#গল্পটা_আমাদের_ছিল
#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন
#পর্বঃ৩২
~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ 🚫 ~~
আরিয়ানের চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে আর আতঙ্কে জমে এক্কেবারে স্থির হয়ে গেল! ওর মনে হলো চারপাশের সময়টা যেন হুট করে এক সেকেন্ডে থমকে গেছে। বুক চিরে ধক করে এক তীব্র মোচড় দিল।
আরিয়ান ওর চড়ুইপাখিরূপী সেই অবয়বটার মুখের দিকে সম্পূর্ণ চোখ তুলে তাকাল। কিন্তু ওর ভাগ্য এতটাই নিষ্ঠুর যে, ওর চোখের দৃষ্টি হুট করেই কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে আসতে লাগল। ও ওর সেই চিরকাঙ্ক্ষিত মুখটা স্পষ্ট করে দেখার জন্য শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু পুরো চারপাশটা এক লহমায় ঝাপসা হয়ে গেল।ওর অবশ হয়ে আসা শরীর আর ক্লান্ত মস্তিষ্ক আর কোনো চাপ নিতে পারল না। চোখের পাতা দুটো প্রচণ্ড ভারী হয়ে নেমে এলো এবং ধীরে ধীরে ওর চোখ দুটো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে ওখানেই লুটিয়ে পড়ল।
┈┈┈┈┈┈┈┈
সকালের ঢাকা শহরটা আজ যেন অন্য দিনের চেয়ে আরও বেশি ব্যস্ত। আকাশে রোদের তেজ থাকলেও বাতাসে অস্বস্তিকর ভ্যাপসা গরম। চারদিক জুড়ে গাড়ির হর্ন, মানুষের ছুটে চলা আর ব্যস্ত নগরীর কোলাহলে সকালটা যেন নিজের গতিতেই ছুটে চলছে।
এদিকে মির্জা বাড়িতেও সকাল থেকেই উৎসবের আমেজ। রেহানা বেগমের কয়েকজন বিশেষ আত্মীয় আজ আসবেন বলে পুরো বাড়ি জুড়ে সাজসাজ রব। কাজের লোকেরা এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে বাহারি খাবারের গন্ধ।
সেই কারণেই ইলা খুব সকাল সকাল চৌধুরী বাড়িতে চলে এসেছে। কিছুক্ষণ পরই যমুনার দিকে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যেতে হবে। সঙ্গে যাবে ইরহাম, জুনায়েদ আর মাহিম। আর সায়রা ও মাইশা আজ বাসাতেই থাকবে।
মাহিম ধীরে ধীরে সায়রার পাশে এসে সোফায় বসে বলে,
─ "সায়ু,জান কী করিস?"
সায়রা ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল—
─ "দেখছিস না? রিল দেখছি।"
মাহিম একটু গম্ভীর হয়ে বলল—
─ "শোন... আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
সায়রা এবার ফোনটা লক করে ওর দিকে তাকাল।
─ "কী সিদ্ধান্ত?"
মাহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
─ "আমাদের সম্পর্কের কথা ইলাদের বলে দেব। আর কতদিন লুকিয়ে রাখব? যদি কোনোভাবে ওরা অন্য কারও মুখে শুনে যে আমরা এতদিন ধরে ওদের না জানিয়ে রিলেশনে আছি... ইলা আমাদের জীবন্ত কবর দিয়ে দেবে।"
কথাটা শুনেই সায়রার বুক ধক করে উঠল।
─ "আল্লাহ! আমার তো এখনই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের শুরুতে'ই বলে দেওয়া উচিত ছিল। তুই বল, আমি কিন্তু বলতে পারব না।"
মাহিম মুচকি হেসে বলল,
─ "আরে বোকা, এত ভয় পাচ্ছিস কেন? জুনায়েদ তো আগেই জানে। ও-ই তো বলেছে, আর দেরি করা ঠিক হবে না।"
─ "জুনায়েদ জানে মানেই কি ইলা ছেড়ে দেবে? ওর রাগটা ভুলে গেছিস?"
─ "রাগ তো করবেই। দু-চারটা ঝাড়ি, কয়েকটা গালি,এসব তো বোনাস। কিন্তু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
─ "আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, আগে গালি দেবে... তারপর বিচারসভা বসাবে... তারপর আমাদের দুজনকে আলাদা আলাদা জেরা করবে!"
মাহিম হেসে ফেলল।
─ "হোক। তবুও আমি চাই, ওরা আমাদের মুখ থেকেই জানুক। অন্য কারও মুখে শুনলে ইলা আরও বেশি কষ্ট পাবে।"
সায়রা ঠোঁট কামড়ে বলল,
─ "আচ্ছা... কিন্তু একটা কথা। যদি ইলা রেগে গিয়ে বলে—'তোদের দুজনকে আজকেই চোখের সামনে থেকে গায়েব করে দিব!' তখন?"
মাহিম দুষ্টু হেসে উত্তর দিল,
─ "তখন তুই কাঁদবি, আমি মার খাব। শেষে ইরহাম, জুনায়েদ এসে আমাদের প্রাণ বাঁচাবে!"
সায়রা এবারও হাসতে পারল না।
─ "তুই হাসছিস, কিন্তু আমার সত্যিই খুব ভয় করছে। ইলা রেগে গেলে মানুষ থাকে না... একদম ঘূর্ণিঝড় হয়ে যায়!"
মাহিম ওর মাথায় আলতো একটা টোকা মেরে বলল,
─ "ঘূর্ণিঝড় হলেও সে আমাদের মানুষ। রাগ করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের সুখটাই চাইবে। তাই আর লুকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।"
সায়রা চুপচাপ মাথা নাড়ল। বুকের ভেতরটা এখনও ধুকপুক করছে।
ওরা সবাই চারটা বাইক নিয়ে বের হওয়ার জন্য একদম রেডি। ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে মাইশা দৌড়ে এসে বায়না ধরল যে সে-ও নাকি ওনাদের সাথে যাবে। এই ভ্যাপসা গরমে বাসায় বসে ও বোর হতে চাচ্ছে না। মাইশাকে রাজি হতে দেখে ইলা পাশে দাঁড়ানো সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তুই একা বাসায় থেকে কী করবি? চল, তুইও চল আমাদের সাথে! "
ব্যস! ইলার গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে সায়রা আর মাইশাও জলদি রেডি হয়ে চলে এলো। মোট চারটা বাইক স্টার্ট হলো—ইলা ওনার নিজের বাইকে, আর বাকি তিনটাতে ইরহাম, জুনায়েদ আর মাহিম। সায়রা আর মাইশা ওনাদের পেছনে চেপে বসল। ঢাকার ভ্যাপসা গরম আর জ্যাম ঠেলে ওরা যখন ঠিক এগারোটার সময় যমুনার সেই অফিস পৌঁছাল!
রিসিপশনে ম্যানেজার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ওনাদের ফাইল চেক করে বলল,
— "ম্যাম, আপনাদের মিটিং তো এগারোটায় নয়, ওটা বারোটায় শিডিউল করা হয়েছে।"
এই কথা শোনা মাত্রই ইলার মাথার রগ এক সেকেন্ডে চটে গেল! ও কাউন্টারে হাত চাপড়ে ওনার সেই চিৎকার করে বলল,
— "আর ইউ কিডিং উইথ মি?! আই ডোন্ট হ্যাভ ইওর ফাকিং ফাউল টাইম টু ওয়েস্ট হিয়ার! হু দ্য হেল টোল্ড মি দ্যাট দ্য মিটিং ওয়াজ অ্যাট ইলেভেন?! দিস ইজ সো আনপ্রফেশনাল!"
ইলা ওখানেই থামল না। ও ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "সাওয়ার পোম্লারা! কাজের কোনো ঠিকঠিকানা নাই, ফালতু সব বাল মার্কা সিস্টেম বানিয়ে রাখছিস তোরা! আমার এক ঘণ্টার দাম তোদের পুরো কোম্পানি বেচলেও উঠবে না, শালার দল!"
ইলার এই ভয়ংকর রূপ দেখে আশেপাশের সিকিউরিটি আর লোকজন এক্কেবারে থমকে গেল। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই ইরহাম আর জুনায়েদ এক সেকেন্ড দেরি না করে ইলার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল। ওরা ইলাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে পাশের একটা রেস্টুরেন্টের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
রেস্টুরেন্টে ঢোকার পথে জুনায়েদ ইলার দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্ত আর চিন্তিত গলায় বলল,
— "ইলা, তুই দিন দিন কিন্তু একটুতেই বড্ড বেশি রেগে যাচ্ছিস! এভাবে কথায় কথায় হাইপার হয়ে গেলে তো বিজনেস চালানো যাবে না রে বোন, একটু তো কুল থাক!"
ইলা এক ঝটকায় ওদের হাত দুটো ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিল। ও ওনাদের ওপর চোখ রাঙিয়ে সোজা গিয়ে রেস্টুরেন্টের মাঝখানের একটা বড় টেবিলে ধপ করে বসল। টেবিলে বসার পর ওনার চোখের সামনে মেন্যু কার্ডটা আসতেই ওনার ভেতরের সেই কিলার মুডটা যেন হঠাৎ উধাও হয়ে এক নিমিষে প্রচণ্ড খিদায় রূপ নিল! ও মেন্যু কার্ডে চোখ বুলিয়ে ওয়েটারকে ডেকে একাই অনেকগুলো ফাস্ট ফুড—বিফ বার্গার, চিজ লোডেড ফ্রাইস আর ক্রিস্পি চিকেন অর্ডার দিয়ে দিল।
অর্ডার আসার সাথে সাথেই ইলা বাকিদের দিকে তাকিয়ে ওনার সেই স্বভাবসুলভ রাশভারী গলায় ধমক দিয়ে বলল,
— "এই বালের নাতি-নাতনিরা! তোরা কেউ যদি খাস, তো খা! আর যদি না খাস, তবে ভালো মানুষের মতো চুপচাপ বসে থাক, আমার খাওয়ার ওপর একদম নজর দিবি না বলে দিলাম! নজর দিলে কিন্তু চোখ গেলে দেব!"
এই বলেই ইলা বার্গারটা হাতে নিয়ে এক্কেবারে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল! ওর এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে ইরহাম, জুনায়েদ, মাহিম থেকে শুরু করে সায়রা আর মাইশাও এক্কেবারে হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। সবাই মনে মনে ভাবল—ভাইরে ভাই! এই মেয়ের এত ঘন ঘন মুড সুইং হয় কীভাবে?! এইমাত্র যে মেয়েটা তুফান তুলছিল, সে এখন এক সেকেন্ডে সব ভুলে বাচ্চার মতো ফাস্ট ফুড ধ্বংস করছে!
সবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টেবিলের চারপাশের চেয়ারগুলোতে টেনে বসল এবং হালকা গলায় কথা বলতে শুরু করল। পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক হতেই জুনায়েদ মাহিমের দিকে একপলক তাকাল। মাহিম তখন সায়রার হাতটা টেবিলের নিচে শক্ত করে ধরে ভয়ে কাঁপছে। জুনায়েদ ইলার দিকে তাকিয়ে হালকা কেশে বলল,
— "ইলা... আসলে মাহিম তোকে একটা খুব ইম্পর্টেন্ট কথা বলতে চাচ্ছে। ও একটা ডিসিশন নিয়েছে।"
ইলা তখন মুখে একটা বড় চিকেনের পিস পুরে চিবাচ্ছিল। ও খেতে খেতেই চিবুক উঁচিয়ে মাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "ওরে আমার সোনা বাবা! ওর কি নিজের মুখে কোনো ভাষা নাই? নাকি মুখটা জং ধরে গেছে যে ও নিজে কয়তে পারে না? আমার কাছে আসার সময় সবার ডায়ালগ কেন অন্য কেউ ডেলিভারি দেয়?!"
ইরহাম ইলার এই মুখের ভেতর খাবার নিয়ে কথা বলার দেখে কপালে হাত দিয়ে ধমকের সুরে বলল,
"আরেহ ইলা! আগে মুখের ওই খাবারটা গিলিয়ে শেষ কর, তারপর শান্ত হয়ে কথা বল।
ইলা বড় একটা ঢোক গিলে খাবারটা নামিয়ে টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছল। ওর সেই তীক্ষ্ণ চিতা চোখ দুটো এবার সোজা মাহিম দিকে স্থির হলো। ওর চাউনি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল—মাহিম কিছু বলার আগেই ইলা ওদের ডাল-ভাতের ভেতরের আসল খিচুড়িটা অলরেডি ধরে ফেলেছে!
ইলা চোখ ছোট করে দু'জনের দিকে তাকিয়ে পানি খেল। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,
─ "আচ্ছা, এখন বল... কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে?"
মাহিমের বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেল...।
মাহিমের বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেল...। ও আমতা আমতা করে বলল,
─ "ইয়ে ইলা আস... আসলে... আসলে—"
ইলা ওর কথা শুনে এক ধমক দিয়ে বলল,
─"কী বালের আসলে-নকলে শুরু করছিস? যা বলার সোজা বল!"
জুনায়েদ টেবিলের নিচ দিয়ে মাহিমকে একটা গুঁতো মেরে ফিসফিসিয়ে বলল,
─ "শালা তাড়াতাড়ি বল, ওর মিটিংয়ের সময় হয়ে যাচ্ছে।"
সায়রার ভয়ে হাত-পা কাঁপছে আর ও মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করছে, যেন বড় কোনো বিপদ না হয়।
মাহিম এবার চোখ বন্ধ করে এক শ্বাসে বলে দিল,
"আমি আর সায়রা রিলেশনে আছি...।"
ব্যস, কথাটা শোনার সাথে সাথে চারপাশের সব শব্দ যেন এক লহমায় থেমে গেল। মাইশা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল,
─"কীহ্! এটা কবে হলো?!"
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইলা এক্কেবারে স্বাভাবিক রইল। মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয় নাই! ও ওনার সেই ঠান্ডা, ধারালো চোখে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
─ "তারপর? কতদিন ধরে চলছে?"
সায়রা ইলার এই অতিরিক্ত স্বাভাবিক কথা শুনে আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল। মনে হচ্ছে যেন একটা প্রলয়ংকরী ঝড় আসার পূর্বাভাস পাচ্ছে ও।
মাহিম ঢোক গিলে কাঁপা গলায় বলল,
─ "দু... দুই বছর।"
ইলা ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
─ "তা... এত দিন জানাস নাই, আজকে জানাতে আসছিস?"
মাহিম ওনার কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছে বলল,
─ "আমার কেন জানি বড্ড ভয় করছে ইলা। কোনো বিপদ আসবে বোধহয়, আমি মনে মনে সেই আভাস পাচ্ছি...।"
ইলা ব্লেজারের হাতাটা টেনে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
─ "হোপ! ল্যাওড়ার কথা বলিস না! তোরা দুই টায় আমার নাকের ডগা দিয়ে পিরিত করবি আর আমি জানবো না—ভাবলি কী করে? তোরা কি আমাকে অন্ধ ভাবিস? আমি তো এই দিন টার অপেক্ষা করছিলাম। বাট তোরা বড্ড দেরি করে ফেললি, আর তার জন্য শাস্তি তো পেতেই হবে তোদের!"
ও ঘাড় বাকিয়ে সায়রাকে দেখে বলল,
─ "কী পাখি? এই জন্য তো মাহিম অসুস্থ হলে তোমার চোখ-মুখ একদম কান্না করে ফুলা থাকতো, তাই না? তখন তো বলতি চোখে ময়লা ঢুকছে!"
সায়রা এক্কেবারে মিনমিন করে ইলার হাত ধরার চেষ্টা করে বলল,
─"আসলে জানু, শুন না... আমি রিলেশন করতে চাই নাই। এই মগাটা আমাকে কীভাবে জানি পটায় ফেলছে, আমি নিজেও জানি না রে দোস্ত!"
ইলা সায়রার কথার জবাব না দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা জুনায়েদের দিকে তাকাল। ওনার সেই চাউনি নিজের দিকে আসতে দেখে জুনায়েদ মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়া শুরু করল—না জানি সব ঝড় এখন ওর ওপর দিয়ে যায়!
ইলা জুনায়েদকে লক্ষ্য ককরেশান্ত গলায় বলল,
─ "কিরে মাদারবোর্ড? সব তো শুরু থেকেই জানতি, ওনাদের প্রেমের মেইন ঘটক তো তুই-ই ছিলি! এখন তোকে কী শাস্তি দিবো বল?"
মাইশা এবার সায়রাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
─ "সায়রা! তুই আমাদের এত কাছের বান্ধবী হয়েও আমাদের না জানিয়ে, এভাবে লুকিয়ে রিলেশন করছিস?!"
ইলা ওর বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে ড্রামাটিক টোনে বলল,
─ "দিলে বড় চোট পাইছি রে মাইশু...!"
ইরহাম এতক্ষণ চুপচাপ পুরো সিনটা দেখছিল। ও এবার গম্ভীর হয়ে মাহিম আর সায়রাকে জিজ্ঞেস করল,
─"তোদের এই সম্পর্কের কথা কি দুই ফ্যামিলি জানে?"
সায়রা ভয়ে ভয়ে ইলার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
─ "পা... পাপা জানে। আ... আর মাহিমের ওপর যখন ওই অ্যাটাকটা হলো, তারপর আমরা যখন ইন্ডিয়া গেলাম না? তখন হসপিটালে মাহিম আন্টিদের সব জানাইছে...।"
ইলা ওর চেয়ারটা পেছনের দিকে ঠেলে এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
─ "বাহ্! সবাই সব জানে! তো এখন আমাকে কেন তোরা এই বাসি কথা জানালি? হোয়াই? আনসার দে আমাকে...!"
মাহিম আর সায়রা এই মুহূর্তে কী বলবে, তার কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। ওরা জাস্ট অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল।
ইলা ওর ফোন আর ব্যাগটা টেবিল থেকে এক ঝটকায় হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাহিম ওর সিট থেকে উঠে আকুল হয়ে বলল,
─ "ইলা, কথা শুন, এভাবে রাগ করে যাস না প্লিজ! আমাদের উচিত ছিল এই কথাটা তোকে অনেক আগেই সবার আগে বলা। কিন্তু বলি নাই... দোস্ত, প্লিজ কথা বল আমাদের সাথে!"
সায়রাও প্রায় কেঁদে ফেলে ওর ব্যাগটা টেনে ধরে বলল,
─ "এইইই ইলা! কই যাচ্ছিস তুই? আমাদের ভুল হয়েছে রে... আর কখনো এমন করব না!"
ইলা ওদের দিকে এক চরম অবজ্ঞা আর পাথুরে চাউনি ছুড়ে দিয়ে বলল,
"আমি কি তোদের কিছু বলছি? কী বাল এক কথা বারবার রিপিট করছিস তোরা? ভাই, এটা তোদের জানাতে মন চায় নাই—জানাস নাই! সো আমি কে যে তোরা আমার সামনে এসে বলছিস ‘ভুল হয়েছে’? আই জাস্ট ডোন্ট কেয়ার!"
সায়রা এবার এক্কেবারে কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,
─ "দোস্ত... প্লিজ এভাবে বলিস না!"
মাইশা আর জুনায়েদ মাঝখান থেকে ওকে শান্ত করতে কিছু একটা বলতে নিলেই ইলা এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে ওর হাতঘড়ির টাইমটা দেখল। ওর মিটিংয়ের সময় হয়ে গেছে। ও পাশে দাঁড়ানো ইরহামের দিকে তাকিয়ে বলল,
─ "ইরহাম, ওদের পরিষ্কার করে বলে দে—ওরা যেন আজ থেকে আর কোনোদিন আমার সামনে না আসে! আমার আশেপাশেও যেন ওদের আর কখনো না দেখি!"
কথাটা শেষ করেই ইলা এক সেকেন্ডও আর সেখানে দাঁড়াল না। ওর সেই হাই হিলের খটখট শব্দ তুলে ও গটগট করে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে অফিসের দিকে চলে গেল। ওর এই শেষ হুকুমটা শুনে মাহিম, সায়রা আর জুনায়েদ এক লহমায় আঁতকে উঠল! ওরা তো ইলাকে ছাড়া এক দণ্ডও থাকতে পারে না, সেখানে ইলা ওদের নিজের সামনে যেতেই বারণ করে দিল!
সায়রা এবার আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না, ও টেবিলে মাথা গুজে ডুকরে কেঁদে দিল। মাইশা নিজের ভেতরের সব রাগ-অভিমান ভুলে সায়রাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
─ "আরেহ সায়রা, চুপ কর! দেখ চারপাশের সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ও এখন জাস্ট প্রচণ্ড রেগে আছে, তাই রাগের মাথায় এই কথা বলছে। তুই তো জানিস ওনাকে..."
জুনায়েদ নিজের কপালে হাত দিয়ে মাহিমকে একটা ঝাড়ি মেরে বলল,
─"এই জন্য তোকে বারবার বলছিলাম যে ওকে আগেভাগে সব বলে দে! এখন দেখলি তো কী হলো?"
মাহিমের গলাটা এবার অপরাধবোধে আর ভয়ে এক্কেবারে ধড়ফড় করে আটকে আসছিল। ও ভাঙা গলায় বলল, "কীভাবে বলতাম বল? ও দুনিয়ার সব সহ্য করতে পারলেও, এই গ্রুপের ভেতর কোনো নিজেদের মধ্যে রিলেশন বা লুকুচুরি একদম পছন্দ করে না—এটা তো আমরা সবাই ভালো করেই জানি! ওর এই মারাত্মক রিঅ্যাকশনের ভয়েই তো এতদিন মুখ খোলার সাহস পাইনি!"
ইরহাম ওনাদের দিকে তাকিয়ে চরম বিরক্তিতে বলল,
─ "আবালচুদা! তোরা একটা আস্ত বলদের দল! এই কথাটা যদি আরও আগে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতি, ও বড়জোর দুই-চারটা চর দিয়ে মেনে নিত। কিন্তু তোরা ওর আড়ালে পুরো দুই বছর ধরে প্রেম করলি, আর আজ এই জঘন্য টাইমিংয়ে এসে বললি! এখন আল্লাহ ভালো জানে তোদের এই তিনটার জন্য সামনে কী ভয়ানক আর খতরনাক শাস্তি অপেক্ষা করছে! বাই দ্য ওয়ে মাইশা, তুই কি আগে থেকে ওদের এই কীর্তিকলাপের কিছু জানতি?"
মাইশা সায়রার চোখ মুছে দিতে দিতে মাথা নেড়ে বলল,
─ "না ইরহাম, কসম খোদার আমি কিচ্ছু জানতাম না! তবে হ্যাঁ, আগে যখন সায়রাকে ফোনে লুকিয়ে কথা বলতে দেখতাম আর মাহিমকে যখন ওর আশেপাশে এত বেশি ঘুরঘুর করতে দেখতাম—তখন একটু খটকা লাগলেও এত গভীর কিছু ভাবি নাই, এত গুরুত্ব দিই নাই।"
জুনায়েদ এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
─ "শালা, এখন আর আমাদের ভয় না দেখিয়ে, কীভাবে ওর রাগ ভাঙানো যায়—সেটার কোনো আইডিয়া বের কর! নয়তো ও তো সত্যি সত্যিই আমাদের কাবাব বানিয়ে দেবে! এখন কী করা যায় বল তোরা?"
মাহিম বলল,
─ "এক কাজ করলে কেমন হয়? ওর মিটিং শেষ হওয়া পর্যন্ত আমরা এই রেস্টুরেন্টেই বসে থাকি? ও যখন বের হবে, আমরা সবাই মিলে ক্ষমা চেয়ে নেব!"
ইরহাম একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
─ "হাহ্! পা ধরবি? ইলা যদি একবার কোনো ডিসিশন নেয়, ওর ওই ইগোর সামনে এসে ধাক্কা মারলেও ওর সিদ্ধান্ত নড়চড় হয় না! এখন তোদের জাস্ট ওপরওয়ালার ওপর ভরসা করে ওর শান্ত হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে, এছাড়া কোনো পথ নাই!"
┈┈┈┈┈┈┈┈┈
মাশফিককে নিয়ে মিটিং রুমে ঢুকতে ঢুকতে ওর থেকে কাজের কারেন্ট আপডেট শুনছিল ইলা। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় ওর হাই হিলের খটখট শব্দে পুরো ফ্লোর কেঁপে উঠছিল। ইলা ঠান্ডা গলায় মাশফিককে নির্দেশ দিয়ে বলল,
— "মেহেদীকে জলদি বাংলাদেশ আসতে বল। আর আমি যা যা আনতে বলছি, সব যেন সাথে করে নিয়ে আসে ও!"
মাশফিক মাথা নিচু করে বলল,
— "ইয়েস ম্যাম, এখনই বলছি।"
ওরা দুজন কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করতেই পুরো রুমের পরিবেশ যেন এক সেকেন্ডে সাইলেন্ট হয়ে গেল। ইলা ওর নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারটায় গিয়ে বসল। রুমে উপস্থিত দেশের বড় বড় নামী-দামী বিজনেস ম্যানরা ইলার ওই কিলার বারগান্ডি লুকের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। সেখানে মির্জা বাড়ির আরিয়ানও উপস্থিত ছিল। ওর চোখ দুটো আড়চোখে ইলার দিকেই স্থির হয়ে রইল।
ইলা চেয়ারে হেলান দিয়ে সানগ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে অত্যন্ত রাশভারী আর গম্ভীর কণ্ঠে পুরো রুমের উদ্দেশ্যে বলল ,
— "গুড মর্নিং জেন্টলম্যান! লেটস নট ওয়েস্ট এনি মোর টাইম। স্টার্ট দ্য প্রেজেন্টেশন ওয়ান বাই ওয়ান অ্যান্ড মেক ইট কুইক!"
ওর হুকুম পেয়ে একে একে সবাই নিজের প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন করতে শুরু করল। আরিয়ানের পালা নিজের প্রেজেন্টেশনটা দিল, যা বেশ ভালো ও মানসম্মত হয়েছিল।এরপর দাঁড়াল মিস্টার আহসান আতীশ দেওয়ান বিজনেস দুনিয়ার রাজা যাকে এক নামে চিনে। রিমন ওর পেছনে দাঁড়িয়ে ল্যাপটপে ফাইল রেডি করে দিচ্ছিল আর আতীশ প্রজেক্ট ডিফাইন করছিলেন। পুরো কনফারেন্স রুমের সবাই যখন ইলার দিকে হা করে তাকিয়ে ওর ইমপ্রেশন বোঝার চেষ্টা করছিল, তখন এই একচ্ছত্র ব্যক্তিটি পুরো প্রেজেন্টেশন চলাকালীন একবারের জন্যও ইলার দিকে চোখ তুলে তাকাল না! আতীশকে দেখেই ইলা চরম বিরক্তিতে ওনার মুখটা বাঁকিয়ে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল মিস্টার ' ব্রুট'? এখানে ওয়াই?
তবে মুখ বাঁকালেও মনে মনে ইলা এটা স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, আতীশের বলার ধরন আর ভয়েস টোনটা এক্কেবারে আলাদা ও ডমিনেটিং ছিল। ও ওর প্রজেক্টের প্রতিটি প্রোডাক্টের ফিচার, কোয়ালিটি আর ফিউচার প্ল্যান এত নিখুঁতভাবে প্রেজেন্ট করছিল যে বোর্ডের বাকি মেম্বাররা ওর আইডিয়া লুফে নিল এবং সবাই খুব পছন্দ করল।
সবাই যখন আতীশের প্রেজেন্টেশনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ঠিক তখনই ইলার পালা এলো। ওর ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে ইলা সোজা হয়ে বসল। ওর সেই তীক্ষ্ণ চোখ দুটো পুরো রুমের ওপর বুলিয়ে অত্যন্ত প্রফেশনাল আর চাবুক টোনে ওর প্রোডাক্টের বিবরণ দিতে শুরু করল,
— "সবার প্রোডাক্ট আইডিয়া নো ডাউট ভালো। কিন্তু আপনাদের ওই ট্র্যাডিশনাল ডিজাইন দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট ধরা যাবে না। আমাদের ব্র্যান্ড এবার এমন এক আল্ট্রা-মডার্ন, কাস্টমাইজড মেটেরিয়ালের প্রোডাক্ট লঞ্চ করছে—যা ওজনে হবে সবচেয়ে হালকা কিন্তু ডিউরেবিলিটিতে হবে পাথরের মতো শক্ত! আমরা শুধু লোকাল প্রফিট দেখি না, আমাদের টার্গেট হলো গ্লোবাল নেক্সট-জেনারেশন ক্লায়েন্ট। সো, জাস্ট ফোকাস অন দ্য কোয়ালিটি, বাকিটা মার্কেট রেসপন্সই বলে দেবে যে কিং কে!"
ইলার এই অল্প কথার ভেতরের কনফিডেন্স আর কিলার বিজনেসম্যান স্ট্র্যাটেজি শুনে পুরো কনফারেন্স রুমে এক সেকেন্ডের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই...
আতীশের কানে ইলার ভয়েসটা যাওয়া মাত্রই ওনার বুকের ভেতর কেমন যেন খটকা লাগল। এই ধারালো, কণ্ঠস্বর ও আগে কোথাও শুনেছে! মাথায় কিছুটা চাপ প্রয়োগ করতেই ওনার এক সেকেন্ডে মনে পড়ে গেল,আরেহ! এটা তো সেই বেয়াডপ, বেপরোয়া মেয়েটার ভয়েস! যদিও সেদিন হেলমেটের গ্লাসের জন্য ও ফেসটা দেখতে পারেনি, কিন্তু গলার এই তীক্ষ্ণ টোনটা তো হুবহু এক! আতীশ নিজের মনের ভেতরের এই ভাবনাটাকে এক ঝটকায় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। ও নিজেকে মনে করিয়ে দিল—ওর হৃদয়ের স্পন্দন, ওর ‘হার্টবিট’ ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে ভাবার বিন্দুমাত্র সময় বা ইচ্ছে ওর নেই!
সবাই ভাবছিল ইলা হয়তো আতীশের সাথেই ডিলটা ফাইনাল করবে, কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ইলা ডিলটা সাইন করল সরাসরি আরিয়ানের কোম্পানির সাথে। আতীশ গম্ভীর গলায় আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "মিস্টার আরিয়ান, ওই ডিলটা নিয়ে কি আপনারা আর আগাবেন না আমাদের সাথে?"
আরিয়ান ক্লান্ত গলায় বলল,
— "কী আর বলবো মিস্টার আহসান! আমি আপনাকে কতবার কল দিয়েছি, কিন্তু আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট তো প্রতিবারই বলল যে আপনি আসবেন, অথচ শেষ পর্যন্ত আর আসেননি। তারপর আব্বু বাধ্য হয়ে মিস ইলার কোম্পানির সাথেই ডিলটা ফাইনাল করে নিয়েছে আচ্ছা, আজকে রাতে আমি আপনাকে আমাদের ডিসিশনটা ফাইনাল জনিয়েছে
আতীশ একদম ভাবলেশহীন মুখে বলল,
— "অ্যাজ ইয়োর উইশ । "
এরপর আতীশ অন্য দুটো ইম্পর্টেন্ট ফাইলে সাইন করে কনফারেন্স রুম থেকে বের হয়ে গেল। ইলাও ব্যাগ নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে এলো। আরিয়ানের মনের ভেতর কেন জানি এক তীব্র অসহায়ত্ব আর ট্রমা কাজ করছিল, ও জাস্ট নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
লিফটের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখা গেল ইলা, মাশফিক, আতীশ আর রিমন—চারজন একসাথে একই লিফটে গিয়ে ঢুকল। লিফটের ভেতর এক পিনপতন নীরবতা। ইলা ওর ফোনটা বের করে এক ঝটকায় ইরহামকে কল দিয়ে লাউড দিয়ে বলল,
— "কই তোরা?"
ওপাশ থেকে ইরহাম বলল,
— "নিচে পার্কিংয়ের দিকে আছি। মিটিং ডিল সাকসেসফুল হইছে?"
ইলা ‘হুম’ বলে ছোট করে উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—"ওরা কই?"
ইরহাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "নিচেই আছে। সায়রা এখানও অনবরত কান্না করছে রে ইলা।"
ইলা ওনার ঠোঁটে এক হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "থাক! কাঁদতে দে, ওটা ওর পাওনা শাস্তি। ফোন রাখ, আমি আসতাছি।"
ফোনটা কেটেই ইলা পাশে দাঁড়ানো মাশফিকের দিকে তাকিয়ে অর্ডার দেওয়ার টোনে বলল,
— "মাশফিক, অফিস থেকে বের হয়েই আমার জন্য জলদি একটা ব্রাইডাল শাড়ি আর একটা পাঞ্জাবি সেট অর্ডার করে নিয়ে আয়...।"
মাশফিক ইলার কথা শুনে এক্কেবারে আকাশ থেকে পড়ল! ও চোখ বড় বড় করে শকড গলায় বলল,
─"ম্যাম! আপনি... আপনি কি বিজনেস সব ছেড়ে আজকে বিয়ে করবেন নাকি?!"
ইলা দাঁত কিড়মিড় করে ধমক দিয়ে বলল,
— "শাটআপ! কী বালের ফালতু কথা বলিস তুই?! আমি তোকে যা বলছি, তুই জাস্ট সব সময় তার থেকে এক লাইন বেশি বুঝিস কেন বল তো?!"
মাশফিক লিফটের ভেতরের বাকিদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থতমত খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "ম্যাম... পাশে মানুষ আছে তো, তাই বলছিলাম...।"
ঠিক তখনই টুং করে লিফটের দরজাটা খুলে গেল। ইলা বের হতে হতে এক্কেবারে প্রকাশ্যেই বলে উঠল,
— "তো পাশে মানুষ থাকলে এখন কী বাল হবে শুনি? সর সামনে থেকে! আমি যা বলছি তুই জাস্ট তাই কর, কোনো মাদারচোদ দেখার সময় আমার নাই!"
রিমন পাশে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে আতীশের দিকে তাকাল। আর আতীশ এবার এক্কেবারে ১০০ পার্সেন্ট শিওর হয়ে গেল—ইয়েস! এই মেয়েটাই সেই ওই চরম অসভ্য আর উগ্র মেয়েটা! ও মনে মনে ভাবল—এই মেয়ের কী অদ্ভুত ক্যারেক্টাররে ভাই! বিজনেস দুনিয়ায় এক রূপ, আর এখন এটা কোন রূপ?! ভাষার কী ছিরি! মুখে তো জাস্ট খই ফুটছে গালির!
ইলা গটগট বের হতেই দেখল ইরহামরা নিচে পার্কিংয়ের এক কোণায় দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কথা বলছে। ও একটু এগিয়ে গিয়ে দেখল—সেখানে সাফিন আর শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে! ইলা ওর সানগ্লাসটা একটু নামিয়ে সাফিনকে দেখে বলল,
— "হেই! কী অবস্থা তোদের?"
সাফিন আর শুভ্র প্রথমে এই কিলার লেডিকে চিনতেই পারেনি! পরে ইরহাম যখন ইশারা করে বলল,
—‘আরেহ এটা ইলা!’, তখন সাফিন এক্কেবারে হা হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ,
— "ও মাই গড! এতো দেখি আমাদের সেই পড়ি! ওইদিন তো হেলমেটের জন্য আসল চেহারাই দেখতে পারি নাই!"
সাফিন আর শুভ্র দুজনেই প্রচণ্ড অবাক হয়ে ইলার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। ইলা মেয়ে হয়েও যে এত বড় লেভেলের বিজনেস হ্যান্ডেল করে আর ওর পারসোনালিটির মধ্যে যে এক জাদুকরী ঘোর আছে, তা দেখে ওরা এক্কেবারে মুগ্ধ। ইলা ওদের সাথে দু-একটা ফর্মাল কথা বলে ইরহামের দিকে ঘুরে ওর বলল,
— "এই মাঙ্গের নাতি-নাতনিদের নিয়ে চল এখন এখান থেকে!"
সায়রা তখনো চোখ মুছে ইলার সাথে কথা বলার জন্য এক পা বাড়াতে চাইল,
— "দোস্ত, শোন না..."
কিন্তু ইলা ওদের দিকে একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকাল না, পুরো ইগনোর করল।
ঠিক তখনই আতীশ আর রিমনও ওদের কাছাকাছি এসে পৌঁছাল। আতীশ সোজা সাফিন আর শুভ্রদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "কী করিস তোরা এখানে?"
কথাটা বলেই ও ওখানকার পরিচিত মুখ ইরহাম আর জুনায়েদদের সাথে টুকটাক কথা বলতে লাগল।
সাফিন ইলার এই তাড়া দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল
— "তোমরা এখন করে কোথায় যাবে?"
ইলা ওর বাইকের চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে এক্কেবারে সোজাসাপ্টা বলল,
— "কাজি অফিস!"
এই কথা শোনামাত্রই ইরহাম এক ধাক্কায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
— "কীহ্! কাজী অফিস?! তুই বিয়ে করবি?! আর আমাদের একটা বারও তোরা কিছু বললি না?"
ইলা এবার রেগে গিয়ে ইরহামের দিকে চোখ রাঙিয়ে গর্জে উঠল,
— "চুপ কর! ধনের কথা বলিস না একদম! আর একবার যদি এই ফালতু কথা মুখে আনছিস, তো তোদের সবার মুখ আমি নিজ হাতে ভেঙে দেব বলে দিলাম!"
ইলার এই ভয়ংকর রূপ আর চিল্লানো দেখে ওদের গ্রুপের বাকি সবাই এক লহমায় মুখ বন্ধ করে দিল। ওরা ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে ইলা যে পরিমাণ হাইপার হয়ে আছে, ওর সামনে কথা বলা মানে আস্ত ডিনামাইটে আগুন দেওয়া!
সাফিন অবশ্য ইলার এই উগ্র রূপ দেখেও একটু দুষ্টু হেসে বলল,
— "তা সুন্দরী, তোমাদের সাথে কি আমাদেরও একটু নেবে নাকি? আমরাও না হয় সাক্ষী থাকলাম!"
আতীশ এবার ধমক দিয়ে সাফিনকে থামিয়ে বলল,
— "সাফিন! তুই ওখানে যেয়ে ফালতু কী করবি শুনি? ড্রামা বন্ধ কর আর সোজা বাসায় চল। আম্মু সকাল থেকে কল দিচ্ছে, সবার সাথে জেসিকে নিয়ে নাকি শপিংয়ে যাবে। সাথে তুই আর শুভ্র যাবি, চল এখন!"
সাফিন মুখ কালো করে বলল,
— "আরেহ থাক না ভাইয়া, একটু তো এনজয় করতে দে!"
ইলা সময় নষ্ট না করে ইরহামদের বলল,
— "ইরহাম চল!"
তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে সাফিন আর শুভ্রর দিকে তাচ্ছিল্যের সাথে তাকিয়ে বলল,
— "আর এই যে ব্যাঙের ছাওরা... আপনারা যদি যাওয়ার এতই শখ থাকে, তবে চলেন আমাদের সাথে!"
ইলা ওর বাইক স্টার্ট দিয়ে কোল্ড ভয়েসে ওদের কাজী অফিসের ঠিকানাটা বলে দিল। আর কোনো বাড়তি কথা না বলে সোজা কাজী অফিসের দিকে রওনা দিল।
ওদিকে ইলা চলে যেতেই সাফিন আতীশের হাত টেনে ধরে আকুল হয়ে বলল,
─ "দোস্ত! প্লিজ চল না ওদের সাথে, আমরাও যাই!"
আতীশ ওর হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে বিরক্তি নিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
─ "ওই অসভ্য, উগ্র মেয়ের সাথে আমি কোথাও যাবো না! তুই নিজের চরকায় তেল দে সাফিন!"
সাফিন ওর কাঁধে হাত রেখে মিনমিন করে বলল,
─ "আরেহ ভাই, এমন করিস না! মাইয়াটা দেখতে অনেক কিউট, তার ওপর ওটা আমার ক্রাশ! ওভাবে বলিস না ভাই, চল না একটু!"
সাফিনের অনেক অনুনয়-বিনয় আর জোরাজুরির পর আতীশ একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
"চল! তোর এই ফালতু ক্রাশের চক্করে আমার নিজের দিনটাই মাটি হলো!"
ইলারা কাজী অফিসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই মাশফিক ইলার অর্ডার করা সেই ব্রাইডাল শাড়ি আর পাঞ্জাবির ব্যাগ দুটো নিয়ে হাজির হলো। ওদিকে ইলা অলরেডি সায়রার বাবা আর মাহিমের আব্বু-আম্মুর সাথে ফোনে কথা বলছিল। প্রথমে ওনারা হুট করে এই বিয়ের কথা শুনে একদমই রাজি হতে চাননি। কিন্তু ইলাকে ওনারা প্রচণ্ড বিশ্বাস করেন, তাই ইলা যখন দায়িত্ব নিয়ে সব বুঝিয়ে বলল, ওনারা আর কোনো অমত করলেন না, হাসিমুখে সম্মতি দিলেন। সায়রা, মাহিম আর জুনায়েদ এই ফাঁকে ইলার সাথে কথা বলে ওনার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতে চাইল, কিন্তু ইলা ওনাদের দিকে তাকিয়ে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে রুক্ষ গলায় বলল,
─ "নো! একটা বাড়তি কথা ও আমার সাথে বলবি না!"
ইলা মাশফিকের হাত থেকে কাপড়ের ব্যাগ দুটো টেনে নিল। একটা ব্যাগ মাইশার দিকে ছুড়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল,
─ "এই মাইশু, এই নাতনিকে নিয়ে যেয়ে জলদি রেডি করায় আন!"
মাইশা সায়রাকে নিয়ে চেঞ্জার রুমে দিকে চলে গেলে, ইলা জুনায়েদের দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা ইরহামের দিকে ঘুরে বলল,
─ "ইরহাম, এই আবালটাকে নিয়ে যা, পাঞ্জাবিটা পরায় রেডি করায় আন! "
ইরহাম জুনায়েদকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু জুনায়েদ এবার আর নড়ল না। ও ধীরে ধীরে ইলার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, জুনায়েদ হুট করে ইলার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এবং দুই পায়ের নিচ দিয়ে হাত বের করে নিজের কান ধরে এক্কেবারে ‘মুরগি’ হয়ে গেল! জেসি এই অদ্ভুত ও হাসির দৃশ্য দেখে আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, ও খিলখিল করে শব্দ করে হেসে উঠল।
জুনায়েদ কান ধরে একদম অপরাধীর মতো মুখ করে বলল,
─ "ইলা নানী, প্লিজ এবারের জন্য আমায় মাফ করে দে! আর জীবনেও তোর কাছে কোনো কিছু লুকাবো না রে বোন। কসম খোদার, ভবিষ্যতে আমি নিজে প্রেম করার আগেও তোর থেকে লিখিত অনুমতি নিবো! এমনকি... এমনকি বাসর ঘরে যাওয়ার আগেও তোর পারমিশন নিয়ে ঢুকবো, প্লিজ এবার মাফ কর! তোর সাথে কথা না বলে থাকতে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে রে ইলা!"
ইলা চোখ নিচু করে তাকিয়ে দেখল, গরমে আর লজ্জায় জুনায়েদের পুরো মুখটা এক্কেবারে টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। ইলা ধমকে উঠে বলল,
─ "ওঠ দামড়া! চারপাশের সব মানুষ আমাদের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে, লজ্জা করে না তোর?!"
জুনায়েদ কান ধরা অবস্থাতেই জেদ ধরে বলল,
─ "না, আগে তুই আমাকে মাফ করবি, বলবি যে তুই আর রেগে নেই, তাহলেই আমি ওঠবো! নয়তো এই মুরগি হয়েই এখানে ডিম পাড়বো!"
ইলা বারবার ওকে ওঠার জন্য বললেও ও এক চুলও নড়ল না। ওদিকে ততক্ষণে সায়রা আর মাহিমও রেডি হয়ে মাইশার সাথে ওখানে চলে এসেছে, ওরাও জুনায়েদকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু জুনায়েদ ওভাবেই বসে রইল।
ইলা চেঁচিয়ে বলল,
─ "খাটাসের পোলা ওঠ বলছি! নয়তো এখনই একটা ঠাস করে থাপ্পড় দিয়ে তোর কানের তালা এক্কেবারে মেরে দেবো! তখন সারাজীবন আর কারোর পারমিশন দেওয়া লাগবে না!"
ইলার ধমক খেয়ে জুনায়েদ এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ও ওখান থেকেই মাহিমের দিকে তাকিয়ে বিজয়ী হাসিতে চোখ টিপে বলল,
─ "চান্দু! আমি মাফ পেয়ে গেছি রে!"
জানু, এই বলেই ও এক লাফে গিয়ে ইলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। হুট করে কী যেন মনে করে এক সেকেন্ডে ওনাকে ছেড়ে দিয়ে তিন হাত দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে আতীশের এই পুরো পাগলামি আর সস্তা নাটক দেখতে বিরক্ত লাগছিল। ও মনে মনে সাফিনকে গালি দিচ্ছিল যে, এই ফালতু ‘সাফিন্না’-র জন্য ওনাকে আজ এই উগ্র মেয়ে আর ওনার সস্তা নাটক সহ্য করতে হচ্ছে!
ঠিক তখনই ইলা মাহিম আর সায়রার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল,
─ "শোন সায়রা, শোন মাহিম। আজ তোদের বিয়ে হচ্ছে। ইউ নো হোয়াট? আমি তোদের মুখ থেকে আর কোনো ফালতু ওজর-আপত্তি বা ‘কিন্তু’ শব্দ শুনতে চাই না। এই যে তোরা এতদিন ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে হারাম প্রেম করছিস, এই সব হারাম পথ আর লুকুচুরির লাইফটা আজ এখানেই বাদ দে। নিজেদের সম্পর্কটাকে এভাবে ছোট না করে, আজ থেকে একদম হালাল ভাবে পবিত্র বন্ধনে জড়িয়ে নে। একটা সম্পর্কের আসল সৌন্দর্য আর মর্যাদা তখনই থাকে, যখন সেটা সবার সামনে হালাল উপায়ে স্বীকৃত হয়। পবিত্র সম্পর্কের বুঝতে শেখ, নোংরামি নয়।"
ইলার মুখ থেকে এত সুন্দর, পরিপক্ব আর গভীর একটা লাইফ লেসন শুনে ওখানকার প্রতিটি মানুষ—এমনকি ইরহাম, জুনায়েদ থেকে শুরু করে জেসি পর্যন্ত সবাই এক্কেবারে স্তব্ধ আর অবাক হয়ে গেল! যে মেয়েটা একটু আগে গালিগালাজ করছিল, সে কীভাবে এত সুন্দর ভাষায় একটা সম্পর্কের পবিত্রতা বুঝিয়ে দিল। '
ইরহাম ইলার এই আধ্যাত্মিক আর দায়িত্বশীল কথাবার্তা শুনে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
─" এটা একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না ইলা?"
কথাটা হতেই ইলা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। ওর সেই অগ্নিদৃষ্টি দেখে ইরহাম সাথে সাথে মুখে কুলুপ আঁটল।
পাশে দাঁড়িয়ে জুনায়েদ মাহিমের পিঠে একটা চাপড় মেরে হেসেই খুন, ও রসিকতা করে বলল,
— "মামা, তোরা যদি আরও আগে এই রিলেশনের কথা এই ইলিশসা কে জানতি, তবে আজ কাজী অফিসে এসে বিয়ে করা লাগত না, এতদিনে হয়তো তুই এক বাচ্চার বাপ থাকতি!"
জুনায়েদের এই রসিকতায় পুরো গম্ভীর পরিবেশটা এক সেকেন্ডে হালকা হয়ে গেল। মাহিম নিজেও মনে মনে প্রচণ্ড অবাক হচ্ছিল। ও কখনো কল্পনাও করতে পারেনি যে ইলা ওদের ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে এত বড় ঝাড়ি দেওয়ার পর, নিজেই দায়িত্ব নিয়ে ওদের মা-বাবাকে রাজি করিয়ে এভাবে হুট করে এত সুন্দর একটা হালাল বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবে
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে কাজী সাহেব খাতা এগিয়ে দিলেন। মাহিমের পক্ষে বিয়ের সাক্ষী হিসেবে সই করল খোদ আতীশ আর জুনায়েদ। আর সায়রা তথা কনের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে সই করল ইলা আর ইরহাম। বিয়ের পুরোটা সময় মাইশা সায়রাকে শক্ত করে ধরে পাশে বসে রইল। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ইলার হাত ধরেই সম্পন্ন হয়ে গেল মাহিম আর সায়রার পবিত্র বিয়ে। বিয়ে শেষ হতেই মাহিম ইলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আবেগপ্লুত গলায় বলল,
─ "দোস্ত, তোর কাছে আমি এতটা কৃতজ্ঞ যে আজ কী বলবো আমি ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না! তুই আমাদের এত বড় ভুলটাকেও এভাবে সামলে নিবি ভাবিনি, থ্যাংক ইউ দোস্ত...!"
ইলা মাহিমের এই ইমোশনাল কথার জবাবে কোনো উত্তর দিল না। ও ওর সানগ্লাসটা চোখে পরে, ব্যাগটা নিয়ে কোনো কথা না বলেই কাজী অফিস থেকে হনহন করে বের হয়ে বাইকের কাছে গেল। ওর পেছনে পেছনে ওদের পুরো গ্রুপ আর আতীশরাও বের হতে লাগল।
বাইরে এসে সাফিন ইলা দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল,
─ "আচ্ছা, ওর কী হয়েছে বলো তো? আজ কেন জানি একটু বেশি শান্ত মনে হচ্ছে ওকে?"
ইরহাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
─ "আসলে ওরা দুই বছর ধরে নিজেদের রিলেশনটা ওর কাছে গোপন রাখছিল, হয়তো সেই কারণেই ভেতর থেকে মারাত্মক চটে আছে ও।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আতীশ এবার বিরবির করে অহংকারের সুরে বলে উঠল,
─ "হাহ্! সে কে যে দুনিয়ার সব কিছু তাকে বলেই করতে হবে? যতসব ঢং! একটা চরম উগ্র আর নোংরা মেয়ে মানুষ!"
জেসি এই কথা শুনে অবাক হয়ে বলল,
─ "আরে এটা কেমন কথা ওরা প্রেম করছে এতে ইলার এত রাগের কী আছে? আজকালকার পোলাপান তো কত কিছুই করে!"
মাইশা সায়রার হাত ধরে রেখে মন খারাপ করে বলল,
─ "আপু, আসলে ও এই লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম-ভালোবাসা একদম দেখতে পারে না। ও এইগুলো প্রচুর ঘৃণা করে। "
শুভ্র জেসির পাশে দাঁড়িয়ে একটু ফাজলামি করে বলে উঠল,
─ "কেন? ও কি মারাত্মক কোনো ছ্যাঁকা খাইছে নাকি? তাই অন্যের প্রেম দেখলেই জ্বলে ওঠে?"
জুনায়েদ শুভ্রর কথায় হালকা হেসে মাথা নাড়ল,
─ "না ভাইয়া, ছ্যাঁকার কোনো বিষয় না। তবে এর পেছনে অনেক লম্বা একটা কাহিনী আছে, পরে একসময় সুযোগ বুঝে আপনাদের খুলে বলবো নি।"
একটু থামার পর জুনায়েদ সাফিন আর আতীশদের দিকে তাকিয়ে প্রস্তাব দিল,
─ "বাই দ্য ওয়ে, আজকে রাতে আপনারা আমাদের সাথেই থেকে যান না প্লিজ?"
জেসি চোখ দুটো বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
─ "থাকা মানে? কোথায় থাকবো?"
ইরহাম পকেটে হাত দিয়ে বলল,
─ "আজকে তো সায়রা আর মাহিমের বাসর রাত। তো আমরা ভাবছি ইলার সাথে কথা বলে আজকে রাতের জন্য কোনো একটা ভালো হোটেলে উঠবো। ওখানেই সবাই মিলে একটা ছোটখাটো সেলিব্রেশন হবে।"
মাইশা যোগ করল,
─ "হ্যাঁ, ইলা অলরেডি বলে দিয়েছে যে আজ ওদের বিয়ে বা হোটেলের এই ব্যাপারটা যেন ইরহামদের বাসায় না বলা হয়। নয়তো ওও দাদি, ফুফু পুরো বাড়ি একদম মাথায় তুলে নাচানাচি শুরু করবে! তাই আজ রাতটা আমরা বাইরেই কাটাবো।"
হোটেলে নাইট স্টে আর সেলিব্রেশনের কথা শুনে সাফিন তো এক পায়ে খাড়া! ও আনন্দে নাচতে নাচতে আতীশের দিকে তাকাল। কিন্তু আতীশ ওর সেই ডেঞ্জারাস চাউনি দিয়ে সাফিনের দিকে এমনভাবে তাকাল, যার পরিষ্কার অর্থ হলো—‘আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে কোনো লাভ হবে না সাফিন্না, আমি এই ফালতু মাইয়ার সাথে এক সেকেন্ডও থাকবো না!’
সাফিন এবার আতীশের হাতটা ধরে একদম বাচ্চাদের মতো কাকুতি-মিনতি করে বলল, "জানু-মানু... ও দোস্ত প্লিজ চল না! লক্ষ্মী ভাই আমার, আজকের রাতটা জাস্ট একটু চিল করি সবাই মিলে! প্লিজ না করিস না!"
শুভ্র আর জেসিও সাফিনের সাথে সুর মিলিয়ে আতীশকে রাজি করানোর জন্য ওর ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করতে লাগল। অন্যদিকে, মাহিম আর জুনায়েদও ওদের গাড়িগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ইলাকে কল দিয়ে হোটেলের রুম বুকিংয়ের আপডেট নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিল।
চলবে.....
আজকের পর্বে ভালো রেসপন্স পেলে মাহিম–সায়রার বাসর পর্বও দিবো! 🤭❤️
আর সাথে একটা বড় সিক্রেটও শেয়ার করব!
তাই সবাই Like,Comment আর Share করো। 🥹🤍