#সাঁঝের_মায়া [ পর্ব ৭০ ( ১ম অংশ) ]
#দুর_এ_দিলশাদ_দুআ
— ‘ আ-আপনিই…আপনি সুস্থ আছেন ? খোদার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া । আমি তো ভয়ই…’
তিতিরের দূর্বল ঠোঁটজোড়া কথাগুলো শেষ করতে পারে না । তার আগেই আ'গ্রাসী আ'ক্রমণ পরে পাতলা অ'ধরজোড়ার ওপর । মেয়েটার ফ্যাকাসে হয়ে আসা মুখটা রঙ ফিরে পায় আচমকাই । কালি পরে যাওয়া চোখজোড়া সিক্ত হয়ে ওঠে নোনা জলে। ক্যানোলা পরানো হাতটা উচিয়ে স্পর্শ করতে পারে না ঈশানকে। ঈশানই ঝুঁকে, নিজের বলিষ্ঠ শরীরের নিচে আড়াল করেছে মেয়েটাকে। তিতির আজকে মোটেই ছটফট করে না। শান্ত হয়ে থাকে। ঈশানকে নিজের মতো করো অনূভব করতে দেয়, শু’ষে নিতে দেয় নিজের ঠোঁ’টের মিষ্টত্বটুকু।
—’ আমি সুস্থ আছি কি-না, সেই প্রশ্নের জবাব ও তোর ওপর নির্ভর করে, তিতির । তোকে পাচ্ছিলাম না। গোটাটা দিন, পাগলের মতো ছুটেছি এদিক থেকে ওদিক । শেষমেশ কোথায় গিয়ে থামতে হয়েছে জানিস ? শুনতে চাস? ‘
তিতির উঠে বসার চেষ্টা করলো। সাহায্য করলো ঈশানই। দু'হাতে আলতো ছুঁয়ে উঠিয়ে বসালো স্ত্রী কে। নিজেও বসলো বেডের একটুখানি জায়গার মধ্যেই। তিতিরের দু'পাশে দীর্ঘ বেণি। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে। ঠোঁট জোড়া শুষ্ক হয়ে থাকলেও, ঈশানের ভেজা আদরে এ বেলা ভিজে উঠেছে। মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। ঈশানের শরীরে অসহায় দৃষ্টি বুলালো। কেমন অসুস্থ লাগছে তাকে। ধীর গলায় শুধালো,
—’ কোথায় গিয়েছিলেন? ‘
ঈশান স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। তারপর দম ছেড়ে হাসফাস করে বললো,
—’ যেখানে প্রান হীন মানুষগুলোকে বড্ড অবহেলায় হিমায়িত করে রাখা হয় । শেষ বিদায়ের আগ মূহুর্ত অবধি একটা বেওয়ারিশ মৃ*ত মানুষের স্থান যেথায় । ম*র্গে… ‘
তিতির চকিত হয়ে তাকালো স্বামীর রক্তিম মুখপানে । ঈশানের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া এখন অসহায় দেখাচ্ছে।
—’ ম*র্গে গিয়েছিলাম, তিতির। তোকে খুঁজতে । ওই ঘরটায় কারোর প্রাণ ছিলো না, জানিস? কেউ শ্বাস নিচ্ছিলো না। সবাই ক্লিনিক্যালি মৃ*ত। অথচ একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছিলো ? আমি জীবিত হয়েও শ্বাস নিতে পারছিলাম না তখন। একটা কাফনে মোড়ানো লা*শের সামনে গিয়ে আমাকে বলা হলো, এটা তুই। সনাক্ত করতে হবে আমাকে। ‘
ঈশান নিজের কম্পিত হাত জোড়া বাড়ায় তিতিরের দিকে। নিজের হাতের দিকে ইশারা করে জড়িয়ে আসা গলায় বলে,
—’ এই হাতজোড়া কাফনের কাপড় সরিয়েছে । সেই কাফনের নিচে তুই থাকতে পারিস, এটা ক্রমাগত বলা হচ্ছে আমাকে। আর আমি…’
হা করে শ্বাস টানলো ছেলেটা। ঝুকিয়ে ফেললো মস্তিষ্ক। তিতির তখনো ছলছল চোখে কেবিনের বেডের হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে বসা। ঘুমের ওষুধের তীব্রতায় চোখ ভেঙে আসছে। ঈশানেরা মশ্রিন গালে পানির কনা গড়িয়ে পরতে দেখা মাত্র ঝাঁপিয়ে পরলো স্বামীর বুকে। তৎক্ষনাৎ ঈশানের বাহুবন্ধনীতে আটকা পরলেও, চোখমুখ খিঁচে নিলো ছেলেটা । বাঁ পাশের ক্ষতটায় তখনো কোনো সেবা শুশ্রূষা পরেনি। নিয়াজ কোনোমতে ব্যান্ডেজ করে ব্লিডিং বন্ধ রেখেছে। তবে ঈশানকে মুখ ফুটে বলতে হলো না কিছুই। ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরা মাত্রই শরীরের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা খেয়াল করলো তিতির। মুখ তুললো বলিষ্ঠ বুকের ওপর থেকে। ক্যানোলা বিহীন ডান হাতের তালু চওড়া কপালে ঠেকাতেই বর্ণহীন হলো মুখটা।
—’ আপনার তো অস্বাভাবিক জ্বর, ঈশান ভাই। এই শরীর নিয়ে… ‘
—’ ও কিছু না । জ্বরের ওষুধ ও পেয়ে গিয়েছি তো। এখন সেরে যাবে। নেমে যাবে জ্বর । ‘
ঈশান খানিকটা পিছিয়েই বসতে চাইলো। মেয়েটা আরেকদফা ঝাঁপিয়ে পরলে, তার ক্ষত স্থান থেকে র*ক্ত গড়িয়ে পরতে দুবার ভাববে না। এমনিতেই ভেজা অনূভুত হচ্ছে। তিতিরের এই শরীরের অবস্থায়, সে মোটেই টেনশন দিতে চাচ্ছে না মেয়েটাকে । তবে ঈশানের সে ইচ্ছে টা পূরণ হলো না। কারণ ছাঁই রঙা শার্টের বাঁ পাশটা, রক্তিম হয়ে উঠেছে । সেদিকে চোখ যেতেই আরেকদফা আতঙ্কিত দেখালো মেয়েটাকে।
—’ এখানে কি হয়েছে? র*ক্ত লাগছে। কি এসব। কি হয়েছে আপনার ? ‘
মেয়েটার ব্যাস্ত হাতজোড়া উঠে এসেছে সেখানটায়। ঈশান লক্ষ্য করলো তিতিরের বাঁ হাতের ক্যানোলায় র*ক্ত উঠে পরেছে। সে হাতটা দ্রুত নিজের হাতে নিয়ে, সেটা ফিক্সড করতে করতে ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ আহ্। আমার গায়ে কিসের র*ক্ত সেটা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে, নিজের শরীরের কথা খেয়াল নেই। এতো ছটফট করছিস কেনো? ‘
—’ আপনি বলছেন না কেনো? কিসের র*ক্ত? ‘
—’ মানুষ খু*ন করে এসেছি। ‘
—’ হেয়ালি করবেন…’
থেমে গেলো তিতির। ঈশান তার হাতের ক্যানোলা ঠিক করতে ব্যাস্ত। কিন্তু মানুষ খু*নের কথাটা কানে আসতেই থমকালো সে। গত রাতের কথা ভেসে উঠলো মানসপটে। ইয়াজ মির্জা একটা ভিডিও দেখিয়েছে তাকে। সেখানেও…গা ছমছম করে উঠলো মেয়েটার। শান্ত গলায় বললো,
—’ আমাকে ছুঁয়ে আছেন, ঈশান ভাই। ‘
—’ হুম, তো? ‘
—’ ছুঁয়েই থাকুন । আর একটা প্রশ্নের জবাব দিন। নাহ, একটা নয়। অনেক গুলো প্রশ্নের। যা এতদিন যাবৎ অজানা আমার। আমার দৃষ্টির অগোচরে যা ঘটে যাচ্ছে। যা আপনি একা বয়ে বেড়াচ্ছেন। জানতে চাই আমি সে-সব। ‘
সরু দৃষ্টি তাক করলো ছেলেটা। হাত সরালো না। চেষ্টাও করলো না। হয়তো বা আন্দাজ করতে পারছে, তিতির এই মূহুর্তে কি প্রশ্ন ছুড়তে পারে। সে-ও বলতেই চায়। এই লুকোচুরি যত দীর্ঘ হবে, আচমকাই যে দুরত্ব তৈরি হবে দু'জনের মাঝে– সেটাও দীর্ঘায়িত হবে । তিতির নড়েচড়ে বসলো খানিকটা। ঈশানের দিকে ঘেঁষে আসতে চাইলো। তবে ঢুলঢুলু দূর্বল শরীরটা সায় দিলো না। ফলসরুপ দুরত্ব ঘুচিয়ে কাছে আসলো ঈশানই। যুবকের মুখজুড়ে আশকারার ছাপ দেখে একপ্রকার স্বস্তিই বোধ করলো তিতির। ঈশানের হাতখানা আর একটু শক্ত করে চেপে দৃঢ় গলায় শুধালো,
—’ আপনি কে ? ‘
—’ কে আমি? ‘
—’ সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। কে আপনি। ‘
—’ তোর হাসবেন্ড। তোর রুহ সঙ্গি। ‘
রুহ সঙ্গী শব্দটা কানে বাজতেই জিজ্ঞাসা আরও প্রবল হলো।
—’ আর? ‘
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ান । বাবা মায়ের নাম বলবো? বংশ পরিচয়? জাত-কুল, ধর্ম - গোত্র? ‘
খানিকটা কড়া চোখেই তাকালো মেয়েটা। চোখ ভেঙে আসছে। এমতাবস্থায় এতো হেয়ালি সহ্য হচ্ছে না তার। কেবিনের বদ্ধ দরজার ওপাশে, ছোট্ট এক টুকরো কাঁচের ওপাশে নিয়াজ কে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। রাহাত নেই। জানিয়ে গিয়েছে মা'কে দেখতে যাচ্ছে। ঈশান আসার মিনিট দশেক আগেই বেড়িয়েছে লোকটা।
—’ আপনি বললেন সময় কম। তাহলে এতো হেয়ালি করছেন কেনো? আমাকে মানুষ বলে মনে হয় না? আপনি বললেন, আপনি আমার হাসবেন্ড, রুহসঙ্গী। এবার একটাবার ভাবুন তো। ভেবে সঠিক জবাব দিন আমাকে। আপনার সম্পর্কে এক আকাশ সমান জিনিস অজানা আমার। এই কথাটা দিনের পর দিন ধরে বলে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত সময় চেয়েছেন। দিন তারিখ ঘুরিয়েছেন। আমাকে হাবিজাবি একগাদা বুঝ দিয়েছেন। মেনে নিয়েছি সবসময়। এমন নয় যে, আমি বুঝতে পারিনি কিছু। সবই বুঝেছি। তবে বিশ্বাসও করেছি ততটাই। আপনি যে এমন কিছু করবেন না, যাতে আমার বিশ্বাস ভাঙে এই আত্মবিশ্বাস টা আমার বরাবরই ছিলো। বিয়ের প্রথম থেকে এসব সহ্য করে আসছি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের তিক্ততা সরিয়ে কাছাকাছি এসেছি। নিজে বহুবার বুঝিয়েছি যতদিন না আপনার মুখে পুরোটা সত্যি জানতে পারবো, ততক্ষণ আমাদের মধ্যের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক তৈরি হতে দেবো না। কিন্তু আমিই ব্যার্থ হয়েছি। আপনার ভালোবাসায় বলুন অথবা যাই কিছু। আমি নিজেকে সপেছি আপনার কাছে। পুরোটা। বিলীন করেছি নিজের নারী অস্তিত্ব। যখন আপনি চেয়েছেন, তখনই সায় দিয়েছি। আর প্রতিবার সেই সুন্দর মূহুর্তের পর, আমার একটা প্রশ্নই থাকতো। একটা অনুরোধই থাকতো। সবটা বলুন আমাকে, আমি সত্যিটা জানতে চাই। কে এই ইয়াজ মির্জা, কে-ই বা রুষা। কি সম্পর্ক, কি রেশারেশি ওদের সাথে। যার জের ধরে এতটা, এতটা গভীরে এগিয়েছে সংঘাত গুলো। ‘
