ফন্ট সাইজ:
থিম:
গল্পটা আমাদের ছিল

২৮তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জেরি

#গল্পটা_আমাদের_ছিল

#জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন

#পর্বঃ২৪

~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ ~~

বিকেলের পুরোটা সময় গোলধুনী মির্জা বাড়ি যেন একেবারে তোলপাড় অবস্থা। চারদিকে শুধু দৌড়াদৌড়ি আর ব্যস্ততা। রেহানা একের পর এক কাজের লোকদের উদ্দেশে চিৎকার করে নির্দেশ দিয়ে চলেছেন।

— "এই, ওদিকটা ভালো করে পরিষ্কার করো! আর তোমরা দাঁড়িয়ে কী দেখছ? হাত চালাও, তাড়াতাড়ি!"

মেইডরা দম ফেলারও ফুরসত পাচ্ছে না। এক কাজ শেষ হতেই আরেক কাজ এসে হাজির হচ্ছে।

তাদের একজন আরেকজনের কানে কানে বিরক্ত গলায় বলল, — "নিজেদের কাজের জ্বালায়ই তো বাঁচি না! তার ওপর আবার কোন ছাতার-মাথা আসছে যে আজ এত খাটতে হচ্ছে!"

আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল, — "আল্লাহই জানে! যার জন্য এত আয়োজন, সে না জানি কারা আসছে!"

বিকেল ঠিক চারটা। হঠাৎই মির্জা বাড়ির বাইরে একের পর এক গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি গেটের দিকে চলে গেল। গেট খুলতেই মিহির ও তার কাজিনরা একে একে ভেতরে প্রবেশ করল।

আশরাফ সাহেব হাসিমুখে এগিয়ে এসে বললেন,

— বাবা, তোমরা এসেছ! কিন্তু তোমার আব্বু-আম্মু আসলেন না?

মিহির ভদ্রভাবে উত্তর দিল,

— আঙ্কেল, আম্মু-আব্বু দুই দিন পর আসবেন। আর আজকে আমার কাজিনরা নীলাকে দেখতে চেয়েছিল, তাই ওদের নিয়ে চলে এলাম।

— আচ্ছা, খুব ভালো করেছ। সবাই বসো। রেহানা, নীলাকে ডেকে নিয়ে আসো।

ঠিক তখনই মাহির চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— সবাই তো আসতে চাইছিল, কিন্তু ভাইয়া আনল না।

আশরাফ সাহেব অবাক হয়ে বললেন,

— কেন আনলে না? সবাই এলে তো আরও ভালো হতো।

মাহির হেসে বলল,

— না আঙ্কেল, বাকিরা বড়দের সঙ্গে আসবে। আর... আরিয়ান ভাইয়া কোথায়?

আশরাফ সাহেব মুচকি হেসে বললেন,

— বুঝলে, সেদিন তোমার আম্মুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। উনি বললেন, তোমার মামাতো বোনের বিয়েটা শেষ হলেই সবাই একসঙ্গে এসে নীলাকে দেখে আংটি পরানোর অনুষ্ঠানে যোগ দেবে। তোমার আম্মু তোমাকে কিছু বলেনি নাকি?

মাহির মাথা নেড়ে হালকা হেসে রইল।

আশরাফ সাহেব আবার বললেন,

— আরিয়ান একটু বাইরে গেছে। এখনই চলে আসবে।

কথা বলতে বলতেই তাঁর চোখ গেটের দিকে গিয়ে আটকে গেল। সেখানে একজন যুবক এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কপাল কুঁচকে তিনি বললেন,

— আরে, ওই ছেলেটা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেন? আর কেউ আসবে নাকি...?

ওরা কিছু বলার আগেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো নীলা। তার সঙ্গে ছিল আয়শীন, সায়ন এবং আরও কয়েকজন কাজিন। নীলাকে দেখেই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার দৃষ্টি এক মুহূর্তে ওর দিকেই স্থির হয়ে গেল।

নীলা সিঁড়ির শেষ ধাপটায় পা দিতেই ড্রয়িংরুমের চেনা মুখগুলোকে দেখে পুরো থমকে গেল। ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। ও নিজের দুই গালে হাত দিয়ে প্রায় চিৎকার করে ওঠার মতো গলায় বলে উঠল,

​— "ওহ মাই গড! এ আমি কাকে দেখছি! তোমরা সবাই একসাথে এখানে?"

​নীলার এই উচ্ছ্বাস দেখে ড্রয়িংরুমের গুমোট হাওয়াটা এক পলকে কেটে গেল। ওদিকে আশরাফ সাহেব তখন পকেট থেকে ফোনটা বের করে আরিয়ানকে তাড়া দেওয়ার জন্য ড্রয়িংরুম থেকে একটু দূরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন। ওনার মন বলছে, আরিয়ান সময়মতো না পৌঁছালে মিহিরদের সামনে ইম্প্রেশনটা খারাপ হতে পারে।

​আশরাফ সাহেব একটু দূরে যেতেই মাহির সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নীলার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল,

​— "সারপ্রাইজটা কেমন দিলাম বলো? নীলা, ও হলো আমার ভাই মিহির, আর এই যে আফরা আর আয়াত। ওহ, আর ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই—ও হলো রাইমা।"

নীলা ওর দুই গালে হাত দিয়ে চোখ দুটো ছানাবড়া করে বলল,

​— "ওহ মাই গড! এ আমি কাকে দেখছি! তোমরা সবাই একসাথে এখানে? তা আমার নন্দ ইশা আসে নাই?"

​মাহির সোফায় হেলান দিয়ে হালকা হেসে জবাব দিল,

​— "না , ও ওর বান্ধবীদের নিয়ে বেড়াতে গেছে। পরে কোনো একসময় আসবে।"

​ওদিকে আশরাফ সাহেব তখন পকেট থেকে ফোনটা বের করে আরিয়ানকে তাড়া দেওয়ার জন্য ড্রয়িংরুম থেকে একটু দূরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেছেন। ওনার দূরে যাওয়ার মাঝেই নীলা এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের কাজিনদের দিকে হাত ইশারা করল। ও বেশ চিল মুডে মিহির-মাহিরদের সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল,

​— "গাইজ! ও হলো আয়শীন, আর ও সায়ন। আর আমার বাকি কাজিনদের সাথেও চিল করো!"

​সবাই মিলে সোফায় বসে একে অপরের সাথে কথা বলতে বলতে অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ ফ্রি হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের গুমোট হাওয়াটা কেটে গিয়ে সেখানে তখন হাসিখুশি আর জেন-জি আড্ডার একটা চাবুক ভাইব চলে এসেছে।

​ঠিক তখনই, হঠাৎ বাইরে আবার একটা গাড়ির কর্কশ হর্ন আর ব্রেক কষার শব্দ হলো।

​গাড়ির সেই আওয়াজটা হওয়া মাত্রই ড্রয়িংরুমের আড্ডায় যেন একটা হালকা ছেদ পড়ল। কিন্তু তার চেয়েও অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল মেইন গেটে। এতক্ষণ ধরে যে ছেলেটা রোবটের মতো গেটের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, সে গাড়ির শব্দটা শোনা মাত্রই আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। ও এক ঝটকায় ঘুরে সোজা বাইরের দিকে চলে গেল!

কিছুক্ষণ পর ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার কৌতূহল যেন চরমে পৌঁছে গেল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটি অবশেষে ভেতরে প্রবেশ করল। তবে সে একা নয়, তার সঙ্গে ছিল আরও একজন রহস্যময় আগন্তুক।

আগন্তুকের মাথায় ফুল-ফেস ব্ল্যাক বাইকিং হেলমেট। মুখের এতটুকুও দেখা যাচ্ছে না, তাই তাকে চেনার কোনো উপায়ই নেই। তার সম্পূর্ণ সাজসজ্জা দেখেই নীলা, আয়শীন, সায়নসহ উপস্থিত সবাই একবাক্যে ধরে নিল—এ নিশ্চয়ই কোনো ছেলে।

কারণ, তার পরনে ছিল একেবারে ড্যাশিং, স্ট্রিট-স্টাইলের ক্যাজুয়াল পোশাক। ভেতরে ব্ল্যাক ক্যামিসোল ক্রপ টপ, তার ওপর সামনের বোতাম খোলা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট চেক শার্ট। সঙ্গে লুজ-ফিট ব্ল্যাক কার্গো প্যান্ট, পায়ে ঝকঝকে সাদা স্নিকার্স আর কাঁধে ঝোলানো একটি ক্যাজুয়াল শোল্ডার ব্যাগ। পুরো ডার্ক, বাইকার-ভাইব লুকটাই তাকে প্রথম দেখায় ছেলে বলে ভুল করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

মিহির সোফা থেকে উঠে কয়েক কদম এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল,

— হেলমেটটা খুলুন, ভাই।

কথাটা শুনে হেলমেট পরা মানুষটি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীর, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হেলমেটের লক খুলে দুই হাতে সেটি মাথা থেকে সরিয়ে নিল।

ড্রয়িংরুমজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে সেই দৃশ্যের দিকে।

আর ঠিক পরের মুহূর্তেই...

হেলমেটটা পুরোপুরি খুলে যেতেই যেন পুরো ড্রয়িংরুমে স্তব্ধতার বিস্ফোরণ ঘটল।

একটার পর একটা চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। কারও মুখ হাঁ হয়ে রইল, কারও চোয়াল যেন নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। কয়েকজন তো অবিশ্বাসে দু'বার চোখ মুছেও তাকাল।

কারণ, শার্ট-কার্গো পরা সেই বাইকার কোনো ছেলে নয়...

সে ছিল এক অসাধারণ সুন্দরী তরুণী।

হেলমেটের বাঁধন থেকে মুক্তি পেয়ে তার কোমর ছোঁয়া সিল্কি চুলগুলো মসৃণ ঢেউয়ের মতো কাঁধ বেয়ে নেমে এলো। গায়ের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি আর ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি তাকে আরও আলাদা করে তুলেছিল।

তবে তার পুরো অবয়বের মধ্যে সবচেয়ে মুগ্ধকর ছিল এক জোড়া গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ—যে চোখে একবার তাকালে সহজে দৃষ্টি ফেরানো যায় না।

নীলা, আয়শীন আর ঘরে উপস্থিত অন্য মেয়েরাও নিজেদের অজান্তেই কয়েক মুহূর্ত তার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। আর ছেলেদের অবস্থা তো আরও করুণ—কারও চোখের পলক পড়ছে না, কেউ আবার বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

ঠিক ওই মুহূর্তেই রেহানা কিচেন থেকে মেইডদের দিয়ে বড় বড় প্লেটে খাবার আর আপ্যায়নের নাস্তা নিয়ে লিভিং রুমে নামছিলেন। কিন্তু সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখা মাত্রই ওনার হাতের ট্রেইটা প্রায় ফসকে যাওয়ার উপক্রম হলো, ওনার নিজেরও চোয়াল ঝুলে গেল বিস্ময়ে! রেহানা বেগম হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন—এতটা সুন্দরী কোনো মেয়ে হয়? এ যেন জীবন্ত কোনো অপ্সরা!

​সে ড্রয়িংরুমের এই স্তব্ধতা আর সবার হাঁ হয়ে থাকা চাউনিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। ও অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গম্ভীর গলায় কোনো ভণিতা না করে সরাসরি ডাকল,

​— "আশরাফ মির্জা!"

​কোনো রকম সম্মানসূচক শব্দ ছাড়া সরাসরি আশরাফ সাহেবের নাম ধরে এভাবে ডাকায় পুরো হলের সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। মিহির নিজের রাগ সামলাতে না পেরে এক চাবুক ধমক দিয়ে বলে উঠল,

​— "হোয়াট দ্য...! কী হচ্ছেটা কি? তুই গুরুজনের নাম ধরে কেন ডাকছিস? ম্যানার্স বলতে কিচ্ছু নেই?"

​মেয়েটা মিহিরের ধমক শুনেও কোনো জবাব দিল না, ওর দিকে ফিরেও তাকাল না। যেন মিহির নামের কেউ সেখানে এক্সিস্টই করে না!

​ওদিকে আশরাফ সাহেব তখন মাত্রই আরিয়ানকে ফোন করা শেষ করেছেন। আরিয়ান ফোনে জানিয়েছে সে বাসার একদম কাছেই চলে এসেছে, এখনই ঢুকবে। ফোনটা পকেটে পুরে আশরাফ সাহেব যখন হল রুমে পা রাখলেন, তখনই ওনার কানে এলো কেউ একজন ওনার নাম ধরে ডাকছে। তিনি বেশ অবাক হয়ে পেছন থেকে সামনে এগিয়ে এসে বললেন,

​— "জি বলেন, আপনি কে?"

​প্রশ্নটা শুনে মেয়েটি তার ব্ল্যাক কার্গোর পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত ধীরস্থির ভঙ্গিতে ওনার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার সেই চোখে এক চিলতে পেশাদারিত্বের আলো ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল,

​— "আসসালামু আলাইকুম।"

​আশরাফ সাহেব সালাম নিলেন। কিন্তু মেয়েটির মুখের দিকে তাকাতেই ওনার চেনা চেনা লাগল। ওনার মস্তিষ্কের কোষে যেন একটা তীব্র ঝিলিক দিয়ে উঠল! তিনি কিছুক্ষণ ওনার চোখের পলক না ফেলে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বিস্ময় জড়ানো গলায় বললেন,

​— "একাডেমি অব বিজনেসের সেই চাবুক পার্সোনালিটি...! এত বড় বিজনেস ওমেন আমার বাসায় এসে হাজির হয়েছেন, আমি তো ভাবতেই পারছি না!"

​আব্বুর মুখে এমন কথা শুনে নীলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও সোফা থেকে দাঁড়িয়ে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "আব্বু! তুমি ওকে চেনো নাকি?"

​আশরাফ সাহেব কিছু বলার আগেই মাহির মাঝখান থেকে বেশ অবাক হয়ে বলে উঠল,

— "আঙ্কেল চিনবে কি করে? ও তো আমাদের কাজিন! কালকেই মাত্র লন্ডন থেকে এসেছে, এই প্রথমবার বাংলাদেশে আসা ওর। আগে আসে নাই। "

​আশরাফ সাহেব মিহিরের দিকে তাকিয়ে প্রায় চোখ কপালে তুলে বললেন,

— "তোমরা একে স্রেফ কাজিন ভাবছ? বিজনেস ওয়ার্ল্ডের কে না তাকে চিনে! সে গ্লোবাল মার্কেটের টপ বিজনেস ওমেন—ইলারা রোজ চৌধুরী! কিন্তু... সে তোমাদের কাজিন কি করে হয়?"

​মাহির মাথা চুলকে এক গাল হেসে বলল,

— "আঙ্কেল, ও আমাদের ছোট মামার মেয়ে।"

​মাহিরের এই এক লাইনের উত্তরে ড্রয়িংরুমের পুরো ছাদটাই যেন ভেঙে পড়ল সবার মাথায়! ইলা যে ইন্টারন্যাশনালি এত বড় বিজনেস হ্যান্ডেল করে, এটা মাহির, মিহির কিংবা বাকি কাজিনদের কেউই জানত না। তারা সবাই নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে বোকার মতো ইলার দিকে তাকিয়ে রইল।

​রেহানা বেগম এখনো সিঁড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে ইলার ওই জাদুকরী চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, ওনার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছেই না।

​সবার এই হা-হয়ে থাকা চেহারার মাঝেই ইলা সোফায় গিয়ে বসল। ওর বসার ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছিল ও কতটা ডমিনেটিং। ও অত্যন্ত আভিজাত্যের সাথে একটা পায়ের ওপর আরেকটা পা তুলে আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হেসে এক্কেবারে চিল জেন-জি স্টাইলে বলল,

​— "গাইস, রিল্যাক্স! ডোন্ট বি সো ক্রিন্জ। আমি এখানে কোনো বিজনেস ওমেন ট্যাগ নিয়ে আসিনি, জাস্ট একজন সাধারণ মানুষ—তোমাদের মতোই। সো, বি ইজি!

​বলেই ও নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

— "বাই দ্য ওয়ে, আমি কি আসতে দেরি করে ফেললাম নাকি?"

​মিহির তখনো পুরো শকড অবস্থা থেকে বের হতে না পেরে আমতা আমতা করে বলল—

— "না... নীলা, ও হলো ইলা। আর... আর ওই যে এতক্ষণ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, ওটা আমাদের ইরহাম।

আরিয়ান ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সবাই ওর দিকে তাকাল। ক্লান্ত মুখটা দেখেই আয়শীন তাড়াতাড়ি এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দিল। চারপাশে অতিথিদের দেখে আরিয়ান কিছু না বলে পানিটা খেয়ে ইলার ঠিক বিপরীতের সিঙ্গেল সোফায় গিয়ে বসল।

মিহির উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে একে একে সবার সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল। সবশেষে ইলার দিকে ইশারা করে বলল,

— আরিয়ান ভাইয়া, ও হলো ইলা।

নামটা শুনে আরিয়ানের দৃষ্টি ইলার দিকে স্থির হয়ে গেল। গভীর, তীক্ষ্ণ সেই চোখ দুটো যেন খুব চেনা ঠেকছে।

আরিয়ান একদৃষ্টিতে সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি থমকে গেল—এই চোখ যে ওর বড্ড চেনা! জীবনের কোনো এক ফেলে আসা মুহূর্তে, কিংবা কোনো চেনা ফ্রেমের আড়ালে ও যেন ঠিক এই চোখ দুটোই দেখেছিল।

​ওদিকে আরিয়ানের এভাবে অপলক নজরে ইলার দিকে তাকিয়ে থাকাটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়শীনের একদমই ভালো লাগছিল না। ওর বুকের ভেতরটা হুট করেই এক তীব্র অভিমানে মোচড় দিয়ে উঠল। আয়শীন মনে মনে ভাবল—কই, সে তো কোনোদিন আমার দিকে এভাবে মুগ্ধতা নিয়ে তাকায়নি! আমি এত দিন ধরে ওর এত কাছে আছি, তাও তো ও এখনও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। আর আজ এই মেয়েটিকে প্রথমবার দেখেই ও এতটা হারিয়ে গেল?

​আরিয়ান তখনো ইলার চোখের মায়ায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন। নিজের অবচেতন মন থেকেই হুট করে আরিয়ানের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল,

​— "এই চোখে কি আপনি লেন্স লাগিয়েছেন?"

​আরিয়ানের এমন অদ্ভুত আর আকস্মিক প্রশ্ন শুনে পুরো ড্রয়িংরুমের সবাই যখন একটু অবাক হলো, ঠিক তখনই পাশে থাকা ইরহাম হেসে উঠে বলল,

​— "আরে না ভাইয়া! এটা ওর জন্মগত চোখ। কোনো লেন্স-টেন্স না।"

ইরহামের মুখে 'জন্মগত' শব্দটা শুনে আরিয়ান যেন আরও বড় একটা ধাক্কা খেল। ওর মনের ভেতরের চেনা ধাঁধাটা যেন আরও বেশি জটিল হয়ে উঠল। ও ভেতরে ভেতরে আরও বেশি থমকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই চারপাশের সবার উপস্থিতি খেয়াল করে নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল।

​কিছুক্ষণ পর মেইডরা টেবিলে নাস্তা সার্ভ করল। সবাই মিলে হালকা-পাতলা নাস্তা শেষ করার পর নীলা একগাল হেসে বলল, "চলো সবাই, আমরা একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি! বিকেলের আবহাওয়াটা দারুণ।"

​সবাই যাওয়ার জন্য দাড় হলেও ইলা নিজের জায়গা থেকে একটুও নড়ল না। ও সোফায় বেশ আভিজাত্যের সাথে বসে রইল। ইলা যাচ্ছে না দেখে ইরহামও ওর সাথে ড্রয়িংরুমে থেকে গেল। আরিয়ানের কাছাকাছি থাকার সুপ্ত ইচ্ছায় আয়শীনও ছাদে যেতে চায়নি, ও ড্রয়িংরুমেই আটকে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু নীলা ওর কোনো অজুহাত না শুনে জোর করে হাত টেনে ওকে ছাদে নিয়ে গেল।

​হলরুমটা কিছুটা ফাঁকা হতেই আশরাফ সাহেব সোফায় একটু এগিয়ে বসলেন। ইলার দিকে তাকিয়ে বেশ সংকোচ আর আশা নিয়ে বললেন,

​— "মা ইলা, আসলে প্রথমে তোমার পরিচয়টা আমার মাথায় ছিল না। এখন হুট করে একটা কথা মনে হলো... তুমি যদি আমাকে একটা হেল্প করতে, তবে আমাদের অনেক বড় উপকার হতো।"

​ইলা ওর শার্টের হাতাটা একটু ঠিক করে শান্ত গলায় বলল,

— "বলেন আঙ্কেল।"

​আশরাফ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওনার পুরো বিজনেস ক্রাইসিস ইলার সামনে খুলে ধরলেন। ওনার গলাটা কিছুটা বুজে এলো,

— "আমাদের বিজনেসে একের পর এক বড় বড় লস হয়ে গেছে মা। যার কারণে আমাদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। যাদের সাথে নতুন ডিল হওয়ার কথা ছিল, তারাও এখন আমাদের এই প্রজেক্টে আসতে চাচ্ছে না, সরাসরি রিজেক্ট করে দিচ্ছে, আবার ঘুমাচ্ছে। তুমি তো গ্লোবাল মার্কেটের টপ বিজনেস ওমেন। যদি তুমি কোনোভাবে আমাদের প্রোডাক্টটা একটু প্রমোশন করে দিতে, তবে আমাদের এই ডুবতে বসা বিজনেসটা বেঁচে যেত। এখন শুধু এই একটা পথই বেঁচে আছে আমাদের সামনে, নয়তো আমাদের এক্কেবারে পথে বসতে হবে!"

​আশরাফ সাহেবের মুখে এই করুণ পরিণতির কথা শুনে ইলা কিছু একটা ভাবল। ওর মায়াবী চোখ দুটোতে এক রহস্যময় গম্ভীরতা ফুটিয়ে ও শান্ত গলায় বলল,

​— "আমাকে প্রজেক্টের ফাইলগুলো দেখান।"

​ইলার মুখে এই কথা শুনে আশরাফ সাহেবের ডুবতে বসা মনে যেন আশার আলো জ্বলে উঠল! তিনি সাথে সাথে পাশে দাঁড়ানো আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

— "আরিয়ান, জলদি যা! আমাদের মেইন প্রজেক্টের ফাইলগুলো নিয়ে আয়।"

​পাশ থেকে ইরহাম যখন ইলাকে এই ফাইলে জড়াতে বারণ করার জন্য চোখের ইশারা করল, ইলা তখন এক চিলতে চাউনিতে ইরহামকে একদম চুপ থাকতে বলল। ও যেন মনে মনে অলরেডি কোনো বড় গেম প্ল্যান সাজিয়ে ফেলেছে!

​কিছুক্ষণ পর আরিয়ান ফাইলগুলো নিয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এলো। ও ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফায় ঠিক ইলার একদম গা ঘেঁষে পাশে বসল। ফাইলটা মেলে ধরে ও ইলাকে প্রজেক্টের প্রতিটা ডিটেইলস এক এক করে বুঝিয়ে দিতে লাগল। ইলা খুব মনোযোগ দিয়ে ফাইলটা দেখতে দেখতে আশরাফ সাহেবের সাথে বিজনেসের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কথা বলতে লাগল।

​কিন্তু ঠিক তখনই আরিয়ানের ভেতরে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হলো! এত কাছাকাছি বসে থাকার কারণে ইলার শরীর থেকে এক অত্যন্ত চমৎকার, মায়াবী আর চেনা সুবাস আরিয়ানের নাকে এসে ধাক্কা দিল। এই ঘ্রাণটা এতটাই অদ্ভুত আর তীব্র ছিল যে আরিয়ান নিজের অজান্তেই চোখ দুটো বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিল।

​চোখ বন্ধ করতেই আরিয়ানের মনে হলো, ও যেন কোনো অচেনা মানুষের পাশে নেই; ও যেন ওর জীবনের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার একদম পাশে বসে আছে! এতদিনের বুকের ভেতরের সেই একাকীত্ব, সেই শূন্যতা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। এতকাল ওর ভেতরটা যে অপূর্ণতায় হাহাকার করত, এই সুবাস আর সান্নিধ্যে আজ আরিয়ানের ভেতরটা এক পরম তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। ও এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পেল এই মেয়ের পাশে বসে।

ইলা বেশ কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে রইল। ঘরের নীরবতা ভেঙে ও যখন মুখ খুলল, ওর কণ্ঠস্বরে তখন এক অলঙ্ঘনীয় আভিজাত্যের সুর। ও শান্ত গলায় বলল,

​— "আমি রাজি। কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে..."

​আশরাফ সাহেব যেন হাতে চাঁদ পেলেন, ওনার ডুবতে বসা চোখে তখন নতুন আশার আলো। তিনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে বললেন,

— "কী শর্ত বলো মা? তোমার সব শর্তই আমি মেনে নেব।"

​ইলা ফাইলের ওপর থেকে চোখ তুলে সরাসরি আশরাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে ওর প্রথম চালটা চালল,

— "আমার প্রথম শর্ত হলো—এই প্রজেক্ট চলাকালীন আমি এই বাড়িতেই থাকব। শুধু আমি নই, আমার সাথে এই ইরহাম থাকবে এবং আর দুই দিন পর আমার আরও কিছু ফ্রেন্ড আসবে, তারাও এই বাসাতেই থাকবে।"

​আশরাফ সাহেব এক মুহূর্তও না ভেবে খুশি হয়ে বললেন,

— "ঠিক আছে, অবশ্যই থাকবে! এটা তো তোমারই বাসা। আর বাকি শর্তগুলো কী?"

