#গল্পটা_আমাদের_ছিল
#জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন
#পর্বঃ১৩
~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ🚫 ~~
সবুজ গাঁয়ের বুকটি চিরে, মস্ত বড় দিঘির পাড়ে,
দাঁড়িয়ে আছে মির্জা বাড়ি, কালের খেয়ায় আপন ঘাড়ে।
শ্যাওলা জমা প্রাচীন ইটে, লুকিয়ে আছে হাজার স্মৃতি,
ঝুল বারান্দায় আজও যেন, থমকে আছে বুনো গীতি।
আরিয়ানের চোখের সামনে ঝাপসা সেই চেনা মায়াবী অবয়বটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না...
আরিয়ান একছুটে গিয়ে ফ্লোরে একদম মৃত্তিকার পায়ের কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসল। তার চোখ দুটো লাল, সেখান থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে হাত বাড়িয়ে মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
আরিয়ান অত্যন্ত আকুল হয়ে, ভাঙা গলায় বলল- মৃত্তিকা...! আমার পাখি! কই ছিলা তুমি ? আমাকে এভাবে একা রেখে কেন চলে গেছো, বলো?
সামনে বসা মৃত্তিকা কোনো জবাব দিল না, সে একদৃষ্টে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল। তার নীরবতা দেখে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল...
আরিয়ান হাঁটুতে ভর দিয়ে আরও এগিয়ে বলল- পাখি... জানো, দুনিয়ার সবাই বলে আমি নাকি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি! আমি নাকি খুব খারাপ! তারা বলে, আমি কষ্ট দিয়েছি বলেই নাকি তুমি অভিমান করে আমাকে ছেড়ে এক্কেবারে আকাশে চলে গেছো! আসলেই কি তাই পাখি?
চোখের পানি মুছে বলল- ও পাখি! কথা বলো না কেন? আমি কি তোমাকে সত্যিই অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি? তাই কি আজ এভাবে চুপ করে আছ আমার ওপর?
মৃত্তিকা তখনও পাথরের মতো স্তব্ধ। আরিয়ান এবার আলতো করে নিজের চোখের কোণটা মুছে একটা ম্লান, অপরাধবোধে ভরা হাসি দিল...
আরিয়ান একটু থেমে, বিড়বিড় করে বলল- পাখি... এখন আর কিন্তু আমার কাছে তোমাকে একটুও নোংরা লাগে না! আমি তোমার এই রূপটাই বড্ড ভালোবাসি। দেখো, আমার পাখিটা কত বড় হয়ে গেছে!
আরিয়ান একদম শিশুর মতো আকুতিভরা কণ্ঠে, দুই হাত বাড়িয়ে বলল- পাখি... আমি কি তোমাকে একটুখানি জড়িয়ে ধরব? তোমায় একটু বুকে টেনে নিতে খুব ইচ্ছা করছে তোমার এই আরিয়ানের! একটু ছুঁয়ে দেখি তোমায়?
আরিয়ানের এই কথা শুনতেই যেন মৃত্তিকা হুট করে অত্যন্ত রাগী আর ভয়ঙ্কর চোখে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তার সেই অগ্নিদৃষ্টি দেখে আরিয়ান ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল...
আরিয়ান ভয়ার্ত কণ্ঠে, দুই হাত জোড় করে বিড়বিড় করে বলতে লাগল- না পাখি... না! রাগ করো না, আমি তোমায় একদম ধরব না! ছোঁব না তোমায়, প্রমিজ! তুমি শুধু... তুমি শুধু এভাবে আমার সামনে বসে থাকো, তাতেই হবে। প্লিজ চোখ বন্ধ করো না পাখি, আমায় ছেড়ে যেও না!
আরিয়ান মেঝেতে হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে, যেন সে সত্যিই তার হারানো মৃত্তিকাকে ধরে রেখেছে...
আরিয়ান অশ্রুসিক্ত চোখে, আর্তনাদের সুরে বলে- পাখি... আজও সব পরিষ্কার মনে পড়ছে। সেই রাতটা... আমাদের বাসর রাত। তুমি মাত্র আট বছরের এক অবুঝ শিশু। সেদিন ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা তোমার শরীরটাকে আমি কোনো মমতা না দিয়ে ঘরের কোণে আটকে রেখেছিলাম। তোমাকে কত নোংরা, আস্তাকুঁড়ের আবর্জনা বলে কত কী যে গালি দিয়েছি... সেই নিষ্ঠুরতার দহনে আজ আমি নিজেই প্রতিদিন দগ্ধ হচ্ছি, পাখি।
সে দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল...
আরিয়ান পাখি, আমি ভুল করেছি। আমি শয়তান ছিলাম! কিন্তু তুমি প্রতিদিন এসে কেন আবার চলে যাও? এই তো, তুমি আমার সামনেই আছ! কেন থাকো না আমার সাথে? এবার আর তোমাকে কোনোভাবেই যেতে দেব না।
সে তার প্রিয়তমার দিকে হাত বাড়িয়ে আদুরে গলায় বলে ওঠে...
কান্না ভেজা হাসি হেসে চলো না পাখি, আবার নতুন করে সংসার গড়ি। যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব, আর কোনো নিষ্ঠুরতা থাকবে না। আমি তোমার পায়ের ধুলো মেখে সারা জীবন কাটিয়ে দেব, তবুও তুমি আজ আমায় ছেড়ে যেও না। আমার এই শূন্যতাটা খুব বেশি ভারী, পাখি... বড্ড ভারী!
আরিয়ান একদৃষ্টিতে মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত হাহাকারে মোচড় দিয়ে উঠল...
আরিয়ান: চোখের পানি মুছতে মুছতে, একদম ছোট বাচ্চার মতো অভিমানী গলায় বলল- মৃত্তিকা...! ও পাখি, কথা বলো না কেন? এখনও কি চুপ করেই থাকবে? আমার ওপর বুঝি রাগটা তোমার এখনও একটুও কমে নাই, হুম?
সে আলতো করে ফ্লোরে আরেকটু গুটিসুটি মেরে বসে, নিজের দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে পাগলটার মতো ম্লান হেসে বলল...
আরিয়ান মেঝেতে বসে থাকা মৃত্তিকার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বেয়ে অনবরত নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে।
আরিয়ান নরম, ভালোবাসায় জড়ানো কণ্ঠে বলল-
"আচ্ছা পাখি, তুমি কি গান শুনবে? তোমার মনে আছে? তুমি আমার কণ্ঠে গান শুনতে কতটা ভালোবাসতে..."
সে ধীরে ধীরে দুই হাত জোড় করল। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে, ভাঙা কণ্ঠে বলতে লাগল—
"কিন্তু আমি কতটা নিষ্ঠুর ছিলাম, তাই না পাখি? তুমি যখনই আমার কাছে গান শুনতে চাইতে, আমি তোমাকে কত অপমান করেছি, কত কষ্ট দিয়েছি! আমার সেই অন্যায়ের পর তুমি আর কোনোদিন আমার কাছে গান শুনতে আসোনি... অভিমান করে একেবারে দূরে চলে গেছো।
কিন্তু আজ আমি গাইব, পাখি। আজ তোমার এই আরিয়ান শুধু তোমার জন্যই গাইবে। তুমি একটু মন দিয়ে শুনবে তো...?"
কথাগুলো বলেই আরিয়ান ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফ্লোরে ঠেকাল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে, বুকভরা কান্না আর অপরাধবোধ নিয়ে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে গাইতে শুরু করল—
"পাখি রে... তুই দূরে থাকলে বুকটা যে ফেটে যায়,
তোর স্মৃতিগুলো আজও আমায় নীরবে কাঁদায়।
ফিরে আয় তুই আমার বুকে, আর করব না তোকে পর,
তোর চেনা এই আরিয়ানের মনটা আজ এক ভাঙা ঘর..."
গান গাইতে গাইতে তার কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে এলো। প্রতিটি শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল অনুতাপ, ভালোবাসা আর হারিয়ে ফেলার অসহনীয় যন্ত্রণা। তার চোখের পানির ফোঁটা ফোঁটা হয়ে মেঝেতে পড়তে লাগল, যেন প্রতিটি অশ্রুবিন্দু মৃত্তিকার কাছে ক্ষমা চাওয়ার একেকটি নীরব আবেদন।
আরিয়ান মেঝেতে বসে থাকা মৃত্তিকার কাল্পনিক অবয়বের দিকে কাঁপতে কাঁপতে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। যেন কাউকে ছুঁয়ে দেখার এক মরিয়া চেষ্টা।
আরিয়ান: আর্তনাদ করে বলে-
"পাখি... এবার আমি আর তোকে কোথাও যেতে দেব না। এই চার দেওয়ালের মাঝেই আমরা দুজন আমাদের ছোট্ট একটা পৃথিবী গড়ে তুলব। তুই আমার পাশে থাকবি, আর আমি সারাক্ষণ তোকে আগলে রাখব।
তোকে আর কাঁদতে হবে না... তোকে আর কাউকে ভয় পেতে হবে না। আমি আমার সব পাপ, সব অন্যায়—তোকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে ধুয়ে ফেলব।
প্লিজ পাখি... এই হাতটা একবার ধর। আমার পুরো অস্তিত্ব আজ তোকে ছাড়া একটা অনাথ আশ্রমে পরিণত হয়েছে। তুই না থাকলে আমার এই রাজপ্রাসাদটাও একমুঠো ছাই ছাড়া কিছুই না..."
কথাগুলো বলতে বলতে সে বাড়িয়ে রাখা হাতটাকে আরও সামনে এগিয়ে দিল। তার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরে পড়ছে, আর ভাঙা বুকের হাহাকার যেন পুরো ঘরটাকে ভারী করে তুলেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ব্যবসার কিছু জরুরি ফাইল হাতে নিয়ে আশরাফ সাহেব আরিয়ানের রুমে প্রবেশ করলেন। তাঁর মুখে ছিল কাজের ব্যস্ততা, চোখে ছিল প্রোজেক্টের চিন্তা।
আশরাফ সাহেব:গম্ভীর বলে-
"আরিয়ান! ওই ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলি? এই প্রোজেক্টে আমাদের কত লস হলো তার হিসাব—"
কথাটা শেষ করার আগেই তাঁর কণ্ঠ থেমে গেল।
তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দরজার কাছে।
সামনের দৃশ্যটা যেন তাঁর সমস্ত বাস্তবতাবোধকে মুহূর্তেই নাড়িয়ে দিল।
যে ছেলেকে তিনি সবসময় দৃঢ়চেতা, কঠোর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা একজন মানুষ হিসেবে চিনেছেন, সেই ছেলেটাই আজ মেঝেতে বসে শূন্যের দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁদছে। যেন সেখানে সত্যিই কেউ বসে আছে, যার সঙ্গে সে কথা বলছে, যার কাছে সে ক্ষমা চাইছে, যার ফিরে আসার জন্য সে আকুল হয়ে মিনতি করছে।
আরিয়ানের এলোমেলো চুল, রক্তশূন্য মুখ, অশ্রুসিক্ত চোখ আর ভেঙে পড়া মানসিক অবস্থা দেখে আশরাফ সাহেবের হাত কেঁপে উঠল।
হাতের ফাইলগুলো ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল।
শব্দটা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলেও তিনি যেন তা শুনতেই পেলেন না।
তাঁর চোখে তখন শুধু একটাই দৃশ্য—
নিজের ছেলের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জীবন।
এক মুহূর্তের জন্য তিনি বিশ্বাসই করতে পারলেন না, তাঁর চোখের সামনে যা ঘটছে তা বাস্তব।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
আশরাফ সাহেব ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আরিয়ানের পাশে দাঁড়ালেন। তাঁর হাত থেকে ফাইলটা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে দিকে কোনো খেয়াল নেই। তিনি ঝুঁকে আরিয়ানের কাঁধে হালকা একটা ধাক্কা দিলেন।
আশরাফ সাহেব কড়া গলায় বলে- আরিয়ান! কী হচ্ছে এসব? হুঁশে ফিরে আয়!
আরিয়ান যেন সেই ধাক্কায় হঠাৎই বাস্তবে ফিরে এল। সে হড়বড় করে উঠে দাঁড়াল, চোখে আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি। পুরো ঘরটা শূন্য—মৃত্তিকা কোথাও নেই।
সে পাগলের মতো চারদিকে খুঁজতে লাগল—খাটের নিচে, পর্দার আড়ালে, আলমারির পাশে। কিন্তু কোথাও নেই তাকে। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল তার। শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে সে আশরাফ সাহেবের হাত খামচে ধরল, কাঁপা গলায় ডুকরে কেঁদে উঠল।
আরিয়ান হাহাকার করে বলতে লাগলো- " আব্বু… আমার মৃত্তিকা কই? এই মাত্র তো ও এখানে ছিল! আমার চোখের সামনেই বসেছিল! তুমি রুমে ঢুকতেই ও কেন চলে গেল, বলো না! ও তো তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত, আব্বু…
কাঁদতে কাঁদতে থেমে থেমে বলে- ও একা একা কী যেন বলছিল… আমি নিজের কানে শুনেছি… ও কি বলছিল যে ও আর থাকবে না? ও কি সত্যিই আর ফিরবে না?
ছেলের এমন ভেঙে পড়া, অস্থির আচরণ দেখে আশরাফ সাহেব এক মুহূর্ত থমকে গেলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ছোট্ট নিষ্পাপ মৃত্তিকার মুখ—যে এই বাড়িতে দিনের পর দিন কষ্ট ছাড়া কিছুই পায়নি।
কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মুখ শক্ত হয়ে গেল। আরিয়ানকে সড়িয়ে দিয়ে নিজের জামা ছাড়িয়ে নিলেন তিনি। তারপর গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠান্ডা, কঠিন গলায় বললেন—
এখন এই পাগলামি করে কী হবে আরিয়ান? যখন মেয়েটা বেঁচে ছিল, তখন তোরা সবাই মিলে ওকে শুধু কষ্টই দিয়েছিস। আজ সে নেই—আজ সে এই নরক থেকে মুক্ত। সে আর কখনোই এই বাড়িতে ফিরবে না।
আশরাফ সাহেবের সেই শীতল কণ্ঠের সত্যটা যেন আরিয়ানের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধে গেল। তিনি আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক ফোঁটা সহানুভূতি না দেখিয়ে আরও কঠোর স্বরে বলতে লাগলেন—
যখন মেয়েটা তোর সামনে ছিল, তখন তো তাকে একটুও মূল্য দিসনি আরিয়ান! তার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটা কান্নাকে তুই পায়ের নিচে পিষে ফেলেছিলি। আর আজ সে বেঁচে নেই দেখে এই মাঝরাতে ঘরের ফ্লোরে বসে পাগলামি করছিস? নাটক করছিস নিজের বিবেকের সাথে?
তিনি আরিয়ানের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে কাঁপানো গলায় বললেন…
ভুলে গেলি কীভাবে চোখের সামনে মেয়েটা শেষ হয়ে গেল? মৃত্তিকা মারা গেছে আজ দীর্ঘ পাঁচ-পাঁচটা বছর হয়ে গেল, আরিয়ান! আজ পাঁচ বছর ধরে সে মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। বাংলায় একটা কথা আছে না—“দাঁত থাকতে মানুষ দাঁতের মর্যাদা বোঝে না, আর দাঁত পড়ে গেলে তখন দাঁতের জন্য হাহাকার করে!”
তিনি এক ধাপ এগিয়ে এসে কণ্ঠ আরও তীক্ষ্ণ করলেন…
তোর অবস্থাও ঠিক তেমনই হয়েছে। যখন মেয়েটা তোর খাঁচার বন্দি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটাত, তখন তুই বুঝিসনি; আর আজ সেই খাঁচা শূন্য বলে তুই দাঁত থাকতে না বোঝার চরম খেসারত দিচ্ছিস—কুত্তার মতো হাহাকার করছিস!
এক মুহূর্ত থেমে, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি রেখে তিনি শেষ কথাটা বললেন…
আশরাফ সাহেব: কিন্তু এই কান্নার কোনো ক্ষমা নেই, আরিয়ান… কোনো ক্ষমা নেই।
✮✮✮✮✮✮✮✮✮
লন্ডনের কেনসিংটনের সকালগুলো যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা এক টুকরো স্নিগ্ধ ছবি। কুয়াশার পাতলা চাদর ভেদ করে যখন ভোরের প্রথম আলো ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের দালানগুলোর গায়ে এসে পড়ে, তখন পুরো রাজকীয় এলাকাজুড়ে নেমে আসে এক নিস্তব্ধতা। সেই শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশকে সঙ্গী করেই প্রতিদিনের মতো আজও ঘুম থেকে উঠল ইলা।
ভোরের আলো ফুটতেই সে পরম মনোযোগ আর প্রশান্তি নিয়ে নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে কিছুক্ষণ মোনাজাত করতেই তার মনটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠল।
আজ অবশ্য প্রতিদিনের মতো বাইরের পার্কে জগিং করতে যাওয়ার ইচ্ছে হলো না তার। তাই নিজের রুমের একপাশে থাকা স্লাইডিং গ্লাস ডোরটা আলতো করে খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। এটি অন্য কিছু নয়—ইলার নিজস্ব পার্সোনাল এক্সারসাইজ রুম।
দরজাটা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক পরিপাটি আর নান্দনিক পরিবেশ। রুমের একপাশের পুরো দেয়ালজুড়ে রয়েছে বিশাল স্বচ্ছ কাঁচের জানালা, যেখান থেকে কেনসিংটনের ভোরের অপূর্ব সৌন্দর্য আর দূরে সারিবদ্ধ সবুজ গাছপালার দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। দামি ম্যাট-ফিনিশড উডেন ফ্লোরিং ঘরটিকে দিয়েছে এক আরামদায়ক ও অভিজাত আবহ।
ঘরের ঠিক মাঝখানে বিছানো রয়েছে স্কাই-ব্লু রঙের একটি প্রিমিয়াম ইয়োগা ম্যাট। এক কোণায় রাখা আধুনিক প্রযুক্তির আল্ট্রা-স্মার্ট ট্রেডমিল, যার পাশে সুন্দরভাবে সাজানো বিভিন্ন ওজনের প্যাস্টেল শেডের ডাম্বেল আর একটি ফিটনেস বল। অন্য দেয়ালজুড়ে বসানো বিশাল আয়নাটি পুরো ঘরের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
রুমের এক কোণায় রাখা ছোট্ট কাঠের শেলফের ওপর থাকা ব্লুটুথ স্পিকার থেকে ভেসে আসছে মৃদু ভলিউমের এক শান্ত, রিফ্রেশিং সুর, যা ভোরের পরিবেশটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। জানালার পাশে রাখা ইনডোর প্ল্যান্টের সবুজ পাতাগুলোও সকালের আলোয় চিকচিক করে উঠছে।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে ইলা মৃদু হেসে ট্রেডমিলের দিকে এগিয়ে গেল। ভোরের এই নিরিবিলি সময়টুকু, নিজের মতো করে উপভোগ করার জন্য সে প্রস্তুত।
ইলা এক্সারসাইজ করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল আটটা বেজে গেছে, তা টেরই পায়নি। শরীরজুড়ে হালকা ঘাম আর মুখে প্রশান্তির ছাপ নিয়ে সে তোয়ালে দিয়ে চুলের ভেজা প্রান্তগুলো মুছতে মুছতে নিজের রুমে ফিরে এলো।
রুমে ঢুকেই তার ঠোঁটে আপনাআপনি একটা হাসি ফুটে উঠল।
বিছানার মাঝখানে পিচ্চি এহান বসে আছে। ঘুম থেকে সদ্য ওঠার কারণে চোখ দুটো আধো-বন্ধ, ছোট ছোট হাত দিয়ে বারবার চোখ ডলছে আর উস্কোখুস্কো চুলগুলো সবদিকে ছড়িয়ে আছে। গোলগাল গাল আর ঘুমজড়ানো মুখটা দেখে মনে হচ্ছে যেন একেবারে তুলতুলে কোনো পুতুল!
এহান এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছিল। হঠাৎ ইলাকে দেখতে পেয়েই তার ছোট্ট মুখটা একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ইলা মুচকি হেসে, তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে- কিরে লাড্ডু ! ঘুম ভেঙে গেল বুঝি? সূর্য মামা তোকে দেখে অলরেডি হেসে দিয়েছে!
এহান: চোখ দুটো পিটপিট করে ইলার দিকে তাকাল। কোনো কথা না বলে ঠোঁট উল্টে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিল।
তার এই ভঙ্গির মানে একদম পরিষ্কার—আগে কোলে নাও, তারপর বাকি সব কথা!
ইলা হেসে এগিয়ে যেতে যেতে বলে-
— ওরে নবাবজাদা রে! ঘুম থেকে উঠেই তার কোলে ওঠা চাই? মুখ না ধুয়ে, ব্রাশ না করে একদম আমার কোলে আসা যাবে না বলে দিলাম!
এহান ইলার টি-শার্ট খপ করে ধরে টান দিয়ে, আধো-ঘুম জড়ানো অভিমানী গলায় বলে-
— লছি... দুত্তু... কোলে নাও! ক্ষুধা লাগছে তো...
এহানের কণ্ঠে বলা কথাটা শুনে ইলার বুকটা হালকা নরম হয়ে গেল। এতটুকু একটা ছেলে, ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে বোনকে খুঁজেছে, তারপর কোলে ওঠার বায়না!
ইলা মায়াভরা চোখে তাকিয়ে বলে-
— আচ্ছা আচ্ছা, আগে কোলে নিই। তারপর মুখ ধোবো, ব্রাশ করবো আর একসাথে নাস্তা করবো। কেমন?
এহান সাথে সাথে মাথা নেড়ে
— হাম!
পরের মুহূর্তেই ইলা তাকে কোলে তুলে নিতেই এহান ছোট্ট দুই হাত দিয়ে বোনের গলা জড়িয়ে ধরল। মাথাটা ইলার কাঁধে রেখে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা এটাই—তার লছির কোল।
ইলা এহানকে ওয়াশরুমে নিয়ে খুব যত্ন করে ফ্রেশ করিয়ে দিল। মুখ ধোয়ানো, ব্রাশ করানো—সবকিছু শেষ করে তাকে কোলে নিয়েই রুমের সঙ্গে লাগানো ছোট্ট মিনি টেরেসে চলে এলো।
মিনি টেরেসটা যেন এক টুকরো স্বর্গ। চারপাশে সারি সারি ইনডোর প্ল্যান্ট, রঙিন ফুলের টব আর সবুজ পাতার সমারোহে জায়গাটা প্রাণবন্ত হয়ে আছে। ঠিক মাঝখানে রয়েছে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার পানির একটি ছোট্ট, মায়াবী সুইমিংপুল। সকালের কোমল আলো পানির ওপর পড়ে এমনভাবে ঝিলমিল করছে, যেন নীল জলের বুকে অসংখ্য হিরের কণা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে।
ইলা এহানকে পুলের পাশে রাখা আরামদায়ক দোলনায় বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য সুইমিংপুলে নামার প্রস্তুতি নিল।
তার গায়ে জড়িয়ে আছে হালকা, আরামদায়ক ও শালীন একটি প্যাস্টেল স্কাই-ব্লু রঙের ড্রেস। ভোরের শান্ত পরিবেশের সঙ্গে পোশাকটাও যেন দারুণ মানিয়ে গেছে।
ইলা আলতো করে পুলের ঠান্ডা পানিতে পা ডুবাতেই এহান দোলনা থেকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
এহান খুশিতে পা দুলিয়ে, আধো-আধো গলায় বলে-
— ওরে বাবা! লোছ তুমি পানিতে নেমে গেছো? পানিগুলান কেমন ঝিলমিল করতাছে!
ইলা মিষ্টি হেসে পানিতে হাত ছিটিয়ে বলল-
— হ্যাঁ রে আমার লাড্ডু বাবু! পানিটা একদম ঠান্ডা আর রিফ্রেশিং। তুমি নামবে নাকি আমার সাথে?
এহান তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে, দোলনাটা শক্ত করে ধরে বলে- না বাবা! আমি নামবো না। আমাল ঠান্ডা লাগবে তো! তুমি থাঁতার কাটো, আমি দোলনায় বথে বথে দেখি। তিন্তু লোছ আপ্পি, পুলে কি মাত আছে?
ইলা খিলখিল করে হেসে বলে-
ধুর পাগলা! সুইমিংপুলে আবার মাছ থাকে নাকি? এটা তো শুধু আপ্পির সাঁতার কাটার জন্য। তুমি লক্ষ্মী ছেলের মতো এখানে বসে থাকো। আপ্পি একটু ফ্রেশ হয়েই তোমাকে নিয়ে নিচে নাস্তা করতে যাবে।
এহান ঠোঁট ফুলিয়ে, পেটের ওপর হাত রেখে বলল-
— আচ্ছা, কিন্তু জলদি আসো লোছ ! আমার পেতে কিন্তু অললেডি ইঁদুর দৌলাদৌলি শুরু কলছে!
ইলা হেসে মাথা নেড়ে বলে-
— তাই নাকি? তাহলে তো লাড্ডু বাবুর জন্য তাড়াতাড়ি উঠতেই হবে। নাহলে ইঁদুরগুলো পুরো সার্কাস শুরু করে দেবে!
এহান সঙ্গে সঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল। আর ইলা ধীরে ধীরে নীল পানির ভেতরে এগিয়ে গেল। ভোরের নরম আলো, চারপাশের ফুলের মিষ্টি সুবাস আর ছোট ভাইয়ের হাসির শব্দ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন এক টুকরো নির্মল সুখে ভরে উঠল।
ইলা সুইমিংপুল থেকে উঠে নরম তোয়ালে দিয়ে চুল আর শরীরের ভেজাভাব মুছতে মুছতে নিজের রুমে ফিরে এলো।
রুমে ঢুকেই সে দরজার দিকে তাকিয়ে একটু জোরে ডাক দিল—
ইলা— আম্মু! একটু এদিকে আসো তো। এহানকে নিচে নিয়ে যাও, আমি ড্রেসটা চেঞ্জ করে ঝটপট আসছি।
ইলার ডাক শুনে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসিমুখে রুমে প্রবেশ করলেন মিসেস চৌধুরী। তিনি দোলনায় বসে থাকা এহানকে কোলে তুলে নিলেন। এহানও বাধ্য ছেলের মতো নানুর কাঁধে মাথা রেখে নিচে চলে গেল।
তাদের চলে যেতে দেখে ইলা আলমারির সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ খুঁজে নিজের পছন্দের পোশাকটা বের করল। তারপর সেটি হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পর যখন সে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হলো, তখন তাকে যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ গোলাপের মতো লাগছিল।
আজ তার পরনে ছিল একদম ট্রেন্ডি অথচ আরামদায়ক একটি ক্যাজুয়াল আউটফিট। ভেতরে পরেছিল ধবধবে সাদা রঙের একটি প্লেইন ফিটেড ট্যাংক টপ। তার ওপর লেয়ারিং করে জড়িয়ে নিয়েছিল পিওর পিঙ্ক রঙের একটি ওভারসাইজড শার্ট। শার্টের বোতামগুলো খোলা রাখা, আর হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত আলতো করে গুটানো—যা তার পুরো লুকে এক ধরনের কিউট অথচ স্মার্ট ভাইব এনে দিয়েছে।
এর সঙ্গে ম্যাচিং করে পরেছিল হাই-ওয়েস্ট লাইট ব্লু রঙের ঢিলেঢালা ওয়াইড-লেগ জিন্স। সাদা টপের সামনের অংশ হালকাভাবে জিন্সের ভেতরে গুঁজে রাখায় সাজটা আরও পরিপাটি আর স্টাইলিশ দেখাচ্ছিল।
পায়ে ছিল একজোড়া ঝকঝকে সাদা স্নিকার্স। গলায় ছোট্ট একটি মিনিমাল সোনালি চেইন আর হাতে একটি সাধারণ গোল্ডেন রিস্টওয়াচ তার সরল সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তুলেছিল।
লম্বা চুলগুলো আজ খোলা রাখা। ভেজা চুলের কিছু এলোমেলো গোছা কাঁধের নিচ বেয়ে কোমড়ে এসে পড়েছে, যা তাকে আরও প্রাণবন্ত আর মায়াবী করে তুলেছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে একবার তাকাল ইলা। সকালের সতেজতা, আত্মবিশ্বাস আর স্বাভাবিক সৌন্দর্যের মিশেলে তাকে আজ ভীষণ উজ্জ্বল লাগছিল।
নিজের এই রিফ্রেশিং লুক দেখে তার ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি একটি মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। তারপর ফোন আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সে দ্রুত নিচে নাস্তার টেবিলের দিকে রওনা দিল, যেখানে তার লাড্ডু বাবু এহান নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত মুখে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
ইলা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ডাইনিং রুমে এসে পৌঁছাল।
ডাইনিং টেবিলে বসে সকালের খবরের কাগজ দেখছিলেন মিস্টার চৌধুরী। ইলাকে আসতে দেখে তিনি মুখ তুলে তাকাতেই মেয়েটা হাসিমুখে এগিয়ে গেল।
ইলা এগিয়ে গিয়ে পাপার গালে আলতো একটা চুমু খেয়ে
— গুড মর্নিং, পাপা!
মিস্টার চৌধুরী: পরম স্নেহে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন বলল-
— গুড মর্নিং, আমার মা! আজ তো তোমাকে একদম পরীর মতো লাগছে।
ইলা হেসে বলে-
— আহা! সকাল সকাল পাপার মিথ্যা প্রশংসা শুরু হয়ে গেছে দেখছি!
বলেই সে পাপার পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল।
ওদিকে পিচ্চি এহান এতক্ষণ তার পাপা কোলে বসে ছিল। কিন্তু নিজের প্রিয় "লছি"কে দেখামাত্রই সে আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। টুপ করে এসে ইলার কোলে উঠে বসল।
এহান— আমি লছির কাছে বসবো!
ইলা হেসে তাকে আরও একটু জড়িয়ে নিল।
এদিকে মিসেস চৌধুরী টেবিলে গরম গরম নাস্তা সাজিয়ে দিচ্ছিলেন। ধোঁয়া ওঠা পরোটা, ডিম, ফল আর জুসে ভরে উঠল পুরো টেবিল।
নাস্তা করতে করতেই ইলা তার পাপার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল। কালকে কোথায় কোথায় ঘুরেছে, কী কী করেছে, কোন জায়গাটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে—সবকিছু একদম বান্ধবীর মতো করে বলছে। আর মিস্টার চৌধুরীও মন দিয়ে মেয়ের সব কথা শুনছেন। পাপা-আম্মুর সঙ্গে ইলার সম্পর্কটা সবসময়ই ছিল বন্ধুর মতো খোলামেলা আর আন্তরিক।
হঠাৎ এক টুকরো রুটি মুখে পুরতে পুরতেই ইলা যেন কিছু মনে করে প্রশ্ন করল—
ইলা— আচ্ছা পাপা, ফুফিরা আসতে আর কয়দিন বাকি আছে গো?
মিস্টার চৌধুরী মুখভরা হাসি নিয়ে বলে-
— আর মাত্র পনেরো দিন আছে মা। তারপরই পুরো বাড়িটা একদম জমজমাট হয়ে উঠবে!
কথাটা শুনে ইলার ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি ফুটলেও কেন জানি বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। অদ্ভুত এক অস্বস্তি এসে মনটাকে ছুঁয়ে গেল। তবে সেই অনুভূতি কাউকে বুঝতে না দিয়ে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
ইলা জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলে-
— ওহ... আচ্ছা।
ঠিক তখনই টেবিলের পাশে রাখা তার ফোনটা হালকা ভাইব্রেশনের সঙ্গে বেজে উঠল।
ইলা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা অচেনা নাম্বার।
ভ্রু কুঁচকে ফোনটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে কলটা কেটে দিল। মনে হলো হয়তো জুনায়েদ, মাইশা কিংবা তাদের কোনো নতুন প্ল্যান নিয়ে কেউ বিরক্ত করতে ফোন দিয়েছে।
কিন্তু কলটা একবার কেটে গেলেও থামল না।
একবার...
দুইবার...
তিনবার...
একই নাম্বার থেকে একের পর এক কল আসতেই থাকল।
এবার বিষয়টা ডাইনিং টেবিলে বসা সবারই নজরে এলো।
মিসেস চৌধুরী ইলার দিকে একটি ডিশ এগিয়ে দিতে দিতে মৃদু ধমকের সুরে বলে-
— ইলা মা, কলটা যখন বারবার আসছেই, তখন ধরেই দেখ না কে ফোন করেছে। এহানকে আমার কাছে দাও, আর তুমি কলটা রিসিভ করো তো।
ইলা কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অচেনা নাম্বারটা আবারও জ্বলজ্বল করছে।
কেন জানি হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি অনুভব হলো...
তবুও সবার কথায় ফোনটা হাতে তুলে নিল সে।
ইলা এহানকে কোল থেকে নামিয়ে মিসেস চৌধুরীর কাছে দিল। তারপর ফোনটা কানে নিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল...
ইলা: হ্যালো?
ওপাশ থেকে অত্যন্ত অস্থির, কাঁপাকাঁপা আর আতঙ্কিত কণ্ঠে আসে- ইলা আপু! ইলা আপু, আমি মাহিমা বলছি!
ইলা অবাক হয়ে বলে- আরে মাহিমা যে! কী খবর? আর তুই এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে তোর?
মাহিমা ওপাশে ডুকরে কেঁদে উঠে বলে- আপু... তোমার বন্ধু মাহিম, আমার ভাইয়া... ভাইয়া ভালো নেই আপু!
ইলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চমকে উঠে বলল- কী হয়েছে মাহিমের? আর তুই কাঁদছিস কেন? স্পষ্ট করে বল!
মাহিমা: ভয়ে ফিসফিস করে, চারপাশ তাকিয়ে বলল- ও... ওরা ভাইয়াকে খুব মারছে আপু! রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব... তা... তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ওরা!
ইলা চোখ-মুখ শক্ত করে, দুই ভ্রু কুঁচকে বলে- "কী বলছিস এসব ছাইপাশ? কে মাহিমকে মারছে? আর কেই বা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, হুম? পরিষ্কার করে নামটা বল!"
মাহিমা: কান্না জড়িত কণ্ঠে কিছু বলতে যাবে আপু, ওরা হলো—.....
ঠিক তখনই ওপাশ থেকে একটা কর্কশ ও নোংরা পুরুষালি কণ্ঠ মাহিমার উদ্দেশ্যে করে বকা ছুঁড়ে দিল...
গুন্ডা:কিরে মাগী! কোন নাগরের সাথে লুকায়ে লুকায়ে কথা বলিস? দেখি, আমিও একটু শুনি তোর নাগরের গলা!
কথাটা শেষ হতেই ওপাশে একটা ধস্তাধস্তির শব্দ হলো। গুন্ডাটা মাহিমার হাত থেকে ফোনটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল। ইলা ফোনের ওপাশ থেকে শুধু মাহিমার একটা আর্তনাদ শুনতে পেল।
গুন্ডাটা ফোন রাখার ঠিক আগ মুহূর্তে ইলার ভেতরের রাগটা একদম চড়া মাথায় উঠে গেল। সে আর চুপ থাকল না, গর্জে উঠে বলা শুরু করল...
ইলা ভীষণ রেগে, কাঁপানো গলায় ইউ বাস্টার্ড! হাউ ডেয়ার ইউ টাচ মাই ফ্রেন্ড অ্যান্ড হিস সিস্টার? লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি, ইউ আর ডিলিং উইথ দ্য রং পারসন! আই উইল হান্ট ইউ ডাউন অ্যান্ড মেক সিওর ইউ রট ইন হেল! ডোন্ট ইউ ডেয়ার হ্যাং আপ দ্য ফোন, ইউ ফিল্দি ক্রাউল!
গুন্ডা: ইলার মুখ থেকে এমন বুলেটের গতিতে কথা শুনে একদম তবদা খেয়ে গেল! সে মাথা চুলকে ভাবল—শালা, এই ছুঁড়ি কী বলল রে ভাই? কিচ্ছু তো মাথায় ঢুকল না!
গুন্ডা খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, পরক্ষণেই আবার রেগে গিয়ে খেঁকিয়ে বলে উঠল- আবে ও জ্যাদা শিয়ানি! ইয়ে ক্যায়া ফটর-ফটর ইংরেজি ঝাড় রহি হ্যায় বে? ক্যায়া বোলা কুছ সমঝ নেহি আয়া! আবে ইয়ে তো কোই লড়কি হ্যায়! ও ছোরি, জ্যাদা ইংরেজি মত ঝাড়, আপনে দেশ কি ভাষা মে বাত কর!
ইলা তখন রাগের মাথায় অনর্গল গুন্ডাটাকে ফোনে বকা দিয়েই যাচ্ছে। সে এক্কেবারে ভুলেই গেছে যে তার ঠিক সামনেই তার পাপা আর আম্মু অবাক হয়ে বসে আছেন, আর ছোট পিচ্চি এহান তো তার লোছি এমন রুদ্রমূর্তি দেখে পুরো হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে!
গুন্ডা ফোনের ওপাশ থেকে ইলার এই তেজ দেখে রাগে অন্ধ হয়ে গেল। সে দাঁত কিড়মিড় করে মাহিমাকে লক্ষ্য করে বলল- বহুত জবান চল রহি হ্যায় না তেরি দিদি কি? রুক তুঝে বাতাতা হুঁ!
বলেই লোকটা মাহিমার গালে সজোরে 'টাস' করে একটা চড় কষিয়ে দিল। ওপাশ থেকে চড়ের সেই ধারালো শব্দ আর মাহিমার আর্তনাদ শুনে ইলা মুহূর্তে একদম নরম হয়ে গেল, তার ভেতরের সব রাগ এক সেকেন্ডে ভয়ে রূপ নিল...
ইলা ভয়ে আর আতঙ্কে গলা কাঁপিয়ে বলল- মাহিমা...! এই জানোয়ার, তুই মাহিমাকে মারছিস কেন? ছাড় ওকে!
গুন্ডা: মাহিমাকে আরও কয়েকটা আঘাত করল এবং নানা রকম নোংরা ও বাজে ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকল। সে নোংরা হেসে বলল- আউর চিল্লাও! আব আপনে দেশ কি ভাষা মে রো!
মাহিমা ওপাশ থেকে ব্যথায় আর আতঙ্কে চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে ইলার উদ্দেশ্যে মরণপণ আকুতি জানিয়ে বলল- আপু...! প্লিজ আপু, আমাদের এসে বাঁচাও! এরা আমাদের মেরে ফেলবে আপু! প্লিজ কিছু একটা করো... আহহহ!
মাহিমার এই বুকফাটা কান্না আর গুন্ডাদের অমানুষিক অত্যাচার ফোনের ওপাশ থেকে আর সহ্য করতে পারল না ইলা। তার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল, আর কোনো উপায় না পেয়ে সে আর একটা শব্দও না বলে ধপ করে কলটা কেটে দিল। পুরো ডাইনিং রুমে তখন পিনপতন নীরবতা...)
মেয়ের এমন ফ্যাকাশে মুখ আর কাঁপতে থাকা হাত দেখে মিস্টার চৌধুরী আর স্থির থাকতে পারলেন না।
মিস্টার চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে পরম স্নেহে মেয়ের মাথায় হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন-
কী হয়েছে মা? এমন করছিস কেন? কে ফোন করেছিল?
ইলা: কোনো উত্তর দিতে পারল না। পাপার হাতের স্নেহমাখা স্পর্শ পেতেই ভেতরে জমে থাকা বাঁধটা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। সে নিঃশব্দে মিস্টার চৌধুরীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার চোখের পানি ধীরে ধীরে পাপার শার্টের কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
ইলা: কিছুক্ষণ পর কান্না সামলে নিচু গলায় বলল- পাপা... আম্মুকে বলো এহানকে একটু হলরুমে নিয়ে যেতে। আমি চাই না ও এসব দেখুক বা শুনুক।
মিস্টার চৌকরলে মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মিসেস চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলেন।
মিসেস চৌধুরী আর কোনো প্রশ্ন না করে এহানকে কোলে তুলে নিয়ে হলরুমের দিকে চলে গেলেন।
ইলা: পাপার বুক থেকে মাথা তুলে লাল হয়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে বলল- পাপা... মাহিম ভালো নেই! আমার মনে হচ্ছে ও এবার খুব বড় কোনো সমস্যায় পড়েছে!
মিস্টার চৌধুরী উদ্বিগ্ন হয়ে বলে- মাহিম.. কী হয়েছে ওর?
ইলা: গলা কাঁপতে কাঁপতে বলল- ওপাশ থেকে মাহিমা কাঁদছিল, পাপা। ওরা মাহিমাকেও খুব মেরেছে! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না... কী হচ্ছে এসব!
একটু থেমে গভীর শ্বাস নিল - পাপা, তুমি প্লিজ এখনই জুনায়েদকে একটা ফোন করো। ওকে বলো আমি আজ ভার্সিটিতে যাব না। আর ও যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সায়রা আর মাইশাকে নিয়ে চৌধুরী ভিলায় চলে আসে।
চোখের কোণে আবার জল জমে উঠল।
ইলা আমাদের এখনই কিছু একটা করতে হবে, পাপা। এর আগেই যদি আরও বড় কিছু হয়ে যায়...!
ইলার কথা শুনে মিস্টার চৌধুরী আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি দ্রুত ফোন বের করে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অর্থাৎ সায়রার আব্বুকে কল দিলেন।
মিস্টার চৌধুরী গম্ভীর গলায় বলে- দোস্ত, খুব জরুরি একটা কাজ আছে। এক ঘণ্টার মধ্যে ইন্ডিয়ার চারটা এয়ার টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারবি?
সায়রার আব্বু অবাক হয়ে বলে- আরে দোস্ত! এই শেষ মুহূর্তে এক ঘণ্টার মধ্যে চারটা টিকিট? কী হয়েছে? কোনো সমস্যা নাকি?
হঠাৎ ইলা পাপার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল।
ইলা অস্থির গলায় বলল- আঙ্কেল, প্লিজ! এত কিছু এখন বলতে পারব না। আপনি আগে টিকিটের ব্যবস্থা করে দিন। পরে সব জেনে নিয়েন।
সায়রার আব্বু চমকে উঠে বলল- মামনি? তুমি? কিন্তু হঠাৎ ইন্ডিয়া—
ইলা জোর করে স্বাভাবিক শোনানোর চেষ্টা করে বলল- আর শুনেন আঙ্কেল, আমরা এক সপ্তাহের জন্য ইন্ডিয়া ঘুরতে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে সায়রাও যাবে। ও এখনো কিছু জানে না, আমি ওকে সারপ্রাইজ দিতে চাই। তাই প্লিজ, ওকে কিছু বলবেন না। আপনি শুধু দ্রুত টিকিটের ব্যবস্থা করে দিন।
সায়রার আব্বু: হেসে উঠলেন বলল- ওহ, এই ব্যাপার! আচ্ছা পাগলি, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি এখনই দেখছি কী করা যায়।
ফোন কেটে যেতেই ইলা গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমল না। এখন তার মাথায় শুধু একটাই নাম ঘুরছে— মাহিম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জুনায়েদ, সায়রা আর মাইশা হন্তদন্ত হয়ে চৌধুরী ভিলায় এসে পৌঁছাল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ইলা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না...
ইলা অত্যন্ত গম্ভীর আর কাঁপাকাঁপা গলায় ফোনের ওপাশের সব ঘটনা—মাহিমকে মারধর করা, গুন্ডাদের সেই ভয়ঙ্কর হুমকি আর মাহিমার আর্তনাদ—সব একনাগাড়ে বন্ধুদের সামনে খুলে বলল।
জুনায়েদ ইলার কথা শুনে পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল, তার পা যেন মেঝের সাথে লেপ্টে গেল সে বলে- কী বলছিস এসব ইলা? মাহিম ইন্ডিয়া তার বাসায় গিয়ে এমন কোন গ্যাংস্টারদের খপ্পরে পড়েছে? ওহ গড!
সায়রা ও মাইশা: (মাহিমের ওপর এমন অমানুষিক অত্যাচারের কথা শুনে আর নিজেদের ধরে রাখতে পারল না। দুজনেই চরম আতঙ্কে আর কান্নায় ভেঙে পড়ল ইলা...! এখন কী হবে? ওরা মাহিমকে মেরে ফেলবে না তো? আমাদের মাহিম কোথায় আছে এখন?
ইলা শক্ত গলায় বলল- কাঁদতে বসার সময় এখন না! আমাদের এখনই বের হতে হবে।
মিস্টার চৌধুরী ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে তাড়াহুড়ো করে ঢুকলেন, তাঁর হাতে ফোন নিয়ে বলল- আম্মু ইলা, জুনায়েদ... তোরা সবাই রেডি হ! সায়রার আব্বু টিকিট কনফার্ম করে ফেলেছে। আমাদের টিকিট কাটা শেষ! ঠিক এক ঘণ্টা পর আমাদের ফ্লাইট!
সায়রা চোখ মুছতে মুছতে আকাশ থেকে পড়ে বলে- কী! এক ঘণ্টা পর ফ্লাইট? কিন্তু আঙ্কেল, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আর আমার পাসপোর্ট-ব্যাগ তো কিচ্ছু সাথে নেই!
মিস্টার চৌধুরী সায়রার কাঁধে হাত রেখে বলে- ওসব আমি আর তোর আব্বু মিলে ম্যানেজ করে নিয়েছি মা। তোদের পাসপোর্ট অলরেডি এয়ারপোর্টে চলে গেছে। এখন আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করা যাবে না, জলদি গাড়িতে ওঠ সবাই!
ইলা ছোট পিচ্চি এহানকে অনেক আদর করে, "আপ্পি তোমার জন্য মস্ত বড় চকলেট আর আরো অনেক কিছু নিয়ে আসবে" বলে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করল। তারপর জুনায়েদদের সাথে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হলো...
মিস্টার চৌধুরী আর সায়রার আব্বু ওদের গাড়ি করে একদম এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। সব ফরমালিটি শেষ করে চার বন্ধু অবশেষে ইন্ডিয়াগামী ফ্লাইটের ভেতরে এসে নিজেদের সিটে বসল। প্লেন আকাশে ওড়ার পর চারপাশের পরিবেশটা একটু শান্ত হতেই জুনায়েদ একদম গম্ভীর মুখ করে কথা শুরু করল।
জুনায়েদ একদম সিরিয়াস মুখ করে, কপালে তিনটা ভাঁজ ফেলে বলে- আচ্ছা ইলা, একটা কথা বল তো... ওই বলদটা ওর দেশে যেয়ে এমন খপ্পরে কীভাবে এমন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ঝামেলায় জড়াল রে? ও কি ওখানে প্রেম করতে গেছিল নাকি গুন্ডাদের লুঙ্গি চুরি করতে গেছিল?
মাইশা জুনায়েদের মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলে- ধুর জাওড়া! এই সিরিয়াস সময়েও তোর ফাজলামি যায় না না?
মুখটা মলিন করে ইলার দিকে তাকিয়ে বলে- আচ্ছা ইলা, আমরা না হয় মুম্বাই যাচ্ছি, কিন্তু ওখানে গিয়ে হুট করে আমরা কী করব বল তো? আমাদের তো কোনো প্ল্যানই নেই!
ইলা চোখ-মুখ শক্ত করে, নিচু কিন্তু চাবুক গলায় বলল- প্ল্যান অলরেডি হয়ে গেছে। তোরা শুধু কান খুলে শোন... মুম্বাই এয়ারপোর্টে নেমেই জুনায়েদ তুই একটা লোকাল সিম আর গাড়ি ভাড়া করবি। আর মাইশা-সায়রা তোরা মাহিমার লাস্ট লোকেশনটা ট্র্যাক করার চেষ্টা করবি। আমি অলরেডি মুম্বাইয়ের একজন চেনা সোর্সের সাথে কথা বলেছি, ও আমাদের ব্যাকআপ দেবে। যদি গুন্ডারা বেশি ত্যাড়্যামি করে, তবে ওই মাটিতেই ওদের এমন ধোলাই দেবো আমি যে বাপের নাম ভুলে যাবে!
জুনায়েদ ইলার এমন চাবুক আর ডেঞ্জারাস প্ল্যান শুনে একদম সোজা হয়ে বসল। তারপর আবার সিরিয়াস মুখে ফিসফিস করে বলল- " দোস্ত, গুন্ডাদের মারার সময় আমাকে শুধু একটা লাঠি দিস। আমি ছোটবেলা থেকে গুন্ডা মারার প্র্যাকটিস করছি... মানে, মনে মনে আর কী!
সায়রা, মাইশা -জুনায়েদের কথায় হেসে ফেললেও, তারা মনে মনে ইলার দিকে তাকিয়ে একদম অবাক হয়ে গেল। তারা তিনজনই মনে মনে ভাবল—আসলেই, বিপদের দিনে ইলার মতো এমন একটা চাবুক আর কেয়ারিং বেস্ট ফ্রেন্ড পেয়েছে বলে তারা কতটা লাকি!
তাদের সবার মনে তখন একটাই চিন্তা—
মাহিমকে খুঁজে বের করতেই হবে।
চলবে......