিষ্পাপ বাচ্চাটার পিছে লাগিস।"

সোহাগ ইমনকে ভালো করে দেখে বলল,

"২৯ বছরের মাসুম নিষ্পাপ বাচ্চা তুই! আর যাদের ৫ বছর তারা পাপী বুড়ো।"

ইমন হেসে বলল,

"কথাটা মন্দ বলিসনি।"

সোহাগ ইমনের কথা পাত্তা না দিয়ে পাশের বেডের দিকে তাকিয়ে অয়নকে না দেখে ভ্রু কোঁচকালো। ভাবলো হয়তো ওয়াশরুমে গেছে। ওয়াশরুমের দরজায় গিয়ে দেখল কেউ নেই।

ইমন বলল,

"অয়নের বাচ্চা গেল কই? রোগী ও নাকি আমরা? রোগী কেবিন থেকে হাওয়া। আমি আর তুই হসপিটালের বেডে ঘুমাচ্ছি। মানে কিছুতেই হিসাব মিলছে না।"

সোহাগ রেগে বলল,

"বাজে বকা বন্ধ করে অয়নের নাম্বারে কল দে।"

ইমন নিজের ফোন খুঁজল। কোথাও নেই। সোহাগ নিজের ফোন বের করে অয়নের নাম্বারে ফোন দিলে দেখল রিং হচ্ছে, কিন্তুু ধরে না। ইমনের অয়নের বেড এর উপর চোখ পরল। এগিয়ে গিয়ে দেখল অয়নের ফোন, কিন্তুু ডিসপ্লের বারোটা বেজেছে। সোহাগের দিকে ফিরে বলল,

"ওর ফোন তো এখানে। আমার ফোন পাচ্ছিনা। আমার ফোনে কল দে।"

সোহাগ ইমনের ফোনে কল দিলে অয়ন রিসিভ করল,

"কই তুই?"

অয়ন চোখ বুজেই বলল,

"একটা কাজে যাচ্ছি।"

"তা সেই মহান কাজটা কী? সুস্থ হয়ে যাওয়া যেত না? আমাদের নিয়ে যেতে পারতি না?"

অয়নের মাথা ব্যাথা করছে। কথা না বাড়িয়ে বলল,

"আমি ঠিক আছি। চিন্তা করিস না।"

এই বলে কল কেটে দিল।

ইমন প্রশ্ন করল,

"কী বলল?"

ফোন লাউডে ছিল। ইমন শুনেও আবার আক্স করছে। সোহাগ রেগে বলল,

"তের শ্বশুর বাড়ি।"

"আমার শ্বশুর বাড়ি কোথায়?"

"উগান্ডায়।"

এই বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

ইমন হাসল। কিন্তুু চিন্তা হচ্ছে। এই অয়ন তার ফোন নিয়ে গেল কই? কী এমন জরুরি কাজ যে এতো অসুস্থতার মধ্যে যেতে হলো! সেই কাজ সে, সোহাগ কেউ জানেনা। যদিও গুরুতর আঘাত না পাওয়ায় সকাল হতে হতে অনেকটা সুস্থ হয়েছে। তবুও টেনশন তো হয়!

ভাবনা রেখে সেও সোহাগের পিছু গেল।

"বলছি যদি কেউ রোগী খোঁজে, তুই হবি না-কি আমি হবো? আসল রোগী তো পালালো।"

সোহাগ রেগে ইমনের দিকে তাকালো। এই অয়ন বেয়াদবের উপর রাগ লাগছে। তার জন্য হসপিটাল এসে বসে আছে তারা। আর ও চলে গেছে কোন রাজ্যের কাজ করতে।

"আর একটা কথা বললে থাপ্পড় খাবি বেয়াদব।"

"তোদের কী দয়া মায়া হয়না এই মাসুম..."

সোহাগ মাঝখান থেকে বলে উঠল,

"২৯ বছরের মাসুম নিষ্পাপ বাচ্চাকে থাপ্পড় দিতে আমার একটুও মায়া হবেনা বিশ্বাস কর।"

ইমন ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে সোহাগের সাথে সামনের দিকে এগলো।

(Page - DrmShohagStory)

★★

সোহাগ বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেল বাজালো। মৌ এসে খুলে দিল। সোহাগ মৌ কে মৃদু হাসল। মৌ জোরপূর্বক হাসল। সোহাগ খেয়াল করল মৌ এর মন খারাপ। ভাবলো কালকে হয়তো ঠিকঠাক কথা বলতে পারেনি, বাসায় আসতে পারেনি তাই হয়তো মন খারাপ। ঘরে গিয়ে নিমিষেই বউ এর মন ভালো করে দিবে।

"সোহাগ আব্বু তোমার বউ এর এটা কী ধরনের চালচলন? বিয়ে হয়েছে দু'দিন ও হলো না। এখনই শাড়ি ছেড়ে জামা পড়া শুরু করেছে। এই মেয়ে স্বামীর ইচ্ছের তো কোনো দাম ই দিচ্ছে না।"

সোহাগ ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ফুপির কথায় তার পা থেমে যায়। বুঝতে পারে মৌ এর মন খারাপ এর কারণ। এটা নিয়ে তার বউকে কথা শোনানো হয়েছে। এজন্যই তার বউ এর মন খারাপ। দু'দিন আগে বলেছিল তার বউ কালো, আর তার মা তাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে সবাই থাকায় এসব এর এন্সার দিতে পারেনি। তারপর কাজ এর চাপ বেড়ে গেল। এখন আবার অন্য টপিকে গেছে। তার পাশে মৌ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে নিল মৌ কে। এরপর উল্টো ঘুরে বুকে দুইহাত গুঁজে সুমি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

"ফুপি আমি তোমাকে কখন বলেছি যে আমার ইচ্ছে আমার বউ শুধুমাত্র শাড়িই পড়বে। অন্যকিছু পড়তে পারবেনা।?"

সুমি বেগম ভ্রু কুঁচকে বলল,

"বলতে হবে কেন? এটা তো সব স্বামীর ইচ্ছে। আর নিয়ম-কানুন বলে তো একটা ব্যাপার আছে, তাই না?"

"কার বানানো নিয়ম যদি একটু বলতে!"

"বানানো কেন হবে? তোমার আম্মু, আমি, আমরা সবাই বিয়ের পর থেকে শাড়ি পড়ি। নয়তো বাইরের মানুষ এসে বলবে বাড়ির বউ তো অবাধ্য, নিজের মর্জি মতো চলে।"

"যারা বলবে তাদের বলে দিও সোহাগ তার বউকে ৫০% জামা পরে দেখতে পছন্দ করে, আর ৫০% শাড়িতে। তাছাড়া বউটা আমার, বাইরের কোনো মানুষের নয়। তাই তাদের আমার বউকে দেখার দরকার ও নেই।"

"তোমার বউ কী হীরা না-কি মুক্তা-মানিক যে কেউ দেখতে পাবেনা?"

"তার চেয়ের অনেক বেশি দামি।"

সুমি বেগম সোহাগের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

"এ কোন মেয়েকে বিয়ে করে এনেছ নাফিসা? ক'দিনেই তোমার ছেলেকে একদম আঁচলে বেঁধে ফেলেছে।"

সোহাগ একটু এগিয়ে গিয়ে তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

"ফুপি তোমার ভাই বউ আমায় জোর করে বিয়ে দেয়নি। আমি নিজের ইচ্ছেতে নিজের পছন্দেই মৌ কে বিয়ে করেছি। তাই আমার আম্মুকে ব্লেম দিওনা দয়া করে। তাছাড়া বর কে নিজের আঁচলে বাঁধা বউদের সুন্দর একটি গুণ। যারা এটা পারেনা তারা ব্যার্থ।"

সুমি বেগম কিছুটা রেগে বললেন,

"সোহাগ তুমি কিন্তুু আমার মুখে মুখে তর্ক করছ।"

"বিশ্বাস কর ফুপি আমার তর্ক করতে একদমই ভালো লাগে না, আর না তো তোমার সাথে তর্ক করছি। তবে অকারণে কেউ কাওকে কথা শোনালে তাকে সঠিক উত্তর গুলো দিতে না পারলে আমি শান্তি পাইনা।"

এই বলে সোহাগ মৌ এর কাছে এসে তার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে নিজ ঘরের দিকে পা বাড়ালো। কিছু মনে পরায় আবার পিছু ঘুরল। অতঃপর বলল,

"ফুপি আমার চোখ যতদূর বলে তোমার চেয়ে মৌ কিছুটা ফর্সা। তুমি যদি মৌ এর চেয়েও কালো হওয়ার পরও ফুপা তোমায় ভালোবেসে এতোবছর সংসার করতে পারে, সেখানে আমি আমার বউকে কেন ভালোবাসতে পারব না?"

একটু থেমে বলল,

"প্লিজ চেহারা বা গায়ের রং নিয়ে কখনো কাওকে কিছু বলো না ফুপি। আমরা সবাই আল্লাহর সৃষ্টি। তুমি এখনকার চেয়েও হাজারগুণ কালো হলেও আমি তোমায় ফুপি ডাকতাম, ভালোওবাসতাম।

তেমনি আমার বউ যদি পাতিলের কালির মতো কালো হতো তবুও আমি তাকেই ভালোবাসতাম।"

সোহাগ কথা থামিয়ে তার ফুপির দিকে তাকালো। তিনি মাথা নিচু করে আছে। সোহাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আসলে দেখার জন্য সুন্দর দুটি চোখ থাকতে হয়, তাহলেই কেবল আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটা জিনিসের সৌন্দর্যের গভীরতা বোঝা যায়।

আমার কথায় খারাপ লাগলে ক্ষমা করে দিও। কিন্তুু কথাগুলো বলা খুব প্রয়োজন ছিল তাই চুপ থাকতে চেয়েও পারিনি।"

এই বলে সোহাগ মৌ এর হাত ধরে ঘরের দিকে চলল। মৌ অবাক চাহনিতে তার মানুষটার দিকে চেয়ে আছে। কী সুন্দর চিন্তা-ভাবনা! সোহাগকে যত চিনছে তত যেন মৌ অবাক হচ্ছে।

ঘরে গিয়ে সোহাগ দরজা আটকে দিয়ে পিছন ফিরে সাথে সাথে মৌ কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

"সরি মৌ বউ। পুরো ২৪ ঘণ্টা পর তোমায় আমার বুকে নিতে পারলাম।"

মৌ হাসল সোহাগের কথা শুনে।

"আমিও তো ২৪ ঘণ্টা পর আমার বর এর বুকে জায়গা পেলাম।"

সোহাগ ওড়নার উপরেই মৌ ঘাড়ে চুমু আঁকলো। কিছুক্ষণ পর ছেড়ে মৌ এর মুখ নিজের হাতের আঁজলায় নিয়ে দুঃখী মুখ করে বলল,

"আমার ফুপির হয়ে আমি অনেক সরি। আমি চাইনা তোমায় কষ্ট দিতে।

তোমার মনে মেঘের আবির্ভাব ঘটলে তোমার বর এর চোখ থেকে বৃষ্টি ঝরে।"

মৌ নিজের দু'হাত সোহাগের দু'হাতের উপর রেখে হেসে বলল,

"আমি কিছু মনে করিনি। যেটুকু মন খারাপ ছিল আপনার এতো সুন্দর কথা শুনে সব নাই হয়ে গেছে। তবে আপনি ফুপির গায়ের রং নিয়ে কেন কথা বললেন? তিনি হয়তো কষ্ট পেয়েছেন।"

"সে যে আমার বউ কে এতো কথা শোনালো তার বেলায়?"

মৌ বোঝানোর স্বরে বলল,

"তিনি না বুঝে বলেছেন। সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে হতো। এভাবে বলা ঠিক হয়নি। তিনি তো গুরুজন।"

"আমি তো ফুপিকে অসম্মান করে কিছু বলিনি। বুঝিয়েই বলেছি। এর চেয়ে ভালো করে আর বলতে পারব না। আমার দ্বারা হবে না।"

"আচ্ছা পরে শুধু একবার সরি বলবেন ফুপিকে। বলবেন আপনি তার গায়ের রং নিয়ে অন্যকিছু মিন করেননি। আমি জানি আপনি ভুল নয়। কিন্তুু আপনি ঠিক হলেও গুরুজনদের সরি বলে যদি তাদের মনে আপনার জন্য যেটুকু কষ্ট জমা হয়ে থাকে সেটা দূর হয়ে যায় ব্যাপারটা ভালো নয় বলুন?"

সোহাগ মৌ এর কথা মন দিয়ে শুনল। যে মানুষটা তাকে এতো কথা শোনালো, সে তারই কষ্টের কথা ভাবছে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। মাথা নিচু করে মৌ এর কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

"আচ্ছা মহারানী বলব ইনশাআল্লাহ।"

অতঃপর টুপ করে মৌ এর কান বরাবর চুমু খেল।

একদম কানের কাছে সোহাগের নিঃশ্বাস পরায় মৌ কেঁপে উঠল। মাথা সরিয়ে নিল খানিকটা। সোহাগ মৃদু হেসে নিজেও এগিয়ে গিয়ে আবারো একই কাজ করল। অতঃপর মৌ এর গালে পর পর দু’টো চুমু খেয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল,

"তুমি বসো। আমি পাঁচ মিনিটে গোসল সেরে আসছি।"

মৌ চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। সোহাগ হাসল। একটুতেই কেমন লজ্জা পেয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বলল,

"বউকে লজ্জায় বোবাপাখি রূপে দেখতে চাই । নয়তো সবসময় আমার তোতাপাখি বউকেই চাই।"

এই বলে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মৌ যখন সোহাগের কোনো সাড়া পেল না। তখন চোখ খুলল। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ পেয়ে বুঝল গোসলে গেছে। বিছানায় বসে মাথা নিচু করে মৃদু হাসল। আল্লাহর কাছে কখনো শুকরিয়া করতে ভুলে যায়না এমন একজন স্বামী তার জীবনে এনে দেয়ার জন্য।

সোহাগ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ঘাড়ের উপর থেকে তোয়ালে নামিয়ে বিছানায় রাখল, এরপর মৌ এর পাশে বসে মৌ এর ওড়না টেনে নিয়ে মাথা মুছতে লাগলো। মৌ কিছু বলল না, চুপচাপ তার বরের কাণ্ড দেখতে লাগলো। মাথা মোছা হয়ে গেলে সোহাগ বলল,

"আমি এখন ঘুমাবো।"

"কিছু খাবেন না?"

"আপাতত খাবো না। ঘুম থেকে উঠে খেয়ে আবার অফিস যেতে হবে। রাতে ঘুম হয়নি একদম। ছোট একটা বেডে দু'জন ছিলাম। আর ইমনের শোয়ার ধরণ যা বাজে, ওর সাথে কেউ ঘুমাতে পারবে না। ওর বউ এর যে কী হবে আল্লাহই জানে!"

মৌ সোহাগের কথা শুনে হেসে ফেলল।

সোহাগ মৃদু হেসে বলল,

"কী যে শান্তি! বউ এর চাঁদমুখের হাসি দেখার শান্তিই আলাদা!"

"আচ্ছা আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।"

সোহাগ শুয়ে পরল। মৌ দাঁড়িয়ে পরলে, সোহাগ মৌ এর হাত বলল,

"কই যাও?"

"আম্মুকে রান্নার কাজে হেল্প করি। আপনি তো ঘুমাবেন।"

"হ্যাঁ ঘুমাবো। কিন্তুু আমার তো ঘুমের মেডিসিন লাগবে।"

"ওহ! একটু ওয়েট করুন। আনছি। এই বলে পিছন ঘুরলে সোহাগ মৌ এর হাত ধরে নিজের দিকে টান দিল, ফলস্বরূপ মৌ সোহাগের উপর গিয়ে পরে।

মৌ অবাক হয়ে বলল,

" এভাবে ফেললেন কেন? ওষুধ আনব না?"

"আমি বলেছি আমার ডক্টরের প্রেসক্রিপশন করা ওষুধ লাগবে?"

"তাহলে?"

"আমার ব্যাক্তিগত ঘুমের মেডিসিন লাগবে। আর সেটা হলো আমার মৌ বউ।"

মৌ হা করে চেয়ে আছে। এই লোক এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলে। সব তার মাথার উপর দিয়ে যায়।

মৌ কে তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সোহাগ মৌ এর নাক এর সাথে নাক ঘষে মৌ কে নিয়ে ডানপাশ ফিরল। মৌ কে জড়িয়ে ধরে বলল,

"কালকে আমার বউ এর শরীরের ঘ্রাণ কত মিস করেছি জানো? এখন আবার পালাচ্ছো! দিস ইস নট ফেয়ার পাখি।

আর তোমার শ্বাশুড়ি জানে তার ছেলের এখন মেডিসিন লাগবে। তাই টেনশন করনা।"

মৌ চোখ বুজে রইল। এসে থেকে তাকে লজ্জা দিচ্ছে শুধু। সোহাগ খালি গায়ে শুয়েছে। মৌ এর মাথা সোহাগের বুকে গিয়েই ঠেকেছে। মৌ এর মুখে হালকা পানি লাগায় চোখ খুলে দেখল সোহাগের লোমশ বুকে বিন্দু বিন্দু পানি। মৌ সোহাগের বুকে হাত রেখে লোমশে হাত বুলালো। সোহাগ চোখ বুজেই মৃদু হাসল। মৌ এর মাথায় চুমু খেল।

বেশ কিছুক্ষণ পর মৌ এর সাড়াশব্দ না পেয়ে চোখ খুলে দেখল তার বউ ঘুমে তলিয়ে গেছে। কাল রাতে না আসায় মৌ যে অনেকরাত পর্যন্ত জেগে ছিল তা সে জানে। চোখে এতো ঘুম নিয়ে রান্না করতে যাচ্ছিল। সে ঘুমাতে চাইল, তার আগে তার বউ তাকে না নিয়েই ঘুমের রাজ্যে চলে গেল। মৌ এর মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। নিজের সাথে ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে মৌ এর মাথার উপর তার থুতনি রেখে চোখ বুজল। শান্তির ঘুম দেবে এখন।

বিড়বিড় করল,

"বউ শব্দের অর্থ প্রশান্তি হওয়া উচিৎ।"

★★

অয়ন অনেকক্ষণ থেকে ইশরাতের হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফোন করছে তো করছে ওপাশ থেকে ধরার নাম নেই। অয়ন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। না পেরে রাস্তার পাশেই বসল। আরও কয়েকবার ফোন করল, নাহ রিসিভ হয়না। তাই অয়ন ইশরাতের নাম্বারে মেসেজ পাঠালো।

'প্লিজ ইশরাত একবার জানালার কাছে অন্তত আয়। আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি। প্লিজ একবার আয় আমার ফুলের রাণী।'

ইশরাত ফোন হাতে বসেই কাঁদছিল। অভিমানে রিসিভ করেনা, আবার রিসিভ না করায় কান্নাও থামাতে পারেনা। মেসেজ আসলে মেসেজ ওপেন করল। মেসেজটা পড়ে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে জানালার কাছে গেলে দেখতে পায় অয়ন রাস্তার পাশে বসে আছে। ইশরাত অবাক হলো। অয়ন ভাইয়া রাস্তার পাশে কেন বসে আছে? বাইক বা গাড়ি কোনোটাই নেই। কিছু কি হয়েছে? অয়ন চোখ তুলে তাকলে ইশরাতের কাছে অয়নকে কেমন যেন স্বাভাবিক লাগলো না। মাথায় কোনো ব্যাথা না পাওয়ায় ইশরাত দূর থেকে বুঝতে পারছে না। কিন্তুু রাস্তার পাশে বসে আছে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। দ্রুত মাথায় ওড়না জড়িয়ে ছুটল অয়নের কাছে।

রাস্তা পার হয়ে অয়নকে সামনে থেকে দেখে ভ্রু কোঁচকালো ইশরাত। অয়ন মৃদু হেসে বলল,

"এসেছিস ফুলের রানী?"

ইশরাত কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,

"কী হয়েছে তোমার? এভাবে রাস্তায় বসে আছো কেন?"

অয়ন পরনের প্যান্ট উঁচু করল অনেক কষ্টে। এতো ব্যাথা! কিন্তুু তা শয়ে নিল। নয়তে তার ফুলের রাণী যে তাকে ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

ইশরাত অয়নের দু'পায়ের ব্যান্ডেজ দেখে বিস্ময় নিয়ে তাকালো। দ্রুত অয়নের পাশে বসে কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,

"এ কী অবস্থা হয়েছে তোমার অয়ন ভাইয়া?"

ততক্ষণে অয়ন দু'হাতের শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়েছে। ইশরাত এসব দেখে মুখে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে ব্যান্ডেজের উপর হাত বুলিয়ে বলল,

"আমায় কেউ কেন কিছু বলোনি তোমরা? আমি তো উল্টো তোমায় ভুল বুঝেছি। আল্লাহ! কীভাবে এসব হয়েছে? ঠিক আছো তুমি অয়ন ভাইয়া?"

অয়ন ইশরাতের দিকে হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিল। অতঃপর বলল,

"তুই চিন্তা করবি তাই বলেনি। পাগলি মেয়ে! আমি একদম ঠিক আছি। কিচ্ছু হয়নি আমার। এখন কথা বলবি তো আমার সাথে ফুলের রাণী?"

ইশরাত অয়নের হাতের উপর তার মুখ রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"আমি একদম বুঝতে পারিনি অয়ন ভাইয়া। জানলে কখনো এমন করতাম না। তুমি এ অবস্থায় কীভাবে এসেছ? আমায় ক্ষমা করে দাও অয়ন ভাইয়া।"

"ভালোবাসার টানে এসেছি আমার ফুলের রাণীর কাছে। আসলাম তোর হাসি মুখ দেখতে। আর তুই কেঁদেই যাচ্ছিস। এটা কিন্তুু ঠিক নয়।"

ইশরাত নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে জড়ানো কণ্ঠে বলল,

"তুমি দুই মিনিট অপেক্ষা কর। আমি এক্ষুনি বোরখা পরে আসছি।"

"কই যাবি?"

"তোমার সাথে বাসায় যাব। তোমায় একা কিছুতেই যেতে দিব না।"

"তোর তো পরীক্ষা।"

"ওহ হ্যাঁ। আজকে পরীক্ষা আছে। কালকে নেই। আমি আজকে পরীক্ষা দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাব। আবার কালকে চলে আসব ভাইয়ার সাথে।

তুমি একটু ওয়েট কর। আমি দেখি আমার ফ্রেন্ডদের কোনো ছেলে ফ্রেন্ডরা আমার পরীক্ষা পর্যন্ত তোমার থাকার ব্যবস্থা করতে পারে কী না।"

এই বলে দ্রুত বসা থেকে উঠল ইশরাত। চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। হাত দিয়ে মুছে বেখায়ালে রাস্তা পার হতে গেলে কোথা থেকে একটা দ্রুতগামী বাইক ইশরাতের দিকে আসে। অয়ন মাথা তুলে হাসিমুখে ইশরাতের দিকে তাকালেও মুখ থেকে হাসি সরে যায়। দেখতে পায় ইশরাতের থেকে কয়েক হাত দূরে একটি দ্রতগামী বাইক।

তাড়াতড়ি বসা থেকে উঠে জোরে চিল্লিয়ে ওঠে,

"ইশরাত!"

ততক্ষণে ইশরাতকে বাইক মেরে দিয়ে পালিয়েছে। ইশরাত রাস্তার একজায়গা থেকে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ে যায়। মুখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। ঝাপসা চোখে কাওকে তার দিকে দৌড়ে আসতে দেখল যেন, আর কিছু দেখতে পেল না। চোখ বুজে নিল।

চলবে ইনশাআল্লাহ~~~~~~~~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন