#গল্পটা_আমাদের_ছিল
#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন
#পর্বঃ২৬
~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ 🚫 ~~
সময় বহমান। নদীর স্রোতের মতো সময়ও নিজের গতিতে বয়ে চলেছে।
আজকের সকালটা চৌধুরী বাড়িতে একটু অন্যরকম। আজ লন্ডন থেকে জুনায়েদরা দেশে ফিরছে। ওদের রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যাবে ইলা আর ইরহাম। ইরহাম যাবে গাড়ি নিয়ে, আর ইলা বরাবরের মতো নিজের প্রিয় বাইক নিয়েই রওনা দেবে।
তবে আজকের দিনটার আরেকটা বিশেষ দিকও আছে।
আজ থেকেই ইলা সাময়িকভাবে মির্জা বাড়িতে শিফট হবে। নতুন প্রজেক্টের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকবে সে।
এই খবরটা ছোট্ট এহানকে এখনো জানানো হয়নি। কারণ সবাই জানে, ইলা বাসায় থাকবে না—এ কথা শুনলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলবে ছেলেটা। তাই আপাতত বিষয়টা ওর কাছ থেকে লুকিয়েই রাখা হয়েছে।
ইলা নিজের রুমে শেষবারের মতো সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন মিসেস চৌধুরী।
ঘরে ঢুকেই তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চোখ দুটো টলমল করে উঠল, পরক্ষণেই অঝোরে কান্না শুরু করলেন।
মাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ইলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাছে গিয়ে দুই কাঁধে হাত রাখল।
মৃদু হেসে বলল,
— "ও আম্মু! তুমি কাঁদছ কেন? আমাকে একটু মিস করলেই একটা ভিডিও কল দিও, আমি সঙ্গে সঙ্গে চলে আসব। এত চিন্তা করো না। আমি তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না, শুধু বিজনেসের কাজের জন্য কয়েকদিন অন্য বাসায় থাকব।"
মিসেস চৌধুরী ভেজা চোখ মুছে অভিমানী গলায় বললেন,
— "সব কাজ কি নিজের বাসায় বসে করা যায় না? অন্যের বাসায় গিয়েই করতে হবে? আমার মেয়েটাকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব?"
ইলা মুচকি হেসে মায়ের হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল।
— "আম্মু, আমি কি এই প্রথম বাসার বাইরে কাজ করতে যাচ্ছি? এর আগেও তো দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কতবার গেছি। তখন তো কিছু বলোনি।"
মিসেস চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
— "তখনও ভালো লাগত না। কিন্তু তোর বাপটা না... একদম ভালো মানুষ না! নিজের বাচ্চা মেয়েটাকে দিয়ে দিনরাত শুধু বিজনেস করায়। মনে হয় পৃথিবীতে আর কোনো লোকই নেই কাজ করার!"
ইলা মায়ের কথায় হেসে ফেলল।
— "আব্বু শুনলে কিন্তু খুব কষ্ট পাবে।"
মিসেস চৌধুরী এবার আরও অভিমানী হয়ে বললেন,
— "কষ্ট পাক! আগে যদি জানতাম দেশে এসে আমার মেয়েকে এভাবে বিজনেসের পেছনে ছুটতে হবে, তাহলে আমি লন্ডন থেকেই আসতাম না। দরকার হলে রাইশার বিয়েটাও লন্ডনেই করার ব্যবস্থা করতাম। অন্তত আমার মেয়েটা সারাক্ষণ আমার চোখের সামনে থাকত!"
কথাটা বলেই তিনি আবার ইলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
মায়ের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ইলা বুঝতে পারল, পৃথিবীতে যত বড়ই হয়ে যাক না কেন, মায়ের কাছে সে আজও সেই ছোট্ট আদুরে মেয়েটাই রয়ে গেছে।
ইলা আলতো করে মায়ের বাঁধন আলগা করে ওনার মুখোমুখি বসল। মিসেস চৌধুরীর চোখের কোণ ঘেঁষে নেমে আসা জলটুকু নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে বেশ চাবুক অথচ নরম গলায় বলল,
— "আম্মু, তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে আমি কাজ করব কী করে বলো? রাইশা আপুর বিয়ের কথা যখন তুললেই, তখন তো আরও বেশি করে আমার সেখানে থাকা দরকার। সব গোছগাছ পারফেক্ট হতে হবে না? তুমি একদম ভাববে না, আমি জাস্ট কয়েকটা দিন পরেই আবার নিজের রুমে ফেরত আসছি। আর এহান ঘুম থেকে ওঠার আগেই কিন্তু আমাকে বেরোতে হবে, নয়তো ও সত্যি সিন ক্রিয়েট করবে।"
মিসেস চৌধুরী মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার মন সায় না দিলেও তিনি বুঝতে পারলেন ইলাকে আর আটকে রাখা যাবে না। তিনি কোনোমতে মাথা নেড়ে ওনার সম্মতি জানালেন।
ইলা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। ও চট করে ওর কালো লেদার জ্যাকেটটা গায়ে গলিয়ে নিল। টেবিল থেকে বাইকের চাবি আর নিজের সেই হেলমেটটা হাতে তুলে নিয়ে রুমের দরজার দিকে পা বাড়াল।
দরজা খুলে বের হতেই ও দেখল করিডোরে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইরহাম। ওর পরনে ক্যাজুয়াল শার্ট, চোখের চশমাটা ও আঙুল দিয়ে একটু ঠিক করে ইলার দিকে তাকাল। ওরা এয়ারপোর্টে জুনায়েদদের রিসিভ করতে যাচ্ছে দেখে দুজন মনে হচ্ছে ডেটে যাচ্ছে করো সাথে
ইরহাম ইলার হাতের হেলমেটের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— "গাড়ির চাবি আর তোর লাগেজ আমি অলরেডি নিচে পাঠিয়ে দিয়েছি। জুনায়েদদের ল্যান্ড করার সময় হয়ে এসেছে। এবার আমাদের বেরোনো দরকার।"
ইলা একে একে বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিল। তারপর বাবার সামনে গিয়ে মাথাটা একটু নিচু করে বলল,
— "পাপা, আমার জন্য দোয়া করবে। যেন নতুন প্রজেক্টটা সুন্দরভাবে শেষ করতে পারি।"
মাকসুদ চৌধুরী স্নেহভরে মেয়ের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।
এরপর ইলা ঘরের কাজের মেয়ে কবিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "কবিতা, এক কাপ স্ট্রং ব্ল্যাক কফি করে নিয়ে আসো তো। বের হওয়ার আগে খেয়ে যাই।"
— "জি, আপা।"
কবিতা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ইলা ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— "পাপা, আমি না থাকা পর্যন্ত কিন্তু আম্মু আর এহানকে ভালো করে দেখে রাখবে। বিশেষ করে এহান যেন বুঝতেই না পারে আমি কয়েকদিন বাসায় থাকব না। না হলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলবে।"
মাকসুদ চৌধুরী মেয়ের দিকে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঠোঁটের হাসি টেনে দোয়া দেওয়ার মতো বললেন,
— "দোয়া করি... আর যেন এই বাসায় তোমার ফিরে আসা না হয়।"
তার মুখে এমন কথা শুনে আশপাশে বসে থাকা সবাই এক মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে গেল।
কিন্তু ইলা?
সে নির্বিকার ভঙ্গিতে সোফায় আরও আরাম করে হেলান দিল। এক ভ্রু উঁচু করে মাকসুদ চৌধুরী দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— " ওহ হ্যালো এক্সকিউজ মি, ! এটা কি আপনার একার বাসা নাকি? এটা আমার পাপার ও বাসা, আর এই বাসার মেয়েও আমি। আমাকে এত সহজে এ বাড়ি থেকে বিদায় করার দিবা স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। দরকার হলে আমি রোজ রোজ ফিরে এসে আপনাদের বিরক্ত করব!"
একটু থেমে দুষ্টু হেসে আবার বলল,
— "আর একটা কথা, এই বাড়িতে আমার নামে আলাদা রুম আছে, আলাদা অধিকার আছে, আলাদা আদর আছে। সুতরাং আমাকে 'না আসার' দোয়া না করে, বরং দোয়া করো যেন বারবার ফিরে এসে তোমাদের মাথা খেতে পারি!"
ইলার কথা শেষ হতেই পুরো হলরুমে হাসির রোল পড়ে গেল।
মিস্টার চৌধুরীও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। মেয়ের মাথায় আলতো একটা টোকা দিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "এক নম্বরের দুষ্টু মেয়ে!"
ইলার কথা শেষ হতেই হলরুমে কেউ হেসে ফেললেও, মাকসুদ চৌধুরীর মুখে বিন্দুমাত্র হাসি ফুটল না। বরং তিনি ঠান্ডা চোখে ইলার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
— "মেয়েটাকে কেউ একটু শাসন করবে? নাকি সবাই মিলে মাথায় তুলেই রাখবে? এই জন্যই দিন দিন মুখের লাগাম হারিয়ে ফেলছে।"
পাশ থেকে সজলা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলেন।
— "আমি তো সেই থেকে বলছি। কিন্তু আমার কথা এই বাড়িতে কে শোনে? উল্টো সবাই ওই মেয়ের পক্ষই নেয়!"
ইলা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি টেনে দু'জনের দিকেই তাকাল।
— "আচ্ছা, তোমরা দু'জন শেষ করেছ? নাকি আমি বের হওয়ার আগে আরেকটু বক্তৃতা শুনতে হবে?"
বলে সে হেলমেটটা হাতে তুলে নিল।
ইরহামও গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ওরা বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক মুহূর্তে মাকসুদ চৌধুরী সজলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে কটাক্ষভরা গলায় গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন—
♪ "যাক, যাক, চলে যাক... শান্তি এবার ঘরে থাক..." ♪
সজলা চৌধুরীও ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
— "আল্লাহ যেন দোয়া কবুল করেন। কয়েকটা দিন অন্তত বাড়িটা শান্ত থাকবে।"
কথাগুলো শুনেও ইলা একবারও পেছনে তাকাল না।
শুধু বেরিয়ে যেতে যেতে হাত নেড়ে বলল,
— "শান্তি কতদিন থাকে, সেটা আমি ফিরে এসে দেখে নেব!"
কথাটা বলেই ইলা আর ইরহাম বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
°°°°
এয়ারপোর্টের ভিআইপি এক্সিট টার্মিনালের সামনে ইলা আর ইরহাম প্রায় দশ মিনিট অপেক্ষা করতেই ভেতর থেকে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে বেরিয়ে এল জুনায়েদ, মাহিম, সায়রা আর মাইশা।
ব্যস! ইলাকে চোখে পড়তেই সায়রা আর মাইশা নিজেদের ট্রলি-স্যুটকেস মাঝরাস্তায় ধপাধপ ফেলে দিয়ে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
— "ইলাআআআ!"
এমন এক চিৎকার যে মনে হলো পুরো এয়ারপোর্টের ছাদটাই বুঝি কেঁপে উঠল! লন্ডনের সব আভিজাত্য আর ব্রিটিশ ম্যানারস যেন এক সেকেন্ডেই উধাও হয়ে গেল।
দুই পাগলি দৌড়ে এসে ইলাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন তিনজন একসঙ্গে একশো বিলিয়ন পাউন্ডের লটারি জিতে অক্ষত অবস্থায় বাংলাদেশে নেমেছে!
জড়িয়ে ধরা শেষ হতেই শুরু হলো আসল কাণ্ড।
তিনজন হাত ধরে গোল হয়ে এমনভাবে লাফালাফি আর চিৎকার শুরু করল যে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সব যাত্রীদের পর্যন্ত চোখ কপালে উঠে গেল। কারও মনে হলো কোনো ওয়েলকাম ফ্ল্যাশ মব চলছে, আবার কেউ কেউ ইতোমধ্যেই মোবাইল বের করে ভিডিও করা শুরু করে দিয়েছে।
লাফাতে লাফাতে হঠাৎ সায়রা মাইশাকে একটা জোরে ধাক্কা দিল।
মাইশা গিয়ে সোজা ইলার ওপর পড়তেই ইলা বিরক্তির ভান করে তাকে সরিয়ে দিয়ে সায়রার কাঁধে আলতো একটা ধাক্কা মেরে বলল,
— "এই পেতনি! আমি মানুষ, বালিশ না! একটু আস্তে জড়িয়ে ধরতে পারিস না?"
মাইশা মুখ ফুলিয়ে প্রতিবাদ করল,
— "চুপ! আগে আমাকে পাঁচ মিনিট জড়িয়ে থাকতে দে। তোকে দুই বছর পর সামনে পেলাম!"
সায়রা সঙ্গে সঙ্গে মাইশাকে টেনে সরিয়ে বলল,
— "হট! ইলা আমার। তুই লাইনে দাঁড়া!"
— "কীসের তোর? আগে আমি দেখছি!"
— "না, আগে আমি!"
একপর্যায়ে দুই বোন ইলাকে মাঝখানে রেখে টানাটানি শুরু করে দিল।
ইলা দুই হাত তুলে বলল,
— "আরে থাম! আমাকে কি দুই ভাগ করে নিবি নাকি?"
ওদের এই হাই-ভোল্টেজ ড্রামা, ধাক্কাধাক্কি আর চিৎকারে টার্মিনালের আশপাশের সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ট্রলি বয় থেকে শুরু করে বিদেশি যাত্রী—সবার চোখ এখন এই তিনজনের দিকেই। কেউ কেউ তো ফোন বের করে টিকটক আর রিলস বানানোর জন্য ক্যামেরাও তাক করে ফেলেছে।
এদিকে আমাদের ইরহাম?
ও নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে এক লাফে অন্তত পাঁচ হাত দূরে সরে গেল। শার্টের কলার টেনে মুখের অর্ধেক ঢেকে, চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এমন একটা ভাব করল, যেন এই পৃথিবীতে সে একেবারে একা আর এই তিন পিস পাগলকে জীবনে কখনো দেখেইনি!
নিজের মনেই বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,
— "আরে ভাই! এ ক্যায়া দেখতে পার রাহা হুঁ ম্যায়? এ সব কেয়া হ্যায় ভাই? আচ্ছা হ্যায় কি ও লোগ মুঝে নেহি দেখ রাহে। ওগো, আমি চিনিই না! আরে ভাই, এগলা কই থেকা আসছে ভাই? এদের আমি বাপের জন্মেও চিনি না, কসম লাগে! কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, আমি ডিরেক্ট বলব—আমি জাস্ট একজন সাধারণ পথচারী, এখানে এয়ারপোর্টের এসি খাইতে আসছি! সকাল সকাল ইজ্জতের ফালুদা বানাইয়া দিল!"
ইরহামের এই চরম অসহায় অবস্থা দেখে জুনায়েদ আর মাহিম ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ওর পাশে এসে দাঁড়াল।
জুনায়েদের মুখে তখন একটা শয়তানি হাসি দিল।
সে ইরহামের কাঁধে জোরে একটা চাপড় মেরে ফিসফিস করে বলল,
— "কী রে মামা! একা একা কোণায় দাঁড়িয়ে দেবদাসের মতো মুখ কালো করে আছিস কেন? চল, আমরাও গিয়ে ওদের হাত ধরে গোল হয়ে লাফানো শুরু করি! বিমানবন্দরের বুকে একটা ইন্টারন্যাশনাল ব্রো-মোমেন্ট ক্রিয়েট হয়ে যাক!"
মাহিমও সুযোগ বুঝে কানের কাছে মুখ এনে বলল,
— "একদম ঠিক! চল মামা, থ্রি ব্রাদার্স ড্যান্স হয়ে যাক! জনগণ দেখুক আমাদের ব্রো-কোড!"
দুজনের এই কুপ্রস্তাব শুনেই ইরহাম এক লাফে আরও দুই হাত পিছিয়ে গেল।
দুই হাত তুলে বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
— "সর, বাল! তোরা যদি এখন ওই তিন পেতনির সাথে এখানে গে-দের মতো লাফানো শুরু করিস, সত্যি বলছি আমি এখনই ফেসবুক লাইভ অন করে তোদের ভাইরাল করে দিব! ক্যাপশনে বড় বড় করে লিখব—'লন্ডন ফেরত দুই মজনুর এয়ারপোর্টে মানসিক ভারসাম্যহীনতা, পাবনায় সিট খালি নাই!'
"একবার তাকিয়ে দেখ তো ওই তিনটার দিকে! জনগণ কেমনে চোখ গোল গোল করে তাকায় আছে! তোদের লজ্জা-শরম না থাকতে পারে, কিন্তু আমার সমাজে একটা ক্রাশ ইমেজ আছে ভাই!
"আর শোন, গাড়ির চাবিটা কিন্তু আমার পকেটে। বেশি নাটক করলে তোদের সব লাগেজ এই মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে আমি ইলাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে এক টানে হাওয়া হয়ে যাব!"
ইরহামের এই হাড়কিপ্টে হুমকি শুনে জুনায়েদ আর মাহিম পেটে হাত দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল।
জুনায়েদ হাসতে হাসতেই বলল,
— "দেখছিস মাহিলা? ছেলে নিজের ইমেজ নিয়ে কত চিন্তিত! মনে হচ্ছে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে কেউ এখনই ওকে সিনেমার হিরো বানিয়ে ফেলবে!"
মাহিম গম্ভীর মুখ করে মাথা নেড়ে বলল,
— "হিরো না, ভাই! এ নিজেকে 'বাংলাদেশের ন্যাশনাল ক্রাশ' ভাবে। তাই তিনটা পেতনি একসাথে লাফালাফি করলে ভাবছে সবাই ওর ফ্যান!"
কথাটা শুনেই ইরহাম নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের বুকে হাত রেখে বলল,
— "আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে একজন আমার ট্যালেন্ট বুঝছে!"
তারপরই মুখটা আবার গম্ভীর করে চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "কিন্তু ভাই, ট্যালেন্ট থাকলেও সম্মানটা বাঁচানো জরুরি! ওইদিকে দেখ, একটা আন্টি তো ইতোমধ্যে আমাকে এমনভাবে দেখছে, যেন এই সার্কাসের মাস্টারমাইন্ড আমি!"
জুনায়েদ চোখ টিপে বলল,
— "মামা, চিন্তা করিস না। যদি ভাইরাল হই, ক্যাপশন দিব—'বাংলাদেশে নামতেই হারিয়ে যাওয়া তিন সঙ্গীকে খুঁজে পেলেন ইরহাম সাহেব!'"
মাহিম সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
— "না না! তার চেয়েও ভালো হবে—'এয়ারপোর্টে বিরল প্রজাতির তিন পেতনির আক্রমণে অসহায় যুবক!'"
— "আল্লাহর ওয়াস্তে থাম!" বলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার ভান করল ইরহাম।
ঠিক তখনই ওদিকে সায়রা চিৎকার করে বলল,
— "এই ইরহাম! এত দূরে দাঁড়িয়ে নাটক করছিস কেন? এদিকে আয়!"
ইরহাম দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে দুই হাত জোড় করে বলল,
— "না আপা! আমি নিরাপদ দূরত্বে ভালো আছি। আপনাদের আনন্দ আপনারাই করেন। আমাকে জড়ালে আমার হাড়গোড়ের ওয়ারেন্টি শেষ!"
মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "কী বললি? আয় তোকে একটা হাগ দিই!"
এই কথা শুনেই ইরহাম এমন দৌড় দিল, যেন পেছনে কেউ ধাওয়া করেছে।
দৌড়াতে দৌড়াতেই চিৎকার করে বলল,
— "জুনায়েদ! মাহিম! এদের সামলা! এরা মানুষ না, এরা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা!"
ইরহামের এমন অবস্থা দেখে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক যাত্রী পর্যন্ত হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই এক নিরাপত্তারক্ষী মুচকি হেসে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "আপনারা যদি রিইউনিয়ন শেষ করে থাকেন, তাহলে একটু রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ান। পেছনে আরও যাত্রী বের হচ্ছেন।"
কথাটা শুনে সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
সায়রা নিজের কপালে চাপড় মেরে বলল,
— "উফ! আমরা তো পুরো রাস্তা আটকে রেখেছি!"
ইলা হেসে মাথা নাড়ল।
— "তোদের দেখে মনে হচ্ছে লন্ডন থেকে না, বারো বছরের জেল খেটে মুক্তি পেয়ে এসেছিস!"
সায়রা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
— "ভুল বলেছিস। জেল থেকে বের হলে মানুষ এত খুশি হয় না, যতটা তোকে দেখে হয়েছি!"
কথাটা শুনে ইলার মুখেও অজান্তেই এক টুকরো উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল।
সায়রা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
— "ভুল বলেছিস। জেল থেকে বের হলে মানুষ এত খুশি হয় না, যতটা তোকে দেখে হয়েছি!"
কথাটা শুনে ইলার ঠোঁটের কোণেও অজান্তেই এক টুকরো উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল।
আর দেরি না করে সবাই লাগেজগুলো গুছিয়ে গাড়ি আর বাইকে উঠে বসল। সামনে ইলা নিজের বাইক নিয়ে, আর পেছনে ইরহামের গাড়িতে জুনায়েদ, মাহিম, সায়রা আর মাইশা।
গল্প করতে করতে কখন যে পুরো রাস্তা শেষ হয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না।
সময় বয়ে চলল...
সকাল প্রায় এগারোটা।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে সবাই এসে পৌঁছাল মির্জা বাড়ির বিশাল লোহার গেটের সামনে।
অবশ্য একটা বিষয় কেউই জানত না...
বাড়ির ভেতরে থাকা নীরা, আয়শীন এমনকি রেহানা বেগমও জানেন না যে আজ থেকে এই পুরো দলটাই এখানে থাকবে।
ইরহাম গাড়ি থেকে নেমে গেটের সামনে গিয়ে কলিং বেল চাপতেই কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে গেট খুললেন রেহানা বেগম।
ইরহাম ভদ্রভাবে সালাম দিল।
— "আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।"
— "ওয়ালাইকুমুস সালাম..."
কথাটা বলতে বলতেই রেহানা বেগমের চোখ পড়ল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচজন যুবক-যুবতী আর বিশাল বিশাল স্যুটকেসের পাহাড়ের দিকে।
একটা...দুইটা...তিনটা...
চারটা...পাচটা... ছয়টা....
গুনতে গুনতে ওনার চোখ কপালে উঠে গেল।
মুহূর্তেই মাথা ঘুরে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলেন।
সৌভাগ্যবশত সায়রা আর মাইশা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ওনাকে ধরে ফেলল।
সায়রা চিন্তিত গলায় বলল,
— "আন্টি! আপনি ঠিক আছেন?"
মাইশাও তাড়াতাড়ি বলল,
— "পানি লাগবে?"
রেহানা বেগম কপালে হাত রেখে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
— "হুম... আমি ঠিক আছি। তা... তোমরা কারা বাবা? মনে হয় ভুল করে অন্য বাসায় চলে এসেছ?"
ঠিক তখনই সবার পেছন থেকে ইলার চেনা কণ্ঠ ভেসে এল,
— "আরে আন্টি! ভুল করে না, ওরা একদম ঠিক জায়গাতেই এসেছে।"
বলেই ইলা একদম নিজের বাড়ির মতো ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল।
তারপর ঘাড় বাঁকিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
— "রাইট গাইস?"
সবাই একসাথে মাথা নাড়ল।
ইলা এবার দুই পা তুলে আরাম করে বসে রেহানা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— "আন্টি, আগে এক রাউন্ড কফির ব্যবস্থা করেন তো! লন্ডন থেকে আসা ভিআইপি গেস্টরা জেট ল্যাগে মারা যাচ্ছে। আর বলুন তো, আপনাদের দেশে এমন জ্যাম ছিল যে আমরা আসতে আসতে মনে হলো ঢাকা থেকে না, মঙ্গল গ্রহ থেকে আসছি!"
রেহানা বেগম বিস্ফারিত চোখে ইলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মনে হচ্ছিল, উনি এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না—এরা অতিথি, নাকি বাড়ির মালিক!
কিছুক্ষণ হা করে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি অবশেষে রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
কিন্তু দুই মিনিট পার হয়ে গেল...
রেহানা বেগমের আর ফেরার নামগন্ধ নেই।
ইলা ভ্রু কুঁচকে সোফা থেকে গলা বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল,
— "আন্টি! কফির বীজ কি এখন গাছ থেকে পেড়ে আনছেন নাকি? নাকি ব্রাজিল থেকে ইমপোর্ট হচ্ছে? আমরা কিন্তু শুধু কফি চেয়েছি, কফি বাগান কিনতে বলিনি!"
মাহিম সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলল।
জুনায়েদ মাথা নেড়ে বলল,
— "শুরু হয়ে গেছে... এখন আল্লাহই ভরসা!"
ইরহাম দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বিড়বিড় করে বলল,
— "ইন্না লিল্লাহ... আজকে থেকে এই বাড়ির শান্তির শেষ দিন!"
চলবে......
রেহানা আন্টির জন্য সবাই একটু দোয়া করবেন! 🤲🤣
কারণ সামনের কয়েকদিন উনার ধৈর্য, সহ্যশক্তি আর মানসিক শান্তির কঠিন পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে! 😂💔