#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_১৫
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
"কত বড় সাহস ইন্সপেক্টর আব্রাহাম ক্রুসকে টিপ,চুরি, পাঠায়!"
আব্রাহাম যখন রাগের চোটে চিরকুটটা হাতের মুঠোয় পিষে ফেলছে।তখনই তার ফোন বেজে উঠল।ফোন রিসিভ করতেই রতনের গলা," স্যার তাড়াতাড়ি আসুন,বাজারের শেষ প্রান্তের দোকানে আগুন লেগে সব চাই হয়ে গেছে। দোকানের মালিক বলছে এখানে রাতে তিনজন ছিলো কিন্তু কে কে ছিলো মুখ খুলছে না।"
আব্রাহাম ফোনটা কেটে দিয়ে ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পরলো,আর সেই বক্সটা সেখানেই পড়ে রইলো।
শহরের এক অন্ধকার ও নিস্তব্ধ করিডোর।
দেয়ালের এক জায়গায় এসে দাঁড়াল একটা ছায়ামূর্তি।পরনে একদম নিখুঁত ফিটিংয়ের অল-ব্ল্যাক স্মার্ট টেক-স্যুট, মুখটা হুড আর ডার্ক গ্লাসে সম্পূর্ণ ঢাকা। দেয়ালের একটা লুকানো প্যানেলে সে তার ডান হাতটা রাখল। বায়োমেট্রিক সেন্সরটা তার হাতের স্পর্শ পেতেই সবুজ আলো জ্বেলে উঠল এবং একটা মৃদু যান্ত্রিক শব্দ করে হাই-টেক মেটাল দরজাটা স্লাইড করে খুলে গেল।
ভেতরের ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার, শুধু ঘরের সেন্ট্রাল সার্ভারের নীলচে আলোটা জ্বলছে। সে ধীর পায়ে ঘরের মাঝখানে এগিয়ে গেল। সামনেই ঝুলছিল একটা বিশাল মখমলের কালো পর্দা।
টান দিয়ে সে পর্দাটা সরিয়ে দিতেই ভেতরের দেয়ালে প্রজেক্টরের আলো জ্বলে উঠল। পুরো দেয়াল জুড়ে স্লাইড শোর মতো একের পর এক ভেসে উঠছে নিশার ছবি।
কোনোটাতে নিশা চন্দনের সাথে কথা বলছে, কোনোটাতে এতিমখানার বাচ্চাদের সাথে হাসছে, আবার কোনোটাতে কপালে ব্যান্ডেজ করা রাম দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। নিশার জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের ওপর নিখুঁত নজরদারি চালানো হয়েছে এখানে।
ছায়ামূর্তিটি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার হুডের আড়াল থেকে এক চিলতে মৃদু, হাসি দিল।
সে স্ক্রিনে নিশার ছবির গালে নিজের একটা আঙুল আলতো করে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, "তিন-তিনটা জ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে অবশ করে, প্রেক্টোল ঢেলে পুড়িয়ে এক নিমেষে ছাই করে দিলে। অথচ বাইরের একটা কুকুরও টেরই পেল না, সুইটহার্ট? এই না হলে তুমি আমার জান? এই হিংস্রতাটাই তো আমার রগে রগে আগুন ধরায়।"
তার চোখ দুটো অন্ধকারে তীব্রভাবে চকচক করে উঠল।
"তুমি বাধ্য হইয়ো না পাখি, তুমি বরং অবাধ্য হয়েই থেকো।আবার আবার বাধ্য কিছুতে মন টানে না।
পুড়িয়ে দাও, এই শহরের যা কিছু তোমার চোখের সামনে আসবে, সব পুড়িয়ে ছাই করে দাও। আর যদি কখনো তোমার ধ্বংস করার জন্য কোনো রাজপ্রাসাদের দরকার হয়, তবে মনে রেখো আমি পুরো শহরটাকেই একটা শ্মশান বানিয়ে তোমার পায়ে এনে উপহার দেবে।"
ফোন বের করে ফোনটার স্ক্রিন অন করতেই লক স্ক্রিনে ভেসে উঠল নিশার একটা ছবি যেখানে নিশার চোখে সেই জেদি, বাঘিনী চাউনি।
মেডিটেশনের মতো মগ্ন হয়ে সে কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটোতে তখন তীব্র পাগলামি। আর সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ফোনটা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে একদম উন্মাদের মতো স্ক্রিনে নিশার ছবির ঠোঁটে, গালে, চোখে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে লাগল।
ফোনের ঠান্ডা কাচের স্ক্রিনটা তার ঠোঁটের তপ্ত ছোঁয়ায় যেন গরম হয়ে উঠল।
বেশ কয়েকবার এলোপাথাড়ি চুমু দেওয়ার পর সে ফোনটা আলতো করে নিজের বুকের বাম পাশে, ঠিক হৃদপিণ্ডের ওপর চেপে ধরল। চোখ দুটো বন্ধ করে, এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি ফুটিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধু আমার, পাখি শুধু আমার।"
সকাল দশটা বাজতেই নিশা এক লাফে ঘুম থেকে উঠে বসলো।আজ বারো তারিখ তার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। দশটায় পরিক্ষা আর এখন বিছানায় বসেই দশটা বেজে গেছে।
নিশা এক লাফে বিছানা থেকে নেমে কোনোমতে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে দুই ঢোক পানি ছিটাল।জামা চেন্জ করে রেজিস্ট্রেশন কার্ড আর অ্যাডমিট কার্ডটা একটা ফাইলে পুরে জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে মেইন রোডের দিকে চলে গেলো।
রাস্তায় এসে নিশা ডানে-বামে তাকাল, কিন্তু একটা রিকশা বা ইজিবাইকেরও দেখা নেই। হটাৎ একটা রয়্যাল এনফিল্ড বাইকের কর্কশ ব্রেকের আওয়াজে নিশা সেদিকে তাকলো। বাইকের মালিক হেলমেট খোলার পরে নিশার চোখে পড়লো সেই বাদামি চোখ জোড়া।
অভ্র বাইক থেকে না নেমেই বিষাক্ত গলায় বলল, "আরে, 'দ্যা গ্রেট নিশা মল্লিক' যে।তা, আপনার দেখি শুধু ওপরে ওপরেই দম? একটা নিজস্ব গাড়িও নাই, কি নিয়ে যে এত অহংকার করেন বুঝি না।শেষমেশ তো কোথাও যাওয়ার জন্য ওই মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্য লোকের গাড়ির জন্যই হা-পিত্যেশ করতে হয়।"
নিশা রেগে কিছু বলতে যাবে তখনই অভ্র তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাইকের এক্সিলারেটরে মোচড় দিল। ধুলো উড়িয়ে নিমিষেই চোখের আড়াল হয়ে গেল সে। নিশা রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে, "তোকে কাল চিচিং ফু করে দিলেই ভালো হতো শালা।টের পাইতি নিশার কিসের অহংকার"
নিজের ফোনটা বের করল। স্পিড ডায়ালে থাকা বাঁধনকে ফোন দিয়ে চিৎকার করে বলল, "বাঁধন,তুই যেখানেই থাকিস, ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাইক নিয়ে আমার সামনে আসবি। যদি না আসিস, তোর বাইক আমি আজ ভেঙে নদীতে ফেলে দেব!"
ঠিক সাড়ে চার মিনিটের মাথায় বাঁধন তার বাইক নিয়ে ঝড়ের গতিতে হাজির হলো। নিশা এক লাফে পেছনে বসে চেঁচাল, "টান দে বাঁধন। ডিরেক্ট ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস।"
বাঁধনও আর কথা না বাড়িয়ে বাইক ১০০ স্পিডে ছোটাল।
যখন নিশা হাপাতে হাপাতে পরীক্ষার হলের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, তখন অলরেডি সাড়ে দশটা বেজে গেছে। হলের গার্ড স্যার নিশা কে দেখে অনুমতি দিলেন এবং খাতা ও প্রশ্নপত্র তার টেবিল এনে রাখলেন।অন্য কেউ হলে মনে হয় না এলাউ করতেন।
নিশা গিয়ে সিটে বসলো। খাতার ওপরে কোনোমতে নাম-রোল লিখে প্রশ্নপত্রটা সোজা করে চোখের সামনে ধরল।
কিন্তু প্রশ্নপত্রের ওপর চোখ বোলাতেই নিশার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।
নিশা কপালে হাত দিয়ে শূন্য খাতার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "ওরে আমার খোদা তুমি এমন করো কেন?
এইগুলা পরীক্ষার প্রশ্ন নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে আনা কোনো কোড ল্যাঙ্গুয়েজ? যে এই প্রশ্ন বানাইছে, নিশ্চিত কাল রাতে তার বউয়ের সাথে মারাত্মক ঝগড়া হইছিল।সব দোষ ঐ বেডির।কোথায় একটু স্বামিকে আদর সোহাগ করবি তা না তার সাথে ঝগড়া করিস আর ফল ভোগ করা লাগছে আমার।"
"এর চেয়ে ভালো ছিল কাল রাতে আমি নিজেই যদি পুড়ে ছাই হয়ে যেতাম। অন্তত এই প্রশ্নের চেহারা দেখার আগে মরণটা তো শান্তিতে হইতো।"
নিশা উঁকি দিয়ে চেষ্টা করে পাশের জনের খাতা দেখে লেখার জন্য কিছু সে খাতার উপর প্রশ্ন চাঁপা দিয়ে লেখছিলো, "ল্যাওড়ার বাল খাতা আর মার্ক নিয়ে কবরে যাস।"
নিশা সাদা খাতাটা উল্টে দুই পৃষ্ঠা পর লেখা শুরু করলো,
"শ্রদ্ধেয় স্যার,আপনাকে আমার শত কোটি সালাম।
আমি জানি এই খাতার উত্তরগুলোর সাথে পরীক্ষার প্রশ্নের কোনো মিল নাই। কিন্তু স্যার, মিল খুঁজতে গিয়া যদি আমারে ফেল করাইয়া দেন, তবে আপনার জীবনের 'টাইমিং' কিন্তু মারাত্মক বিগড়ে যাবে।
বেশি নম্বর দিতে না পারেন, অন্তত পাস মার্কসটা দয়া কইরা দিয়া দিয়েন।কোনোভাবে যদি জানতে পারি আপনার লাল কালির কারণে আমার এক বছর লস হইছে, তবে আপনার বাড়ির রাস্তা কিন্তু আমার খুব ভালো করেই চেনা আছে।
খাতাটা ভালোয় ভালোয় পাস করাইয়া দিয়া শান্তিতে ঘুমান স্যার।
ইতি, আপনার একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত, ভয়ঙ্কর ছাত্রী/ছাত্র যা আপনি ভালোবেসে ডাকবেন তাই।"
দশ মিনিট পর খাতাটা জমা দিয়ে বেরিয়ে গেলো নিশা।
বাইরে চন্দন দলবল নিয়ে ক্যাম্পাসে বসে ছিলো।নিশা কে দেখতে জিগ্গেস করলো "বস পরিক্ষা কেমন হয়েছে?"
"আরে সব কমন। শুধু লিখে গেছি।"
হটাৎ তার মনে পড়লো অভ্রের বলা কথা টা"একটা নিজস্ব গাড়িও নাই,"
"চন্দন ফলো মি।"
"কোথায় বস?"
"চল আজ সব থেকে দামি বাইকটা কিনবো।"
চলবে__