দীর্ঘ আক্ষেপ শেষে দম ফেললো মেয়েটা । কান্নার তোড়ে কথা জড়িয়ে আসছে। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে চুপ রইলো কিয়ৎক্ষন।
—’ আপনি আচমকা কিছু না বলে, সেদিন উধাও হয়ে গেলেন । রাতে ফিরলেন না। না তো পরের দিন। আর বাড়িতে পুলিশ আসলো আপনার নামে ওয়ারেন্ট নিয়ে। তা-ও কিসের অভিযোগ! রে*প! ছিহ্। একজন স্ত্রী হিসেবে, এটা কতটা অপমানজনক, বোঝেন আপনি? একবুক বিশ্বাস নিয়ে ওপরে ওপরে স্ট্রং হলেও, আমার ভিতরটা দেখেছেন কি? দেখবেন? জ্বলে গেছে, পুড়ে গিয়েছে। আরও পুড়িয়ে ছাঁই করে দিতে, পরের দিন ডিভোর্স লেটার এসে হাজির। সেটা কবে তৈরি করা? আমরা যেদিন প্রথম…’
নিজেদের প্রথম মধুরাতের কথা মনে করা মাত্রই, এ যাত্রায় ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। ঈশানের হাত ছেড়ে দু'হাতে চেপে ধরলো নিজের মুখ। ঈশান অসহায় হাসলো। সবই জানা তার। মেয়েটাকে শেষ একবার আক্ষেপ প্রকাশের সময় দিতে চাইলো। কান্না থামছে না রমনীর। পাতলা দেহখানা ঝাঁকি দিয়ে উঠছে কান্নার তীব্রতায়। ঈশানের কাছে এ কান্না সহ্য সীমার বাইরের বস্তু। পুরুষালি কঠিন বুকটা কাপে। নিয়ম ভেঙে এলোপাতাড়ি বিট করতে থাকে। শ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। লম্বা হাতজোড়া বাড়িয়ে, রমনীর তুলতুলে পাতলা দেহটা জাপটে নিলো নিজের বলিষ্ঠ বুকে। পুরুষালি পারফিউম আর দেহের ঘামের মিশ্রণে তৈরি ঘ্রানটা বুক ভরে টেনে নিলো তিতির। ঈশানের হাতের আঙুলগুলো বিচরন করছে রমনীর এলোমেলো চুলের ভিতর ।
—’ এতোটা বিশ্বাস কি করে করতে পারে কেউ ? হাসবেন্ড রে*প কেসে এরেস্ট হয়েছে জানার পরেও, যে নারীর বিশ্বাসে একবিন্দুও চিড় ধরে না। ডিভোর্স লেটারে হাসবেন্ড এর সই, চিঠি দেখার পরও যে নারী ভুল না বুঝে, উল্টো খোদার কাছে নত হয়ে আর্তনাদ করে। স্বামীর সুস্থতার, ফরিয়াদ জানায় সব বিপদ কেটে যাওয়ার… আমি কি এমন পূন্য করেছি এ জীবনে? যার ফলসরুপ খোদা, তোকে আমার জন্য হালাল করে দিলো? বল তো? ‘
—’ সেসব কিচ্ছু জানি না আমি। কিন্তু আপনার সম্পর্কে সবটা আজকে আমি জানতে চাই।'
—’ এখনো বিশ্বাস আছে? ‘
—’ আমার প্রশ্নের জবাব দিন আগে । কে আপনি? কেনো এতো লুকোচুরি? আমার আপনার বিয়েটা, এটাও কি অতীতের কোনো ঘটনার জের ধরে? নাকি সত্যিই কাকতালীয়ভাবে পরিবার থেকে হয়েছে। আ-আমি…আ-আমি আপনাকে খু*ন করতে দেখেছি। কেনো? কি কারণে এতো নৃশংসতা? হ্যা? ‘
খু*ন করতে দেখেছে মেয়েটা । কে দেখাতে পারে সেটা বুঝতে দেরি হয় না তার। তিতিরকে সোজা করে বসিয়ে আচমকাই একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো। প্যান্টের পিছন দিকটায়, শার্টের নিচে গুঁজে রাখা বন্দুক খানা বের করে সোজা ঠেকালো রমনীর কপালের মাঝামাঝি। হিসহিসিয়ে বললো,
—’ খু*ন করতে দেখেছিস আমাকে । আমি কতটা নৃশংস সেটাও দেখেছিস। তারপরও এই বুকে আছড়ে পরে এতো অভিযোগ জানালি। ভয় করছে না? ‘
একপেশে হাসলো মেয়েটা। দূর্বল হাতটা তুলে স্পর্শ করলো ঈশানের বন্দুক চেপে রাখা হাতের কবজি।
—’ নাহ তো। করছে না । ‘
—’ তোর কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছি। তাও না?’
—’ নাহ। ‘
—’ কেনো ভয় পাচ্ছিস না আমাকে? কি এমন করেছি তোকে। আমার হাতে অস্ত্র দেখেও রুহ কাঁপছে না তোর। খারাপ মনে হচ্ছে না আমাকে? ‘
—’ হচ্ছে না । ‘
—’ বিশ্বাস নাকি ঘৃ নায়? ‘
—’ ভালোবাসায় । ‘
—’ ভালোবাসায় ভুল দেখতে নেই? ‘
—’ ভুল শোধরানো যায় । অন্যায় নয় । কোনটা করেছেন ? ভুল নাকি অন্যায় ? ‘
—’ অন্যায় । ‘
ঈশানের একেরপর এক প্রশ্নের জবাব মন্ত্রমুগ্ধের মতো আউরিয়ে শান্ত হলো দু'জনেই। ঈশানই মুখ খুললো আবারও।
—’ মানুষ হ*ত্যা করেছি আমি। একজন নয়। অনেকজন। ‘
—’ কারণ তারা রে*পিস্ট ছিলো তাই তো? ‘
এতক্ষণ সেরকম গুরুত্ব না দিলেও এবার চমকালোই ছেলেটা। ঘাড় বাঁকিয়ে দরজার দিকে তাকালো। সময় খুবই কম। সে চলেই যাচ্ছিলো। সেসময় তিতিরের জ্ঞান ফেরায় থমকাতে হয়েছে তাকে। ভাগ্যিস জ্ঞান টা তখনই ফিরেছিলো। ঈশান নিজের কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে শুধালো,
—’ কে জানিয়েছে তোকে? ইয়াজ মির্জা? ‘
ডানে - বায়ে মাথা নাড়লো তিতির।
—’ নিজের দোষের কথা কেউ নিজ মুখে স্বীকার করে? ‘
তেলতেলে কপালের মাঝে গোটা তিনেক ভাজ ফেলে তাকিয়ে আছে ঈশান
—’ মানে? ইয়াজ মির্জা স্বীকার করেছে তোর কাছে? ‘
—’ নাহ। ‘
—’ তাহলে? '
---' আমার আন্দাজ ছিলো সবটা শুরুতে। আমাকে কিডন্যাপ। তারপর ওনার একের পর এক বলা কথাগুলো। আর…’
—’ আর? ‘
—’ ওনাকে আপনি সামনা-সামনি দেখেেন? ‘
মাথা ঝাকালো ঈশান। দেখেছে সে। কয়েকবার দেখা হয়েছে দু'জনের।
—’ গত কালও ভিডিও কলে দেখেছি। ইভেন, তমা এখনো ওর কাছেই আছে। ‘
—’ আমি কিন্তু দেখিনি ওনাকে। আমার সামনে উনি মুখ খুলে আসেনি। কালো কাপড়ে ঢাকা ছিলো। একই ঘরে, অথচ মাঝখানটায় একটা কাচের পারটিশন দেওয়া। দু'পাশে দু'জন। স্পিকার এ কন্ঠ শুনেছি ওনার। এতো লুকোচুরি কেনো আমার থেকে, আন্দাজ করতে পারেন? ‘
আন্দাজ করতে পারে না ঈশান। তিতিরের থেকে লুকিয়ে থাকার মতো কিছু নেই। লুকিয়ে যদি থাকতেই হতো, সেটা ঈশানের থেকে। তবে লোকটা সেটা করেনি। উল্টো ওপেন চ্যালেন্জ ছুড়ে বরাবরই মুখোমুখি হতো তার।
—’ নাহ। ‘
—’ আপনি সব জানেন? ওর সম্পর্কে? ওর কুকীর্তির সম্পর্কে। মানে, আমি যেসব কে আন্দাজ বলছি, সে-সব কি সঠিক? ‘
স্বীকার করতে বাধ্য হলো ঈশান। ধীর কন্ঠে বললো,
—’ সঠিক। ঈয়াজ মির্জাই রে*পিস্ট। ‘
—’ আপনার কাছে প্রমান আছে?’
—’ আছে। ‘
—’ তাহলে ওকে পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছেন না কেনো? ‘
—’ প্রমান তো ও আমার বিরুদ্ধেও সাজিয়েছে। ‘
—’ মানে? ‘
—’ মানে অনেক কিছু, তিতির। যা অতীত, তা বর্তমানের সাথে খাপ খাওয়ানো বড্ড মুশকিল। প্রমান পরিবর্তন করা খুব সহজ কথা। মিথ্যা খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যর ক্ষেত্রে তা খুব কঠিন। বিগত পাঁচ বছর যাবত যা হয়ে আসছে। তা আমার দু একটা প্রমানে পুলিশ কেনো বিশ্বাস করবে? আমার বিরুদ্ধেও সে-সব প্রমান আছে। ‘
—’ তাহলে উপায়? ‘
—’ সেটাই তো করে যাচ্ছি। আমরা অতীতকে বিশ্বাস না করতে পারি। ভরসা না-ই করতে পারি। কিন্তু চাক্ষুষ প্রমান? সেটা কি? সেটার জোর অনেক। ইয়াজ মির্জার মতো পাকা ক্রিমিনাল কে হটকারিতায় ফসকাতে পারি না আমি। ওর বিরুদ্ধে জোরালো প্রমানগুলো তখনই কাজে দেবে, যখন আমি বর্তমানেও ওকে দোষি প্রমান করতে পারবো। বুঝলি কিছু? অপরাধ করার সময় পাকরাও করবো ওকে আমি। ‘
—’ সেটা কি করে? ‘
—’ সেটাই ভাবছিলাম এতদিন। আচমকা তুই আর তমা ওর ডেরায় আটকা পরে সব গোলমাল করে দিলি । আমার দূর্বলতা ও সবসময় খুঁজে বেড়াতো। এখন জানে আমার দূর্বলতা কি, কে! সেখানেই হাত বাড়ায় ও।'
ঈয়ান শ্বাস ফেললো। তারপর মিহি গলায় ডাকলো,
---' তিতির?
—’ হুম। ‘
—’ আমি অন্যায় করেছি। মানুষ হ*ত্যা মহাপাপ…’
বন্ধ চোখজোড়া খুললো মেয়েটা। হাত বাড়িয়ে ঈশানের গালে হাত রাখলো। উষ্কখুষ্ক দেখাচ্ছে মানুষ টাকে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি গালভর্তি। নিজের যে যত্ন নেয়না, সেটা এক লহমায় বলে দেওয়া যায়।
—’ রাকিন, ইয়াজ মির্জার ভাই? যাকে আপনি মে*রেছেন? ‘
—’ হ্যা । ওউ রে*পিস্ট। ‘
—’ সেই প্রতিশোধ নিচ্ছে? ‘
—’ হু। ‘
তিতির আদুরে গলায় বললো,
—’মানুষ হ*ত্যা মহাপাপ। রাকিন কে কি মানুষের কাতারে ফেলা যায় ? অথবা ইয়াজ মির্জাকে? ধ*ধর্ষনকারীদের শাস্তি সম্পর্কে অবগত আমিও। ধর্ম বলুন অথবা আইন। খানিকটা জানি আমিও। আপনি অন্যায় করেননি। একজন সত্যিকারের পুরুষ হিসেবে, সাধারান নাগরিক হিসেবে…’
—’ আমি সাধারণ নাগরিক নই তিতির । ‘
—’ আপনি…’
ঈশান মেয়েটার দু-হাত নিজের হাতের মুঠোতে চেপে শুষ্ক চুমু আঁকলো।
—’ এই ইয়াজ মির্জা নামক অভিশাপ আমাদের মাথার ওপর থেকে সরাতে, কাজ করি আমি। দেশের হয়ে। আইনের হয়ে। আইন আমাকে দিয়েছে এই দায়িত্ব। আমি…আমি… শুধু তোর হাসবেন্ড বা দেওয়ান বাড়ির ছেলে নই। এর পাশাপাশি আরও পরিচয় আছে আমার। যেটা আমি জানাতে অপরাগ। আমার পেশাই এটা। ‘
তিতির বিস্ফরিত নয়নে তাকাতেই, টুপ করে মেয়েটার চোখের পাতায় চুমু আঁকলো ঈশান। ফিসফিস করে বললো,
—’ NIB তে আছি আমি। বিগত ছয় বছর যাবৎ। এই কেসটা নিয়ে কাজ করছি শুরু থেকেই। স্পেশাল অপারেশন এটা। সেখানকার সিনিয়র আন্ডারকভার অফিসার আমি। ‘
দম নিলো ঈশান। মেয়েটার পেলব গালের ওপর নিজের খসখসে হাতটা স্লাইড করে বোঁচা বোঁচা নাকের ডগার ওপর, ঠোঁট ছুঁয়িয়ে বললো,
—’ আমি অন্ধকারের মানুষ তিতির। আর তুই? তুই আমার জীবনের জোনাকি। তোর এক টুকরো আলোতে খানিকটা হলেও, শান্তির ছোঁয়া পাই আমি। কিন্তু তুই কিভাবে কবুল করবি এই অন্ধকার কে। আর এই অন্ধকারে মোড়া আমি’কে? ‘
তিতিরের ঘোর তখনো বোধহয় কাটেইনি। শরীর শিরশির করছে শিহরণে। ঈশানের স্বীকারোক্তি তে হত-বিহবল সে। কপালে কপাল ঠেকানো দু'জনের। চোখজোড়া বুঁজে আছে। স্বামীর তপ্ত হাতের আদুরে বিচরন তার পেলব গালে। সেথায় হাত ছুঁয়িয়ে ফিসফিস করে বললো,
—’ জোনাকির অস্তিত্ব অন্ধকার ছাড়া দৃশ্যমান হয়না, ঈশান ভাই। দিনের আলোতে জোনাকির অস্তিত্ব টের পেয়েছেন কখনো ? পান নি। তাই না? পাবেনও না। তাহলে? আমি আপনার জীবনের জোনাকি। তাই তো? অন্ধকার ছাড়া আমার অস্তিত্ব মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনাকে কবুল। এ জন্ম, পরজন্ম– আজন্মের জন্য কবুল। আপনার রাগ-জেদ, ন্যায়-অন্যায়, সব কবুল। তিন কবুলের সঙ্গী আমি আপনার। আপনাকে বিশ্বাস করে মৃ*ত্যুও কবুল। ‘
সময় পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। বাইরে সাজিদ কি বলে সময় অতিবাহিত করছে জানা নেই ঈশানের। সেদিকে মনও নেই তার। তিতির নিজের হতবিহবলতা কাটিয়ে উঠলো বেশ সময় নিয়ে। ঈশানের এমন একটা সত্যি একদিন তার সমানে এসে হাজির হবে। সেটা কি আন্দাজ করেছিলো কখনো? করেনি তো। একদম করেনি।
নিজের চাকরিজীবন নিয়ে খুটিনাটি একেরপর এক বলে যাচ্ছে ঈশান। আর সে-সব কর্ণগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু একটা৷ তিতির চুপচাপ বসে ভাবলো কিছু একটা। অবচেতন মন এলোমেলো অনেক কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু ধরতে পারছে না সেটা।
—’ আমাকে ইয়াজ মির্জার ছবি দেখাতে পারেন আপনি? ‘
—’ হুম। কেনো? ‘
তিতির ঠোঁট টিপলো। কিছু একটা মনে পরতে গিয়েও পরছে না। চোখ বুজলেই একজোড়া তীক্ষ্ণ অথচ মায়াবী চোখ ভেসে উঠছে তার মানসপটে। তীক্ষ্ণ চোখজোড়া কেমন অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তৎক্ষনাৎ সিক্ত হচ্ছে। যেনো একই মানুষের দুই রুপ। আগুন আর পানি!
—’ ঈশান ভাই? ছবিটা জলদি দেখান তো। ‘
ঈশানও জলদিই বের করে ছবিটা। ফোনের ফোল্ডার ঘেঁটে একখানা সুদর্শন যুবকের ছবি তিতিরের দিকে বাড়িয়ে ধরতেই বজ্রাহত হলো মেয়েটা। ঝাঁকি দিয়ে উঠলো গোটা টা শরীর। এক মূহুর্তের জন্য দুঃস্বপ্ন মনে হলো সবকিছুই। পাতলা ঠোঁটজোড়া শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়েও থেমে গেলো। কপালের কাটা দাগ! সেই তীক্ষ্ণ চোখ। এতো সহজে কিভাবে ভোলে সে। হতভম্বতার মাঝেই আরেকটা ঝটকা লাগলো। নিজের অবচেতন মন, যে কথাটা বারংবার স্মৃতির পাতায় আনতে গিয়েও আনতে দিচ্ছিলো না। সেটাও স্পষ্ট হলো। এই কাটা দাগ সে দেখেছিলো নদীর তীরে জ্ঞান হারানোর সময়। তমা ছিলো ঠিক তার পাশেই। মেয়েটা তখন বিরবির করে কথা বলছে। তিতির সুস্থ আছে দেখে, এক চিলটে হাসিও ফুটেছিলো মুখে। সে-সময়ই সাক্ষাৎ ফেরেশতার মতো হাজির হয় একজন ব্যাক্তি। ব্যাক্তিটির কপালের বিভৎস কাটা দাগটিই সবার আগে নজরে আসে মেয়েটার। জ্ঞান হারানোর লগ্নে এক মূহুর্তের জন্য ইয়াজ মির্জাকেই মনে করেছিলে সে। আতঙ্কিত হয়েছিলো সে-কারণেই। তবে সে ধারনাকে ভুল প্রমানিত করে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ বড্ড নিরাপর এক ব্যাক্তির কন্ঠস্বর, কানে এসে বেজেছিলো তার। ছোট্ট একটা শব্দ শুনতে পেরেছিলো। “পরীই।”
তিতির ছলছল চোখে তাকালো ঈশানের দিকে। অস্ফুটস্বরে বিরবির করে বললো,
—’ রাহাত ভাই! ‘
বর্তমান—
—’ তোর বাপ এইটা। তারে এতো তোয়াজ করতেছি দেইখা হ্যাবলার মতো তাকায় আছে । চালাক মনে করছিলাম। সিরিয়াল কি*লার যেহেতু। এ তো দেখি আস্ত আহাম্মক। যার পিছনে যুগ যুগ ধরে পরে আছিস, তার আইডেন্টিটি জানিস না? আইন রে আইন চেনায়। চেনোস এইটা কে? ‘
ঘরজুড়ে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে যেনো। তাহমিদের বিতৃষ্ণা মাখা কন্ঠে বাকিরা হেলদোল না করলেও, রাহাত ঠিকই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাহমিদ পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসা তখনো। তিতির দাড়িয়ে ঈশানের ঠিক পিছনটাতেই। চোখেমুখে রাহাতের জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। রাহাত শুকনো ঢোক গিলে কদম বাড়ালো। উপস্থিত সবার বন্দুক তাক করা তার দিকে। ঈশানের মুখোমুখি এসে নিচু গলায় বললো,
—’ আমাকে তিতিরের সাথে একমিনিট কথা বলতে দেওয়া সম্ভব? ‘
—’ নাহ। ‘
মূর্তিমান মানবের মতো জবাব দিলো ঈশান। সাজিদের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করলো। ওদের নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার যে আদেশ টা ছোড়া হয়েছিলো, সেটা দ্রুত কার্যকরের নির্দেশ দিচ্ছে ইশারায়। সাজিদ আর সময় নষ্ট করে না। দু'জন হাবিলদারের সহায়তায় তাহমিদ কে নিয়ে বের হয় ঘর থেকে। সঙ্গে তমা।
—’ সাজিদের সাথে যা । আমি এদিকটা সামলে ফিরবো । ‘
—’ আমি যাবো না আপনাকে রেখে। ‘
তিতির নাকচ করলো তৎক্ষনাত। এখন আর বউকে সোহাগ করার সময় নেই দেওয়ান সাহেবের। অন ডিউটি অফিসার সে। ঘরভর্তি সবাই তার জুনিয়র, তার আন্ডারে।
—’ আমাকে রেখে মানে কি! আমি ডিউটি টে আছি। একজন মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল কে এরেস্ট করবো। একে বাইরে নেওয়া মাত্র প্রেস, মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পরবে। আমি নিজের মুখ রিভিল করতে পারি না। আমি একজন আন্ডারকভার অফিসার। যেভাবে এসেছিলাম, বের হতে হবেও সেভাবে। তোকে আগলাবো কি করে? আমার বউ তুই। এটা জানাজানি হলে, টপ নিউজ হয়ে বসে থাকবো দু'জনে। এটা ঠিক? এতোদিন লুকোচুরি করে কি লাভ তাতে! ‘
তিতির শুনলো। বুঝলো অবস্থাটা। এখন মোটেই আবেগ দেখানোর সময় নেই। তাছাড়া এত এত বন্দুকের নলের মুখ থেকে আর পালানো সম্ভবও নয় রাহাতের। ঈশানের দিকে অসহায় দৃষ্টি তাক করে, সাজিদের পিছু পিছু পা বাড়াতেই, একগাদা বন্দুকের নিশানাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে রাহাত হুমড়ি খেয়ে পরলো তিতিরের পায়ের কাছে। মেয়েটা সবেই পা জোড়া বাড়িয়েছিলো কদম ফেলতে। রাহাতের দু'হাতের বাঁধ
। বিস্ফোরিত নয়নে পিছু ফিরতেই আর্তনাদ করে উঠলো ছেলেটা।
—’ আমার জীবনে আগে আসো নি কেনো, পরী। এই ভুল গুলো আমি করতাম না। এই পাপে জড়াতাম না। যে আমি'র গোটা টা জীবন কেটেছে মানুষের লা*শের ওপর দাঁড়িয়ে। একের পর এক মানুষের দেহ থেকে প্রাণ আলাদা করতে দু সেকেন্ড ভাবিনি। সেই আমি থমকে গিয়েছিলাম বছর ছয়েক আগে। তোমাকে মারতেই গিয়েছিলাম। সেটা অস্বীকার করার কোনো রাস্তা নেই। করবোও না আমি। কিন্তু আমার মতো পাষান একটা লোকও সেদিন নিজের নিশানা মিস করেছিলো। হুশ খুইয়ে ছিলো। স্ব-ইচ্ছায়। ‘
তিতির আতঙ্কিত লোচনে একবার তাকালো ঈশানের দিকে। ছেলেটার চোখমুখ পাথর হয়ে গিয়েছে। চেয়াল শক্ত করে কটমট করে তাকিয়ে আছে এদিকটাতেই। রাহাতের দু-হাত তিতিরের পায়ের পাতার ওপর ছোঁয়ানো। তাহমিদ খেদোক্তি ঝেড়ে উঠলো দরজার ওপাশ থেকে। দু'পাশে দুজন হাবিলদার ধরে আছে তাকে। তাদের কাঁধের ওপর ভর করে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরলো। রাহাতের মতো পুরুষকে ওমন করে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পরে থাকতে দেখে যথাপরং বিরক্ত সে। খেদোক্তি ঝেড়ে বললো,
—’ তিতির বলেছিলো, তাকে পেতে হলে বারো ঘাটের জল খাওয়া পুরুষ হতে হবে। এক্সপেরিয়েন্সড থাকা লাগবে! ননসেন্স কোথাকার। ‘
হাবিলদার দু-জনকে ইশারা করে আদেশ ছুড়লো তাহমিদ।
—’ এই চলুন তো। এই লোকটাকে দেখে আমি হতাশ। একটা সিরিয়াল কি*লারের পারসোনালিটি কেনো এতো ছ্যাচড়া হবে। আশ্চর্য। আমি কল্পনা করতাম যে সিরিয়াল কি*লার কে। তার সাথে এক কানাকড়িও মিল নেই। আরেহ্ ভাই। তুই সিরিয়াল কি'লার। তোকে ধরতে গোটা দেশ হুমড়ি খেয়ে আছে। তুই দেশ সহ ইনটারন্যাশনাল নিউজ হচ্ছিস। তুই কেনো একটা মেয়ে মানুষের জন্য হেদিয়ে মরবি! তখন বি* চ বলে গালি দিয়ে এখনো পা ধরে নিজে বেচারা সাজা হচ্ছে! ফালতু যত্তসব। ঈশান স্যার কে সন্দেহ করে তাও একটা মানসিক শান্তি পেয়েছিলাম। ভিলেন হো, তো এয়সা হো। তা না। কোথা থেকে কি এসে হাজির। চলুন, চলুন…’
রাহাতের স্পর্শ থেকে পালাতে, তিতির হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে আসে।
—’ আপনি পাগল হয়েছেন। ভালোবাসার মানে কি বোঝেন? এত কিছুর পরও…’
—’ আমি সব তোমার জন্য করেছি। পরীই। ‘
—’ আমি আপনাকে রে*পিস্ট হতে বলেছিলাম? ‘
—’ আ-আমি তোমাকে ঈশানের আগে থেকে ভালোবাসি। বলো? ছয়টা বছর। তোমার জন্য ইমতিয়াজ থেকে রাহাত হয়ে থেকেছি দিনের পর দিন। নিজের অস্তিত্ব কে ভুলতে বসেছিলাম। নিজের জীবনের কালো দিক মুছে গিয়েছিলো তোমার উপস্থিতিতে। অথচ, আবার সেই ঈশান। ওই একটা মানুষের জন্য আমার সব ধ্বংস হয় বারবার।’
বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠলো মেয়েটার মুখে। শক্ত গলায় বললো,
—’ খোদার বিচার বলে এটাকে । দিনের পর দিন, মেয়েদের সাথে অন্যায় করে যাবেন। আর আপনার কপালে খোদা সংসার রাখবে? ‘
—’ ঈশান কেনো পেলো সব। ‘
—’ প্রশ্নটা বড্ড বাচ্চাদের মতো হয়ে গেলো না? আপনি আর ঈশান এক? সম্ভব কখনো? আমার সাথে বিয়ের হিসেব বাদ দিন। তার আগের কথা ধরুন। আপনি ক্রিমি'নাল একজন।'
রাহাত তখনো বড্ড ব্যাকুল। তাহমিদের কথাই সত্য। ইয়াজ মির্জাকে এতটা অসহায় রুপে কখনো দেখা যাবে বা আদৌ সম্ভব কি-না। এটা বোধহয় কল্পনাও করেনি কেউ। গোটা কটেজ পুলিশের কবজায়। ঘরভর্তি সব আইনের লোকজন। এরাই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে দিন-রাত এক করে খোঁজ ছিলো এই ক্রিমিনালের ক্রিমিনালের কাঠিন্যের সাথে লড়াই করতে প্রস্তুত হয়েই ছিলো সব। তবে সামান্য এক রমনীর জন্য এরকম হা-হুতাশ করতে দেখবে এটা ভাবেনি। এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও, ঈশান আর স্থির হয়ে থাকতে পারলো না। ডান হাতের পিস্তল খানা রাহাতের মাথায় ঠেকিয়ে, বাঁ হাতের বন্ধনিতে আঁটকে নিলো তিতিরকে। রাহাতের কপালে পিস্তল টা চেপে, হিসহিসিয়ে বললো,
--' আমার বউয়ের দিকে বিড়ালের মতো সুড়সুড় করে হাত বাড়ালে, আমি বাঘের আগ্রাসী থাবা দেবো না ? পিস্তলে যে কটা গু লি আছে, তোর ম'স্তিষ্কে গেঁ'থে দেওয়ার আগে আমার বউকে, আম্মা বলে ডাক ।'
রাহাতের চোখেও অগ্নিবর্ষণ হলো যেনো। আকুলতা, ব্যাকুলতা মিলিয়ে গেলো কোথায় যেনো। ঝড়ের গতিতে উঠে মুখোমুখি হলো ঈশানের। হুংকার ছাড়লো একই কন্ঠে।
—’ এতো কনফিডেন্স ভালো না, ঈশান আরশাদ দেওয়ান । একদম ভালো না। থানা অবধি নিয়ে দেখা আমাকে। আচ্ছা ধর নিলি, তারপর? ফাঁ’সি? আমি না-হয় পেলাম না তিতিরকে। কিন্তু তুই? তুই ধরে রাখতে পারবি তো? না-কি কোনো একদিন দেখবি এ সবই মরিচীকা হয়ে গিয়েছে? ‘
ঈশান বাঁকা হাসলো। পিস্তল টা আরেকটু জোরে চেপে ধরতে ধরতে বললো,
—’ মরিচীকা? তুই নিজের টা ভাব? বাস্তব জীবনে তুই কিভাবে টিকে থাকিস, সেটার চিন্তা কর আগে। ‘
চলবে ইনশাআল্লাহ 🍂🌼
[ পর্বটা আরও একটু ছিলো, এডিটে কপির বদলে পেস্ট এ লেগে ওইটুকুব কেটে গিয়েছে। এখন আর লেখার ধৈর্য হলো না । গত পর্বের মতো আর দেরি হবে না, ইনশাআল্লাহ। রেসপন্স করুন। জলদিই লিখে ফেলবো। 🌼]
#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৭০( ২য় অংশ) ]
#দুর_এ_দিলশাদ_দুআ
খানিক আগের তাঁরা ঝলমলে আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা এখন । চাঁদ তাঁরা বিদায় নিয়েছে মেঘের আড়ালে । বিশাল আকাশের বুক চিড়ে সরু সরু আলোর ঝলকানি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বেশ ঘনঘন। যেকোনো মূহুর্তে প্রকৃতি তান্ডব শুরু করে দেবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না আর । এলোমেলো বাতাস বইছে সে-ই সন্ধ্যা থেকে। সেটার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের পূর্বাভাসও জোরালো হচ্ছে বেশ করে। রাহাতকে থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শ দুয়েক পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘেরাও করে রেখেছে গোটা কটেজ। সাভারের শুনশান এই এলাকা এখন পুলিশের পদচারণায় মুখর বলা চলে। ভোর হওয়ার আগেই লোকসমাগম এড়িয়ে আসামীকে থানার নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে । ওপর মহল থেকে এরকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আসামীকে ধরার পুরো ক্রেডিট এনআইবির হলেও, ঈশান সন্তর্পণে সেটা সাজিদকে দিতে চায় । প্রথমত নিজের পরিচয় জনসম্মুখে আনতে পারে না সে। এই মিশনের পর ওপর মহল তার পরিচয় সবাইকে জানানোর পরিকল্পনা করলেও, ঈশান তাতে পাত্তা দেয়নি মোটেই। আন্ডারকভার অফিসার হয়ে থাকার সুবিধাও নেহাৎ কম নয়। স্বাভাবিক জনগনের মতো চলাফেরা তার। রাহাত কে ধরার পর, সে সবার সামনে আসলে প্রেস মিডিয়ার নিউজের চক্করে, তার স্বাভাবিক জীবন যাপন অসম্ভব হয়ে দাড়াবে একপ্রকার। তাছাড়া চাকরির শুরুতেই প্রথম কেস ছিলো এটা তার। এর মাঝে ছোট বড় আরও অনেক তদন্ত করলেও, কেস সলভ করলেও মূলত এই কেসের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমেই যাত্রা শুরু হয়েছে তার। গোটা ক্যারিয়ার সামনে পরে রয়েছে। যেভাবে আছে, সেভাবেই যাত্রা চালিয়ে নিতে চায় সে। ঈশান ক্রমাগত ফোনকলে ব্যাস্ত। নিজের ফোর্স সহ, সকল টিম কে জোরালো নির্দেশনা দেওয়া আছে, রাহাতকে থানায় নেওয়ার আগ অবধি, কিছুতেই যেনো এই তথ্য প্রেসের কাছে না পৌছায়। পুলিশ বা আইনের তরফ থেকে একদম গোছানো কোনো বয়ান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টা গোপনীয়ই রাখতে চায় সে। প্রেস মিডিয়া ফেক নিউজ তৈরিতে ওস্তাদ।
নাঈম, নিয়াজ আলাদা গাড়িতে দু'জন পুলিশ পাহারায় – তমা আর তিতির কে নিয়ে রওনা দিয়েছে শহরের উদ্দেশ্য। আরও খানিকটা আগেই রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও, দেরি হয়েছে বিভিন্ন আইনের কাজকারবারে । যেহেতু দুটো মিসিং ডায়েরি করা ছিলো। এবং মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রি’মিনালের জেম্মায় ছিলো দু'জন। সেই হেতুতে অনেক জবানবন্দি দিতে হবে কেসের সার্থে। ঈশানও বাঁধা দেয়নি তাতে অবশ্য। বিষয়টা দরকারি। সকালের দিকে আরেক দফা জবানবন্দি দেওয়ার জন্য থানায় আসতে হবো মেয়েদুটোকে। সে কারণে এখানেই রাখতে চেয়েছিলো। তবে রাহাত কে নিয়ে থানায় যাওয়ার পথ নিশ্চয় নিরাপদ হবে না। সে-ই সময় টা তিতির কে রাহাতের থেকে যতটা সম্ভব দূরেই রাখতে চায় ঈশান।
দেওয়ান বাড়ি বর্তমানে খানিকটা হলেও স্বস্তির ছায়া ফুটে উঠেছে। । তমা আর তিতির সুরক্ষিত আছে ঈশানদের সাথে– শোনার পর থেকেই , শান্তি শান্তি ভাব একপ্রকারে। রাইসুল দেওয়ান যদিও ছেলের ওপর মহা বিরক্ত এখনো অবধি। স্ত্রীর মুখে ছেলের সত্যিটা শোনার পর থেকে, থ মেরে বসে ছিলো ঘন্টা খানেক। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে, তার থেকে সব লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আজকে বাড়ির মেয়ে- বউয়ের এরকম বিপদের দিনে জানতে পারছে সব! এই দূর্যোগের কারণ কে? কে দায়ী? ঈশান নয় কি? ওর পেশা’র রেশ ধরেই এতো অশান্তির সুত্রপাত।
দীর্ঘদিন পর বাড়ির মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দু চোখের পাতা এক করতে গিয়েছে । বাইরের আবহাওয়ার টানে নূরি এসে দাড়িয়েছে ছাদে। নিশি নামাজে বসেছে। নামাজ শেষে সে-ও আসবে । সেলফোনে মিহি আওয়াজে সম্ভবত কোনো উর্দু গান বেজে যাচ্ছে ক্রমাগত। তবে সে গানের ওপর থেকে নূরির ধ্যান ভড়কেছে বহু আগেই। গানটার গভীরতায় মন দিতেই, মন গিয়ে স্থান করে নিয়েছে অন্য জায়গায়। তবে হুশ ফিরলো সেলফোনের কর্কশ শব্দে। এবং স্ক্রিনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। সাইকোলজির ক্যাচক্যাচানি আজকাল সত্যি হতে শুরু করেছে। ফোনটা সে রিসিভ করলো একদম শেষ মূহুর্তে এসে। ইচ্ছাকৃত দেরি যাকে বলে আরকি!
ওপাশের কাঙ্ক্ষিত অথচ অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বরের নিরুত্তাপ কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো তৎক্ষনাৎ।
—’ ঘুমাও নি? ‘
নূরি চোখবুঁজে শীতল বাতাসটুকু অনূভব করতে চাইলো যেনো। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
—’ ধরুন ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন । তাহলে ? ‘
—’ তাহলে আর কি! ফোন রেখে দেবো। বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইবো । ‘
নূরি নিঃশব্দ হাসলো। হেয়ালি গলায় বললো,
—’ এতো সহজে হার মেনে নেবেন ? ‘
নাঈমের মুখটা তখনো বড্ড স্বাভাবিক। মাঝরাতে, মাঝরাস্তায় দাড়িয়ে হাস্যজ্বল মুখে সেলফোনটা কানে গুঁজে রাখা । তমা আর তিতির কে নিয়ে সে আর নিয়াজ ফিরছে। ঈশান বা সাজিদ দু'জনের কারোরই নাগাল আজকে পাওয়া যাবে না। আজ কেনো! দু'তিন দিন তো ভালোমতো কাজে ডুবে থাকবে তারা। মেয়ে দুটোকে আজ রাত তা বিশ্রাম নিতে দিয়ে, কাল বেলা হলে রওনা দেবে সিলেটের দিকে । আর যদি আরও একপাক থানায় হাজিরা দিতে হয়, সেটাও দেবে। ওরা দু'জন সুরক্ষিত আছে শোনার পর থেকে রাইসুল দেওয়ান একপ্রকার পাগল হয়ে গিয়েছিলেন আবার ঢাকায় আসতে। নাঈমই মানা করেছে। মানুষ টা এ কদিন যা ঝক্কি পোহালো । গাড়ি রাহাতের কটেজ ছেড়ে এসেছে ঘন্টাখানেক হলো। শহরের মধ্যে এখনো ঢুকতে পারে নি। তার আগেই গাড়িটার চাকা ইস্তফা দিয়েছে। ড্রাইভার সেটাই সারছে। নিয়াজ তদারকি করেছে সেখান টায়।
নূরির প্রশ্নে মৃদু হাসলো নাঈম । নরম গলায় বললো,
—’ সবেতে হারজিত এর হিসেব আমি করি না তো । তবে যেটাতে করি, সেটাতে জিততে কি করতে হয়, সেটা করবো । ‘
—’ চ্যালেন্জ হিসেবে নেন? ‘
—’ কাইন্ড অফ । ‘
—’ আামকেও নিয়েছেন? ‘
এ যাত্রায় নাঈমের হাসি টুকু যেনো কর্ণগোচর হলো নূরির।
—’ হাসছেন যে? ‘
নাঈম অযথা গলা পরিষ্কার করে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
—’ ভালোবাসা চ্যালেন্জ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়, নূরি। যে মূহুর্তে ওটাকে তুমি তোমার জেদ মনে করবে। সেই মূহুর্ত থেকে তুমি সামনের মানুষ টার ওপর অকারণে জোর খাটাতে চাইবে । আর ভালোবাসায় অকারণে জোর খাটানো অন্যায় । সেটা আর ভালোবাসা থাকে না । ‘
নূরি থমকায় হয়তো। শুকনো ঢোক গিলে মিহি গলায় শুধায়,
—’ তাহলে? আপনি যে বললেন, যে জিনিস চান সে জিনিস জিতেই ছাড়েন। ‘
—” ভালোবাসা দিয়ে… ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা জেতার কথা বলেছি আমি । এই একটা জিনিস এ জগতে একজিস্ট করে। যেটার ক্ষমতা আকাশচুম্বী। যার ওপর খোদার অনেক রহমত । আমি খোদাকে মানি, তাকে ভরসা করি, নিজের অনূভুতি -ভালোবাসা কে ভরসা করি। নিজে শতভাগ সৎ আমার অনূভুতির ওপর। সুতরাং, খোদার কাছে অন্য রকম একটা জোর খাটিয়ে চাইতে পারি। মানুষের কাছে জোর না-ই খাটলো। ওই এক খোদা আছেন। যাকে মন থেকে ডেকে, নিজের বুকের জমায়িত অভিমান, আবদার, আক্ষেপ সব প্রকাশ চলে। উনি ফেরান না। ‘
এই লোকটা প্রতিনিয়ত বিমুগ্ধ করে চলেছে মেয়েটার ক্ষতবিক্ষত মনটাকে। অন্য এক পুরুষের ভীষন যত্ন আর পরিকল্পনা নিয়ে করা ক্ষত, এই মানুষ টা নিজ হাতে তারও অধিক যত্নে নিরাময় করতে মরিয়া । অবচেতন মন মাঝেমধ্যে সাড়া দিতে চায় না। এমনটা নয়! তবে, ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় । এতো গুলো দিনের অনূভুতি কে দমিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা, একটা মেয়ের জন্য নেহাৎই মামুলি বিষয় নয়!
নূরি আর জবাব দেয়না দীর্ঘক্ষন । খোলা আকাশের নিচে দমকা বাতাসে এলোমেলো হওয়া চুলগুলো মুখের ওপর এসে বড্ড বিরক্ত করছে । নারী মন বড্ড অদ্ভুত। নিজ হাতে এই চুলগুলো কানে গুঁজতে ইচ্ছে করছে না মোটেই। একটা অনৈতিক ইচ্ছে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফোনের ওপাশের মানুষ টা এই কাজটা করলে কেমন হতো! নূরি মলিন হাসলো। আজকাল স্বপ্ন দেখতেও বড্ড ভয় হয়। অপাত্রে ভালোবাসা দান করে এখন পস্তাচ্ছে। সঠিক মানুষ দেরিতেই আসে জীবনে। ততদিন একটা নারীমনের কাবু রাখতে পারা উচিত। আবেগে গা ভাসালে মেয়েদের চলবে কেনো! নূরি হুট করে কোনো প্রতিত্তোর করতে পারে না। হয়তো চায় ও না। মেয়েটার নিরবতা বরাবরই বড্ড পোড়ায় ছেলেটাকে। সে যত আবেগ বা ভালোবাসা ময় কথা বলে, নূরি তত চুপ হয়ে যায়। কে জানে, ভালোবাসা শব্দটা কানে গেলেই হয়তো সেই পুরুষটার মুখচ্ছবি টা ভেসে ওঠে মানসপটে। যে কি-না অতি নিপুণ হাতে ভেঙেচুরে গিয়েছে নারীমনটা।
—’ তাহলে রাখি, কেমন? ঘুমিয়ে পরো । এতো রাত জাগা উচিত না। ‘
—’ তমা আর বার্বি সুস্থ আছে? ওদের নিয়ে কবে ফিরবেন? আর ভাইয়া ? ‘
—’ কাল ফিরবো ইনশাআল্লাহ। দু'জনেই সুস্থ, স্বাভাবিক। ঈশানও তাই। চিন্তার কারণ নেই । ‘
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটা। নিচ থেকে শুনেছিলো ক্রি’মিনাল ও নাকি ধরা পরেছে । আর কেউ জানুক না জানুক, সে তো জানে– ক্রিমিনাল টা আদতে কে! তবে নাঈমকে জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত হলো ভীষন।
—’ শুনুন। ‘
—’ বলো। ‘
নূরির আচমকা ডাকে উজ্জ্বল হয়ে এসেছে ছেলেটার মুখটা । তবে সে আকাঙ্খা স্থায়ি হলো না বেশিক্ষণ। নূরির মুখে ঘুরেফিরে ইয়াজের নাম শুনে দুমড়েমুচড়ে উঠলো বুকটা ।
—’ ইয়াজ কে কি এরেস্ট করেছে পুলিশ ? ‘
—’ হুম । ‘
—’ ওই ছিলো সবের মুলে? ‘
—’ সন্দেহ আছে ? অন্য কাউকে আশা করেছিলে ? ‘
—’ সত্যি বলতে, শেষ অবধি ওকেও আশা করতে ইচ্ছে হয়নি । ‘
মলিন হাসলো নাঈম । ভালোবাসার একটা মানুষ কে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা মুখের কথা নয় । মেয়েটাকে দোষ দিতে কখনোই রাজি নয় সে । আজও নয়।
—’ কিন্তু আশা না করলেও, বাস্তবে ঘটেছে সেটা । তমা কে রে*প করার চেষ্টার সময়, অন ডিউটি পুলিশ অফিসার অনস্পট গ্রেফতার করেছে তাকে । এবং তিতিরের বিপদ আশঙ্কা করে, নিজের যাবতীয় সত্য পুলিশের সামনে স্বীকার ও করেছে সে…আমি আর কিছু না-ই বলি । তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শুনতে রাজি , কিন্তু কেনো যেনো এই বিষয়টা নিয়ে ভালো লাগছে না । কাল দুপুরের দিকে প্রেসমিট ডাকা হবে৷। জানানো হবো প্রেস, মিডিয়াকে। সবটা…তখন নিজ চোখে দেখে নিয়ো। আর নিজেকে শক্ত রেখো। আশা যেহেতু রাখো নি। নিশ্চয় কষ্টও হবে । ‘
নূরি ইচ্ছে করেই আর কোনো জবাব দিলো না। নাঈম হয়তো বা খানিকটা হলেও, আশা পোষণ করেছিলো মেয়েটার দিক থেকে কোনো প্রতিত্তোরের। প্রেমিক মন, এইটুকু আশা করতেই পারে। তবে সে-সব ঘটলো না কিছু। আর না তো নূরি অভিমান ভাঙাতে আর কিছু বলে উঠলো।
*
পরিকল্পনা মাফিক ঘটলো না কোনোকিছুই । প্রেস মিডিয়ার থেকে লুকিয়ে রাখা গেলো না বিষয়টা । পুলিশের পিছনে হয়তো বা সাংবাদিক বেচারারা লেগেই ছিলো। সমসাময়িক কালের মধ্যে সবথেকে আলোচিত একটা বিষয়। সবথেকে আলোচিত ক্রিমিনাল। সুতরাং, পুলিশের গাফিলতিতেই জানাজানি হয়ে গেলো মূলত । তখন ভোররাত। রাহাতকে নিয়ে থানায় পৌঁছেছে পুলিশ। ঈশান নিজেও আছে ।। তবে মুখাবয়ব কালো পর্দার আড়ালে। যদি তখনও জনসাধারণের ভিরভাট্টা তৈরি হয়নি ৷ তবুও, বাড়তি সতর্কতার খাতিরে এটা করা । বিধ্বস্ত আসামি কে লকাপে রেখে বিভিন্ন সেকটরের সকল আইনি কর্মকর্তা মিলে মিটিং এর আয়োজন বসেছে। বিশাল আকারের একটা টেবিল। দু'পাশে কম করে হলেও আঠারো জন কর্মকর্তা বসা। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ঈশান সম্পর্কে অবগত, বাকিরা নন। তাদের কাছে পুরোটা নতুন সে। তাহমিদ কায়েসর পায়ের ক্ষতের চিকিৎসা করে, সে-ও এসেছে জোগ দিয়েছে খানিকটা আগে। স্বরাষ্ট্র অধিদপ্তরের লোকজনও আছেন বেশ কয়েকজন । যদি বলা হয় সবার কেন্দ্র বিন্দু মূলত ঈশান আরশাদ দেওয়ান। তাহলে বোধহয় ভুল বলা হবে না। কেসের শুরু থেকে আজকে অবধি ঈশান ঠিক কতটা জড়িয়ে সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে সে-সব শুনতে । প্রায় ছয় বছর আগে শুরু হওয়া এই আতঙ্ক, পাঁচ বছর আগে দায়িত্ব নেওয়া আন্ডারকভার অফিসার কিভাবে একা হাতে সামলে গিয়েছে, সেটার একটা ছোটখাটো ব্রিফ পর্ব চলছে যেনো । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণলয়ের সিনিয়র সচিব সাহেব বড্ড আগ্রহ নিয়েই তাকিয়ে আছে তার দিকে । পৌঢ় ভদ্রলোকে রিটায়ার করবেন দিন কয়েক পরেই। ঈশানের বয়স ঠাহর করতে চাইলেন যেনো । ফিটফাট, সফেদ শার্টটা নির্মেদ কোমড়ে কালো প্যান্টের ওপর ইংক করে রাখা । ফর্শা মুখ জুড়ে আভিজাত্যের ছোঁয়া। তীক্ষ্ণ চোখজোড়া টেবিলের গুটিকয়েক ফাইলের ওপর স্থির তার ।। চেয়াল শক্ত করে রাহাতের রিপোর্ট গুলোয় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে । ভদ্রলোক ঈশানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন বেশ রয়েসয়েই ।
—’ ইয়াং ম্যান , এই প্রফেশনে আসার পরিকল্পনা কিভাবে চেপেছিলো তোমার ? এরকম তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শক্তি, পরখ ক্ষমতা, বুদ্ধিদিপ্ত মুখ…অবশ্য এই প্রফেশনেই ফিট তুমি । ‘
ঈশান হাসলো লোকটার দিকে তাকিয়ে । লোকটির সাথে এর আগে তার যতবার প্রফেশনাল কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে হয়েছে। প্রতিবারই মাধ্যম ব্যবহার করেছে। এবারই প্রথম সম্ভবত মুখোমুখি হলো দু'জন। ঈশান বড্ড অনুগতের সাথে গম্ভীর কন্ঠে চললো,
—’ মাসুদ রানা পড়তাম, স্যার। এককালে…কাজী আনোয়ার হোসেন? কাজিদা? চেনেন তো নাকি? তার লেখা এমআর নাইন! ছোট বেলা কেটেছে সেটার সাথেই । সময়ের সাথে মস্তিষ্কে গেঁথে গেলো গল্পগুলো। স্বপ্নে পরিনত হলো রীতিমতো। তারপর আর কি! খোদাও চাইলেন, আমিও পরিশ্রম করলাম…হয়ে গেলো! ‘
ভদ্রলোক সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন । বয়স শেষের দিকে হলেও, মাসুদ রানার সাথে পরিচয় ভালোমতোই। কে না চেনে, কালজয়ী চরিত্র টাকে! ঈশানের বুদ্ধিদিপ্ত, হাস্যজ্বল চেহারার দিকে তাকাতেই, কল্পনার মাসুদ রানার চেহারা ভেসে উঠলো। ভদ্রলোকের এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো, বছরের পর কল্পনায় তিনি যে মুখ কল্পনা করে এসেছে মাসুদ রানার! ঈশানের মুখটা বোধহয় সেটাই। ভদ্রলোক একদফা হাসলেন। সাজিদ কে ঈশারা করে বললেন,
—’ ছোট বেলার বন্ধু তোমার । হরিহর আত্মা । সর্বক্ষণ একসাথে ওঠাবসা। সে-ও আইনের লোক। তুখর অফিসার। তার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে, এতগুলো বছর চললেন কি করে ? একবারও জানানোর কথা কেনো মনে হয় নি? ‘
সাজিদের মনেও এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো ঈশানের পরিচয় জানার দিন থেকেই । তাকে ঈশান জানিয়েছে সেদিনই। যদিও ঈশান যে স্বাভাবিক কোনো বিজনেস ম্যান মোটেই নয়, সেটা সে আন্দাজ করে আসছিলো বহু আগে থেকেই। কখনো নিজের মনের ভুল, কখনো না পুলিশি মন মানসিকতা মনে করে কাটিয়ে গিয়েছে বরাবর। তবে সমসাময়িক বিষয়গুলো এতো গভীরে ইঙ্গিত করছিলো বারংবার। সে নিজেই দোলাচলে ভুগতো সবসময়। একটা সময় ঘুরেফিরে সকল এলিগেশন গুলো যখন ঈশান কেই ইঙ্গিত করে যাচ্ছিলো । এলোমেলো করে দিচ্ছিলো তার সকল প্রেডিকশন। ঠিক তখনই সবটা পরিষ্কার করেছিলো ঈশান নিজেই।
অতীতের একাংশ,
বদ্ধ দরজার ভিতরে পরিচিত ঘ্রানে ম ম করছে । ঈশানের পারফিউমের ঘ্রান। এ ঘরটা বড্ড ছোট লাগলো সাজিদের কাছে। দু কদম এগিয়ে ভিতরে যেতেই পা থমকালো। সঙ্গে শ্বাসও। সামনের বিশাল দেয়ালের পুরোটা জুড়ে অসংখ্য রঙিন, বেরঙিন ছবি সেঁটে রাখা। অসংখ্য তথ্য– লাল, নীল কালিতে মার্ক করা। অজস্রবার দাগ কাটা হয়েছে কিছু ছবি, আর লেখর ওপর । ঠিক তার মাঝামাঝি অবস্থিত একটা পুরুষের ছবি। তাদেরই বয়সী বোধহয়। সুদর্শন, প্রচুর সুদর্শন । তবে ছবির মালিক কে চিনে নেওয়ার আগেই, সেই ছবি বা পাশে এক হাস্যজ্বল রমণীর ছবিতে গিয়ে আটকালো তার চোখ। খানিক দূরেই তার নিজেরও ছবি। সাথে তাহমিদ কায়েস থেকে শুরু করে আরও বহু অফিসার, বা পরিচিত মানুষ দের ছবি। হতভম্ব হয় সাজিদ। গোটা ঘরের চারদেয়ালের একটা দিকও অবশিষ্ট নেই। গোলকধাঁধার মতো লাগলো সবকিছু তার কাছে…সাজিদ ধীর পায়ে ঈশানকে ছেড়ে এগিয়ে গেলো সেদিকটায়। আনসলভ কেস থেকে শুরু করে, সলভ হয়ে যাওয়া বহু কেসের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এখানটায় , এ ঘরের মাঝে! তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে, যতদূর বুঝলো এটা বর্তমান সময়ের সবথেকে আলোচিত কেসের তথ্যগুলো। যেটার দায়িত্ব সয়ং তার ওপরই ন্যাস্ত ছিলো এ কটা দিন। যেটা থেকে ইস্তফা দিতে সে এসেছে এখানে। নিজের হতভম্বতা কাটাতে পারছে না বেচারা। তবে স্টিলের শক্ত দরজাটা, শব্দ করে বন্ধ হতেই চমক ভাঙলো সাজিদের। পিছনে ঘোরার প্রয়োজনও বোধ করলো না। দেয়ালের ওপর ইয়াজ মির্জার রঙিন ছবির ওপর হাত রেখে অস্ফুটে বললো,
—’ কে তুই, ঈশান ? ‘
ঈশান পিছনে দু-হাত ভাজ করে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে বন্ধুর পাশেই। দেয়ালের দিকে গভীর দৃষ্টি রেখে হালকা গলায় বললো,
—’ স্যার ডাকুন, মিস্টার সাজিদ তালুকদার । সিনিয়র দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, সে ভদ্রতা জ্ঞান আপনার নেই দেখছি! ‘
সাজিদ ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই, ঈশান কাঁধ জড়িয়ে ধরলো ছেলেটার। নিজের পকেট থেকে আইডেন্টিটি কার্ডটা বের করে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললো,
—’ চাকরির বয়সেও তোর থেকে বছর খানেকের সিনিয়র, পদের দিক থেকে তো আরও । আমার এক ইশারায় তোর পোস্টিং বান্দরবান হয়ে যাবে, ট্রাস্ট মি…’
সাজিদ স্তম্ভিত,হতভম্ব, হতবিহ্বল। হাতখানা কাঁপছে একপ্রকারে। চিন্তাচেতনার বাইরের ব্যাপার স্যাপার হচ্ছে পুরোটা। বাঁ হাতে ধীরেসুস্থে টেবিল থেকে কার্ড টা তুলে নিয়ে অসহায় দৃশ্য তাক করলো বন্ধুর দিকে। ঈশান হাসলো। চমকের পর্ব শেষ হতেই, ঈশান ছোট্ট করে পরিচয় দিলো নিজের। সেদিনই সাজিদ প্রথম জানতে পারে বন্ধুর পরিচয়। জানতে পারে, কেসের মূল দায়িত্বে শুরু থেকে আজ অবধি কে ছিলো, কিভাবে ছিলো । তবে সময় সল্পতায় জানা হলো না পুরোটা।
সাজিদ ছোট্ট করে শুধালো,
—’ এতো লুকোচুরি ক্যানো? অন্তত পরিবার এর থেকে?৷ ‘
—’ এই অন্ধকার দিক থেকে ওদের আড়াল করতে । ‘
—’ তিতির কে নিয়ে অনেক তথ্য দেখলাম । ও? ‘
—’ ও কি ? ‘
—’ ও শুরু থেকে জড়িয়ে এসবে! কি করে৷? ‘
—’ শোন, যেকোনো পরিকল্পনা চুটকি তে জলে ফেলে দিতে জাস্ট একটা কারণই যথেষ্ট। প্রেম! ইয়াজ মির্জা প্রেমে পরেছিলো তিতিরের। এই প্রেমই কাল হবে ওর! ‘
সাজিদ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। অবাক গলায় বললো,
—’ তিতির কে তুই কি এ-কারণেই বিয়ে করেছিস৷? শুধুমাত্র ক্রিমিনালের কাছ অবধি পৌছাতে ? ওকে দূর্বল করতে ? ‘
ঈশান ডানে-বামে মাথা ঝাঁকালো। হাতের আঙলগুলো চুল গলিয়ে দিয়ে বললো,
—’ ভেবেছিলাম সেটাই। তবে পরে বুঝলাম অন্য কিছু । ‘
—’ মানে? ‘
ঈশান হাসলো বন্ধুর দিকে তাকিয়ে। কাঁধ চেপে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে যেতো কাব্য সুরে বলে উঠলো,
—’ প্রেম এসেছিলো জীবনে! প্রেম…বসন্ত…বুঝিস? ‘
*
বর্তমান,
তাহমিদের বিষয়টাও একপ্রকার অস্পষ্টই ছিলো সাজিদের কাছে । ঈশান না-হয় আন্ডারকভার অফিসার, কিন্তু তাহমিদ! সে তো দেখা যায় আরেক ধুরন্ধর। পুলিশের লোক হয়ে, কি সুন্দর বাংলার মাস্টার সাহেব সেজে হাজির হয়েছিলো তাদের ওখানটায়। সবকিছুর যখন খোলসা হচ্ছে, এটার রহস্যও খোলাসা হওয়া উচিত। সেটার পর্দা উন্মোচনও ঈশানই করলো । ঘুরেফিরে সবার মতো তাহমিদেরও সন্দেহ হয়েছিলো ঈশানের ওপরই। যেটা স্বাভাবিক। সকল প্রমাণ গুলো ঘুরেফিরে তাকেই ইঙ্গিত করছিলো। অপর দিকে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচেতে কোথাও ইয়াজ নামক কোনো ব্যাক্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। অথচ তদন্তের খাতিরে হোক বা ব্যাক্তিগত কোনো কিছু, ঈশান সহ সবাই কিভাবে যেনো ওই একটা নামই খুঁজে পাচ্ছিলো। তদন্তের সূর্ত ধরে সাজিদের পরিচয় পায় তাহমিদ। ঈশান আর সাজিদ যে একে অপরের বন্ধু, সেটা নজরে আসতেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে আসে তার৷। বন্ধুত্বের খাতিরে সাজিদ শেষমেশ ঈশানকে আড়াল করতে প্রমান লোপাট করবে কি-না এই ভয় এসে বাসা বাঁধে তার মনে। সেই জের ধরেই ছদ্মবেশে আসা ছেলেটার । তবে লুকোচুরি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তার। ঈশানের দক্ষ চোখে ফাঁকি দিয়ে পালাতে পারেনি একচুলও। ঈশান জেনে গিয়েছে তার পরিচয় । তদন্তের সার্থে, সব দিক বিবেচনায় তাহমিদ কে নিজের সত্যিটা জানাতে হয়েছে ঈশানকে। সচিব সাহেব মন দিয়ে শুনছিলেন এতক্ষণ সবই । তাহমিদ কায়েস এর বিষয়টাও শুনেছে সে আজকেই৷। ভাসা ভাসা হিসেবে আরকি।
গুরত্বপূর্ণ সব আলোচনা বেশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া গেলো না । হাবিলদার এসে খবর জানালো, তমা আর তিতিরের জবানবন্দি নেওয়া শেষ হয়েছে । পাশের ঘরেই অপেক্ষা করছে তারা । নাঈম আর নিয়াজ একদফা জবানবন্দি দিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলো মেয়ে দুটোকে। তবে তদন্তের খাতিরে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিলো তাদেরকে। সবেই শেষ হয়েছে সেটা । ঈশান নিচু গলায় তাদের অপেক্ষা করতে বলে মিটিং এ মন দিতেই, হৈ হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে এলো কানে । আচমকা এমন লোকসমাগম কোথা থেকে হলো, সেসব ভাবাভাবির মধ্যেই একপ্রকার ছুটে এলেন একজন কনস্টেবল। জানালো প্রেস, মিডিয়া সহ সাধারণ লোকজনের বহর এসে জমায়েত হয়েছে, থানার সামনে। দু'হাতের আঙুলে কপাল চেপে ধরলো ঈশান। বাকিদের মুখ দিয়েও খেদোক্তি বের হয়ে এলো । বিরক্তি তে। এখনো সব তথ্য একাট্টা করে, রিপোর্ট তৈরিই হয়ে ওঠেনি। আলোচনা পর্বই শেষ হয়নি । তার আগেই কি করে সবটা জানাজানি হয়ে গেলো, বুঝে এলো না তাঁদের। ঈশান বিরক্ত কন্ঠে বললো,
—’ প্রেসে খবর দিয়েছেন কে ? ‘
স্বীকার করবে না কেউ, এটা জানা কথা । তারপরও ঈশানের হুংকারে কাঁপলো সকল কনস্টেবল । অত্যন্ত ঝামেলার অবস্থা একটা । ঘটনা হাতের বাইরে তখন চলে গেলো, যখন বাইরের হৈ হট্টগোল রুপ নিলো একপ্রকার মিছিলের মতো। বাইরের মানুষের উচ্চস্বরের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সাজিদ ব্যাস্ত পায়ে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। ফিরলো প্রায় মিনিট সাতেকের মাথায়।
—’ আসামী কে ওরা বাইরে চাচ্ছে । ‘
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সচিবের মুখটা শুকিয়ে এসেছে ততক্ষণে। বৃদ্ধ বয়সে যেকোনো কিছুর ভয় জোড়ালো হয় একটু বেশিই।
—’ বাইরে চাচ্ছে মানে ? ‘
সাজিদ গম্ভীর মুখে বললো,
—’ ওদের হাতে তুলে দিতে বলছে ক্রিমিনাল কে। ওরা নিজ হাতে শাস্তি দিতে চায় । প্রচুর লোকজন জমায়েত হয়ে গিয়েছে । সাথে ঈশান কেও বাইরে চাচ্ছে। ‘
পরিস্থিতি সত্যিই হাতের বাইরে চলে যাওয়ার মতোই হয়ে এসেছে । আসামির প্রতি যেমন তীব্র ঘৃ ণা, আক্রোশে ফেটে পরেছে জনগন । তেমনই সেই আন্ডারকভার অফিসারের খোঁজও করছে সবাই । তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে তাকে একনজর দেখতে চাইছে সবাই । আলোচিত এই সিরিয়াল কি*লারের ঘটনা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংবাদেও স্থান পেয়েছিলো বেশ কয়েকবার । সুতরাং সেই আসামি যখন ধরা পরেছে, সেই খবরও ছয়লাব হতে সময় নিলো না মোটেই। অতি উৎসাহী সব সাংবাদিকদের দল, এরই মধ্যে দেশের সরকারি, বেসরকারি সব চ্যানেলের হেডলাইন এ নিয়ে এসেছে বিষয়টা । দিনের আলো ফুটছে, ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পরছে বিসয়টা । হিসেব মতে আজকে আসামি কে কাঠগড়ায় তোলার কথা ছিলো। পুলিশ ঈশানকে সন্দেহ করে কোর্টে তোলার পায়তারা করলেও, এখন পরিস্থিতি পালটেছে। রাহাতকে তোলা হবে কোর্টে। ওপর মহলের সাথে এই গোপনীয় আলোচনা বহু আগেই হয়েছিলো ঈশানের । সেই হিসেবে, মহা ফ্যাসাদেই পরেছে সকলে। বাইরের যে পরিস্থিতি। না- তো আসামি কে এখানে রাখা সম্ভব, আর না তো এখান থেকে বের করে কোর্ট অবধি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ঈশান গম্ভীর মুখে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো পাশের এক ছোট্ট কামড়ার লোহার শিকের কাছে। ভিতরে তমা আর তিতির। নিয়াজও আছে সাথেই। কি যে গল্প করছে কে জানে। তিতিরই বকবক করছে মূলত। হয়তো এ ক’দিনের শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনি শোনাচ্ছে। মেয়েগুলো হোটেলে চলে গিয়েছিলো, সেটাই ভালো ছিলো। আরেকদফা জবানবন্দি দেওয়ার জন্য নিয়ে এসে আরেক ঝামেলায়। বাইরের উত্তাল জনগন ভাঙচুর শুরু করলে নিশ্চয় ভয়ে একসাড় হয়ে যাবে ওরা৷। আবার এই ভিড়ের মধ্যে খুব সহজে নিজেকে আড়াল করে, তিতির -তমাকে আড়াল করে চলেও যাওয়া সম্ভব না।
মিটিং রুমের বিশাল কামড়ার দক্ষিণের দেয়ালের এলইডি টিভি টা চালাতেই বিশেষ সংবাদের ব্রডকাস্ট শুনতে পাওয়া গেলো। এক জনৈক ভদ্রমহিলা, এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মাইক হাতে অতি উত্তেজিত গলায় সংবাদ পরে যাচ্ছে…
এক অজানা আন্ডারকভার অফিসার, যে কি-না এখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই, বিগত পাঁচ বছর কি করে এই তদন্তের সঙ্গে ছিলো সে-সবই আউরাচ্ছে। তার সঙ্গে একেরের এক হ ত্যা গুলো কিভাবে হতো…
ঈশান চূড়ান্ত হতাশ হলো । যিনিই ফাঁস করে দিক না ক্যানো, অনেক কিছুই জানিয়েছে সাংবাদিক দের। তা না হলে এতো কিছু জানার কথা নয় মোটেই। সে ব্যাক্তিগত ভাবে চায়নি, এই ক্রেডিট টা নিতে!
“ National intelligence Bureau এর স্পেশাল অপারেশনে, সিনিয়র আন্ডারকভার অফিসারের হাতে
বিগত ছয় বছর সমাজে বুকে কলুষিত এক, নোংরা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। নারী ধর্ষ*ক, এবং সিরিয়াল কি*লার গ্রেফতার! ‘
সংবাদ টা দেখেই টিভি অফ করে দিলো ঈশান । আশেপাশের সবার দিকে দৃষ্টি রেখে প্রস্তাব করলো, দিনের আলো ফুটে, আরও জন সমাগম হওয়ার আগেই রাহাত কে বের করে নিয়ে যাওয়া হোক এখান থেকে। এবং সে নিজেও তার পরিবার নিয়ে যেনো প্রস্থান করতে পারে। কেসটার সকল দায়িত্ব সে যযে সাজিদ আর তাহমিদের ওপর দিয়েছে, সকল ক্রেডিট যে তাদেরই থাকবে কথাও জানিয়ে দিয়েছে সে।
*
যতটা সহজে সবটা করা যাবে বলে মনে হলো, ততটাও সহজে হলো না কিছুই। পুরো থানা ঘেরাও হয়ে গেলো সাধারণ জনগনে । পুলিশ, সেনাবাহিনীর লোকজন এসেও সরাতে পারছে না তাদের। ভাঙচুর করে ভিতরে আসতে চাইছে লোকজন । নিজ হাতে ধর্ষক কে শাস্তি দিতে মরিয়া হয়ে আছে সবাই। তিতির তমা কাচুমাচু মুখ করে বসে আছে চেয়ারে। আশেপাশে সবার উচ্চবাচ্য শুনতে পাওয়া যাচ্ছে । আসামির পাশাপাশি সবার চিন্তা যে ওদের দু'জনকে এখান থেকে সাবধানে বের করে নেওয়ার, সেটা ওরাও বুঝতে পারছে এতক্ষণে। তবে দেরি হয়ে গিয়েছে ভীষন। ভিতর থেকে যে-ই বের হোক না ক্যানো, সাধারণ লোকজন চড়াও হবে তাদের ওপরই। ওপর মহলের কড়া নির্দেশে বাইরের লোকজনের ওপর কোনো ধরনের কড়া ব্যবহারও করা যাবে না।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তাল হচ্ছে চারিদিক। কোর্ট বসার সময়ও হয়ে আসছে। একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাহাত কে নিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ।
গরমের তীব্রতা আজকে ভয়াবহ। রাতের দিকের আবহাওয়ার সাথে, দিনের আবহাওয়ার আকাশ পাতাল তফাত। রাতের মেঘ মেঘ পরিবেশ দেখে হলফ করে বলে দেওয়া যায়, আগামী সাতদিন টানা ঝড় বৃষ্টির কবলে থাকবে গোটা দেয়। তবেই দিনেই সেই প্রকৃতির সম্পূর্ণ অন্য রুপ ।
পুলিশের সুরক্ষা সামগ্রী পরিয়ে রাহাত কে যখন লকাপ থেকে বের করা হলো, তখন ঈশান নিজেকে আবৃত করে ফেলেছে ভালোরকম। পুলিশের সকল তাগড়া তাগড়া অফিসার রা বন্দুক সমেত ঘেরাও করে আছে তাকে ।
রাহাত বের হয়েই, তার অনুসন্ধানী তীক্ষ্ণ চোখজোড়া কাউকে খুঁজলো। ঈশানকে সম্ভবত। পেলোও তাকে । তবে যা আশা করেনি মোটেই, সেটাও চোখে পরলো। পুলিশের সমাগমের মাঝেও, অদূরে দু'টো মেয়েকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে । ঘরটা সম্পূর্ণ আলাদা। তবে লোহার শিকের ওপাশে শক্ত চোখে চোখ পরতেই পা জোড়া থামলো ছেলেটার । এক লহমায় সম্ভবত ভুলে বসলো নিজের অবস্থান । ঈশান তখনো দূরেই দাড়িয়ে।
তাকে উদ্দেশ্য করে এতো এতো শব্দ উপেক্ষা করে বললো,
—’ আমাকে কি ফাঁ’সিতে ঝোলানোর পরিকল্পনা আছে, ঈশান আরশাদ দেওয়ান? ‘
ঈশান বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে টেবিলের সাথে। প্লেন কালো টি শার্টটা বলিষ্ঠ শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। খানিক আগের ফরমাল লুক এখন আর নেই। কালো মাস্কে মুখটা ঢেকে রাখা। সুতরাং রাহাতের কথায় তার মুখে হাসি ফুটলো নাকি অন্য ভাবাবেগ হলো, তা বোঝা গেলো না। তবে গমগমে কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো দ্রুতই।
—’ সেটা কোর্ট বুঝবে৷। তবে তোকে ফাঁ সির দড়িতে ঝুলাতে বাদবাকি যা করতে হয়, সেটা আমি করবো। সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আমার । ‘
সাজিদ টানলো রাহাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বাইরের লোকজন ঠেলে ভিতরে চলে আসতে চাচ্ছে। রাহাত একরোখার মতো করে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরছে বারংবার। তবে কফিনের শেষ পেড়েক পরলো একদম শেষ মূহুর্তে। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সদর দরজা খুলে কয়েক কদম নামিয়ে নিয়ে আসা মাত্র, লোকজনের মাঝ থেকে আচমকা অতর্কিত গু*লি ছুড়লো কেউ একটা। মূহুর্তেই চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। আতঙ্কিত জনগন এলোমেলো হলো দ্রুতই। পুলিশের এতো করা সতর্কতা সত্ত্বেও এরকম হবে ভাবাই যায়না। রাহাতকে ঘেরাও করে পিছিয়ে আসতে উদ্যত হওয়ার মাঝেই, খেয়াল হলো আরেকটা বিষয়। গু*লি গুলো মোটেই রাহাতের উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে না। চালানো হচ্ছে পুলিশ কে উদ্দেশ্য করে। বিশেষত সাজিদ কে লক্ষ করে। ঈশান সতর্ক পায়ে ছুটে আসার আগেই চোখের সামনে ঘটে গেলো যা ঘটার। হাতের মুঠোয় চেপে রাখা . ২২ ক্যালিবারের বন্দুক খানা বাড়িয়ে এগোনোর আগেই একটা গু*লি এসে বিধলো এসপি সাজিদ তালুকদারের পেটের বাঁ পাশটায়। ততক্ষণে ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে সবকিছুই। সাধারন জনগনের সুরক্ষার কথা ভেবে এলোপাতাড়ি গু*লি চালাতে পারছে না পুলিশ। অথচ ঠিকই সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আক্রমণ চলছে তাদের ওপর। পুলিশ হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আগেই রাহাতের দক্ষ হাত দু'টোর মাঝে দেখতে পাওয়া গেলো একটি পিস্তল। এবং হ্যান্ডকাফে আটকা হাত দুটো গিয়ে ঠেকলো লুটিয়ে পরা সাজিদের মাথায়। ছেলেটার র ক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা মেঝে। রাহাত হাঁটু ভেঙে বসে পরেছে ততক্ষণে সাজিদের পাশে। আশেপাশের সবার ব ন্দুকের নিশানা রাহাতের দিকে থাকলেও, রাহাতের মুখে কোনো ভাবাবেগ লক্ষ করা গেলো না। তবে হাত বাঁকিয়ে বন্দুক টি পেটের সেই ক্ষ'ত স্থানে আবার চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
—’ পাশা খেলায় আমিও নেহাৎ কাঁচা নই, ঈশান আরশাদ। এতো সোজা! এতোই সহজ! এতো কাঁচা খেলোয়াড় আমিই? আমাকে থানা থেকেই বের করতে পারলেন না, আবার ফাঁ সির দড়িতে ঝোলাবেন! আমার হাত আইনের হাতের থেকেও লম্বা…ভীষন লম্বাআ…ট্রাস্ট মিই। ‘
ঈশানের মুখের মাস্কের কারণে কঠিন চেহারা টা চোখে পরছে না। তবে রক্ত বর্ণ চোখজোড়া দিয়ে ভষ্ম করে ফেলবে জেনো। দু'হাতে দু'খানা পিস্তল। তাক করে আছে তার দিকে। সাজিদ গো ঙাচ্ছে রীতিমতো।
তিতির ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। নাঈম, নিয়াজ দুজনেই আড়াল করেছে ওকে।
—’ সারেন্ডার কর। তোর মনে হয়, এখান থেকে বেঁচে বের হতে পারবি? ‘
—’ মরার ভয় নেই। বিশ্বাস কর। শুধু তিতির কে নিজের করে না পাওয়ার একবুক আক্ষেপ আছে। তবে ওকে আমি না পেলে, তোরও হতে দেবো না বিশ্বাস কর। ‘
—’ সিনেমা পাস নি এটা । ওকে ছেড়ে সরে দাড়া। না হলে, আমার হাত চলতে দু'বার ভাববো না। ‘
রাহাত না সরলো, না তো ভয়ের ছাপ দেখা গেলো। উল্টো হাতের চাপ দৃঢ় করলো যেনো। সাজিদের অবস্থা তখন বেশ শোচনীয়। রক্তে মাখামাখি হচ্ছে আশপাশ।
—’ তিতির কে এক নজরের জন্য সামনে আসতে বল।’
—’ ও নেই এখানে। ‘
—’ মিথ্যা মানাচ্ছে না এখন। আসতে বল। পরীইই? ‘
আতঙ্কিত মেয়েটা দু'হাতে মুখ চেপে ধরলো। ভিড়ের মাঝে দেখা যাচ্ছে না সাজিদ কে। তবে সবার উত্তেজিত অবস্থা দেখে স্পষ্ট বলে দেওয়া যায়, কিছু একটা বয়াবহ ঘটেছে।
—’ পরীইইই…’
রাহাতের হাত ওপর দিকে তুলে, সিলিং ফ্যান উদ্দেশ্য করে শব্দ করে গু*লি ছুড়লো আরেকটা । শব্দ করে হেসে ফেললো। ছেলেটা উন্মাদ তখন!
ঈশান দু কদম এগোতেই, হিসহিসিয়ে উঠলো ছেলেটা।
—’ মেরে দেবো তোর বন্ধুকে। একদম মেরে দেবো। তিতির কে ডাক। রাইট নাও। ‘
পুলিশ বাজে ভাষায় গালি দিয়ে রাহাতের দিকে এগোতে যাওয়ার আগেই হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিলো ঈশান । গম্ভীর গলায় বললো,
—’ তিতিরের ক্ষতি হবে এমন কিছু তুই করবি না। ‘
—’ করবো না। ভালোবাসি ওকে আমি। ‘
—’ আমি ডাকবো তিতির কে। তুই সাজিদ কে ছেড়ে সরে দাড়া। ‘
—’ এতো সহজে তুই তোর বউকে পরপুরুষের সামনে আনবি? তোকে আমি চিনি না! ‘
ঈশানের হাতের ইশারা উপেক্ষা করে আচমকাই পিছন থেকে একজন এগোতেই উন্মাদের মতো আরেকটা গুলি ছুড়ে দিলো সাজিদের বাহুর দিকে। চেঁচিয়ে উঠলো ঈশান,
—’ স্টপ, রাইট নাও। আমি ডাকছি। ‘
ঈশানের ডাকতো না মোটেই। অন্য পরিকল্পনার ছক ঘুরছে মাথায় । তবে সে চিন্তাভাবনায় জল ঠেলে পাশের কামড়া থেকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো তিতির। ব্যাগ্র গলায় ডেকে উঠলো,
—’ রাহাত ভাই, নাআ…’
মেয়েটার কান্নামাখা চোখ তখন র'ক্তাক্ত সাজিদের ওপর স্থির। রাহাত তার ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে। হাঁটুর নিচ রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
—’ পরীই? ‘
—’ রাহাত ভাইই, সরে যান ওখান থেকে। দয়া করে। রহম করুন। সাজিদ ভাইকে ছাড়ুন । ‘
—’ পরীইই । ‘
হুংকার দিয়ে উঠলো ঈশান ।
—’ ভিতরে যা, তিতিইর। ‘
তিতির আতঙ্কিত নজরে, কাঁপছে থরথর করে। সাজিদের এই অবস্থার জন্য সে দায়ি কি? নাঈম দু'হাতে আগলে মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে যেতে উদ্ধত হতেই আরেকদফা পাগলামি শুরু হলো ছেলেটার।
—’ তোমাকে যদি আমার কল্পনাতেই বাঁচিয়ে রাখতে হয় , তবে অন্য কারোর বাস্তবে তোমার বিচরণ কিভাবে মানবো আমি, পরী-ই ? তুমি আজকের পর থেকে ঈশানের জীবনেরও মরিচীকা । কেমন ? '
চলবে ইনশাআল্লাহ 🥀🌼