ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

১০ম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#পর্বঃ১০

~~অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ 🚫~~

​"রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারিদিকে সকালের আলো ফুটে উঠল। ভোরের নরম রোদে পুরো পৃথিবীটা যেন এক নতুন মায়ায় জেগে উঠছে। চারপাশের পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে একটা স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি হলো।"

লন্ডনের কেনসিংটনের সেই স্নিগ্ধ সকালের আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথেই চৌধুরী বাড়ির সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই বাড়ির সকালটা সবসময়ই নিয়ম, শৃঙ্খলা আর একরাশ প্রশান্তি দিয়ে শুরু হয়।

ইলা বরাবরের মতোই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। ফজরের নামাজ শেষ করে সে কিছুক্ষণ বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াল। ভোরের ঠান্ডা হাওয়াটা যেন মুহূর্তেই তার মনটাকে সতেজ করে দিল। এরপর সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তার সাধের বড় বাগানটার দিকে। পরম মমতায় একে একে প্রতিটা গাছের গোড়ায় পানি দিতে লাগল সে। ভোরের নরম রোদে পানির ছোট ছোট ফোঁটাগুলো যখন পাতার ওপর মুক্তোর মতো ঝলমল করছিল, তখন ইলার ঠোঁটেও ফুটে উঠল তৃপ্তির এক মিষ্টি হাসি।

গাছগুলোর যত্ন নেওয়া শেষ করে ইলা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সোজা নিজের পড়ার টেবিলে গিয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে গেল। পড়াশোনার ব্যাপারে সে সবসময়ই ভীষণ সিরিয়াস।

খানিকটা সময় পর চৌধুরী ভিলার ছোট রাজকুমার, এহান সাহেব, চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠল। এহান জেগে উঠতেই ইলার পড়াশোনায় ক্ষণিকের বিরতি পড়ল। সে পরম যত্নে তার আদরের ছোট ভাইটাকে ফ্রেশ করিয়ে সুন্দর একটা জামা পরিয়ে একদম পরিপাটি করে দিল।

সকালের এই মিষ্টি সময়টায় এহানকে নিয়ে ঘরে বসে থাকার মানুষ ইলা নয়। তাই এহানের প্রিয় ছোট সাইকেলটা সঙ্গে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল কেনসিংটনের বিখ্যাত Hyde Park-এর উদ্দেশ্যে।

হাইড পার্কের এক কোণে, যেখানে সবুজের সমারোহটা একটু বেশিই, সেখানে একটা কাঠের বেঞ্চে ইলা পরম যত্নে তার পিচ্চি ভাই এহানকে বসিয়ে দিল। এহানের পুতুলের মতো ছোট্ট সাইকেলটা রইল বেঞ্চের ঠিক পাশেই।

এহানকে শান্ত হয়ে বসে থাকতে বলে ইলা নিজেই একটু দূরে গিয়ে সকালের এক্সারসাইজ শুরু করল।

প্রথমে হালকা জগিং আর স্ট্রেচিং দিয়ে শরীরটাকে একটু গরম করে নিল সে। এরপর পার্কের তাজা বাতাস বুকভরে টেনে নিয়ে মন দিয়ে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ আর কিছু ইয়োগা করতে লাগল।

ইলা যখন পুরো মনোযোগ দিয়ে শরীরচর্চায় ব্যস্ত, তখন বেঞ্চে বসে থাকা ছোট্ট এহান সাহেবের পৃথিবীটা যেন এক জায়গায় থমকে গেছে। পার্কের অন্য কোনো প্রজাপতি, ফুল কিংবা রঙিন সাইকেলের দিকে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার গোলগোল মায়াভরা চোখ দুটো অপলক দৃষ্টিতে শুধু তার লছি আপুর দিকেই আটকে আছে। যেন এই পুরো পৃথিবীতে তার লছির চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নেই।

এক্সারসাইজ করতে করতেই ইলা খেয়াল করল, তার পিচ্চি ভাইটা কেমন পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

ইলা হালকা হেসে, একটা পোজ হোল্ড করেই আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল—

‘কী ব্যাপার, আমার প্রিন্স এত একধ্যানে কী দেখছে, হুম?’

এহান নিজের ছোট্ট দুই গালে হাত রেখে মাথাটা একটু কাত করল। তারপর মুগ্ধ গলায় আধো-আধো সুরে বলে উঠল—

‘তোমাকে লছি… তি থুনধল তুমি!’

(কী সুন্দর তুমি!)

ছোট্ট ভাইয়ের মুখে এমন হুট করে নিজের রূপের প্রশংসা শুনে ইলা আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। কারণ সে তো মনে মনে জানতই, তার এই ছোট্ট লাড্ডু বাবুটা ঠিক এমন কিছুই বলবে।

ইলা যখন প্রাণ খুলে হাসছিল, তখন ভোরের মিষ্টি আলো এসে পড়ল তার মুখে। সেই হাসির সাথে সাথে তার ফর্সা দুই গালে গভীর দুটো টোল স্পষ্ট হয়ে উঠল। শুধু গালেই নয়, থুতনিতে থাকা ছোট্ট মিষ্টি টোলটাও যেন তার হাসির সৌন্দর্যকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল।

লছির মুখের সেই জাদুকরী হাসি আর গাল-থুতনির টোল দেখে চার বছরের এহান সাহেব পুরো হাঁ হয়ে গেল। বিস্ময়ে সে নিজের ছোট ছোট আঙুল মুখের ভেতর পুরে চোখ দুটো আরও বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।

তার ছোট্ট মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

তার লছি আপুর মুখে এই ছোট ছোট গর্তগুলো কোথা থেকে আসে? হাসলেই কেন ওগুলো এত সুন্দর লাগে?

মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে শুধু তাকিয়েই রইল তার প্রিয় লছির দিকে।

এহান সাহেব শুধু ওখানেই দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে নিজের ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে গাল ধরে আরও কত কী যে আধো-আধো গলায় বলতে লাগল!

কখনো বলল—

‘লছি, তোমার থালে দুইটা চোথ ঘর আছে… হাসলে লুকায় যায়!’

আবার কখনো ইলার হাত টেনে ধরে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে উঠল—

‘তুমি এতো থুনধল কেন? আমি বড় হয়ে তোমাল মতো তাউকে বিয়ে তলবো!’

ছোট্ট ভাইয়ের মুখে এমন পাকা পাকা আর বিয়ের কথা শুনে ইলা হাসতে হাসতে পুরো শেষ! সে দ্রুত এহানকে কোলে তুলে নিয়ে তার নরম গালে টুসটুস করে কয়েকটা আদর এঁকে দিল।

ভাইয়ের এই নিষ্পাপ ভালোবাসা আর মিষ্টি কথার জাদুতে কখন যে পার্কের সোনালি সকালটা গড়িয়ে গেল, তা ইলা টেরই পেল না।

হুট করেই ইলার ট্রাউজারের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সে খানিকটা চমকে উঠল। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল প্রায় নয়টা ছুঁইছুঁই। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—‘আম্মু’।

ইলা দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে মিষ্টি গলায় বলল—

‘আসসালামু আলাইকুম, আম্মু।’

ওপাশ থেকে মিসেস চৌধুরী স্নেহভরা কণ্ঠে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন—

‘ওয়ালাইকুমুস সালাম, মা। তোরা কি এখনও পার্কেই আছিস? এবার ঝটপট বাসায় চলে আয় তো। তোর পাপা নাস্তার টেবিলে বসে তোদের দুজনের জন্য অপেক্ষা করছে। উনার আবার একটু পরেই একটা ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে। তোদের না দেখে তো নাস্তাই মুখে তুলছেন না।’

মায়ের কথা শুনে ইলা হালকা হেসে বেঞ্চের ওপর রাখা এহানের পুঁচকে সাইকেলটা এক হাতে ধরল। অন্য হাতে শক্ত করে এহানের ছোট্ট হাতটা আঁকড়ে ধরে বলল—

‘হ্যাঁ আম্মু, এই তো আমরা এখনই রওনা দিচ্ছি। আর দশ মিনিটের মধ্যেই চৌধুরী ভিলায় হাজির হয়ে যাব।’

ফোনটা রেখে ইলা এহানের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল—

‘কী হে প্রিন্স? পাপা কিন্তু ডাইনিং টেবিলে বসে অপেক্ষা করছে। জলদি চলো, নয়তো তোমার চকলেট পাফগুলো পাপা একাই খেয়ে নেবে!’

চকলেটের নাম শুনতেই এহান সাহেব তার ছোট্ট সাইকেলের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে এমন জোরে হাঁটা শুরু করল, যেন সে এখনই কোনো রেসে নেমে পড়েছে!

আর ইলা তার পিছু পিছু খিলখিল করে হাসতে হাসতে এগিয়ে চলল।

ঠিক দশ মিনিটের মাথায় ইলা এহানকে নিয়ে চৌধুরী ভিলায় ফিরল। ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা মিসেস চৌধুরী মেয়ের ঘামে ভেজা অবস্থা দেখে অবাক হয়ে বললেন—

‘কী রে রোজ! এত দৌড়াদৌড়ি করছিস না...?’

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ইলার পেছন থেকে সামনে এসে দাঁড়াল এহান। ছোট্ট মুখটা রাগে ফুলে লাল টমেটো হয়ে আছে। কারণ তার আদরের লছিকে অন্য কারও মুখে ‘রোজ’ নামে ডাকা সে একদমই সহ্য করতে পারে না।

ছেলের সেই অধিকারভরা চাহনি দেখেই মিসেস চৌধুরী নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। দ্রুত হেসে বললেন—

‘ইলা, মা তুই আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। তোর আবার ভার্সিটিও যেতে হবে না?’

মায়ের আচমকা ভোলবদল আর এহানের গম্ভীর ফুলা মুখ দেখে ইলা মনে মনে হেসে ফেলল। এহানের চুলে আলতো করে বিলি কেটে সে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

মিনিট পনেরোর মধ্যে ইলা সুন্দর করে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো। ডাইনিং টেবিলের দিকে এগোতেই দেখল মিস্টার চৌধুরী খবরের কাগজে চোখ রাখছেন। ইলা তার বাবার চেয়ারের পাশে চেয়ার টেনে বসে এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল—

— “গুড মর্নিং, পাপা!”

ঠিক সেই মুহূর্তেই পিচ্চি ডন এহান সাহেব সুযোগ বুঝে শুরশুর করে এসে ধপাস করে ইলার কোলে উঠে বসল। ইলাও স্নেহভরে এক হাতে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।

অন্যদিকে মিসেস চৌধুরী ডাইনিং টেবিলে গরম গরম নাস্তা পরিবেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইলা বাবার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে চামচ দিয়ে আদর করে এহানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিল।

কথার মাঝেই মিস্টার চৌধুরী চায়ের কাপ টেবিলে রেখে কিছুটা গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা গলায় বললেন—

— “ইলা মা, একটা খবর আছে। তোমার বড় আপু আফরার বিয়ে ঠিক হয়েছে বাংলাদেশে।”

“আফরা আপুর বিয়ে!”—ইলা খুশি হলেও পরক্ষণেই তার ভেতরে অজানা এক অস্বস্তি খচখচ করে উঠল।

মিস্টার চৌধুরী মেয়ের মুখের ভাব লক্ষ্য করে ধীরে বললেন—

— “হ্যাঁ মা। বড় ভাই ফোন করেছিলেন, সবাইকে নিয়ে এখনই বাংলাদেশে যেতে বলেছেন। প্রথমে আমি সরাসরি না করে দিয়েছিলাম।”

একটু থেমে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— “কিন্তু আফরা মা ফোনে কেঁদেই ফেলেছিল। বলল, ‘চাচ্চু, জীবনের এত বড় দিনে যদি তোমরা না থাকো, আমি বিয়ে করব না। ইলা কেন আসতে চায় না জানি না, কিন্তু ওকে ছাড়া আমার বিয়ে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’”

এই আবেগভরা কথাগুলো শুনে ইলার বুকের ভেতরটা হালকা ধক করে উঠল। সে বুঝে গেল—এবার আর শুধু ফোনে না বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

মিস্টার চৌধুরী এবার ইলার হাতটা ধরে নরম গলায় বললেন—

— “তাই বড় ভাই, মেজো ভাই আর ফুফু সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সবাই সপরিবারে আগামী সপ্তাহে লন্ডনে আসবে। তোমার সব কাজিনরাও আসছে। আফরা স্পষ্ট বলেছে, তোকে বুঝিয়ে হলেও সে এবার তোকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবে। এবার আর কোনো অজুহাত চলবে না, মা।”

এই কথাগুলো শুনে ইলার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। চোখের ভেতরে ভেসে উঠল অজানা কোনো পুরোনো স্মৃতির ছায়া।

সে মনে মনে ভাবল—যে বাংলাদেশ থেকে সে এত দূরে পালিয়ে এসেছে, নিয়তি কি আবার তাকে সেখানেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে?

কোলের মধ্যে বসে থাকা এহান সাহেব অবশ্য এত জটিলতা কিছুই বুঝল না। সে ইলাকে চুপ থাকতে দেখে আধো গলায় অভিযোগ করে উঠল—

— “লছি, তুমি আমার খাওয়ার দিকে তাকাচ্ছো না কেন? পাপা কি তোমাকে বকেছে?”

এহানের কথা শুনে ইলা বাস্তবে ফিরে এলো। ভেতরের অস্বস্তি লুকিয়ে সে ভাইয়ের গালে একটা আদুরে চুমু খেয়ে বলল—

— “না রে পুচকু, পাপা বকেনি। খা, জলদি খেয়ে নে—ভার্সিটি যেতে হবে তো আমার!”

--"ইলার চোখের কোণে জমে ওঠা সেই ক্ষণিকের নীরবতা আর উদাস ছায়া ডাইনিং টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে মিসেস চৌধুরীর চোখ এড়াল না। মায়ের মন—মেয়ের ভেতরের ঝড়টা এক পলকেই তিনি টের পেলেন। তিনি দ্রুত মিস্টার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন—আর এক মুহূর্তও বাংলাদেশ বা বিয়ের টপিক নয়।

মিস্টার চৌধুরীও স্ত্রীর সেই ইশারা বুঝে নিলেন। হালকা কেশে গম্ভীরতা ঝেড়ে ফেলে তিনি বিষয়টা বদলে দিলেন

— “আচ্ছা আম্মু, এসব পরে হবে। বল তো, কালকের রেসের প্রস্তুতি কেমন?”

হঠাৎ প্রশ্নে ইলা একটু থমকে গেল। প্লেট থেকে চোখ তুলে অবাক হয়ে বলল—

— “কী বললে, পাপা? কালকের রেস?”

মিস্টার চৌধুরী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কিছুটা চিন্তিত গলায় বললেন—

— “হ্যাঁ মা। তোর প্রিপারেশন সবসময়ই ভালো, সেটা জানি। কিন্তু একটা কথা আমাকে ভাবায়। তুই সবসময় একাই রেস করিস কেন? অন্যরা তো বড় বড় টিমের হয়ে নামে। তুই কেন কোনো অফিসিয়াল টিমে যোগ দিস না? একা একা চাপ নেওয়াটা কি সহজ, মা?”

বাবার প্রশ্ন শুনে ইলার মুখে এক ম্লান অথচ দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে চামচটা রেখে বাবার চোখের দিকে তাকাল।

— “পাপা, ট্র্যাকে যখন স্পিড ২০০ পার করে, তখন পুরো দুনিয়াটা ঝাপসা হয়ে যায়। তখন নিজের বাইকের হ্যান্ডেল আর নিজের ওপর ছাড়া আর কারো ওপর ভরসা করা যায় না—আমি ভয় পাই। কোনো বড় টিম মানেই নিয়ম, পলিটিক্স আর কারো অধীনে থাকা। আমি ট্র্যাকে স্বাধীনতার জন্য করি, পাপা। কোনো টিমের হয়ে না—আমি চৌধুরী বাড়ির ইলারা রোজ চৌধুরী হয়ে নিজের যোগ্যতায় ট্রফি জিততে চাই। টিম নেই তো কী হয়েছে? তোমার আর আম্মুর দোয়া তো সবসময় আমার সাথে আছে।”

মেয়ের এই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী কথা শুনে মিস্টার চৌধুরী আর কিছু বললেন না। তাঁর চোখে ভেসে উঠল গর্বের ছায়া।

ঠিক তখনই কোলে বসে থাকা পিচ্চি ডন এহান সাহেব পুরো “টিম” বিষয়টা না বুঝেই নিজের স্টাইলে ঢুকে পড়ল। সে ইলার হাত টেনে ধরে বলল—

— “লছি! তোমার টিম নাই তো কী হইছে? আমি আছি! আমি তোমাল টিম! আমি সাইকেল নিয়ে থবাইরে ধুইয়া দিব!”

এহানের এই বীরত্বপূর্ণ ঘোষণায় মুহূর্তেই পুরো ডাইনিং টেবিলে হাসির রোল পড়ে গেল।

মিসেস চৌধুরী হাসতে হাসতে এহানের গালে চুমু খেয়ে বললেন—

— “হ্যাঁ বাবা, তুমিই তোমার লছির সবচেয়ে বড় টিম!”

ইলাও খিলখিল করে হেসে ভাইকে জড়িয়ে ধরল। এহানের এই নিষ্পাপ কাণ্ডে ডাইনিং টেবিলের ভারী বাতাস এক মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল—ফিরে এলো এক টুকরো উষ্ণতা, হাসি আর শান্তি।

---এইভাবেই চৌধুরী ভিলার ডাইনিং টেবিলে হাসি-আনন্দে সকালের নাস্তা শেষ হলো। ইলার মনও পরিবারের ভালোবাসায় হালকা হয়ে গেল।

নাস্তা শেষে ইলা ব্যাগ আর গাড়ির চাবি নিয়ে বাবার সঙ্গে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিল। ঠিক তখনই চার বছরের এহান শক্ত করে ইলার ওড়নার কোণ ধরে দাঁড়িয়ে রইল—যেন কিছুতেই ছাড়বে না।

ইলা হেসে হাঁটু গেড়ে বসে ভাইয়ের গালে চুমু দিয়ে বলল

— “লছি শুধু ভার্সিটিতে যাচ্ছে, তুমি আম্মুর সাথে ভালো করে থাকবে। দুপুরের খাবার শেষ করলে লছি তোমার জন্য বেলুন আর চকলেট আনবে।”

এহান চোখ চকচক করে বলল—

— “পিলমিচ? তাড়াতাড়ি আসবে কিন্তু!”

— “প্রমিস, আমার ডন ভাইয়া।”

ইলা হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল, বাবার দিকে তাকিয়ে বলল—

— “চলো পাপা।”

এহানকে বিদায় জানিয়ে, বাবার সাথে ইলা চৌধুরী ভিলা থেকে সকালের আলোয় বেরিয়ে গেল।

লন্ডনের নামী ভার্সিটির পার্কিং লটে নিজের গাড়ি পার্ক করে ইলা ক্যাম্পাসে ঢুকল। চারপাশের ছাত্রছাত্রীদের নজর তার ওপর পড়লেও সে সোজা পিলারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, বেস্ট ফ্রেন্ড সায়রা আর মাইশার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে সে সায়রাকে ফোন দিল। জানতে পারল, ওরা ক্যাম্পাস ক্যাফেতে আছে এবং “ধামাকা কিছু” দেখাবে।

ইলা ক্যাফেতে গিয়ে দেখে, সায়রা আর মাইশা একদম গোপনে কারো দিকে তাকিয়ে আছে—ভার্সিটির মোস্ট পপুলার “ ক্রাশ বয়”-কে নিয়ে ফিসফাস করছে।

বন্ধুদের পাগলামি আর ক্রাশ-নাটক দেখে ইলা হাসতে হাসতে ওদের কথায় যোগ দিল। তবে সে জানত না, সেই গম্ভীর ছেলেটার চোখ তখন ভিড়ের মাঝে শুধু ইলার হাসির দিকেই আটকে গেছে।

ইলার খিলখিল হাসি থামতে না থামতেই সায়রা আর মাইশার মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। কারণ, ওপাশের টেবিল থেকে লম্বা, হ্যান্ডসাম সেই ছেলে সরাসরি তাদের দিকে হেঁটে এসে ইলার সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

ইলা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, কিন্তু ছেলেটা একদম নির্লিপ্তভাবে ইলার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল—

— “হাসিটা সুন্দর… আই লাইক ইট, বার্বি ডল।”

এই কথা শুনে ইলার মেজাজ একদম চড়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল—

— “এক্সকিউজ মি! কার অনুমতিতে আপনি এখানে বসেছেন? আর আমাকে বার্বি ডল বলার সাহস পেলেন কোথা থেকে? এখনই উঠে যান!”

তার তীব্র ধমকে সায়রা-মাইশা ভয় পেয়ে গেলেও ছেলেটা শুধু হালকা হাসল, একটুও নড়ল না—বরং ইলাকে আরও মজার চোখে দেখতে লাগল।

ইলার কড়া ধমকের মাঝেই ক্যাফেতে কয়েকজন নতুন ছেলে-মেয়ে এসে দাঁড়াল—ছেলেটির আরও চারজন বন্ধু: আরিয়ান, ফাহিম, তানিয়া আর রেশমি।

রেশমি নাটকীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে ছেলেটার হাত ধরে নেকা গলায় বলল—

— “ওহ বেবি! এখানে কী করছ? চলো, আমাদের টেবিলে যাই।”

তার অতিরিক্ত নাটক আর নেকামি দেখে ইলার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সায়রা আর মাইশা হাসি চাপতে না পেরে একে অপরের দিকে তাকাল।

ইলা আর দাঁড়াল না। ব্যাগ নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—

— “চল সায়রা, চল মাইশা। এখানে থাকার মানে নেই।”

ইলা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সায়রা আর মাইশাকে সাথে নিয়ে ক্যাফে থেকে বের হতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই চঞ্চল ছেলেটা সবার সামনে জোরে গান গেয়ে উঠল—

'চুমকি চলেছে একা পথে...

সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে?

রাগ করো না, সুন্দরী গো...

রাগলে তোমায় লাগে আরও ভালো!'

পুরো ক্যাফেতে হাসাহাসি শুরু হয়ে গেল, কেউ কেউ অবাকও হয়ে গেল। রেশমি রাগে জ্বলতে লাগল, আর ইলা একদম থমকে দাঁড়াল।

রাগ আর অপমানে ইলা ঝড়ের বেগে ফিরে এসে ছেলেটার সামনে দাঁড়াল। চোখে আগুন নিয়ে কড়া গলায় বলল—

— “মুখ সামলে কথা বলবেন! অনেক হয়েছে আপনার এই ফালতু ইয়ার্কি। আবার আমার আশেপাশে দেখা গেলে ফল ভালো হবে না!”

তার কড়া ধমকে পুরো ক্যাফে এক মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল।

কিন্তু ছেলেটা ভয় না পেয়ে শুধু সেই চেনা বাঁকা হাসিটা দিয়ে ইলার দিকে তাকিয়ে রইল—যেন তার রাগটাই তার কাছে আরও বেশি মজার কিছু।

ইলার অগ্নিশর্মা ধমকের পর সে ব্যাগটা শক্ত করে টেনে নিয়ে সায়রা আর মাইশাকে সাথে নিয়ে হনহন করে ক্যাফে থেকে বের হয়ে গেল। পুরো ক্যাফেটেরিয়া তখনও স্তব্ধ।

কিন্তু ছেলেটা একদম নির্লিপ্তভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। ঠোঁটে সেই চেনা বাঁকা হাসি। তারপর হঠাৎ সে সুর করে গান গাইতে শুরু করল—

“Hey there, pretty girl, don’t walk away so fast,

Your fiery anger feels like a spell I wish would last.

You can run, you can hide, but you can’t ignore the spark,

You’ve just left behind a beautiful storm right in my heart.”

তার গাওয়া প্রতিটি শব্দ যেন ক্যাফের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ অবাক, কেউ বিরক্ত, আবার কেউ হাসি চেপে ধরল।

রেশমি রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল, আর আরিয়ান-ফাহিম,তানিয়া শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

এক্সিট দরজার কাছে পৌঁছে যাওয়া ইলা এক মুহূর্ত থমকে গেল গানের শব্দ শুনে। কিন্তু পরক্ষণেই সে আর পেছনে ফিরল না। ভেতরের বিরক্তি আর অস্বস্তি চেপে ধরে দ্রুত ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল।

ক্যাফেটেরিয়ার ঘটনার পর ইলার মেজাজ এতটাই খারাপ ছিল যে সে আর ক্লাস করার মনই পেল না। সায়রা আর মাইশাও তার অবস্থা বুঝে জোর করেনি। তিনজন মিলে শুধু প্রয়োজনীয় প্রেজেন্টেশন সাবমিট করে লন্ডনের রাস্তাঘাট, পার্ক আর শপিংয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ইলার মনটা একটু হালকা করল। বিকেলের দিকে তারা আলাদা হয়ে যার যার বাসায় ফিরে গেল।

অন্যদিকে, যে ছেলেটা ক্যাফেতে ইলার সাথে এমনভাবে ইয়ার্কি করেছিল, সে আসলে তাদেরই ভার্সিটির বিজনেস ডিপার্টমেন্টের লাস্ট ইয়ারের জনপ্রিয় সিনিয়র—আয়মান আহান তালুকদার । ক্যাম্পাসে সে খুবই ড্যাশিং, চঞ্চল আর ড্যাম-কেয়ার স্বভাবের জন্য পরিচিত।

লম্বা, আত্মবিশ্বাসী আর সবসময় বাঁকা হাসিতে ভরা আহান সাধারণত কারো কথায় খুব একটা গুরুত্ব দেয় না, মেয়েদের ভিড়ও এড়িয়ে চলে নিজের মতো থাকে। কিন্তু ইমি'কে প্রথম দেখার পর থেকেই তার ভেতরে এক অদ্ভুত আগ্রহ তৈরি হয়েছে—ইমির রাগী, বোল্ড আর আলাদা ব্যক্তিত্বটা তাকে নাড়া দিয়ে গেছে।

***************************************************

"মির্জা বাড়িতে এখন চেনা-অচেনা অনেকেই এসে উঠেছে। উৎসবের দিনে পুরো বাড়িটা মানুষের কোলাহলে গমগম করার কথা ছিল, কিন্তু এক অদ্ভুত আর থমথমে নীরবতা যেন এই বিশাল অট্টালিকার দেয়ালগুলোকে গ্রাস করে রেখেছে। এখন আর এই বাড়ি থেকে আগের মতো আনন্দের কলকাকলি কিংবা প্রাণখোলা হাসির শব্দ ভেসে আসে না। চারপাশের কৃত্রিম আলোটাও যেন এখানকার গাম্ভীর্যের কাছে এসে ম্লান হয়ে গেছে।

​সকালে ভোরের আলো ফুটতেই আরিয়ান ঘুম থেকে উঠে পড়ল। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও যখন মনের ভেতরের অস্থিরতাটা কোনোমতেই কমল না, তখন সে বাধ্য হয়েই ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু নিজের চেনা আরামদায়ক ড্রইংরুম বা বারান্দার দিকে না গিয়ে, আরিয়ানের পা দুটো যেন অবশ হয়ে এক অদৃশ্য টানে হেঁটে গেল বাড়ির একদম পেছনের নিভৃত দিকটায়।

​সে এসে দাঁড়াল মৃত্তিকার সেই ছোট, স্যাঁতসেঁতে আর ধুলোবালি জমে থাকা নোংরা রুমটার সামনে। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিয়ান ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। রুমের এক কোণায় পড়ে থাকা সেই জীর্ণ, ছোট চকিটার (তক্তপোশ) ওপর সে মাথা নিচু করে বসল।

​আজ কেন জানি আরিয়ানের বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি ফাঁকা লাগছে। এক তীব্র, দমবন্ধ করা অস্বস্তি আর ছটফটানি তার পুরো অস্তিত্বকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। আরিয়ানের বারবার মনে হতে লাগল—ঠিক এই মুহূর্তে কিছু একটা, ভীষণ মূল্যবান আর বড্ড আপন কোনো একটা কিছু তার থেকে অনেক... অনেকটা দূরে চলে যাচ্ছে। এমন এক দূরত্বে, যেখান থেকে তাকে আর কোনোদিন কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

​চকিটার খসখসে কাঠের ওপর নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা রেখে আরিয়ান বিড়বিড় করে বলল—'এই অস্থিরতা কেন হচ্ছে আমার? কেন মনে হচ্ছে আমি যা আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছি, তা আসলে আমার নয়? কে চলে যাচ্ছে আমার জীবন থেকে এত দূরে? মৃত্তিকা... তুমি কি আমায় সত্যিই ক্ষমা করোনি?'

​মির্জা বাড়ির সেই পুরনো জীর্ণ দেয়ালগুলো আরিয়ানের এই মৌন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না, শুধু এক বুক শূন্যতা নিয়ে চারপাশটা যেন আরও বেশি ভারী হয়ে উঠল।"

"বাইরের জানলা দিয়ে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া এসে তার গায়ে লাগছে। আরিয়ানের হঠাৎ মনে হলো, এই ঠান্ডাটাতো আজকের নয়! এই ঠান্ডাটা যেন ঠিক সেই আট বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের, যেদিন সে মৃত্তিকাকে ওই কনকনে শীতে আটকে রেখেছিল।

​আট বছর... দীর্ঘ আটটি বছর সে এই সত্যটাকে মনের এক কোণায় কবর দিয়ে রেখেছিল সে । কিন্তু আজ আর পারল না; মনের ভেতরের অপরাধবোধের ধারালো নখগুলো আজ মাটি খুঁড়ে অতীতটাকে জ্যান্ত করে বের করে এনেছে।

​আজ থেকে তেরো বছর আগের সেই দিনটা আরিয়ানের চোখের সামনে সিনেমার মতো ভাসতে লাগল। তখন আরিয়ানের বয়স ছিল মাত্র আঠারো—এক উদ্দাম, অহংকারী, জেদি তরুণ। আর মৃত্তিকা? সে তো ছিল মাত্র আট বছরের এক অবুঝ, নিষ্পাপ শিশু! ফ্রক পরা, পুতুল খেলার বয়সের সেই ছোট্ট মেয়েটার গলায় কোন পরিস্থিতির শিকার হয়ে যে এই বাড়ির মানুষগুলো জোর করে বিয়ের মালা পরিয়ে দিয়েছিল, তা ভাবলে আজ আরিয়ানের নিজেরই গা শিউরে ওঠে। একটা আট বছরের বাচ্চার সাথে আঠারো বছরের এক তরুণের বিয়ে!

​এই বিয়েটা রেহানা বেগম কোনোদিন মেনে নিতে পারেননি। তাঁর আভিজাত্যের অন্ধ অহংকারে এই বিয়ে ছিল একটা কুৎসিত, কালো দাগ। আর সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি দিন-রাত আরিয়ানের 'ব্রেন ওয়াশ' করা শুরু করেছিলেন। রোজ রাতে আরিয়ানের ঘরে এসে বিষাক্ত সাপের মতো ফিসফিসিয়ে বলতেন, 'ও তোর বউ নয় আরিয়ান, ও একটা ছোটলোকের বাচ্চা,নোংরা একটা এতিম! ও তোকে আর আমাদের এই মির্জা পরিবারকে ধ্বংস করতে এসেছে। ওরে দূর করে দে নিজের জীবন থেকে! ওর ছায়াও যেন তোকে স্পর্শ না করে!'

​মায়ের সেই তীব্র আর অন্ধ বিষে নিজের বিবেক সঁপে দিয়ে, আঠারো বছরের আরিয়ান নিজের পুরুষত্বের অহংকারে সেই কনকনে শীতের রাতে আট বছরের নিজের সেই ছোট্ট নামমাত্র 'বউ'টাকে ঘরের বাইরে, ওই বরফ ঠান্ডা অন্ধকারে আটকে রেখেছিল। একটুও বুক কাঁপেনি তার, একটুও মায়া হয়নি সেই কাঁপতে থাকা পুঁচকে হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে। পরের দিনই সে মায়ের কথামতো সব অপরাধ, সব কান্না পেছনে ফেলে রেখে সোজা বিদেশ পাড়ি দিয়েছিল। নিজের ক্যারিয়ার গড়েছিল, স্বপ্ন দেখেছিল তানজিনা কে নিয়ে কিন্তু দিনশেষে সেও ধোঁকা দিয়ে চলে গেল।

​আর আজ? আজ আরিয়ানের বয়স একত্রিশ, আর মৃত্তিকা যদি আজ বেঁচে থাকত তবে তার বয়স হতো ১৯ কি ২০ বছর। যে মেয়েটা নিজের সোনালী শৈশব হারিয়ে, এই রাজপ্রাসাদ সম মির্জা বাড়ির অবহেলা আর নির্যাতনে কৈশোরে পা দিয়েছিল—সে আজ কতদিন হলো এই দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে! কেউ তার খোঁজ রাখেনি, কেউ তার কান্না শোনেনি।

​আরিয়ান চকি থেকে উঠে ধীরপায়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জানলার গ্রিলটা শক্ত করে ধরে বাইরের ঝুম বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—সে আসলে কোনো বড় ডিগ্রিধারী, নামী-দামী ভদ্রলোক নয়; সে একটা খুনি! একটা জলজ্যান্ত পিশাচ! মায়ের বিষাক্ত মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে সে একটা চিরকালের অপরাধী হয়ে গেছে।

​জানলা দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁট আরিয়ানের মুখে এসে লাগছে, কিন্তু তার চেয়েও তীব্র বেগে তার চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে ওই নোংরা ঘরের এক কোণায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আজ তার এই একত্রিশ বছরের সুঠাম শরীরটা অনুশোচনার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টির শব্দের আড়ালে নিজের গলার কান্নাটা চেপে সে ডুকরে কেঁদে উঠল—'মৃত্তিকা... ওরে আমার ছোট্ট পাখিটা! আমি তোকে বাঁচতে দিইনি রে! আমার এই পাপের কি কোনো ক্ষমা আছে? কোনো শাস্তি কি পারবে আমার ভেতরের এই খুনিটাকে পবিত্র করতে? কিন্তু কেন জানি না... আমার মন বলছে তুই মরিসনি মৃত্তিকা!

আমার এই পাপী মনটা বারবার চিৎকার করে বলছে তুই এই দুনিয়ার কোনো না কোনো এক কোণে ঠিক বেঁচে আছিস! তুই এভাবে আমাকে আজীবন অপরাধী বানিয়ে চলে যেতে পারিস না। আমি যে এখনও তোর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাত দুটো জোড় করে একটা বার মাফ চাইতে পারলাম না রে!

​হে আল্লাহ! আমার ওপর রহম করো। যে নিষ্পাপ ফুলটাকে আমি নিজের হাতে এই নরকে ঠেলে দিয়েছিলাম, তাকে আরও একটা বার আমার কাছে এনে দাও আল্লাহ! আমার যে এখনও তোর সাথে সংসার করা হলো না, মৃত্তিকা! যে অধিকারটা তেরো বছর আগে এই সমাজ আর পরিবার আমার হাতে তুলে দিয়েছিল, নিজের অহংকারে আমি তা পায়ে ঠেলেছি। কিন্তু আজ আমার এই শূন্য বুকটা যে শুধু তোকেই চাইছে রে!

তোকে বুকে জড়িয়ে, এই ভাঙা ঘরে তোর পাশে বসেই আমার জীবনের বাকিটা পথ কাটানোর আকুতি কেন আজ আমাকে এভাবে পাগল করে দিচ্ছে?'

​আরিয়ান মেঝের ধুলোবালির ওপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক অবুঝ বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার চোখের জলে মৃত্তিকার সেই নোংরা ঘরের শুষ্ক মাটিটুকু ভিজে একাকার হয়ে গেল। তেরো বছরের জমানো সব পুরুষালি অহংকার আজ এই এক ফোঁটা কান্নার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসেছে।

​মির্জা বাড়ির এই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকূপের মতো রুমটায় আরিয়ানের সেই বুকফাটা কান্নার আওয়াজ আর শূন্য হাহাকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, কিন্তু সেই আট বছরের ফ্রক পরা মেয়েটা আর ফিরে এলো না।"

-----------------------------------------

"নোনা ধরা দেয়াল আর অন্ধকারের সেই ঘরে জিরো ওয়াটের লাল বাল্বটা দুলছিল। রক্তে ভেজা মেঝেতে আধমরা লোকটা শিকলের টানে কোনোমতে ঝুলে আছে, আর তার ঠিক সামনেই সেই রাজকীয় চেয়ারে কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে বসে আছে এক ছায়ামূর্তি। তার কোনো অবয়ব চেনা যাচ্ছে না, কোনো আলো-ছায়ার খেলায় ধরা পড়ছে না।

​কিন্তু ঘরের পিনপতন নীরবতা ভেঙে সেই নিথর ছায়ামূর্তির ঠোঁট দুটো অদ্ভুতভাবে নড়ে উঠল। সে অত্যন্ত নিচু, ঠান্ডা আর থমথমে গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল:

​"“তুই কি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার সাহস করেছিলি? এখন দেখ কী হয় যখন কেউ আমার বিশ্বাস নিয়ে খেলে। নিজেকে দেখ, টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছিস। এটাই তোর বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য, আর আমি নিশ্চিত করব তুই এই কষ্ট তোর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মনে রাখবে।”

​কথাগুলো শেষ করেই চেয়ারে বসা লোকটা আলতো করে তার হাতটা তুলল। হাতের একটা সামান্য ইশারা পেতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই জন বিশালদেহী গার্ড খ্যাপাটে নেকড়ের মতো হিংস্র ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে এলো। তারা লোকটার ঝুলন্ত চুলগুলো মুঠো করে ধরে তার মাথাটা সজোরে পেছনের দিকে হেঁচকা টান মারল।

​পর মুহূর্তেই একটা ভারী লোহার রড দিয়ে লোকটার পাঁজরে আর হাঁটুতে একের পর এক সজোরে আঘাত করা শুরু হলো! 'ঠা ঠা' শব্দে রডের কড়া আঘাতগুলো যখন লোকটার হাড়ের ওপর গিয়ে পড়ছিল, তখন পুরো ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দে। লোকটার মুখ ফেটে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত ছিটকে গিয়ে পড়ল সেই কালো বুট জুতো জোড়ার ওপর।

যন্ত্রণার এক পৈশাচিক আর্তনাদে ঘরটা কেঁপে উঠল, কিন্তু শিকলের বাঁধন এতই শক্ত ছিল যে সে ছটফট করারও সুযোগ পাচ্ছিল না। প্রতিটা আঘাতের সাথে সাথে তার মাংস ছিঁড়ে চামড়া আলাদা হয়ে যাচ্ছিল, আর সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে আধমরা থেকে পুরো মৃতপ্রায় হয়ে পড়তে লাগল।

​অথচ, চেয়ারে বসা লোকটার মাঝে কোনো হেলদোল নেই। সে একইভাবে পাথরের মতো নিথর বসে থেকে, লোকটার এই নৃশংস পরিণতি আর রক্তের ছোপগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার রহস্যময়ভাবে বিড়বিড় করতে লাগল।

"লোহার রডের সেই মড়মড় শব্দ আর পৈশাচিক আর্তনাদকে এক নিমেষে স্তব্ধ করে দিয়ে ঘরের ছমছমে নীরবতা আবার ফিরে এলো। চেয়ারে বসা সেই ছায়ামূর্তি ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। তার হাতের একটা সামান্য ইশারায় এক জন গার্ড জ্যাকেটের ভেতর থেকে বের করে আনল একটি কালো রঙের চকচকে রিভলভার।

​কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। গার্ডটি লোকটার একদম কপাল বরাবর গান পয়েন্ট করে ট্রিগার চেপে দিল—'ঠাং!'

​একটা তীব্র আলোর ঝলকানি আর সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের নিচু শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। লোকটার কপাল ভেদ করে তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে ছিটকে গেল পেছনের নোনা ধরা দেয়ালে। তার আধমরা শরীরটা এক ঝটকায় নিথর হয়ে শিকলের টানে ঝুলে রইল। বেইমানির চ্যাপ্টারটা সেখানেই চিরতরে ক্লোজ হয়ে গেল।

​সেই বীভৎস মৃতদেহ আর রক্তের ছোপগুলোর দিকে এক পলকও না তাকিয়ে, ছায়ামূর্তিটি ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই অন্ধকার টর্চার সেল পেছনে ফেলে সে এসে দাঁড়াল তার নিজের একদম ব্যক্তিগত রাজপ্রাসাদে।

˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙˙

ধীরপায়ে হেঁটে সে এগোল তার সেই বিশাল, বিলাসবহুল পেইন্টিং রুমটির দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দামী কোনো পারফিউম আর কালার থিনারের এক অদ্ভুত, তীব্র নেশা ধরানো ঘ্রাণ তার নাকে এসে লাগল। এক অদ্ভুত মাদকতা মেশানো সেই গন্ধ, যা পুরো রুমের পরিবেশকে এক লহমায় বদলে দেয়।

আলো-আঁধারির খেলায় ঘেরা বিশাল এই পেইন্টিং রুমটিতে পা রাখলেই যে কেউ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে যেতে বাধ্য! কারণ, পুরো রুমের দেয়াল জুড়ে, মেঝেতে রাখা ইজেলের ওপর আর চারপাশের শত শত ক্যানভাসে আর কারো নয়—শুধুমাত্র একজনেরই হাজারেরও বেশি ছবি থরে থরে সাজানো।

প্রতিটি ছবি এতই সূক্ষ্ম, এতই নিখুঁত আর যত্নে আঁকা যে, সেগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়—তারা বুঝি ক্যানভাসের ফ্রেম ভেঙে এই মুহূর্তেই জীবন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে! কোনো ছবিতে তার চোখের মায়াবী চাউনি, কোনো ছবিতে ঠোঁটের কোণের এক চিলতে হাসি, আবার কোনো ছবিতে রাগে থমথমে মুখাবয়ব—যেন এক সুনিপুণ জাদুকরের হাতে ক্যানভাসে বন্দি হয়ে আছে এক জীবন্ত মানুষ!

এতক্ষণ যার হাত দিয়ে রক্তের হোলি খেলা চলছিল, সেই রহস্যময় হাতটা এবার আলতো করে ছুঁয়ে দিল সামনের সবচেয়ে বড় ক্যানভাসটির ওপর। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, গা ছমছমে অথচ গভীর তৃপ্তির হাসি।

ধীরপায়ে হেঁটে এসে সে রুমের ঠিক মাঝখানে থাকা সবচেয়ে বড় আর জীবন্ত পেইন্টিংটার সামনে একটা কাঠের নিচু টুলে এসে বসল।

​তার চোখের সেই খুনে চাউনিতা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো এক মহাসমুদ্র সমান ব্যাকুলতা আর তীব্র পাগলামি। সে একধ্যানে, পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল ক্যানভাসে বন্দি সেই চেনা মুখটার দিকে—যে মুখটা এই বিশাল অট্টালিকার বদ্ধ ঘরে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

​সে ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে নাড়িয়ে অত্যন্ত কোমল, নিচু আর আর্তনাদ মেশানো গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল—'হার্টবিট... আমার হার্টবিট! কবে আমি তোমাকে নিজের খুব কাছে পাবো? এই দেখো না... তুমি আমার কাছে নেই, আমার এই শূন্য হাত দুটো তোমাকে সশরীরে ছুঁতে পারে না, তাও দেখো কত শত স্কেচ এঁকে রেখেছি তোমার! এই পুরো ঘরটা জুড়ে, আমার প্রতিটা নিশ্বাসে শুধু তুমি আর তুমিই মিশে আছ। তুমি ছাড়া তো আমার এই বুকের ভেতরটা একদম অচল!

​কথাগুলো বলতে বলতে তার কাঁপতে থাকা ডানহাতের আঙুলগুলো পরম মমতায় আলতো করে বুলিয়ে দিল ক্যানভাসের সেই আঁকা অবয়বটার ওপর—ঠিক যেভাবে কোনো জীবন্ত মানুষের হাত, মুখ আর চুলে পরম আদরে হাত বুলায়! ক্যানভাসের খসখসে স্পর্শটা যেন তার বুকে এক তীব্র হাহাকার আর অবাধ্য যন্ত্রণার জন্ম দিল। সে আর নিজের ভেতরের সেই পাগলামি চেপে রাখতে পারল না। ক্যানভাসের একদম মুখোমুখি নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে, এক অদ্ভুত, নেশাতুর আর ভাঙা গলায়

ফিসফিসিয়ে বলল—

​'আই হাগ ইউ, হার্টবিট... আই জাস্ট হাগ ইউ! প্রতিটা রাতে, প্রতিটা ক্ষণে যখন এই দুনিয়ার অন্ধকার আমাকে গ্রাস করতে আসে, আমি চোখ বন্ধ করলেই তোমাকে এভাবে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরি। তুমি আমার থেকে যতই দূরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না কেন, এই অবাধ্য মনের খাঁচায় তুমি আজীবন বন্দি। খুব তাড়াতাড়ি... বড্ড তাড়াতাড়ি আমাদের এই দূরত্বের অবসান হবে। তখন এই ক্যানভাসের জড় বস্তু নয়, তুমি নিজে আমার এই বুকের মাঝে মিশে থাকবে, আর সেদিন তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নেওয়ার সাধ্য এই দুনিয়ার কারও হবে না! তুমিই তো আমার একমাত্র হার্টবিট!'"

​কথাগুলো শেষ করে সে ক্যানভাসের ওপর নিজের কপালটা আলতো করে ঠেকিয়ে দিল। ঘরের দামী পারফিউম আর কালার থিনারের তীব্র মাদকতায় ভরা বাতাসের মাঝেই ধীরে ধীরে চোখ দুটো বুজে ফেলল সে। তার পাথরের মতো শক্ত, খুনে বুকের গভীর থেকে তখন বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস।

অবাধ্য মনটাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে না পেরে, সে নিচু আর বিষণ্ন স্বরে গুনগুন করে গেয়ে উঠল—

"তোমাকে ছোঁয়ায় নেই তো আমার সাধ্য,

দেখতে পাওয়ার সেই তো বড়ো ভাগ্য।

মনটা অবাধ্য হচ্ছে প্রায়শ,

কষ্টের বোঝা বেড়েই যাচ্ছে ক্রমশ।

ঘুম চলে যায় তোমার চোখ বেড়াতে,

পারি না তাকে কোনোভাবে ফেরাতে...

বায়বীয় প্রেম আকাশ পাতাল সমতল...."

শেষ লাইনটা উচ্চারণ করতে করতেই হুট করে থেমে গেল সে। রুমের আলো-আঁধারির মাঝে ধীরে ধীরে চোখ মেলে আবার তাকাল সামনের ক্যানভাসটার দিকে। যে চোখের চাউনিতে এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়েও মানুষকে শেষ করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, সেই চোখে এখন আর কোনো হিংস্রতা নেই, নেই এতটুকু অহংকারও। সেখানে জমে আছে মহাসমুদ্রসম হাহাকার আর অসীম অসহায়ত্ব।

এক অদ্ভুত, অস্ফুট যন্ত্রণায় তার বুকটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।

চলবে..........

"ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। 🖤

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন