#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_৩
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা ছুই ছুই।নিশার বারোতম জম্মদিন উপলক্ষে এতক্ষণ যে বাড়িটা আলো, গান আর মানুষের হাসির শব্দে গমগম করছিল, হুট করেই সেখানে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে। নিশার জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ। একে একে সব মেহমান বিদায় নিয়েছেন। ড্রয়িং রুম ভর্তি গিফট।
বাড়ির মানুষের ব্যস্ততা বেড়ে চলেছে,কোনো হেল্পিং হ্যান্ড না থাকায় জাহানারা বেগম আস্তে আস্তে সব কিছু গোছানো শুরু করে দিয়েছেন।জামিলাকে তার মা নিয়ে গেছে কাল সকালে আসবে।
তাই যতটুকু পারা যায় এখন থেকেই গোছানো শুরু করে দিয়েছে।
নিশার বাবা আফজাল মল্লিকের পরম বন্ধু দাবি করা পাঁচজন মানুষ রয়ে গেলেন। মিস্টার আসিফ ইব্রাহিম, সাখাওয়াত হোসেন, কামাল আহমেদ, জাহিদ হাসান এবং তারেক রহমান।
তারা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের গাড়িতে তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেও নিজেরা ড্রয়িংরুমের সোফায় জাঁকিয়ে বসলেন। আফজাল মল্লিক কিছুটা অবাক হলেন। বন্ধুদের এমন আচরণের কোনো কূলকিনারা তিনি খুঁজে পেলেন না। তবে পুরোনো বন্ধু ভেবে পুরো বিষয়টাকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিলেন।
ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে তার পাঁচ বন্ধু সবাইকে একে অন্যের দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে আর ইশারায় কিছু বলাবলি করছে।
আফজাল মল্লিকের মনে একটু ভয় ভয় হতে লাগলো তাদের এমন আচরণ দেখে কিন্তু তবুও তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন
তিনি হেসে বললেন, "তোরা বস, আমি আর রাফসান ফ্রেশ হয়ে আসছি। বাকি রাতটা নাহয় গল্প করেই কাটবে।"
আফজাল মল্লিক তার ছোট ভাই রাফসানকে ইশারা করলেন তার সাথে আসার জন্য কিন্তু তখনো তারা দুই ভাই জানতো না পরম বন্ধুদের হাতে তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে।
তারা দুই ভাই সেখান থেকে উঠে যেতেই তারেক গিয়ে ড্রয়িংরুমের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল ।
আফজাল মল্লিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
" কি হলো দরজা বন্ধ করলে কেন?আমরা ফ্রেশ হয়ে আসি তারপর আড্ডা দিবো।"
পিছন থেকে তার কাধে হাত রাখলো আসিফ ইব্রাহিম, চোখের কোণে তখন এক পৈশাচিক হিংস্রতা।
সোফার তলা থেকে বের হয়ে এলো চকচকে ধারালো ছোরা। আফজাল আর রাফসান কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকস্মিক এক ঝড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর বন্ধু রূপি সেই পাঁচ নরপশু।
ঘরের চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম আর্তনাদটা ছিটকে বের হতে চাইল, কিন্তু শক্ত হাতে তা চেপে ধরা হলো।
ধস্তাধস্তি, গোঙানি আর রক্তের ছপছপ শব্দ। কোনো প্রতিরোধই টিকল না সেই পরিকল্পিত হিংস্রতার সামনে। ফ্লোরের কার্পেট নিমেষেই ভিজে উঠল গাঢ় লাল রক্তে। আফজাল মল্লিক এবং রাফসান মল্লিকের নিথর দেহ দুটো পড়ে রইল ড্রয়িংরুমের মেঝেতে।
তাদের চোখ দুটো তখনো অপলক, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না বিশ্বাসের এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
হত্যাকাণ্ড শেষ হতেই আসিফ ইব্রাহিম তার হাতের রক্তমাখা ছোরাটা সোফায় ছুড়ে ফেলল।
তার চোখ এখন জ্বলছে অন্য এক আদিম কামনায়। আফজাল মল্লিকের স্ত্রী, রূপবতী জাহানারা বেগমের ওপর তার নজর বহুদিনের। আজ সেই সুযোগ হাতছাড়া করার কোনো ইচ্ছে তার নেই।
পা টিপে টিপে আসিফ এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে। জাহানারা বেগম তখনো ক্লান্ত শরীরে অনুষ্ঠানের এঁটো থালাবাসন ধুচ্ছিলেন। জলের শব্দের মাঝেই হুট করে পেছনে কারও ছায়া দেখে তিনি চমকে উঠলেন। ঘুরে তাকিয়ে আসিফকে দেখে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞেস করলেন, "ভাই, আপনার কিছু লাগবে?"
কথাটা শেষ হতেই জাহানারার চোখ গেল আসিফের জামা আর হাতের দিকে। সেখানে লেগে আছে তাজা, গরম রক্ত! জাহানারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল তীব্র এক ভীতি। তিনি চিৎকার দিতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই আসিফ হিংস্র বাঘের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রান্নাঘরের মেঝেতেই শুরু হলো এক নারকীয় তাণ্ডব। জাহানারাকে পশুর মতো ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে লাগল আসিফ ইব্রাহিম।
এদিকে এতসব কোলাহল, গোঙানি আর আতঙ্কের মাঝেই একটা ঘরে ঘুমিয়ে ছিল ১২ বছরের ছোট্ট নিশা। কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ একটা বুকফাটা, অমানুষিক আর্তনাদে তার ঘুমটা ভেঙে গেল। সেই চেনা কণ্ঠটা আর কারও নয়, তার গর্ভধারিণী মায়ের। মায়ের এমন মরণপণ চিৎকার নিশা এর আগে কখনো শোনেনি।
গা ছমছম করা ভয় আর কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে নিশা বিছানা থেকে নামল। ঘর থেকে বের হয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ড্রয়িংরুমের দিকে। সেখানে পা রাখতেই নিশার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।
সামনে পড়ে আছে তার বাবা আফজাল মল্লিক আর ছোট চাচা রাফসান মল্লিকের রক্তাক্ত, নিথর লাশ। বাবার যে হাতটা কিছুক্ষণ আগেও তার মাথায় আদরের পরশ দিয়েছিল, সেই হাতটা এখন রক্তে লেপটে মেঝেতে পড়ে আছে। আর ঠিক সেই লাশের গা ঘেঁষেই সোফায় আয়েশ করে বসে আছে বাবার সেই চার বন্ধু—সাখাওয়াত, কামাল, জাহিদ আর তারেক। তাদের মুখে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো ভয় নেই।
বরং রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা জাহানারার সেই বীভৎস, আর্তচিৎকার আর কান্নার আওয়াজ যেন তাদের কানে কোনো মধুর সংগীতের মতো বাজছিল। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে হাসছিল, উপভোগ করছিল একটি পরিবারের ধ্বংসযজ্ঞ।
১২ বছরের নিশা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই ড্রয়িং রুমে আধা খোলা দরজার পাশে। একদিকে বাবার রক্তাক্ত লাশ, অন্যদিকে রান্নাঘর থেকে আসা মায়ের শেষ হয়ে যাওয়ার চিৎকার, আর সামনে বসে থাকা চার নরপিশাচের সেই বিকৃত হাসি কি করবে সে কাঁদবে নাকি মায়ের কাছে যাবে।
সে যদি তাদের সামনে যায় তাকেও যদি তারা মেরে ফেলে।
নিশা দৌড়ে গিয়ে মায়ের রুম থেকে জাহানারা বেগমের ফোন থেকে পুলিশের নাম্বার খুঁজলো।একটা জমির মামলার প্রয়োজনে নিশা তার মায়ের কথা অনুযায়ী নাম্বার টা সেভ করেছিলো।
নাম্বারটা খুজে পেতেই সেখানে কল দিলো। কিন্তু রিসিভ হয় না।
দুই বারের পর তিনবার কল দেওয়ার পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।
"হ্যালো কে?" ঘুম জড়ানো কন্ঠ ভেসে এলো।
" পুলিশ আংকেল ওরা আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে"। বলেই নিশা কান্নায় ভেঙে পড়লো।
কথাটা শুনলো কিনা জানে না নিশা ওপাশ থেকে কল কেটে গেলো।
নিশা মায়ের চিৎকার আর নরপশুদের সেই হাসি আর সহ্য করতে পারছে না।
ধীরে ধীরে সে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।যেখানে তার হাত দেওয়া নিষেধ ছিলো ঠিক সেই জাগাতে সে হাত দিলো আজ।
আলমারির দ্বিতীয় ড্রয়ে ছিল আফজাল মল্লিকের লাইসেন্স করা পিস্তল।
সেখানে কতটা বুলেট ছিল সে জানে না আদৌ তাতে বুলেট আছে কিনা তাও জানে না।
সে কোনো দিন পিস্তল ধরেনি কিন্তু আজ সেই ভারি পিস্তল নিয়ে আবার গেল সেই ড্রয়িং রুমের আধা খোলা দরজার পাশে এতক্ষণে সেখান থেকে একজন চলে গিয়েছে।
আর তিনজন এসে নিশার বাবা আর চাচার লাস বস্তায় ঢোকানোর চেষ্টা করছে।
তাই দরজার দিকে আর কারো খেয়াল নাই।
নিশা সেখান থেকে পরপর ছয়টা গুলি ছুড়লো।
গুলি লেগেছে কিনা সে জানে না তার চোখের পানিতে সব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
শুধু দেখেছিলো তিনজন দাঁড়ানো মানুষ আস্তে আস্তে মাটিতে শুয়ে পড়েছে।
আর রান্নাঘর থেকে খালি গায়ে বেরিয়ে এসেছে আসিফ ইব্রাহিম।
সে গুলির শব্দে বেরিয়ে এসেছে, সবাইকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তার চোখ যায় ড্রয়িং রুমের আধা খোলা দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট নিশার উপরে।
জম্মদিনের সাজটা এখনো মুখে লেগে আছে।চোখে কাজল থাকায় চোখের পানি ও কালো বর্ন ধারন করেছে।
হাতে পিস্তল আর সেই পিস্তল এখন ইব্রাহিমের দিকে তার করা।
ইব্রাহিম কিছুটা ভয় পেয়ে ধীরে ধীরে দুই হাত উপরে তুলে।নিশা শুট করার মুহূর্তে বাইরে পুলিশের গাড়িতে আওয়াজ আর গাড়ির আলো দেখা যায়।
নিশা জানালা দিয়ে সে দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার সামনে তাকিয়ে দেখে ইব্রাহিম নেই।
সে ছুটে যায় রান্না ঘরে।দরজা খুলতেই...
চলবে_