#অবাধ্য_মন_পাখি
#সূচনা_পর্ব
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
'মেয়ে হয়ে অন্য একটা মেয়েকে ইভটিজিং করো লজ্জা করে না তোমার?'
'মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে ইভটিজিং করেছি সেইটা বড় কথা না রে পাগলা।একটা মেয়ে ইভটিজিং করেছে তা জানার পরেও তুই সেই মেয়ের কাছে শুনতে এসেছিস একটা পুরুষ হয়ে তোর লজ্জা করে না রে পাগলা?'
(পনেরো মিনিট আগে?)
'চুমকি চলেছে একা পথে_
সঙ্গি হলে দোষ কি তাতে_
রাগ করোনা সুন্দরি গো
কাঁদলে তোমায় লাগে আরো ভালো_'
" বস কাঁদলে তোমায় হবে না রাগলে তোমায় হবে আপনার গানের লিরিক্স ভুল হয়ে গেছে।''
রাস্তা থেকে একটা মেয়ে বইখাতা জাপটে বুকের মধ্যে নিয়ে হাঁটছে।আর পাশ থেকে অনেকগুলো ছেলের মধ্যে একটা মেয়ে গান গাইছে।
মেয়েটা দ্রুত পায়ে সেখান থেকে হেঁটে চলে গেলো।
"শালা কানের নিচে একটা মারবো সব লিরিক্স তোর পেছন দিকে বার হয়ে যাবে।
এই নিশা মল্লিক যা বলবেই ঐটাই তখন লিরিক্স হয়ে আপডেট নিবে। এই নিশা মল্লিকের ভয়ে বাঘে ছাগলে এক ঘাটে জল খায়। তুই আমাকে লিরিক্স শেখাও?"
" বাঘে ছাগলে না বাঘে বিড়ালে হবে।"
"চন্দন শেখ"
"জি বস"
" আমার সামনে আয় বাপ।"
চন্দন দাত বের করে হাসতে হাসতে তার সামনে গেলো।মোটা আকৃতির গোলগাল মুখ বিশিষ্ট চন্দন শেখ।
" পেছন ফিরে দাড়া তোকে নতুন একটা টেকনোলজি দেখাই।"
চন্দন আগ্রহের সাথে পেছন ফিরে দাঁড়ালো।নিশাকে সে নিজের গুরু মানে।নিশা মানে পুরা আইটেম বোম।গুরুর কাছ থেকে নতুন টেকনোলজি শেখা এ বড়ো ভাগ্যের ব্যাপার।এ ভাগ্য সবার হয় না।নিজেকে নিয়ে নিজেই গর্বিত ফিল করছে চন্দন।গর্বের সাথে নিজের বলিষ্ঠ হাত দিয়ে নীজের বুকে নিজে দুটো থাবা দিলো।
বাইকের উপর বসা থেকে এক লাফে নামলো নিশা মল্লিক।
চোখে কালো সানগ্লাস,হাতে তিনটা ব্যাসলেট,নীল শার্টৈর উপর সোনালী রংয়ের একটা চেইন তার সাথে ইংরেজিতে নিশা লেখা একটা লকেট।মাথার পিছনে বড় একটা খোপা খুব সুন্দর করে বাঁধা।
সব থেকে আলাদা বিষয় হলো তার পরা কালো লুঙ্গি।মেয়ে হয়েও লুঙ্গি পরে এটার জন্য সে বেশ বিখ্যাত প্রায় তাকে কালো লুঙ্গিতে দেখা যায়।
সবাই নিশাকে আলাদা ভাবে এটার তার বেশ ভালোই লাগে।
এক হাত দিয়ে লুঙ্গির এক প্রান্ত ধরে এগিয়ে যায় চন্দনের দিকে।
"চন্দন শেখ, গুরুর কাছ থেকে কিছু শিখতে হলে মাথা নিচু করে শিখতে হয় ভুলে গেছো? এই তুমি তোমার গুরুকে মানো?"
"ভুল হয়ে গেছে বস।"
চন্দন বিনয়ের সাথে তার ভারি দেখ নিয়ে মাথা নিচু করলো।
" শোনো চন্দন শেখ, আজ তোমারে শিখাবো কি ভাবে এক একা কেউ একবার না বুঝলে তাকে কিভাবে শেখাতে হয় সেই টেকনোলজি।"
চন্দন মাথা নাড়ালো।
নিশা সজোরে তার পেছনে একটা লাথি মারলো,চন্দন তাল সামলাতে না পেরে ফুটবলের মতো গড়িয়ে কিছু দূর চলে গেল।
' তোর জন্য ঐ মেয়েটা আমাকে খারাপ ভাবলো,ভাবলো আমি ভুল গান গাই।নারী জাতির কাছে নারী হয়ে আমার মানসম্মানের উপর কাকে ইয়ে করে দিলো তাও তোর জন্যে
ছ্যা রে চন্দন্না ছ্যা।"
" ভুল হয়ে গেছে বস।আমারে মাফ করে দেন।"
" নিশা মাফ করেনা।নিশা শাস্তি দেয়। নিশা প্রতিশোধ নেয়।নিশার ভেতরে যে জানোয়ার টা আছে নিশা তাকে প্রতিশোধ বিনিময়ে শান্ত করে।"
নিশা হাসছে অনেক জোরে হাসছে।নিশার পাশে থাকা ছেলেগুলোর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।
নিশা আবার ফিরে গিয়ে এক লাফে বাইকের উপরে উঠে বসলো, " এ চন্দনের বৌ বন্ধন গান বাজা।"
" কি গান বাজাবো বস?"
"আমি যেটা গাইলাম ঐটা বাজা।"
বাঁধনের হাতে মিনি সাইজের একটা সাউন্ড বক্স সেখানে গান বাজছে "চুমকি চলেছে একা....।
সেই তালে তালে নিশার গোলাপি ঠোঁটেও গানের কথা ফুটে উঠছে মিউজিকের তালে তালে শরীর দুলছে সাথে হাত ও নড়ছে।
সেই মুহূর্তে একজন এসে নিশাকে ডাকছে কিন্তু নেশা এখন গানের ভিতরে ডুবে আছে।তার এইসব জাকানাকা গান খুব ভালো লাগে বাকি নিরব গান গুলো তার কাছে লাগে একশো বছর আগে মৃত মানুষের মতো।
সেই লোকটা বাঁধনের হাত থেকে মিনি সাউন্ড বক্স টা নিয়ে দূরে ছুড়ে মারলো।
নিশার শরীর স্থির হলে গেলো। চন্দন এগিয়ে গিয়ে তার কলার ধরলো।
নিশা মূহুর্তে তার হাত দিয়ে তাকে ইশারা করলো ছেড়ে দিতে।
চন্দন কলার ছেড়ে দিয়ে নিশার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
নিশা হাত দিয়ে ইশারা করে সেই লোককে কাছে আশার জন্য।
লোকটা দৃঢ় পায়ে এগিয়ে আসে।
"নাম কি? রাফি?"
লোকটা একটু চমকে গেলো, " হ্যাঁ তুমি কি করে জানলে?"
" পাঁচদিন হলো এই এলাকায় নতুন?"
এবার লোকটার একটু ভয় হতে লাগলো গলার আওয়াজ কমে আসছে, " জি, আপনি....?"
প্রশ্ন শেষ করার আগেই নিশা তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে তাকে দেখায় চুপ করতে।
লোকটার কথা বন্ধ হয়ে যায়। নিশা সানগ্লাস খোলে।
নিশার চোখের দিকে তাকিয়ে লোকটা দুই কদম পিছিয়ে যায় অসম্ভব রকমের লাল চোখ।চোখের প্রতিটা শিরা লাল।মনে হচ্ছে চোখের ভিতর থেকে রক্তের ছিটা বেরিয়ে আসছে।
ডান চোখের কোনায় লম্বা একটা কালো দাগ।দেখেই বোঝা যায় ছুরির আঘাত।
কিন্তু কার এত সাহস এটা গবেষণা করার মতো বিষয়। সেই দাগ নিশার মুখের খুঁত নাকি সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রতিক বোঝা কষ্টকর।
নিশা লুঙ্গির দুই প্রান্ত ধরে নিয়ে রিল্যাক্সে হেঁটে তার দিকে যাচ্ছে,চোখের পলকেই তড়িৎ বেগে লোকটার নাভির নিচে একটা লাথি মারলো।
ও মা গো বলে রাফি ছিটকে গিয়ে পড়ে থাকলো নিচে।মুখ দিয়ে শুধু ও মা ওমা বার হচ্ছে।
নিশা পা দিয়ে তার গাল চেপে রধলো। এবার রাফির হাত নিশার যেই জাগাটায় প্রথম লাথি মেরেছিল সেখান থেকে সরে শিশার পায়ের উপর পড়লো অনেক চেষ্টা করছে পা সরানোর কিন্তু একচুলও সরাতে পারছে না।
" কুত্তার বাচ্চা, পাঁচ দিন হয় নাই এলাকায় এসেছিস এখনই মেয়ে দেখলে ছাদের উপর দাঁড়িয়ে প্যান্ট খুলে নিজের মেইন পয়েন্ট দেখাস।আর তোর বোনকে যখন আমি একটু গান শোনালাম তাতেই তুই প্রতিশোধ নিতে চলে আসছি?
একেই বাংলায় বলে কান টানলে মাথা আসে।
তোর মেইন পয়েন্টকে আজ মাইনর পয়েন্ট বানিয়ে দিলাম।"
মুখ থেকে পা সরিয়ে আবারো আগের স্থানে লাথি মারলো। দ্বিতীয় লাথির বেগ ছিল প্রথমটার থেকে দ্বিগুণ। রাফি ছিটকে গিয়ে আরো কিছু দূর পড়ে গেলো।গাল থেকে লালা বের হয়ে নিচে পড়ছে শুধু একটু গোঙানির আওয়াজ আসছে কানে।
" মনে রাখবি এটা নিশার এলাকা।এখানে আমার আইন চলবে, আমিই এখানকার আইন প্রনেতা, আমিই বিচারক আর শাস্তি ও আমি দিবো। এখন থেকে সারাজীবন তোর আমার নাম মনে থাকবে, ভুলিস না রে পাগলা,নি শা "
" চন্দন শেখ"
"হ্যাঁ বস বলুন।"
"বাইকে স্টার্ট দে।"
"জি বস।"
চন্দন ভারি দেহ নিয়ে বাইকে বসে বাইক স্টার্ট দিলো।
"বস উঠুন, আমাকে শক্ত করে ধরে বসুন।"
চন্দন খুব সিরিয়াস, মুখ চোখ শক্ত হয়ে আছে। অনেক বড় একটা কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে। গুরু দায়িত্ব তার উপরে।
নিশা একবার চন্দনের দিকে তাকালো আরেকবার বাইকের দিকে।
চন্দনের মোটা দেহ বাইকের পুরো জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। নিশার বসার মতো জায়গা নেই।
" চন্দান্না"
"আদেশ করুন বস"
"তোকে একটু আগে যেন আমি যে টেকনোলজি শিখিয়েছি সেইটা যে তুই ঠিক করে শিখছিস তা প্রমাণ কর যা।"
নিশি রাফির দিকে তাকিয়ে তাকে ইশারা দিলো।
চন্দন চোখ কোড়া করে একবার রাফির দিকে তাকিয়ে আরেকবার নিশির দিকে তাকালো চন্দনের চোখে আগুন জ্বলছে।
সে বাইক থেকে মাটিতে শব্দ করে নামলো। এগিয়ে গেল রাফির দিকে।
হাঁটায় শব্দ হচ্ছে না তাও জোরে জোরে মাটিতে পা ফেলে হাঁটছে যাতে শব্দ হয়।
রাফির পশ্চাৎদেশ একেরপর এক এলোপাথাড়ি লাথি মারছে।
কালো শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।
সফলতার হাসি হেসে পেছনে ঘুরে দেখে কেউ নেই সবাই চলে গেছে,
" বস, বাঁধন আমাকে রেখে তোরা কই চলে গেছি।"
মাথায় হাত দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো চন্দন শেখ।
"মা জননী খেতে দাও খুব খিদে পেয়েছে।কত কাজ তোমার মেয়ের তুমি জানো?থাকো তো সারাদিন শুয়ে বসে জানবা কি করে।"
কথা গুলো বলে নিশি চুল মুছতে মুছতে বাইরের বারান্দার দিকে গেলো।
"আর একটা কথা বললে তোর হাত পা ভেঙ্গে ঘরে বসিয়ে রেখে দিবো তখন যাস মাস্তান গিরি করতে।মেয়ে মানুষ হয়েছো তার কোনো লক্ষণ তো নাই তোমার ভিতরে।" জাহানারা বেগম রান্নাঘর থেকে তেজি গলায় বলে ওঠে।
"মিস নিশা মল্লিক, আপনার নামে একটা কেস আছে।আপনাকে এখনি থানায় যেতে হবে উপর থেকে অর্ডার আছে।" বাসার ভিতরে দুইজন পুলিশ ঢুকে এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে গেলো।
নিশি তার হাতে থাকা তোলায়েটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তাদের দিকে হেঁটে আসছে।
সদ্য গোসল থেকে বেরিয়েছে কালো লুঙ্গিটা পরে।সব সময় খোপা করে রাখা চুল গুলো এখন ছেড়ে দেওয়া।
তাদের কাছে এসে জোরে চেঁচিয়ে বলে, " মা আমার নামে কেস হয়েছে।আমি থানায় যাচ্ছি।"
ভেতর থেকে উওর আসে, " যা মুখপুড়ি, কিন্তু আমি ভাত বাড়ছি ঠান্ডা হওয়ার আগে ফিরে আসিস নয়তো কিন্তু আজ কপালে ভাত জুটবে না তোর বলে দিলাম।"
নিশি অবাক হয়ে গাল থেকে শুধু বার হলো " আ্যা?"
আমি কি বেড়াতে যাচ্ছি নাকি?"
চলবে___