ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

১৭তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#পর্বঃ১৬ (প্রথমাংশ)

~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ🚫 ~~

আগের রাতের সেই ভয়ংকর ঝড়-ঝাপটা, দৌড়ঝাঁপ আর হুল্লোড়ের পর মাহিমের বাসায় আজকের সকালটা যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি নিয়ে ধরা দিল। রাতের সব আতঙ্ক আর ক্লান্তি ভুলে সায়রা, মাইশা আর মাহিমা একই রুমে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। আর ইলার হাতের ইনজুরির কারণে ওকে দেওয়া হয়েছে একটি আলাদা, ছিমছাম রুম।

সকাল ঠিক ছয়টা। পুরো বাড়িটা এখনো নিঝুম, চারপাশে নীরবতার রাজত্ব। ইলার রুমের জানালার কাঁচ ভেদ করে ভোরের নরম, সোনালি রোদ এসে আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার ঘুমন্ত মুখশ্রী। ঘুমের ঘোরে ইলার সেই চিরচেনা গম্ভীর, কঠোর আর রাগী চেহারাটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা বুকের ওপর শান্তভাবে রাখা, আর জানালা দিয়ে আসা রোদের কোমল আলো তার গাল আর বন্ধ চোখের পাতার ওপর মায়াবী এক খেলা খেলছে।

এই মুহূর্তে ইলাকে দেখলে কেউই বিশ্বাস করবে না, এই মেয়েটাই রাতের অন্ধকারে একাই ভয়ংকর গ্যাংস্টারদের মোকাবিলা করে এসেছে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় তাকে আজ অসাধারণ শান্ত।

দেখতে দেখতে সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় নয়টা বেজে গেছে। ইলা তখনও মটকা মেরে ঘুমাচ্ছে দেখে সায়রা, মাইশা, জুনায়েদ আর মাহিম এক্কেবারে দলবল বেঁধে ওর রুমে ঢুকে কানের কাছে এসে চিল্লাচিল্লি আর হুল্লোড় শুরু করে দিল। ওদের ওই চিৎকারের জ্বালায় টিকতে না পেরে ইলা ধড়ফড় করে উঠে বসল...

ঘুমের চোখে চুলগুলো টেনে, চাবুক গলায় বলল, "ওই জাওড়ার দল! সকাল সকাল কার গোয়ালে আগুন লাগছে রে? তোরা আমার রুমের ভেতর এসে এমন গরুর মতো ব্যা ব্যা করতাছোস কেন, হ্যাঁ?"

​সায়রা ভ্রু কুঁচকে, কোমরে হাত দিয়ে বলে, "তো তুই এমন মরার মতো কুত্তা-ঘুমানো ঘুমাচ্ছিস কেন শুনি? নয়টা বেজে গেছে তোর কোনো হুঁশ আছে?"

​মাইশা মুখ বাঁকিয়ে বলে, "এই ইলা! আমরা এত কষ্ট করে আসলাম, তো আমরা কি এখন ঘুরবো-ফিরবো নাকি সারাদিন এই জেলখানার মতো বাসায় বন্দি হয়ে থাকবো?"

​জুনায়েদ দুই হাত মাথায় দিয়ে, বলে, "ওরে আমার চান্দু মায়েরে! তুই কি এখানে শুধু শুধু খাওয়া আর এই খাটের ওপর পাছা চুলকে ঘুমানোর জন্য আসছিস? আমরা বাইরে ঘোরার প্ল্যান করছি আর তুই এখানে কুম্ভকর্ণের নাতনি সেজে আছিস!"

​ইলা চোখ গরম করে জুনায়েদকে বালিশ তুলে মারার ভঙ্গি করে বলে, "ওই জুনায়েদ, মুখ সামলে কথা বলবি! তোরা চারজনে মিলে তো কুত্তার মতো একনাগাড়ে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছিস, আমাকে কিছু বলতে দিচ্ছিস?"

​মাহিম সোফার ওপর পা তুলে বসে বলল," আচ্ছা বল তুই, তোকে না করছে কে? দেখি তোর মহারানীর মুখে কী বাণী বের হয়!"

​ইলা এক ঝটকায় চোখ চকচক করে উঠল, মাহিমের দিকে তাকিয়ে বলে, "এই মাহিম! আজকে কি এই এলাকায় কোথাও কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড বাইক রেস হবে রে? আমার হাত একদম নিশপিশ করছে, আজকে আমি একটা খতরনাক বাইক রাইড দিবো!"

​জুনায়েদ কপালে হাত দিয়ে, নিজের স্বভাবসুলভ ফানি বকা দিয়ে বলে "নে! বাল ছেঁড়ো, কুত্তার লেজ কোনোদিন সোজা হয় না! শুরু হয়ে গেল এই লেডি ডনের আবার সেই বাইকের ভূত! একে এখন ফাঁসি দিলেও এর কোনো হাহুতাশ নাই, শুধু বলবে—'ফাঁসি পরে দিবো, আগে কাওয়াসাকি বাইকটা দে!'"

​জুনায়েদের এই কথা শুনে মাহিম আর মাইশারা হেসেই খুন!

​জুনায়েদ একটু থেমে, ইলার কানের কাছে গিয়ে নরম সুরে আবার বললেন, "আরে মেরী মা! আমরা এখানে আসছিলাম এই বলদা মাহিম আর মাহিমাকে বাঁচাতে। যেহেতু ওই কুত্তা আরবাজের গুষ্টি উদ্ধার করে ওদের বাঁচায় ফেলছি, তো এখন আর কোনো টেনশন নাই। যে কয়দিন আছি, শুধু ঘুরবো, খাবো আর বিন্দাস চিল করবো, বুঝছিস?"

ইলা চোখ রাঙিয়ে বলে, "ঠিক আছে যা, তোরা এখন জলদি রেডি হ। আমরা একবারে নাস্তা করে বাইরে বের হবো। আর হ্যাঁ, মনে থাকে যেন—সারাদিন ঘোরার পর কিন্তু আমি একটা খতরনাক বাইক রাইড দিবো!"

​জুনায়েদ দুই হাত জোড় করে বলে"ওরে মা, মাফ চাচ্ছি! আমি তোর সাথে কোনো বাইক রাইড-ফাইডে নাই! তুই হলি রেসিং ট্র্যাকের চ্যাম্পিয়ন লেডি, তোর সাথে টক্কর দিতে গেলে আমার হাড্ডিগুড্ডির আর সোজা হয়ে বাড়ি ফেরা লাগবে না। তুই একাই ওই যমদূত ছোটাস, আমরা পেছন থেকে তালি বাজাবো!"

