#দ্বাদশ_বসন্তের_নীলচিঠি
#কলমে #ইয়াজ_ইনসাফ_দেওয়ান
#পর্বসংখ্যা ১৩
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ)
ইয়াজের ঠোঁটের কোণের সেই রহস্যময় হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে শান্ত চোখে আদিবার দিকে তাকিয়ে রইল। আদিবা দরজার সামনে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন কান পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
ইয়াজ ধীর গলায় বলল, "তোর বয়স যেন কত?"
প্রশ্নটা শুনে আদিবা অবাক হয়ে গেল। এহ! বকা না দিয়ে বয়স জিজ্ঞেস করছে? ব্যাপার কী? ও একটু ইতস্তত করে বলল, "বা... বারো বছর। আর কয়দিন পরেই তেরোতে পড়ব।"
ইয়াজ মাথা নাড়ল। "হুম... বারো বছর।" তারপর দুই হাত বুকের সামনে গুটিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
"এই বয়সে এত পাকনামি শিখলি কেমনে? প্রথম প্রথম তোকে দেখে মনে হয়েছিল একদম নাদান, কিছুই বুঝিস না। এখন দেখি ভূত সেজে মানুষ ভয় দেখানোর প্ল্যান পর্যন্ত করে ফেলিস! কলিজা কত বড় হয়ে গেছে তোর। আর তোর কি করে মনে হলো আমি এসবে ভয় পাবো বেয়াদব! "
আদিবা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল। ঠোঁট কামড়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
"সব ওই দুই বজ্জাত ভাইয়ের দোষ! নিজেরা আইডিয়া দিল, এখন সব দোষ আমার উপর পড়ছে ! নিজের এদিকে উধাও হয়ে গেছে।"
ইয়াজ এবার কড়া গলায় বলল, " কান ধর।"
আদিবা ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
"জি...?"
"কানে কম শুনিস নাকি? কান ধরে উঠবস কর ১০০ বার ।"
আদিবার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কাঁচুমাচু হয়ে গেল। "ইয়াশ ভাই ! ইউভান ভাই ! তোমাদের দুইজনকে আমি ছাড়ব না। নিজেদের লুকিয়ে এখন আমাকে একা বলির পাঁঠা বানিয়ে দিলে! সাহায্য চাইতে গিয়েছিলাম উল্টা আমাকে ফাঁসিয়ে দিলে এভাবে আরো। "
ও করুণ মুখ করে বলল, "ইয়াজ ভাই... আর হবে না।"
"উঠবস শুরু কর। যত কথা বাড়াবি তত সংখ্যার আরো বাড়বে।"
"প্লিজ..."
"আমি তিন পর্যন্ত গুনব?"
আদিবা বুঝে গেল, আর কোনো লাভ নেই। মুখ ফুলিয়ে দুই কান ধরে উঠবস শুরু করল। প্রতি বার উঠবস করতে করতে মনে মনে দুই ভাইকে যত রকম বকা দেওয়া যায়, সবই দিয়ে ফেলল।
" বজ্জাত দুইটা! নিজেরা আইডিয়া দিল, আর এখন আমি একা শাস্তি খাচ্ছি! তোমাদের দু'জনের খবর আছে!" অবশেষে উঠবস শেষ হতেই আদিবা হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে রইল। ইয়াজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর ওর মাথায় হালকা একটা টোকা দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
"এরপর থেকে আমার সঙ্গে এসব বাদরামো করতে আসলে... তুলে এক আছাড় দিবো মনে থাকবে?"
আদিবা মুখে ছোট্ট করে বলল, "জি..."
কিন্তু মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
"উফ! বজ্জাত লোক আবার ওকে শাস্তি দিল ! একদম শান্তিতে থাকতেও দেয় না। বুড়ো হাবাগোবা!"
ইয়াজ যেন কিছুই শুনতে পায়নি এমন ভাব করে দরজার দিকে হাঁটল। দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে তাকিয়ে বলল,
"আর হ্যাঁ... পরের বার প্ল্যান করলে আগে হাতের ব্যান্ডেজটা লুকাতে শিখিস। ওটাই তোকে ধরিয়ে দিয়েছে।
আর শোন এবস ভুত পেত এগুলাতে ভয় পাই না আমি আল্লাহ ছাড়া ইয়াজ ইনসাফ দেওয়ান কাউকে ভয় পাইনা ছোট পাকনা মস্তিষ্কে ঠুকিয়ে কথাটা।
কথাটা বলেই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ইয়াজ ।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই আদিবা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মুখ কুঁচকে দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"এতো খুব বড় তান্তিক হয়ে গেছেস তো। তো এখানে কি করেন শসানে গিয়ে ছালা পড়ে ধেন করেন ! দাঁড়ান... ওই দুই জাউড়ার সঙ্গে আপনারও হিসাব একদিন মিটাব!"
বলেই ঠোঁট ফুলিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। ভালো লাগছে না ওর। করতে গেলো এক হয়ে গেলো আর এক।
--------
অন্ধকার গোডাউন। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, মাথার উপর একটা মাত্র হলুদ বাল্ব ঝুলছে। মেঝেতে বসে আছে চার-পাঁচটা ছেলে। গায়ে স্কুল ড্রেস। হাত-পা মোটা রশি দিয়ে বাঁধা। বয়স বড়জোর ১৬-১৭ । ওরা ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। হঠাৎ লাইটটা জ্বলে উঠল। ঝলসানো আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল ওদের। সামনে তাকিয়ে দেখল তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
ইয়াজ, ইউভান, আর ইয়াশ মিলে সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার পথ থেকেই তুলে আনা হয়েছে ওদের। ইয়াজ ধীর পায়ে সামনে এসে দাঁড়াল। ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কোনো সমস্যা হচ্ছে? কারো খিদে পেয়েছে? কিছু খেতে দেব?"
ছেলেগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এমন শান্ত গলা ওরা আশা করেনি। হঠাৎ ইউভান রেগে সামনে এসে গর্জে উঠল।
"তোদের মধ্যে কে সেদিন ক্লাস সেভেনের আদিবার হাত ধরেছিল? বল!"
প্রশ্ন শুনে ছেলেগুলো একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর মাঝখানের একটা ছেলে কাঁপা গলায় বলল,
"ও... ওই রিয়াদ। রিয়াদ ধরে ছিলো আমি কিছু করিনি। "
রিয়াদের মুখটা তৎক্ষণাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ধরা পড়ে গেছে ও যে বন্ধু ওকে আস্কারা দিয়েছিল সেই এখন নিজে বাঁচতে ওর নাম বলে দিল। বুঝতে পারল, এত কষ্ট করে এখানে আনার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।
ইয়াজ রিয়াদের দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
"তোমরা তো সবে মাত্র বড় হচ্ছ। এই বয়সে এসব করা কি ঠিক? বলো।"
ওর এমন শান্ত ব্যবহার দেখে ইয়াশ আর ইউভান বিরক্ত হয়ে বলল,
"ধুর! কানের নিচে দুইটা দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।"
ইয়াজ ওদের থামিয়ে দিল।
"শান্ত হ। এমন করছিস কেন? এরা তো ছোট। গায়ে হাত তোলা যাবে না। শাস্তি দিতে হলে একটু অন্যরকম ভাবেই দিতে হবে।"
তারপর ইয়াজ ঘুরে জিজ্ঞেস করল, "ল্যাব থেকে যেগুলো আনতে বলেছিলাম, এনেছিস?"
ইয়াশ দাঁত বের করে হেসে বলল, "হ্যাঁ ইজু ভাই। সব রেডি।"
ইয়াজ এগিয়ে গিয়ে রিয়াদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। তারপর খুব যত্ন করে ওর হাত ধরে বলল, "চলো, বাবা আমার সাথে চলো তুমি।
রিয়াদ বুঝতে পারছে না। এতো শান্ত আচারোন ঝর আসার আগের সময় এটা। রিয়াদের বুকের ভেতরে ধরফর ধরফর করছে গলা শুকিয়ে কাঠ। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে, কে জানে। রিযাদ কাপা কাপা কন্ঠে ইয়াজের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো।
" ভাইয়া জীবনে আর এমন হবে না কোনদিন আর কোনো মেয়ে কে জ্বালাবো না ভাই। মেয়ে কেনো কোনো তৃতীয় লিঙ্গেল ব্যক্তিকে দিকেও তাকাবো না।
ইয়াজ রিয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল, " এমন যাতে আর না হয় তার ব্যবস্থাই তো করতে যাচ্ছি। আর টেনশন নিও না বেশি কিছু করবোনা। স্পেশালি গায়ে হাত তো উঠাবোই না । "
যাওয়ার আগে ইয়াজ ইউভান আর ইয়াশের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, "আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি। তোরা যেটা বলেছিলাম, ওদের সাথে সেটাই শুরু কর।"
ইয়াজ রিয়াদকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত হাসির শব্দ হলো। ইউভান আর ইয়াশ দুজনের মুখে সয়তানি হাসি । ওরা দুজন গার্ডকে ডাকল।
"নিয়ে এসো ওগুলো।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই গার্ডরা কয়েকটা বড় কাঁচের বয়াম নিয়ে এল। বয়ামের ভেতর কী আছে, বাইরে থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তেলাপোকা, কেচো, চোক, আরো নানা ধরনের সব পোকামাকড় কিলবিল করছে ভেতরে। বয়ামগুলো দেখে ছেলেগুলোর কলিজা শুকিয়ে গেল।ঘৃনা আর ভয়ে চিৎকার করে উঠল ওরা। ইয়াশ আর ইউভান গার্ডদের কাছ থেকে বয়ামগুলো নিয়ে একে একে ছেলেগুলোর প্যান্টের বেল্ট খুলল। তারপর বয়ামের মুখ খুলে সবগুলো পোকা ওদের প্যান্টের ভেতর ঢেলে দিল। পরমুহূর্তেই গোডাউন কেঁপে উঠল আর্তচিৎকারে। ছেলেগুলো ব্যথায় আর ভয়ে লাফাতে লাগল। প্যান্টের ভেতর পোকাগুলো ছোটাছুটি করছে।
---------
অন্যদিকে.......
ইয়াজ রিয়াদের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরোনো ওয়াশরুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে এসে লাগল। বহু দিন ধরে পরিষ্কার হয় না। মেঝেতে শ্যাওলা, দেয়ালে ময়লা, কমোডের চারপাশে নোংরা জমে আছে। গন্ধ আর ভিতরের পরিবেশ দেখে রিয়াদের গা গুলিয়ে উঠল। ওর মনে হলো এখনই বমি করে দেবে।
ইয়াজ শান্ত গলায় বলল, "কোন হাত দিয়ে সেদিন ওর হাত ধরেছিলি?"
রিয়াদ কাঁপতে কাঁপতে ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল। ইয়াজ হাড়পিক আর বালতি ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"এই হাত দিয়েই এখন পরিষ্কার করবি। পুরো ওয়াশরুম। একটা কোণাও যেন বাদ না যায়।"
রিয়াদের অসহাই চোখে ইয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে।
"ভাই... প্লিজ এমন করবেন না। আমি পারবো না। আর কখনো এমন হবে না। কথা দিচ্ছি।"
ইয়াজ ওর দিকে একবার তাকিয়ে কিছু বলল না। শুধু দরজাটা টেনে দিয়ে বাইরে চলে এল। কিছুক্ষণ পর রিয়াদকে ওখান থেকে বের করে আনা হলো। ওর হাত-মুখ, জামা সব ময়লায় মাখামাখি। চোখ ফোলা ফোলা। ইয়াজ একটু দূরে সরে গিয়ে শুধু বলল,
"আমার থেকে দূরে থাকবি।"
এরপর ওরা ফিরে এল গোডাউনে। সেখানে ইউভান আর ইয়াশের "শাস্তি" ততক্ষণে শেষ। বাকি ছেলেগুলোর অবস্থাও রিয়াদের চেয়ে ভালো না। ভয়ে, কান্নায় সবার চেহারা ফ্যাকাশে। ইয়াজ সবার সামনে এসে দাঁড়াল। গলার স্বর আগের মতোই ঠান্ডা,
"আজকে এখানে যা হলো, এর একটা কথাও যেন বাইরে না যায়। যদি যায়, তাহলে তোদের সবার খবর আছে। আর যদি কোনোদিন কোনো মেয়ের গায়ে হাত তোলার কথা মাথায়ও আসে, তাহলে মনে রাখিস... আজকের শাস্তির চেয়েও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে।"
ছেলেগুলো মাথা নিচু করে ঘনঘন মাথা নাড়ল। ওদের গলা দিয়ে আর কথা বের হচ্ছে না। ইয়াজ গার্ডদের দিকে তাকিয়ে বলল,
"ওদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কর।"
গার্ডরা মাথা নেড়ে ছেলেগুলোর বাঁধন খুলে দিল। একে একে সবাই ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বেরিয়ে গেল।
চলবে...