ফন্ট সাইজ:
থিম:
সাঁঝের মায়া

৭৩তম পর্ব

লেখক: দুর এ দিলশাদ দুআ

#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৬৮( ১ম অংশ) ]

#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআ

—’ সরি, মিস্টার ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আপনার নামে যে এলিগেশন গুলো এসেছে, তার ভিত্তিতে বহু আগেই গ্রেফতারের আদেশ দেওয়া হয়েছিলো থানা থেকে। কাগজ পত্রের হিসেব দেখাচ্ছে, আপনি জেলে ছিলেন এ কটা দিন। আদতে তা নয়। ‘

পৌঢ় ভদ্রলোকটি পুলিশের পোষাক গায়ে জড়ানো। ঈশানরা হাসপাতালের মর্গের সাইট থেকে বের হয়ে আসছে। সামনে গটগট পায়ের আওয়াজ করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসা পুলিশ অফিসার কে দেখে নিজেদের পায়ের কদম থমকালো। ঈশান তখনো বেশ ডিসটার্ব। চোখমুখ কুঁচকে রয়েছে তখন থেকে। ফর্শা, পুরুষালি মুখটা কালচে হয়ে আছে গোটা দিনের দৌড়ঝাপে! সে মুখ ফুটে কিছুর বলার আগেই, সাজিদ পাশ থেকে এগিয়ে এলো।

—’ মিস্টার রহমান, আসলে…’

—’ আপনার কোনো কৈফিয়ত আমরা শুনতে রাজি নই, সাজিদ সাহেব। বন্ধুকে এ-সব এলিগেশন থেকে বাঁচানোর অভিযোগে আপনাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিলো। জানি না আবার কি করে, আপনাকে কাজে জয়েন করতে বলা হলো। কোন ক্ষমতার ব্যবহার করেছেন। তবে কেসটা যখন তাহমিদের থেকে আমার ওপর হস্তান্তর করা হয়েছে, আমি নিশ্চয় আপনার কথা মেনে চলবো না? ‘

ভদ্রলোক পদের দিক থেকো সাজিদের সম পর্যায়ে হলেও, বয়সে বেশ সিনিয়র। কোনো ধরনের বেয়াদবি করা মোটেই ভালো দেখায় না।

—’ তা কেনো চলবেন! আপনার ওপর যেহেতু দায়িত্ব পরেছে, আপনার হান্ড্রেড পারসেন রাইট আছে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেবার। ‘

ভদ্রলোক সৌজন্যের তাগিদে মেকি হাসলেন। রাত হয়েছে অনেক। তবে রোগ আর রুগীর তাগিদে হাসপাতাল তখনও মুখর। নার্স থেকে শুরু করে রুগীর সজনরা ব্যাস্ত পায়চারি করেছে গোটা করিডর জুড়ে। পুলিশের পোষাকে এভাবে এতজনকে দেখে কেউ কেউ গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েও আছে । ঈশান দুরত্ব ঘুচিয়ে এগিয়ে এলো ভদ্রলোকটির মুখোমুখি। শীতল সুরে বললেন,

—’ আমার স্ত্রীর মিসিং নিয়ে ডায়েরি করেছিলাম আপনাদের থানায়। এতোটা তৎপরতা তো দেখলাম না। ‘

বাঁকা হাসলেন লোকটি। হাতের হ্যান্ডকাফে ঝনঝন শব্দ করতে করতে বললেন,

—’ আপনি হিসেব মতে একজন রে প কেসের আসামি। পাঁচ পাঁচটি মা র্ডার প্লাস রে প এলিগেশন আপনার নামে। একজন সচেতন, শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে নিশ্চয় আপনার ধারনা আছে, কতটা জটিল বিষয় এটা? গোটা দেশের আইন নাড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। আপনাকে রেখে অন্য দিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় কোথায়? '

বাঁকা হাসলো ঈশানও।

—’ কি যে বলেন! অতো ক্ষমতা কোথায় আমার! ‘

—’ নেই বলছেন? ‘

—’ নাহ তো । ‘

—’ আমি যদি বলি আছে । নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছেন। ‘

ঈশান ধীর গলায় নির্বিকার শুধালো,

—’ নাকের দড়ি ছুটে গিয়েছে মনে করছেন নাকি? ‘

—’ ছোটেনি? আরও কি ছলচাতুরী করছেন? ‘

—’ সেটা না হয় শেষ চাল টা দিয়েই বোঝাবো, এখন চলুন না হয়। জেলের ভাত খেয়ে দেখি…’

ঈশান সাজিদের দিকে একনজর তাকাতেই বন্ধুকে ভরসা দিলো ছেলেটা। কাঁধে হাতখানা রেখে আস্বস্ত করলো যেনো। তিতিরের খোঁজ তারা করবে। এবং তাতে যে কোনো প্রকার অবহেলা করা হবে না এই নিশ্চয়তা নিয়ে ঈশান পা মেলালো পুলিশের সাথে।

*

ছোট্ট একটা কেবিন রুম। একদম ঝকঝকে তকতকে যাকে বলে আরকি। এ রুমে হাসপাতাল হাসপাতাল, সেই অস্বস্তি হওয়া ঘ্রান টা নেই। পরিষ্কার করে রাখা সবকিছু । ছোট্ট কামড়ার দু'পাশের দেয়াল ঘেঁষা দু'টো বেড। সফেদ, পরিষ্কার বেডশিট পাতা তাতে। তিতির পিটপিট করে তাকাতেই, ঘোর অন্ধকারের বদলে একদম চকচক করা সফেদ সিলিং চোখে পরলো। এক মূহুর্তের জন্য স্বপ্নই ঠেকলো তার কাছে। শরীর কম্পন দিয়ে উঠলো। মনে হলো কোনো এক অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে, বাঁচার জন্য আকুপাকু করছে। খুব জোর খাঁটিয়ে তাকাতে চেয়েও কাজ হলো না, যতটুকু আঁখি মেলতে পারলো, দৃশ্যমান ততটুকুই ঘোলাটে। পেশিতে খিঁচ ধরে আছে যেনো। একটু নড়াচড়া করতেই সেই খিঁচুনি টের পেলো স্পষ্টত।

রাহাত জেগেই ছিলো। তিতিরের বেডের পাশের চেয়ারটাতে পিঠ ঠেকিয়ে বসা। ক্লান্ত শরীরে রাজ্যের ঘুম এসে জড়ো হয়েছে। সকালে নদীর তীর থেকে মেয়েটাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর, গোটা দিন কেটে, রাতও শেষ হওয়ার পথে। জ্ঞান ফিরেছে মেয়েটার দিনের বেলাতেই। তবে ডাক্তারের ভাষ্যমতে সাঁতার না জেনে পানিতে ঝাপ দেওয়ায় একপ্রকার মানসিক ট্রমা হয়ে গিয়েছে। জ্ঞান ফেরা মাত্রই ছটফট করছিলো। কড়া ঘুমের ওষুধের ডোজ দিয়ে রাখা হয়েছে আপাতত। তিতিরের ব্যাস্ত হাত পা নড়াচড়ায় সদ্য লেগে আসা চোখজোড়া খুলে গেলো। বড্ড অস্থির হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে তিতিরের দিকে ঝুঁকে আদুরে গলায় ডেকে উঠলো,

—’ পরীই? ‘

—’ উমমম । ‘

বহুদিন, বহুদিন পর রাহাতের ডাকে সাড়া দিলো মেয়েটা । যদিও এরকম আদুরে ডাকে, ওকে সময় অসময় ডাকা হতো এমনটা নয়। বুকের গহীনে লুকায়িত থাকতো এ-সব ডাক। তবে, ঈশানের সাথে মেয়েটার বিয়ের পর, রাহাত যতবার নির্লজ্জের মতো মেয়েটার কাছে যেতো, ততবারই এই নামেই আর্তনাদ করতো। তবে তিতির কখনো সেই ডাকে সাড়া দিয়েছে বলে, মনে পরলো না তার । আজকে চেতনাহীন তিতির উত্তর নিলো, তাতে কি! রুক্ষ বুকটা বৃষ্টির ছোঁয়া পেলো যেনো।

—’ পরীই? খারাপ লাগছে কি খুউব? হ্যা? শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? ‘

—’ ঈ..ঈশা..ন ভা…’

জ্ঞান ফিরলেও ঘুমের ওষুধের প্রভাব এখনো শরীর থেকে কাটেনি মেয়েটার । ঘুমের ঘোরেই গু'ঙিয়ে উঠছে বারংবার । বিরবির করে বলছে কিছু, যদিও বোধগম্য হচ্ছে না সে-সব। শুধু ফ্যাকাসে হয়ে থাকা পাতলা ঠোঁটজোড়া নড়ছে সামান্য । তবে এতক্ষণ পর এই প্রথম, একটা বাক্য খানিকটা বোধগম্য হলো রাহাতের! তিতির অস্পষ্ট, ভাঙা ভাঙা শব্দে ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলে উঠলো,

---' ঈশাআআন ভাইই...একটাবার জড়িয়ে ধরেন না! ভালোবাসি তো...'

রাহাত আচমকাই ঝুঁকে থাকা থেকে, সোজা হয়ে দাড়ালো । ঝিমঝিম করে উঠলো কান জোড়া। অসহায় হাসলো । নড়াচড়ায় মেয়েটার ক্যানোলা লাগানো হাতটা বেকায়দায় পরে গিয়েছে খানিকটা,

হাত বাড়িয়ে নার্সের কথামতো ক্যানোলা পরানো হাতটা পেটের ওপর ঠিকঠাক করে দিতে দিতে মলিন গলায় বললো,

---' স্বপ্নেও ঈশানের বিচরণ বুঝি! এতো ভালোবাসা? আর এই ছয় বছরে আমাকেই ভালোবাসা গেলো না শুধু। তাই না পরীই? '

তিতিরের পুনরায় কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। ঘুমের দেশে তলিয়েছে মেয়েটা। রাহাত আলতো হাতে গায়ের সফেদ চাদর খানা টেনে দিতে দিতে গভীর চোখে পরখ করে গেলো ভালোবাসার নারীটিকে। তিতির যখন সজ্ঞানে আসবে, তখনও নিশ্চয় ব্যাস্ত হয়ে ঈশানকেই খুজবে। কে জানে, সে বাঁচিয়েছে বলে হয়তো বিরক্তই হবে খানিকটা। স্বামীকে একপলক দেখার জন্য ছটফট করে উঠবে। যেমনটা এখন করে যাচ্ছে!

*

—’ রেহনুমা হেলাল তিতির, মমতা বেগম, রাসেল শেখ এই তিনটা নাম বললো পেশেন্টের। রাতে দুই ডোজ ওষুধ আছে ওনাদের। আমি প্রথম ডোজ টা দিয়ে যাবো। ভোর ছয়টার দিকে আরেকটা দিয়ে দেবেন আপনি। ‘

দু'জন নার্সের কথোপকথনে পা থমকালো ঈশানের। কানে সঠিক শুনেছে কি-না তা বোঝার জন্য ঘাড় বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো বাঁয়ের সাজিদের দিকে। বলাবাহুল্য সবারই কর্ণগোচর হয়েছে কথাগুলো । তবে চকিত ঈশান তৎক্ষনাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে না পারলেও, সাজিদ ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গেলেন নার্সদুটোর দিকে।

—’ এক্সকিউজ মি! ‘

পুলিশের পোষাকে এতগুলো লোকজন দেখে মহিলা দুটোর মুখ চুপসানো দেখলো। তাঁদের ভয় না পেতে আস্বস্ত করলো সাজিদ। এক পা, দু পা করে ঈশান, নাঈম, নিয়াজও এগিয়ে এসেছে এদিকটায়।

—’ কি নাম বললেন পেশেন্টের? ‘

মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো দুজনেই। নিচু গলায় ইতস্তত জবাব দিলো।

---' কার? '

---' প্রথম নামটা?'

—’ রেহনুমা। ‘

—’ পুরো নাম? ‘

—’ রেহনুমা হেলাল তিতির। ‘

—’ কি কেস? ‘

—’ পানিতে ডুবেছিলো। ‘

যা শুনেছে তাতে কোনো ভুল নেই। ঈশানের হাঁটু কেঁপে উঠলো ঠকঠক করে। নিছকই কল্পনা ঠেকলো তার কাছে। মেয়েটাকে যে হারে, পাগলের মতো এতগুলো লোক এদিক-সেদিক খুঁজছে গত দিন থেকে। আজকেও কিছুক্ষণ আগে কি পরিমাণ জঘন্য পরিস্থিতিতে ছিলো তারা। এতো আচমকা, এভাবে খোঁজ পাবে তা বোধহয় কারোরই কল্পনায় ছিলো না। এ যাত্রায় ব্যাতিব্যাস্ত হলো ঈশান। নাঈম, নিয়াজকে দু'হাতে ঠেলে সরিয়ে সামনে এসে ব্যাগ্র কন্ঠে শুধালো,

—’ কোথায় পেশেন্ট? কত নাম্বার রুমে? এখন কেমন আছে সে? ‘

—’ ছয়তলাতে । ছয়শো আঠারো নাম্বার কেবিনে। ‘

ঈশান দেরি করে না একমুহূর্ত। পা ছুটে গিয়েছে তার।

—’ কে এডমিট করিয়েছে ওনাকে? ‘

—’ ওনার হাসবেন্ড সম্ভবত । রাহাত নাম। ‘

ছুটে যেতে গিয়েও থেমে গেলো ঈশান। রাহাত এডমিট করিয়েছে, তার থেকেও কানে তীক্ষ্ণ হয়ে যে শব্দটা এসে লাগলো, সেটা হলো হাসবেন্ড! খেদোক্তি প্রকাশ করে চেচিয়েই উঠলো ছেলেটা। অশান্ত হয়ে বললো,

—’ আমি ওর হাসবেন্ড । কেউ এসে রুগী এডমিট করালেই আপনাদের এখান থেকে, তাদের হাসবেন্ড -ওয়াইফ ট্যাগ দেওয়া হয় কি? ‘

দাঁতে জিব কাটলো মেয়েটা। তারা কি করে জানবে। লোকটা মেয়েটাকে নিয়ে আসার সময় যে পরিমাণ হাউমাউ করে কাদছিলো আর আর্তনাদ করে করে ভালোবাসি ভালোবাসি বলছিলো। সে কি করে টের পাবে এটা হাসবেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড নয়!

ঈশানকে অনুতপ্ত হয়ে কৈফিয়ত দিতে যাওয়ার আগেই তপ্ত দৃষ্টি তাক করে প্রস্থান করলো ঈশান। নার্স দুটোকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাকিরাও ছুটলো তার পিছু পিছু।

বদ্ধ কেবিন। ঈশানরা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ভিতরে ঢুকতে চাওয়া মাত্রই বাঁধা দিলো, ভিতর থেকে বের হওয়া নার্স। জানানো হলো রুগী ঘুমে আছে, ভিতরে এতো মানুষ এলাও না মোটেই । তবে পুলিশ পোশাকধারী লোকজন এবং ঈশানের স্বামী পরিচয় দেওয়ার পর, নার্স সদয় হলো খানিকটা। জানানো হলো, যিনি নিয়ে এসেছেন পেশেন্ট কে তিনি খানিক আগেই বেরিয়েছেন একটু। বাকিরা কেউ প্রবেশ করলো না। ঈশানকে একাই যেতে দেওয়া হলো ভিতরে।

গোটা কামড়াই নিস্তব্ধ। বিপ বিপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই। কেবিনের দরজা ভেজিয়ে সম্মুখের ওই সফেদ বেডটার দিকে তাকাতেই বুকের ধুকপুকানির শব্দটা জোড়ালো হলো বড্ড । বুক অবধি চাদর টেনে দেওয়া মেয়েটা। মাথার লম্বা চুলগুলো সুন্দর করে বেণী করে রাখা দু'পাশে। একপাশের চুলের অংশ বেড ছেড়ে বাহিরে এসে ঝুলছে৷ বাতাসে উড়াউড়ি করছে বেবি হেয়ার গুলো। হাতে ক্যানোলা লাগানো, অক্সিজেন মাস্কখানা পাশেই সাজিয়ে রাখা। মেয়েটা স্বাভাবিকের থেকে খানিকটা দ্রুতই শ্বাস নিচ্ছে মনে হলো। ঈশান এসে মেয়েটার পাশে বসতেই কেমন গুঙিয়ে উঠলো মেয়েটা । ছেলেটা তখনো স্থির চোখেই তাকিয়ে। কতদিন পর দেখা! কাঁপতে থাকা হাতটা আলতো করে মেয়েটার মাথায় ছুঁয়িয়ে, ফিসফিস করে ডেকে উঠলো ঈশান।

—’ তিতির ? বউ ? ‘

সাড়া মিললো না অপর পাশের মেয়েটার থেকে । তবে ঘুমের মধ্যেও ভ্রু জোড়া কোঁচকানো লক্ষ্য করলো ঈশান । এখন ঘুম ভাঙবে না মেয়েটার। ঢোকার সময় নার্স বলেই দিয়েছিলো ।

—’ বড্ড জ্বালালি, জানিস কি সেটা ? কে বলেছিলো বাড়ি থেকে বের হতে? আমি তো জানতাম এরকম কিছুই হবে, আর এ কারণেই নিষেধ করেছিলাম পইপই করে। তারপরও কেনো এতো অবাধ্য? হুম? কোথায় না কোথায় খুঁজেছি জানিস? আন্দাজ আছে তোর? ম রেই যাচ্ছিলাম। ‘

মেয়েটার কপালের ভাজ গাঢ় হলো আরও খানিকটা । ঘুমের মধ্যেও পরিচিত মানুষের, সেই প্রিয় ঘ্রানটা বোধহয় পাচ্ছে সে । তিতিরের বুঝি এটাকে স্বপ্নই মনে হলো। পাতলা ঠোঁটজোড়া নাড়িয়ে কিছু বলতে গিয়েও, বললো না। শুধু তিরতির করে কাঁপলো। ঈশান পরখ করে সে-সবই। বৃদ্ধাঙ্গুলি ছোঁয়ায় মেয়েটার শুষ্ক ঠোঁটের ওপর। দু'বার স্লাইড করে ভেজা কন্ঠে বলে,

—’ মর্গ অবধি গিয়েছিলাম আমি । মর্গ মানে বুঝতে পারছিস? সেখানে একটা মানুষেরও শ্বাসপ্রশ্বাস চলে না। মৃ ত সবাই। ওখান অবধি যেতে হয়েছে তোর জন্য। তোর শ্বাস নেই, এটা ভাবতেই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো আমার। এই মূহুর্তের যন্ত্রনা কি করে বোঝাই বলতো ? ‘

—’ ঈশা…আন ভাই?’

—’ হুমম।

—’ কোথায়…’

—’ কি কোথায়? ‘

—’ চলে গেছিলেন? খুঁজে-ছি তো আমি…’

মেয়েটার ঘুম ভাঙেনি একফোঁটাও।ঘুমের ঘোরেই বিরবির করে যাচ্ছে । মৃদু হাসলো ছেলেটা। নাক টানলো, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সরিয়ে ফেললো চোখের কোণে জমতে থাকা অশ্রুকণা। মুখটা ঝুঁকিয়ে শব্দ করে চুমু খেলো তিতিরের ফুলো গালটায়। সেখানেই নাক ঘঁষে ফিসফিস করে বললো,

—’ আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। তোর কন্ঠস্বর শোনার জন্য ছটফট করছিলাম আমি । এক মূহুর্তের জন্য মনে হয়েছিলো, এই বুঝি একেবারে হারিয়েই ফেললাম। তোকে ছুঁতে পারার এই মূহুর্তটা আমার জন্য যে কি, সেটা বোঝানোরও সাধ্য আমার নেই। ‘

রমনীর পেলব গাল শিক্ত হলো স্বামীর অশ্রুজলে। ঈশান মুখ তুললো না। ওভাবেই কেটে গেলো বোধহয় দীর্ঘ সময়। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হচ্ছে। পুলিশ অফিসার তাড়া দিচ্ছে। ঈশানকে নিয়ে যাবে। সাজিদ কোনোমতে সময় চেয়ে নিয়ে অপেক্ষা করাচ্ছে তাদের। ঈশান বুঝলো এখানে আর সময় কাটাতে পারবে না। নিয়াজ কে ডেকে দ্রুত খবর পাঠাতে বললো দেওয়ান বাড়িতে। যতক্ষণ না পরিবারের সবাই আসে ততক্ষণ তাকে তিতিরের কাছেই থাকতে বললো । তবে ঈশান ঘুরেফিরে এতোটা সময় ব্যায় করছে সম্পূর্ণ অন্য একটা কারণে। নাঈম বোধহয় টের পেলো সেটা। চাপা গলায় শুধালো,

—’ বিশ্বপ্রেমিক কে দেখতে এতো অপেক্ষা, নাকি? ‘

—’ কে বিশ্বপ্রেমিক? ‘

—’ তোর বউয়ের জন্য যে দিওয়ানা।’

ঠোঁট উল্টালো ঈশান। পকেটে দু-হাত গুঁজতে গুঁজতে বললো,

—’ সে তো সবাই বিশ্বপ্রেমিক তাহলে! আর আমার বউয়ের পিছনে শেয়াল- কুকুরের লাইন দেখেছিস? ‘’

হাসলো নাঈম। বাকা গলায় শুধালো,

—’ জেলাস? ‘

—’ হবো না? ভাগ্যের পরিহাস দেখ। পাগলের মতো খুঁজে ফিরলাম আমি। অথচ উদ্ধার করে, কোলে তুলে নিয়ে এলো ওই রাহাত। যেটাকে নিয়ে আমি , বিয়ের আগে থেকে বিরক্ত। ‘