​জুনায়েদের এমন কথা শুনে ইলা খাট থেকে জুতো ছুড়ে মারার জন্য উঠতেই জুনায়েদ এক দৌড়ে রুম থেকে হাওয়া হয়ে গেল। ইলা শব্দ করে হেসে ওয়াশরুমে গিয়ে একটা ফ্রেশ শাওয়ার নিল। বের হয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে তার কোমর সমান লম্বা সিল্কি চুলগুলো শুকিয়ে নিল। তারপর চুলে একটা হালকা মেস-বান করে পেছনের চুলে একটা কালো রিবন ক্লিপ আটকে দিল। ঠোঁটে আলতো করে ছোঁয়ালো নিউড লিপস্টিক। গায়ে জড়ালো একটা সাদা হাই-নেক ইনার, আর ওপর দিয়ে কালো টি- শাট আর ম্যাচিং কালো বেগি প্যান্ট। পায়ে সাদা নিউ ব্যালেন্স স্নিকার্স। জাস্ট বসের মতো মায়াবী দেখাচ্ছে ওকে! ও হলরুমে এসে বসতেই সায়রা আর মাইশা রেডি হয়ে ঘরে ঢুকল...

​সায়রা চোখ বড় বড় করে বলে- "ওরে বাবারে ইলা! তোকে আজকে জাস্ট আগুন লাগছে রে! এই অল-ব্ল্যাক ড্রেসআপে তোকে পুরো ইন্টারন্যাশন্যাল মডেলদের মতো দেখাচ্ছে!"

​মাইশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-"ধুর ভাই! ওর তো কোনো মেকআপই লাগে না, শুধু একটা নিউড লিপস্টিক দিলেই জাস্ট স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরী লাগে। আর আমাদের দেখো—এক গাদা মেকআপের প্রলেপ দিয়েও মেছোরানীর মতো লাগে!"

​জুনায়েদ হুট করে রুমে ঢুকে মাইশা আর সায়রার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে" তোরা একদম ঠিক বলছিস মাইশা! তোদের মুখের আটা-ময়দা মাখাটা আজকে একটু কমই হয়েছে। আরেকটু থুপলে বেশি ভালো লাগতো! যদিও এখন পেতনি আর ডাইনী লাগছিস, আরেকটু দিলে হয়তো আফ্রিকার জংলি বান্দর লাগতি!"

​সায়রা রেগে চিৎকার করে বলে, "ওই জুনায়েদ! মুখ সামলে কথা বলবি! আমরা কি আটা মেখেছি নাকি?"

​জুনায়েদ নিজের স্বভাবসুলভ গলায় বলে, " আটা না তো কী? তোদের এই ময়দার বস্তা মার্কা মেকআপ দেখে তো পাশের বাসার কুত্তাটাও ভয় পেয়ে ঘেউ ঘেউ করা বন্ধ করে দেবে! ওদিকে দেখ, আমাদের ইলা আপা কোনো ঘষামাজা ছাড়াই জাস্ট বোম লাগছে!"

​ইলা একগাল হেসে, জুনায়েদকে ধমক দিয়ে বলল, "ওই জুনায়েদ, সকাল সকাল মেয়েদের সাথে জাওড়ামি করবি না একদম! চল, এখন ড্রয়িংরুমে চল।"

​ওরা সবাই যখন হলরুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে যাচ্ছিল, তখন মাহিমের বাসার ছোট-বড় প্রায় সব মানুষ ইলার ওই রাজকীয়, স্টাইলিশ আর মারাত্মক মায়াবী চেহারার দিকে জাস্ট হা করে তাকিয়ে রইল। কেউ যেন চোখ সরাতেই পারছিল না!

ড্রয়িংরুমের সব মানুষ যখন ইলার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিল, তখন পরিস্থিতি দেখে জুনায়েদ প্রথমে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল—'বিচ্চু এহান , এখানে থাকলে তো আজকে ইলার রূপ দেখতে দেখতেই সবার দিন পার হয়ে যাবে!' ভেবে বলতো কতো কি,এরপর ও হুট করে গলা উঁচিয়ে, এখানের মতো বলার ভঙ্গিতে নকল করে চিল্লিয়ে উঠল...

"তেউ আমাল লোছির (রোজির) দিকে তাকাবে না! খবলদাল বলে দিচ্ছি, যে তাকাবে তার চোখ কিন্তু আমি এক্কেবারে টাস কলে উপলে নেব!"

​জুনায়েদের এই বাচ্চার মতো ভেংচি আর এহানের বলা 'লোছি' আর ডায়লগ শুনে পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির এক বিশাল রোল পড়ে গেল! মাহিম আর মাইশারা তো হাসতে হাসতে সোফায় লুটিয়ে পড়ল। ইলা তখন তার সেই চোখ দুটো রাঙিয়ে খতরনাক লুকে জুনায়েদের দিকে তাকাল। সেই চাহনি দেখা মাত্রই...

​জুনায়েদ ভয়ে এক সেকেন্ডে নিজের মুখে হাত চেপে ধরে, চোখ গোল গোল করে ফিসফিসিয়ে বলে- "ওরে বাবারে! ডন মাইন্ড করেছে! আমি একদম চুপ, মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছি!"

​এরপর ওরা সবাই মিলে টেবিল গরম করে হাসিমুখে চমৎকার নাস্তা শেষ করল। নাস্তা শেষেই শুরু হলো ওদের আসল মিশন—আন্ধেরির উদ্দেশ্যে বাইক রাইড! মাহিমের বাইকের পেছনে বসল মাহিমা, জুনায়েদের বাইকে মাইশা, আর ইলার সেই রাজকীয় স্পোর্টস বাইকের পেছনে রাজকন্যার মতো চেপে বসল সায়রা। তিনটা বাইকের স্টার্ট নেওয়ার গগনবিদারী আওয়াজে পুরো এলাকা কেঁপে উঠল এবং ওরা নিমেষেই হাইওয়েতে হাওয়া হয়ে গেল...

​মুম্বাইয়ের আন্ধেরির কাছাকাছি একটা বিশাল মেলার মতো স্পটে ওরা যখন পৌঁছাল, তখন চারদিকের জমকালো আলো আর ভিড় দেখে জুনায়েদের ফাজলামো আবার শুরু হয়ে গেল। মেলায় ঢুকে ওরা প্রথমে গেল সেই বিখ্যাত 'মৃত্যুকূপ' বা 'মউত কা কুয়া'র মোটরবাইকের খেলা দেখতে...

​ইলা উত্তেজিত হয়ে বলে, "ওয়াও মাহিম! দেখেছিস লোকটা দেওয়ালের ওপর কীভাবে বাইক ঘুরাচ্ছে? জাস্ট অসাম! আমার নিজেরই এখন বাইক নিয়ে ওই কূপে নেমে যেতে ইচ্ছা করছে!"

​জুনায়েদ আঁতকে উঠে বলে, "ওই ইলা, তোকে হাত জোড় করে বলছি, তুই ওখানে নামিস না! তোর ওই চ্যাম্পিয়ন গিরি দেখাতে গিয়ে যদি হুট করে আছাড় খাস, তবে তোর ব্লেজার ছিঁড়ে পাছা কিন্তু এক্কেবারে লাল হয়ে যাবে! তখন আন্ধেরির মানুষ তোকে ইলা ডন না, 'ছেঁড়া পাছা ডন' বলে ডাকবে!"

​মাইশা হেসে কুটি কুটি হয়ে জুনায়েদের পিঠে থাপ্পড় মেরে বলে, "ওই জুনায়েদ! তুই এত অসভ্য আর বেফাঁস কথা কেন বলিস রে সবসময়? "

​জুনায়েদ বিন্দাস ভঙ্গিতে বলে, "আরে আমি তো সত্যি কথাই বললাম! আচ্ছা চল, আমরা ওই আকাশের সমান উঁচু নাগরদোলা বা 'জায়ান্ট হুইল'-এ উঠি। ওটায় চড়লে পুরো মুম্বাই শহর দেখা যাবে।"

​সবাই রাজি হয়ে টিকিট কেটে সেই মারাত্মক উঁচু নাগরদোলায় গিয়ে বসল। নাগরদোলা যখন এক্কেবারে টঙে গিয়ে পৌঁছাল, তখন ওপরের তীব্র বাতাস আর ঝাঁকুনিতে সায়রা আর মাইশা ভয়ে চিৎকার করে ইলাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ইলা তো লেডি ডন, ও বিন্দাস হাসছিল। ওদিকে জুনায়েদের অবস্থা তখন এক্কেবারে কেরোসিন!

​জুনায়েদ নাগরদোলার লোহার রড দুটো দুই হাত দিয়ে খামচে ধরে, চোখ-মুখ খিঁচিয়ে, কাঁপানো গলায় বলে,"ওরে মা রে! ওরে কে কোথায় আছিস রে, আমাকে নামা! এই নাগরদোলার বাচ্চা যদি এখন হুট করে ভেঙে পড়ে, তবে আমার আস্ত কলিজাটা মুখ দিয়ে বের হয়ে আন্ধেরির ড্রেনে গিয়ে পড়বে রে!

​মাহিম হাসতে হাসতে মোবাইল বের করে জুনায়েদের ভিডিও করতে করতে বলে, "ওই জুনায়েদ, তুই না একটু আগে বড় বড় কথা বলছিলি? এখন তোর প্যান্টের কী অবস্থা রে? ভিজে গেছে নাকি?"

​জুনায়েদ ভয়ে কেঁদে ফেলার মতো করে বলে,"ভাইরে ভাই! প্যান্ট শুধু ভিজেনি, ভেতরে মনে হচ্ছে একদম সুনামি হয়ে গেছে! এই ইলা, তুই তো ডন রে, তোর ওই কাটা হাত দিয়ে জলদি একটা চড় মেরে এই কুত্তার নাগরদোলাটা থামানা প্লিজ! আমি নামলে তোদের সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াবো, তাও আমাকে বাঁচা!

​জুনায়েদের এই অবস্থা দেখে ইলা, সায়রা, মাইশা আর মাহিম, মাহিমা নাগরদোলার ওপরেই হাসতে হাসতে জাস্ট শেষ হয়ে গেল! পুরো মেলা প্রাঙ্গণ যেন ওদের এই পাঁচ বন্ধুর ফাজলামো আর হাসির শব্দে এক্কেবারে মুখরিত হয়ে উঠল...

মেলা শেষে তখন ঠিক সন্ধ্যা সাতটা বাজে। চারদিকে গোধূলির আলো ফুরিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ওরা সবাই যখন বাইকের কাছে এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনই ইলার আইফোনে একটা বিশেষ নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে আসা মেসেজটার দিকে চোখ পড়তেই ইলার মায়াবী চেহারাটা চকচক করে ওঠে! ও এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ফোনটা পকেটে চালান করে দিল। সায়রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইলা ওকে এক ঝটকায় নিজের বাইকের পেছনে টেনে বসাল এবং গিয়ার চেপে জাস্ট ঝড়ের গতিতে বাইক স্টার্ট দিয়ে চোখের পলকে হাইওয়েতে হাওয়া হয়ে গেল! ওরা সবাই তো হা করে তাকিয়ে রইল...

​জুনায়েদ চোখ কপালে তুলে, চিল্লিয়ে বলে, "ওই শালার ঘরের শালা! এই সাইকো ডন মেয়েটার কি হুট করে পাছায় আগুন লাগলো নাকি রে? আমাদের সবাইকে এভাবে রাস্তায় ফেলে দিয়ে জাস্ট রকেটের মতো উড়ে গেল!"

​মাইশা আতঙ্কে জুনায়েদের হাত টেনে বলে"ওই জুনায়েদ, বকবক বন্ধ কর! সায়রা কিন্তু ইলার পেছনে আছে, কোনো বিপদ হওয়ার আগে জলদি ওটার পিছু নে!"

​পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জুনায়েদ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ও নিজের বাইকে মাইশাকে সামনে আর মাহিমের বাইক থেকে নামিয়ে সায়রাকে পেছনে—অর্থাৎ দুজনকে একসাথে নিজের বাইকে বসিয়ে ইলার উদ্দেশ্যে ফুল স্পিডে রেস ছেড়ে দিল! হাইওয়ের তীব্র বাতাস ভেদ করে জুনায়েদ তখন নিজের স্বভাবসুলভ বেফাঁস গলায় ইলার উদ্দেশ্যে দূর থেকে চিল্লাতে শুরু করল...

​" ওই ইলা! ওই পেতনি! তোর কোন নানার বাড়ি থেকে বিয়ের নোটিশ আসছে রে যে তুই এভাবে যমদূতের মতো বাইক ছোটাইতাছিস? একটু আস্তে চালা মায়েরে! তোর পেছনে আস্ত মুটি মেয়েকে নিয়ে আমি এখানে একা বাইক ব্যালেন্স করতে গিয়ে আমার নিজেরই তো গু-মূত্র এক হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছে! তুই কি আজকে আমাদের সবাইকে আন্ধেরির রাস্তায় লাশ বানিয়েই ছাড়বি নাকি?!

হাইওয়ের বুক চিরে আন্ধেরির এক কোণে, শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে থাকা বিশাল এক পরিত্যক্ত স্টেডিয়ামের মতো জায়গায় এসে ইলা হঠাৎ ব্রেক কষল। চারদিকে ফ্লাডলাইটের ঝলমলে আলো, দামি রেসিং বাইকের ইঞ্জিনের গগনবিদারী গর্জন আর উত্তেজনায় ফেটে পড়া জনতার চিৎকার—পুরো জায়গাটাই যেন কোনো বিপজ্জনক আন্ডারগ্রাউন্ড জগতের অংশ।

বাইক থামানো মাত্রই সায়রা এক ঝটকায় সিট থেকে নেমে রাস্তার ওপর ধপ করে বসে পড়ল।

দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে, কাঁপা গলায় বলে,"ওরে বাবারে বাবা! আমি কি আসলেই বেঁচে আছি, নাকি অলরেডি পটল তুলে শহীদ হিসেবে পরপারে চলে গেছি?ওই ইলা, তুই বাইক চালাচ্ছিলি নাকি ফাইটার জেট ওড়াচ্ছিলি রে সাইকো মেয়ে? আমার তো মনে হচ্ছিল বাতাসেই আত্মাটা দেহ ছেড়ে আন্ধেরির আকাশে উড়াল দিছে!

ইলা হেলমেট খুলে একগাল হেসে, সায়রাকে টেনে তুলতে তুলতে বলে," আরে সায়ু, শান্ত হ! তুই একদম ঠিকঠাক আছিস। আর দেখ, অবশেষে আমরা আমাদের আসল গন্তব্যে চলে এসেছি!"

ঠিক তখনই জুনায়েদ, মাইশা আর মাহিম হাঁপাতে হাঁপাতে বাইক নিয়ে সেখানে এসে ব্রেক কষল। চারপাশের খতরনাক রেসিং ট্র্যাক, ভয়ংকর সব রাইডার আর মাফিয়া-ভাইবের পরিবেশ দেখে ওদের চোখ প্রায় কপালে উঠে গেল।

জুনায়েদ বাইক থেকে নেমে কপালে হাত দিয়ে বলে,"হালার ঘরের হালা! এই মেয়ে এত রাতে এই যমদূতের আখড়ায় আসার জন্য ওইভাবে রেস ছুটিয়ে আসছে?! তোর কি জানের কোনো ভয়ডর নাই রে ইলা?"

মাহিম রেগে গিয়ে ইলার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, "ইলা, তুই কি আস্ত একটা পাগল? তুই জানিস মাঝরাস্তায় তোকে হারিয়ে ফেলে আমরা কতটা ভয় পেয়েছিলাম? যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটত?"

মাইশা চারদিকের হাই-ফাই সেটআপ দেখে অবাক হয়ে বলে," আচ্ছা ইলা, মুম্বাইয়ের এই আন্ডারগ্রাউন্ড রেসিং ট্র্যাকের খোঁজ তুই আন্ধেরির বুকে কোথায় পেলি?"

ইলা রহস্যময় হাসি দিয়ে ফোনটা পকেটে রেখে বলে, "মেহেদী মেসেজ করে এই সিক্রেট ট্র্যাকের লোকেশন পাঠিয়েছে। শুধু তাই না, আমার নামে এন্ট্রি আর সব পেপারওয়ার্কও ও আগেই কমপ্লিট করে ফেলেছে। রেসটা শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই!

সায়রা চোখ কপালে তুলে ,কী বললি?! তুই এই ইনজুরি হাত নিয়ে এখন রেসে নামবি? তুই কি আমাদের সবাইকে আজ রাতে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মারার প্ল্যান করছিস?"

মাহিম ইলার ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতের দিকে তাকিয়ে বলে, "একদম না! তোর হাত কাটা। এই অবস্থায় আমি তোকে কোনোভাবেই রেসে নামতে দেব না।"

জুনায়েদ চারপাশের রেসারদের দিকে তাকিয়ে বলে,"ওরে মাহিম, তুই একে চিল্লাইয়া থামাইতে পারবি না! এর রগে রগে এখন রক্তের বদলে কাওয়াসাকির মবিল বইতাছে! তুই শুধু দেখ, এই কাটা হাত নিয়েই যদি সবাইরে পিছনে ফালায় দেয়!"

ঠিক তখনই চারদিকের লাউডস্পিকারে ঘোষকের গর্জন ভেসে উঠল—

"লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন! মুম্বাই আন্ডারগ্রাউন্ড ডেথ রেস-২০২৬-এ আপনাদের স্বাগতম! আজকের এই ভয়ংকর ট্র্যাকে মুখোমুখি হচ্ছে মুম্বাইয়ের অপরাজেয় দল 'আন্ধেরি ভাইপার্স' এবং কলকাতার চ্যাম্পিয়ন রাইডার নেতৃত্বাধীন 'দ্য ডার্ক ফ্যান্টম'!"

ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়াম করতালি আর শিসে ফেটে পড়ল।

ইলা ধীরে ধীরে নিজের হেলমেটের ভিসার নামিয়ে দিল। ফ্লাডলাইটের আলোয় তার চোখ দুটো যেন আরও ধারালো হয়ে উঠল।

ইলা ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসী হাসি টেনে বলে, "তোরা গ্যালারিতে গিয়ে বস। আর চোখ খোলা রাখিস। আজ আবার দেখবি—চৌধুরী বংশের মেয়ে কাটা হাত নিয়েও কীভাবে আন্ধেরির বুক চিরে ট্রফি ছিনিয়ে আনে!"

--- জুনায়েদ হাসতে হাসতে বলে," শুরু হইছে! আজকে কারো না কারো কোপ খাওয়া নিশ্চিত!"

ইলা কোনো উত্তর দিল না। শুধু নিজের কাওয়াসাকির ইঞ্জিন স্টার্ট করল।"

পরের মুহূর্তেই গর্জে উঠল বাইকটা।

আর সেই শব্দে যেন পুরো আন্ধেরির রাত কেঁপে উঠল...

রেসের ফ্ল্যাগ ড্রপ হতেই ইলার বাইক যেন আগুনের গোলার মতো ট্র্যাক চিরে ছুটে চলল। কাটা হাতের তীব্র যন্ত্রণা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে একের পর এক বাঁকে এমন ভয়ংকর ড্রিফট নিল যে আন্ধেরি ভাইপার্সসহ বাকি তিন দলের অভিজ্ঞ রেসাররাও তার পেছনে শুধু ধুলোই খেল। একাই তিনটি দলকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়ে ইলা যখন সবার আগে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করল, তখন পুরো স্টেডিয়াম করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।

ট্রফি হাতে পোডিয়ামে দাঁড়ানো ইলার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে চিফ জাজ মাইক্রোফোন হাতে এগিয়ে এলেন।

চিফ জাজ অবাক কণ্ঠে বলে, "ওয়াও! আনবিলিভেবল রাইডিং! আপনি মুম্বাইয়ের অপরাজেয় সব রেসারকে একাই হারিয়ে দিলেন। আন্ডারগ্রাউন্ড রেসিং ওয়ার্ল্ডে আপনার পরিচয়টা আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করতে চাই। দয়া করে আপনার আসল নাম অথবা কোডনেমটি বলবেন?"

ইলা হেলমেটের কালো ভিসরের আড়ালে রহস্যময় এক হাসি দিল। তারপর তার সেই চিরচেনা চাবুকের মতো গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

ইলা: "লন্ডন... অন্ধকারে চিতা।"

নামটা লাউডস্পিকারে প্রতিধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো স্টেডিয়ামে যেন মৃত্যুনীরবতা নেমে এল। কয়েকজন জাজের হাত থেকে মাইক প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। গ্যালারিতে বসে থাকা জুনায়েদ, মাহিম আর বাকিরাও মিটমিট হাসছে।

কিন্তু সেই নীরবতা স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

পরক্ষণেই চারদিক থেকে পাগলাটে চিৎকার ভেসে এলো—

— "ওরে বাবারে! অন্ধকারে চিতা!" — "আন্ডারগ্রাউন্ড রেসিং দুনিয়ার সেই অদৃশ্য কিংবদন্তি!" — "যে কোনোদিন নিজের মুখ দেখায়নি!"

উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে আরেকজন জাজ বলে উঠলেন

জাজ ২: ও মাই গড! আমরা আজ জীবন্ত কিংবদন্তিকে রেস জিততে দেখলাম! কিন্তু আপনি তো লন্ডনের ট্র্যাকে রাজত্ব করেন। আন্ধেরির এই ট্র্যাকে হঠাৎ এলেন কীভাবে?

ওদিকে আন্ধেরি ভাইপার্সের রেসাররা এতক্ষণ রাগে ফুঁসছিল। তাদের ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়া মেয়েটার পরিচয় জানার পর সেই রাগ মুহূর্তেই আতঙ্ক আর শ্রদ্ধায় বদলে গেল।

তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলতে লাগল—

— "ভাইরে ভাই, ভালোই হইছে রেসের সময় ধাক্কা মারার চেষ্টা করি নাই!" — "ও আস্ত একটা জল্লাদ!" — "জান নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছি, এটাই অনেক!"

কিন্তু ইলা তাদের কোনো কথারই জবাব দিল না। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এক হাত দিয়ে ট্রফিটা আকাশের দিকে তুলে ধরল। তারপর দ্রুত ফোন বের করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি গোপন বার্তা টাইপ করে পাঠিয়ে দিল।

টিং!

মেসেজ সেন্ড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো স্টেডিয়ামের সব ফ্লাডলাইট, লাউডস্পিকার আর জেনারেটর একযোগে বন্ধ হয়ে গেল।

চারদিক মুহূর্তেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল।

দর্শকরা আতঙ্কে চিৎকার শুরু করার আগেই ইলা বিড়ালের মতো নিঃশব্দে গ্যালারির দিকে ছুটে গেল। জুনায়েদ আর মাহিমের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল—

ইলা: ওই জাওড়ার দল! হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? জলদি বাইকে ওঠ! রান!

আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সবাই নিজেদের বাইকে চড়ে বসল। অন্ধকারের বুক চিরে ইলার স্পোর্টস বাইকের সেই পরিচিত গর্জন আর জুনায়েদদের বাইকের শব্দ আন্ধেরির বাতাস কাঁপিয়ে মেইন হাইওয়ের দিকে ছুটে গেল।

স্টেডিয়ামের জাজ, রেসার আর দর্শকরা অন্ধকারের মাঝে শুধু সেই গর্জন শুনেই বুঝে গেল—

'অন্ধকারে চিতা' আবারও অন্ধকারের বুকেই মিলিয়ে গেছে।

কয়েক সেকেন্ড পর স্টেডিয়ামের সব আলো আবার জ্বলে উঠল।

কিন্তু পোডিয়ামে তখন আর কেউ নেই।

সেখানে পড়ে আছে শুধু এক চিলতে ধুলো...

আর কিংবদন্তির মতো হারিয়ে যাওয়া এক চিতার অদৃশ্য পদচিহ্ন।

*********

বাংলাদেশ বিকাল তখন প্রায় চারটা বা পাঁচটা হবে। মির্জা বাড়ির বাইরে তখন হুট করেই একদল এলাকার মুরুব্বি জাঁকিয়ে বসল। তাদের চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ আর হাতে লাঠি। তারা সমানে আশরাফ সাহেবকে ডাকতে শুরু করল। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক দেখে রেহানা বেগম ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলেন...

​রেহানা বেগম শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায়, আপনারা এই রাতে এভাবে বাড়ির সামনে চিল্লাচিল্লি করছেন কেন? কী হয়েছে? আর আপনারা আশরাফকে কেন ডাকছেন?

​এক বৃদ্ধ মুরুব্বি নিজের দাড়ি হাত দিয়ে আলতো করে চুলকে, বাঁকা চোখে রেহানা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন—'আশরাফ সাহেবকে ডাকেন, ঘরের খবর ঘরের লোকে জানলে ভালো হয় না!'

​রেহানা বেগম এক মুহূর্ত ইতস্তত করে স্বামী আশরাফ সাহেবকে খুঁজে পেলেন না। তিনি মৃওিকার রুমের সামনে গিয়ে হালকা কড়া নাড়লেন...

​রেহানা বেগম মৃওিকার রুমে দরজার বাইরে থেকে তুমি কি ভেতরে? নিচে তোমাকে ডাকছে ।

​দরজা খোলার শব্দ হলো, আশরাফ সাহেব ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর আর চিন্তিত। তিনি রেহানা বেগমকে কিছু না বলে সোজা নিচে নেমে গেলেন। ড্রয়িংরুমের সোফায় মুরুব্বিরা তখন বসা। আশরাফ সাহেব তাদের বসতে বলে কুশল বিনিময় করলেন...

​আশরাফ সাহেব সহজ গলায় বলে, ''বলুন ভাই, এত রাতে কোনো জরুরি প্রয়োজন?"

আশরাফ সাহেব শান্ত গলায় কুশল বিনিময় করার পরই মুরুব্বিদের একজন নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে অত্যন্ত কড়া আর বাঁকা চোখে তাকালেন..."

​মুরুব্বি ১:তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে,"আশরাফ ভাই, আমরা তো আপনাকে সম্মান করি। কিন্তু ভাই, আপনার বড় মেয়ে নীরার কথা নাহয় বাদই দিলাম, সে তো এমনিতেই হাতের বাইরে। কিন্তু আপনার ছোট মেয়ে নীলা—সে আবার এসব কী শুরু করছে? আপনি কি নিজের চোখ-কান একদম বন্ধ করে রেখেছেন?"

​আশরাফ সাহেব বুকটা ধক করে উঠল, তাও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, "নীলা? ও আবার কী করল? ও তো বাসায়ই থাকে!"

​মুরুব্বি ২: মুখটা কুঁচকে, গলার আওয়াজ আরও উঁচিয়ে বলে- "আরে ভাই, বাসায় থাকে নাকি লোক হাসাতে বাইরে যায়, সেই খবর কি রাখেন? আপনার মেয়ে আবার সেই আগের মতো চালচলন শুরু করেছে। সেদিন সন্ধ্যার পর ওমুকের মোড়ে ওই বখাটে ছেলেদের সাথে ওকে হাসাহাসি করতে দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, এলাকার মানুষ আমাদের কাছে এসে বলছে—নীলাকে নাকি শহরের ওইসব আজেবাজে আর সস্তা জায়গাগুলোতেও আজকাল আড্ডা দিতে দেখা যাচ্ছে!"

​বৃদ্ধ ১: অত্যন্ত অপমানজনক ও কঠোর গলায় বলে, "আশরাফ ভাই, স্পষ্ট করেই বলি। একটা ধিঙ্গি মেয়ে এভাবে রাত-বিরাতে বখাটে ছেলেদের সাথে ঢলাঢলি করে বেড়াবে, আর আমরা মুরুব্বিরা তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব? আপনার মেয়ের কি কোনো মা-বাপ নাই? নাকি আপনি আপনার মেয়েদের একদম মাথায় তুলে লাই দিয়ে এই নোংরামি করার পারমিশন দিয়ে রেখেছেন? সমাজে আমাদেরও একটা ইজ্জত আছে ভাই!"

​মুরুব্বি ৩ কটাক্ষের সুরে মাথা নেড়ে বলে, "ঠিকই তো! আগের বার যখন একটা কেলেঙ্কারি বাঁধিয়েছিল, তখনই তো উচিত ছিল ওর পিঠের চামড়া তুলে ওকে ঘরের কোণে বন্দি করে রাখা। তা না করে আপনি ওকে আবার আশকারা দিলেন? এই বখে যাওয়া মেয়ে যদি কালকে কোনো অঘটন ঘটিয়ে মির্জা বাড়ির মুখে চুনকালি মাখায়, তখন কি আপনি এই সমাজের বুকে মুখ দেখাতে পারবেন? আজই ওর পাখা ছেঁটে ফেলুন, নয়তো এই নোংরা মেয়ের জন্য আপনার পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করতে আমরা বাধ্য হব!"

​মুরুব্বিদের এই তীব্র অপমান আর কড়া কড়া কথাগুলো তীরের মতো এসে বিঁধল আশরাফ সাহেবের বুকে। রেহানা বেগম দরজার আড়াল থেকে এই কথাগুলো শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, আর ড্রয়িংরুমের বাতাস এক নিমেষে জাস্ট থমথমে আর ভারী হয়ে উঠল..."

এলাকার ওই কুৎসিত মানসিকতার মুরুব্বিরা চলে যাওয়ার পর পুরো ড্রয়িংরুমে যেন এক শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। আশরাফ সাহেব সোফায় জাস্ট থম ধরে, পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। ওনার এই অবস্থা দেখে রেহানা বেগম আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে ওনার পাশে এসে দাঁড়ালেন...

​রেহানা বেগম অনুনয় করে বলে, "ওগো, তুমি ওই পরনিন্দাকারী লোকগুলোর কথা এভাবে বিশ্বাস করো না! নীলা এখন আর আগের মতো ওসব কিচ্ছু করে না। ও তো সারাদিন বাসাতেই থাকে, চোখের সামনেই ঘোরে। মহল্লার মানুষ তো এমনিতেই তিলকে তাল বানায়। আমাদের মেয়ের পেছনে শত্রু লেগেছে গো, তুমি নিজের মন শক্ত করো!"

​স্ত্রীর এই সাফাই গাওয়ার কথাগুলো শোনা মাত্রই আশরাফ সাহেবের ভেতরের জমে থাকা সব রাগ আর অপমানের আগুন যেন এক নিমেষে মাথায় চড়ে গেল! ওনার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর দশা হলো। ওম্নি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে..

​টাস্স্!

​আশরাফ সাহেব রেগে এক্কেবারে রেহানা বেগমের গালে কষে একটা থাপ্পড় মেরে বসলেন! পুরো ড্রয়িংরুমটা যেন সেই চড়ের আওয়াজে কেঁপে উঠল। রেহানা বেগম চমকে উঠে, নিজের গালে হাত দিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন...

​রেহানা বেগম , কাঁপানো গলায় "তুমি... তুমি আমাকে চড় মারলে ওগো? এত বছরের সংসারে আজ পর্যন্ত আমার গায়ে হাত তোলোনি, আর আজ ওই বাইরের লোকের কথায়..."

​আশরাফ সাহেব তীব্র চিৎকারে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে, চোখ মুখ লাল করে বলল, "হ্যাঁ মেরেছি! তোকে আরও অনেক আগে মারা দরকার ছিল রেহানা! এই ঘরের ছেলে-মেয়ে দুইটাই আজ শুধু তোর অন্ধ ভালোবাসার জন্য একদম উচ্ছন্ন গেছে! তুই চব্বিশ ঘণ্টা এই বাসায় থেকে নিজের মেয়েকে একটু চোখে চোখে রাখতে পারিস না? আগেও ও একটা মারাত্মক নোংরা কেলেঙ্কারি বাঁধিয়েছিল, তখন আমি সমাজের হাত-পা ধরে কত কষ্ট করে সব ধামাচাপা দিয়েছি! আর তুই ওকে শাসন না করে উল্টো আবার মাথায় তুললি? ও আবার বাইরে গিয়ে মুখ পুড়িয়ে আসছে!"

​আশরাফ সাহেবের বুকটা তীব্র কষ্টে আর অপমানে হাঁপাতে লাগল, ওনার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল...

​আশরাফ সাহেব কণ্ঠরোধ করে, আরও কড়া গলায় বলে, "আর তুই? তুই তো মা নামের কলঙ্ক! নিজের পাপী মেয়েদের শাসন না করে, ওইটুকু ছোট নিষ্পাপ মেয়ে মৃওিকা—যে আমার কলিজার টুকরা মা, তার ওপর তোরা দিন-রাত অমানুষিক অত্যাচার করলি! তুই আর তোর ওই নষ্ট মেয়েরা মিলে শেষ পর্যন্ত আমার মায়াবী মা-টাকে এই বাসা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলি! আজ তোদের এই নোংরামি আর অত্যাচারের জন্যই আমার মৃওিকা এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, আজ ও আমার পাশে নেই! তোদের মতো পাপীদের মুখ আমি আর দেখতে চাই না, তোদের কারণেই আজ মির্জা বাড়ির ইজ্জত ধুলোয় মিশে গেল!"

আশরাফ সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে, রেগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, "আজ আরিয়ান আসুক বাসায়! ও আসলেই আমি এই কুলাঙ্গার নীলাকে ঘাড় ধরে যার-তার সাথে বিয়ে দিয়ে এই বাড়ি থেকে বিদায় করে দিবো! অনেক সহ্য করেছি তোদের লম্পটপনা, আর না! এই নোংরা মেয়েকে এই পবিত্র মির্জা বাড়িতে রাখার চেয়ে অন্য কোথাও পার করে দেওয়া অনেক ভালো!"

​আশরাফ সাহেবের মুখে আবারও সেই মৃওিকার প্রতি এত দরদ আর নীলাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা শোনা মাত্রই রেহানা বেগম নিজের গালের চড়ের ব্যথা ভুলে হিংসায় এক্কেবারে জ্বলে উঠলেন! ওনার ভেতরের কুৎসিত রূপটা যেন এক নিমেষে বাইরে বেরিয়ে এল...

​রেহানা বেগম চোখ দুটো বিষাক্ত করে, দাঁত কিড়মিড় করে চিল্লিয়ে "আহা রে! আমার মেয়ের বেলায় যত দোষ, আর তোমার ওই অলক্ষ্মী ডাইনি মেয়ে মৃওিকা—যে সারাদিন বাইরে বখাটে ছেলেদের সাথে ডং করে বেড়াতো, সে হলো তোমার কলিজার টুকরা মা?! ওই অপয়া মেয়েটা এ বাড়ি থেকে গেছে বলেই তো আমরা শান্তিতে আছি! ও একটা আস্ত..."

​টাস্স্!

​

রেহানা বেগম নিজের বাক্যটা শেষ করার আগেই আশরাফ সাহেব রাগে অন্ধ হয়ে ওনার অন্য গালে আবারও এক্কেবারে কষে আরেকটা চড় মেরে বসলেন! রেহানা বেগম ছিটকে গিয়ে সোফার ওপর ধপ করে পড়ে গেলেন...

-- ​আশরাফ সাহেব একদম বাঘের মতো গর্জে উঠে, রেহানা বেগমের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, "মুখ সামলে কথা বলবি রেহানা! আমার মৃওিকার নামে যদি আর একটাও কুৎসিত বা খারাপ কথা তোর ওই নোংরা মুখ দিয়ে বের করিস, তবে তোকে আমি এই বাড়ি থেকে জাস্ট এক কাপড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো! তুই নিজে তো একটা পাপী, আর তোর পেটের ওই মেয়েটাও একটা আস্ত ডাইনি! আমার মায়ের নামে আর একটাও বাজে কথা বললে তোকে আমি কাঁচা চিবিয়ে খাবো, মনে থাকে যেন!"

​

আশরাফ সাহেবের এই রুদ্রমূর্তি আর পরপর দুটো চড় খেয়ে রেহানা বেগম সোফার ওপর বসে একদম ভয়ে আর অপমানে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন, ওনার মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও বের হলো না...

----------------------

চারদিকের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে নিঃশব্দে বসে ছিল। সময় যেন থমকে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সে ঘরের মেইন লাইটটা অন করল। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকের অন্ধকার সরে গিয়ে আলোয় ভরে উঠল পুরো রুম।

রহস্যময় ব্যক্তিটি ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দেয়ালে ঝোলানো বিশাল এক মায়াবী পেইন্টিংয়ের সামনে দাঁড়াল। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে টেবিলের ড্রয়ার খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মখমলের তৈরি নেভি ব্লু রঙের একটি গোপন ডায়েরি। ডায়েরিটির মলাটে রুপালি অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে নাম—

"দ্য ইঙ্কড পজেসিভনেস অফ দ্য কেজড হার্টবিট"

রহস্যময় ব্যক্তিটি নিজের ফর্সা আঙুলের ডগা দিয়ে নামটার ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, শীতল হাসি। তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে নিচু স্বরে গভীর ও জেদি গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল—

"মাই ডার্ক ডায়েরি... ইউ নো এভরিথিং, রাইট? ইউ নো হাউ মাচ আই হেট দিস ইমোশন... ইয়েট আই অ্যাম হোপলেসলি অ্যাডিক্টেড টু ইট। এভরি সিঙ্গেল পেজ অফ ইয়োরস ক্যারিজ দ্য স্টোরি অফ মাই অবসেশন ফর হার..."

সে ডায়েরির একটি ফাঁকা পাতার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের মণি দুটো ধীরে ধীরে সরু হয়ে এলো। যেন তার কল্পনায় সেই পাতাগুলো ইতোমধ্যেই অসংখ্য অদ্ভুত গোপন স্বীকারোক্তিতে ভরে গেছে।

ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রেখে সে আবার পেইন্টিংটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এবার তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ আর রহস্যময় মুগ্ধতার ছাপ।

ক্যানভাসে আলতো করে হাত রেখে, নিচু স্বরে-

""সুইটহার্ট... হাউ শুড আই অ্যাপিয়ার ইন ফ্রন্ট অফ ইউ টু মেক ইউ হ্যাপি? জাস্ট টেল মি..."

কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর তার দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল। যেন পেইন্টিংয়ের ভেতর থাকা মেয়েটির কাছ থেকেই উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় আছে সে।

মৃদু হাসি দিয়ে বলে-

""টেল মি, হার্টবিট... শুড আই কাম টু ইউ, অর উইল ফেট ব্রিং ইউ টু মি?"?"

ঘরের নিস্তব্ধতার মধ্যে তার কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল।

আর দেয়ালে ঝোলানো সেই পেইন্টিং—নীরব সাক্ষীর মতো সবকিছু দেখেই চলল...

ডায়েরির পাতাটার ওপর কলম দিয়ে অত্যন্ত খসখসে আওয়াজে লিখতে শুরু করল। লেখার মাঝেই ও হুট করে থেমে গিয়ে ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে একটা ডার্ক আর শীতল হাসি দিল...

​কলমটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে, ফিসফিসানি সুরে

​"সুইটহার্ট... টেল মি, হোয়াট ইজ রিটেন ইন দিস ডায়েরি? ইউ কান্ট অ্যানসার, রাইট? আই নো ইউ ডোন্ট হ্যাভ দ্য গাটস! কিন্তু হার্টবিট... তোমার সাথে আমার অনেক হিসাব-নিকাশ বাকি আছে। অনেক হিসেব চুকানো বাকি, সুইটহার্ট!"

​ওর চোখের মণি দুটো এক সেকেন্ডে বিষাক্ত আর হিংস্র হয়ে উঠল। ও ক্যানভাসের মেয়েটার লম্বা চুলের আঁকিবুঁকির ওপর নিজের আঙুলটা জোরে চেপে ধরে বিড়বিড় করে তীব্র জেদ আর অহংকার মেশানো গলায় বলে-

​"ইউ নো হোয়াট, হার্টবিট? আই ডোন্ট বিলিভ ইন দিস ট্র্যাশ ইমোশন কলড লাভ! আই জাস্ট হেট লাভ! বাট... আই লাভ দ্য ফ্যাক্ট দ্যাট ইউ অনলি বিলং টু মি! ইউ আর মাই পজেসিভনেস! তুমি জানো আজকে আমি কয়েকটা কুত্তাকে কী কঠিন শাস্তি দিয়েছি?"

​ওর মুখ দিয়ে একটা বিকৃত আর সাইকো হাসির শব্দ বের হলো, যেন ও সেই নরকের শাস্তিটার দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে...

​দাঁতে দাঁত চেপে, গভীর ও শীতল গলায় বলে,

​"যে জারজগুলো সাহস করে তোমার ওই চুলে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল... আজকে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের সেই হাতগুলো শরীর থেকে এক্কেবারে আলাদা করে দিয়েছি! আই পানিশড দেম ভেরি ব্রুটালি, সুইটহার্ট! নো ওয়ান... আই রিপিট, নো ওয়ান হ্যাজ দ্য রাইট টু টাচ হোয়াট ইজ মাইন! তোমার এই চুলে হাত দেওয়ার অধিকার শুধু আমার এই হাতের, অন্য কারো না!

​সে আবারও ডায়েরির পাতায় কলম মেলালো। পুরো ঘরজুড়ে তখন শুধু আলোর তীব্রতা আর এক সাইকো প্রেমিকের কলমের খসখসে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল...

রহস্যময় ব্যক্তিটি পেইন্টিংয়ের দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখে এক অদ্ভূত অবসেসশন আর সন্দেহের আগুন। সে ক্যানভাসের মেয়েটির দিকে আঙুল তাক করে বিড়বিড় করে বলতে লাগল...

​

​"জাননন... আজকে সারাদিন কী করেছো, আমায় কেন বলোনি? তুমি কি আবার কোনো ছেলের সাথে কথা বলছো? তাই না হার্টবিট? আই নো ইউ আর লাইয়িং টু মি!"

​সে নিজের হাতের দিকে তাকাল। ওখানে একটা গুলি লাগার ক্ষত থেকে টাটকা রক্ত টপটপ করে নিচে মেঝেতে পড়ছে। কিন্তু সে যেন সেটার কোনো ব্যথাই অনুভব করছে না! বরং ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম বিকৃত হাসি...

​নিজের হাতের রক্তমাখা ক্ষতটার দিকে তাকিয়ে বলে-

​"দেখো হার্টবিট, হাউ মাচ আই অ্যাম সাফারিং ফর ইউ! বাট ইউ ডোন্ট কেয়ার, রাইট? তোমার অবহেলা আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে। বাট আই লাভ দিস পেইন... কারণ এই ব্যথাটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় তুমি শুধু আমারই!"

​সে এক পা এগিয়ে গিয়ে পেইন্টিংয়ের ওপর হাত ছোঁয়াল। রক্তমাখা আঙুলের ছাপ ক্যানভাসে মিশে যেতে লাগল...

​দাঁতে দাঁত চেপে বলে-

​"আই হেট দিস ফিলিং, সুইটহার্ট! আই হেট দিস লাভ, বিকজ ইট মেকস মি উইক! বাট এট দ্য সেইম টাইম... আই কান্ট লিভ উইদাউট ইউ! ইউ আর মাই ড্রাগ, মাই ডার্ক অবসেসশন! আমাকে না বলে কোথাও যাওয়ার সাহস আর করো না, আদারওয়াইজ আই উইল বি ফোর্সড টু ডু সামথিং ভেরি ব্যাড, দ্যাট ইউ উইল রিগ্রেট ফরএভার!"

হাতের ক্ষত থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছিল, কিন্তু সেদিকে তার যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে ধীরে ধীরে পেইন্টিংয়ের মায়াবী মেয়েটার চুলের ওপর নিজের রক্তমাখা আঙুল ছুঁইয়ে দিল। তারপর চোখ বন্ধ করে একদম নরম, ভাঙা গলায় খুব মৃদু সুরে, ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল—

"তুমি অধরা হয়েই থাকো, আমি না হয় ভালোবেসে যাই...

তোমার ওই মায়াবী চোখে, আমার কোনো অধিকার তো নাই!

তুমি ঘৃণা করো এই মনকে, আমি বিষাদেই সুখ খুঁজে পাই...

তুমি আমার সেই অন্ধকার, যাকে ছাড়া আমি বাঁচতে চাই না....."

শেষ করে সে এক অদ্ভুত, গাঢ় বাঁকা করে হাসি দিল। তারপর পেইন্টিংটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—

"সুইটহার্ট... পছন্দ হয়েছে তো?"

কিন্তু সে থামল না। বুকের গভীরে জমে থাকা অদ্ভুত এক হাহাকার যেন তাকে আরও কিছু বলতে বাধ্য করছিল। সে আবার আবেগ আর জেদের মিশেলে গেছে উঠল—

"তোমার নামে রোদ্দুরে, আমি ডুবেছি সমুদ্দুরে...

জানি না যাবো কদ্দুরে এখনও।

আমার পোড়া কপালে, আর আমার সন্ধ্যে সকালে...

তুমি কেন এলে জানি না এখনও।

ফন্দি আঁটে মন পালাবার,

বন্দী আছে কাছে সে তোমার..."

গানটা হঠাৎ করেই থেমে গেল।

এক মুহূর্ত আগেও যে চোখে মায়া আর আকুলতা ছিল, পরের মুহূর্তেই তা কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। তার দৃষ্টিতে ফিরে এলো সেই অদ্ভুত শীতলতা।

সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল—

"আই হেট দিস লাভ, সুইটহার্ট... বাট আই অ্যাম হেল্পলেস!"

ঠিক তখনই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাইরে থেকে ভেসে এলো দরজায় বারবার কড়া নাড়ার শব্দ। কেউ একজন একনাগাড়ে দরজায় নক করছে।

শব্দটা কানে যেতেই সে এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের সমস্ত আবেগ, অস্থিরতা আর অদ্ভুত ভাবভঙ্গি নিখুঁতভাবে আড়াল করে ফেলল। যেন কয়েক মুহূর্ত আগের মানুষটা আর এখনকার মানুষটা সম্পূর্ণ আলাদা।

ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এসে সে পকেট থেকে একটি রিমোট বের করল। এক ক্লিক করতেই দরজার লক খুলে গেল।

দরজা খুলে বাইরে বের হতেই সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাল।

একদম শান্ত, সৌম্য ও স্বাভাবিক গলায় বলে-

"কী হয়েছে, ছোট আম্মু? এত রাতে তুমি আমার ঘরের বাইরে কেন? কোনো সমস্যা?"

ছোট আম্মু: আতীশ, তোকে নিচে তোর বাবা ডাকছে। এখনই আয়, তোর সাথে জরুরি কিছু কথা বলবে।

চলবে.......

চলবে... 🖤

ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন