ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবাধ্য মন পাখি

৩৪তম পর্ব

লেখক: খাদিজা পারভিন

#অবাধ্য_মন_পাখি

#পর্ব_৩৪

#writer_খাদিজা_পারভিন

আব্রাহামের বাসর করার স্বপ্নের সাথে সাথে আব্রাহামের বাড়িতেও আগুন লাগিয়ে দিয়ে সিগারেটের ধৌয়া উড়িয়ে হেটে চলেছে নিশা মল্লিক।

মনে বেশ আনন্দ লাগছে। আব্রাহাম কে মেরে ওকে কেটে পিস পিস করতে মন চায় নিশার।

দূর থেকে এইসব দেখছে অভ্র আর আকাশ। আব্রাহামের প্রতি তার কোনো বিশ্বাস নেই।তাই সে নিজেই এখানে এসেছে জরুরি অবস্থায় যাতে সব কিছু সামলাতে পারে।এইদিকে আকাশের গাল যে হা হয়ে আছে আর বন্ধ হচ্ছে না।

"স্যার,"

"হুম,"

"এটা কে?"

"আমার বউ,"

"মানে!" একটু চেঁচিয়ে উঠলো আকাশ। পরক্ষনেই আবার অভ্রের শিতল চাহনিতে গলার স্বর নিচু হয়ে গেলো।

"আপনি বিয়ে করেছেন?"

"হুম,"

"কখন?কিভাবে?"

এত তোমার না জানলেও চলবে।দেখো তো আমার গিন্নী কতদূর গেলো।

"জি স্যার।"

আকাশ গাছের পেছন থেকে গলা বাড়িয়ে নিশাকে কোথায় দেখতে পেলো না।

"চলে গেছে স্যার।"

"হুম। কিন্তু ঐ ছেঁড়া পাশা অফিসার আব্রাহাম কোথায় গেলো? ও বাইরে গেলোই বা কেন?"

আকাশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,"সে আবার কে?"

অভ্র একটা সিগারেট ধরিয়ে সাবলীল ভাবে উওর দিলো," এঁটো থালাচাটা পুলিশ অফিসার।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই আব্রাহামের গাড়ি এলো।অভ্র সেটা খেয়াল করে বলে উঠলো," শয়তানের নাম নিতে নিতেই শয়তান হাজির।"

আব্রাহাম গাড়ি থেকে নামলো ততক্ষণে আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।আগুনের তাপে চারপাশে হলুদ আভা তৈরি হয়েছে। আব্রাহাম একটু দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিল তার বাড়িতে আগুন ধরেছে।সে তার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কল দিলো।তার হাতে এখন নিজের বাসর ঘর সাজানোর জন্য আনা ফুলের ব্যাগ ঝুলছে।

"আকাশ ওর হাতে ঐটা কি ভালো করে দেখো তো।"

আকাশ একটু ভালো করে চোখ ছোট বড় করে দেখে বলল," গোলাপ ফুল ভরা ব্যাগ।মনে হয় বাসর করার জন্য এনেছে।"

আভ্র হেসে উঠলো,"ঐ ফুল এখন ওর প্যান্টে গুজে বসে থাকা লাগবে।"

অভ্রের সাথে সাথে আকাশ ও হেসে উঠলো।"আমরা গিয়ে গুজে দিবো?"

"পারো তো শুধু অন্যের প্রাইভেট সেক্টরে কাটা আর বাঁশ গুজতে।"

আকাশ একটু মুচকি হাসি দিলো," আপনার কাছ থেকেই তো শেখা স্যার।"

চোখের সামনে আব্রাহামের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আর সে নিরবে দাঁড়িয়ে দেখছে।

"নিশু পাখি,কাজটা কি তুমি ঠিক করলে? তুমি কি এর দাম দিতে পারবে?"

এগুলো মনে মনে বিড়বিড় করছে আব্রাহাম।নিজের ফোন বেজে উঠার শব্দে ঘোর কাটে তার।

"হ্যালো ড্যাড।"

"নিশা কে সরিয়েছো?"

"না। এনেছিলাম তবে আমার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে চলে গেছে।"

"হোয়াইট দ্যা ফা*ক‌। ইউ বিস্ট,তোমার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে চলে গেলো তুমি কি তখন সামনে বসে ললিপপ খাচ্ছিলে?আমি কিছু শুনতে চাই না।নিশা কে সরাতে হবে মানে হবে।আর খবরদার নিশার যেন কিচ্ছু হয় না।নিশা কে আমার জীবিত চাই।"

এগুলো বলেই আসিফ ইব্রাহিম ফোন কেটে দিলো। আব্রাহাম হাতে থাকা গোলাপ ফুল ভর্তি ব্যাগ থেকে একটা গোলাপ বার করে বাকি গুলো জোরে আগুনের মধ্যে ছুড়ে মারে।

ফুলটা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রান নেওয়ার চেষ্টা করে। "তোমার এই রাগ,জেদ, দুঃসাহসই আমাকে বার বার তোমার উপর আকর্ষণ করে নিশু পাখি।আমাকে বাসর করার স্বপ্ন দেখিয়ে আমার পুরো বাড়িটাই আগুন লাগিয়ে দিলে। একবার ও ভাবলে না এখন আমি থাকবো কোথায়?

তোমার বাড়ি?"

বলেই হো হো করে হেসে দিলো।

নিশা হাটতে হাঁটতে এতিমখানার সামনে এসে দাঁড়ালো ।দেখতে পেলো খাবার-দাবারের বিশাল আয়োজন হচ্ছে।

পোলাও, খাসির মাংস আর ডাল রান্নার ম-ম গন্ধে আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে। নিশা কপালে দু-তিনটে খাঁজ ফেলে থমকে দাঁড়াল।

"কী ব্যাপার? আজ হঠাৎ ড্যাগে ড্যাগে বিশাল ভোজের আয়োজন কেন? কোন ধান্ধাবাজ লোক দেখানো নাটক করতে এলো আবার।"ভাবতে ভাবতেই সে ভেতরে পা বাড়াল।

ভেতরে ঢুকতেই নিশার চোখে পড়ে এতিমখানার মাঠের মাঝখানে একদল পিচ্চি বাচ্চার সাথে মহা উৎসাহে কানামাছি খেলছে ঈশান চৌধুরী।

যে এতদিন ধরে অভ্রের সাথে আসতো এই এতিমখানার জমি দখল করার জন্য।তাকে এভাবে দেখে নিশা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছে।

নিশা দূর থেকে হাঁ করে কিছুক্ষণ এই অদ্ভূত দৃশ্য দেখল। তারপর করিম চাচাকে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করে তার দিকে আসতে বললো।

সে কাছে আসতেই নিশা বাঁকা চোখে জিজ্ঞেস করল, "করিম চাচা, এই বাঁদরটা এখানে কী করছে? আর এত বিরিয়ানি-পোলাওয়ের টাকা কোথায় পেলে?ব্যাংক ডাকাতি করেছো নাকি তুমি বাচ্চাদের নিয়ে?"

করিম চাচা এক গাল হাসলেন, "নিশু মা।ঐ যে ছেলেটাকে দেখছো।ঐ ছেলেটা সব নিয়ে এসেছে বাচ্চাদের জন্য।কত ভালো ছেলে দেখেছ?" ইশানের দিকে আঙ্গুল তুলে কথাটা বললো করিম চাচা।

"এই বদমাইশটা আবার ভালো মানুষ হয়ে গেল কবে থেকে? জমি দখলের জন্য নতুন কোনো চাল নাকি? বাগে না পেয়ে শেষে কি এই মাসুম বাচ্চাগুলোর খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে দিল নাকি?''

নিশা আর কিছু ভাবতে পারছে না।ক্ষিপ্র পায়ে ধেয়ে গেল মাঠের মাঝখানে। বাচ্চার দল কিছু বুঝে ওঠার আগেই, নিশা এক টানে ইশানের শার্টের কলারটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে হিঁচড়ে টানতে শুরু করল।

হঠাৎ করে পিছন থেকে কলার চেপে ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ায় ঈশান প্রথমে ভেবেছিল নিশ্চয়ই কেউ অ্যাটাক করেছে।

সে শার্ট সামলাতে সামলাতে রাগে পেছনে ঘুরতেই তার চোখ আটকে গেছে।

সামনে তার স্বর্গের পরী নিশা মল্লিক।

ঈশানের মুখে রাগের 'র' টুকুও প্রকাশ পেলো না। সে বাধ্য ছাগলের মতো নিশার টানের সাথে সাথে হাঁটা দিল।

নিশা এক টানে ইশানকে টেনে এনে দাঁড় করাল সদ্য রান্না শেষ হওয়া বিশাল ডালের ড্যাগের সামনে। হাড়ি থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছে, একদম টগবগ করে ফোটা গরম ডাল।

নিশা এক হাতে ড্যাগের বড় ঢাকনাটা সজোরে সরাতে সরাতে পাশে থাকা একটা কাঠের মস্ত বড় চামচ তুলে নিল। চামচ ভরে টগবগে গরম ডাল তুলে সোজাসুজি ঈশানের মুখের সামনে ধরে বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল,"খা ,হা কর।"

ঈশানের মগজে তখন অন্য সুর বাজছে। সে ব্যাকুল চোখে নিশার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, '‘ও মাই গড,আমার স্বপ্নের রানী নিশা মল্লিক আজ আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে? আমি কি সত্যি সত্যি স্বর্গে চলে এলাম নাকি?"

নিশার সন্দেহের কথা ঈশানের ঘিলুতে ঢুকলই না। সে ভাবল নিশা হয়তো তার প্রেমে পড়া শুরু করেছে তাই নিজের হাতে লোকমা তুলে দিতে এসেছে।

ঈশান আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করল না। চোখ বন্ধ করে, অত্যন্ত পরম ভক্তি নিয়ে মুখটা হাঁ করল। আর নিশা সেই ধোঁয়া ওঠা গরম ডাল পুরে দিল ঈশানের মুখে।

'‘উফফফফ,ঈশানের গাল, জিব আর তালু যে এক সেকেন্ডের মধ্যে পুড়ে একদম ছাই হয়ে গেল, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।জিভ দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে, চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ইশানের ফোকাস এক চুলও নড়ল না।

সে পরম তৃপ্তিতে পোড়া গাল নিয়েই ডাল ঢোক গিলে গিলতে লাগল।

তার মন-প্রাণ, সব তখনও আটকে আছে নিশার ওপর। সে এক দৃষ্টিতে নিশার সেই চোখ, হালকা লালচে হওয়া রগচটা ঠোঁট, রাগে ফুলে ওঠা নাকের ডগা আর সেই কিলার চাহনির দিকে তাকিয়ে মনে মনে আউড়াতে লাগল,

"কী রূপ! কী রাগ! রূপ তো নয় যেন এক গ্যালন এসিড।মুখ পুড়ুক, জিব খসুক নিশা মল্লিকের হাতে বিষ খেলেও তো তা অমৃত মনে হবে।"

ঈশানের মুখে এই হাদা মার্কা এক্সপ্রেশন দেখে নিশা চামচ হাতে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবছিল গরম ডালে মুখ পুড়লে লোকটা চিল্লাচিল্লি করবে, কিন্তু এই ডেমনা যে পোড়া মুখ নিয়েও তার দিকে ছাগলের মতো তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে তা দেখে নিশার নিজেরই এবার পাগল হওয়ার উপক্রম হলো।

যেহেতু সে খেয়েছে তো খাবারে কোনো ভেজাল নাই। তারপর সে সরাসরি ইশানকে জিগ্গেস করলো," কি মতলবে এসেছিস এখানে?"

নিশার কথায় ইশান হুসে ফিরলো, তার চোখ দিয়ে এখনো পানি পড়ছে।গাল ঠোঁট জ্বলছে শুধু রক্ত টুকু বার হওয়ার উপক্রম।এই অবস্থায় কথা বলার উপায় নেই তাও জোর করেই বললো," আজ আমার জন্মদিন।আপন বলতে যারা আছে তাদের কারো মনে নাই।তাই এই বাচ্চাগুলোর সাথে নিজের দিনটা ভাগ করে নিতে এলাম।ভুল হয়েছে আমার?"

নিশা আর কিছু বললো না।

ইশান আবার বললো," আমার ভুল হলে আমি ক্ষমা চাচ্ছি আপনার কাছে।আর আমি এখনই চলে যাচ্ছি।তবে খাবার গুলো দয়া করে ওদের খেতে দিবেন।আমি অনেক ভালোবেসে এনেছি এগুলো।"

ইশান যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।

" দাড়ান।থাকুন আপনি ।"

ইশানের মূখে হাসি ফুটলো, " আপনিও থাকুন প্লিজ।"

" আমি কারো জম্মদিনের অনুষ্ঠানে থাকি না।" বলেই নিশা সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো‌।ইশান এগিয়ে গেলো নিশা কে আটকানোর জন্য তবে তখনই রহিম চাচা এগিয়ে এলো।

" ওকে যেতে দাও ।ও কারো জম্মদিনে থাকে না।"

ইশান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো," কিন্তু কেন?"

অভ্র রিভলভিং চেয়ারে গা এলিয়ে বসেছিল, হাতে ওয়াইনের গ্লাস।

"আব্রাহাম তো ভুয়া জামাই তাই নিশা তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাতু বানিয়ে দিল। কিন্তু যখন নিশা আসল সত্যটা জানতে পারবে? যখন সে জানতে পারবে যে আব্রাহাম নয়, তাকে সত্যি সত্যি জোর করে, বেহুঁশ করে , টিপছাপ নিয়ে আমি বিয়েটা সেরেছি তখন সে আমার কি করবে?"

অভ্র একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলো।

"তাদের একসাথে থাকার প্রথম রাতে নিশা বেডরুমের দরজায় রকেট লাঞ্চার ফিট করে রাখেছে, তোশকের নিচে গ্রেনেড আর খাট সাজানো তাজা বোমা দিয়ে। অভ্র রাতে ঘরে ঢুকতে গেলেই নিশা হাসতে হাসতে লাইটার জ্বালিয়ে বলবে, "এসো হে পতিদেব,আজ আমাদের সত্যিকারের বাসর রাত হবে, একেবারে সোজা পরকালে।"

অভ্র নিজের হাসি চাপিয়ে রাখতে পারলো না।হাসতে হাসতে হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটা টেবিলে রেখে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল,"কি দিন এলো তোর অভ্র একটা সাইকো মেয়ে তোর পুরোটা হৃদয় জুড়ে রাজত্ব করছে।আমার মনের অন্ধকার চিলেকোঠায় সে এক তেজস্বী রানির মতো সিংহাসন দখল করে বসে আছে।লোকে ভালোবাসায় শান্ত দিঘির জল খোঁজে, আর আমি পাগলের মতো বেছে নিয়েছি কালবৈশাখী ঝড়কে। কারণ আমি জানি, এই ঝড়ের তাণ্ডবে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার মাঝেই আমার আসল জীবন।"

"ফায়ার বার্ড,আমি এত সহজে তোমার কাছে যাবো না। আবার তোমার থেকে দূরে ও যাবো না। তুমি যখন আমার কাছে আসতে চাইবে আমি তখন দূরে যাবো।যখন তুমি দূরে যেতে চাইবে তখন আমি তোমার এত কাছে আসবো যে তুমি আমার নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারবে।আমার প্রতিটা হৃদস্পন্দন শুনতে পারবে।"

নিশা নিজের বাড়ি এসে জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে কিন্তু খুলছে না কেউ। জাহানারা বেগমের কড়া নিষেধ।

" দরজা খুলবে নাকি ভেঙ্গে ফেলবো।আমার বাথরুমে যাওয়া লাগবে বাল।এই রহিমা মাগি দরজা খোল।"

চলবে__

(সবাই সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করলে অনেক ভালো লাগে😩🤍)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন