ফন্ট সাইজ:
থিম:
সরকার ভাই

৩য় পর্ব

লেখক: কায়ানাত খান কবিতা

#সরকার_ভাই

লেখনীতেঃ #কায়নাত_খান_কবিতা

🚫 কপি নিষিদ্ধ 🚫

পার্টঃ ৩

— ধানিলঙ্কা, তেজ আছে ভালো ‘’

আয়েশার দিকে তাকিয়ে তাকে ধানিলঙ্কার উপাধি দেয় তানভীর। এটা প্রথম বার ছিলো যখন কোনো মেয়ে তানভীরকে পুরোপুরি ভাবে উপেক্ষা করছে, তার অস্তিত্বকে পাত্তাই দিচ্ছে না। পুরো মেলায় আয়েশার পিছনে ছায়ার মতো হয়ে হেঁটতে থাকে তানভীর। কিন্তু আয়েশা তো আয়েশাই। সে পাত্তা তো দিচ্ছেই না বরং তানভীর কে এমন ভাবে উপেক্ষা করে যেভাবে রাস্তায় পরে থাকা ময়লা আর্বজনাকে করা হয়।

ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে হাত ঘড়িতে দেখে সন্ধ্যার প্রায় ধার ধার।

— কাম সারছে!’’

– কী হইবার লাগছে আয়েশা।’’

— আব্বাজান কইছিল মাগরিবের আগে বাইত যাইতে গা। মাগার আমার তো কোনো হুসই নাইক্কা।’’

— আই হাই, আছলেই তো, আই৷ যায় গা।’’

— জ্বলদী ল ছেমড়ি।

আয়েশা তার দুই বান্ধবী, চৈতি এবং জান্নাতিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে মেলা থেকে বের হয়। কারণ সন্ধ্যের সময় পুরো জায়গা নীরব হয়ে যাবে। দোকান পাট ও নেই আশেপাশে সব মেলায় নিজের স্টল দিতে ব্যস্ত। রাস্তা গুলো এতোটাই জনমানব শূন্য যে কেউ কাউকে অপহ’রণ করলে ও কেউ টের পাবে না। তাছাড়া সব থেকে বড় সমস্যা হচ্ছে আরশি নগর থেকে ঢাকার বাস ও ঠিক মতো পাওয়া যাবে না। তার উপরে আজকে আয়েশা তার খোলা জীপ ও সাথে আনতে ভুলে গিয়েছে। তাই তাড়াতাড়ি তাদের পা চালায়। কিন্তু আজ যেনো প্রকৃতি ও তার সাথে ছলনায় মেতে রয়েছে। হঠাৎ করেই ভারি বর্ষণ হতে শুরু করে। পো'ড়ার উপর বি’স্ফোরণ,

ততক্ষণে তারা প্রায় মাঝ রাস্তায়। আবার মেলাতে ফিরে গিয়ে আশ্রয় নিতে চাইলে পুরো কাক ভেজা হয়ে যাবে তারা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছনে, মসজিদ থেকে একটু দূরে মিনা মঞ্জিলে আশ্রয় নেয় তারা তিন বান্ধবী।

— ৭ টার সময় আজ রবিবার নাটক আইবো, এই বা*লের বৃষ্টির লাইগা সব শেষ। ‘’

আয়েশা প্রচন্ড ক্ষোভ ছাড়তে থাকে। আজকে সপ্তাহের শুক্রবার। তার মানে সন্ধ্যা ৭ টাই আজ বরিবার নাটকটি দেখানো হবে। ১৯৯৬ সালের জনপ্রিয় একটি নাটক ছিলো আজ রবিবার। ছোটো থেকে বড় প্রায় সকলের ছিলো আর্কষণের কেন্দ্র বিন্দু এই সপ্তাহিক নাটকটি। স্যার হুমায়ুন আহমেদ রচিত এই মাস্টার পিস নাটকটি সে-সময় ছিলো প্রায় সকলের মুখে মুখে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঝিরঝির করা চ্যানেলেই সকলে দেখতে বসে যেতো আজ রবিবার। আয়েশা কোনো এপিসোড মিস করতো না। যেখানে সবাই বই খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো সেখানে আয়েশা টিভি এবং মার্শাল আর্টের ক্লাস করতো।

আয়েশা সরকার ছিলেন উড়ণ চন্ডী ধরনের মেয়ে মানুষ । যার না ছিলো ভয় আর না ছিলো কোনো কিছুর চিন্তা। যেখানে কম বয়সে সে সময় মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো, সেখানে তার আব্বাজান তাকে মাথায় তুলে রেখেছিলেন। আয়েশা ছিলেন প্রচন্ড ফিল্মি। নায়কা শাবনূরের সব থেকে বড় ভক্ত। তাই নায়কা শাবনূর যেভাবে সাজ আয়েশা ও ঠিক সেভাবেই সাজতেন। এক ছবিতে দেখেছিলেন, নায়কা শাবনূর খোলা জীপে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, ব্যাস সেটাই ছিলো আয়েশার আর্কষণের কেন্দ্র বিন্দু। যেহেতু তার পছন্দের নায়কা জীপে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, সেহেতু সে ও যাবে।

তাই জেদ ধরে জীপ কিনেন। এবং ২ মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করেন শুধু মাত্র জীপ চালানো শিখার জন্য। তার থেকে জীপ হয়ে যায় তার জীবনের সঙ্গী । কিন্তু আজ সেই সঙ্গীকে সাথে না আনার ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ।

মিনা মঞ্জিল তখন প্রায় অন্ধকার।পুরোনো ভাঙা রাজ বাড়ি। বারান্দার রেলিংয়ে মরিচা।বৃষ্টির শব্দে চারপাশটা কেমন থমথমে হয়ে আছে।পুরোটাই ভৌতিক পরিবেশের মতো। এই বুঝি দোতলা থেকে কোনো শাঁকচুন্নি বেরিয়ে এলো।

চৈতি আর জান্নাতি দু’জনেই ভিজে কাঁপতে থাকে। কিন্তু সব থেকে বেশি যেটা তাদের শরীরে কম্পন তুলে দেয় সেটা হলো এই অন্ধকার গা ছমছমে পরিবেশ। এবং ভূতের ভয়। কথায় রয়েছে যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। হলো ও তাই।

সন্ধ্যা ও হলো, তারা আঁটকে ও পড়লো। থেকে থেকে একটা কিছু পরার শব্দ ভেসে আসে আর তারা চমকে উঠে। একটু পর পর শব্দ হয় চৈতি এবং জান্নাতি চিৎকার করে উঠে। তাদের এই অতিরিক্ত ন্যাকামি দেখে আয়েশার প্রচন্ড গা জ্ব'লার মতো ভাব হয়ে যায়।

___ তোর কি একটু ও ডর লাগে না আদুরি?’’

____ তোগো মতো বকরির কলিজা খাইয়া বড় হই নাই যে ডর লাগবো। গরুর কলিজা খাইয়া বড় হইছি। এত্তা ভয় আয়েশা পায় না।’’

—- আদুরি রে, আমার তো সেই ডর লাগতাছে।

— বা'ল ফালা। ডর.. ওটা কি করে?’’

হঠাৎ করে আয়েশার মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে যায়। হাত কাঁপতে থাকে। এতোক্ষণ ধরে বান্ধবীদের এতো সাহস দেওয়ার পর ও নিজে ভয়ে কপোকাত হয়ে যায় সে। কারণ অন্ধকারে একটা ছায়া মূর্তি দোতালার সিড়ি থেকে আস্তে আস্তে তাদের কাছে আসতে থাকে, যেটা দেখে আয়েশার পিলে চমকে যায়। ভূতে ভয় পায় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এতো বাহাদুরি দেখানোর পর ও আয়েশা নিজেই ভয়ে কাঁপছে এখন।

—-- আদুরি রে…. এটা কে?’’

—- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু… এটা তো ভূতততততততততত… পালাআআআআআআ’’’

খুব জোড়ে চিৎকার করে উঠে আয়েশা। যেখানে সে এতো সাহসী হওয়ার পর ও ভয়ে অবস্থা নাজেহাল, সেখানে বাকি দু'জন তো জন্মগতই ভিতু। আয়েশার পিছু তারা ও দৌড় লাগায়। বাইরে বৃষ্টি পিছনে ভূত, তার উপরে অন্ধকার। পুরোটাই একটা হরর সিনেমার ভাইব দিচ্ছে তাদের ।

দৌড়ে শেষ সীমানার কাছে গিয়ে কারো একজনের প্রশস্ত বুকের সাথে বা'রি খায় আয়েশা। অন্ধকারে ঠিক দেখা যায় না কে তার সামনে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আয়েশা তাকে।

—-- ভূতত… পিছনে ভূততত.. প্লিজ বাঁচান! ‘’

ভয়ে রীতিমতো থর থর করে কাঁপতে থাকে আয়েশা। এতোটা ভয় সে কখনোই পাইনি। কিছুক্ষণ চুপচাপ ওভাবেই দাড়িয়ে থাকে সে। এভাবে কিছু ক্ষণ কেটে যাওয়ার পর আয়েশা অনুভব করে। সে কারো হাতের বাঁধনে আটকা। কেউ একজন খুব শক্ত করে তাকে আলিঙ্গন করে রেখেছে।

ঝটকা মে'রে তাকে নিজের থেকে দূরে সরায় আয়েশা। অন্ধকারে চিনা মুশকিল হয়ে যায় কে এই ছায়া মানব।

পরক্ষনেই লাইটার জ্বালিয়ে সামনে ধরে ছায়া মানবটি। এখন তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

সাদা পাঞ্জাবি, তার উপর কালো ওয়েস্টকোট।

চুল নিখুঁতভাবে সেট করা। তার চোখের দৃষ্টি এতোটাই দূর ছিলো যে আয়েশা প্রচন্ড রেগে যায়। মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই গি লে খাবে আয়েশাকে। পিছনে তার দু-জন চ্যালা দাঁড়ানো।

— কী সমস্যা ভাই? মেলা থেকে আমার পিছনে লেগে আছো কেন?’’

আয়েশার মুখে হঠাৎ এতো শুদ্ধ ভাষা শুনে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকায় তানভীর তার পান্ডবদের পানে। সে কী আদোও ঢাকাইয়া? এতো শুদ্ধ ভাষা।

—- আপনাকে কেউ ভয় পেতে শেখায়নি আয়েশা?’’

অপরিচিত ব্যক্তির মুখে নিজের নাম শুনে একটু চিন্তায় পরে যায় সে। কারণ তানভীর সরকার কে এটা তো আয়েশা জানে, কলেজের ভিপি কম টিভিতে ছাত্র নেতা নুরুল ইসলামের খুনিদের ধরার জন্য আনন্দোল করার সময় সরকার ভাই হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলো তানভীর সরকার । যেখানে দেশ এবং দশের সাধারণ মানুষ তাকে চিনে আয়েশা ও যে চিনবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার কাছে তানভীরকে বকাটে ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। ভার্সিটিতে তাকে শুধু মা'রধর করতেই দেখেছে আয়েশা। তাই বকা'টে তানভীরই তার কাছে পরিচিত । আর্দশ নেতা সরকার ভাই নয়।

—- হালাল খাইয়া বড় হয়ছি তো, তাই ভয় ডর একটু কমই আমার'’

— তেজ থাকা ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত তেজ থাকা ভালো না আয়েশা। ‘’

— ক্যান? তেজ কী কারো বাপের সম্পত্তি? শুধু তারই তেজ থাকবো আর কারো থাকবো না?’’

আয়েশার চ্যাটান চ্যাটান কথা গুলোর প্রতি উত্তরে আর কিছু বলতে পারে না তানভীর। একদম চুপ হয়ে যায় সে। কিন্তু বিষয়টা তার পান্ডবদের ভালো লাগে না। তাদের সামনে একটা পুচকি মেয়ে তাদের বড় ভাইয়ের মুখে মুখে কথা বলছে, এটা রীতিমতো অপমান তাদের জন্য। রাগে ফুলতে থাকে নবাব।

সে প্রতিবাদ করে উঠে।

—- এই মেয়ে, মুখ সামলে….! ‘’

পুরো কথা শেষ করার আগেই তানভীর হাত উঠিয়ে নবাবকে থামিয়ে দেয়। সাথে সাথে চুপ হয়ে যায় নবাব। ততক্ষণে তানভীরের হাতে থাকা লাই টার টি ও নিভে যায়, পরিবেশ আবারো অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তারপর বোঝা যাচ্ছিল আয়েশা এবং তানভীর একজন আরেকজনের পানে খুব কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।

কিছু ক্ষণের ব্যবধানে আয়েশার পিছন থেকে কাইল্লা চো'রা মোম বাতি জ্বা’লিয়ে আসতে থাকে সাথে তার দুই বান্ধবী।

—- আদর?’’

জান্নাতির ডাকে পিছনে ফিরে তাকায় আয়েশা। সাথে চৈতি ও ছিলো। কাইল্লা চো'রাকে দেখে আয়োশা বোঝে যায়, একটু আগে দোতলা থেকে কে হেঁটে হেঁটে তাদের পানে আসছিলো। রাগে কিটিমিটি করতে থাকে আয়েশা।

—- যেমনি বাঁদর তেমনি তার সেনা।’’

হনহনিয়ে চলে যেতে থাকে আয়েশা। সাথে তার বান্ধবীরা ও পিছু নেয়।

—- ভাই বাদর কইছে আমাগো!’’

তানভীর কিছু না বলে মিটমিট করে হাসতে থাকে। তার মুখ দেখে যে কেউ বলে দিবে মন প্রফুল্ল।

—-- নবাব।’’

— জ্বী বড় ভাই। ‘’

— এই ধানিলঙ্কারে আমার চাই। বউ বানামু ওরে। যত পোলাপান আছে খবর পাঠা।

—- কী বড় ভাই?’’

— আজকের পর থেকে আয়েশা সিদ্দিকা আদর তানভীর সরকারের পার্সোনাল প্রপার্টি। যে ওর দিকে তাকাইবো, তার চোখ তুলে মার্বেল খেলবো।’’

চলবে।

কেমন লাগছে সরকার ভাই? কী মনে হয় তামিমকে ছাড়িয়ে যাবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন