ফন্ট সাইজ:
থিম:
ডার্কসাইট

৫১তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

─⁠──⁠───⁠──⁠──

ব্যাটার তৈরি করে উপরে বেশ কতক চকলেট চিপস ছিটিয়ে দিলো আসমান।তারপর ওভেনে ট্রে সমেত রেখে ত্রিশ মিনিটের টাইমার সেট করলো।কিচেন কাউন্টারে হেলান দিয়ে রোযা অত্যন্ত মনোযোগী দৃষ্টিতে তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে চলেছে।কিন্তু সেই মনোযোগে বারংবার ব্যাঘাত ঘটছে পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গত আধ ঘণ্টা যাবৎ তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হয়ে থাকা নিহাদ এবং চারুলতার উচ্চবাচ্যতে।

- হ্যাঁ হ্যাঁ।এখন সব আমার দোষ তাইনা?কে বলেছিল উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে?সোজা ঢুকে গেলেই হতো।

চারুর বক্তব্যে নিহাদ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো,

- আস্ত একটা পেত্নী।তোমার গরুর মতন শরীর নিয়ে আমার উপর ভর দিতে গেলে কেনো?

- কি বললে?আমি গরু?

- ভুল বলেছি।তুমি একটা গাভী।

মুষ্টিবদ্ধ হলো চারুলতার হাত,সটান সে নিহাদের চোয়াল বরাবর ঘু*ষি হাঁকালো। তা অতি সত্ত্বর পাকড়াও করলো নিহাদ,এক ঝটকায় কাউন্টারে ঠেকালো চারুকে,দুহাতের কব্জি আঁকড়ে নিলো নিজের দুহাতে।চারু অবশ্য ভড়কালোনা।উল্টো হাঁটু তুলে নিহাদের তলপেট বরাবর গুতো দিলো।

- আউচ!

- আমার সঙ্গে পাঙ্গা নেয়ার পরিণাম ভালো হয়না কখনোই।

- শাকচুন্নি তো। ঘা*ড় ম*টকে খা*ওয়ারই তো স্বভাব।

- তোমার মতন নির্লজ্য তো নই যে মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তে গিয়ে উঁকিঝুঁকি দেই!

ভ্রু কুঁচকে নিহাদ জানালো,

- ইশ!মানুষ খোলা ছাদে টাইটানিক মুভির মতন রঙ্গলীলা করতে পারে,আর আমি দেখতে গেলেই দোষ?বাসর করার শখ থাকলে দরজা আটকে দিলেই হতো!

- মানুষ কি আর জানে নাকি তোমার মতন একটা চিংটা নিজের লেঙ্গুর তুলে নেংটি ইদুরের মতন হানা দেবে?

নিহাদ হাত তুললো,চারুর মুখের সামনে ধরে দৃপ্ত কন্ঠে জানালো,

- মজা তুমিও পেয়েছ আমিও পেয়েছি ঠিক আছে?নাহলে তুমি আরো ভালোমতন দেখার জন্য আমার পিঠের উপর উঁকি দিলে কেনো?এখন এসব দোষারোপ বন্ধ করো।দুইজন সমান সমান।

- কিসের সমান সমান?কেক কি আমি নষ্ট করেছি?

- উঠতে গিয়েই তো ঠেলা লাগলো,তাতেই তো কেককে আ*ত্মা*হুতি দিতে হলো।বেচারা,ব্ল্যাক ফরেস্টের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।এক পেত্নীর ঝটকায় তাকে পরপারের যাত্রী হতে হলো।

- তো উঠবোনা?তোমার বুকে শুয়ে থাকবো নাকি?

- কেনো?আমার বুক এতটাই ঠুনকো লেগেছে তোমার কাছে যে কিছু মুহূর্তের স্পর্শও সহ্য করতে পারোনি?

পাল্টা জবাব দিতে গিয়েও থমকে গেলো চারুলতা। তিরতির করে কাপলো তার অধর।নিহাদ কোন অর্থে কথাটা বলেছে জানা নেই,কিন্তু তার মাঝে অদ্ভুত অনুভুতির দোলাচল উদগিরিত হয়েছে। শব্দগুচ্ছ কন্ঠে দলা পাকিয়ে গিয়েছে।দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো সে।তাতে বিজয়ীর হাসি হাসলো নিহাদ,

- আমার মতন হ্যান্ডসাম ছেলে এই দুনিয়ায় আর কয়টা আছে বলো?এই বুকে ঠাঁই পেয়েছ কয়েক সেকেন্ডের জন্য এ তোমার সাত পুরুষের ভাগ্য!

- স্টপ ইট!

অতর্কিতে একটি সিলভার চামচ ছুটে এলো নিহাদের উদ্দেশ্যে,টাং করে তার মাথায় নিশা*নাভেদ করলো।তাতে ভড়কে গিয়ে মাথা ঘষতে ঘষতে পাশ ফিরে আসমানকে নির্বিকার চেয়ে থাকতে লক্ষ্য করলো।কাউন্টারে দুহাত ঠেকিয়ে শীতল দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে দুজনকে।

- এটা রঙ্গ করার জায়গা?

- না।রান্না করার জায়গা।

নিহাদের প্রতি উত্তরে আসমান দৃষ্টি বুজে একটি দীর্ঘশ্বাস নির্গত করলো।অতঃপর যখন নয়নপল্লব মেললো তখন তার কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নিহাদের সমস্ত শরীর প্রকম্পিত করে দিলো।

- হেহেহে...বদ্দা....আমি তো একটু মজা করছিলাম... এতে এত রাগ করে নাকি কেউ?

ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে চাইলো নিহাদ,কিন্তু চারুলতার সঙ্গে ধাক্কা খেলো।মেয়েটি কিচেনের দরজার প্রান্তে দুহাত পিছনে বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে পলায়ন করতে দিতে নারাজ।

- তোমার ব্যবস্থা আমি আগামীকাল করবো নিহাদ।

আসমানের ঘোষণায় একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করে নিহাদ ভিক্ষার দৃষ্টিতে চাইলো রোযার দিকে।একপাশে দাঁড়িয়ে অতি উৎসাহী হয়ে নাটক পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলো সে এতক্ষণ।নিহাদ তাকাতেই তীর্যক হেসে চোখ টিপ দিলো সে,বেচারার সমস্ত আশা যেন এক লহমায় গুঁড়িয়ে গেলো।

- বেঈমানদের মাঝে বসবাস আমার!

মিছিমিছি কান্নার ভান ধরলো নিহাদ,তাতে রোযা হেসে আসমানের দিকে এগোলো। কাঁধে হাত রেখে মৃদু কন্ঠে বললো,

- হয়েছে আসমান।বাদ দাও।বেচারা বুঝতে পারেনি।

- বেচারা?কাকে বেচারা বলছো তুমি?ছাব্বিশ বছরের এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বেচারা কি করে হয়?

- ছাব্বিশ?

চারুলতা মনে মনে উচ্চারণ করতে চাইলেও খানিক জোর পরে গেলো,সকলে অতর্কিতে তাকালো তার দিকে।দ্রুতই কন্ঠ পরিষ্কার করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো সে।

- আজ শুভদিন বলে কিছু বলছিনা।মুখে লাগাম দাও।অন্যথায় ভুলে যাবো শুভদিনের কথা,আগে তোমাকে সাইজ করবো।অনেকদিন পোলিও খাওয়া হয়না তোমার, দুই ডোজ পেটে পড়লেই সব রঙ্গতামাশা বেরিয়ে যাবে।

উল্টো ঘুরে হাতে গ্লাভস পরিধান করে ওভেনের দিকে এগোলো আসমান।ঝুঁকে দেখলো তার অতি দ্রুততম সময়ে বানানো কেকখানি ঠিকমত হচ্ছে কিনা। রোযাও কৌতূহলী হয়ে তার পাশে দাঁড়ালো।অপরদিকে নিহাদ এক স্বস্তির নিঃশ্বাস গোপন করে মাথা ঝাঁকালো।কপালে তার কি আছে খোদাই ভালো জানেন।

- আমাকে আপু বলে ডাকবে।

মৃদু কণ্ঠস্বরটি কানে যেতেই কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে নিহাদ পাশে ফিরে তাকালো। চারুলতা এসে দাঁড়িয়েছে নিকটে,মিটিমিটি হাসছে।

- আমি আটাশ, গুরুজন তোমার।আসতে যেতে সালাম দিয়ে চলবে,জুনিয়র মুরগী!

কয়েক মুহূর্ত সময় প্রয়োজন হলো নিহাদের বিষয়টি হজম করে নিতে।পরক্ষণেই তীর্যক হাসিতে উদ্ভাসিত হলো তার সুদর্শন চেহারা।সামনে ঝুঁকলো,একেবারে চারুলতার কানের নিকট ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে জানালো,

- ডোন্ট ওয়ারি, আই লাইক ওল্ডার উইমেন!

স্পষ্টত শিহরিত হলো চারুলতার সর্বাঙ্গ,সামান্য সরে হাসির ঝলক প্রদর্শন করে নিহাদ কাউন্টারের বাস্কেট থেকে একটি আঙ্গুরের থোকা তুলে নিয়ে কয়েকটি মুখে পুরলো,চারুর দিকে এগিয়ে দিয়ে শুধালো,

- ওয়ান্ট সাম?

নিহাদকে বিহ্বল করে দিয়ে চারুলতা পাল্টা কোনোপ্রকার জবাব দিলোনা। উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেলো।অদূর থেকে তার চলার পথে তাকিয়ে থাকলো নিহাদ, সদা নিয়ন্ত্রিত মেয়েটির সুদর্শনা অবয়বে লালিমার আবরণ তার দৃষ্টি এড়ায়নি। নিজের হৃদমাঝারে এক তড়িৎ অনুভব করলো নিহাদ,দৃষ্টি সরিয়ে নিলো দ্রুতই।

“ নিয়ন্ত্রণ কর নিজেকে, গ্রহাণুর সাধ্য কি নিজেকে নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করে?”—

ধ্বনিত হলো তার অন্তরজুড়ে।

。

。

。

পরদিন।

যদিও গতকাল রাত্রিতে বেশ দেরী করেই ঘুমানো হয়েছিল আয়োজন সমাপ্তের পর,তবুও আজ বেশ ভোরেই উঠে পড়লো রোযা।

নতুন দিনের দিবাকর আপন রশ্নির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে ধরিত্রীর বুকজুড়ে।স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল চুঁইয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে স্নিগ্ধতা মাখানো দীপ্তি।আলোকোজ্জ্বল কক্ষটি যেন স্বর্গের প্রতিরূপ।নড়চড় করতে গিয়েই রোযা অনুভব করলো আসমানের বাহুডোরে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে সে।নয়ন মেলে মৃদু হাসলো সে,ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখাবয়বখানি তার তন্দ্রার জগতকে ভাসিয়ে তুললো অনুভবের জোয়ারে।সন্নিকটে গেলো রোযা,হাত তুলে ছুঁয়ে দিলো কপোল আলতো করে।মৃদু গুঙিয়ে উঠে তার স্পর্শের মায়ায় হারালো আসমান,তার নিদ্রাভঙ্গ হয়নি।ভাবছে বুঝি এক রূপকথার ন্যায় সুন্দর স্বপ্ন।তার নাকে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে রোযা সন্তপর্নে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।কম্বল টেনে সম্পূর্ণ ঢেকে উঠে পড়লো বিছানা ছেড়ে।হাতমুখ ধুয়ে নিজেকে তৈরি করতে আয়নার সামনে বসতেই নজরে পড়ল বিষয়টি।

রোযার কন্ঠজুড়ে জড়িয়ে আছে একটি স্বর্ণের তৈরি লকেট।বহুকাল আগের কাজ,যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হলেও জৌলুস হারিয়েছে।এটি আসমানের তরফ থেকে তার জন্মদিনের উপহার।মূল্যহীন এই বস্তু রেমান পরিবারের আভিজাত্যের বিপরীতে।তবুও রোযার সবটুকু আবেগ কেড়ে নিয়েছে ছোট্ট অথচ অর্থপূর্ণ এই উপহার।কারণ,আসমান এটি তার কণ্ঠে পরিয়ে দিয়ে বলেছিল,

“ এটা আমার আম্মুর।যত্নে রেখো, জ্যোৎস্না।”

অতিরিক্ত কোনো ব্যাক্ষা আসমান প্রদান করেনি।তার একটি বাক্যই রোযার নিকট এই বস্তুর গুরুত্ব উপলব্ধিতে যথেষ্ট ছিল।নিজের চারিপাশের দেয়াল হটিয়ে দিয়েছে আসমান,হাত বাড়িয়েছে রোযার ভালোবাসার অনুভবের প্রতি সম্পূর্ণভাবে।নিজেকে উৎসর্গ করেছে আরো একবার।তাই হয়ত এই লকেটের যোগ্য হকদার মনে করেছে সে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে।

আসমানের মা—রোযার নিকট এক মমতাময়ী ধোঁয়াশার অস্তিত্ব সে।যার সম্পর্কে কোনোদিন কোনো বাক্য শ্রবণের সৌভাগ্য হয়নি তার।অতীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তিনি।আসমান বাদশাহ কায়সারের পুত্র হলে তিনি নিশ্চয়ই তার স্ত্রী ছিলেন।তাহলে বিলাল রেমান?তিনি যে চিরকুমার তাতে সন্দেহ নেই,আসমান,চারুলতা কিংবা চিত্রলেখা কেউই তার নিজের সন্তান নয়।তবে এহেন দুর্বলতার কারণ?আসমানের প্রতি তার পিতৃত্ববোধ যেন জগতের সকল ঔদার্যকেও হার মানায়।এর পিছনে কি কোনোভাবে আসমানের মা দায়ী?কি ঘটেছিল অতীতে?কিভাবে আসমান পৌঁছেছিল বাদশাহ কায়সারের হাতের মুঠোয়? রহস্যের ভেদে রোযার অন্তরমাঝে আকুলিবিকুলি ঢেউ উঠলো।রাফা কায়সারকে অবহেলা করা অসম্ভব,তাকে পূর্ণ শক্তিতে মোকাবেলা করতে হবে।তার জন্য আসমানের সম্পূর্ণ অতীত জানা প্রয়োজন।আসমানকে জিজ্ঞেস করবে?কিন্তু সে নিজেও কি আদতে সবকিছু সম্পর্কে অবহিত?

একনজর ঘুমন্ত আসমানের উদ্দেশ্যে তাকালো রোযা।রাফা কায়সারের সঙ্গে তার সম্পর্ক,বাদশাহ কায়সার তার বাবা এই ধরণের বিষয়গুলো ছেলেটি তার কাছে পরিষ্কার করেনি।কিন্তু তাতে কি অভিমান করা সম্ভব তার উপর?নিশ্চয়ই আসমানের নিজস্ব কোনো ভাবনা ছিল। রোযাকে সম্পর্কের এই কদর্যতা উপলব্ধি করতে দিতে চায়নি সে,দূরে রেখেছে সকল কলুষিত সত্য থেকে।এটা হয়ত তার আপন নিরাপত্তার পদ্ধতি।তাই অভিমান হলোনা রোযার,বরং দারুন বিষন্নতা অনুভূত হলো।কত কিছু সহ্য করতে হয়েছে এই অভিশপ্ত অস্তিত্বকে যা তাকে মানুষ থেকে মেশিনে রূপান্তরিত হতে বাধ্য করেছিল?

সন্তপর্নে উঠলো রোযা,আসমানের ঘুমন্ত চেহারা অবলোকন করে গেলো একদৃষ্টিতে।আজ আন্দোলনে বিরতি।ঠিক বিরতি নয়,বিকালে মিটিং রয়েছে।তাই সকালটুকু সে সম্পূর্ণ মুক্ত।তাছাড়া আজ তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে আজ আসমান নিজের হাতে সকলের জন্য দুপুরের খাবার তৈরী করার কথা দিয়েছে,নিজের পরিবারকে সময় দিতে হবে কিছুটা হলেও।হঠাৎ স্বচ্ছ দেয়াল বেয়ে বাইরে দৃষ্টি গেলো রোযার,বাগানের পথে জগিং করতে লক্ষ্য করা গেলো বিলালকে।এই বয়সেও তার শারীরিক যত্নে কোনোপ্রকার আপোষ নেই। রেমানদের প্রত্যেকেই স্বাস্থ্য সচেতন।বর্তমানে রোযারও শারীরিক কসরত এবং ট্রেনিংয়ের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।সময় পেলেই আসমান তাকে জিমে আত্মরক্ষার কৌশল চর্চা করায়। বিলালকে বাহিরে দেখে চকিতে এক বুদ্ধি খেলে গেলো রোযার মস্তিষ্কে। মেঘতীর বর্তমানে ঘুমন্তপুরী।জাগ্রত হওয়ার তাড়া নেই কারো।একান্তে কথোপকথনের এই সুযোগ।

যেমন ভাবা তেমন কাজ পরিকল্পনা করে রোযা দ্রুত নিচে নেমে এলো।কিচেনে গিয়ে সহজ হাতে অ্যাভোকাডো টোস্ট, অমলেট এবং ফলের রস তৈরি করলো।ট্রেতে দুইজনের অনুপাতে সাজিয়ে হেঁটে চললো বিলাল রেমানের কক্ষের দিকে।রোযা নাস্তা তৈরি করতে করতে জগিং সেরে ফিরে এসেছেন তিনি।কক্ষ তার নিচতলায়ই।রাজকীয় ধাঁচের দরজার নিকট পৌঁছে রোযা থামলো।মৃদু আঁচে কড়া নাড়লো।

- বাবা।আমি রোযা,আসবো?

- মামণি?অফকোর্স,কাম ইন।

অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো রোযা।বিলাল রেমানের কক্ষটি বনেদী ধাঁচে তৈরি।আধুনিকতার ছোঁয়া নেহায়েত কম।তবে আভিজাত্যের কমতি নেই কোথাও।এই কক্ষটি রেমান পরিবারের প্রধানদের কর্তৃক ব্যবহৃত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।যদিও বাধ্যবাধকতা নেই নীতি পালনের,কিন্তু বিলাল রেওয়াজ মেনেই চলেছেন।

রোযাকে নাস্তার ট্রে হাতে লক্ষ্য করে বিছানার কিনারে বসে ঘাড় মুছতে থাকা বিলাল হাসলেন।সোফায় বসার ইশারা করলেন।রোযা আজ্ঞা পালন করতে করতে তিনি জগিংয়ের পোশাক পরিবর্তন করে টি শার্ট গায়ে চড়িয়ে এলেন।অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তাতে তাকে রীতিমত যুবক ধাঁচের কেউই দেখালো।শক্ত সামর্থ্য শারীরিক গঠন,প্রশস্ত বুক,সুদর্শন মুখশ্রী এবং তার সঙ্গে মানানসই হালকা ফ্রেমের চশমা।অধরের উপরে পাতলা গোঁফের চারিপাশে খোঁচা খোঁচা আধপাকা দাড়ি তার বয়সের আধিক্য নয় বরং অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছে যেন।রোযার বিপরীতে বসলেন তিনি।

- গুড মর্নিং।

- গুড মর্নিং বাবা।

- বাহ্,আমার মামণি আজ নিজ হাতে নাস্তা তৈরি করে এনেছে?উপলক্ষ বিশেষ কিছু বটে।

বিস্তৃত হাসলেন তিনি।অতর্কিতে ট্রাউজারের পকেটে হাত ভরলেন।সেটি বের করতেই তার হাতের তালুতে দেখা গেলো গোলাকৃতির একটি বাক্স।ঢাকনা খুলতেই ভেতরে জ্বলজ্বলে নীলচে এক রত্ন দ্যুতি ছড়াতে আরম্ভ করলো।

- নীলকান্তমণির টায়রা। রেমান পরিবারের পৈতৃক সম্পত্তি।আজ থেকে এর হকদার তুমি মামণি।শুভ জন্মদিন।

রোযার হাত কাপলো জিনিসটি গ্রহণ করতে গিয়ে।বিহ্বল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

- বা...বাবা আপনি নিশ্চিত এই জিনিস আমার প্রাপ্য?

- অবশ্যই।রোযা রেমান তুমি,এই সম্পদের যথাযথ অধিকারী।

- কি...কিন্তু এটা অনেক মূল্যবান নিশ্চয়ই।আমি কিভাবে...

- এই সংসার জুড়ে রাখার দায়িত্ব বর্তমানে তোমারই মামণি।আমি আর কতদিন?খোদার ডাক আসলে পরপারের যাত্রী হতে সময় লাগবেনা।এই পরিবারের একটি ভিত্তি দরকার।তুমি আমার আসমানের যোগ্য সঙ্গিনী হবে আমি জানি,ওর পাশে থাকবে আজীবন।

আপ্লুত হলো রোযা।মাথা দুলিয়ে সায় জানালো।

- শুভ উপলক্ষের আয়োজনে রেমান পরিবারের বউদের এই টায়রা পরিধানের রেওয়াজ ছিল। আশা রাখছি তুমি পালন করবে তা।তারপর যখন তোমার ছেলের বউকে বরণ করে নেবে,তখন তাকে দেবে।

- আমার ছেলের বউ?

স্পষ্টত লজ্জাবোধ করলো রোযা।বিলাল তাতে বিস্তৃত হাসলেন।

- অবশ্যই।বিয়ে তো হলো,এবার নাতি নাতনীর মুখদর্শনের পালা আমার,তাইনা?একজন প্রিন্সেস কিংবা প্রিন্স সমগ্র বাড়িতে দাপিয়ে বেড়াবে,আমি তার ব্যক্তিগত ঘোড়া হয়ে পিঠে তুলে নেবো।তাই দেখো কত কসরত করে শরীর বানাচ্ছি!

হাসতে বাধ্য হলো রোযাও। বিলাল রেমান অতি স্নিগ্ধ এক মানুষ। আপন ভরসার ছায়ায় তিনি আগলে রাখেন সকলকে।তার সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা চোখে পড়লেও অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখা বেদনাটুকু হয়ত কেউ কোনোদিন উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়।অতি যত্নে তিনি নিজেকে বিষাদটুকু আড়াল করে রাখেন সন্তানদের থেকে।

- আপনি এখনো যথেষ্ট হ্যান্ডসাম বাবা।চাইলেই যে কেউ এক বাক্যে আপনাকে বিয়ে করতে রাজী হবে।

- তাই বুঝি? অস্বীকার করলাম না।যুবক বয়সে আমিও যথেষ্ট....কি যেন বলে তোমাদের ভাষায়? হট অ্যাণ্ড সেক্সী ছিলাম!

চোখ টিপে দিলেন তিনি।হাতে তুলে নিলেন টোস্ট, একটি ঢোক গলাধঃকরণ করে রোযা অবশেষে জিজ্ঞেস করলো,

- আপনি কোনোদিন বিয়ে করেননি কেনো বাবা?চারুলতা এবং চিত্রলেখার একজন মায়ের দরকার ছিল নিশ্চয়ই?

দৃশ্যমানভাবে থমকালেন বিলাল।দৃষ্টি তার যথারীতি প্রফুল্ল,কি ভাবছেন বোঝা দায়। টোস্টে কামড় না দিয়ে তিনি পুনরায় রেখে দিলেন সেটি প্লেটে।রোযা মেঝের দিকে তাকালো,

- এমন ব্যক্তিগত প্রশ্নের জন্য দুঃখিত বাবা।কিন্তু হয়ত ব্যাপারটা আমার জানা প্রয়োজন।আসমানের মা, আসমানের বাবা.... এই সমস্ত অতীতের রহস্য আমায় কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

নিঃশব্দ থাকলেন বিলাল,তারপর অতর্কিতে বিড়বিড় করলেন,

- যদি বলি একজনকে লাভ করার আশায় আমি আমার সমস্ত জীবন পার করে দিয়েছি তাহলে কি বিশ্বাস করবে, মামণি?

চোখ তুললো রোযা,মৃদু কন্ঠে শুধালো,

- আসমানের মা?

- ওর নাম আয়েশা।বড়ই মধুর এক স্মৃতি।তোমার কন্ঠে ওর লকেটটি দারুণ মানিয়েছে মামণি।খানিকটা আয়েশার মতোই লাগছে।

নিস্তব্ধ রইলো রোযা,বিলাল রেমান স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছেন।কিন্তু তার নয়নজুড়ে আবেগের টলটলে অশ্রু ভিন্ন কিছু ঘোষণা করছে।

- বাবা....আমি দুঃখিত।কোনো দরকার নেই আপনি...

- উহুম।আমারও কিছুটা ভারমুক্ত হওয়া দরকার।একলা স্মৃতিচারণের যন্ত্রণা বড্ড পীড়াদায়ক।

এটুকু বলেই উঠে গেলেন বিলাল।ক্লোজেট খুলে সিন্দুক থেকে বের করে আনলেন একটি ছোট্ট পকেট অ্যালবাম।রোযার দিকে এগিয়ে দিলেন।সেটি খুলতেই মুহূর্তের জন্য হৃদস্পন্দন থমকালো রোযার। অ্যালবামের পাতাজুড়ে খচিত এক চিত্রপট। যাতে তরুণ বয়সী এক ছেলেকে নজরে পড়ছে।রীতিমত আশির দশকের মডেলদের ন্যায় ভঙ্গি তার,মেঝেতে দুপা ছড়িয়ে বসেছে,ঠোঁটে ঝুলন্ত একটি কাঠির মতন।সিগারেট কিংবা অন্যকিছু হতে পারে।তবে ব্যাপার সেটি নয়,তার উদ্দেশ্যে ঝুঁকে থাকা অপ্সরীতুল্য এক রমণী যেন সবটুকুর কেন্দ্রবিন্দু।হাতে একটি ডায়েরি, যাতে আনমনে কিছু লিখে চলেছে।তরুণের দৃষ্টি তার মুখজুড়ে।আগেকার যুগের সিনেমার পোস্টার বলে চালিয়ে দেয়া যাবে ছবিটিকে অনায়াসে।

- এটা আপনি বাবা?

সামান্য হাসলেন বিলাল, সায় জানালেন।রমণী কে তা বুঝতে রোযাকে বেগ পেতে হলোনা।সোফায় হেলান দিয়ে জুসের গ্লাস তুলে নিলেন বিলাল, চুমুক দিয়ে জানালেন,

- সে আজ থেকে প্রায় তেত্রিশ বছর আগেকার কথা।আমি তখন ইতালি থেকে দেশে ফিরেছি বাংলাদেশে ব্যবসা বিস্তৃতির উদ্দেশ্যে।ইতালিতেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।যার দরুণ বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে খুব একটা পরিচিত ছিলাম না।বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন,কায়সার পরিবারকে মোকাবেলায় এবং যথার্থ ভিত্তি স্থাপনে আমার গাইডের দরকার ছিল।একজন অ্যাসিস্টেন্ট।কখনোই কারো সামনে নতজানু হওয়ার প্রবণতা ছিল না আমার মাঝে,সবসময় পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই ভালোবাসতাম।কারো হুকুম কিংবা উপদেশের ধারকাছ দিয়েও হাঁটতাম না।যতদিন না আমার অ্যাসিস্টেন্ট সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে......

নিজেকে বিলাল রেমানের অতীতের রোমন্থনে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেললো রোযা।

━━━━━━━━━━━━━━

তেত্রিশ বছর অতীত।

মেঘতীর ভবন।

“ শেরি শেরি লেইডি

গোয়িন থ্রু আ মোশন

লাভ ইয হোয়্যার ইউ ফাইন্ড ইট

লিসেন টু ইওর হার্ট ” ~

গ্রামোফোনের সুরের আবহে উদ্ভাসিত সমস্ত কক্ষ।ওয়াইনের মিষ্টি সুবাসে ভরপুর প্রত্যেক প্রান্ত।যার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে বাথরুম থেকে ভেসে আসা পানির কলকলে ধারার শব্দ।একটা মুহূর্তে সেই প্রবাহ বন্ধ হলো, হাট করে খুলে গেলো দরজা। সিক্ত পায়েই মেঝেতে পদার্পণ করলো তাগড়া তরুণ ছেলেটি।শুধুমাত্র একটি তোয়ালে জড়ানো কোমরের চারিপাশে।অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গ।তাতে প্রতিফলিত হওয়া ল্যাম্পের স্বর্ণালী আভা।বুকের বামপাশাজুড়ে তার এক নেকড়ের ট্যাটু অঙ্কিত।সোনালী প্রজ্জ্বলনে যা একইসঙ্গে মনোমুগ্ধকর এবং ভয়ংকর ঠেকছে।

মেঝে সিক্ত করার পরোয়া না করেই সে কক্ষজুড়ে দুবাহু মেলে ঘুরতে আরম্ভ করলো, গ্রামোফোনের তালে তাল মেলালো তার কন্ঠস্বর।

“ শেরি শেরি লেইডি

লিভিন ইন ডিভোশোন

ইটস অলওয়েজ লাইক দ্যা ফার্স্ট টাইম

লেম্মি টেইক আ পার্ট ”~

ওয়াল্টজের তালে ঘুরে যেতেই কক্ষের একদম কোণায় একটি আরামকেদারায় নজর আবদ্ধ হলো তার।অজ্ঞাত এক রমণী।পরিধানে ধবধবে শুভ্র বর্ণের শাড়ী,দীঘল কালো কেশরাশি তার মাঝখানে সিঁথি তুলে দুপাশে ছড়ানো।একদৃষ্টে চেয়ে আছে তরুণের দিকে, নয়নজুড়ে মায়াবিনীর এক প্রগাঢ় কৃষ্ণগহ্বর।থমকালো তরুণ,আপন অন্তরে এক মৃদু খটখটানি অনুভব করলো।এমন অবস্থায় এক রমণীর সামনে তার বিব্রত হওয়া উচিত।কিন্তু সে তাতে বিন্দুমাত্র নারাজ,কিসের শঙ্কা তার?কিসের লজ্জাবোধ? বিলাল রেমান সে,যার কাঁধে বিরাট এক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তরের অস্তিত্ব।

রমণীর মাঝেও বিন্দুমাত্র বিব্রতবোধ নেই, চেয়ে আছে সে একদৃষ্টে।যেন তার দৃষ্টি দিয়েই মেপে নিচ্ছে প্রতিপক্ষের তেজ।এগোলো বিলাল, আরামকেদারার সন্নিকটে।হিং*স্র শিকারীর দৃষ্টি তার গভীর নয়নে, অধরজুড়ে সন্তুষ্টির তীর্যক হাসি। আরামকেদারার দুপাশের হাতলে হাত রেখে সে ঝুঁকলো, তীক্ষ্ণ চিবুক গড়িয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো রমণীর কোলে। তা লক্ষ্য করে মাদকীয় ভঙ্গিতে হাসলো বিলাল,রমণীর দৃষ্টি তার মুখশ্রী অতিক্রম করে বুকের ট্যাটুর উপর গেড়ে বসেছে।

- ডু ইউ লাইক হোয়াট ইউ সি?

তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো রমণী,বিব্রত হয়ে নয়, বরং কিঞ্চিৎ ক্রোধে।হাঁটুর উপর পা তুলে শক্ত ভঙ্গিতে মোকাবেলা করলো শিকারীকে।

- সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যের গাঁধা দেখছি।আপনাকে বাঙালী সুপুরুষে পরিণত করতে বেশ কাঠখড় ব্যয় করতে হবে।

এক মুহুর্ত থমকালো বিলাল,অতঃপর হাসিটি তার বিস্তৃত হলো। আরও একটু ঝুঁকলো রমণীর নিকট, অজ্ঞাত রমণী তৎক্ষণাৎ পাশের একটি মোটা মলাটের পুস্তক টেনে উভয়ের মাঝে সীমারেখা স্থাপন করলো যেন।তাতে বিনোদিত হয়ে বিলাল বইয়ের প্রান্ত চেপে ধরে বিড়বিড় করলো,

- আর ইউ লস্ট ইন ডেভিলস ডেন....মিস অ্যাঞ্জেল?

#ডার্কসাইড

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৫১

পর্ব ৫১: (শেষাংশ)

─⁠──⁠───⁠──⁠──

~ কে তুমি তন্দ্রাহরণী

দাঁড়িয়ে আমার চোখের আগে

রাঙালে এ মন পুষ্পরাগে

কে গো চম্পাবরণী

কে তুমি তন্দ্রাহরণী ~

গ্রামোফোনের সঙ্গীত মূর্ছনায় উদ্ভাসিত সম্পূর্ণ কক্ষজুড়ে মিষ্টতার ঘ্রাণ।তবে তা ওয়াইনের নয়, ফলের রসের।ডেস্কের উপর রাখা পাত্রে শোভা পাচ্ছে আঙ্গুরের শরবত।সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে তা ওয়াইনের মতোই দেখায়।উন্মুক্ত বুকের বাম পাশের ট্যাটুখানির বিলোপ ঘটেছে।এমনকি সঙ্গীতের পছন্দতেও ব্যতিক্রম।ইউরোপীয় অপেরা কিংবা পপের বদলে বাংলা গান?বিস্ময়ে ভ্রু উঁচু না করে পারলেন না মেঘতীর ভবনের দায়িত্বে থাকা দীর্ঘদিনের কর্মচারী শামীম শিকদার।পঞ্চাশের ঘরে ঠেকেছে বয়স তার, মোটা ফ্রেমের চশমার অন্তরালে তবুও দৃষ্টি সুচারু।

মাস তিনেক অতিবাহিত হয়েছে রেমান পরিবারের বংশধর আপন জন্মভূমিতে থিতু হতে আরম্ভ করেছে।প্রথম যেদিন এসেছিল,তখন ছিল পুরোদস্তুর এক সাহেব।কিছুটা উগ্র এবং রগচটা স্বভাবের।বৈশিষ্ট্য যদিও অভিজাত,কিন্তু বাঙালী সমাজে তা মানানসই ছিলোনা।কিন্তু তার সহকারী মেয়েটা ভালোই খেল দেখিয়েছে এই কয়েকদিনে।যেন হাতের মুঠোয় বশ করে নিয়েছে।

- কে আপনার তন্দ্রা হরণ করলো সাহেব?

শামীম প্রশ্ন ছুঁড়লেন।তাতে আরামজেদারায় হেলান দিয়ে থাকা বিলাল সোজা হয়ে বসলো,ঠোঁটে তার এক লম্বাটে দারুচিনির টুকরো ঝুলে আছে।সেটি সিগারেটের মতন দু আঙুলে নিয়ে বিলাল বিড়বিড় করলো,

- তন্দ্রা অর্থ কি?

হাসলেন শামীম।মাথা নেড়ে জানালেন,

- তন্দ্রা অর্থ ঘুম।যে সঙ্গীত শুনছেন তার মূলভাব অনুভব করতে পারছেন না?

- হুম।

মস্তিষ্কে যেন গেঁথে নিলো বিলাল, তীক্ষ্ণ শিকারী দৃষ্টি তার দূর জানালায় আবদ্ধ।

- হঠাৎ এমন সঙ্গীতের ধাঁচ বদল?আয়েশা কিছু বলেছে বুঝি?

ভ্রু কুঁচকে তাকালো বিলাল।যেন আয়েশা নামে বিতৃষ্ণা জেগেছে তার।যদিও ব্যাপারটি সত্যি নয়।বরং হৃদয়ে এক তরঙ্গ খেলে গিয়েছে অজানা অনুভূতির।

- হ্যাঁ,বলেছে।ওই মেয়ে তো সারাদিন বকবক বকবক করতেই থাকে।ওর কাজই আমার মাথা নষ্ট করা।

- নষ্ট করা নাকি ঠিক করা?

কাঁধ তুলে ঠোঁট উল্টে আবারো হেলান দিলো বিলাল।জিহ্বায় দারুচিনি ছুঁয়ে জানালো,

- ওই মেয়েই তো পবিত্র আর আমি পাপী।তাইনা?

শামীম মাথা দুলিয়ে হাসলেন।

- রাগ করবেন না সাহেব,আমি এমনিতেই বলছিলাম।

- আপনারা সবাই একজোট আমি জানি।নাটক করার প্রয়োজন নেই।আপনার নাটক ভালো হচ্ছে না।থিয়েটার আছে,প্রয়োজন পড়লে সেখান থেকে দেখ নেবো।

অট্টহাসি হাসলেন শামীম,তারপর এগিয়ে গিয়ে সমাপ্ত হয়ে আসা শরবতের পাত্র পূর্ণ করে দিলেন।বিলাল সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো।তারপর শুধালো,

- এই আয়েশা তালুকদারের কাহিনী কি সত্যি?নাকি এর পিছনে অন্য কোনো রহস্য আছে?

শামীম পাত্র নামিয়ে রেখে অধরে হাসি ধরে রেখেই জানালেন।

- সত্যি।আয়েশা তালুকদার পরিবারের মেয়ে,যদিও তালুকদার পরিবার বলতে বর্তমানে কিছু অবশিষ্ট নেই।একাত্তরের যু*দ্ধের পর তাদের ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি গুঁড়িয়ে যায়,মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে নেমে আসে তাদের স্তর।তখন রেমানদের কর্মচারীতে পরিণত হয় তারা।বছর দশেক আগে আয়েশার বাবা অসুস্থতাজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন,তার পরবর্তী বছর মাও একই পথের যাত্রী হন।এরপর থেকে মেয়েটা একলাই জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলেছে।খুবই কর্মঠ এবং আত্মমর্যাদাবান।তাই আপনার বাবা মেয়েটাকে নির্বাচন করেছেন,আপনি বাস্তবতা শিখবেন তার কাছে।

একটি বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেললো বিলাল,যেন শামীমের ইতিহাস শুনে তার বিন্দুমাত্র অনুভূতি হচ্ছেনা।আদতে আর অন্তর সম্পূর্ণ ভিন্ন ইচ্ছা পোষণ করে চলেছে। আরো জানতে চায় সে আয়েশা সম্পর্কে।কিন্তু মেয়েটাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা কষ্টকর,ঠোঁটের মাঝে বা*রুদ নিয়ে ঘোরে যেন।

- আয়েশা তালুকদার.... আই সি....

পুনরায় ঠোঁটে দারুচিনি পুরলো বিলাল,কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হলোনা।বিরক্তির শব্দ তুলে উঠে বসলো।টেবিল থেকে লাইটার হাতিয়ে নিলো,ঝুলন্ত শার্টটি গায়ে চড়ালেও বোতাম আটকানোর প্রয়োজনবোধ করলোনা।সিগারেট বের করতে করতে আপনমনে বিড়বিড় করলো,

- ইট উইল বি রিয়েলি হার্ড টু কোয়াইট স্মোকিং।

স্পষ্টত শুনলেন শামীম,কিন্তু কোনোপ্রকার মন্তব্য করলেন না।সিগারেট বের করে জ্বালতে জ্বালতে বিলাল কক্ষ থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে বারান্দার উদ্দেশ্যে হাঁটতে আরম্ভ করলো।রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বাহিরের প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে করতে সিগারেটে মনোনিবেশ করলো সে, অপর হাতটি গুঁজলো প্যান্টের পকেটে।ঠিক কতক্ষন নিভৃতে পেরিয়েছে জানেনা,অতর্কিতে মিষ্টি অথচ দৃপ্ত কণ্ঠস্বরটি ভেসে এলো।

- ওসব স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, বারণ করেছিলাম।

ফিরে তাকালো বিলাল,গোলাপ বর্ণের শাড়ী পরিহিতা আয়েশা বারান্দার প্রান্তে প্রবেশপথের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।দুবাহু তার বুকের উপর রাখা, খোলা কেশরাশি বায়ুতে দোল খাচ্ছে এলোমেলোভাবে। তবুও এই অস্তিত্বকে একটুও অগোছালো লাগছেনা। সৌন্দর্য্য এবং মর্যাদার এক মিশেল সে। বিলালের অধরে তীর্যক হাসি ফুটলো।

- অ্যায ইফ আই কেয়ার!

আয়েশাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আরো একটি সিগারেট প্রজ্জ্বলিত করলো বিলাল,যদিও আগেরটি এখনো নিঃশেষ হয়নি।সেটি আধখাওয়া অবস্থায়ই নিচে ফেলে নতুনটি ঠোঁটে ছোঁয়ালো।দীর্ঘ এক টান গ্রহণ করলো,বায়ু পরিপূর্ণ হলো মাদকীয় ধোঁয়াতে।কোনোপ্রকার বাক্য উচ্চারণ না করে আয়েশা সম্পূর্ণ দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করলো।তারপর এগোলো।বিলাল প্রত্যাশাও করলোনা,এতটাই অতর্কিতে উত্তোলিত হলো তার হাত।এক টানে সিগারেট কেড়ে সোজা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেললো আয়েশা।তাতে ভড়কে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো বিলাল।এর পূর্বে এমন ঔদ্ধত্য তার সঙ্গে কেউ প্রদর্শন করার দুঃসাহস করেনি।

- ওসব টানুন,ঠিক আছে।আমার সামনে নয়।এই বিষাক্ত ধোঁয়ায় আমার অ্যালার্জি আছে।

দৃষ্টি সরু করে তাকিয়ে থাকলো বিলাল,একটানা কয়েকমুহূর্ত।তারপর রেলিংয়ে হেলান দিয়ে অধরে হাসি ফিরিয়ে এনে জানালো,

- অ্যাফ্রেইড দ্যাট ইউ উইল ফল ফর মি?

- বাংলায় বলুন।

- বাংলায় বললে অপবিত্র শোনাবে। যাই হোক.... আমার প্রেমে পরে যাওয়ার ভয় পাচ্ছো না তো?

আয়েশার অধর বিস্তৃত হলো, এক কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সে বিলালের দিকে।

- আপনি এবং প্রেম?আপনার মতন এক পাশ্চাত্যের গাঁধার সঙ্গে প্রেম?বিনোদন পেলাম।

ঝুঁকলো বিলাল,আয়েশার কিঞ্চিৎ নিকটে।তাতে তার উন্মুক্ত বুক স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো।আয়েশার দৃষ্টি এক পলক নজর বুলিয়ে তার মুখে এসে ঠেকলো।বিলাল খানিক হেসে মৃদু আবেশিত কন্ঠে বললো,

- কিন্তু তোমার দৃষ্টি যে ভিন্ন কথা বলে প্রিয়?

বিচলিত হলোনা আয়েশা,বরং কঠোর চিত্তে তাকালো বিলালের দৃষ্টিতে।

- আপনার সবসময় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে খুবই ভালো লাগে তাইনা?

- অফকোর্স।এত সুন্দর সৃষ্টি,প্রদর্শন করবোনা?সে তোমার মতন কারো দৃষ্টি আকর্ষিত হলে আমার মাথা ব্যাথা নয়।

- দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে ভিন্ন কারণে।আপনার নেকড়ে কোথায়?

সামান্য বিব্রত হলো বিলাল,নিঃশব্দ থাকলো।জবাব দেয়ার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন কিন্তু তা পাওয়া গেলোনা।আয়েশার কথা ভেসে এলো কানে,

- মুছে ফেলেছেন? বাহ,ঠিক করেছেন।এখন দেখতে ভালো লাগছে।

ক্রমশ বাড়তে থাকা লালিমার ছোঁয়া এড়াতে বিলাল দ্রুতকন্ঠে জানালো,

- ইশ।নতুন কিছু ট্যাটু করবো,তাই আগেরটা মোছার দরকার ছিলো।

- ওসব নেকড়ে ফেকড়ে দিয়ে কি হয়?

মাথা কাত করলো বিলাল।

- নেকড়ে এমন এক প্রাণী যে সবথেকে অধিক আস্থাশীল।একজন নেকড়ে সর্বদা একমাত্র এক সঙ্গিনী নির্বাচন করে,কোনোকালে তার ব্যতিক্রম ঘটেনা।যদি সঙ্গিনী গতও হয়,তবুও কখনো নেকড়ে অন্য কারো প্রতি আকর্ষিত হয়না।বরং সঙ্গিনীর মৃ*ত্যু*র পর নিজেও দ্রুতই পরপারের যাত্রী হয়।মানুষের থেকে শত সহস্র গুণে ভালো,কি বলো?

আয়েশা একনাগাড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, দৃষ্টির গাঢ়ত্বের প্রভাবে তিরতির করে কাপলো তার চোখের পাতা।

- নিজেকে নেকড়ের সঙ্গে তুলনা করছেন?

- হোয়াই নট?

- হাস্যকর।আপনাকে দেখে মনে হয়না আপনি কোনোদিন একজনে সন্তুষ্ট থাকবেন।

বিলাল নীরবে হাসলো,শার্টের অংশ চেপে আরো খানিক উন্মুক্ত করে বললো,

- দ্যান ট্রাই মি?

ক্ষিপ্র গতিতে এগোলো আয়েশার হাত,বিলাল ভাবলো এই বুঝি তার কলার টেনে ধরে জোরপূর্বক বোতাম আটকে দেয়।কিন্তু রমণী তা করলোনা।মাঝপথে থমকে গেলো।কি যেন ভাবলো।তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে ভিন্নদিকে চেয়ে জানালো,

- আমি শুধু জরুরী কিছু কাগজপত্র দিতে এসেছিলাম।আর হ্যাঁ,আগামীকালের বিজনেস পার্টির কথা ভুলে যাবেন না। ডিল হওয়া জরুরি,আপনিই মনে করিয়ে দিতে বলেছিলেন।

এতটুকুই।তৎক্ষণাৎ উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে গেলো আয়েশা।বিলাল নিজের স্থানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে অবলোকন করে গেলো।এই রমণী মাঝে মাঝে তার নিকট ভীষণ রহস্যময় ঠেকে।নিজের কঠোরতার অন্তরালে যেন একঝাঁক রহস্যের বসবাস।তার সম্পর্কে সবাই সবকিছু জানে,আবার যেন কিছুই জানেনা।তাই হয়ত বিলালের অন্তর সেই রহস্যের সমাধানে ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে।নিজেকে এমন ধারণাই প্রদান করলো সে।রেলিংয়ে হেলান দিয়ে পুনরায় তাকালো সুবিস্তৃত গগনের উদ্দেশ্যে।

- হুম..... তন্দ্রাহরণী।

অধরের হাসিটি ক্রমশ ব্যাপকতা ধারণ করলো বিলালের।

。

。

。

একটি মখমলি সোফায় বসে হাতের পুস্তকে মনোযোগ ধরে রেখেছে আয়েশা।চারিদিকে পার্টি অব্যাহত রয়েছে।অভিজাতদের বিজনেস পার্টি বলতে মূলত উত্তেজক পানীয়ে বুদ হয়ে থাকা,অপেরার সঙ্গে ওয়াল্টয।কেউ কেউ আবার অধিক বিনোদনের আশায় নর্তকীদলকে নৃত্য পরিবেশনের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকে। ব্যাপারগুলোতে মোটেও আগ্রহী নয় আয়েশা,তাই একপাশে অবস্থান নিয়েছে সে।তার মনোযোগ দূরীভূত হয়ে বিরক্তি ফুটলো একদল লোকের আগমনে।পাশ ফিরে তাকাতেই সোফায় আশেপাশে বিনা অনুমতিতে বসে যাওয়া লোকগুলোকে নজরে পড়লো। রেমান গ্রুপের ব্যবসায়িক সহযোগী।তাই ইচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে প্রশান্ত রাখলো আয়েশা।

- এক স্বর্গের অপ্সরী লাগছে তোমাকে।

- ধন্যবাদ।

মন্তব্যের বিপরীতে শুকনো এক প্রতিক্রিয়া উচ্চারণ করে পুস্তক হাতে উঠে পড়লো আয়েশা।দ্রুত প্রস্থানের চেষ্টা চালালেও তার হাত চেপে ধরলো একজন।

- আরে কোথায় যাচ্ছো? বসো।একটু আলাপ আলোচনা করি।

- আপনাদের আলোচনা আমার বসের সঙ্গে হওয়া উচিত,আমার সঙ্গে নয়।

- তা তো অবশ্যই।ভাবলাম তোমাকে তার মাঝে একটু চেনাজানা যাক?

তীর্যক হাসলো আয়েশা,নিজের হাতখানি মোলায়েমভাবে ছাড়িয়ে নিয়ে জানালো,

- দুঃখিত।আমি পরিচিত হতে ইচ্ছুক নই।শুভরাত্রি।

এটুকুই।দ্রুত উল্টো ঘুরে শাড়ীর আঁচল গুটিয়ে এগিয়ে গেলো আয়েশা।আশপাশের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুসরণে নিজেদের টপ এবং বলগাউনে সজ্জিত করা রমণীদের ভিড়ে তার চিকচিকে ঘন অমানিশাখচিত শাড়ী পরিধানকৃত অবয়ব না চাইতেও দৃষ্টি কাড়তে বাধ্য।চাইলে সে মুখের উপর জবাব দিয়ে লোকগুলোর ব্যবস্থা করতে পারতো,কিন্তু জনসম্মুখে ঝামেলা করতে বাঁধ সাধছে।তাই নিঃশব্দে পার্টির বাহিরে আড়াল হয়ে গেলো সে।

বাইরের খোলা জায়গায় এসে বিশুদ্ধ বায়ুতে প্রশ্বাস গ্রহণ করতেই ধীরে ধীরে প্রশান্ত হয়ে এলো তার জ্বলন্ত তেজ।স্থানটিতে কেমন আবদ্ধ এবং হাসফাঁস লাগছিলো।সর্বদাই লাগে,যখন অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও বিপরীত পক্ষের মন রাখার উদ্দেশ্যে তাকে অসৎ হাসি প্রদর্শন করতে হয়।সকলে এক,কেউই ব্যতিক্রম নয়।এই অভিজাতদের দল একেকটি দানব যেন। বিলাল রেমান সেই দানবদের উপরের সারিতেই রয়েছে।আপাতদৃষ্টিতে তার সৌন্দর্য্য দৈবিক মনে হলেও অন্তরের কদর্যতা মুছবার নয়।যেন সৌন্দর্য্যের অন্তরালে আপন আঁধার ঢেকে রাখে সে।সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারে আয়েশা।তবুও.... আজ এতগুলো দিন পেরিয়ে সে অনুভব করলো বিলাল রেমানকে সে চাইলেও ঠিক ঘৃণা করতে পারছেনা।বরং ওই অস্তিত্বের তীর্যক হাসি জড়ানো মুখ হৃদয়ের কোণে ভেসে উঠলেই কেমন স্থবির হয়ে পড়ে মস্তিষ্ক।দ্বিধান্বিত হয় চিন্তাভাবনারা।

“ লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছিস আয়েশা,মনস্থির কর!”—

ধ্বনিত হলো আপন অন্তরে।দীর্ঘ প্রশ্বাস গ্রহণ করলো আবারো।উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সন্দিহান হওয়া চলবেনা।অন্যথায় বাদশাহ.....

চিন্তা সহসাই থমকে গেলো বাহুতে জোর ঝটকা অনুভব করে।কিছুটা বিস্মিত হয়ে ঘুরে তাকালো আয়েশা।সেই লোকগুলো,অনুসরণ করে এখান পর্যন্ত চলে এসেছে।কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোটা একটি টাকার বান্ডিল আয়েশার মুখে ছুঁড়ে দিলো একজন, ধপাস করে পড়লো তা ভূমিতে।হতচকিত হয়ে রমণী তাকাতেই একজন বললো,

- এক রাতের জন্য যথেষ্ট নিশ্চয়ই?

তড়িৎ খেলে গেলো আয়েশার শরীরে।অসম্ভব।এরপরও চুপ থাকার অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া, নিজের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।হাত তুলে সজোরে আয়েশা চ*ড় দিলো লোকটিকে,অপরজন বিস্মিত হয়ে এগোতেই তীব্র ঘু*ষি হা*নলো তলপেটে।

- নরপ*শুর দল!

এটুকুই।হ*ত্যাযজ্ঞে উন্মত্ত হতে চাইলেও এর অধিক প্রতিক্রিয়ায় নারাজ মস্তিষ্ক। বাঁধা আসছে,নিজেকে বিপদে ফেলা যাবেনা।বিলাল যদি এরপর তাকে বদলে ফেলে ভিন্ন কর্মচারীকে সুযোগ দেয়,সমস্যা আছে।দ্রুত প্রস্থান করতে চাইলেও সম্ভব হলোনা।তৃতীয়জন তার শাড়ীর আঁচল টেনে ধরলো শক্তভাবে।

- মেয়েমানুষের এত দেমাগ?

ক্ষীপ্র গতিতে এগোলো তার হাত,উদ্দেশ্য আয়েশার কাঁধ।আয়েশাও প্রস্তুত প্রতিরোধে।কিন্তু দরকার পড়লোনা।রীতিমত ছায়ার মতন নীরবে উপস্থিত হলো এক অপ্রতিরোধ্য অস্তিত্ব।হাতখানি পাকড়াও করলো।

একটি জোরালো টান, ডানে এবং বামে মোচড়।কটমট করে হাড় ভা*ঙার শব্দ।আর্তনাদ উঠতে চাইলেও মুখে চেপে বসলো হাত।হাঁটুর জোরালো আ*ঘা*ত চে*পে বসলো তলপেটজুড়ে।অতঃপর ধরাশায়ী।হতভম্ব আয়েশা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূরে সরে দাঁড়ালো।আকাশে উদিত হওয়া আবছায়া চাঁদের জ্যোৎস্নায় তার দৃষ্টিতে প্রতিফলিত হলো আঁধারকালো অবয়বটি।

বিলাল রেমান।

কালো স্যুটে আবৃত অভিজাত শরীর, তীক্ষ্ণ চেহারাজুড়ে শীতলতম দৃষ্টি। আঁখিজোড়ার মাঝে যেন প্রজ্জ্বলিত দাবানল ঠাঁই পেয়েছে।এগোলো সে,তড়িৎ গতিতে।বাকি দুজনের একজনকে লা*থি হা*কিয়ে ভূমিতে ফেললো।অপরজনের ঘাড় চেপে স্থির রাখা কয়েকটি গাড়ির বনেটের একটিতে আছ*ড়ে ফেলল।চেপে ধরে রাখলো শক্তভাবে।

- ডিল কোম্পানির সঙ্গে হওয়ার কথা ছিল,আমার অ্যাসিস্টেন্টের সঙ্গে নয়।

দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলো বিলাল।ওই অবস্থায়ই ঘাড় চেপে লোকটিকে টেনে আনলো আয়েশার নিকট,জোরালো ধাক্কায় হাঁটু গেঁড়ে বসালো রমণীর সামনে। ঝুঁকে লোকটির সন্নিকটে গিয়ে দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলালো,চিবুক চেপে ধরলো হাতের আঙুলের মাঝে, তীর্যক হেসে বিড়বিড় করলো,

- যদি ও ক্ষমা না করে,তবে তোকে নিজ হাতে খু*ন করার সৌভাগ্য আর কাউকে অর্জন করতে দেবোনা!

ধ্বং*সযজ্ঞ যেন এক লহমায় শেষ হয়েছে। সরে দাঁড়ালো বিলাল, প্রশান্তভাবে। পকেট থেকে বের করে অধরে দারুচিনির টুকরো ছোঁয়ালো।বুকে দুহাত বেঁধে নীরব পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো।তার উপস্থিতিতে স্পষ্টত কম্পিত হলো লোকটি।তৎক্ষণাৎ ঝুঁকলো আয়েশার পদক্ষেপে।

- ক্ষ... ক্ষম...ক্ষমা করে দিন!

তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো আয়েশা।বাকি দুইজনও অত্যন্ত দ্রুত হুড়মুড় করে এলো তার সামনে।একযোগে ক্ষমা চাইতে লাগলো।দুই আঙ্গুলে কপাল ঘষতে ঘষতে একনজর বিলালকে দেখলো আয়েশা।গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বেশ উপভোগ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।রমণীর পদক্ষেপে লুটায়িত কাপুরুষ তাকে বিনোদিত করছে যেন।

- নারীদের সম্মান দিতে না জানলে নিজ দায়িত্বে আ*ত্মাহুতি দেবেন।এই পৃথিবীর আপনাদের মতন কলুষিত অস্তিত্বের কোনো প্রয়োজন নেই।নিজেকে শান্ত রেখেছি খুব কষ্টে,সিদ্ধান্ত বদলের আগে চোখের সামনে থেকে দূর হন!

লোকগুলো দ্রুতই পরিত্যাগ করলো স্থান,তবে শেষজন যাওয়ার পূর্বে একনজর বিলালের সঙ্গে বিষাক্ত দৃষ্টি বিনিময় করলো।

- তোমার ব্যবসা আমি দেখে নেবো!

- কেনো?আমাকে দেখুন?আমি কি কোনো অংশে কম হ্যান্ডসাম?

বিব্রত হলো লোকটি স্পষ্ট,এমন জবাব আশা করেনি।বেপরোয়া হাসলো বিলাল,তারপর এক অদ্ভুতুড়ে ছায়া আচ্ছাদিত করলো তার অভিব্যক্তি।

- নেকড়ে কখনো তার সঙ্গিনীর উপর দৃষ্টিপাতকারীকে ছাড় দেয়না।আপনাকে দিচ্ছি,অতীতে বাবার সাথে সখ্যতার খাতিরে।অন্যথায় যে চোখ ওই রমণীতে দৃষ্টিপাত করেছে,ওই চো*খ উগ*ড়ে নিতাম!

স্পষ্ট কর্ণগোচর হলো আয়েশার,অন্তরে ঘূর্ণিঝড় উঠলো,তবুও শান্ত থাকলো অভিব্যক্তি।লোকটি একটি ঢোক গলাধঃকরণ করে দ্রুতই চলে গেলো।দুইজন সম্পূর্ণ একলা হতেই বিলাল আয়েশার দিকে ফিরলো।প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নিজের পরিধানের কোট খুলে এগিয়ে গেলো।জড়িয়ে দিলো রমণীর কাঁধে।আয়েশা একটি ঝটকা দিয়ে উঠলো,

- প্রয়োজন নেই।আপনার এমন হস্তক্ষেপ করার দরকার ছিলনা।আমি সামলে নিতে পারতাম।

- শাট আপ।

- আমার জন্য তাদের সঙ্গে শত্রুতা পাতানোরও প্রয়োজন দেখিনা। ডিলটা অত্যন্ত লাভজনক ছিলো। রেমান কোম্পানি ক্ষতিতে পড়বে।

- আই সেইড শাট আপ... ড্যাম উইম্যান!

উচ্চকন্ঠে কম্পিত হলো আয়েশা সামান্য।বিলাল কোট টেনে জোরপূর্বক বোতাম আটকে দিলো।তারপর আয়েশার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলালো,

- অমানুষদের সঙ্গে আমি ব্যবসা করিনা।

- আপনি নিজে কি?

আয়েশার প্রশ্নটি বিলালের অন্তরে আ*ঘা*ত করলো ভীষণভাবে,দৃষ্টি নামিয়ে হাসলো সে,পরিহাসের হাসি।স্থির চেয়ে থাকলো আয়েশা, বিলালকে বর্তমানে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দেখাচ্ছে।দূরে সরে চুলে হাত চালালো বিলাল,তারপর পরিহাস ধরে রেখেই বিড়বিড় করলো,

- তোমার তাই মনে হয় আয়েশা?আমিও ওদের মতন?

বাধ সাধলো হৃদয় তীব্রভাবে,তবুও আয়েশা বিড়বিড় করলো,

- হ্যাঁ।

- আচ্ছা।

প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজলো বিলাল,অধর ফাঁক হলো তার।যেন কিছু বলতে চায়।কিন্তু শেষমেষ বলতে সক্ষম হলোনা।নির্বিকার চাদরে নিজেকে ঢেকে উল্টো ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো,

- চলো।তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমি বাড়িতে ফিরবো।ক্লান্ত লাগছে ভীষন।

কোনোকিছু উচ্চারণ করলোনা আয়েশা।দ্বিধার জোয়ার উঠলো তার হৃদমাঝারে।তবুও নীরব থাকলো, কিসের খাতিরে?সে রহস্যের সমাধান আপাতত বহুদূরে। বিলালকে নিঃশব্দে অনুসরণ করলো সে।অন্তর তার ঘোষণা করলো,

“ আপনি ওদের মতন নন বিলাল। ”

。

。

。

অতিবাহিত হলো কিছুদিন।

আয়েশা এবং বিলালের মাঝে বর্তমানে অদৃশ্যমান দেয়াল দন্ডায়মান।এর পিছনে দায়ী আয়েশা নিজে, তা সম্পর্কে সে অবহিত।সবকিছু পূর্বের মতোই চলছে।ব্যবসার কাজ, বিলালকে এদেশের সঙ্গে পরিচিত করানোর কাজ,তার জন্য উভয়কে একটি দীর্ঘ সময় একসাথে কাটাতে হয়।আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু স্বাভাবিক ঠেকলেও বিলাল পরিবর্তন হয়েছে ভীষণ। খুনসুঁটি পরিহার করেছে,আয়েশার উদ্দেশ্যে তার নিবেদনগুলো ফিকে হয়ে এসেছে।বিষয়টি যন্ত্রণাদায়ক ঠেকছে রমণীর নিকট।

বর্ষাকালের আগমন ঘটেছে প্রকৃতিতে।বৃষ্টিপাতে ভরপুর সন্ধ্যা।বকুলের থোকায় থোকায় পূর্ণতা পেয়েছে বৃক্ষলতা।এর মাঝে রান্নাঘরে উষ্ম খিচুড়ির ঘ্রাণ।তার সঙ্গে জুড়েছে ইলিশ ভাঁপার লোভনীয়তা।নিজের কক্ষ থেকে বের হতে বাধ্যই হলো বিলাল।কৌতূহলী ভঙ্গিতে পায়ে পায়ে পৌঁছলো রান্নাঘরে।এই বাড়িতে প্রত্যেক কাজকর্ম সারার জন্য আলাদা লোক রয়েছে।কিন্তু আজ রান্নাঘরে সে কর্মচারীর বদলে আয়েশার দেখা পেলো।বকুলের মতন হলুদাভ বর্ণের শাড়ি পরিধানে রমণী পাকাপোক্ত হাতে বড়সড় পাত্রে খিচুড়ি নেড়ে চলেছে। কেশরাশি বেঁধে নিয়েছে খোঁপা করে।বাইরে বৃষ্টির ঝমঝমে ধ্বনি,এবং এই দৃশ্য।বিলালের হৃদয় আবেশিত হয়ে পড়লো মোহে। দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো।আয়েশা কাজেই ব্যাস্ত,কারো উপস্থিতি খেয়াল করেনি।অতর্কিতে তার হালকা খোঁপা নড়ে উঠার কারণে খুলে গেলো,পিঠ ভাসিয়ে নেমে এলো ঘন চুলরাশি।ইলিশ ভাঁপার অংশ কলাপাতায় মুরতে ব্যাস্ত আয়েশা ভীষণ বিরক্ত হলো।তার অস্বস্তি খেয়াল করে এগিয়ে গেলো বিলাল।

নিজের সন্নিকটে প্রভাবশালী অস্তিত্ব টের পেলো আয়েশা।পিছন ঘুরে কিছু বলতে চাইছিল,কিন্তু তার আগেই বিলালের হাত জড়িয়ে গেলো তার কেশরাশিতে।ত্বক স্পর্শ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকে সে আস্তে আস্তে আয়েশার খোঁপা পুনরায় বেঁধে দিতে আরম্ভ করলো।সম্পূর্ণ স্থবির রইলো রমণী। বিলালের কাঁচা হাতে যদিও খোঁপা শক্ত হলোনা,তবুও।বর্তমানে শুধুমাত্র খোঁপার চিন্তায় স্থির থাকতে পারছেনা আয়েশার অন্তর।খুব বেশিক্ষণ সন্নিকটে ব্যায় করলোনা বিলাল।পাশে সরে দাঁড়িয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,

- তোমাকে এই বাড়িতে রান্নার কাজ করতে কে দিয়েছে?আমি যতদূর জানি তুমি স্টাডিরুমে ফাইলের কাজ করছিলে।

হাসলো আয়েশা,বহুদিন বাদে তার অধরে এই প্রফুল্ল হাসির অস্তিত্ব নজরে পড়ল।

- বাইরে কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে।ভাবলাম দিনটা নষ্ট হতে দেয়া যায়না।আপনি কি জানেন বাঙালিদের বৃষ্টি এবং খিচুড়ির সম্পর্কে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক?

সহসাই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো বিলাল,ওই হাসি তার হৃদস্পন্দন থমকে দিয়েছে।নিজেকেই নিজে শাসালো।এতটা অনিয়ন্ত্রিত কবে থেকে হলো তার হৃদয়?

“সেদিন থেকেই যেদিন এই রমণী তার তেজস্বী দৃষ্টি এবং কঠোর মনোবল নিয়ে শাড়ি জড়ানো অঙ্গে তোমার কক্ষের আরামকেদারায় বসেছিল”—

জবাব এলো তৎক্ষণাৎ।নিজেরই বিশ্বাস হলোনা তা।দ্রুত কন্ঠ পরিষ্কার করলো বিলাল।শক্ত হওয়ার চেষ্টা করলো,

- তোমাকে এজন্য দায়িত্ব দেয়া হয়নি।এসব বন্ধ করে কাজে যাও দ্রুত।

বলেই বিলাল চলে আসছিল,কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে আয়েশার হাতের আঙ্গুল জড়িয়ে গেলো তার কব্জিতে, থমকাতে বাধ্য করলো।বিস্মিত হয়ে বিলাল একবার নিজের হাত এবং আরেকবার আয়েশার মুখপানে চাইলো,এই রমণী সত্যিই তার হাত স্পর্শ করেছে? স্বপ্ন নাকি রূপকথা?কোন জগতে হারিয়েছে বিলাল নিজেকে?

- অভিমান করেছেন?

সামান্য দুইটি শব্দই যেন দ্বিধার দেয়াল গুঁড়িয়ে দিলো।আয়েশা আরো কিছু বলতে গিয়েও থমকালো, হাতের বাঁধনে দৃষ্টি পড়তেই কেমন যেন আতঙ্ক ফুটে উঠল তার অভিব্যক্তিতে।দ্রুত হাত ছেড়ে সরে যেতে চাইলো, কিন্তু এবার সুযোগ দিতে নারাজ বিলাল। হাতটি শক্তভাবে চেপে এক টানে রমণীকে নিকটে টানলো, তীব্র ইচ্ছা হলো দুহাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরার।কিন্তু নিবারণ করলো নিজেকে,যথাযথ দূরত্বের গণ্ডি পেরিয়ে অসম্মান করার ইচ্ছা হলনা।এই সম্পর্কে কোনো পরোয়াই নেই তার।কিন্তু আয়েশার ক্ষেত্রে, সে ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। রহস্যময়ীকে কষ্ট দিতে নারাজ তার হৃদয়।

- কেন বারবার দূরে ঠেলে দাও?কিসের ভয় তোমার?

বিলালের কন্ঠস্বর আহ*ত পশুর আর্তনাদের মতন শোনালো।তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে আয়েশা শুধুমাত্র একটিই জবাব দিলো।

- একদিন বুঝতে পারবেন।আর সেদিন আপনি আমাকে সবথেকে বেশি ঘৃণা করবেন,বিলাল।

এই প্রথম আয়েশা তার নামটি উচ্চারণ করেছে,সেই অনুভবে এতটাই নিমজ্জিত ছিলো বিলালের মস্তিষ্ক যে রমণীর টলটলে দৃষ্টি এবং বাক্যের অর্থ সেদিন সে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি।

বিলাল উপলব্ধি করলো,সবটাই।কিন্তু ততদিনে অতিক্রান্ত হয়েছে গোটা একটি বছর।ভালোবাসার উত্তাল স্রোতে তার হৃদসমুদ্র তখন আগ্রাসী জলরাজ্য।অনুভূতির তোড়ায় সজ্জিত তার এককালের শূন্য হৃদয়বাগান।অতি অপ্রত্যাশিত ভাগ্যের চক্রে সে সম্পূর্ণ দিশেহারা এক প্রজ্জ্বলিত স্নিগ্ধতার প্রেমে।শুধুমাত্র নিজেকে জাহির করা বাকি।গিয়েছিল সে, দুহাত ভরে প্রেয়সীর প্রিয় কাঠগোলাপের জৌলুস হাতে।কিন্তু সেই কাঠগোলাপ লুটিয়ে গেলো ভূমিতে।ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো চারিদিকে,ঠিক তার সদ্য ভেঙেচুরে চুরমার হওয়া হৃদয়ের মতন।

আয়েশার একান্ত নীড়ের সামনের সড়কে সেদিন দাঁড়িয়েছিল একটি গাড়ি,যে গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দন্ডায়মান রেমান গ্রুপের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী,কায়সার পরিবারের বংশধর।

বাদশাহ কায়সার।

যুবক একা ছিলোনা,তার পাশেই বিলালের হৃদয় হরণ করে নেয়া রমণী।আয়েশা।যার কোমরে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রকভাবে জড়ানো বাদশাহর বাহু।বিলালের আগমনে তীর্যক হেসেছিল সে।যেন তাকে দেখানোর জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে আয়েশার কপোলে ঠোঁট ছুঁয়েছিল বাদশাহ,তারপর বিজয়ীর মুকুট আগলে নিয়ে বলেছিল,

- বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদ বড়ই মধুর,তাইনা রেমান?

কোনো জবাব আসেনি বিলালের পক্ষ থেকে,স্থির দৃষ্টিতে সে শুধু অবলোকন করে গিয়েছিল। অধরজোড়া কাপতে কাপতে ফাঁক হয়েছিল তার, অতঃপর ভগ্ন কন্ঠে শুধুমাত্র একটি বাক্যই উচ্চারিত হয়েছিল,

- তন্দ্রাহরণী.....আমাকে ভালোবাসলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো?

প্রতিত্তর লাভ করেনি বিলাল।বর্তমান পর্যন্ত নয়।

—চলবে—

[ আপনাদের অনুরোধে অতীতটা সামান্য একটু বর্ধিত করেছি।আগামীকালের পর্বে এর ইতি হবে।লেখনী অগোছালো লাগতে পারে।যেহেতু আমার বিস্তারিত লিখার ইচ্ছা ছিল না তাই ঠিকমত সাজানো হয়নি ব্যাপারটিকে।তাই এমন মনে হতে পারে,সবটা দ্রুত হয়ে গেছে।আসলে সময়ের ব্যবধান কিন্তু অনেক, প্রত্যেক দিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করিনি আমি। যাই হোক, ডার্কসাইড ধীরে ধীরে গল্প থেকে উপন্যাস হয়ে যাচ্ছে, যারা এতদিনেও ধৈর্য্য ধরে পড়ছেন তাদের জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ।খুব বেশি বিরক্ত করার ইচ্ছা নেই, গল্পের মোড় দ্রুত টানার চেষ্টা করবো এরপর থেকে।ভালোবাসা সবাইকে।🖤]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন