অচেনা মুখ
মাহভীরের কথায় মেহা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
লেকের পানিতে তখনও রাইসা হাবুডুবু খাচ্ছে।
মেহার চোখে পানি চলে এসেছে। আশপাশের মানুষজন শুধু তাকিয়ে আছে। কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করছে, কেউ আবার মুখে দুঃখের ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সাহায্য করার জন্য কেউ পানিতে নামছে না।
মেহা শেষবারের মতো লেকের দিকে তাকাল।a
রাইসাকে আর ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।
হতাশ হয়ে সে ঘুরে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই—
— দাঁড়ান।
মাহভীরের গম্ভীর কণ্ঠে মেহা থেমে গেল।
সে ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল।
মাহভীরের দৃষ্টি তখন লেকের পানির দিকে স্থির।
কেন যেন কয়েক সেকেন্ড আগে দেখা মেয়েটার মুখটা তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে।
চেনা।
অদ্ভুত রকম চেনা।
কিন্তু কোথায় দেখেছে?
মনে করতে পারছে না।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেল।
মাহভীরের চোখ সরল না পানির ওপর থেকে।
— মেয়েটা কোথায়?
মেহা দ্রুত লেকের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
— ওইখানে... আর দেখা যাচ্ছে না ঠিকমতো।
মাহভীর আর কোনো কথা বলল না।
পরনের ঘড়িটা খুলে সাকিনের হাতে দিয়ে দিল।
সাকিন অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
— মাহির, তুই—
কথা শেষ করার আগেই মাহভীর লেকের পানিতে ঝাঁপ দিল।
চারপাশের মানুষজনের মধ্যে হঠাৎ হৈচৈ পড়ে গেল।
কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কেউ মোবাইলের ক্যামেরা আরও সামনে ধরল।
— দেখ, লোকটা পানিতে নামছে!
— ভিডিও কর! ভিডিও কর!
— আহারে, মেয়েটা তো ডুবে যাচ্ছে!
— কেউ আগে নামল না কেন?
কেউ দুঃখ প্রকাশ করছিল, কেউ আবার পুরো ঘটনাটাকে মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দী করতে ব্যস্ত।
সাকিন বিরক্ত হয়ে চারপাশের লোকজনের দিকে তাকাল।
— ভিডিও বন্ধ করেন! মানুষটা বিপদে আছে!
কিন্তু ততক্ষণে মাহভীর অনেকটা এগিয়ে গেছে।
পানির নিচে হাত বাড়িয়ে অবশেষে সে রাইসার হাতটা ধরে ফেলল।
মাহভীর তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
রাইসার শরীর তখন নিস্তেজ হয়ে আসছে।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
মাহভীর এক হাতে তাকে শক্ত করে আগলে ধরে অন্য হাতে পানির ওপর ভেসে থাকার চেষ্টা করল।
তার চোখ আবার একবার রাইসার মুখের দিকে গেল।
ভেজা চুল মুখের সঙ্গে লেপ্টে আছে।
চোখ বন্ধ।
মুখটা অস্বাভাবিক শান্ত।
মাহভীরের বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা হলো।
কেন এত চেনা লাগছে মেয়েটাকে?
কেন?
কোনো উত্তর পেল না সে।
মাহভীর আর দেরি না করে রাইসাকে নিয়ে তীরে ফিরে আসতে লাগল।
ততক্ষণে সাকিন, সাজ্জাদ আর রহিমও ছুটে এসেছে।
মাহভীর তীরে উঠে রাইসাকে নিজের হাতের ওপর সামলে নিল।
মেহা দৌড়ে এসে রাইসার পাশে বসে পড়ল।
— রাইসা! রাইসা, চোখ খোল!
কোনো সাড়া নেই।
মাহভীর নিচে তাকাল।
মেয়েটা সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে মাহভীর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
— চোখ খোলো...
কিন্তু রাইসা শুনল না।
সে তখন সম্পূর্ণ অচেতন।
আর মাহভীর?
সে শুধু তাকিয়ে রইল সেই অচেনা মুখটার দিকে।
অদ্ভুতভাবে পরিচিত এক মুখ।
যার পরিচয় সে এখনও জানে না।