ফন্ট সাইজ:
থিম:
সাঁঝের মায়া

১৮তম পর্ব

লেখক: দুর এ দিলশাদ দুআ

#সাঁঝের_মায়া

#পর্ব_১৮

#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা

[🚫কপি করা নিষেধ।সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়ষ্কদের জন্য উন্মুক্ত ]

আজ আবহাওয়া বেশ মেঘলা। দমকা বাতাস বইছে অনবরত।গতকাল রাত থেকেই এই অবস্থা।তবে বাড়ির বাইরে কোনো আয়োজন না থাকায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ঘরোয়া আয়োজন সব শুরু হয়ে গেছে সেই সাজসকাল থেকেই।বাড়ির ভিতরে ছেলেমেয়েরা মিলে টুকটাক সাজিয়ে গুছিয়ে ফেলেছে।গোল্ডেন ফেইরি লাইটের আলোয় ঝলমল করছে বাড়ির ভিতরটা।সিঁড়িসহ, বাড়ির এ কোন, ও কোন বিভিন্ন ধরনের সতেজ ফুল দিয়ে মোড়ানো।

রাইসুল সাহেবের দুই চাচাতো ভাই তাদের পরিবার সহ এসে পরেছেন।তার গ্রামের দু চারজন বন্ধুও,ও মুরুব্বিরা আসার কথা।নিয়াজ,সাজিদ,অনিমা,নাইম আর রিতু চলে এসেছে সকাল সকাল।বাড়ির গিন্নিরা ব্যাস্ত রান্নাঘরে।কর্তারা সবাই বসে আড্ডায় বসা।

শুক্রবারের দিন।যোহরের নামাজ পরে কাজি সাহেব চলে আসবেন।বিয়ে পড়ানো হবে যোহরের পরপরই।

ইশান ঘরের মধ্যে কাগজপত্র মেলে বসে আছে।তাদের অফিসের বেশ কিছু হিসেবের গড়মিল। সেগুলো দেখছে মনোযোগ সহকারে।এরই মধ্যে দরজায় বেশ কয়েকবার কড়া নাড়ার শব্দ এসেছে তার কানে। সে অবশ্য সেসব আমলে নেয়নি,আর না তো দরজা খুলেছে।ব্যাস্ত বলে কাটিয়ে দিয়েছে।এবার অবশ্য সেই ধার কেউ ধারছে না।ক্রমাগত দরজায় আওয়াজ হচ্ছে।

একপ্রকার বিরক্ত হয়েই দরজা খুললো সে।তার বিচ্ছু বন্ধু গুলো সবকটা দাড়িয়ে। তার খানিকটা পিছনে নিশি,নূরি,রিশা,রোশনি আর রাফিও দাড়িয়ে। সবকটা কে এমন হাট হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বেজাই চটলো ইশান।

বাজখাই কন্ঠে ধমকে উঠলো,”বললাম তো একটু ব্যাস্ত আছি।তোদের সবারই এখনই ডাকাডাকি করতে হবে?”

দরজা খোলা পেয়েছে।এই সুযোগ আর কেউ ছাড়ে!ভাইবোন গুলো সাহস না পেলেও তার অসভ্য বন্ধুগুলোর মধ্যে সে বালাই নেই।নিয়াজ,অনিমা একপ্রকার ঠেলেঠুলে ভিতরে ঢুকে পড়লো।ইশারা করলো বাকিদের ও ভিতরে ঢোকার।একেএকে সবকটা ঠেলেঠুলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পরলো।সবার পিছনে বড় বড় ফুলের ডালা নিয়ে চারজন লোককে ঢুকতে দেখা গেলো।ইশান কপাল কুচকে বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত ভাজ করে তাকালো ঘরের ভিতরে ঢোকা সব কটাকে।

নিশি, নূরি খানিকটা কাচুমাচু হয়ে অনিমাদের পিছন পিছন দাড়িয়ে আছে ভাইয়ের ভয়ে।সাজি আর নাইম গম্ভীর মুখ লোকগুলোকে বুঝিয়ে দিতে শুরু করলো কিভাবে কি সাজাতে হবে।

“কি শুরু করলি এসব।কাজ করছিলাম তো।”

ইশান এর কথায় সবার চোখ গেলো বিছানার ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলোয়।সাজিদ ইশারা করতেই দ্রুত হাতে সেগুলো গুছিয়ে ফেললো অণিমা।ইশানের হাতে গুজে দিলো সেগুলো।

“তালা মেরে রাখ ড্রয়ারে। আজকে কোনো কাজ নেই তোর।”

“এগুলো কি হচ্ছে জানতে পারি?”

নিয়াজ অবাক হওয়ার মতো মুখ বানালো।ইশানের সামনে চলে এলো।

“আমিও অবিবাহিত। এখানে বেশিরভাগি অবিবাহিত। তাই বলে বিয়ের দিন ছেলের ঘর কেনো সাজায় এটা তো আমাদের কাউকে মাইকিং করে কেউ জানায়নি।তাও আমরা জানি।আর তুই জানিস না?কোন জগতের বাসিন্দা তুই?”

ইশান বিরক্ত হয়।সবাই খুব ভালো করে জানে এ বিয়ে টা সে করতে চায়না।আর না তো ওই মেয়ে টাকে সে মানে বা মানতে পারবে।দিদার কথায় বিয়েটা করতে হচ্ছে। তার মধ্যে এসব বিরক্তিকর আচরণ এর মানে হয় কোনো।

“আমার রুমে এসব কিছু হবে না।আউট।”

কারোর মধ্যে ভাবান্তর দেখতে পাওয়া গেলো না।মাঝখান থেকে সবাই একপ্রকার তেড়ে আসলো ইশানের দিকে।অণিমা কোমড়ে হাত রেখে হুমকি গলায় বললে,”তুই বললেই হবে?বাসর ঘর আমরা সাজাবো।নিচে পারমিশন নিয়েই এসেছি।”

ইশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।এসব পাগলদের বোঝানো তার সাধ্যের বাইরে।

“এখন নাটক করছিস।পুতুলের মতো বউকে যখন লাল বেনারসি তে রেখে যাবো না এই ফুলের মধ্যে। দেখে হার্ট হাতে করে থ মেরে বসে থাকবি তখন।ফুল কোনটা খুজেই পাবিনা।তারপর দেখবো ব্যাটা তোর কনট্রোল কোথায় থাকে।তখন বলিস বাসর করবো না।”

নাইম এর কথায় অট্টহাসিতে ফেটে পরলো পুরো রুমের সবাই।ইশান ধমক দেবে তার সুযোগও পায়না।এতো হৈ চৈ শুরু করেছে এরা রুমের ভিতর।নেহাৎ দিদার জন্য এসব করতে হচ্ছে, আর এরা এসব দিদার পারমিশন নিয়ে এসে করছে না হলে কোনো কিছুর ধার ধারতো নাকি সে!ঘাড় ধরে বের করে দিতো একেকটাকে।টুং টাং শব্দ করে ফোনে মেসেজ আসতেই চোখ কুচকে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।টেবিল থেকে ম্যানিব্যাগ আর বাইকের চাবি টা হাতে নিয়ে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।

“কোথায় যাচ্ছিস এসময়।”

নিয়াজ পিছন থেকে ডেকে উঠলো।ইশান থামলো না।ভাড়ি গলায় শুধু বললো,

"কাজে। “

আর কিছু কাউকে বলার সময় না দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে।ইশানের যাওয়ায় সবাই একপ্রকার খুশিই হলো।আর খ্যাচখ্যাচ করবে না।এখানে থাকলে বকাঝকা করে মাথা খেয়ে ফেলতো।তার থেকে ভালো যেখানে যাচ্ছে যাক।তারা নিশ্চিন্তে সাজিয়ে ফেলতে পারবে।

আজকেও নিজের ঘর থেকে বেড়িয়ে নিজের অজান্তেই চোখ গেলো পাশের ঘরের হাট করে খোলা দরজার দিকে।স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে যাওয়ার সময় তাকালেও এবার থমকে গেলো পা দুটো।তিতির বসে আছে বিছানার কিনারায়।গায়ে কাঁচা হলুদ কালার একটা শাড়ি।দু হাত দু দিকে ছড়িয়ে রাখা দু টো বালিশের ওপর,হাতে মেহেদী দিয়েছে কিনা।দুটো পা ও তাই।লম্বা করে সামনে একটি টুলের ওপর রাখা।পায়েও অল্প করে মেহেদী পরা।শাড়িতে না লাগার ব্যাবস্থা করতে গিয়ে শাড়িটা বেশ খানিকটা পায়ের ওপরের দিকে তোলা।ফলসরূপ ধবধবে ফর্শা পা দুটোের বেশিরভাগ অংশই দৃশ্যমান।বাইরের দমকা বাতাসে খোলা চুলগুলো আছড়ে পরছে বারবার মুখের ওপর।বিরক্ত ভঙ্গিতে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সরাতে চাচ্ছে সেগুলো।ইশান খেয়াল করলো তার বুকের বা পাশটায় চিনচিন করছে।দ্রুত চলছে অনেকটা।এ মেয়েকে শাড়িতে দেখলেই এমন হয় কেনো বুঝতে পারে না সে।ঘরে এখন তিতির ছাড়া কেউ নেই বুঝতে পারলো সে।ধীর পায়ে শব্দহীন ঢুকলো ঘরের মধ্যে।

তিতির অনেকটাই উল্টো হয়ে আছে।খোলা চুলের কারণে হুট করে ঘরে কেউ ঢুকলে চোখে পরার সম্ভাবনা কম।ইশান কাছাকাছি যেতেই কারোর অস্তিত্ব টের পেলো বোধহয় সে।

“তমা, ভাই চুলগুলো বেধে দে প্লিজ।আর পিঠটা চুলকে দে তো।জলদি।”

ইশান থ মেরে দাড়িয়ে থাকে।কাঁপা হাত এগোয় তিতির এর দিকে।চুলগুলো আলতো হাতে ধরতেই খসখসে হাতের ছোয়া লাগে তার ঘাড়ে।সিওরে ওঠে সে।এটা তো তমার হাত নয়।চমকে পিছনে ফেরার জন্য নড়েচড়ে ওঠে।তবে ঘুরতে পারে না।ইশান দু বাহু চেপে ধরে ধমকে ওঠে,”সোজা থাক।”

তিতির হতবিহ্বল হয়।”ইশান ভাই?”

ইশান কিছু বলে না।বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে ক্লেচার দিয়ে অপটু হাতে চুলগুলো কোনোমতে পেচায়।চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় উন্মুক্ত ফর্শা পিঠ।ব্লাউজের গলা বেশ বড় পিছন দিকে।পিঠের বেশিরভাগই দেখা যাচ্ছে।হুট করেই ইশানে খেয়াল করে তার গলাখানা অস্বাভাবিক শুকিয়ে এসেছে।

তিতির মিনমিন করে বলে,”হয়েছে।আর লাগবে না কিছু।”

ইশান চোখ সরায় না উন্মুক্ত পিঠ থেকে।চোখের সামনে পিঠের বা পাশে জলজল করছে একটা কালো কুচকুচে তিল।সেদিক তাকিয় ঢোক গেলে ইশান।নিজের অজান্তেই হাতের চার আঙ্গুলের উল্টো পিঠ ছোয়ায় সেখানটায়।

তিতির তখন আশ্চর্যতার চূড়ান্তে।ইশানের এহেন ছোঁয়ায় শরীর অবশ হয়ে আডে তার।উঠে সরার অবস্থাও নেই।মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে সে।

“ইশান ভাই..”

তিতির এর গলার আওয়াজে ইশান এর হুশ ফেরে সরে আসে সেখান থেকে।দাড়ায় না আর এক সেকেন্ড সেখানে। তিতির পাশ ফিরে ইশানের প্রস্থান দেখে।শরীর এখনো কেঁপে যাচ্ছে।এমন অনূভুতির কারণ কি?সম্পর্ক বৈধতা পাবে তাই বুঝি?হবে হয়তো।

____

শার্টের বোতাম ঠিকঠাক করে নিচে নামতেই পরিবার এর সবার সামনে পরলো ইশান।বাবা, চাচা এবং তাদের বন্ধুরা বেশ কয় জন সোফায় বসে গল্প করছেন।

তাকে এভাবে ফিটফাট হয়ে হন্তদন্ত হয়ে নামতে দেখে রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে এলেন রাহেলা দেওয়ান।

“হ্যা রে বাপ।এ সময় কোথায় যাচ্ছিস?”

ইশান মায়ের দিকে ফেরে।রাইসুল দেওয়ান সহ সবাই ঘুরে তাকিয়ে আছে ইশানের দিকে।

“,একটু আরজেন্ট দরকার এ মা।বেড়োতে হবে।”

সবার কপালে ভাজ পরে।রাহেলা কিছু ছেলেকে বলার আগেই শোনা যায় রাইসুল দেওয়ান গমগমে

কন্ঠ।

“এ সময় বাইরে বেরোচ্ছো মানে!বেলা দশটা বাজে।নামাজের পর কাজি সাহেব চলে আসবে।এখন কোথাও যাওয়া চলবে না।”

ইশান পিতার দিকে তাকালো না।পিতার পু্ত্রের মান অভিমান কমেনি এখনো।মায়ের দিকে ফিরলো

“মাা খুব দরকার।না গেলেই নয়।”

“রাহেলা,তোমার ছেলেকে বলে দাও এখন না বের হতে।শুভ অশুভ এর একটা ব্যাপার আছে তো নাকি।”

ইশান চুপ করে রইলো।রাহেলা দেওয়ান ছেলের হাত টেনে ধরলেন।

“সত্যিই তো। তোর বাপ ঠিকই বলছেন।এখন না বের হলে…

“

“মা বলছি তো সময় মতো চলে আসবো আমি।এখন আটকিয়ো না।”

ইশান দাড়ায় না।রাইসুল দেওয়ান এর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ব্যাস্ততার ভঙ্গিতে বেড়িয়ে যায় বাড়ি থেকে।রাইসুল দেওয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে তাকিয়ে থাকেন সেদিকে।সবাই তাকে বোঝাতে ব্যাস্ত ছেলে যখন বললো নিশ্চয়ই ঠিক সময়েই ফিরবে এতো রাগারাগির কাজ নেই।

___

তিতিরকে ফেসিয়াল করাচ্ছে তমা।সকাল থেকে একটার পর একটা নিয়ে ঝামেলা করেই যাচ্ছে এই তমা টা।তিতির এখন বিরক্ত। তার এসবে অভ্যাস কম।বিয়ে বলেই এতএত ঝামেলা ঝক্কি করার মানে হয়।কে শোনে কার কথা।এতক্ষণ তো নিশি,নূরিও এসে জুটেছিলো।এখন কিছুক্ষণ হলো সে দুজন তাও কোথাও একটা গিয়েছে।

তমা তিতিরের পায়ের মেহেদী তুলে ডলাডলি করে গরম পানিতে পা ভিজিয়ে অপেক্ষা করছে। তিতির রাগি গলায় ধমকে ওঠে,”আর কি কি ঝামেলা করবি তুই বলবি?না কোনো আয়োজন না কিচ্ছু।তুই এগুলো নিয়ে পরেছিস কেনো বলতো।”

তমা মুখ ভেঙায়।গম্ভীর মুখে জবাব দেয়।

“সে অনুষ্ঠান হোক আর না হোক বিয়ে তো বিয়েই।সাজাবো তোকে একটু পর থেকে।মেকাপ বসা লাগবে না ঠিকমতো?তাছাড়া অনুষ্ঠান না হলেও বাসর টা তো হবে নাকি?”

বলেই চোখ টিপলো তিতির এর দিকে।তিতির এর মুখ হঠাৎই লাল হয়ে গেলো।সত্যিই তো।আজ থেকে ওই মানুষ টার সাথে একঘরে বাকিটা জীবন কাটাতে হবে।মনে পরে গেলো গতরাতে ইশানের বলা সেই কথাগুলো,একটু আগে ওই ঠান্ডা হাতের স্পর্শ ।হাত পা কেঁপে উঠলো তার।

“কিরে ব্লাশ করছিস কেনো।”

তিতির মুখ ঘুরালো চটজলদি।”কই। তোর শুধু উল্টাপাল্টা কথা।”

তমা খিলখিলিয়ে হাসলো।হঠাৎই থেমেও গেলো।ধীর গলায় বললো,”রাহাত ভাইকে ফোনে পেয়েছিলি?”

রাহাত ভাইয়ের কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে তিতির তমার কথায় মুখটা মলিন হয়ে এলো।মাথা নাড়লো দুদিকে।

“এ কয়দিন তো টানা কল করেই গেলাম।পেলাম না তো।”

থামলো কিছুক্ষণ। তমা অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলে।

“তমা?আমি কি খুব অন্যায় করে ফেললাম রাহাত ভাইয়ের সাথে? “

তমার ঘাড়ের ওপর হাত রাখলো।আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলো তিতিরকে।

“উহু।তুই যদি তাকে জানানোর চেষ্টা না করতি তাহলে তোর দোষ দেওয়া যেতো।আমি তো জানি কি পরিমাণ চেষ্টা করলি তুই রাহাত ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করার।তোর দোষ নেই কোনো।”

তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে।রাহাত ভাই মানুষ টার জন্য তার খারাপ লাগে।সে না হয় ভালোবাসেনি।কিন্তু সে তো একজন নারী,পুরুষ মানুষ একজন নারীকে কোন নজরে দেখে,কি কারণে আগলে রাখে সেটা সে বোঝে।বিগত অনেকগুলো বছর ধরে চেনে সে রাহাত ভাই কে।সে কখনো অন্য নজরে না দেখলেও রাহাত যে তাকে ভালোবাসার নজরেই দেখতো তা সে জানতো।প্রশ্রয় দিতো এমন টা নয়।তবে সম্মান টা সে সবসময় করতো।রাহাত ও প্রশ্রয় চাইতো না।যথেষ্ট দুরত্বই রাখতো।সেদিন যদি রাহাত ভাই তার মনের কথা টা তিতির কে না জানাতো,তাহলে কি আজ তার মধ্যে এতো গিলটি বোধ থাকতো?বোধহয় থাকতো না।

“এগুলো নিয়ে ভাবিস না তো।যা হওয়ার হবে।তাছাড়া খোদা লিখে রেখেছে কার ভাগ্যে কে আছে।বড় ভাইয়ার সাথে তোর বিয়েটা হচ্ছে। মানে বুঝছিস

তার বুক পাজড়ের হাড় দিয়ে তোকে বানানো হয়েছে।এগুলো আমাদের জন্মেরও আগে ঠিক করা।তাছাড়া তিতির তুই রাহাত ভাইকে কখনো ভালোবাসিস নি।তেমন ইশারাও দিসনি।সে তোকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়,তুই তোর পরিবার কে জানাতে বলিস।এটাতে ভুল ছিলো না।এখন তোর পরিবার অন্য কাউকে ঠিক করেছে তোর জন্য, আর তাছাড়া তুই রাহাত ভাইকে কোথাও পাচ্ছিস না।এর মধ্যে আর কি করতে পারতি তুই।একদম ভাববি না তো এসব নিয়ে।”

তিতির মাথা নাড়ে।সত্যিই তো।যা হওয়ার হচ্ছে। ভাগ্যের লিখনের বাইরে মানুষের এক চুল নড়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।রাহাত ভাইয়ের ভাগ্যে সে ছিলো না।না তো তার ভাগ্যে রাহাত।যেটুকু সময়ের জন্য ছিলো,বা সামনে যেই আসবে তার বাকি সময়ের অধিকার বোধ নিয়ে সবটা আগে থেকে লেখা।জীবন কেটে যায় জীবনের মতো।কাউকে না পেলে কেউ মরেনা।রাহাত ভাইয়ও পারবেন নিজেকে মানাতে।কষ্ট হবে হয়তো।হয়তো নয়।হবেই..তার পরেও। জীবন থেমে থাকবে না।তার জন্যও খোদা নিশ্চয়ই কাউকে হালাল করে রেখেছেন।

____

ইশানের বাইক থামলো একটা হোটেলের সামনে।শহরের চার তারকা একটি হোটেল।ফোন বের করে ঘন্টাখানেক আগে আসা মেসেজটা চেক করলো।এই হোটেলেরই ঠিকানা দেয়া।বাইক পার্কিং করে চোখের সানগ্লাস টা পরে নিলো।সফেদ শার্টটা ঠিকঠাক করতে করতে ভিতরে ঢুকলো।রিসেপশনে যেতেই একগাল হেসে তাকে অভিবাদন জানালো সেখানকার রিসেপশনিস্ট। মহিলা টি ইশানের পরিচিত,এর আগে সাজিদ,অনিমার বিয়ের সময় তাদের দূর থেকে আশা বেশ কয়েকজন গেস্ট দের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো এই হোটেলে।তাছাড়া অন্যান্য দরকারেও আশা হতো টুকটাক।

“স্যার ৩১২ নাম্বার রুমের চাবি চান তো?”

ইশান অবাক হলো।মহিলা টি বুঝতে পারলো ইশানের আশ্চর্যতা।হেসে পরিষ্কার করলো সবটা।

“ম্যাডাম জানিয়েছেন আপনার কথা।আপনি এলেই যেনো আপনাকে চাবিটা দিয়ে দেই।”

ইশান বুঝতে পারে এবার।হাত বাড়িয়ে চাবিটা হাতে নেয়।

“স্যার দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার সব আমরা আপনাদের রুমেই পাঠিয়ে দেবো।হ্যাপি হানিমুন।”

ইশান কিছু বলে না।আলতো হেসে মাথা ঝাকায়।লিফটে চেপে এসে দাড়ায় ৩১২ নাম্বার রুমের সামনে।তবে নিজের হাতে বরাদ্দকৃত চাবিটি দিয়ে ঢোকেনা ভিতরে।দরজায় নক করে।মিনিট খানেকের মধ্যে দরজা খুলে দেয় রুষা।হাস্যজ্জল মুখ দাড়িয়ে আছে সে।গায়ে একটি ডার্ক পারপেল কালারের নাইটি।চুলগুলো আধখোলা করে রাখা।আধভেজা লাগছে,হয়তো কিছুক্ষন আগেই শাওয়ার নিয়েছে। ।ইশান ভিতরে ঢোকে।সারাঘর সাজানো। পুরো পারপেল থিম।রুষা মিষ্টি হাসে।ইশান কে টেনে ভিতরে এনে দরজা আটকে দেয়।আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে পেছন থেকে।

“আমি জানতাম তুমি আসবে।”

ইশান হালকা হাসে।পেটে জড়িয়ে ধরা রুষার হাতের ওপর নিজের হাত টা রাখে।

“আসতেই হতো।”

রুষা আরও শক্ত করে ধরে ইশানকে।

“আজ রাত কিন্তু এখানেই থাকতে হবে।মনে আছে তো?”

“খুব আছে।লাঞ্চ করেছো?”

“উহু।”

“দিতে বলি।”

“আমার অন্য কিছু চাই এখন।”

“দেবো তো।আগে..”

“উহু।আমার এখনই চাই।”

“আগে বলে এখন তোমার শরীর ঠিক আছে তো?ওষুধ খেয়েছিলে?”

“উমম হুম।”

ইশানের শরীরের ঘ্রানে নেশা চাপে রুষা।মুখ ডলে পিঠের ওপর।আবেশে চোখ বুঝে আসে তার।

ইশান রুষার হাত চেপে ধরে ঘুরিয়ে আনে সামনে।রুষা ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছে ইশানের দিকে।পুরো রুমের পর্দা টেনে দেয়া। আধো আধো অন্ধকার সবটা।রুষা দু পা উঁচিয়ে এগিয়ে আসে ইশানের ঠোঁটের দিকে।ইশান থামায়।

“আগে লাঞ্চ টা করে ওষুধ টা নিয়ে নাও…

রুষা বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়ে দুদিকে।

“আগে অন্য কিছু টা আমার চাই।”

ইশান আলতো হাতে দু গাল চেপে ধরে রুষার।”সেটা কি পাঁচ দশ মিনিটের ব্যাপার?হুম?সময় লাগবে না?আগে খেয়ে নেই।তারপর সব হবে।তখন এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করবো না। কেমন?”

রুষা লজ্জা পায়।মাথা নামিয়ে ফেলে।মুখ গোজে ইশানের বুকে।ইশান টেনে এনে আসায় সোফাতে।কল করে রুম ডেলিভারিতে।

খাবার আসে অল্প সময়ের মধ্যেই।অসময়ে তার ক্ষিধে নেই।তবে রুষার মেডিসিন নেওয়ার টাইম এটা।লাঞ্চ করে বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোয় ইশান।রুষা বিছানায় বসে আছে।নাইটির ওপরের বোতাম দুটো বিপজ্জনক ভাবে খুলে রাখা।তোয়ালে তে মুখ মুছতে মুছতে এগোয় সেদিকে।রুষা সামনে থাকা চুলগুলো ঠেলে পিছনে দেয়।চোখ সরায় না ইশানের চোখ থেকে।ইশান নিজের চোখ সরায় না।হাতের তোয়ালেটা ছুড়ে দেয় সোফার ওপর।এগিয়ে আসে বিছানার দিকে।

হাতড়ে পকেট থেকে ফোন বের করে।বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটি কল। দ্রুত হাতে মেসেজ লেখে সাজিদ কে কিছু একটা।তারপর সুইচ অফ করে ফেললো ফোনটা।অবহেলায় ছুড়ে দেয় সোফার ওপর।

****

বেলা পোনে তিনটে।দেওয়ান বাড়ির সবাই জু্মার নামাজ পরে তৈরি হয়ে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত। বিয়ের জন্য ছোটখাটো বসার জায়গা বানিয়ে ফেলা হয়েছে।কাজি সাহেব চলে এসেছেন।সবাই ব্যাস্ত হয়ে পায়চারি করছেন এদিকসেদিক।রাইসুল দেওয়ান ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে থ মেরে বসে আছেন।বেশ কয়েকবার সে দৃষ্টি পরলো রাহেলা দেওয়ান এর ওপর।রাহেলা কাচুমাচু মুখ নিয়ে নিজেও ফোন হাতে পায়চারি করছেন।ফোন করছেন ছেলেকে।রাসেদ দেওয়ান হাক ছেড়ে ডাকলেন নিজের ছেলেকে।নয়ন ছুটে এলো।রাইসুল দেওয়ান অস্বাভাবিক মুখে জিজ্ঞেস করলো

“পেয়েছো তোমার ভাইকে।”

নয়ন মাথা নিচু করে দু দিকে মাথা নাড়লো।

দীর্ঘশ্বাস ফেললো সকলে।প্রায় তিন ঘন্টা ধরে ফোনের ওপর ফোন করা হচ্ছে ইশানকে।ফোন ধরছে না সে।কথা ছিলো একসাথে নামাজ আদায় করেই বিয়ের কাজটা সেরে ফেলা হবে।অথচ বেলা গড়িয়ে বিকেল হলো ছেলেটা ফেরেনি।

“দাদুভাই ফেরেনি?”

চন্দ্রা দেওয়ান এর কন্ঠে চমকে তাকালো সবাই।নূরি হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে আসছে বৃদ্ধা কে।রিক্তা দেওয়ান তড়িঘড়ি পায়ে এগিয়ে গেলেন শাশুড়ীর দিকে।নূরির হাত থেকে ছাড়িয়ে ঠেলে নিয়ে এলেন নিজে।

রাইসুল দেওয়ান মায়ের হাত ধরে বসলেন পাশের সোফায়।

“ফেরেনি মা।তবে ফিরলো বলে।”

চন্দ্রা দেওয়ান কিছু বলে না।চিন্তারত মুখটা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।সবাই হাশফাশ করছে।কতক্ষণ এভাবে বসে থাকা যায়।

“তিতির কোথায়?”

দিদার কথা নূরি এগিয়ে এলো।”ওকে রেডি করে ঘরে রেখে এসেছি দিদা।তমা,বড়পু সবাই ওখানে।”

“তুমিও যাও ওর কাছে।ইশান আসলে নিয়ে এসো ওকে।”

নূরি মাথা ঝাকিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে চলে যায়।

এবার তিনি ফেরেন ইশানের বন্ধু দের দিকে।সবাই দুশ্চিন্তার মধ্যে।

“নিয়াজ দাদুভাই। “

নিয়াজ উঠে আসে হাটু গেড়ে বসে বৃদ্ধার হুইলচেয়ারের সমানে।

“তোমাট বন্ধু কোথায় গেছে বলে গেছে?”

নিয়াজ দু দুিকে মাথা নাড়ে।

“জানায়নি।বললো কিছুক্ষণ এর মধ্যে ফিরবে।কিন্তু..

“ কিন্তু দুপুড় গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে সে ফিরছে না।আজকে দিনে কাজ রাখতে না করেছিলাম।কি এমন কাজ থাকে আজকের দিনে?”

নিয়াজ কিছু বলতে পারে না।মাথা নিচু করে থাকে।কি বলবে সে।সত্যিই তো তারা কিচ্ছু জানেনা। সবার মনে একটাই চিন্তা ছেলেটা প্রথমে রাজি ছিলো না।জোর করে কি তারা এখন ভুল করলো?সবার মধ্যে সবচাইতে মুখটা মলিন সাজিদ এর।ফোন কাত করে ঘন্টাখানেক আগের ইশানের পাঠানো মেসেজে চোখ বুলালো সে।এ মেসেজ পাঠিয়েছে তাও তে ঘন্টা তিনেক আগে।এতক্ষণ তো চলে আসার কথা।এখনো কেনো আসছে না।ঘড়ির কাটায় সাড়ে তিনটে বাজে।আর কিভাবে সামলাবে সে ইশানের এই একরোখামি।

চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🍂

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন