#অবাধ্য_প্রনয়ীণি পর্ব |৮| #আনান_রোজ
ইফান কে রক্তাক্ত অবস্থায় টানেলের পাশে পাওয়া গেছে, খবরটা আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই পুরো বাড়িতে প্রলয় নেমে এল। ইফানের বাবা এবং অনন্যার বাবা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। তাঁরা আর্মি ফোর্সের জিপ নিয়ে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেলেন ইফানকে রেসকিউ করে মিলিটারি হসপিটালে নেওয়ার জন্য।
ঠিক তখনই তটিনী সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে নিজের মাকে সোফার ওপর অজ্ঞান অবস্থায় দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে কাঁপানো হাতে হসপিটালের ডাক্তারকে ইমার্জেন্সি কল দিল। কল শেষ করেই যখন সে চোখ তুলল, ড্রয়িংরুমের এক কোণে চার বছরের আইনানকে কোলে নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্যাকে তার চোখে পড়ল।
ভাইয়ের এই রক্তাক্ত পরিণতির সমস্ত ক্ষোভ আর পুরোনো ঘৃণা এক নিমেষে তটিনীর মাথায় চড়ে বসল। সে অনন্যার দিকে এগিয়ে এসে অত্যন্ত জঘন্য এবং হিংস্রভাবে অপমান করে চিৎকার করে উঠল—
—"অলক্ষুণে মেয়ে একটা! তুই এই বাসায় পা রাখতেই এত বড় বিপর্যয় ঘটে গেল! এখনই বেরিয়ে যা এখান থেকে! তোর ওই নোংরা ছায়া যেখানে পড়ে,সেখানেই ধ্বংস নেমে আসে। তুই সবসময় আমার নিষ্পাপ ভাইটার কপালে শুধু কষ্ট ডেকে আনিস! দূর হ এখান থেকে, মুখ দেখাবি না আর!"
তটিনীর এই তীব্র, বিষাক্ত অপমানের জবাবে অনন্যা আজ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। তার ঠোঁটের কোণে কোনো চিরচেনা জেদ বা প্রতিবাদী রূপ ফুটে উঠল না কারণ, সে নিজের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক আদালতে খুব ভালো করেই জানত—কোনো-না-কোনোভাবে ইফানের এই রক্তাক্ত অবস্থার জন্য সে নিজেই দায়ী। সে কোনো উত্তর না দিয়ে, আইনানকে বুকে চেপে মেইন বিল্ডিং থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। নিজের পেছনের সেই ছোট স্যাঁতসেঁতে ঘরে ফিরে সে এক ঝটকায় দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল।
অনন্যা ধীর পায়ে আইনানকে নিজের কোল থেকে মেঝেতে নামাল। কিন্তু আইনান টিমটিমে আলোয় মায়ের চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জলটুকু দেখে ফেলল। সে তার অস্পষ্ট, আধো আধো গলায় ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল—
— "আম্মু...আম্মু কাঁদছ কেনু? নানুভাই কি আবাল বকা দিয়েতে?"
অনন্যা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের কান্না আর বুকের ভেতরের হাহাকারটুকু জোর করে গিলে ফেলল। সে ছেলেকে শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল—
— "না সোনা, আম্মু একদম কাঁদছি না। আমার রাজকুমার পাশে থাকতে এই দুনিয়ায় কার এত সাহস আছে যে আম্মুকে কষ্ট দেবে, বলো?"
আইনান অনন্যার বুক থেকে একটু আলাদা হয়ে, তার ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে মায়ের ফর্সা গাল দুটো পরম মমতায় শক্ত করে ধরে বলল—
—"আম্মু, তুমি আ একটুও কান্না কলো না! আমি আছি তো!"
অনন্যা ছেলের এই পিচ্চি বয়সের গভীর ভালোবাসা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, সে আইনানের কপালে এক দীর্ঘ চুমু খেল। আইনান বয়সে অনেক পিচ্চি হলেও, এই বাড়ির চারপাশের অদ্ভুত নীরবতা আর নির্মম বাস্তবতা যেন সে নিজের অবুঝ মনেই টের পেয়ে গেছে—যে এই বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে তার আম্মুকে আসলে কেউ ভালোবাসে না, সবাই তাকে শুধু তাড়িয়ে দিতে চায়!
অনন্যা নিজের চোখ জোড়া দ্রুত ওড়না দিয়ে মুছে নিয়ে এক কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল—
—"বাবা, চল... অনেক দুপুর হয়েছে, এখন লক্ষ্মী ছেলের মতো খেয়ে নেবে, তারপর তো ঘুমাতে হবে, তাই না? সময়ে না ঘুমালে তুমি তাড়াতাড়ি বড় হবে কীভাবে?"
আইনান বিছানার ওপর গিয়ে বসে নিজের ছোট মাথাটা দুদিকে নেড়ে খুব বিষণ্ণ গলায় বলল—
— "না আম্মু, আমি একন এদদম খাব না আমার একটুও ভালু লাগছে না।"
অনন্যা ভাতের প্লেটটা হাতে নিয়ে আইনানের পাশে এসে বসল। ওকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে অত্যন্ত কোমল অথচ বীরত্বের সুরে বলল—
—"না খেলে শরীরে শক্তি হবে কীভাবে, বাবা? তুমি যদি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে শক্তি না পাও, তবে আম্মুকে ওই পচা লোকগুলোর থেকে বাঁচাবে কীভাবে?"
মায়ের মুখে ‘আম্মুকে বাঁচানোর’ কথা শোনামাত্রই আইনানের মলিন মুখটা এক মিষ্টি খিলখিল হাসিতে ভরে উঠল। সে বুক ফুলিয়ে বীরের মতো হেসে বলল —
—"আনিন বাঁচাবে তো আম্মুকে! আমি পতা লোকদেল অনেক মালব!"
ছেলের মুখে এই আশ্বাস শুনে অনন্যার বুকের ভেতরের সব মেঘ কেটে গেল। সে পরম মায়ায় লোকমা মেখে আদর করে আইনানকে দুপুরের খাবারটা খাইয়ে দিল,আর আইনানও খেয়ে নিল। খাবার শেষ করে আইনান বিছানায় উপুড় হয়ে ভাঙা ফোনে কার্টুন দেখছিল। অনন্যা ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল হঠাৎ করেই আইনান কার্টুন থেকে নিজের চোখ দুটো সরিয়ে, অনন্যার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে এক নিষ্পাপ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করে বসল—
—"আম্মু... বাবা কোতাই? বাবা কেন আমাল কাছে কখনু আসে না? বাবা কি আনিনকে নানুভাইয়ের মতো একটুও ভালোবাসে না?"
আইনানের এই, তীরের মতো ধারালো প্রশ্নটি শোনামাত্রই অনন্যার চোখের মণি দুটো মুহূর্তের মধ্যে ছলছল করে উঠল, তার বুকটা চিরে একাকার হয়ে গেল! আইনান মাঝে মধ্যেই এই প্রশ্ন করে বসে, বিশেষ করে যখন ডে কেয়ারে বাচ্চাদের তাদের বাবার সাথে দেখে, বাচ্চারা খেলার সময় যখন তাদের বাবাকে নিয়ে আধো আধো গল্প বলে। ওগুলো আইনান চুপ করে শুনে মাকে এসে বলে, মাঝে মধ্যে ওদের সাথেও কথা বলে, বাবা কে? সবারই বাবা থাকে? এমন আরো অনেক কিছু।
তবে অনন্যা নিজের মনে ইজানকে যতই তীব্র ঘৃণা করুক না কেন, সে নিজের নিষ্পাপ সন্তানের মনে তার জন্মদাতা বাবার প্রতি বিন্দুমাত্র কোনো বিষ বা ঘৃণার সৃষ্টি হতে দেয়নি। সে আইনানের গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল—
—"না সোনা, একদম ওমন কথা বলতে নেই। বাবা তোমাকে পৃথিবীর সবার চেয়ে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসে! সেও তো তোমার মতোই... বাইরের পচা লোকদের সাথে অনেক বড় ফাইট করতে গেছে। আর বাবা বলেছে—আইনান যদি গুড বয় হয়ে আম্মুর কথা শোনে, তবে বাবা খুব দ্রুত ফাইট শেষ করে আইনানের কাছে চলে আসবে।"
আইনান মায়ের এই মায়াবী উত্তর শুনে এক মিষ্টি মুচকি হাসি দিল। সে এক ঝটকায় কার্টুন ফেলে এগিয়ে এসে অনন্যার গলা জড়িয়ে ধরে বলল—
— "বাবা কবে আতবে, আম্মু ?"
অনন্যা ওকে নিজের বুকের মাঝে লেপ্টে ধরে চোখ বুজে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
—"আসবে তো সোনা... খুব জলদি আসবে।"
এর কিছুক্ষণ পর আইনান মায়ের বুকে মাথা রেখেই পরম শান্তিতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। অনন্যা ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ধীর পায়ে উঠে এসে নিজের পড়ার টেবিলটার সামনে বসল।
এই নিঝুম দুপুরে চারপাশটা একদম সুনসান। অনন্যার মগজ জুড়ে তখন এক ভয়ঙ্কর তোলপাড় চলছিল। এই মুহূর্তে বাইরে কী হচ্ছে, ইফানের অবস্থা আসলে কেমন—তার কোনো খবর পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ জানেন ইজানের সেই পাশবিক হিংস্রতা ইফানকে ঠিক কোন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনন্যা টেবিলের ওপর দুহাত রেখে মনে মনে শুধু একটি প্রার্থনাই করতে লাগল—
—‘মাবুদ, সালার ওর সাথে যতই অন্যায় করুক না কেন... ইফান ভাই যেন অন্তত বেঁচে থাকে। আমি কোনো রক্তের দায় নিজের মাথায় নিতে পারব না...’
টেবিলের ওপর রাখা ভাঙা স্ক্রিনের ফোনটার দিকে তাকিয়ে অনন্যার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। তার পুরো শরীর ভয়ের চেয়েও বেশি তীব্র ক্ষোভে কাঁপছিল। সে কাঁপানো হাতে ফোনটা তুলে নিয়ে কয়েকবার ইজানের নম্বরটা ডায়াল করল, কিন্তু প্রতিবারই একটা তীব্র অস্বস্তিতে কল করার আগেই কেটে দিল। এভাবে আরও কিছুক্ষণ কাটার পর, সে নিজের ভেতরের সবটুকু শক্তি এক করে চূড়ান্ত বারের মতো নম্বরটা ডায়াল করে গ্রিন বাটনে চাপ দিল। ওদিকে তখন সোয়াত হেডকোয়ার্টারের অফিশিয়াল ডেস্কে বসে দুপুরের লাঞ্চ করছিল কমান্ডার সালার মুনতাহির ইজান। হঠাৎ নিজের আইফোনের স্ক্রিনে 'Stubborn Wife' নামটা জ্বলজ্বল করতে দেখে সে এতটাই খুশি আর বিষ্মিত হলো যে নিজের অজান্তেই ভাতের লোকমা মুখে তুলতে গিয়ে মারাত্মক এক বিষম খেল! তাও সে দ্রুত কাঁপানো হাতে কলটা রিসিভ করে, অনবরত কাশতে কাশতে এক অদ্ভুত আহ্লাদী গলায় বলে উঠল—
—"হ্যাঁ... খুক খুক... হ্যাঁ বউ?"
অনন্যা ইজানের মুখে 'বউ' ডাক শুনে এবং তার ওমন কাশির শব্দে চরম বিরক্ত হয়ে মুখ কুঁচকে বলল—
—"কাশছেন কেন আপনি?"
ইজান টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা এক চুমুকে খালি করে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল —
—"আরেহ, লাঞ্চ করছিলাম, তুই হটাৎ কল দিলি! হটাৎ ই বিষম খেলাম। মেনুতে আজ মাটন ছিল... তোর প্রিয় না?"
ইজান একদমে কথা গুলো বলল, হটাৎ যদি কল্টা কেটে দেয় এই মেয়ে! কিন্তু অনন্যা কোনো উত্তর দিল না, সে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল ইজান ওকে সম্পূর্ণ নীরব দেখে আবারও একটা কুৎসিত খোঁচা দিয়ে বলল—
—"রাহি, আমার জন্য এই মাটন'টা স্পেশালি রান্না করে অফিসে নিয়ে এসেছে। তোর জন্য কি কিছুটা নিয়ে আসব?"
ইজানের এই আয়েশী আড্ডা শোনামাত্রই অনন্যার মাথার রগগুলো রাগে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে নিজের গলার স্বর তীক্ষ্ণ করে চিৎকার করে বলল, —
—"ওদিকে ইফান ভাই হসপিটালের বেডে জীবনের সাথে লড়াই করছে, মরার পথে দাঁড়িয়ে আছে! আর আপনি একটা মানুষকে এই রক্তাক্ত অবস্থা করে এখানে এত রিল্যাক্স মুডে মাটন চিবোচ্ছেন?"
ইজান ওপাশ থেকে এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর গলায় বলল—
—"দেখলি অনন্যা? আমাদের মধ্যকার আন্ডারস্ট্যান্ডিং কতটা নিখুঁত!"
অনন্যা ভ্রু কুঁচকে ক্ষুব্ধ গলায় বলল—
— "মানে? আপনি আমার সাথে ইয়ার্কি মারছেন?"
ইজান ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলল—
—"ইয়ার্কি কেন করব? তুই তো কোনো প্রমাণ ছাড়াই কত সুন্দর এক পলকে বুঝে গেলি যে এই চমৎকার পুণ্যির কাজটা অন্য কেউ নয়—তোর বর করেছে! হাউ কিউট অফ ইউ, ওয়াইফি!"
অনন্যা এবার রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বলল—
— "আপনার লজ্জা করে না সালার? আপনার কি মানুষের চামড়া নাকি পশুর চামড়া, সালার? একটা সুস্থ, নিরপরাধ মানুষকে আপনি এভাবে পশুর মতো নির্যাতন করেছেন?"
—"না, আমার বিন্দুমাত্র লজ্জা করে না! একদমই করে না "
অনন্যার কথার মাঝেই ইজানের গলার স্বর মুহূর্তের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর সাইকোপ্যাথ মতো বরফশীতল হয়ে গেল, সে আবার দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— "সে আমার বউকে নিতে চায়, সে চরম অপরাধী! তাছাড়া সে আমার শত্রু! তবে আফসোস...লোকটা এখনো বেঁচে আছে, ওখানেই আমার হিসাবটা কিছুটা মিলল না।"
এসব শুনে, অনন্যা তীব্র ঘৃণা মাখানো গলায় ফিসফিসিয়ে বলল—
—"ছিঃ! আপনি এত জঘন্য, এত নিচু মানসিকতার একটা লোক! দুনিয়ার কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ আপনার মতো একটা হিংস্র জানোয়ারের সাথে বাঁচতে পারবে না।"
ইজান ওপাশ থেকে এক উচ্চৈঃস্বরে অন্ধকার হাসি হেসে উত্তর দিল—
—"তুই ত অসুস্থ বলেই আজও আমার এই বিষাক্ত নামের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে আছিস....!
সবাই তো আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তুই ছাড়া আমার আর যে কেউ নেই। এটা কেন বুঝতে চাস না?"
অনন্যা ইজানের এই কথার কোনো উত্তর দিল না, তার ভেতরের ঘৃণাটা এবার পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে তাকে গ্রাস করতে লাগল। ইজান নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে অত্যন্ত ডোন্ট-কেয়ার ভাব নিয়ে বলল—
—"তোকে তো আমি আগেই ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম, তুই আমার কথা কানে তুলিসনি। এখন তোর ওই জানের জান ইফান জীবনে আর কোনোদিন নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।"
কথাটা বলেই ইজান এক বিকট, শয়তানি হাসিতে মেতে উঠল। অনন্যা নিজের চোখ জোড়া শক্ত করে বুজে জিজ্ঞেস করল—
—"কী করেছেন আপনি ওর সাথে?"
ইজান অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের আঙুল মটকাতে মটকাতে বলল—
—"বিশেষ কিছু না। ওর ওপর প্রথমে চারটা হকিস্টিক ভেঙেছি, তারপর লোহার রড ইউজ করেছি! সত্যি বলতে, ওকে বাঁচিয়ে রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার ছিল না, পরে ভাবলাম—না, এখনই না, ওকে তিলে তিলে মরতে দেখাটা বেশি আনন্দ দেবে।"
অনন্যা এবার চরম শকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল, অবিশ্বাস্য বিষ্ময়ে বলল—
— "ছিঃ! আপনি এত নিচু! স্রেফ নিজের নোংরা জেদের জন্য আপনি একজন মায়ের কোল খালি করতে চাইলেন?"
ইজান এবার অত্যন্ত কড়া ও হিংস্র গলায় ধমক দিয়ে বলল—
— "অনন্যা! আমার সামনে ভুলেও ওই ইফানের কোনো পক্ষপাতিত্ব করতে আসবি না! তুই ওর জন্য যত বেশি ওকালতি করবি, ওর পরবর্তী শাস্তি কিন্তু এর চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর হবে, এটা মাথায় রাখিস।"
অনন্যা নিজের দাঁতে দাঁত চেপে চোখের জল ফেলে বলল,—
—"আমি আপনাকে কোনোদিনও ক্ষমা করব না, সালার...!"
"তোর ক্ষমার আমার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই! পারলে ক্ষমাটা তুই নিজেকেই দিয়ে দে।"
ইজান অত্যন্ত অহংকারের সাথে জবাব দিল।
অনন্যা এবার নিজের ওড়নার কোণটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রলয়ঙ্করী, বিষাক্ত এবং চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক হাসির রেখা। সে ইজানের অহংকারী ইগোতে সবচেয়ে বড় আঘাতটা হানার জন্য অত্যন্ত ধীর অথচ স্পষ্ট গলায় বলল—
—"আপনি সব সময়ই জানতে চেয়েছিলেন যে আমি আপনাকে কেন ‘ইজান’ না ডেকে কেন ‘সালার’ বলে ডাকতাম?"
ইজান ওপাশ থেকে আচমকা একদম চুপ হয়ে গেল, তার কৌতূহল আর অহংকার মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। অনন্যা এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে, ইজানের পুরুষালী সত্তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে বলল—
—"কারণ—‘ইজান’ আর ‘ইফান’ ২টা নামের উচ্চারণ প্রায় একই রকম ছিল! আর আমি ইফান ভাইকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। আর সেই সবচেয়ে প্রিয় মানুষের পবিত্র নামটা আপনার নামের সাথে মিলত বলে... আমার একদম ভালো লাগত না! তাই জন্যই আমি আপনাকে আজীবন ‘সালার’ ডেকে এসেছি !"
অনন্যার এই একটিমাত্র বিস্ফোরক মন্তব্য ওপাশ থেকে শোনামাত্রই সোয়াত কমান্ডার ইজানের হাতের পানির গ্লাসটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে মচমচ শব্দে ভেঙে একাকার হয়ে গেল, তার চওড়া বুকের স্পন্দন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল! এতবছর ধরে যে নামটাকে সে নিজের একচ্ছত্র অধিকার ভেবে এসেছে, ওটা আসলে অন্য একটা পুরুষের নামের প্রতি অনন্যার তীব্র ভালোবাসার কারণে তৈরি হওয়া এক টুকরো ঘৃণা—এই চরম সত্যটা ইজানের পুরো পুরুষালী অহংকার আর সোয়াতের দাপটকে এক নিমেষে পুড়িয়ে ছাই করে দিল...
~~~~~~~~~~~~~~🥀
অনন্যা নিজের বুকের ভেতরের সমস্ত বিষাক্ত ক্ষোভ ইজানের নামের রহস্যের মাধ্যমে উগরে দিয়ে এক ঝটকায় কলটা কেটে দিল। তার পুরো শরীর তখনো রাগে আর উত্তেজনায় কাঁপছিল।
ওদিকে সোয়াত হেডকোয়ার্টারের রুমে তখন এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। অনন্যার মুখ থেকে ‘ইফানকে ভালোবাসার কারণে ইজান নামটা উচ্চারণ না করার’ সত্যটা শোনামাত্রই ইজানের পুরো পুরুষালী অহংকার এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল। সে রাগে, অপমানে আর এক তীব্র হিংস্রতায় গজগজ করতে করতে নিজের টেবিলের ওপর থাকা সমস্ত অফিশিয়াল ফাইল, ল্যাপটপ আর ওয়াকিটকি এক ঝটকায় মেঝেতে আছড়ে ফেলে দিল! ডেস্কটায় নিজের শক্ত হাত দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল সে। কিন্তু ঠিক সেই চরম উন্মাদনার মাঝে, ইজানের তীক্ষ্ণ চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল! আজ অনন্যার এই চরম অবহেলা আর অন্য পুরুষের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণে তার কি তবে সত্যি কান্না আসতে চাইল?
অনন্যা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে একটু অস্থির পায়ে পেছনের উঠোনের দিকে গেল। সেখানে তখন সনিয়া খালার মেয়ে আসিফা কাপড় মেলছিল। অনন্যা ধীর পায়ে আসিফার কাছে গিয়ে অত্যন্ত নিচু ও কাঁপানো গলায় জিজ্ঞেস করল—
— "আসিফা... তুই হসপিটালের কোনো খবর পেয়েছিস? ইফান ভাইয়ের অবস্থা এখন কেমন?"
আসিফা হাতের কাপড়টা বালতিতে রেখে অত্যন্ত মলিন মুখে বলল—
—"আপা, অবস্থা নাকি অনেক খারাপ! ছোট আম্মা বলছিল যে ডাক্তাররা হতাশ। কে বা কারা নাকি এত বাজেভাবে মেরেছে যে শরীরের অনেকগুলো হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে! পুরো শরীরে অনেক জখম..."
আসিফার কথাগুলো শোনামাত্রই অনন্যা মনে মনে এক তীব্র আতঙ্কে কেঁপে উঠল! সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল—
—সালার হুট করে কেন এমন উগ্রতা করছে? ৫ বছর আগে তো সেও আমাকে ঘৃণা করত, এই বাড়ির বাকিদের মতো সেও আমাকে স্রেফ একটা পাপী আর অপয়া ভাবত। এমন কি বিয়ের রাতেও সে আমাকে কত জঘন্যভাবে অপমান করেছিল, আমার গায়ে হাত তুলেছিল! এই দীর্ঘ ৫ বছর সে তো একটা বারও আমার কোনো খোঁজ নেয়নি, কোনো যোগাযোগ পর্যন্ত রাখেনি! সে নিজেই তো ডিভোর্স চেয়ে রাশিয়ার বুকে নিজের নতুন জীবন সাজিয়েছে। তাহলে এখন হঠাৎ ফিরে এসে আমার ওপর এমন অবাধ্য, হিংস্র অধিকার খাটানোর মানে কী? কেন সে ইফান ভাইকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর অনন্যার সাধারণ মগজে মিলল না। সে নিজের মাথা ঝেড়ে আসিফার দিকে তাকিয়ে বলল—
— "আসিফা, তুই একটু আইনানের কাছে গিয়ে বসবি? ও ঘুমোচ্ছে। সনিয়া খালামনি তো কাজে ব্যস্ত। আমি জাস্ট এক ঘণ্টার জন্য একটু বাইরে বের হব।"
আসিফা সাথে সাথে সায় দিয়ে বলল—
—"হ্যাঁ আপা, আপনি যান। আমি আছি আইনানের কাছে।"
আসিফা ছোট থেকেই অনন্যার এই একাকী লড়াই, সমাজের লাঞ্ছনা আর এই জরাজীর্ণ ঘরের করুণ দশা খুব কাছ থেকে দেখে এসেছে, তাই সে আইনানকে একদম নিজের আপন ভাগ্নের মতো জান দিয়ে আদর করে। অনন্যা আসিফার আশ্বাসে নিজের দরকারি ডকুমেন্টস আর ফাইলগুলো ব্যাগে পুরে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার আজকের একমাত্র গন্তব্য রাফির লয়ার মামার বাড়ি, যার ঠিকানা রাফি গত রাতেই অনন্যাকে টেক্সট করে জানিয়ে দিয়েছিল।
শহরের এক অভিজাত এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ভিআইপি জোনে এসে রিকশা থেকে নামল অনন্যা সামনে তাকাতেই তার চোখ জোড়া বিষ্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল, রাজপ্রাসাদের মতো বিলাসবহুল অট্টালিকা। ইউনির সেই সাধারণ রাফি যে এত বড় ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে বিলং করে, তা অনন্যার ধারণাতেও ছিল না।
সে দেখল, সেই বিশাল লোহার মেইন গেটের সামনে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে রাফি। অনন্যা ধীর পায়ে ওর কাছে গিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে বলল—
— "এই রাফি! এটা... এটা তোর লয়ার মামার বাড়ি?"
রাফি অনন্যার বিষ্মিত মুখটা দেখে নিজের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, মার্জিত মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল—
—"হ্যাঁ অনু। আসলে আমার মামার নিজস্ব কোনো ফ্যামিলি নেই, আর আমি এবং আমার আম্মু মামার সাথেই এই বাড়িতেই থাকি।"
অনন্যা আর কোনো কথা বাড়াল না, কারণ এই মুহূর্তে তার নিজের মুক্তি পাওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সে রাফির পাশে পাশে অত্যন্ত ধীর পায়ে সেই বিশাল অট্টালিকার ভেতরে প্রবেশ করল।
অনন্যা রাফির সাথে ভেতরের ড্রয়িংরুমের দিকে এগোতে এগোতে চারপাশের আভিজাত্য দেখে মনে মনে বেশ অবাক হচ্ছিল। রাফি যে এত সুবিশাল আর প্রভাবশালী ফ্যামিলির ছেলে, তা সে কখনোই প্রকাশ করতে দেয়নি। রাফি মূলত অনন্যার কলেজের বন্ধু, আর এখন তারা একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। ওদের প্রথম আলাপ হয়েছিল এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে, কোচিংয়ে। এরপর ওরাই একই নামী কলেজে ভর্তি হয়। কলেজ লাইফেই রাফি একদিন অনন্যাকে জানিয়েছিল যে সে আসলে অনন্যার সাথেই একই স্কুল থেকে প্রাইমারি পাস করেছে, এমনকি হাই স্কুলেও তারা একসাথেই পড়ত! কিন্তু অনন্যা তখন নিজের জেদ আর পড়াশোনা নিয়ে এতটাই মগ্ন থাকত যে পেছনের বেঞ্চের এই শান্ত ছেলেটাকে ওভাবে কোনোদিন নোটিশই করেনি। অনন্যা শুধু এইটুকুই জানত, রাফির একটা ছোট ভাই আছে আর ওর বাবা নেই। উনিও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি বেশ কয়েক বছর আগে ডিউটিরত অবস্থায় মারা যান।
করিডোর পেরিয়ে ওরা যখন মেইন ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল, তখন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রাফির মা—রিক্তা শহীদ। উনার পরনে অত্যন্ত মার্জিত সিল্কের শাড়ি, চোখে-মুখে এক মায়াবী আভিজাত্যের ছাপ। তিনি অনন্যাকে দেখামাত্রই দুহাত বাড়িয়ে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে বললেন—
— "কেমন আছ মা? রাফির মুখে তোমার কথা কত শুনেছি! তা... তোমার ছেলেকে সাথে আনোনি কেন?"
অনন্যা রিকতার এই উষ্ণ অভ্যর্থনায় কিছুটা থতমত খেয়ে মুচকি হেসে বলল—
—"আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, আন্টি। আসলে আইনান মাত্রই ঘুমালো।
রিক্তা শহীদ অনন্যার ফর্সা মুখটার দিকে পলকহীন চেয়ে থেকে প্রশংসার সুরে বললেন—
—"বাহ্, মাশাআল্লাহ! তুমি তো দেখতে সত্যিই বেশ সুন্দরী মা, রাফির বর্ণনার চেয়েও অনেক বেশি রূপসী!"
রিক্তার মুখে 'রাফির বর্ণনা' শব্দটা শোনামাত্রই অনন্যা কিছুটা অবাক হয়ে রাফির দিকে তাকাল। রাফি তখন অস্বস্তিতে নিজের চোখ জোড়া অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ফাইল গোছানোর ভান করতে লাগল। রিক্তা শহীদ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনন্যার হাত দুটো চেপে ধরে অত্যন্ত ক্ষোভের গলায় বললেন—
—"তোমার লাইফ সম্পর্কে, তোমার পেছনের ওই কঠিন অতীত নিয়ে আমি সব জানি মা। ওই ইজানকে আল্লাহ কোনোদিন মাফ করবে না, ও নিজের এই পাশবিকতার শাস্তি ঠিকই পাবে!"
অনন্যা হুট করে নিজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে তাকাল। রাফির মায়ের মুখ থেকে ইজানের প্রতি এই তীব্র ক্ষোভের ভাষা, কেন জানি অনন্যার মোটেও ভালো লাগল না। অনন্যাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রিক্তা শহীদ আবার বলে উঠলেন—
—"আসলে ওই ইজানটা একদমই তার মায়ের মতো হয়েছে... সেই একই রকম জেদ আর..."
—"আম্মু!"
রিক্তা শহীদ উনার বাক্যটা শেষ করার ঠিক এক সেকেন্ড আগে রাফি অত্যন্ত কড়া ও শক্ত গলায় নিজের মাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল! সে অনন্যার হাতটা আলতো করে ধরে বলল—
—"অনু, চল... মামা ভেতরে ফাইল নিয়ে ওয়েট করছেন। আগে কেসের কথাটা শেষ করি, বাকি গল্প পরে হবে।"
বলেই সে এক প্রকার টেনে অনন্যাকে ভেতরের স্টাডি রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
তবে অনন্যাকে নিয়ে দরজার ওপারে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, রাফি এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে নিজের মায়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। আর রিক্তা শহীদও রাফির চোখের ভাষা বুঝতে পেরে অনন্যার অলক্ষ্যে অত্যন্ত রহস্যময় কিছু একটা ইশারা করলেন, যা দেখে মনে হলো মা-ছেলের মাঝে কোনো এক গোপন সত্যের খেলা চলছে !
অনন্যা রাফির মায়ের সেই চোখের ইশারা দেখতে না পেলেও, তার পুরো মগজ জুড়ে এক তীব্র বিষ্ময় আর খটকা তৈরি হলো। রাফির মা ইজানের মাকে নিয়ে ওভাবে কথা বলছিলেন কেন? আর উনি কীভাবে জানলেন যে ইজান একদম তার মায়ের মতো হয়েছে? ইজানের মা তো অনন্যা আর ইজানের সেই অভিশপ্ত বিয়েরও বহু বছর আগে ইজানের বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে চিরতরে রাশিয়ায় ব্যাক করেছিলেন!
অনন্যা রাফির মামার স্টাডি রুমে প্রবেশ করে অত্যন্ত নম্রভাবে সালাম দিল। রাফির মামা আহমেদ সাহেব অনন্যাকে দেখামাত্রই হাসিমুখে সালামের উত্তর নিলেন এবং অত্যন্ত মার্জিত গলায় বললেন—
—"বসো মা। রাফির মুখে তোমার সংগ্রামের কথা অনেক শুনেছি। সত্যিই তুমি একজন অত্যন্ত সাহসী মেয়ে।"
অনন্যা চেয়ারে বসে নিজের ব্যাগ থেকে দরকারি পেপারসগুলো বের করতে করতে বলল—
—"ধন্যবাদ মামা। আসলে আমি আমার এই বৈবাহিক সম্পর্কটা থেকে আইনি মুক্তি চাই। ডিভোর্সের প্রসেসটা..."
অনন্যার কথা শেষ হওয়ার আগেই আহমেদ সাহেব ড্রয়ার থেকে একটি সুসজ্জিত আইনি ফাইল বের করে অনন্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন—
—"তোমাকে নতুন করে আর কিছু করতে হবে না মা। রাফি অলরেডি তোমার কেসের সমস্ত ডিটেইলস আমাকে দিয়ে পেপারস রেডি করে রেখেছে। তুমি জাস্ট একবার রিড করে সাইন করে দাও।"
অনন্যা তীব্র বিষ্ময় নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাফির দিকে তাকাল। রাফি ওর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে এক চিলতে শান্ত হাসি দিয়ে বলল—
—"তুই যেদিন ভার্সিটিতে কমান্ডার সালার মুনতাহির কথা বললি, আমি তো সেদিনই মামার সাথে কথা বলে এই ড্রাফটটা রেডি করিয়ে রেখেছিলাম, অনু। যাতে সময় নষ্ট না হয়।"
রাফির এই অতি-তৎপরতা আর আগে থেকেই সবকিছু গুছিয়ে রাখার বিষয়টা অনন্যার কাছে কেমন যেন একটু লাগল। একজন বন্ধু হিসেবে রাফি কি একটু বেশিই অ্যাডভান্সড ভাবছে?
তবে সে আর গভীর কিছু ভাবল না। কারণ রাফি আর নেহা তার বিপদের দিনের বেস্ট ফ্রেন্ড, তারা যে নিঁখাদ ভালোবেসে অনন্যার ভালোই চাইবে—তা নিয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।
অনন্যা আহমেদ সাহেবের দিকে ফিরে ইজানের ক্ষমতার গভীরতা বোঝানোর জন্য বিস্তারিত বলতে শুরু করল—
— "মামা, কেসটা কিন্তু অতটা সহজ হবে না। সালার অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে বিলং করে। ওর বাবা সেনাবাহিনীর একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন এবং ইজান নিজে একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ছিল। পরে সে রাশিয়ায় গিয়ে ওখানকার স্পেশাল ফোর্সে পুলিশের এলিট সোয়াত (SWAT) জয়েন করে এবং মাত্র এক মাস হলো বাংলাদেশে ফিরে সে পুলিশের ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডারের দায়িত্বে আছে। ওর ক্ষমতা আর হিংস্রতা দুটোই মারাত্মক।"
অনন্যা পাওয়ারফুল প্রোফাইলের বিবরণ দিলেও, আহমেদ সাহেব কিংবা রাফির মুখে কোনো রেখাই ফুটল না। যেন ইজানের এই সাতকাহন তাদের কাছে বহু পুরোনো কোনো খাতার পাতা! তবে অনন্যা নিজের আইনি জটিলতার চিন্তায় মগ্ন থাকায় মা-ছেলের আর মামার এই রহস্যময় নীরবতার গভীরতা বিন্দুমাত্র টের পেল না। সব শেষে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
— "আমি কোনো বড় ঝামেলা বা আইনি যুদ্ধ চাই না। শুধু ডিভোর্সটা যেন ভালোয় ভালোয় কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ছাড়া হয়ে যায়, ব্যস।"
আহমেদ সাহেব ফাইলে একটা শেষ চোখ বুলিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ও রহস্যময় গলায় বললেন—
—"মা, তুমি একদম চিন্তা করো না। আজ রাতেই সোয়াত কমান্ডার ইজানের সরকারি ভিলায় এই অফিশিয়াল ডিভোর্সের নোটিশ আর ফাইলটা পৌঁছে যাবে। ও যদি পেপারে সাইন করতে রাজি না হয়, তবে আমাদের তো আইনি পথ খোলাই আছে। আমি আমার সর্বোচ্চ পলিটিক্যাল আর জুডিশিয়াল নেটওয়ার্ক ইউজ করব ওকে কোর্টে টেনে হিড়হিড় করে নামানোর জন্য।"
ইজানকে কোর্টে টেনে নামানোর এই উগ্র ভাষা শুনে অনন্যা হুট করেই তীব্র অস্বস্তি আর ভেতর থেকে একটা অজানা টান অনুভব করল। সে হাত দুটো মুচড়ে কিছুটা আমতা-আমতা করে বলল—
— "না... না মামা! এত বড় কিছু করার বা কোনো নেটওয়ার্ক ইউজ করার কোনো প্রয়োজন নেই। সালার আমার জীবনে যতই অনাকাঙ্ক্ষিত হোক না কেন, উনি কোনো ক্ষতি বা অপমানের মুখোমুখি হোন তা আমি মন থেকে চাই না। দিনশেষে... উনি আমার ছেলের বাবা। তাছাড়া বিডিতে উনার পাশে দাঁড়ানোর মতো আপন বলতে কেউই নেই।"
অনন্যার অত্যাচারী স্বামীর প্রতি এই গোপন দুর্বলতা আর মায়া রাফির যেন এক ফোঁটাও ভালো লাগল না ! তার ফর্সা চোয়ালটা মুহূর্তের মধ্যে ক্ষোভে শক্ত হয়ে উঠল। সে অনন্যাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ কড়া গলায় বলল—
—"অনু, তুই বড্ড বেশি চিন্তা করিস! তার জন্য এত দয়া দেখানোর কিচ্ছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে, এখন চল। আম্মু ডাইনিং টেবিলে খাবার বেড়ে আমাদের জন্য ওয়েট করছেন।"
ওরা স্টাডি রুম থেকে বের হতেই দেখা গেল রিক্তা শহীদ হাসিমুখে ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছেন। অনন্যা আর নিজের ঘরের পরিবেশের কথা ভেবে খাবার টেবিলে বসতে চাইল না। সে বিনীতভাবে বলল—
— "আজ আর না আন্টি। আসিফা ঘরে আইনানকে নিয়ে একা আছে, আমাকে দ্রুত ফিরতে হবে। অন্য কোনোদিন এসে খেয়ে যাব।"
কিন্তু রাফি নাছোড়বান্দার মতো জোর করতে লাগল
— "আরে বোকা, একটু খেয়ে যা। আম্মু কত কষ্ট করে রান্না করল!"
অনন্যা তাও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রইল। সে সবাইকে বিদায় জানিয়ে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করেই সেই সুবিশাল অট্টালিকা থেকে বেরিয়ে এল।
~~~~~~~~~~~~~~🥀
ঘণ্টাখানেক পর অনন্যা নিজের পেছনের সেই ছোট স্যাঁতসেঁতে ঘরে ফিরে এল । দরজা ঠেলে ঢুকতেই সে দেখল আইনান আসিফার সাথে বিছানায় উপুড় হয়ে খেলনা গাড়ি নিয়ে আপনমনে হাসিমুখে খেলছে। আসিফাকে ঘরে দেখে অনন্যার বুকের ভেতরের সবটুকু মেঘ কেটে গেল। সে ব্যাগ থেকে কিছু শপিং মলের দামী চকোলেট বের করে আসিফা আর আইনানের হাতে দিল।
আসিফা চকোলেট পেয়ে খুশি হয়ে বলল—
— "ধন্যবাদ অনু আপা। আইনান কিন্তু খুব লক্ষ্মী ছেলের মতো খেলেছে, একটুও কান্নাকাটি করেনি।"
অনন্যা আসিফাকে বিদায় দিয়ে বিছানায় বসা আইনানের সেই মায়াবী মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। আইনানের ওই সরু নাক, ঘন পাপড়ি আর কুচকুচে কালো ভ্রু জোড়া দেখতে দেখতে অনন্যার মনটা হুট করেই এক অজানা বিষাদে ভারী হয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—
—‘আজ না হয় আমি সালারের থেকে বাঁচার জন্য ডিভোর্স ফাইল করছি। কিন্তু একদিন... একদিন তো এই নিষ্পাপ ছেলেটা বড় হবে। তখন তো ওকে ওর বাবার কথা বলতে হবে। আইনান তো আর ওর বাবাকে ঘৃণা করতে পারবে না, সেও হয়তো বাকি সন্তানদের মতো তার ক্ষমতাধর বাবাকে খুব ভালোবাসবে।’
অনন্যার ঠোঁটের কোণে এক তপ্ত, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ইজান তার জীবনের সবচেয়ে বড় কালবৈশাখী আর অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঝড় হলেও, সে যে তার এই ফুটফুটে সন্তানের বাবা, তার নিজের ভাঙা জীবনের একটা জলজ্যান্ত অংশ—এই পরম সত্যকে সে কোনো আইনি কাগজ দিয়ে মুছে ফেলতে পারবে না! যদিও সে খুব ভালো করেই জানে, ইজানের জীবনে আজ অন্য কেউ আছে। আর ভবিষ্যতের কোনো এক নতুন ভোরে সে হয়তো রাহির গর্ভে আসা কোনো সন্তানের নতুন বাবাও হবে...!
এই শেষ চিন্তাটা অনন্যার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত, তীব্র কষ্টের ছাই উসকে দিল, যা সে নিজেও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারল না...
রাত তখন প্রায় আটটা।
ঘরের টিমটিমে টেবিল ল্যাম্পের আলোর নিচে বসে অনন্যা প্রতিটা সেকেন্ড এক তীব্র, দমবন্ধ করা যন্ত্রণার মাঝে পার করছিল হসপিটাল থেকে ইফানের কোনো নতুন খবর এখনো আসেনি, তার বাবা-চাচা এবং পরিবারের সবাই এখনো মিলিটারি হসপিটালের আইসিইউ-র বাইরে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন।
ঠিক তখনই অনন্যার ভাঙা স্ক্রিনের ফোনটা কেঁপে উঠল। রাফির কল। অনন্যা রিসিভ করতেই রাফি ওপাশ থেকে অত্যন্ত নিচু ও সতর্ক গলায় বলল,—
—"অনু... মামার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে এইমাত্র ডিভোর্স ফাইল আর অফিশিয়াল নোটিশটা দিয়ে কমান্ডারের ভিলায় পাঠানো হয়েছে।"
অনন্যা এক বুক ভারী শ্বাস ফেলে স্রেফ ছোট করে বলল—
—"আচ্ছা।"
বলেই সে কলটা কেটে দিল। সে খাটের এক কোণে বসা আসিফার কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকা আইনানের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকাল। তার পুরো মগজ জুড়ে তখন একটাই চিন্তা অনবরত হাতুড়ি পিটছিল—
—ডিভোর্স নোটিশটা হাতে পাওয়ার পর ওই হিংস্র লোকটা এবার ঠিক কী করতে চলেছে?
ওদিকে ঠিক একই সময়ে
সোয়াত কমান্ডার সালার মুনতাহির ইজান তার সেই সুবিশাল, কাস্টম-মেড অফিশিয়াল ভিলার মাটির নিচের এক অন্ধকার, সাউন্ডপ্রুফ বেসমেন্টে বসে ছিল। ঘরের চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু এক কোণে রাখা দামী স্পিকার থেকে ইফানকে লোহার রড আর হকিস্টিক দিয়ে পেটানোর সময় তার আর্তনাদ আর হাড় ভাঙার মচমচ শব্দগুলো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো অনবরত বাজছে! ইজান অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিয়ে বসে তার একহাতে একটি খাঁটি রাশিয়ান মদের গ্লাস ধরে হালকা চুমুক দিচ্ছিল।
তার ঠিক সামনের বিশাল দেয়ালে একটি আধুনিক প্রোজেক্টরের আলো আছড়ে পড়ছিল। সেখানে কোনো ক্রাইম সিনের ছবি ছিল না, ছিল আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগের তাদের সেই অভিশপ্ত বিয়ের প্রথম রাতের ছোট একটা ভিডিও ক্লিপ, যা লুপে বার বার প্লে হচ্ছিল! পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়ে রাশিয়া যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, ইজান অনন্যার এক্সট্রা নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ফারমহাউসের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ নিজের হাতে রিমুভ ?