#গল্পটা_আমাদের_ছিল
#লেখিকা_জান্নাতুল_ফেরদৌস_জেরিন
#পর্ব_৩৯
~~ অনুমতি বিহীন কপি করা নিষিদ্ধ 🚫 ~~
বিঃদ্রঃ এই পর্বে গল্পের চরিত্র ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে কিছুটা বেশি গালাগালি ব্যবহার করা হয়েছে। শব্দগুলো চরিত্রের সংলাপের অংশ—এখানে লেখিকার ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য বা হাত নেই। তাই সবাই গল্পের অংশ হিসেবেই নেবেন।
ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
---------
মির্জা বাড়িতে আজ যেন নিঃশব্দতারও মৃত্যু হয়েছে। কেউ অনুশোচনায় পুড়ছে, কেউ অতীতের স্মৃতিতে ডুবে আছে, আবার রেহানা ও শমসের নিজেদের পুরোনো কুকর্ম মনে করে আতঙ্কে কাঁপছে।তাদের বিশ্বাসই হচ্ছে না—যে মেয়েটাকে একসময় তুচ্ছ করেছিল, সেই মৃত্তিকাই আজ ইলা হয়ে তাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে!
আরিয়ানের বুকেও চলছে অদ্ভুত এক যুদ্ধ। চড়ুই বেঁচে আছে—এই আনন্দের পাশে পাহাড়সম অনুশোচনা। সেদিন যদি ওমন না করে তাকে মেনে নিত, হয়তো আজ গল্পটা অন্যরকম হতো।
ঠিক তখনই ফোনটা কানে নিয়ে আরিয়ান থমকে গেল।
— “স্যার! একটা অফিস সিল হয়ে গেছে। লিগ্যাল পেপারস ডুপ্লিকেট পাওয়া গেছে, নতুন ডিলগুলোও একের পর এক ক্যানসেল হচ্ছে। আপনি তাড়াতাড়ি অফিসে আসুন!”
আরিয়ানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ইলার ওপর।
আরিয়ানকে এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মির্জা বাড়ির সবাই চমকে উঠল।
— “কী রে? কী হয়েছে? হঠাৎ এভাবে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আরিয়ান শুকনো মুখ তুলে ধীর গলায় বলল—
— “আমাদের একটা অফিস সিল হয়ে গেছে, আব্বু... তিনটা প্রজেক্টও ক্যানসেল হয়ে গেছে।”
কথাটা শুনতেই উপস্থিত সবাই যেন একলহমায় পাথর হয়ে গেল! মির্জা বাড়ির শক্ত ভিতটা চোখের সামনে মুহূর্তে কেঁপে উঠল। তবে এই আকস্মিক সংবাদের পর, ঘরের থাকা দুই মানব-মানবীর—ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, অমাবস্যার মতো বাঁকা হাসি!
পতন... এটা এমন এক ভয়ংকর জিনিস, যা একবার শুরু হলে একমাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কোনো বান্দার সাধ্য নেই তা থামানোর!আর সেখানে মির্জা বাড়ির প্রতিটি মানুষ তো একেকজন অদৃশ্য খুনি! এক নিষ্পাপ, সরল মেয়েকে কত নির্মমভাবে, তিল তিল করে পিষে শেষ করতে চেয়েছিল ওরা!এই সামান্য ব্যবসায়িক ধস তো ওদের কৃতকর্মের শাস্তির অতি ক্ষুদ্র এক সূচনা মাত্র; পুরো ধ্বংস তো এখনও ওদের ওপর নেমে আসে নাই! ওরা তো সবেমাত্র রাজপ্রাসাদ ছেড়ে ধুলো বালি মাখা ধংসের পথে পা বাড়াল।আগামীতে এই পাষাণ মানুষগুলোর কপালে আর কতখানি নরক যন্ত্রণা লেখা আছে, তা একমাত্র ওপরওয়ালাই ভালো জানেন!
রেহানা বেগম অশুভ শকুনের মতো গগনবিদারী কান্নার অভিনয় শুরু করলেন, অথচ অবাক করার বিষয়—উনার শুকনো দুটো চোখে এক ফোঁটা জলের দেখাও মিলল না! বিষাক্ত রাগ আর হিংসায় রি-রি করতে করতে উনি ইলার দিকে তেড়ে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলেন,
"আগেও তুই আমাদের সংসারের শান্তি কাড়ছিলি, আর এখনও শান্তি দিচ্ছিস না! তোর জন্মের সময়ই তুই কেন মরে গেলি না, বল্?! তুই সেদিন মরলে তো আর আরিয়ানের বাপ তোকে কুড়িয়ে এই মির্জা বাড়িতে আনত না! এতদিন ধইরা দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষে রেখেছিলাম, আর আজ সেই সাপই আমাদের এভাবে ছোবল মারল! এক নিমেষে আমাদের পথে নামিয়ে ছাড়ল রে!"
রেহানা বেগম বিষাক্ত চোখে ইলার দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে আবার বলে উঠলেন,
— "কোন জারজ সন্তান কার পেটে জন্ম নিছে, তা ওই ওপরওয়ালাই জানে! ভালো কোনো বংশের রক্ত তো হতেই পারে না, নিশ্চিত কোনো নোংরা নর্দমার মেথরপট্টিতে তোর জন্ম হয়েছিল!"
কথাগুলো ড্রয়িংরুমের থমথমে বাতাসে বিষাক্ত বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু ইলার মুখে কোনো রা-শব্দ নেই, সে কেবল বরফশীতল নীল চোখে চেয়ে রইল—
তার কথাটা শুনে মিস্টার চৌধুরী ও আতীশ দুজনই রক্তচক্ষু নিয়ে রেহানা বেগমের দিকে তাকাল। ইলা অবশ্য সম্পূর্ণ নির্বিকার।
মিস্টার চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
"অনেক বলছেন আমার মেয়েকে! এখন তো পথে বসেছেন। আর একটা বাজে কথা বললে কিন্তু আপনাদের স্থায়ী জায়গা হবে জেলের গরাদে! আম্মু চলো, এই নর্দমা মার্কা পরিবেশ থেকে আমার গা গুলাচ্ছে।"
আতীশ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে অলস গলায় বলল,
"শ্বশুরমশাই বসুন, এত উতলা হলে কি চলে, হুম?"
ইরহাম, জুনায়েদ, মেহেদী, মাশফিক আর রিমন চোখ বড় বড় করে তাকাল! ইরহামের বুক দুরুদুরু কাঁপছে—নাহয় হঠাৎ বলে বসে যে ইলাকে কিডন্যাপ করে বিয়েটাই করে ফেলেছে! জুনায়েদ ভয়ে দরদর করে ঘামছে। মির্জা বাড়ির সবাই তো অবাক! আর আয়শীনের তরুণী কাজিনের মনে হলো যেন কেউ কানে গরম শলাকা ঢুকিয়ে দিল! ২৫ বছরের জীবনে প্রথম অনুভূতির দোলা দেওয়া পুরুষটাকে সে অন্তত অন্য কারো হতে দিতে চায় না।
মিস্টার চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"আমার তো মেয়ে একটা। জানামতে তাকে আমি এখনো বিয়ে দিইনি! সো, আমি কীভাবে শ্বশুর হলাম?"
আরিয়ান আড়ালে এক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক, চড়ুই এখনো কারো নয়!
জুনায়েদরা ভেতরের ধুকপুকানি নিয়ে আড়ালে দোয়া ইউনুস পড়তে লাগল। আতীশ নির্বিকারভাবে আবার বলল,
"এখন দেন নাই তো কি হয়েছে? জামাই তো এই আহসান আতীশ দেওয়ানই হবে! সো এখন শ্বশুর বললে ক্ষতি কী?"
"আমার মেয়ে আমি তোমার কাছে বিয়ে দেব, এই আশা তুমি করছ কীভাবে?"
আতীশের চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল,
"আমাকে আগের কথা বলতে বাধ্য করবেন না শ্বশুরমশাই! আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, কিন্তু আমি কিছুই ভুলিনি! আর আপনি না দিলেও, এই আহসান আতীশ দেওয়ান নিজের জিনিস ঠিকই কেড়ে আনবে!"
ইলা এবার দাঁত কড়মড় করে গর্জে উঠল,
"মিস্টার ব্রুট! আপনি পাপার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেন? আর কী ছিনিয়ে নেবেন, আমি কি কোনো পুতুল, হুম? বেশি বাড়াবাড়ি করলে আপনাকে জান্ত রেখে কলিজা কেটে ভূনা করে আপনাকেই খাওয়াব!"
আতীশ বাঁকা হেসে গা জ্বালানো ভঙ্গিতে বলল,
"মঞ্জুর হ্যায়, হার্টবিট! তুমি নিজ হাতে করালে তা-ও আমার কাছে অমৃত! এবার নাটক থামিয়ে চল তো সুইটহার্ট, আমার চুমুর ক্রেভিংটা কিন্তু ক্রমেই বাড়ছে!"
ইলা দাঁত কড়মড় করে কঠিন কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই আশরাফ সাহেব হাত উঁচিয়ে আকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন,
"তোমরা দয়া করে ঝগড়া কোরো না! ইলা, তুমি তাহলে সত্যি সত্যিই আমাদের সাথে ডিলটা ক্যানসেল করে দিলে, তা-ই তো?"
ইলা একচুলও না নড়ে সোজা জবাব দিল,
"হুম!"
আতীশ ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে গা জ্বালানো গলায় বলল,
"আশরাফ মির্জা, আমার সাথে তো ডিল এখনো বাকি! হার্টবিট সরে গেছে, খুব ভালো হয়েছে; এবার খেলা জমবে দারুণ! তা আপনি তো প্রায় পথে বসেছেন, আমি এখন ডিল ক্যানসেল না করার বদলে যা শর্ত দেব, দিতে পারবেন তো?"
আশরাফ সাহেব থমথমে গলায় বললেন,
"হুম, প্রয়োজন পড়লে এই ভিটেবাড়ির অর্ধেকও আপনার নামে লিখে দেব!"
মির্জা বাড়ির সবাই একযোগে থমকে গেল! রেহানা বেগম চেঁচিয়ে কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই আতীশ রিমনকে ইশারা করতেই সে চট করে একটা ফাইল বাড়িয়ে দিল। আশরাফ সাহেব ছলছল চোখে পুরো বাড়িটার দিকে শেষবার তাকিয়ে ফাইলে সই করে দিলেন। আরিয়ান প্রচণ্ড রেগে আগুন হয়ে উঠলেও, নিজের চড়ুইকে সামনে দেখে কোনোমতে নিজেকে সামলে রাখল।
আশরাফ সাহেব কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই আরিয়ান ইলার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে আবেগঘন কণ্ঠে বলে উঠল,
"চড়ুইপাখি, তুমি এতদিন আমার চোখের সামনেই ছিলে... তার মানে ওইদিনও তুমিই ছিলে আমার সামনে? আমি তবে সত্যি অনুভব করেছিলাম!"
নীলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
"কোন দিনের কথা বলছিস তুই?"
ইরহাম অমনি সুযোগ পেয়ে লাফিয়ে সামনে চলে এল,
"আন্টি, এই ইতিহাসটা আমি বলি! আমাকে তো কেউ কায়দা মতো ফুট কাটতেই দিচ্ছে না! ওইদিন আরিয়ান ভাই যখন ইলা মানে মৃত্তিকাকে প্রায় দেখেই ফেলছিল, ঠিক তখন আমি—এই গ্রেট ইরহাম চৌধুরী—ভাইকে ক্লোরোফর্ম শুঁঙিয়ে ধপাস করে অজ্ঞান করে দিই! তারপরের সিনটা শুনবেন?"
নীলা আন্টি বলায় কটমট করে তাকায় এরা কি শুরু করছে আজকে একজন আম্মু কে বলে খালা বলছে একজন আমাকে আন্টি বলছে।
ইরহাম নাটকীয় ভঙ্গিতে ইলার গলার অভিনয় করে বলতে লাগল,
"তুই কী করতে যাচ্ছিলি, কোনো আইডিয়া আছে ইরহাম?"
"যেটা পরে করতাম, সেটাই এখন করতে যাচ্ছিলাম! ক্লোরোফর্ম দিলি কেন?"
"কেন দিয়েছি, তা বোঝার চেষ্টা কর! আর এক মিনিট দেরি হলে সব শেষ হয়ে যেত!"
"হলেও হতো! আজ হোক বা কাল, এটা তো একদিন হতোই! সামনে থেকে পালিয়ে লাভ কী?"
"কয়েকটা দিন ধৈর্য ধর! তুই নিজেই তো সবাইকে ঠান্ডা মাথায় থাকতে বলেছিলি, আর আজ নিজেই নিয়ম ভাঙছিস?"
"মাঙ্গের নাতি! সরাসরি বল—আমি কি ওদের ভয় পাই নাকি?"
"ভয়ের কথা না! আরিয়ান এখন ট্রমার মধ্যে আছে, এই মুহূর্তে এসব করলে ঝামেলা বাড়বে!"
"তো...?"
"তো’ না! কয়েকটা দিন নিজেকে কন্ট্রোল কর, পরে যা হওয়ার হবে!"
ইরহাম করুণ মুখ করে যোগ করল,
— "আন্টি, সেদিন ইলাকে আটকানোর অপরাধে আমাকে কী শাস্তি দিছে তা আর মুখে আনব না... আমার বড্ড সরম করে!"
ইলা হেসে উঠে বলল,
— "মাঙ্গের নাতি! তোকে কি আরেকবার ওই শাস্তিটা দিব নাকি, বল?"
জুনায়েদ আর মেহদী শব্দ করে হেসে উঠল। মির্জা বাড়ির পুরো ভিটেমাটি নীল হয়ে যাচ্ছে, আর এই গ্যাংটা বিন্দুমাত্র সান্ত্বনা না দিয়ে উল্টো বিনোদন নিচ্ছে! এরা আসলে একেকটা পিস!
ঠিক তখনই আরিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে ইলার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
— "চড়ুইপাখি! এবার আর কোথাও যেতে দেব না! এই কয়টা বছর আমি তোমায় ছাড়া প্রতিটা মুহূর্ত কীভাবে কাটাচ্ছি তা আমিই জানি! আর সম্ভব না আমার পক্ষে...!"
ইলা একঝটকায় হাত টেনে নিয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করল,
— "বাইন**চোদ, হাত ছাড়!"
আতীশ সোফা থেকে আলতো ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে হিমশীতল কণ্ঠে বলল,
— "ওকে ছাড়েন, মিস্টার আরিয়ান মির্জা!"
আরিয়ান এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠল,
— "না! ও আমার চড়ুই, আমার মৃত্তিকা!আমি ওকে আর ছাড়ব না! আপনি কে কথা বলার? আপনার সাথে বিজনেস ডিল ছাড়া কোনো সম্পর্ক নেই, সো এখন আসতে পারেন! আর একটা কথা বাড়ালে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে!"
আতীশ ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে এক পা এগিয়ে এল,
— "তুই যে আমার কোন বা’ল ছিঁড়তে পারবি, তা আমার খুব ভালোই জানা আছে! আপাতত আমার হার্টবিটের দিক থেকে তোর ওই শকুনের দৃষ্টি সরা, নয়তো তাকানোর জন্য তোর ওই পোটকার মতো চোখ দুটোই আর কোটরে থাকবে না!"
ইলা চোখ গোল গোল করে আতীশের দিকে তাকাতেই আতীশ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
— "ওভাবে তাকিও না হার্টবিট, কিছুমিছু করতে মন চাচ্ছে কিন্তু!"
ইলা কপালে হাত দিয়ে বলল,
— "এমা! মিস্টার ব্রুট? আপনিও গালি দিলেন? ছিঃ, আপনি এত খারাপ!"
আতীশ এবার এক ভ্রু উঁচিয়ে রসিকতার সুরে বলল,
— "ওভাবে বললে হবে না সুইটহার্ট! মন থেকে বলো—‘এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো মানুষ হচ্ছে আহসান আতীশ দেওয়ান! আমার দেখা সকল পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ এই আমি!"
ইলা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
— "হুহ! আপনি ধ*নের সুদর্শন! নিজের প্রশংসা নিজেই করছেন? শোনেন মিস্টার ব্রুট, আমার দেখা সবচেয়ে বাজে আর বিরক্তিকর পুরুষ হচ্ছেন আপনি! শুধু ধলা হলেই কি মানুষ সুন্দর হয় নাকি? ধলা তো মূলাও হয়! আপনি আগাগোড়াই একটা 'ধলা মূলা'! যা খেলে পেটের ভেতর দূষিত বায়ু উৎপাদন ব্যতীত আর কোনো ফায়দা হয় না!"
ইলার কথা শুনে মির্জা বাড়ির গম্ভীর থমথমে পরিবেশেও জুনায়েদ, ইরহাম আর মেহেদীরা হেসে প্রায় গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম! জুনায়েদ মনে মনে আফসোস করছে—আহা, আজ যদি মাহিম, সায়রা আর মাইশা এখানে থাকত! কী একখানা মহাকাব্যিক বিনোদন যে ওরা মিস করল!অন্যদের অবস্থা হা হলেও, ইলার মুখে আতীশের এমন বাঁশ মার্কা অপমান শুনে আরিয়ানের মনটা খুশিতে একলহমায় চাঙ্গা হয়ে উঠল। ও মনে মনে ভেবে নিল—যাক! চড়ুই পাখি তাহলে এই লোকটাকে মোটেই পছন্দ করে না, ধুলোর মতোই দেখে!
মির্জা বাড়ির মানুষগুলো তখনও বুঝতে পারছে না, একের পর এক ধাক্কার মধ্যে এই গ্যাংটা নিজেদের মধ্যে এসব ধামাকা বিনোদন কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছে!
ইলা বাকা হেসে বলল,
"বা’ল পাকনা ডিসের লাইন একটা! নাট**কির****পো হাত ছাড়, আমার কাজ আছে...!"
আরিয়ান কাতর চোখে ইলার দিকে তাকিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
"চড়ুইপাখি, তুমি আমাকে রেখে কই যাবে? এবার সত্যি বলছি, তোমাকে ছাড়া আমি আর শ্বাস নিতে পারব না!"
ইলা একচিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
"ওমা! যখন আমাকে কনকনে ঠান্ডাতে আটকে রেখে আপনার প্রেমিকাকে নিয়ে বিদেশে গেছেন, তখন কি আমার কথা মনে পড়েছিল? এখন এত এই সাওয়ার ভালোবাসা উথলে পড়ছে কেন, নাকি ওটাকে খাওয়া শেষ দেখে মৃত্তিকার জন্য পাগল হলেন? আমি আর সেই অবলা মেয়েটা নেই, যাকে যেভাবে ইচ্ছা আপনারা অত্যাচার করবেন! আমি ইলা রোজ চৌধুরী! আমার সাথে বেশি পুংটামি করতে আসলে ডাইরেক্ট জায়গা মতো কেটে লবন-মরিচ মাখিয়ে আপনাকে দিয়েই খাওয়াব!"
ইলার হাড়হিম করা হুঙ্কারে পুরো মির্জা বাড়ির সবার শরীর কাটা দিয়ে উঠল, কারো গা গুলাতে লাগল! এই মেয়ে যা খ্যাপা, কখন কী করে বসে বিশ্বাস নেই! আরিয়ান অসহায় চোখে তাকালেও ইলা সেই চাহনি উপেক্ষা করে বরফশীতল কণ্ঠে গজে উঠল,
"তোগো মতো খান**কির পোলাগো জন্যই আজ মেয়েদের এই অবস্থা! আমাকে কি অবলা মনে হয়? আমি ইলা, পেছনে কোনো কাজ করি না! সবে তো পতন শুরু, আগে দেখ হোতা হ্যায় কেয়া! জীবিত রেখে ভিক্ষা চাওয়াব তোদের! একবারে মারব না, ধীরে ধীরে বাঁচিয়ে মারব! প্রতিদিন তোদের শরীর থেকে একটু করে মাংস কেটে রাস্তার কুকুরকে খাওয়াব! পেরান খেকো মাছ তোদের জায়গা মতো ছাড়তে পারলে আমি ইলা শান্ত হতাম! হাত ছাড় আমার!"
কথাগুলো শুনে সবাই আঁতকে উঠল। কিন্তু আরিয়ান হাত ছাড়ল না, মনে হচ্ছে আজ ছাড়লে আর কখনো এই হাত ধরতে পারবে না।
— "মাগীর ছাওয়াল, ছাড়!" বলেই ইলা ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে রক্তলাল চোখে তাকিয়ে বলল,
"নেক্সট টাইম এই ভুল করলে একদম জ্যান্ত মেরে দেব মাদার***চোদ! এক কথা কানে যায় না? বাপের সম্পদ পাইছিস... যতোসব সোর ন**টির পো!"
ইলা সজোরে ধাক্কা দিয়ে আরিয়ানকে সরিয়ে দিল। আরিয়ানের মনে হলো কেউ যেন তার গলা চেপে ধরেছে, বুক ফুঁড়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না! এটা কি তার সেই মৃত্তিকা, যে সামান্য আঘাতেই চোখ ভেজাত?
আরিয়ান বলল,
"চড়ুইপাখি, তুমি না আমাকে ভালোবাসতে? আব্বু আমাকে বলছিল! তাহলে এখন এমন করছ কেন? তুমি যা বলবে আমি তাই করব, তাও প্লিজ এভাবে কথা বোলো না... ভেতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে!"
ইলা দাঁত কড়মড় করে এক চিলতে বাকা হাসি হেসে বলল,
— "বেশ্যা মা**গির পোলা, কিসের ভালোবাসা, হা? আমি তোরে বলছি আমি ভালোবাসি, ল্যাউড়ার পুত? নিজে নিজে বললেই হলো? আর একবার এই কথা উচ্চারণ করলে ওই পুরানো প্রেমিকাকে এনে বালি দিয়়া তোরে চুদা*****মু, শুয়োরের বাচ্চা!"
মির্জা বাড়ির সবাই হা হয়ে রইল! এত বড় বিজনেস ওমেন, অথচ মুখে কী ভাষা! ঠিক তখনই আতীশ আচমকা এগিয়ে এসে ইলাকে চট করে নিজের কাঁধে তুলে নিল! যেতে যেতে আশরাফ মির্জার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
— "মিস্টার আশরাফ মির্জা, আপনি যেটা সই করছেন তা আমার অ্যাসিস্ট্যান্টের থেকে দেখে নেবেন। বাড়ির যার অর্ধেক আপনি আমার হার্টবিটের নামে নিজ ইচ্ছায় লিখে দিয়েছেন!"
মিস্টার চৌধুরী পেছনে চেঁচিয়ে উঠলেন,
— "এই অসভ্য ছেলে! আমার মেয়েকে নিয়ে কই যাচ্ছিস? নামা ওকে!"
আরিয়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; মনে হলো তার বুকের কলিজাটা কেউ জীবন্ত টেনে ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে! অন্যদিকে ইলা আতীশের কাঁধে হাত-পা ছুড়ে ছটফট করছে নেমে যাওয়ার জন্য।
আতীশ ইলার পিঠে হালকা চাটি মেরে বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলল,
— "উফ! একটাও রোমান্স করতে দিচ্ছে না! এমনিতেই চুমুর ক্রেভিং উঠছে, কখন না জানি অন্য কিছুর উত্তেজনা চেপে বসে! তখন তো হার্টবিটের ওপর চাপ পড়ে যাবে, আর পরে আমাকে জ্যান্ত বালিচাপা দিয়ে দেবে!"
──────⊹⊱⊰⊹──────
সময় সত্যিই বড় অদ্ভুত! চোখের পলকেই যেন দিনটা কোথায় হারিয়ে গেলো। দেখতে দেখতে আজ রাইশা আর রাফসানের গায়ে হলুদ। বিকেল গড়িয়ে ঠিক চারটা। দেওয়ান বাড়ি আর চৌধুরী বাড়ি—দুই বাড়িতেই ব্যস্ততার শেষ নেই। বাড়ির মেয়েরা সবাই পার্লারে ছুটেছে সাজগোজের শেষ প্রস্তুতি নিতে। ঢাকার নামকরা লা মেরিডিয়ান বিউটি লাউঞ্জ থেকে পার্লারের টিমও এসেছে—মেয়েদের সাজে আজ যেন কোনো কমতি না থাকে!
এদিকে বাড়ির বিশাল গার্ডেনটাও সেজেছে নতুন রূপে। চারপাশে ঝুলছে অসংখ্য ফেয়ারি লাইট, রঙিন ফুল আর ছোট ছোট লণ্ঠন। মাঝখানে বিশাল প্যান্ডেল, ছাদজুড়ে ঝুলন্ত ফুলের মালা আর আলোয় সাজানো ঝাড়বাতি। এক পাশে রাইশা আর রাফসানের জন্য ফুলে সাজানো সুন্দর স্টেজ, সামনে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। বাতাসে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণের সঙ্গে ভেসে আসছে হাসি-ঠাট্টা আর গানের শব্দ।
আজকের রাতটা যেন দুই পরিবারের আনন্দে রঙিন হয়ে উঠেছে।
ঘড়িতে তখন রাত ঠিক আটটা।
পুরো প্যান্ডেলজুড়ে ফুরফুরে সান্ধ্য হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে স্নিগ্ধ বাদ্যযন্ত্রের সুর আর চটপটে গান। ছোট ছোট বাচ্চারা খুশিতে দিকবিদিক ছোটাছুটি করছে, আর ওয়েটাররা রাজকীয় ধামে একের পর এক সুস্বাদু খাবারের আইটেম সাজিয়ে রাখছে টেবিলগুলোতে। চারপাশের এই আলো ঝলমলে আমেজে যেন উৎসবের পারদ তুঙ্গে!ঠিক তখনই প্যান্ডেলের মূল ফটক দিয়ে কনে রাইশাকে ধরে ধরে স্টেজের দিকে নিয়ে আসা হলো।
রাইশাকে দেখা মাত্রই উপস্থিত সবার চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে গেল! পরনে হলুদ আর সোনালি কাচের নিখুঁত কাজ করা ভারি ডিজাইনার লেহেঙ্গা, চুলে সুন্দর খোঁপা ছাঁদের হাফ-আপ কার্ল হেয়ারস্টাইল আর তাতে গোঁজা তাজা শ্বেতশুভ্র বেলি ফুলের গজরা। গলায় আর কানে কুন্দনের জুয়েলারির সাথে কপালে টিকলি—সব মিলিয়ে রাইশাকে একদম রাজকীয় কোনো অপ্সরী মনে হচ্ছিল!
ইলা, সায়রা আর চৌধুরী বাড়ির সব মেয়েরা হাত ধরে রাইশাকে পরম স্নেহে স্টেজের সেই ফুল দিয়ে সাজানো সিংহাসনে এনে বসাল।চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা যেন একেকজন অপ্সরী! কেবল ছ’জন মানুষ বাদে, পরিবারের বাকি সব মেয়েরাই এক রঙের থিম মেনে দুর্দান্ত এক আউটফিটে সেজে উঠেছে। উজ্জ্বল কাঁচা হলুদ রঙের ভারী কারুকাজ করা সালোয়ার-গ্রারার সাথে গাঢ় ম্যাজেন্টা রঙের নজরকাড়া জর্জেট দোপাট্টা—এই পোশাকে তাদের সবাইকে একসাথ দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল! হাতে সোনালি রেশমি চুড়ি, গলার সুক্ষ্ম গয়না আর সাথে ম্যাচিং করা ঝুলন্ত পোটলি ব্যাগ নিয়ে চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা যখন এক সাথে স্টেজের চারপাশে ঘেরাও করে দাঁড়াল, পুরো প্যান্ডেলের শোভা যেন একলহমায় দ্বিগুণ হয়ে গেল।
প্যান্ডেলের এক পাশে দাঁড়িয়ে মাহিম, জুনায়েদ আর ইরহামদের চোখ তো ছানাবড়া! ইরহাম সিটি বাজিয়ে বলে উঠল,
— " চৌধুরী বাড়ির তো আজকে আটার বস্তা
দিয়ে পুরো ভেন্যু উড়াইয়া দিচ্ছে! এরা কি গায়ে হলুদ খেতে আসছে নাকি ফ্যাশন শো করতে, বুঝি না বাপু!"
জুনায়েদ হেসেই আকুল হয়ে বলল,
— "ঠিকই বলছিস! রাফসান ভাইয়ের বরযাত্রী আসার আগেই যদি মেয়েরা এভাবে আলো ছড়িয়ে দেয়, তবে তো বরপক্ষের চোখ ধাঁধিয়ে যাবে রে!"
সেই ছ’জন মানুষ যখন একে একে প্যান্ডেলে এসে হাজির হলো, তখন পুরো ভেন্যুর আবহাওয়াই যেন বদলে গেল! মাইশা—পরনে উজ্জ্বল কাঁচা হলুদ রঙের কুঁচকানো স্কার্ট আর গাঢ় বোতল-সবুজ রঙের পাড়-বর্ডার দেওয়া ওড়না ও ব্লাউজ, সাথে চুলে গুঁজে নেওয়া মিষ্টি বেলি ফুল।তার পরপরই এল সায়রা—তার পরনে ছিল সর্ষে-হলুদ আর রানি গোলাপি (ম্যাজেন্টা) রঙের এক চোখধাঁধানো ঐতিহ্যবাহী হাফ-শাড়ি স্টাইলের লেহেঙ্গা। সায়রা স্টেজে পা রাখতেই একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহিম একদম মন্ত্রমুগ্ধের মতো একধ্যানে নিজের প্রিয়সী দিকে তাকিয়ে রইল! চোখ ফেরানোর যেন কোনো সাধ্যই নেই ওর!সায়রা মাহিমের এমন অপলক চাহনি দেখে লজ্জায় রাঙা হয়ে আলতো করে চোখ নামিয়ে নিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুনায়েদ মাহিমের কনুইয়ে এক চিমটি কেটে ফিসফিস করে হেসে বলল,
— "শালা! আশেপাশে এতো মানুষ আছে, এমন হাবাতের মতো তাকিয়ে থাকিস না তো! চোখ দিয়ে গিলে খাবি নাকি রে?"
মাহিম অবশ্য একগাল হেসে মাথা চুলকাল, কিন্তু সায়রার ওপর থেকে চোখ সরাল না!
এরপর এল রাইমা—জলপাই সবুজ আর গাঢ় লাল রঙের আভিজাত্যময় পোশাকে, আফরা—হালকা সোনালি ও খয়েরি রঙের মিশেলে তৈরি এক চমৎকার সাজে, আর সবশেষে আয়াত—উজ্জ্বল কমলা আর রয়েল ব্লু রঙের রাজকীয় কম্বিনেশনের পোশাকে। এই ছ’জনের আলাদা রূপ ও আভিজাত্য দেখে পুরো চৌধুরী বাড়ির আঙিনা যেন অপ্সরীদের মেলায় পরিণত হলো!
ছেলেরা যে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির সাথে গলায় রঙিন (ওড়না/স্কার্ফ) ঝুলিয়ে কাধে ফেলে রেখেছিল, তা তাদের আউটফিটে এনে দিয়েছিল বাড়তি এক আভিজাত্য! কারো গলায় লাল-সাদা বা রঙিন বাঁধনি প্রিন্টের উত্তরীয়, আবার কারো কাধে হালকা হলুদ বা বাসন্তী রঙের সুতি উত্তরীয় ঝোলানো ছিল।চারপাশে যখন আত্মীয়-স্বজনেরা আনন্দে হাসাহাসি আর ছবি তোলায় ব্যস্ত, ক্যামেরাম্যান রাইশার দিকে ক্যামেরা ধরে ভিডিও শুট করছিলেন। ঠিক তখনই সেখানে এসে হাজির হলো ইশা!
হলুদ রঙের ক্যাজুয়াল অথচ দারুণ আকর্ষণীয় একটি শাড়িতে ইশাকে দেখেই প্যান্ডেলের বেশ কয়েকজন ছেলে একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল, যেন সবার চোখ থমকে গেছে ওর ওপরেই! ইশা অবশ্য সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সোজাসুজি ক্যামেরাম্যানের দিকে এগিয়ে গেল। কারণ ঢাকার বিখ্যাত শিল্পপতি মাকসুদ চৌধুরীর বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা—অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখার জন্য তো আর একটা-দুটো নয়, পুরো তিনজন প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান আনা হয়েছে! ইশা মিষ্টি হেসে একজন ক্যামেরাম্যানকে ডেকে বলল,
— " একটু আমার কিছু একক ছবি তুলে দিন তো!"
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে থেকে ভেসে এল একের পর এক বাইকের গর্জন আর গাড়ির হর্নের শব্দ!
প্যান্ডেলজুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল—রাফসানরা এসে পড়েছে!সবাই দৌড়ে প্যান্ডেলের প্রবেশদ্বারের দিকে যেতেই দেখা গেল এক দারুণ দৃশ্য! বহরের একদম সামনের প্রথম বাইকটি সগর্বে চালিয়ে আসছে স্বয়ং বর—রাফসান!তার পরনে চোখধাঁধানো হলুদ রঙের ভারি মিরর-ওয়ার্ক বা কাচের কাজ করা জাঁকজমকপূর্ণ পাঞ্জাবি, গলায় বর্ডার দেওয়া রাজকীয় চাদর এবং সাথে ধবধবে সাদা পায়জামা। ঠিক যেন কোনো এক রাজপরিবারের রাজপুত্র নিজের রাজকন্যাকে নিতে এসেছে!
রাফসানের ঠিক পেছন বসে ছিল আহিয়ান, আর তার পেছনে এক এক করে বাইকে এসে নামল ওদের পুরো কাজিন গ্যাং বন্ধুরা। আর পেছনের সুসজ্জিত গাড়িগুলো থেকে হাসিমুখে নেমে এল পরিবারের মেয়েরা।
বরপক্ষের সব ছেলেরা একরঙা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে সেজে এসেছিল, যা তাদের পুরো দলটাকে এক অপূর্ব আভিজাত্যে মুড়িয়ে দিয়েছিল! বাইকের আওয়াজ আর আনন্দের কোলাহলে চৌধুরী বাড়ির পুরো আঙিনা যেন এক নিমেষেই উৎসবের আনন্দে মেতে উঠল!
দেওয়ান বাড়ির মেয়েরা যখন একসাথে প্যান্ডেলে পা রাখল, চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল!ওদের সাজগোজের থিমটা ছিল অসাধারণ। কেউ পড়েছে গাঢ় বেগুনি (প্ল্যাম) কালারের জামার সাথে হলুদ প্যান্ট ও ওড়নার বৈপরীত্য, আবার কেউ জলপাই সবুজ কুড়তির সাথে বাসন্তী হলুদ সালোয়ার আর হালকা ওড়নায় অপরূপা।তবে সবচেয়ে বড় চমকটা ছিল—নাবিলা!
হালকা লেমন-হলুদ রঙের একটা স্লীভলেস ড্রেস, কানে ভারী জুমকো আর চুলে গোঁজা একটা হলুদ ফুল। নাবিলা যখন চুলে হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে সামনে এগোল, চৌধুরী বাড়ি আর দেওয়ান বাড়ি—দুই বাড়ির ছেলেরাই একমুহূর্তের জন্য হা করে তাকিয়ে রইল! মাহিম তো জুনায়েদের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলেই ফেলল,
— "ভাইরে ভাই! কাকে ছেড়ে কাকে দেখবে ওরা? আজ দুই বাড়ির ছেলে-মেয়েদের যা লুকস হয়েছে না, জাস্ট পাগল করার মতো অবস্থা!"
দুই পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে কুশল বিনিময় করল। একটু পর রাফসান ধীরপায়ে হেঁটে স্টেজে গিয়ে রাইশার ঠিক পাশে গিয়ে বসল। রাফসানকে পাশে পেয়ে রাইশার গালে লাজুক রাঙা হাসি ফুটল।ক্যামেরাম্যানরা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না! শুরু হলো ব্রাইডাল ফটোশুট আর দারুণ সব কাপল ভিডিও শ্যুট। তাদের নানারকম কিউট পোজ আর রোমান্টিক ক্যামেরার ফ্রেম দেখে স্টেজের নিচে থাকা সবাই তালি দিয়ে উঠল। ফটোশুট শেষে পরিবারের বড়রা এক এক করে স্টেজে উঠে রাফসান আর রাইশাকে মিষ্টি মুখ করিয়ে গায়ে হলুদের ছোঁয়া দিতে লাগলেন। আজকে চৌধুরী বাড়ির গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান, আর কালকে অনুষ্ঠান হবে দেওয়ান বাসায়।
ঠিক সেই আনন্দঘন মুহূর্তে হঠাৎ প্যান্ডেলের প্রবেশদ্বারে সজোরে তালি বাজানোর 'তালি... তালি... তালি...' বিকট শব্দ!
সবাই ঘুরে তাকাতেই দেখল—একদল হিজরা বেশ ধুমধাম করে নেচে-গেয়ে প্যান্ডেলে ঢুকে পড়েছে!
দলের সর্দার একদম সোজা স্টেজের দিকে এগিয়ে গিয়ে রাফসানের গাল টিপে দিয়ে সশব্দে তালি বাজিয়ে বলল,
— "ওমা! বর তো দেখি একদম চাঁদের টুকরো রে! তা আমার সুন্দর বরটা আর মিষ্টি কনেটার চোখ যেন কেউ না মারে, দুজনকে যেন নজর না লাগে!"
এই বলেই হিজরাদের দলটি ঢোলের তালে তালে ধুমধাম নাচ শুরু করে দিল। একজন গিয়ে সোজা ইরহাম আর জুনায়েদকে চেপে ধরল নাচ করার জন্য! জুনায়েদ তো ভয়ে আর লজ্জায় হাত-পা ছেড়ে দিয়ে পালাচ্ছিল, কিন্তু হিজরাদের হাত থেকে ছাড় পাওয়া কি এতই সহজ? ওরা জুনায়েদ আর ইরহামকে ঘিরে ধরে এমন কায়দায় নাচ শুরু করল যে উপস্থিত সবাই হেসে একাকার!
সর্দার হিজরা এবার মাকসুদ চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে বলল,
— "হেই চৌধুরী সাহেব! বড়লোকের মেয়ের বিয়া, আমাগো বকশিশ না দিলে কিন্তু কনেকে আজ স্টেজে বসায়া রাইখাই নাচতে থাকব! জলদি আমাগো মন মতো 'কড়কড়ে নোট' বের করেন!"
মাকসুদ চৌধুরী হেসে ফেলে পকেট থেকে মোটা অঙ্কের বকশিশ বের করে ওদের হাতে দিতেই ওরা রাফসান আর রাইশাকে দোয়া করে, তালি বাজাতে বাজাতে নাচতে নাচতেই প্যান্ডেল থেকে বের হয়ে গেল।
হিজরাদের এই কাণ্ডকারখানায় চৌধুরী আর দেওয়ান—দুই পরিবারের গাম্ভীর্য ভেঙে পুরো প্যান্ডেলজুড়ে হাসির এক আনন্দের ঢেউ খেলে গেল!
প্যান্ডেলের ভিড় আর গোলমালের মাঝেই ইরহাম আড়চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল—ইলা কই এখনও আসছে না কেন দেখার জন্য এগিয়ে যাবে। ঠিক তখনই তার কানে এল এক অপূর্ব হাসির শব্দ! এই মিষ্টি কন্ঠের হাসিটা ইরহামের খুব চেনা। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ইরহাম হঠাৎ একদম চমকে উঠল! সে অবিশ্বাস্য চোখে আশেপাশে তাকাল—এই আওয়াজটা কি সত্যি তার শোনা সেই চেনা আওয়াজ? সে কি সত্যিই এখানে এসেছে?
সামনে নজর পড়তেই ইরহামের মুখে ফুটে উঠল এক বাঁকা হাসি। সে মনে মনে ভাবল,
"মেয়েটা কি রাফসান ভাইয়ের আত্মীয় নাকি? যাই হোক, সে সম্পর্কের যা-ই হোক না কেন, পরে জানা যাবে! আগে ওকে একটু সামনাসামনি গিয়ে দেখি!"
ইরহাম ঢং করে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
— "এখানে কী করা হচ্ছে, বিয়ান সাহেবারা?"
মেয়েটির পাশে থাকা অন্য দুটি মেয়ে হেসে উত্তর দিল,
— "আমরা তো বিয়াই মশাই! একটু কাজ ছিল। তা আপনি এখানে কী করছেন?"
কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অহনা যেন একমুহূর্তে জমে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল! সেই পরিচিত গম্ভীর ও দরাজ কণ্ঠের মালিককে দেখে তার শ্যামলা গাল দুটো লজ্জায় একদম গরম হয়ে রাঙা হয়ে উঠল!
ইরহাম পকেটে হাত গুঁজে বলল,
— "তোমাদের তো নিচে বড়রা ডাকছে, যাও।"
ওরা দুজন যেতে নিলে ইরহাম একটু গম্ভীর গলায় থামিয়ে দিয়ে বলল,
— "তোমরা যাও, ও থাকুক।"
অহনা চমকে উঠে তার বন্ধুদের দিকে আকুল চোখে তাকাল। ইশারা করে বন্ধুদের না করছিল যেন ওকে একা রেখে না যায়, কিন্তু দুষ্টু বন্ধুরা মিটিমিটি হেসে অহনাকে একা ফেলে রেখেই নিচে নেমে গেল! এখন কী হবে ভেবে অহনার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
বন্ধুরা চলে যেতেই ইরহাম আরও একধাপ অহনার কাছে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে দুষ্টুমির আভাস। সে নিচু ও গম্ভীর গলায় বলল,
— "কী খবর, হুম? সেদিন না হয় আমি ভুল করে ফোন নম্বরটা চাই নাই... তাই বলে তুমি কি নিজে থেকে দিয়ে যেতে পারতে না? জানো, এই কয়দিন আমি ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে পারি নাই! হুদাই ছটফট করছি। এখন এই অপরাধের জন্য তোমাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া দরকার!"
অহনা একপ্রকার আঁতকে উঠে পিছিয়ে যেতে চাইল,
— "কী! কীসের শাস্তি?"
ইরহাম তার আরেকটু কাছে এসে দেয়ালের সাথে ওকে প্রায় আটকে ফেলে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে অহনার দিকে বাড়িয়ে দিল। মুখে সেই বাঁকা হাসি বজায় রেখে বলল,
— "তোমার শাস্তি হলো, এখন এখনই এই ফোনে তোমার নম্বরটা ডায়াল করে সেভ করে দিবে! আর হ্যাঁ, আজকে রাতে আমি যখন ফোন করব, প্রথম রিং হতেই ফোন রিসিভ করতে হবে! একটুও দেরি হওয়া চলবে না।"
অহনা চোখ দুটো গোল গোল করে অবাক হয়ে ইরহামের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলের বুকে এতো সাহস! কিন্তু ইরহামের সেই গভীর চোখের চাহনি আর গায়ের কড়া পারফিউমের সুবাসে অহনার শ্যামলা মুখটা যেন আরও লাল হয়ে উঠল। কাঁপাকাঁপা হাতে সে ফোনটা নিয়ে নিজের নম্বরটি টাইপ করতে বাধ্য হলো, আর ইরহাম একজয়ী বীরের মতো তৃপ্তির হাসি হেসে ফোনটা পকেটে পুরে নিল!
চলবে.....