​ইলা এক চিলতে হেসে বলল,

— "বাকি শর্তগুলো সময় হলে বলব।"

​মির্জা বাড়ির মতো বিলাসবহুল বাড়িতে ইন্টারন্যাশনালি এত বড় একজন সফল মানুষকে নিজেদের অতিথি হিসেবে রাখার সুযোগ পেয়ে রেহানা বেগম এক্কেবারে গদগদ হয়ে উঠলেন। উনি নিজের মনের ভেতরের লোভ আর ভালোমানুষির মুখোশটা পরে কৃত্রিম আহ্লাদ দেখিয়ে বললেন,

​— "অবশ্যই মা! তুমি থাকবে না তো কে থাকবে? তোমার মতো চাঁদের মতো সুন্দরী মেয়ের জন্য আমার ঘরের দরজা সবসময় খোলা..."

​রেহানার এই ন্যাকামো আর অতিরিক্ত মিষ্টি কথাগুলো ইলার একটুও পছন্দ হলো না। ওর ঠোঁটের হাসির রেখা ফুটে উঠল। ও মনে মনে বলল—‘চাঁদ তো কেবল দেখেছেন আন্টি, চাঁদের ভেতরের সেই নিকষ কালো কলঙ্কটুকু সহ্য করার ক্ষমতা কি আপনার বা আপনার এই বাসার কারো আছে? সেই ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি থাকুন।’

​ইলা আরিয়ানের দিকে নিজের ফর্সা, মসৃণ হাতটা বাড়িয়ে দিল। আরিয়ানও এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ইলার সেই নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠল। ওদের মাঝে একটা মৌন চুক্তি সই হয়ে গেল।

​এরপর ইলা যখন আশরাফ সাহেবের সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল, তখন আশরাফ সাহেব আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। ওনার চোখে তখন এক অদ্ভুত পিতৃত্বের হাহাকার। তিনি করুণ গলায় বললেন,

— "মা, আমি কি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি?"

​ইলা মৃদু মাথা নেড়ে অনুমতি দিতেই আশরাফ সাহেব ওকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আর সাথে সাথেই ওনার চোখের বাঁধ ভাঙা জল ইলার দামি শার্টের কাঁধটা ভিজিয়ে দিল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— "তোমাকে এত কাছ থেকে দেখে আমার খুব আপন একজনের কথা মনে পড়ছে মা!"

​ইলা নিজেকে ওনার বুক থেকে একটু আলগা করে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "কার কথা মনে পড়ছে আঙ্কেল?"

​আশরাফ সাহেব চোখের জল মুছে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— "আমার নিজের মেয়ের কথা..."

​পাশ থেকে ইরহাম এতক্ষণ সবটা খুব খুঁটিয়ে দেখছিল, ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "কই, আপনার মেয়ে কোথায়? সে তো ড্রয়িংরুমে আসেনি।"

​আশরাফ সাহেবের গলার স্বর এবার এক্কেবারে বুজে এলো, ওনার পুরো শরীরটা যেন কান্নায় কাঁপতে লাগল। তিনি ডুকরে উঠে বললেন,

— "সে নেই... সে অভাগা আমাকে একা রেখে, এই পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে।"

​ইলা ওনার এই কষ্ট দেখে শান্ত গলায় সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

— "কোথায় গেছে আঙ্কেল? আর প্লিজ, আপনি মন খারাপ করবেন না।"

​আশরাফ সাহেব ওনার মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরে ডাইনিং টেবিলের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,

— "আমার মা মারা গেছে... আজ সে বেঁচে থাকলে ঠিক তোমার বয়সীই হতো। ও আমার বড় আদরের মেয়ে ছিল..."

​আশরাফ সাহেবের মুখে এই স্বীকারোক্তি শুনে ইলা আর ইরহামের পায়ের তলার মাটি যেন এক মুহূর্তে সরে গেল! ওরা প্রচণ্ড অবাক হয়ে ভাবল—মির্জা পরিবারের আরও একটা মেয়ে ছিল? যার কথা এই বাড়ির কেউ এখন পর্যন্ত ভুলেও উচ্চারণ করে নাই!

​বাবার মুখ থেকে এই নামটা শোনা মাত্রই আরিয়ানকে এক তীব্র বিষাদ আর একাকীত্ব গ্রাস করে নিল। ও আর এক সেকেন্ডও ওই ড্রয়িংরুমে বসার শক্তি পেল না। ও কোনো কথা না বলে, একরাশ শূন্যতা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা ওপরে উঠে গেল। ও একা হতে চাইল, তাই ও ওর রুমে না গিয়ে এই মেহরান ভিলার এক কোণায় থাকা মৃত্তিকার সেই অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরটার দিকে পা বাড়াল। যে ঘরের দেওয়ালগুলো আজও এক করুণ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

​ওদিকে আরিয়ান চলে যেতেই এতক্ষণ চুপ করে থাকা রেহানা বেগমের ভেতরের বিষাক্ত রূপটা এক নিমেষে বেরিয়ে এলো। উনি আশরাফ সাহেবের এই কান্না আর ইলার সামনে অতীত হাতড়ানো একদমই সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি ড্রয়িংরুমের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে মৃত্তিকার উদ্দেশ্যে জঘন্য সব ভাষায় করতে শুরু করলেন,

​— "অলক্ষ্মীটা মরে গিয়েও আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না! বেঁচে থাকতেও আমার সংসারে আগুন লাগিয়েছিল, আর মরে গিয়েও ও আমাদের ভালো দেখতে পারছে না। শাঁখচুন্নি একটা! তাই তো এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও ও নিজের ওই নোংরা স্মৃতিগুলো নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে আর আমার সাজানো সংসারটাকে তছনছ করে!"

​রেহানা বেগমের মুখ থেকে একটা মৃত মেয়ের প্রতি এমন হিংস্র আর কুৎসিত কথা শুনে ইলা আর ইরহাম স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষ মরে গেলে তো সব শত্রুতার অবসান হয়, কিন্তু একটা মৃত মানুষকে কেউ এভাবে বলতে পারে? তার এই আভিজাত্যের নিচে যে কতটা পঙ্কিলতা লুকিয়ে আছে, তা ওদের আগে একদমই জানা ছিল না।

​আশরাফ সাহেব নিজের স্ত্রীর এমন রুক্ষ আর অমানবিক আচরণে চরম লজ্জিত ও ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,

— "রেহানা! মুখ বন্ধ করো তোমার! মেহমানদের সামনে ঘরের মরা মেয়েকে নিয়ে এসব কী আজেবাজে কথা বলছ?"

​কিন্তু রেহানা বেগম স্বামীর সেই ধমককে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিলেন না। ওনার চোখ-মুখ তখন রাগে আর হিংসায় বিকৃত হয়ে উঠেছে। তিনি ওপরের দিকে হাত তুলে চরম আক্রোশে অভিশাপ দিয়ে বললেন,

— "কেন মুখ বন্ধ করব? ও একটা ডাইনি ছিল! আমি খোদার কাছে লাখ বার বদদোয়া করি, যাতে ওই অপয়াটা নিজের কবরেও এক চিলতে শান্তি না পায়! ও যেন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়!"

​ইরহাম আর ইলা স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, ওদের সামনে এই পারিবারিক নোংরামি প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় আশরাফ সাহেব একদিকে যেমন ধমকাচ্ছেন, অন্যদিকে নিজের স্ত্রীর এই লাগামহীন অবাধ্যতায় ভেতরে ভেতরে চরম লজ্জা ও অস্বস্তিতে পুড়ছেন। পরিবেশটা এতটাই দমবন্ধ করা হয়ে উঠেছিল যে, সেখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানোও সম্ভব ছিল না।

​তাই ইলা আর ইরহাম সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ইলা শান্ত গলায় বলল,

— "আঙ্কেল, আমরা তাহলে আজকে আসি। মাহিররা ছাদ থেকে নিচে নামলে ওদের একটু বলে দেবেন যে আমরা বাসায় চলে গেছি।"

​আশরাফ সাহেব কোনোমতে মাথা নেড়ে বিদায় জানালেন। ইলা আর ইরহাম দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুম ছেড়ে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু ওরা গেট পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত পিছন থেকে রেহানা বেগমের সেই উচ্চস্বরের চিৎকার আর মৃত্তিকার প্রতি ওনার তীব্র আক্রোশ মেশানো বিষোদ্গার ওদের কানে আসতেই থাকল। রেহানা তখনও মেইডদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলছেন,

— "নষ্ট মেয়ে একটা! ওর অভিশাপেই আজ আমাদের বিজনেসের এই দশা! ও আমাদের পুরো বংশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে... ওই নোংরা মেয়েটার নাম যেন এই বাড়িতে আর কেউ কোনোদিন না নেয়! ও জারজ সন্তান মৃ........"

​আর কিছু শোনা হলো না। মির্জা বাড়ির সেই রাজকীয় আর ভারী সদর দরজাটা এক তীব্র শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

~ চলবে......

🌸 ভুল-ক্রটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন