__এমন একটা ধানি লঙ্কা আমার কপালেই জুটলো।”
মাটিতে ধপাস করে বসে পড়ে হায় হতাশ করতে থাকে তানভীর।এদিন যাকে খোঁজার জন্য পোস্টার বানিয়ে ও লাভ হলো। তাকেই কি-না না চাইতেই পেয়ে গেলো।তার উপরে আচ্ছা খাসা বিয়েটা হচ্ছিল, সেটা ও ভেস্তে গেলো।তানভীর সরকার এতোটাই হতাশা গ্রস্ত হয়ে পরে তার পঞ্চ পাণ্ডব কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
এক জোড়া চোখ। যার খোঁজে মোটামুটি ছন্নছাড়া হয়ে যায় তানভীর সরকার। সেই মেয়েটিই তার চোখের সামনে ঘুরঘুর করে বেড়িয়েছে এতোদিন ধরে। কিন্তু সে টেরই পেলো না। কোথায় রয়েছে অভাগা যেদিকেই যায় সেদিকেই পানি শুকিয়ে যায়।তানভীর সরকারের বিষয়ে কথাটি একদম খাপেখাপ মিলে যায়।
বেশ কিছু ক্ষণ ধরে তানভীর সরকারকে চুপ থাকতে দেখে নবাব সাহস জুগিয়ে বলে,__বড় ভাই!এইডাই কী ভাবিসাপ নি?” নবাবের কথা শুনে মাটিতে বসা তানভীর মাথা উঁচু করে তাকায়।তারপর মাথা নাড়ে দু-বার উপর নিচ করে। নবাব বলে,__খাইসে রে।শেষমেশ আপনের জাত শত্রু।” কথাটি শেষ হতেই তানভীর সরকার উঠে দাড়ায়। এবং শরীরে মোচড় দিয়ে বলে,__বউ আমার ডায়নি..তাই তাকে এতো দিন চিনি নি।”
এমন সময় ও তানভীর সরকারের কথা পেটে খিল ধরিয়ে দিতে বাধ্য। তবে পঞ্চ পাণ্ডব জানে, এখন হাসাহাসি করা বিপদজনক। তাদের পিছন সাইটে লাঠি চার্জ হবে। তাই প্রত্যেকেই মুখে কুলু পাতে।
মাঝ থেকে কানা বলে ওঠে, __ভাই! আমাগো হবু ভাবি কিন্তু মারামারি পছন্দ করে না।” কানার কথা শেষ হতেই তানভীর সরকার হাতের রাম'দাটি নবাবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পকেট থেকে রোদ চশমা বের করে পরে, চুল ঠিক করতে করতে বলে,__আমি আবার মারামারি করলাম কবে? এক্সকিউজ মি।’ তানভীর সরকার ভদ্রলোকের মতো বেরিয়ে যেতে থাকে মিনা মঞ্জিল থেকে। যেন তার মতো সাধু লোক আর একটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
হঠাৎ পাজি থেকে হাজিতে রূপান্তরিত হওয়া তানভীরের রুপ দেখে জাম্বু বলে,__ভাইয়ের মুড আর আমার পেট। কখন কমে আর বাড়ে কিছুই বুঝি না বা'ল।’ অট্টহাসিতে ফেটে পরে সকলে।এখন শুধু দেখা বাকি তানভীর সরকার আর পরিবর্তন হয়।তাও একটি মেয়ের জন্য।
__দৌড়াতে দৌড়াতে বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌঁছায় আয়েশা এবং তার সখীগন। তারা প্রত্যেকেই প্রচন্ড হাঁপাতে থাকে। আজ তার উপরে জীপ ও আনেনি আয়েশা। যার ফলে তাদের বাসে করে যেতে হচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে জান্নাতি বলে,__পারিসা লো।আর একটু হইলে তিনজন মর'তাম।’ পাশ থেকে বোরখা ঠিক করতে করতে কাকুলি বলে,__বাপের জন্মে এমন ভয় পাই নাইক্কা। কী দৌড়টাই না করাইলো মা গো।” জান্নাতি এবং কাকুলির কথা আয়েশা শুনছিলো ঠিকই।কিন্তু তার মস্তিষ্কে বোধ হয় অন্য কিছু চলছিলো। সে তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে ইশারা করে সামনের দিকে দেখিয়ে বলে,__বাস আইতাছে।’
তিন জনই বাসে উঠার জন্য সুন্দর মতো দাঁড়িয়ে পরে। আরশিনগর থেকে পুরান ঢাকা মোটা দেড় ঘন্টার মতো লাগে। আয়েশার ইচ্ছে ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।কিন্তু তারা তিনজন চান্সই পায়নি। যার ফলে একটু দূর হলে ও আরেকটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা চেষ্টা করে।এবং সফল ও হয়। কিন্তু যাতায়াতের বেলা তিনজনেরই জান বের হয়ে যায়। সপ্তাহে তিন দিন বেশ ঝামেলা পোহাতে হয় তাদের। তবু স্বপ্নের কাছে জার্নি আর কী জিনিস?
একবার স্বপ্ন পূর্ণ হলে এই জার্নি তখন অন্যের জন্য অনুপ্রেরণা হবে।তাই তারা কষ্ট হলে ও পড়াশোনা চালিয়ে যায়।
দেখতে দেখতে রঙচটা বাসটি তাদের সামনে এসে দাড়ায়। লোক সংখ্যা কম হওয়ায় তারা সহজেই উঠে মাঝ বরাবর সিটে বসে পরে। প্রচন্ড ক্লান্ত থাকায় তারা আগে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে।
বেশ কিছু ক্ষণ দম নেওয়ার পর আয়েশা বলে,__সেদিনের নকল সালমান শাহ, আর কেউ না। এই গরু চোরই ছিলো।’ মুখে সবে মাত্র পানি নেওয়া জান্নাতি ফিক করে মুখ থেকে পানি বের করে ফেলে। আয়েশার প্রথম ক্রাশ শেষ মেষ এই খু'নি।
জান্নাতি এবং কাকুলি একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকায়। আয়েশা তেতে রয়েছে এটা তো বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এবার কী হবে?কারণ আয়েশা তো ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নয়। তাকে দৌড় করিয়েছে। সে এর থেকে ডাবল দৌড় করিয়েই ছাড়বে। তার উপরে তার চোখের তীক্ষ্ণ চাহুনি বলে দিচ্ছে তানভীরের কপালে দুঃখ না বরং কষ্টের পাহাড় রয়েছে।
দেখতে দেখতে সূর্যটি ডুবে যেতে থাকে। কিন্তু আয়েশার মনের খোরাক নয়। সে পন করে ফেলেছিলো। তানভীর সরকারকে দেখে নিবে।
মিনা মঞ্জিলের নিচ তলায় কষায় খানার মাঝে মাটিতে শরীর ছেড়ে দিয়ে শুয়ে থাকে তানভীর সরকার। চোখ জোড়া আজ প্রশান্তির ছায়াতে ভরপুর।যেন অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছে অমূল্য রতন।তানভীর সরকার আনমনেই বলে,__ মেয়ে তো না। পুরা একটা আগুন। বউ হিসেবে খারাপ হবে না।' নিজের নিজের মনকে শান্তকে দিতে থাকে তানভীর। কারণ সে যেমন শান্ত মেয়ে পছন্দ করতো। আয়েশা ছিলো ঠিক তার উল্টো। একদম ধানি লঙ্কা। যার ফলে তানভীর সরকার তাকে ধানি লঙ্কা নামটি উপাধি দেয়।
আয়েশার কথা ভাবতে ভাবতে তানভীর সেখানেই ঘুমিয়ে পরে। মন শুধু বার বার বলছিলো কবে দেখা পাবে সেই কাঙ্ক্ষিত রমনীর।
দেখতে দেখতে দুটো দিন এভাবেই কেটে যায়। এই দু-দিনে সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে চললে ও তানভীর সরকার ছিলো অস্বাভাবিক। ভিতর ভিতর আয়েশাকে দেখার এক অতৃপ্ত বাসনা জেঁকে বসে তার মনে। শুধু মন বলছিলো কখন দেখতে পারবে তার পছন্দের রমনীকে?
সোমবার সকালটা ছিলো একদম নিয়মমাফিক।১৯৯৬ সালের সেই সময়কার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে যেমনটা হওয়া স্বাভাবিক। বড় বড় কাঠের বেঞ্চ, সামনে লম্বা ডায়াস, আর চক-ডাস্টে ভরা ব্ল্যাকবোর্ড। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের জায়গা ঠিক করে বসে পড়ে।ছেলেরা সাধারণত একপাশে, মেয়েরা আরেকপাশে। শিক্ষক ঢোকার সাথে সাথেই পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে যায়।কারণ তখন ক্লাসে শৃঙ্খলার ব্যাপারটা ছিলো বেশ কড়াকড়ি।
আয়েশা তার বান্ধবীদের সাথে মেয়েদের সারিতে বসে মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনতে থাকে। তার সামনে খোলা খাতা, হাতে কলম।প্রতিটা কথা ধরার চেষ্টা করতে থাকে সে। এমন সময় দরজার পাশে হালকা গুঞ্জন ওঠে। সবাই না তাকালেও, কিছু চোখ ঘুরে যায় ওদিকে।তানভীর সরকার।ভার্সিটির ভিপি। সিনিয়র,
তার প্রবেশটা সবসময়ই একটু আলাদা।না চাইলেও একটা উপস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু ক্লাস চলাকালীন কোনো সিনিয়রের ঢুকে পড়া বা বসে পড়া।এটা একেবারেই নিয়মবহির্ভূত। সাধারণত কেউ এমন সাহস করে না, বিশেষ করে শিক্ষকের সামনে।তবুও সে ঢুকে পড়ে।
কোনো অনুমতি না নিয়েই ধীর পায়ে হেঁটে এসে আয়েশার ঠিক ওপাশের বেঞ্চে বসে পড়ে সে। কয়েকজন ছাত্র একে অপরের দিকে তাকাতে থাকে। শিক্ষক একবার তাকিয়েছিলেন, কিন্তু কিছু বলে না। হয়তো ভিপির প্রভাব, অথবা পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত নীরবতা।
আয়েশা প্রথমে নিজেকে সামলে নেয়। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে সে তাকায় তানভীর সরকারের দিকে। তাকাতেই দেখা গালে হাত দিয়ে তানভীর সরকার তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
আয়েশা বিরক্ত হয়ে মুখ বাকায়, আর কোনো কথা না বলে উঠে অন্য বেঞ্চে গিয়ে বসে পরে। তার বান্ধবীরা চোখাচোখি করতে থাকে। কিছুটা অবাক, কিছুটা মজা সবাই পাচ্ছিল।
দুই মিনিটও হয় না।তানভীর আবার উঠে দাঁড়ায়। পুরো ক্লাসের মাঝখান দিয়ে হেঁটে সে আবার ও আয়েশার পাশের সিটে গিয়ে বসে পড়ে।আয়েশার ধৈর্য শেষের দিকে।সে আবার উঠে যায়।এবার একটু দূরের বেঞ্চে। কিন্তু একই ঘটনা। তানভীর যেন একগুঁয়ে হয়ে যায়। সে বারবার জায়গা বদলাতে থাকে, আর প্রতিবারই আয়েশার পাশে গিয়ে বসে পরে।
কপাল কুঁচকে দাড়িয়ে পরে। তারপর হনহন করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায়। আয়েশা বের হওয়ার সাথে সাথে তানভীর সরকার ও বেড়িয়ে পরে। এবং জুকের মতো আয়েশার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। আয়েশার পাত্তা না পেয়ে তানভীর সরকার একটা ছোটো ইট নিয়ে আয়েশার পিছনে ঢিল মারে। কিন্তু অসাবধানতার ফলে ঢিলটা আয়েশার একদম মাথায় পিছনে লাগে। বেশ ব্যাথা পায় সে। পিছনে হাত দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,__ ম'রার পাখনা গজায়ছে তোর?'
চলবে।
#সরকার_ভাই
লেখনীতেঃ #কায়নাত_খান_কবিতা
পার্টঃ ৯