ঈশানকে এই মূহুর্তে ভীষন চনমনে লাগাছে। লাগবে না-ই বা কেনো। এতক্ষণ তো বউকে জড়িয়ে ধরো হু হু করে কেঁদে এলো। তা কি তারা দেখেনি! বউকে হারিয়ে ফেলার যে ভয়টা, সেটা মুছেছে মন থেকে। তাই খানিকটা ক্ষেপানোর সুযোগও হাতছাড়া করলো না সে। ফিসফিস করে বলে উঠলো,

—’ পানিতে ডোবা রুগীদের নাকি সিপিআর দেয়। তিতির কে যখন, রাহাত পানি থেকে…’

আঁতকেই উঠলো ঈশান। মুখের আদল কঠিন হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। বাঁ হাতে কলার চেপে হিসহিসিয়ে বললো,

—’ বাজে বকিস না। কিসের সিপিআর? কোনো সিপিআর লাগেনি ওর। আমার বউ ও, এতো সহজে শ্বাস ফুরাবে না ওর।'

আসলেই লাগেনি। নিয়াজ গিয়েছিলো তিতিরের ট্রিটমেন্ট যিনি করছে সেই ডাক্তারের কাছে। রুগীর বর্তমান অবস্থা থেকে শুরু করে সব খবরাখবরই নিয়ে এসেছে। সবাইকে সবটা বুঝিয়ে আরেকদফা এসে দাড়ালো মেয়েটার কাছে। একটাবার ঘুম ভাঙলে! তবে তা সম্ভব নয় এই মূহুর্তে। আর ঈশানের হাতেও সময় নেই অতটা। তিতির নিরাপদে থাকলেও, তমা ভীষন বিপদে। ইয়াজ মির্জার মতো মানুষকে বিশ্বাস নেই একবিন্দুও। তবে ঈশানের এই দেরি করাটা স্বার্থক হলো না। না তো তিতিরের ঘুম ভাঙলো, আর না তো রাহাত ফিরলো এর মধ্যে।

ঈশান অজস্র চুমু আঁকলো স্ত্রীর গোটা মুখে । এমন একটা সময় এভাবে রেখে যেতে মন সায় দেয়? কিন্তু তাছাড়া উপায়ই বা কি! চিবুকের শব্দ করে চুমু খেয়ে ঠোঁটের কিনারায় এসে থামলো ছেলেটা। নিঃশ্বাস বারি খাচ্ছে দু'জনেরই।

—’ ভাগ্যিস সিপিআর লাগেনি তোর । এতো এতো অশান্তির মধ্যে এটা আমার জন্য আরেক অত্যাচার হতো, জানিস ? আমার বউয়ের ঠোঁ ট আমি খা বো। অন্য কেউ কেনো স্পর্শ করবে! গড! ভাবতেই মাথায় চক্কর খায় আমার। ‘

—’ উমমম। ‘

—’ উমম, উমম করছিস কেনো? উঠলি তো না। দেখা পেলি না আমার। ঘুমের ঘোরে তোর ফায়দা লুটে কত কি-ই করে গেলাম! ‘

—’ ভালোবাসি, ঈ..ঈশা-ন…’

—’ জানি তো। ‘

—’ উমমম। ‘

—’ একটা চু মু খাবো। কেমন? তোর অনুমতি নেওয়ার সময় নেই। যেতে হবে। নরম সরম চু মু না কিন্তু। তোর শাস্তি এটা। আমার অবাধ্য হয়ে বের হওয়ার। বের না হলে তোর একেকজন আশিক রা কি খোঁজ পেতো তোর? রাহাত নাকি কোলে করে নিয়ে এসেছে তোকে। মানা যায়, বলতো? ‘

—’ উহু..’

ঈশান হাসলো খানিকটা শব্দ করেই। দু গাল চেপে ধরতেই ঠোঁট জোড়া গোল হয়ে এলো। হয়তো ব্যাথাও লাগছে খানিকটা, কপাল তো কুঁচকে রেখেছে সেই কখন থেকেই! ঈশান ঢোক গেলে ওই লোভনীয় ঠোঁট জোড়ার দিকে তাকিয়ে। ঝুঁকে এসে ঠোঁটে ঠোঁট মেলাতে যাওয়ার আগে হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,

—’ অনুমতি নিলাম না কিন্তু। কাছে চাচ্ছিলি আমাকে। দেখেছি আমি সবই। আজকে চু মু অবধিই মুলতবি থাকুক। ফিরে এসে বাকিসব হকও বুঝিয়ে দেবো, আমিও বুঝে নেবো। আর আমাকে পোড়াস না, কেমন? তুই হেফাজতে থাকলে, দুনিয়ার সব লড়াই আমি একা হাতেই লড়তে পারবো। যেতে হবে, মাই লাভ। বি আ গুড গার্ল৷ খুব দ্রুতই ফিরবো আমি। ‘

নাইট ডিউটিতে এখন যে ডাক্তারের ভিজিটিং আওয়ার, তিনি রুগীর কেবিনের সামনে এতো ভিড় দেখে অবাকই হলেন। পুলিশের লোকসহ, একগাদা মানুষ। কি হেতুতে, সেটা জিজ্ঞেস করার আগেই কেবিনের দরজা খুলে ফেললেন। ঈশান তখন গভীর মনোযোগে তিতিরের অধরসুধা পানে মত্ত। একহাতে মেয়েটার কন্ঠনালি আঁ'কড়ে, অন্য হাত বেডের হেডবোর্ডে ঠেকিয়ে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। হাসফাস করছে তিতিরও। তবে আশ্চর্যের বিষয়, সে তাল মিলিয়েছে ঈশানের সাথে। দরজা খোলার শব্দ পেতেই তিতিরকে ছেড়ে বিরক্ত নজরে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই, চোখে পরলো ডাক্তার মহিলাটিকে। অপ্রস্তুত হলো ঈশান। ওদিকে সাজিদ, নাঈম ঘাড় উচিত তাকিয়ে আছে ভিতরের দিকে। ঈশান উঠে দাঁড়ালো। অপ্রস্তুত হেসে, কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,

—’ সিপিআর দিচ্ছিলাম, ডাক্তার। ‘

—’ কি-ই? ‘

—’ সিপিআর দিচ্ছিলাম। এরকম রুগীকে একা রেখে কেউ বাইরে যায় ? দায়িত্ব জ্ঞান একদম নেই আপনাদের। ভাগ্যিস ঠিক সময়ে ঠোঁটে ঠোঁট… মানে সিপিআর দিতে পেরেছি। ‘

—’ অক্সিজেন মাস্ক তো পাশেই। ওটা পরিয়ে দেওয়া যাতো না? ‘

—’ আমি…মানে ওর হাসবেন্ড থাকতে অক্সিজেন মাস্ক? সো লেম! তাছাড়া অক্সিজেন মাস্ক পরাই নি কারণ, কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়ার থেকে…ভালো করেছি না বলুন? ‘

ডাক্তার রাগী মুখে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই পাশের নার্সটি কানে কানে জানালো পেশেন্টের সাথে ঈশানের পরিচয়। মহিলাটি নরম হলেন খানিকটা। তাকিয়ে দেখলেন। হার্টবিট দ্রুত হয়েছে। সম্ভবত এই ঘনিষ্ঠতার কারণেই। তবে স্বাভাবিক হচ্ছে ধীরে ধীরে। ঈশানের দিকে তাকিয়ে হতাশ সুরে বললেন,

—’ ভালোই করেছেন। সুস্থ রুগীকে সিপিআর! ‘

ঈশান অমায়িক হাসলো। দরজার দিকে ইশারা করে বললো,

—’ তাই না? তাহলে আর একটু যদি বাইরে যেতেন। মানবসেবা টা শেষ করতে পারতাম… ‘

*

এক শ্বাসরুদ্ধকর রাত্রীর সমাপ্তি ঘটেছে। ফজরের আজান হচ্ছে। তিতিরের কেবিনের সামনেই গোটা রাত ধরে বসে আছে নিয়াজ । নাঈম আর সাজিদ গিয়েছে ঈশানের সাথে। দেওয়ান বাড়িতে ঈশান-তিতির দুজনের সংবাদই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তমার কথাটা এখনো খোলাসা করতে পারেনি তারা । সেটা ঈশান আর সাজিদ সামলে নেবে বলে গিয়েছে। ঘড়ি দেখলো নিয়াজ। হিসেব মতে আরও ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে সবার এসে পৌছাতে। রাতে তারা ফোন করে জানানো মাত্রই রওনা হয়েছে সবাই । তিতির বেঘোরে ঘুমাচ্ছে এখনো। ডাক্তারের থেকে খোঁজ নিয়ে যেনেছে, আর ঘন্টাখানেক থাকবে ওষুধের ডোজ। তারপর আপনাআপনিই জ্ঞান ফিরবে মেয়েটার। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর, তারও কম ঝক্কি গেলো না শরীরের ওপর দিয়ে । আজানের শব্দ পেয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। হাসপাতালের নামাজঘর একদম টপ ফ্লোরে। খানিক আগেই নার্সরা এসে দেখে গিয়েছে তিতিরকে। ঝটপট ছোট্ট করে নামাজ টা পরে আসার সিদ্ধান্ত নিলো সে।

এরকম একটা মূহুর্তের অপেক্ষাতেই বোধহয় ছিলো রাহাত। নিয়াজ ব্যাস্ত পায়ে প্রস্থান করতেই, দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো সে । বিনা শব্দে কেবিনের ভিতর ঢুকে পরলো। হাতের কাগজের ফাইলখানা কাঁধের ব্যাগে তুলতে তুলতে নিচু স্বরে ডাকলো তিতিরকে। খানিক আগেই হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়েছে সে। একটু কায়দা করতে হয়েছে। কিছু টাকাও খরচ করতে হয়েছে। তবে সুবিধা হয়েছে অন্য কারণে। ঈশান রা যে সময়ে এখানে ছিলো, সেই সময়ের নার্স বা ডাক্তার সবারই শিফট পরিবর্তন হয়েছে। একটুর চেষ্টাতেই সফল হয়েছে সে-ও। বাইরে দিনের আলো ফোটেনি এখনো । তিতির হেঁটে বাইরে অবধি যেতে পারবে কি-না সেটাও বুঝতে পারছিলো না। বাধ্য হয়ে একজন ওয়ার্ড বয় কে দিয়ে হুইলচেয়ারের ব্যবাস্থাও করে ফেলেছে সে। রাহাতের ক্রমাগত ডাকে চোখ মেললো তিতির। রাহাত আলতো হাতো তুলে বসালো মেয়েটাকে। কড়া ওষুধ, আর টানা ঘুমের প্রভাবে চোখ মেলেই তৎক্ষনাৎ চিনে উঠতে পারলো না সামনের মানুষটাকে। এটায় অবশ্য সুবিধাই হলো ছেলেটার। সময় নষ্ট করলো না মোটেই। তিতিরকে ধরে বিছানা থেকে নামিয়ে বসিয়ে ফেলোো হুইলচেয়ারে। এই শিফটের নার্স আসতেই তাকে রিলিজের কাগজপত্র দেখিয়ে আলগোছে প্রস্থান করে গেলো হাসপাতাল থেকে!

দু কামড়ার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট । দেখে হুট করে কিছুতেই মনে হবে না , এটা কোনো ব্যাচেলর পুরুষ মানুষ থাকে। একদম ছিমছাম, গোছানো সবকিছু । তিতিরকে সোফায় বসিয়ে রাহাত দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে গেলো। রান্নার প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে এখানটায়। মিনিট পনেরোর মাথায় গরম গরম স্যুপ করে এনে রাখলো তিতিরের সামনে। তিতির দু'হাতে মাথা চেপে বসে আছে। কাঁচের টেবিলে স্যুপ বোল টা রাখার শব্দে মাথা তুললো। মাথা পরিষ্কার হয়েছে খানিকটা। রাহাত কে দেখে চমকালো না মোটেই। কারণ নদী তীর থেকে সে যখন জ্ঞান হারায়, তার আগে দেখেছিলো রাহাতকে। এতক্ষণ মনে না পরলেও এখন মনে পরেছে ভালোমতো। রাহাত মুখোমুখি সোফায় বসে বাটিখানা তুলে নিলো হাতে। চামচ নেড়েচেড়ে, ফুঁ দিয়ে তিতিরের সামনে ধরতেই, তিতিরই হাত বাড়িয়ে চামচখানা হাতে নিলো।

—’ বোল টা টেবিলে রাখুন । আমিই খেতে পারবো । ‘

রাহাত বাধ্যের মতো শুনলো । স্যুপ মুখে দিতে দিতে নিচু গলায় শুধালো,

—’ অনেক ধন্যবাদ, রাহাত ভাই। আমাকে বাঁচানোর জন্য, যতটুকু কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করি, কম হবে। ‘

—’ আমার কাছে এতো ফরমালিটির প্রয়োজন আছে কি? ‘

তিতির জবাব দেয় না। হাত দূর্বল লাগছে। ধীরেসুস্থে ঈষৎ উষ্ণ স্যুপ মুখে তুলছে । চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে উত্তাল শীতলক্ষ্যায় ডুবতে ডুবতে বেঁচে ফেরার সেই মূহুর্ত।

—’ তমাকে কেউ নিয়ে গিয়েছে, আমাকে নেয় নি কেনো? ‘

—’ তোমাকে তুলে গাড়িতে রেখে, তমাকে আনতে গিয়ে ওকে আর পাই নি। সম্ভবত স্থানীয় কেউ উদ্ধার করেছে। স্থানীয় লোকজন যারা ছিলো। আমি খোঁজ করছি ওরও। ইনশাআল্লাহ খবর পেয়ে যাবো। কিন্তু ওখানে কি করছিলে দুজন? ‘

তিতির অতি সংক্ষেপে যতটুকু না বললেই নয়, ততটুকু বলে থামলো। খাবার টুকু শেষ করে পানি মুখে দিতে দিতে বললো,

—’ আমার বাড়িতে যোগাযোগ করেছেন? ‘

—’ কারোর নাম্বার নেই । ‘

—’ তাও তো কথা । আপনার ফোনটা দিন, আমি কল করছি । ‘

রাহাত ইতস্তত করলো খানিকটা । ফোনটা বের করতে করতে মিহি গলায় বললো,

—’ তারা সম্ভবত একটু ডিসটার্ব। “‘

—’ হ্যা। বাড়ির দু'দুটো মেয়ে কিডনাপ হয়েছে। ডিসটার্ব হবে না? ‘

—’ তার জন্য নয়। ‘

—’ তাহলে? ‘

রাহাতের মুখ শুকিয়ে এলো খানিকটা। তিতিরকে কিভাবে বলবে বিষয়টা সেটা বুঝে এলো না।

—’ কি হলো, কেনো বললেন না তো? ‘

—’ তোমার হাসবেন্ড কে নিয়ে। ‘

তিতির থমকালো। মলিন মুখটা তুলে স্থির দৃষ্টি ফেললো ঈশানের দিকে। দূর্বল গলায় বললো,

—’ কেমন আছেন উনি? ‘

—’ সুস্থ। ‘

—’ তাহলে? ‘

—’ আজকের নিউজপেপার দেখবে? ‘

—’ কি হয়েছে? ‘

রাহাত উঠে গিয়ে সকালের সংবাদপত্রখানা এনে শব্দহীন ফেললো তিতিরের সামনে। লাস্ট পেজে একদম বড় বড় করে হেডলাইন হয়েছে। বিশাল করে রঙিন একটা ছবি সেঁটে রাখা। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ঈশানকে ঘেরাও করে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অদূরে সাজিদ আর নাঈম কেও চোখে পরলো তিতিরের। দ্রুত লেখাগুলোয় চোখ বুলিয়ে গেলো তিতির। পুলিশ ,ডাকে নি মিডিয়াকে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মিডিয়া উপস্থিত হয়েছে সেখানে। কি মামলায় ঈশান আরশাদ দেওয়ান গ্রেফতার সেটা পুলিশকে জিজ্ঞেস করেও জানা যায়নি। তবে মিডিয়া ধারনা করছে, ধারনা নয়, বলা যায় গোপন সোর্সের মাধ্যমে জেনেছে, বর্তমান সময়ের চাঞ্চল্যকর ধ র্ষন, মামলা ও একেরপর এক নারী খু ন করা সিরিয়াল কিলার সন্দেহে পুলিশ তাকে এরেস্ট করেছে। আগামীকাল কোর্টে তোলা হবে তাকে! তিতির পাথর হয়ে তাকিশে রয় কাগজের দিকে। অক্ষরগুলো কেমন এলোমেলো ঠেকলো। ইয়াজ মির্জার দেখানো ভিডিওটা চোখের সামনে ভাসলো চালচিত্রের মতো করে ।

—’ পরীই? ‘

কাগজ থেকে চোখ তুললো না তিতির। ওভাবেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধীর গলায় বলে উঠলো,

—’ তিতির। তিতির ডাকবেন, রাহাত ভাই। আপনার মুখে এই ধরনের শব্দ শুনে আমি খুব আনইজি ফিল করি৷ ‘

রাহাতের মনঃক্ষুণ্নই হলো খানিকটা । ঠোঁট কামড়ে গলার মধ্যে আঁটকে থাকা কথাগুলো গুছিয়ে নিলো। ঈশান আরশাদ দেওয়ানকে নিয়ে পুলিশ মহলের ভিতরে যা যা হচ্ছে, সে-সব সে জেনেছে খোঁজ নিয়ে।

—’ তুমি কি ঈশানের সঙ্গে খুশি, তিতির? ‘

—’ কেনো? ‘

—’ প্রশ্নটা করা কি যুক্তিযোগ্য লাগলো না? বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে? ‘

—’ মানে? ‘

রাহাত খানিকটা নড়েচড়ে বসলো। এসির রিমোট হাতে, পাওয়ার টা খানিকটা কমিয়েও দিলো। কেমন ভ্যাপসা গরম লাগছে। তিতির দূর্বল শরীরটা একপ্রকার এলিয়েই রেখেছে সোফায়। মেয়েটা এই মূহুর্তে শুতে পারলে হয়তো কমফোর্ট ফিল করতো। রাহাত গলা খাঁকারি দিয়ে উঠে বললো,

—’ তুমি জানো কেনো বলছি এটা । আজকের নিউজপেপার দেখার পর অনেক কিছুই খোঁজ নিয়েছি আমি। বর্তমানে সেরকম চর্চা না হলেও, ভিতরে ভিতরে এ-সব নিয়ে অনেক তদন্ত চলছে। ঈশান আরশাদ কে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে আরও সাত দিন আগে থেকে। অথচ…অথচ সে নাকি এতোদিন জেলে ছিলোই না। ধ র্ষন মামলায় এরেস্ট। শুধু তাই নয়। খু নের মামলায়ও…’

তিতির হাত নাড়িয়ে থামিয়ে দিলো রাহাত কে। আচমকাই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বোধহয়।

—’ আমি জানি সে-সব। আর বলবেন না প্লিজ। ‘

—’ তোমার উচিত এবার অন্তত একটু শক্ত হওয়া। ‘

—’ এবার বলতে? ‘

—’ মানে যা হচ্ছে আরকি। দুনিয়ার সবাই তো আর ফেক হতে পারে না। বলো? ‘

তিতির চোখ তুলে তাকালো রাহাতের মনমরা মুখের দিকে। লোকটা এখনো আগের মতোই আছে কি? নাহ, নেই। আগের সেই জৌলুশপূর্ণ চেহারা আর নেই। শুকিয়েছে অনেকটা । মসৃণ ত্বকে কেমন খসখসে ভাব। তিতির আচমকাই ভারি কন্ঠে বলে উঠলো,

—’ আমি দুনিয়ার সবাইকে ফেক ভাবছি। এটা কেনো মনে হলো আপনার? ‘

—’ মানে!’

—’ মানে আমি নরম হতে পারি ক্ষেত্রবিশেষে। একদম বোকা নই। ‘

রাহাত অপেক্ষা করে তিতিরের পরের কথাগুলো শুনতে। মেয়েটার মুখের ভাবভঙ্গিই বলে দিচ্ছে আরও কিছু বলে যাবে সে। হলোও তাই।

—’ আমার আর ঈশান আরশাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে, রাহাত ভাই। গতকালকেই আমি সে কাগজে সই করে রেখে এসেছি। ‘

আসমান থেকে পরলো যেনো রাহাত। হতভম্ব হয়ে শুধালো,

—’ ডিভোর্স? কাল কে? ‘

মাথা নাড়লো তিতির।

—’ ইয়াজ মির্জার ওখানে। ঈশান আরশাদ দেওয়ানের ওরকম একটা নৃ শংস খু নের প্রমান দেখার পর, আমি এখনো তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করবো? ‘

—’ কিসের ভিডিও? ‘

সংক্ষেপে আউরালো ইয়াজ মির্জার দেখানো সেই ভিডিওটার কথা। রাহাত কপাল চেপে ধরলো। বিরবির করে বললো,

—’ ওর এই অন্ধকার দিক সম্পর্কে আমার সন্দেহ হয়েছিলো বহু আগে। ‘

—’ আমার হয়নি। তাই ঠকে গেলাম। হেরে গেলাম জীবনের কাছে । ‘

ছলছল করে উঠলো মেয়েটার চোখজোড়া। দু'হাতে মুখ ঢাকলো। এই মেয়ের চোখের পানি সহ্যসীমার বাইরে রাহাতের। সহ্য হলোও না। বুকটা দুমড়েমুচড়ে উঠলো। নরম গলায় বললো,

—’ যা হওয়ার হয়ে গেছে, তিতির। জীবনটা এতো ঠুনকো নয়।’

—’ নয় তো। জানি সেটা। এ কারণেই আমাকে বাচানোর জন্য কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি। না হলে তো ম রেই যেতে চাইতাম । ‘

ফুঁপিয়েই উঠলো মেয়েটা । রাহাত দ্রুত পায়ে কিচেন থেকে এক গ্লাস পানি এনে রাখলো মেয়েটার সামনে। দিনের পর দিন ভালোবেসে আগলে রেখেছে সে। আর সেই নারী অন্য পুরুষের জন্য আর্তনাদ করে!

—’ সে-ই কিন্তু তোমাদের পথ আলাদা হলোই, পরীই। মাঝখান থেকে খোদা, আমার কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নিলো। ‘

—’ খোদার মর্জি ঠিক- কি, আমার জানা নেই, রাহাত ভাই। তবে আজকে সত্যিই অভিযোগ জানাতে ইচ্ছে হচ্ছে তার মর্জির ওপর। জীবনটা অন্য রকম হলেও হতো, তাই না! সেদিন যদি আমি বাড়ি না আসতাম, আজকে আপনি আমি বোধহয় অন্য ভাবে থাকতাম। বলুন? ‘

এতক্ষণ শক্ত হয়ে বসে থাকা রাহাত, পানির মতো গলে গেলো। তীক্ষ্ণ আঁখিজোড় অশ্রুসিক্ত হলো। এরকম কথা কি সে ভাবেনি! ভেবেছে তো। আজও ভাবে। এই মেয়েকে সবভাবে গ্রহন করতে প্রস্তুত সে। আজ, অথবা – আজ থেকে আরও বিশ বছর পর। তিতির নাক টানলো। হাত বাড়িয়ে গ্লাস নিয়ে, পানিটুকু একঢোকে শেষ করে বললো,

—’ আমাকে ক্ষমা করবেন, রাহাত ভাই । ‘

—’ আমার কাছে তুমি কখনো দোষি ছিলেই না । ‘

—’ ভাগ্য কোথায় এনে দাঁড় করালো বলুন। আপনার আমার যে সমীকরণ, এক লহমায় মিলে যেতো। সেটার সমীকরণ আজকে এতো জটিল।’

মলিন হাসলো রাহাত।

—’ আমি গনিতে দক্ষ। হিসেব মেলাতে খুব একটা দেরি হওয়ার কথা নয়। ‘

চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼

[ এহ্ হে রে! আজকের পর্বে কি ঘটলো এসব বলেন তো? শুরুতে ঈশান- তিতিরের অংশটুকু পড়ে লেখিকারে চু'ম্মা দেন। আর শেষের অংশে রাহাত-তিতিরের অংশ পড়ে লেখিকা, রাহাত আর তিতির তিনজনরে একসাথে গালি দেন🌚🤌 আর আমি ততক্ষণে, মাথা ফ্রেশ করে পরের পর্ব সাজাই। দিবো নাকি রাহাত- তিতিরের শাদি মোবারক মার্কা একখান পর্ব?🤡 ]

#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৬৮ ( শেষ অংশ) ]

#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআ

বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। সূর্য মাথার ওপর একেবারে। যোহরের ওয়াক্ত। অন্য দিন নামাজ পরতে রাহাত বাইরে গেলেও, তিতিরকে একা রেখে আজকে যায়নি। বাড়িতেই নামাজ পরে নিয়েছে। একা নিজের ব্যাচেলর জীবনে যা টুকটাক রান্নাবান্না শিখেছে, সে-সব বড্ড যত্ন করে রেঁধে ফেলেছে আজকে । অনলাইনে অর্ডার করে এরই মধ্যে তিতিরের জন্য কয়েক সেট জামাকাপড়ও নিয়ে আসা হয়েছে। তিতির বাড়িতে ফোন করেনি। রাহাত কয়েকবার সাধলেও, সে নিজেই ইচ্ছে করেই ফোন দেয়নি বাড়িতে। কেনো,কি কারণে সে-সব জিজ্ঞেস করে ব্যাতিব্যাস্ত করেনি রাহাতও। খাবার টেবিলে মনমরা হয়ে আছে মেয়েটা। ভাতের থালায় আঙুলের উদাস পায়চারি করে যাচ্ছে তখন থেকে। গোসল করে নিয়েছে, সকালের তুলনায় বেশ ফ্রেশ লাগছে দেখতে। রাহাত, মাংশের প্লেটখানা মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে আলতো গলায় ডাকলো।

—’ তিতির? ‘

—’ হু। ‘

—’ খাচ্ছো না কেনো? ‘

তিতির জবাব দিলো স্বাভাবিক ভাবেই। ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে।

—’ খাচ্ছি। ‘

—’ রান্না ভালো হয় নি? আমি আসলে সেরকম পারিনা। মা অসুস্থ হওয়ার পর, টুকটাক যা শিখেছি। ‘

মৃদু হাসলো মেয়েটা। খাবার মোটেই কাঁচা হাতের রান্নার মতো লাগছে না। বরং যেকোনো রেস্তোরাঁর শেফ কে হার মানাবে বোধহয়।

—’ খাবার পারফেক্ট একদম। আসলে আমারই খিদে নেই তেমন। ‘

মেয়েটার চোখের নিচের কালচে ভাব নজর এড়ায় নি রাহাতের। ঈশানের কেস টা নিয়ে, কয়েকদিন যে ভীষন মানসিক চাপ গিয়েছে মেয়েটার ওপর, তা আর বুঝতে বাকি রয় না তার।

—’ তোমার বাড়ির মানুষ কে ফোন করতে দিলে না কেনো? ফিরতে চাও না? ‘

—’ চাইবো না কেনো? না ফিরে উপায় কি? কে আছে আমার! ঘুরেফিরে গন্তব্য তো ওখানেই। বাবা মা বেচে থাকলে বিষয় অন্য হতো । যাই হোক, একটু সময় নিচ্ছি নিজেকে গুছিয়ে নিতে। যে বেই মানির স্বীকার হয়েছি, ক্ষত সারতে একটু সময় লাগবে তো নাকি? যে স্বামী ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে ছুঁয়েছে দিন কে দিন। আচমকা তার হাতে মানুষের র ক্ত দেখা কতটা ভয়ংকর, ভাবতে পারেন? এক দু'দিন কি আশ্রয় দেবেন না?’

বড্ড ব্যাস্ত হলে রাহাত। তিতিরের কথাগুলো আচমকাই তার ভীষন অভিমানী লাগলো। মেয়েটা খুবই হতাশা মাখা কন্ঠে আউরিয়েছে বাক্যখানা।

মেয়েটার এমন অভিমানি কথার জবাবে দ্রুত গলায় বললো,

—’ আমার বাড়িতে তোমার জায়গা হবে না! এটা কি করে জিজ্ঞেস করতে পারলে, পরীই?’

তিতির আর কথা বাড়ালো না গোটা টা সময়। আর না তো রাহাত। নিঃশব্দে খাবার শেষ করলো দু'জনেই। খাবার শেষে মেয়েটা নিজের জন্য বরাদ্দকৃত কামড়ায় চলে গেলো দ্রুত পায়ে। বাইরে বাতাস বইছে। গোটা দিনের খাঁ খাঁ করা তপ্ত রোদ আচমকাই পরে গিয়েছে। রাহাতের বাড়ির পশ্চিমের বারান্দার এপাশটা বড্ড সুন্দর। এখানে দাঁড়ালে সামনে বুড়িগঙ্গার সুন্দর ভিউ দেখতে পাওয়া যায়। বাতাসে নদীর পানিতেও ঢেউ খেলে যাচ্ছে জোরে জোরে। কচুরিপানা গুলো আপনমনে ভেসে চলেছে। উত্তাল ঢেউয়ে দলছাড়া হচ্ছে সে-সব।

হিসেব মতে কালকে কোর্টে তোলা হবে ঈশান কে। তিতিরের সাথে যখন ফোনে কথা হচ্ছিলো, তখন যে বললো – সে নাকি জেলে নেই, ছিলো না কখনোও। তাহলে! জেলে নেওয়া হবে কেনো। আর আচমকা কোথা থেকেই বা পাওয়া গেলো তাকে। এ-সব সাতপাঁচ ভাবাভাবির মধ্যেই টোকা পরলো দরজায়।

রাহাত এলো হাতে কফির কাপ নিয়ে। নিজের জন্যও এনেছে সম্ভবত। তিতির মৃদু হেসে বসতে ইশারা করলো তার পাশের বেতের মোড়াটায়।

—’ ভীষন সুন্দর করে সাজিয়েছেন ফ্ল্যাটটা। ‘

ইষৎ উষ্ণ কফিতে চুমুক দিতে দিতে সামান্য ঘাড় ঝুঁকালো সে।

—’ তা সাজিয়েছি। ‘

—’ জায়গাটাও ভীষন সুন্দর। এপাশের বেলকনিতে দাড়িয়ে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি।’

—’ যাক, আমার কিছু তো তোমাকে মুগ্ধ করলো অন্তত।’

তিতির সরু চোখে তাকালো মানুষটার দিকে। লোকটার বাম ভ্রু ওপরের দিকটায় ছোট্ট কাটা দাগ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বেশ ক্ষত হয়ে আছে জায়গাটায়। এতটাই যে, চোখে পরছে স্পষ্টত।

—’ কপালে কেটেছিলো কি করে? ‘

বাঁ হাতে কপালের নিদ্রিষ্ট জায়গাটায় আঙুল ছুঁয়িয়ে হাসি হাসি মুখ করে বললো,

—’ ছোট বোন ফুলদানি ছুঁড়ে মেরেছিলো।’

—’ বলেন কি! সোজা ফুলদানি? ‘

হাসলো রাহাত। কফির আরেক সিপ নিতে নিতে বললো,

—’ মা অসুস্থ হওয়ার পর… আমি আর ও। সত্যি বলতে ক্লান্ত। আমার হয়তো একটা বয়স হয়েছে। কিন্তু মেয়েটা ছোট থেকে এই একঘেয়েমি বিষয়টা ফেস করে আসছে। দু'জনেই একপ্রকার নিজেদের জীবন বিকিয়েই দিয়েছি মায়ের পেছনে। সেটা অবশ্য আফসোসের কিছু বলে মনে করি না, তবে যার কাধের দায়িত্ব, রেগে যাওয়াটা তাকেই মানায়। ওরও তাই। হুট করে একদিন মানসিক চাপে রেগে গিয়েছিলো। ছোড়াছুড়ি করছিলো ঘরের জিনিসপত্র। তখনই আরকি ছোট্ট একটা কাচের টুকরো এসে বেঁধে। ‘

তিতির বুঝদারের মতো মাথা ঝাকালো। দিনের ভ্যাপাসা গরম কেটে শরীর শিরশির করছে এই ঝরো বাতাসে।

—’ আপনার মা আর বোন কোথায় এখন? ‘

—’ আমার বোনের কাজের সূত্রে উত্তরা থাকতে হয়। সেখানে রেখেছি। আমিও সেখানেই থাকি। তোমাকে নিয়ে…’

—’ বুঝতে পেরেছি। ‘

আবার কিছুক্ষণের নিরবতা চললো দু'জনের মাঝে। রাহাতের মুগ্ধ চোখ তখনো তিতিরেই স্থির। বহুদিন পর এমন এক অভাবনীয় সময় পার হচ্ছে তার জীবনে। নিরবতা ভেঙে কথা বললো তিতিরই প্রথম। নদীর বেগুনি রঙা কচুরিপানার ফুল গুলোর দিকে দৃষ্টি রেখে নিচু গলায় বললো,

—’ তখন যে বললেন না– আপনার কোনো কিছু অন্তত আমাকে মুগ্ধ করেছে। কথাটা আংশিক ভুল, রাহাত ভাই। ‘

এতক্ষণ পর সেই আগের কথার রেশ টেনে পুনরায় কথা বলায়, বেশ অবাকই হলো ছেলেটা। সুদর্শন মুখটা চকচক করে উঠলো। তিতির হাসলো একপেশে। মৃদু গলায় বললো,

—’ আপনি আপাদমস্তক একজন মুগ্ধ হওয়ার মতো মানুষ, রাহাত ভাই। আমার জীবনে আপনার মতো পারফেক্ট একজন পুরুষ আমি খুব কম দেখেছি। আসেনি আমার জীবনে…’

দম নিলো মেয়েটা।

—’ আমি যার ঘর করেছি, তার সাথে শুরুর দিনগুলো জা হান্নাম কেটেছে আমার। তবে আপনি এমন একজন ব্যাক্তি যে আমাকে আগলে রেখেছে দীর্ঘ সময়। দিনাজপুরে যখন প্রথম গেলাম, মনে আছে সে-সব দিন? ‘

—’ ভার্সিটির ছেলেরা তুমি বলতে পাগল হয়ে থাকতো। রাতদিন বিরক্ত করতো। ‘

—’ আর আপনি সে-সব জঞ্জাল পরিষ্কার করে ফেলতেন টের পাওয়া মাত্র। আমাকে কখনো কোনো ইমবয়ারেসিং পরিস্থিতিতে পরতেই হয়নি। ছোট বাচ্চার মতো ট্রিট করে, আগলে রাখতেন। ‘

শব্দ করেই হাসলো ছেলেটা। সে-সব দিন ভুলবে কি করে সে! ওরকম মধুর মূহুর্ত তার জীবনে আর আসবে? আসবে না হয়তো। প্রথম প্রেম এসেছিলো জীবনে। প্রেমে পরেছিলো সামনের ওই মেয়েটির। এখন পূর্নযৌবনা একজন রমনী হলেও, তখন মেয়েটা নিছকই বাচ্চা! তেরো- চৌদ্দ বছরের সদ্য বয়ঃসন্ধিতে পা দেওয়া কিশোরি। দু'পাশে লম্বা বেণি করে স্কুলে ছুটতো। পাতলা গরনের মেয়েটার কাধের ভারি ব্যাগাটায় কুঁজো হয়ে হাটতো একপ্রকার। মাথা নিচু করে যেতো, মাথা নিচু করে ফিরতো। আশেপাশে তাকাতো না কখনো। পথেঘাটে আর বাকিদের মতো হি হি করতে দেখতো না কখনো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহাত কিছু বলবে তার আগেই তিতির নিজের হাতের কাপটা বেতের টেবিলে রেখে খানিকটা ঝুঁকে এসে হাঁটুতে নিচের হাতের কনুই ঠেকিয়ে বললো,

—’ আপনাকে পায়ে ঠুকরে, পরিবারের চাপে হোক বা নিজের আবেগে-- ঈশাান আরশাদ দেওয়ান কে বিয়ে করা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, রাহাত ভাই । ‘

থমকালো রাহাত । বড্ড চমকালোও। বুকের বাঁ পাশের বিদ্রোহ জোরালো হলো বড্ড । কোনোমতে অস্পষ্ট আওরালো,

—’ ভুল না হলে, সঠিক চিনতে কি করে ! ‘

—’ তা ঠিক। ‘

—’ ভাগ্য সবই।’

—’ নিষ্ঠুর ভাগ্য। ‘

—’ আপনি নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করেননি কেনো? ‘

—’ তোমাকে ছাড়া? ‘

—’ আমি ছিলামই বা কবে।’

—’ এখনো আছোই। প্রথম দিনের মতোই।’

—’ আমি বিবাহিত। ‘

—’ এখন ডিভোর্সি।’

—’ ডিভোর্সি মানে বোঝেন?’

চোখে চোখ রাখলো মেয়েটা। শান্ত, অথচ দৃঢ় গলায় বললো,

—’ এটা কতটা গভীর একটা শব্দ। ডিভোর্সি! ‘

—’ হোক। ‘

—’ তারপরও অনূভুতি কমেনি?’

—’ বিন্দুমাত্র নয়। ‘

আরেকটু একপেশে হাসলো মেয়েটা। কানের পিঠে ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো গুঁজে দিতে দিতে ভাবলেশহীন গলায় বললো,

—’ বিবাহিত, ডিভোর্সি – এসবের মানে বুঝতে পারছেন? আমরা টিভি স্ক্রিনের কোনো কাল্পনিক চরিত্র নই কিন্তু, রাহাত ভাই। যে, বিয়ের তিন-সাড়ে তিন মাসের মাথায় এসেও বলবো, “ আমাকে এখনো আমার স্বামী স্পর্শ করেনি, আমাদের মধ্যে কিচ্ছু হয়নি। আমরা আলাদা ঘুমাতাম। ‘

রাহাত কিছু বলতে যাবে, হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো রমনী।

—’ আমাকে বলতে দিন। আমার প্রতি ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে, আপনি আমার প্রতি ভালোবাসা রাখেন। আমি আপনার সেই আগের তিতির নেই। যাকে আপনি ভালোবেসেছিেন। সে এখন..।’

—’ আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার গর্ভে যদি ঈশানের সন্তানও থাকে, তবুও ভালোবাসি। সেই বাচ্চাটাকেও ভালোবাসবো আমি। এ-সব কথা আমি তোমাকে আগেও বলেছি। তোমার বিয়ের পর, যতবার দেখা হয়েছে, ততবার বলেছি। ‘

তিতির অনিমেষ তাকিয়ে থাকে সামনের মানুষটার দিকে। রাহাতও বেশ ঘনিয়ে বসেছে এদিকটায়। দমকা বাতাসে এদিকে তাকিয়ে থাকতে সম্ভবত কষ্ট হচ্ছে মানুষটার। তিতির বিস্ফোরণ ঘটালো এবারে। ঠোঁট কামঁড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে, আচমকাই বলে উঠলো,

—’ বিয়ে করবেন আমায়? ‘

শ্বাস ফেলতেও ভুলে গেলো ছেলেটা। ভুল শুনছে কি-না বুঝে এলো না তার। অস্ফুটস্বরে শুধালো,

—’ কী-ই? ‘

—’ বিয়ে করবেন আমাকে? ‘

—’ ভেবে বলছো? ‘

—’ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে । ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে শাস্তি দিতে এর থেকে ভালো উপায়, আমার জানা নেই…’

—’ শুধু ওকে শাস্তি দিতে? ‘

—’ নাহ, হয়তো নিজের জীবনটা পুনরায় গুছিয়ে নিতেও। করবেন?’

—’ তুমি চাও?’

—’ চাইছি বলেই জিজ্ঞেস করলাম। ‘

দু'হাতে মুখ ডললো রাহাত। তিতিরের ধারনা হলো, হয়তো ভাবছে বিষয়টা নিয়ে। তবে তা নয়। রাহাতের রক্তিম চোখ দেখে ভুল ভাঙলো তার। কাঁদছে নাকি লোকটা!

—’ ভাগ্য সবসময় নি’ষ্ঠুর হয়না, পরীই। বলো? সময় মতো সব আপনা-আপনিই আসে। ‘

বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে তিতির বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে বসলো। চারমাস আগের দেখার সেই তিতিরের সাথে আজকের তিতিরের অনেক তফাত। আগের তিতিরের চোখমুখে অজানা একটা সরলতা, ভিতু ভিতু ভাব, সবসময় দেখতো। আর এই তিতির! এই তিতির একদম বুঝদার, প্রাপ্ত বয়ষ্ক বাঙালি নারী!

—’ আমাকে একটা সাহায্য করতে হবে, রাহাত ভাই।’

—’ বলো।’

—’ তমা…’

—’ তমা? ‘

—’ তমার খোঁজ বের করতে হবে। ‘

—’ নিশ্চয় খুঁজবো। আমি আমার পরিচিত লোক লাগিয়ে দিয়েছি। সকাল থেকেই খোঁজ করছে তারা। বাড়িতে যায়নি ও। ‘

—’ ওকে খুজে এনে দেবেন। ‘

—’ দেবো। ‘

তিতির নিজের শীতল হয়ে আসা মুখটা দু'হাতে ঢেকে বসে রইলো মিনিটখানেক। সেভাবেই মুখ গুঁজে ভীষন দৃঢ় গলায় বললো,

—’ এই সবের জন্য দায়ি ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আমি সবকিছুর জন্য তাকে ক্ষমা করতে রাজি। কিন্তু… কিন্তু তমার যদি কিছু হয়ে যায়, এই একটা জিনিসে আমি ইহকাল, পরকাল কোনোকালেই তাকে ক্ষমা করবো না। তার নোংরামির জন্য আমাদের পরিবার ধ্বংস হলো। প্রথমে ছোটপু, তারপর আমি, তারপর এবার তমা! সব মানবো। কিন্তু তমার কিছু হলে…’

—’ জানি না, নিজের দেওয়া কথা কতটুকু রাখতে পারবো। তবে তমা কে খুঁজে পেতে যা করতে হয়, সেটাও করবো । ‘

*

—’ বের হচ্ছেন কোথাও ? ‘

রাহাত, টিভি ক্যাবিনেটের ওপর থেকে নিজের ওয়ালেট খানা পকেটে গুঁজে, মৃদু হেসে বললো,

—’ আমার বোন কে নিয়ে আসি । রাতে, এই গোটা বাড়িতে তুমি আর আমি – বুঝতেই পারছো। বিষয়টা খারাপ দেখায় । প্রতিবেশী রা মাইন্ড করে ফেলতে পারে । ‘

মাথা দোলালো তিতির। মাগরিবের নামজ পরে সবেই বেরিয়েছে রুম থেকে। মাথায় এখনো ওড়নাটা গোল করে প্যাচানো।

—’ ফিরতে কতক্ষণ লাগবে? ‘

—’ ভয় পাবে কি? ‘

—’ নাহ, তার জন্য নয়।’

—’ জ্যাম ঠেলে আসতে - যেতে যতক্ষণ আরকি। ‘

—’ তমার কোনো খোঁজ পেলেন। ‘

—’ সেটাও নেবো। ‘

রাহাত বেড়িয়ে যেতেই এগিয়ে গিয়ে দরজা টা লক করে দিলো তিতির। গোটা ঘর জুড়ে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। শব্দহীন পায়ে চলেও এলো নিজের রুমের মধ্যে। বাঁকা চাউনি দিলো গোটা কামড়ায়। নজরে পরলো না কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা। আচমকা দরজার কোনা থেকে একটা ঝাড়ু টেনে বের করে দেয়ালের কোনায় তাকিয়ে খেদোক্তি ছেড়ে বললো,

—’ তেলাপোকার বা চ্চা… তোকে তো আজ আমি! ‘

একপ্রকার ছুটে গিয়েই সজোরে আঘাত করলো দেয়ালের এদিক-সেদিক। গোছানোর বিছানার ওপর উঠেও লম্ফঝম্প চললো একদফা। তেলাপোকা বাবাজি যে কিছুতেই মনুষ্য জাতির কাছে ধরা দিতে নারাজ, তা তিতিরের হতাশ মুখাবয়ব দেখেই বুঝতে পারা যায় । সময় গড়ালো প্রায় পাঁচ থেকে সাত মিনিট। রুমের ওপরের দিকে এক কোণায় চোখ সরু করে তাকালো মেয়েটা। বিরবির করে তেলাপোকা টাকে গালিও দিলো কয়েকবার। তারপরই সজোরে বারি বারলো সেখানে। বিজয়ীর হাসি জুটলো গোটা মুখ। একপ্রকার লাফিয়েই উঠলো খুশিতে।

শব্দ করে হেসে উঠলো রাহাত। রাহাতের ড্রাইভার ছেলেটা অল্প বয়সের। আচমকা কি এমন দেখল তার স্যার! বে - আক্কেল হয়ে তাকাতেই দেখলো হাস্যজ্জল মানুষ টাকে। ফোনে কিছু একটা দেখছে। তিতির তারপর বড্ড স্বাভাবিক ভাবে পায়চারি করে গেলো। ঘরে সাজানো এনটিক গুলো মুগ্ধ চোখে দখলো, জানালা খুলে রাতের চাঁদ - তারকাময় আলো ঝলমলে রাত্রি দেখলো। তারপর বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। এসির পাওয়ার কমিয়ে দিলো অনেকটা। রাহাত চ সূচক শব্দ করলো মুখে। এমনিতেই জ্বর৷ তারপরও এসি কমিয়ে দিচ্ছে এতটা। একবার ভাবলো ল্যান্ড লাইনে কল করবে কি-না। কল করে কি বলবে! সে কি করে জানলো তিতির এসির পাওয়ার এতোটা কমিয়েছে। গোটা বাড়িতে তারই সুরক্ষার জন্য সিসিটিভি সেট করে এসেছে, এটা জানতে পারলে মেয়েটার নিশ্চয় ভালো লাগবে না। তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো খানিকের মধ্যেই। কমফোর্টার মুড়ি দিয়েছে মেয়েটা।

আজকে জ্যাম কমই। রাহাতের নিজের গন্তব্যে পৌছুতে অন্যদিনের থেকে সময় বেশ কম লাগছ। তবে জ্যাম লাগলো বলে। ঘন্টা খানেক হলো ঘুমিয়েছে তিতির। রাহাতের হাতে ফোনটা তখনো একই ভাবে ধরে রাখা। ধ্যান ভড়কালো তখন, যখন আচমকাই ব্লার হয়ে এলো স্ক্রিন! ভ্রু কোঁচকালো ছেলেটা। একে একে চেক করলো বাকি ঘরগুলো। সব গুলোই ব্লার! আচমকা? সার্ভার ডাউন বুঝি? এমনটা আগেও হয়েছে।

তিতির হাসফাস করে মুখ বের করলো কমফোর্টার থেকে। এসির পাওয়ারও বাড়িয়ে দিলো। বড্ড শীত করেছে। উঠে গিয়ে বসার ঘর থেকে তুলে নিলো টেলিফোন খানা।

—’ কতদূর পৌঁছেছেন ? ‘

—’ আর মিনিট বিশেক। ‘

—’ জ্যাম আছে রাস্তায়? ‘

—’ একটু। ‘

—’ কতক্ষণ লাগলো তাহলে পৌছাতে? ‘

—’ ঘন্টাখানেক। ‘

—’ আমি কি করবো এখন? ‘

—’ বুকে আসলে, আসতেই পারে কেউ। ‘

খেদোক্তি বের হলো তিতিরের মুখ থেকে। কি থেকে কি উত্তর! আশ্চর্য। তেঁতো গলায় বললো,

—’ বুকে আসার সময় হয় নি এখনো। বিয়ে টা হোক। যাবো। ‘

শব্দ করে হাসলো ওপাশের মানুষটা । গাড়ির হর্নের তীক্ষ্ণ আওয়াজে কান সরিয়ে নিলো তিতির।

—’ আপনার ড্রাইভার টাকে পাঠান। ‘

—’ হুমম। ‘

তিতির এসে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই, মিনিট খানেকের মাথায় সচল হলো সার্ভার। রাহাতের চোখের সমানে আমার স্পষ্ট হলো মনিটর। ফোন হাতে ধরেই তাকিয়ে ছিলো সে। মেয়েটাকে একই ভাবে দেখে মৃদু হাসলো ছেলেটা।

*

নিস্তব্ধতায় ঘেরা পাতালপুরীর মতো আশপাশটা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মানুষ কেনো, সামান্য কাকপক্ষীরও সাড়াশব্দ পাওয়া দুষ্কর। এটা সেই আগের জায়গাটা নয়, যেখানে তাকে আর তিতির কে প্রথম বার নিয়ে আসা হয়েছিলো। কারণ সকালে তবুও বাড়ির আলো-বাতাস অনূভব করতে পেরেছে। এখন সে-সব কিচ্ছুর বালাই নেই। ঢাকা শহরের মতো ব্যাস্ত, জনবহুল শহরে– এরকম শুনশান পাতালপুরী এরা কোথা থেকো আবিষ্কার করে বসে আছে কে জানে!

—’ আমার সাথে কি করবে উনি ? এভাবে এরকম একটা ঘরে কেনো নিয়ে আসা হলো আমাকে ? ‘

তমার কম্পিত কন্ঠের আওয়াজে, সাড়া দেওয়ার মতো কেউ নেই। যারাই তাকে নিয়ে এসেছে সবার মুখেই একপ্রকার কুলুপ এঁটে রাখা। হাজার বার জিজ্ঞেস করে, আর্তনাদ করেও কারোর মুখ থেকে একটা শব্দ অবধি উচ্চারণ করাতে পারেনি মেয়েটা । তবুও ভালো এখন মুখটা খুলে দিয়েছে, এতক্ষণ তো সেটাও দেওয়া হচ্ছিলো না। শ্বাস আঁটকে আসছিলো মেয়েটার । একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই মেয়েটাকে যে ঘরটায় নিয়ে আসা হলো, সেটার দক্ষিণের সাইটের দেয়ালে বিশাল একটা জানালা। খট করে দরজা লক করে লোকগুলো চলে যেতেই, বড্ড অসহায় হয়ে গোটা ঘরটা দেখলো মেয়েটা । পশ্চিমের দিকে বিশাল একটা বেড। পাশেই ছোট্ট একটা বেড সাইট টেবিল। যার ওপরে একটা টিমটিমে আলোর ল্যাম্প। গোটা ঘরে আলো বলতে এই এতটুকুই। আজানের শব্দ শুনে হিসেব রেখেছিলো বেলা কত হয়েছে। মাগরিবের আজানা পরেছে খানিক আগেই। এটা যে পুরান ঢাকাই, তা বলার অবকাশ রাখে না। নামাজের ওয়াক্ত হলেই, আশপাশ থেকে একের পর এক মসজিদ থেকে আজানের মধুর ধ্বনি ভেসে আসে। ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানাতেই বসলো মেয়েটা। তিতিরের কি অবস্থা করেছে লোকটা কে জানে। জ্ঞান ফেরার পর থেকে এখন অবধি তিতিরের কোনো খোঁজ পায়নি। দেয়ও নি কেউ। তমা পায়চারি করলো ঘরময়। বুদ্ধিদিপ্ত চেহারার মলিনতা খানিকটা হলেও কমেছে। গোটা দিনের মাথা যন্ত্রনা কমায়, আরও একটু ভালো লাগছে হয়তো বা।

রাতের খাবার দেওয়া হয়নি তাকে এখনো । গোটা দিনে একবারও দেয় নি যদিও। ভনভন করছে মস্তিষ্ক। কেমন একটা কুটকুট শব্দ হচ্ছে খাটের তলা থেকে। ইদুর হবে কি? এরকম রাত্রির বেলা, বদ্ধ কামড়ায়, আলেহীন বসে থেকে যেকোনো শব্দই বিচ্ছিরি রকমের ভয়ংকর শোনায়। তমা শুকনো ঢোক গিলো আশেপাশে পরখ করে। শব্দ টা ঠিক কোথা থেকে আসছে সেটা বোঝার জন্য। বাথরুম থেকে কি? ওদিকটায় এককোণয় মেজেন্টা রঙের পর্দা ঝোলানো। ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে, কাঁপা হাতে পর্দাটা সরাতেই চোখে পরলো বাথরুমের দরজা। শব্দটা সেখান থেকেই আসছে । তমা ইতস্তত করলো বেশ সময় ধরে। অতঃপর সাহস জুগিয়ে খুট করে ছিটকিনি খুলতেই হতভম্ব হলো। দু'হাতে মুখ চেপে চ্যাঁচিয়ে উঠলো সজোরে। ভিতরের পুরুষটা বড্ড নির্বিকার। বসে ছিলো কমোটের ওপর। নাহ, কোনো বিশেষ কাজ সারছিলো না। ঢাকনা নামিয়েই দেওয়স কমোটের। তমা ভয়ার্ত হয়ে পিছিয়ে এলো কয়েক পা। আতঙ্কিত হয়ে মুখ চেপে ধরে আছে সে।

ভিতরের লোকটি বিরক্ত হলো বোধহয়। বিরক্ত গলাতেই বললো,

—’ আমাকে বোধহয় প্রথম দেখছো, এমন ভাব করছো কেনো?

—’ আ..আপনি…’

—’ কাকে এক্সপেক্ট করেছিলে? ‘

—’ বাথরুমে কাকে এক্সপেক্ট করবো? যাকেই করি, আপনাকে অন্তত না। ‘

—’ তা-ও ঠিক! ‘

তমা হুড়মুড়িয়ে সরে গিয়ে দাঁড়ালো ঘরের মাঝামাঝি। গায়ের নোংরা ওড়নাটা ঝটপট গায়ে জড়িয়ে চাপা গলায় শুধালো,

—’ আপনিই সব করেছেন তাহলে, শুরু থেকে? সম্মুখের সবই অভিনয় ছিলো? ‘

বাঁকা হাসলো লোকটা। এলোমেলো চলন ফেলে, বাইরে আসতে আসতে বললো,

—’ নাহ তো। তবে অভিনয় ভালোই করি তাই না বলুন, মিস নুসাইবা দেওয়ান? ‘

বিতৃষ্ণা ফুটে উঠলো মেয়েটার চোখেমুখে।

—’ জা নোয়ার। ‘

—’ অভিনয় না হয় করেছি। তাই বলে জা নোয়ার? আমি বিচার দেবো... '

*

ঘড়ির কাঁটা তখন নিজ মনে টিকটিক করছে রাত দশটার ঘরে। দশটা বেজে তেরো মিনিট। তমা হাঁটুতে মুখ গুঁজে বিছানায় বসা। কাঁদতে কাঁদতে বিধ্বস্ত চেহারা। এ কোথায় এসে আঁটকে গেলো! গায়ের লোমকূপ জেগে উঠছে। বাইরের উত্তাল আবহাওয়া জানান দিচ্ছে ভয়ংকর কিছু ঘটবে তার সাথে। ভাবাভাবির জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছে আদতে তাকে।

কোনো পূর্ন সংকেত ছারা শব্দ করে দরজা টা খুলে যেতেই কাচুমাচু হয়ে এলো মেয়েটা। আতঙ্কিত নয়নে তাকাতেই দরজার সামনে ভেসে উঠলো পরিচিত মুখাবয়ব । রাগে, ঘৃনায় রক্তিম হয়ে উঠলো মেয়েটা। সঙ্গে সুশ্রী মুখে ফুটলো একরাশ জড়তা আর ভয়।

—’ সুইটহার্ট? অল গুড? হাহ? ‘

—’ আর আঁধারে দাঁড়িয়ে কেনো? এগিয়েই আসুন। রুপ টা দেখি ভালো করে । তিতিরের সামনে তো শুনলাম মুখদর্শন করেন নি। আমার ক্ষেত্রে উল্টো কেনো? ‘

ইয়াজ এগিয়ে এলো। গায়ের শার্ট টা প্যান্টের ভাজ থেকে আলগা করতে করতে বললো,

—’ ওকে আমাদের বা সর রাতে মুখ দেখাবো! শুধু মুখ কেনো সবই দেখাবো। সবই তো ওর। ‘

—’ পিওর ছেলে পাবে, তিতির। ‘

—’ সন্দেহ আছে? ‘

—’ আর বাকি মেয়েরা? ‘

—’ ট্রায়াল এগুলো। আমার তিতিরপাখির যেনো প্রথম দিন লোড না হয়ে যায়। পরীর মতো মেয়েটা। আমাকে সামলাতে প্রথম দিনই… না না, এটা মানতে নারাজ আমি। নিজেকে কাবু করার প্রচেষ্টায় এতো ট্রায়াল। ‘

তমা দুরুদুরু বুক নিয়েও শক্ত রাখলো নিজেকে। দূর্বলতা প্রকাশ মানেই, হার মেনে নেওয়া। তা হতে দেওয়া যায় না। শেষ মূহুর্ত অবধি নিজের সম্মানের জন্য লড়াই করে না গেলে, সে কেমন মেয়েমানুষ! কেমন নারীজাতি!

—’ তিতির কোথায়? ‘

কু'টিল চেহারাটা আরও তী'ক্ষ্ণ হলো ইয়াজের। দাঁতে দাঁত পিষে অতর্কিত চেপে ধরলো মেয়েটার গলা। তমার মনে হলো থা'বা বসেছে গলায়। শ্বা'স বন্ধ হয়ে গেলো। গোঁ গো করলো শ্বাস নিতে, মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে।

—’ তিতির কোথায়, সেটা আমি বলবো? বলবি তো তুই। ‘

—’ আমাকে দয়া করে স্পর্শ করবেন না। আমি জানি না, তিতির কোথায়!’

ঝটকা দিয়ে বি'ছানায় ফেলো দিলো মেয়েটাকে। এক হাঁটু বিছানায় ঠেকিয়ে বাঁ হাত বিছানায় ভর রেখে ঝুকলো।

—’ তিতির কে কি দরকার ? দেওয়ান বাড়ির যেকোনো মেয়ে হলেই চলবে আজ রাতে। ‘

—’ অভিনয় টা বেশ ভালো করেই করে গিয়েছেন, এতগুলো দিনে। ‘

—’ না হলে দেওয়ান বাড়ির মেয়ে তিনটে বছর আমার প্রেমে হাবুডুবু খায়? ‘

—’ আদতে আপনি একটা জা'নোয়ার। আমি সেদিন ভুল দেখিনি তাহলে…’

কথা শেষ হয় না। সজোরে থা'প্পড় পরে মেয়েটা ফুলো গালে। দাঁত নড়ে গেলো বোধহয়। শব্দ করে কেঁদে ফেললো তমা। পা গুটিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আগেই টান পরলো পায়ে। হিড়হিড় করে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো ইয়াজ। তপ্ত গলায় বললো,

—’ তোমাদের বাড়ির সবার সমস্যা কি জানো? প্রত্যেকটা এক লাইন বেশি বোঝো। আচ্ছা, তোমার রক্তা ক্ত দেহটা কাল তোমার ভাইকে উপহার দিলে কেমন হয় ? ভালো না ? ‘

বিষ্ফরিত নয়নে তাকিয়ে রইলো তমা। কাঁদছে হেঁচকি তুলে ।

—’ আর একটা কথা । কেমন হয় তোমার খু নের মামলায় তোমার ভাইকে ফাঁসিয়ে দিলে? "নিজের প শুত্ব ফলাতে গিয়ে, ঈশান আরশাদ দেওয়ান বলি দিলেন – নিজেরই আপন চাচাতো বোনকে।" হেডলাইন হবে। ওয়াহ্। সেরাহ্। তাই না? ‘

—’ এই খু ন, ধ র্ষন সব আপনার করা ? ‘

—’ না তো। ঈশান আরশাদের। সত্যি। তিন সত্যি। তোমার কসম, সুইটহার্ট । নাহ, নাহ। তোমার নূরি আপুর কসম। আমি ভদ্রলোক। পুরোপুরি। ‘

—’ আমাকে নিয়ে এসেছেন কেনো? ‘

— ভাবো ভাবো। ততক্ষণে আমি সিগারেট টা জ্বালাই। ‘

বিছানা ছেড়ে সরে গিয়ে পকেট থেকে সিগারেট জ্বাললো লোকটা। ব্যাস্ত হাতে গায়ের শার্টটা খুলে মাটিতে ফেললো। রুহ অবধি কাঁপলো তমার। এই মূহুর্তে চোখের সামনে ভাসছে আরেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ। অনাকাঙ্ক্ষিত কি? নাহ। বড্ড কাঙ্ক্ষিত। এখন তার সাথে যে সর্বনাশ ঘটতে চলেছে, সেটার সম্পূর্ণ হকদার হিসেবে তমা আজীবন যাকে ভেবে এসেছে, সেই পুরুষের মুখ ভাসছে। তমা ঠোঁট টিপে, চোখ বুজে ফেললো। ঝরঝর করে কেঁদে, অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,

—’ ন-নয়ন ভা-ইই। ‘

ইয়াজ ঘামছে। হাতের সিগারেটটা উ'ন্মাদের মতো টেনে শেষ করছে। তমা আতঙ্কিত হলো বড্ড। পালানোর কোনো উপায়ই নেই তবে। খোদা কে ডাকলো ব্যাগ্র কন্ঠে। নিজের সম্মান ভিক্ষা চেয়ে আর্তনাদ করে গেলো নিঃশব্দে। নয়নকে শেষ বারের মতো ব্যাক্ত করে গেলো কিছু বলতে না পারা আক্ষেপ।

—’ যে পুরুষের কাছে কলঙ্কহীন একটা নারী হয়েও, বিন্দুমাত্র ভালোবাসা পেলাম না। তার কাছে এই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে কি করে আর , ভালোবাসার দাবি জানাবো! আজকে থেকে আপনার কাছে আমার ভালোবাসার দাবি ফুরালো, নয়ন ভাই । আপনি একজন ভালো, চরিত্রবান জীবনসঙ্গী ডিজার্ভ করেন । আমাকে ভুলে যাবেন কি? নাকি ঘৃনা করবেন? আপনার ভুলে যাওয়া, সইবে আমার। তবে ঘৃ না সইবে না। আমি ছিলামই না আপনার জীবনে। তমা বলে কেউ ছিলো না। কেমন? ভুলে যাবেন। ‘

ইয়াজ হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে কা'মুক চোখে পিছনে তাকাতেই, খোদাকে আরেকদফা ডেকে উঠলো মেয়েটা।

—’ কাউকে ডেকে লাভ হবে না, সুইটহার্ট। ‘

—’ আপনি আমার বোন কে ভালোবাসেন, বলেছিলেন। তিতির যদি কখনো জানতে পারে। আমার মৃ ত্যুর জন্য আপনি দায়ি। তখন? ও ইহজীবনে আপনার হবে বলে মনে করেন? ‘

বিজ্ঞের মতো ডানে- বায়ে মাথা নাড়লো লোকটা। আফসোসে যেনো ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে। এমন মুখ করে বললো,

—’ সেটাই তো। তোমাকে আমার নিচে পি ষ্ট করার কোনো শখ বা পরিকল্পনা, কোনোটাই ছিলো না, সুইটহার্ট। ওটার পরিকল্পনা হয়েছে আজ সন্ধ্যায়। কেনো? জানতে চাও না? ‘

তিরতির করে কাঁপছে মেয়েটার ঠোঁট। তাকে কিছু জিজ্ঞেস ও করতে হলো না। ইয়াজ প্যান্টের বেলে হাত রাখতে রাখতে বললো,

—’ তোমার বোন কি বলেছে জানো? ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সব পাপ সে মাফ করতে রাজি। কিন্তু আজকে তোমার যদি কিছু হয়ে যায়– তাহলে সে কখনো ঈশান কে মাফ করবে না। এখন তুমিই বলো, তিতির যদি ঈশানকে মাফই করে দেয়। আমার লাভ না ক্ষতি? অবশ্যই ক্ষতি? আর কাল যদি খবরের হেডলাইন হয় – তোমার খু ন ঈশানের হাতে! ভাবতে পারো। চেকমেট! তাই না? হুম? ‘

চলবে ইনশাআল্লাহ 🥀

[ চেকমেট? হু? কি বুঝলেন? প্রতিটা অংশ একে অপরের সাথে কানেক্টেড। প্রচুর ভাবার বিষয় আছে পর্বটায়। বুঝলেন কি? কাল যবনিকা পাত হবে সবের। আমার মুখে শুনতে চান তো? কাল আমি ক্লিয়ার করবো। আপনাদের আন্দাজের দিন আজই শেষ। শেষ বারের মতো ভাবেন। 🙆‍♀️🌚💋

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন