ফন্ট সাইজ:
থিম:
Wrong Profile

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: সেয়ারা তিষিকা

< সতর্কতাঃ এইখানে ট্রমা, নির্যাতনের, মানসিক আঘাতের মতো সংবেদনশীল বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। নিজ দায়িত্বে পরবেন >

°°*°°

" পাঁচটা বেজে গিয়েছে, আমাদের যাওয়া উচিত " রাইনিকা উঠে দাড়ায়।

বাকি সবাইও উঠে দাড়ায়। "আমার কার আশেপাশেই আছে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এভাবে যেতে হবে না", আবেশ ফোন বের কি টাইপ করে।

"সমস্যা না- " পার্কের গেটের বাইরে কার এর গর্জন শোনা যায়।

তিন্নি এগিয়ে গেটের কাছে যায় দেখতে।

-" বিএমডব্লিউ!!?? " তিন্নির মুখ হা হয়ে গিয়েছে বাইরে ব্ল্যাক বিএমডব্লিউ দেখে।

রাইনিকা আবার চোখ পাকায়, " দরকার নাই। আমরা এর আগেও এভাবেই যাতায়াত করেছি। আপনারা চলে যান গাড়িতে, আমরা যেতে পারবো। "

রাইনিকা তিন্নিকে নিয়ে গেইটের বাইরে চলে যায়। তিন্নিও কিছু বলতে পারে না ঘটনার তাড়াহুড়ায়।

°°*°°

রাইনিকা তিন্নি হোস্টেলে চলে এসেছে। তিন্নি হাত-মুখ ধুতে চলে যায়।

রাইনিকার প্রচুর টায়ার্ড লাগছে। সে ওভাবেই পার্সটা কোনোরকম একপাশে রেখে বিছানায় শরীর ফেলায়।

কি করতে চেয়েছিলাম আর কি হয়ে গেছে? এই লোক কি আসলেই আমায় পছন্দ-টছন্দ করে? আমার তো মনে হয় না। লোকটা যেভাবে বলছিল!! ওওউউ !!... রাইনিকার শরীরে আবার কাটা দিয়ে উঠে পিঠ থেকে নিচের দিকে শিহরণ বয়ে যায়। এভাবে কাউকে পছন্দ করা সম্ভব নাকি?...কয়েকদিন পর আশ মিটে গেলে এমনি চলে যাবে।

তিন্নি রুমে আসে। রাইনিকা মুখ খুলে, " কই আমরা একটু মজা করতে গেসিলাম! মাঝখানে কোত্থেকে এই লোক উরে আসছে? "

" তুই সবকিছু নিয়েই একটু বেশী ভাবিস। কাল কলেজ আছে, এইচডব্লিউ করা হয়েছে তোর? " তিন্নি তার বিছানায় বসতে বসতে বলে।

" আমার ভালো লাগছে না। আজাইরা জিনিস মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘুমাবো আমি এখন। পরে করব ওগুলো।" রাইনিকা চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়ে।

°°*°°

আরও একটা দিনের শুরু। থার্ড ক্লাস, বায়োলজি চলছে। রাইনিকা তিন্নি একদম লাস্ট বেঞ্চে বসে। চোখ সোজা সামনে বোর্ডের আঁকানো ক্রেবস চক্রের দিকে। কিন্তু রাইনিকার হাত বেঞ্চের নিচে ফোনে। কোনো কারন ছাড়া রিলস স্ক্রল করছে। কোচিং এ এগুলো পড়িয়ে ফেলেছে। তারও এগুলো পড়া শেষ। এজন্য ক্লাসে মনেযোগ নেই। ২ সেকেন্ড বোর্ডে তো ১০ সেকেন্ড ফোনে তাকাচ্ছে।

স্ক্রিনে মেসেঞ্জারের বলটা ভেসে ওঠে। ঐ লোকের মেসেজ।

" বাইরে আসো "। মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে এই লোকের?? রাইনিকা সীন করে রেখে দেয়। আবার মেসেজ আসে।

" বাইরে না আসলে আমার ভিতরে যেতে কিন্তু সময় লাগবে না "।

রাইনিকা আঁতকে উঠে, আমার সেকশনের ইনফরমেশন কোত্থেকে পাইছে লোকটা। রাইনিকা তারাতারি ওয়াশরুমের বাহানা দিয়ে বাইরে আসে। মেসেজ পাঠায় লুকায়ে

" এসেছি"।

"বাইরে গ্রিলের কাছে আসো।" রাইনিকা গ্রিলের কাছে যায়। সাথেসাথে কতগুলো গোলাপি বেলুন উড়ে আসে নিচ থেকে। সাথে একটা শুভ্র কাগজ। তাতে লেখা,

"অ্যা'ম ওয়েটিং। বের হওয়ার সময় ডান দিকের ছোট গেইট দিয়ে বের হবে '"। রাইনিকা কিছুটা ভয় পায় কিছুটা আকস্মিত হয়। তবে কোনো ভালো লাগা কাজ করে কি না ও বুঝতে পারে না।

একবার ভাবে সে বের হবে না ঐদিক দিয়ে। আবার মাথায় আসে তাহলে যদি অন্যকিছু করে বসে। কিছু করার নেই। সে ঐদিক দিয়েই বের হবে ঠিক করে।

°°*°°

১১:৪০। রাইনিকার ছুটি হয়। সে ঐ ছোট গেইট দিয়েই বের হয়। আবেশ তার বিএমডব্লিউ তে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে। জিন্স, জ্যাকেট, টিশার্ট। সব ব্ল্যাক। রাইনিকা এগিয়ে যায়,

" এগুলো কি ধরনের কাজ? "

ভর দুপুরের রাজধানীর প্রধান সড়কের ডান দিকে, সিটি কলেজের সাথে একটা সড়ক । ঐ সড়কের একপাশে তীক্ষ্ণ চোখ নিয়ে একটা ব্ল্যাক বিএমডব্লিউ দাড়িয়ে। তাতে হেলান দিয়ে বুক খোলা কালো লেদার জ্যাকেটের একটা লম্বা ছেলে দাড়িয়ে। তার সামনেই মাঝারি সাইজের একটা ব্যাগপ্যাক নিয়ে একদম সাদা কলেজ ড্রেস পড়ে, পিছনে একটা লম্বা বেণী ঝুলিয়ে, ঐ ছেলের বুক পর্যন্ত আসা একটা মেয়ে ঐ ছেলের দিকে মাথা উচিয়ে কিছু বলছে।

" কি ধরনের কাজ? " আবেশ উত্তর দেয়।

" আমার সেকশন এর ইনফরমেশন জানেন কিভাবে?

" কে বলল জানি? "

" আপনি যে বললেন উঠে আসবেন? "

আবেশ মৃদু হেসে ওঠে, " সেটা তো তোমাকে বের করার জন্য। "

রাইনিকা নিজের ওপর বিরক্ত হয়। ও সামনে হাটা ধরে।

আবেশ ড্রাইভারকে বলে দেয় কার টা নিয়ে যেতে। তারপর সে ওর পিছু পিছু হাটে।

" আমার ক্রাশিত জন কই? "

" ওর শরীর খারাপ; আসেনি "

" তোমার ফোন নাম্বার দাও। "

" সিম নাই আমার নিজস্ব।"

আবেশ ব্যঙ্গাত্মক হাসে। রাইনিকা পিছন ফিরে তাকায়। এভাবেই উল্টো হাটতে থাকে, " এসব কাজ আর-"

—হৃদপিণ্ড ছ্যাৎ করে উঠে- সামনে থেকে এক হাত শো্ঁ করে টান দিয়ে পিছনে নেয় ওকে।

"মরার ইচ্ছে বেশী হয়ে গিয়েছে ?!" আবেশ ধমকে উঠে

" সোজা হয়ে হাঁটো!!"

সবসময় মজা করা মানুষের এমন কঠিন ধমকে রাইনিকা একদম চুপসে যায়। সামনেই খোলা ম্যানহোল ছিল। ঢাকা'র রাস্তার জন্য স্বাভাবিক। রাইনিকাতো তা আর খেয়াল করেনি।

রাইনিকা মিনমিনিয়ে বলে, " চলে এসেছি। "

আবেশ হাত ছেড়ে দেয়। রাইনিকা ধীর পায়ে হোস্টেলের দিকে এগিয়ে যায়। আর আবেশ যতক্ষণ দেখা যায় ওকে ততক্ষণ দাড়িয়ে থাকে।

এই দিন আর রাতের মাঝে তাদের আর যোগাযোগ হয় না।

°°*°°

পরদিন সকাল দশটা। আবেশ ট্রেড মিল'এ হাঁটছে। ব্ল্যাক ঢিলেঢালা ট্রাউজার আর ব্ল্যাক ট্যাঙ্ক টপ। গলায় সাদা একটা টাওয়াল। বাহুর পেশী, ঘাড়, গলার দিকটায় ঘাম ঝড়ে পড়ছে।

আবেশ জিম শেষ করে। তারপর তার বিএমডব্লিউ নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে ঢাকা সিটি কলেজের উদ্দেশ্যে।

এবার আর ছোট গেইট না। মেইন গেইটের বাইরে দাড়িয়ে আছে। হাতে একটা বান একটু পর পর মুখে দিচ্ছে। সকালের খাবার।

°°

১১:৪০ বাজতে চলেছে। সে গেইটের কাছাকাছি এসে এক চটপটিওয়ালা মামার বেঞ্চের ওপরে উঠে পড়ে। রাইনিকাকে সহজে দেখার জন্য।

এদিকে মামা চিল্লা-মেল্লা শুরু করে দিয়েছে, " ওই পোলা, নামো আমার বেঞ্চ থিইকা?? বড়লোক বইলা কি গরিবের কোনো দাম নাই?? নামো কইতাছি..."

" মামা, আপনেরে নতুন বেঞ্চ কিন্না দিমুনে, টেনশন নিয়েন না " তার চোখ একদম গেইটের দিকে।

আর রাস্তার সবার চোখ তার দিকে। যেই যায় পাশ দিয়ে সেই একবার করে চোখ বুলায়। গেইটের দারোয়ান কাকাও তাজ্জব বনে তাকিয়ে । কিন্তু তার কোনো যাচ্ছে আসছে না। কোনোই হেলদোল নাই তার, চোখ একধ্যানে সামনে গেইটের মুখে তাকিয়ে।

ছুটি হয়েছে। একে একে মেয়েরা বাইরে আসতে শুরু করে। চারপাশে অভিভাবকদের ভির। প্রধান সড়কের অর্ধেকটা স্টুডেন্ট আর অভিভাবকে ভরে উঠেছে। আবেশ উপরে দাড়িয়ে একে একে বের হওয়া প্রতিটা মেয়ের দিকে খেয়াল করছে। যে এই হয়তো রাইনিকা বের হয়ে আসবে। অনেক মেয়েরা বের হচ্ছে কিন্তু রাইনিকার দেখা নেই। আস্তে আস্তে শেষ মেয়েটাও বের হয়ে আসে কিন্তু রাইনিকা বা তিন্নি কারোরই দেখা নেই।

আবেশ নিচে নেমে আসে। মামা বলে ওঠে, " আমার বেঞ্চ?" আবেশ একমুঠো টাকা লোকটার হাতে ধরিয়ে দেয়। সবগুলো হাজার টাকার নোট। লোকটা বড় খুশি হয়। আর কিছু জিজ্ঞেস করে না আবেশকে।

আবেশের চেহেরায় ভাজ। দুজনের একজনও নাই। কি হয়েছে? আবেশ মেসেঞ্জারে কল দেয়। কল ঢুকছে না। মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করে। মেসেজও যাচ্ছে না।

আবেশের চিন্তা বাড়ে। দ্রুত পায়ে তার গাড়িতে যেয়ে বসে। হোস্টেলের দিকে গাড়ি ঘুরায়। অল্প পথ; হেটে যাওয়া যায়। কিন্তু সে দেরি করতে চায় না একটুও। একবার দেখা করে হলেও মনকে শান্ত করা দরকার।

হোস্টেলে গেইটে পৌঁছে যায়। আবেশ দারোয়ান কাকাকে ডেকে দিতে বলল রাইনিকাকে । দারোয়ান কাকা নারাজ। বলছে নিজে যেতে। কিন্তু টাকা লাগবে। দারোয়ান কাকা আবার এমনি-এমনি কোনো পরপুরুষ কে মেয়েদের হোস্টেলে ঢুকতে দেয় না। টাকা লাগে ঢুকতে। আবেশের মাথা চটকে যায় এসবে। কিন্তু সামলে নেয়। এসবে সময় নষ্ট করতে চায় না সে। হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে রুম নাম্বার জেনে উপরে উঠে যায়।

কলিং বেল সমানে প্রেস করে যাচ্ছে ।

দরজা খুলে যায়। তিন্নি দাড়িয়ে ভিতরে। ঘর্মাক্ত আবেশের নিশ্বাস এলোমেলো, " মুমুবা কোথায়? "

তিন্নি আবেশকে এই অবস্থায় দেখে থমকায়,"আপনি রাইনিকার জন্য এভাবে-"

" মুমুবা কোথায়? " কণ্ঠস্বর ভারী ঠান্ডা। অচেনা আবেশ। যেন উত্তর না দিলে তিন্নিকে এখানে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করবে না সামনের মানুষটা। একি আসলেই কোনো অনলাইন গেইমের ক্যারেক্টার ডিজাইনার?

তিন্নির কথায় কোনো অনুুভুতি নেই, " গতকাল ওর বাবা-মা এসে ওকে নিয়ে গেছে। ওর বাবা-মা বলল ওর পড়াশোনা অফ করে দিবে। "

-" বাড়ির ঠিকানা দিন।" শান্ত শক্ত মুখভঙ্গি; চোখে রক্তজমাট রগগুলোও ভেসে উঠছে । কপালের রগ ফুলে ওঠেছে। কিভাবে কন্ট্রোল করছে নিজেকে? আর আপনি করে ডাকছে আবেশ ওকে!! তিন্নি বাড়তি একটা কথা বলারও সাহস পায় না এই আবেশের সামনে। সরাসরি ঠিকানা বলে তিন্নি রাইনিকার।

আবেশ আর এক সেকেন্ড দাড়ায় না। সোজা নিচে গিয়ে গাড়িতে বসে।

গাড়ি ঘুরিয়ে মিরপুর মেইন রোডে আনে। কার স্টার্ট দিয়ে সোজা নরসিংদীর রাস্তা ধরে। ফোনে ব্লুটুথ কানেক্ট করে।

" মাহিম?..." উদ্বিগ্ন গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

" ইয়েস স্যার্!! " মাহিম এই ভারী কণ্ঠস্বর খুব ভালো চিনে।

" নরসিংদীর বেলাব'র আজিজুল ব্যবসায়ীর সকল ধরনের ডেটা চাই ওয়ার্ড টু ওয়ার্ড ফুল ডিটেইলস, এখনই। "

" নোটেড্!! "

আবেশের চোখ সামনে রাস্তায়। কিন্তু কানের পূর্ণ মনোযোগ মাহিমের বলা একেকটা শব্দে।

ওর রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে মাহিমের পরপর বলা কথাগুলোতে। একপর্যায়ে সে হাতে থাবা দিয়ে ওঠে স্টিয়ারিং'এ, " শিট! শিট!...আগেই উচিত ছিল জানকারী লাগানো! কেনো অপেক্ষা করতে গেছিলি ওর নিজের বলার?…তাহলে আগেই সামলে নেওয়া যেত!! ড্যাম ইট!"

গাড়ির স্পিড বেড়ে যায়। কিন্তু দুপুরের পর ঢাকার রাস্তার জ্যাম অস্বাভাবিক। সে এবারে শর্টকাট নিতে থাকে। যতদ্রুত যাওয়া যায়।

তারপরও পৌছাতে পৌছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। পেটে ওই একটা বান রুটি ছাড়া কিচ্ছু পড়ে নি। কিন্তু তার এতটুকু খিদা লাগছে না।

গ্রামবাসীর কাছে জিজ্ঞেস করে করে অবশেষে আজিজুল ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে পৌছায়। চারপাশে ওয়ালের ঘিরা দেওয়া বাড়ির পাশেই লটকনের বাগান। সামনেই মেইন দরজা। আবেশ শান্ত করে নিজেকে। সে এখানে কোনো ঘটনা ঘটাতে চাচ্ছে না প্রয়োজন ছাড়া। জিমের পর একটা কালো হুডি পরেই বেড়িয়ে পড়েছিল , সাথে ঢিলেঢালা কালো ডেনিম প্যান্ট।

হুডিটা চেঞ্জ করে, গাড়ির পেছন দিক থেকে একটা সাদা শার্ট বের করে। এগুলা সবসময়ই তার কারে থাকে। কখন কি প্রয়োজন হয় বলা যায় না। উপরের বোতাম দুটো আর লাগায় না। শ্বাস আটকে আসছে এখন তার। হাতাটা গুটিয়ে নিয়ে, শার্টটা ওইভাবেই ছেড়ে দেয়। ইন আর করে না। চুলে কয়েকবার হাত দিয়ে সারাদিনের ঝড় ঠিক করে। যথেষ্ট! হয়ে গিয়েছে।

সে বাইরে বের হয়ে দরজায় কয়েকবার টোকা দেয়। একজন মধ্যবয়স্কা নারী গেইট খুলে, " কাকে চাই? " একদম মুমুবার চেহেরার ছাঁচ।

আবেশ সালাম দেয়,

" আস্ সালামু আলাইকুম অ্যান্টি। আজিজুল ব্যবসা-"

" ঘরে নেই। বসবেন নাকি কাল আসবেন? "

-" কিছুক্ষণ বসি। "

আবেশ কারটা লক করে ভিতরে ঢুকে। আশেপাশে তাকায়। বাড়িটা একদম সাংসারিক বড় বাড়ি। গরুর খামার থেকে শুরু করে হাঁস, মুরগী, ছাগল সব আছে। বাড়ির ভেতরেও দুটো লটকন গাছ উঠোনের দুপাশে। মেইন গেইটের সামনে বরাবর এল সাইজ করে বাড়ির দুটো অংশ একজায়গায় লাগানো। আরেক পাশে আরও তিনটে ঘর। আর ঐ ঘরগুলোতেই গবাদিপশুগুলো রাখা। একটু পরপর আওয়াজ আসছে। বাড়ির চারপাশে বড় বড় লাইট বাধানো।

আবেশ'কে নারীটি সামনের বড় ঘরটায় সোফায় বসায়,

" কিছু নিবে তুমি? চা-টা??"

" না, অ্যান্টি। সমস্যা নেই। "

উনি ঘরের আরেকপাশের দরজা দিয়ে বের হয়ে সামনে আরেকটা ঘর মতোন জায়গায় যায়। যেখানে থেকে আগুন জ্বলার ছায়া দেখা যাচ্ছে। সাথে একজন বৃদ্ধ ও আরও একজন নারীকণ্ঠের আওয়াজ আসছে। আবেশ আশেপাশে তাকায় কিন্তু কোথাও মুমুবা নাই।

ঘরে আছে নাকি? কি অবস্থা মেয়েটার? সব ঠিকঠাক তো??…… আবেশের মুহূর্তগুলো যেন যাচ্ছে না। সে ঝুকে দুই উরুর ওপর দুই বাহুর ভর দিয়ে বসে।

কিছুক্ষণ পর সাদা টুপি পাঞ্জাবি হালকা দাড়ির একজন ভেতরে ঢুকেন। সাথে আরেকজন সাদা ফতুয়া, টুপি পড়া। সন্ধ্যার নামাজ পড়ে ফিরছেন হয়তো। দুইজনের চেহেরায় অনেকটা মিল, কিন্তু মুমুবার সাথে এতটা মিলে না।

পাঞ্জাবি পড়া মধ্যবয়স্ক লোকটি আবেশের সামনের সিঙ্গেল সোফাটায় বসে, " কি চাই? "

" এবাড়ির মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। " আবেশের সোজাসাপ্টা জবাব।

ভদ্রলোকের ভ্রু কুঁচকে আসে।

সামনের মানুষটির অসম্মতির লক্ষ্মণ দেখে আবেশ বলে,

" বউকে খাওয়ানোর জন্য ডিসেন্ট জব আর ডিসেন্ট ক্যারেক্টার দুটোই আমার আছে। "

সম্মত হওয়ার বদলে সামনের মানুষটা যেন কিছুটা রেগে গেল, কিন্তু কণ্ঠ শান্ত," কাকে বিয়ে করার কথা বলছ? "

দৃঢ় কন্ঠে আবেশ উত্তর দেয়, "রাইনিকা মুমুবা"। বাতাসে হালকা নিভু মেয়ে কণ্ঠ আবেশের কানে বেজে ওঠে।

"এই না-"

-"মুমুবা??!!" আবেশের জোড় ডাক পুরো বাড়ি প্রকম্পিত করে। পরক্ষণেই মৃদু গোঙানির আওয়াজ কানে আসে!

আবেশের— চোখ বুজে আসে। খসখসে বাম হাতের তালুতে নিজের মুখটা ঘষে, "শালার!!…আমি ভালো মানুষ হইতে চাইছিলাম, কিন্তু আাপনাগো সহ্য হইল না! "

সে ধীর পায়ে এগোয় আজিজুল সাহেবের কাছে,তারপর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে ওঠে," আমি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগে বলে ফেলেন মুমুবা কোথায়! নয়তো সত্যি বলছি আমি ভালো মানুষ না। আপনাকে মিথ্যা কেইসে ফাঁসিয়ে গুম করতে আমার এতটুকুও বাঁধবে না।"

একজন সাধারন ব্যাবসায়ীর জন্য গু*মের হুমকি অবশ্যই ভয়ঙ্কর। সামনের ছেলের আচার-ব্যবহারেও মনে হচ্ছে এই কাজ তার জন্য অসম্ভব কিছু না। একেকটা শব্দ আজিজুল সাহেবের কাছে মৃত্যুবার্তার মতো লাগে। তিনি আর দেরি করেন না। সঙ্গেসঙ্গে তার স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে ইশারা করেন ঘর দেখিয়ে দিতে। বাড়ির তিন নারী সদস্য ঘরের ভিতরেই এতক্ষণ নিঃশব্দে দাড়িয়ে।

মরিয়ম বেগম আবেশকে নিয়ে একটা তালামারা ঘরের সামনে উপস্থিত হয়। ওনার মনে পড়ে চাবি তো আজিজুলের কাছে। "দাড়াও, বা-"

" ঠাঁস! ঠাঁস!! " শব্দ করে দুটো লাথি তে দড়জার শিকলের টান ছুটে দড়জা খুলে যায়।

অন্ধকার ঘর। তারওপরে রাত। আবেশ ফোনের আলো জ্বালায়। কিন্তু মাঝেমাঝে আলোই আমাদেরকে অযাচিত অপ্রত্যাশিত ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখায়!

রু'হ্'টা যেন বেড়িয়ে আসতে চায় আবেশের কুচকায়ে কোনায় বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে। ঘরের কোনায় ঐ সুন্দর চুলগুলোর জটপাকানো আবরণের আড়ালে কুচকায়ে বসে থাকা মেয়েটা! দুইদিনের মধ্যে একটা মেয়ের মানসিক অবস্থা এমন কিভাবে হয়!? মেয়েটা ভয় পাচ্ছে আলোকে?!!…আরও জরিয়ে বসে ও, পারলে ওয়ালের সাথে মিশে যায়। মুখ দিয়ে হালকা অদ্ভুত আওয়াজ করছে ।

আবেশ শান্ত করতে পারে না নিজেকে। ঠিক করতে পারছে না নিজেকে। এতসব ট্রেনিংএর কি হলো? তার শ্বাস ভারী হচ্ছে।

ঠিক কর নিজেকে!! সামলাতে হবে তোর সবকিছু। আবেশ কোনোমতে এক দুই কদম সামনে ফেলায়।

"আআআআআআআ"... তীক্ষ্ণভাবে চিল্লায়ে ওঠে রাইনিকা।

আবেশ ঢোক গিলে," মুমুবা!",,,, আদরে মিশানো ডাক!

……রাইনিকা থামে, শান্ত চোখে তাকায়।

আবার আবেশের স্তিমিত কণ্ঠ, " মুমুবা!"। ডাকটায় যেন কতটা আক্ষেপ কতটা আদর জরিয়ে!!

আবেশ ফোনটা একপাশে রাখে। যারকারনে আলো বাধা পেয়ে তীব্রতা কমে যায়।

রাইনিকা একদম শান্ত। কোনো নড়চড় নেই। দৃষ্টি ফ্লোরের দিকে। আবেশ এগিয়ে যায়, " মুমুবা,...যাবে আমার সঙ্গে?"

রাইনিকার দৃষ্টি তখনো ফ্লোরে।

ভারী কণ্ঠটা নিভে আসে," মুমুবা?"

রাইনিকা মুখ তুলে। আবেশ হাতটা ওর মুখের দিকে এগিয়ে নেয়। রাইনিকা চোখের পাতি পর্যন্ত ফেলায় না। ওর দৃষ্টিতে শুধুমাত্র শুন্যতা। আবেশ মুখের সামনের চুলগুলো পরম যত্নে সরিয়ে দেয়," যাবে আমার সঙ্গে? "

রাইনিকা ধীরে মাথা উপর থেকে নিচে করে। মানে 'ও যাবে'। আবেশ ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়। রাইনিকা হাতটার দিকে তাকায়। তারপর আস্তে আস্তে ওর নিজের ছোট্ট হাতটা ঐ বড় হাতের মুঠোয় দেয়। বড় হাতটাতে ভর দিতে চায়। কিন্তু শক্তি যে নেই। দুই দিন একরাত না খাওয়ার ফল।

" কোলে নিই? " আবেশ ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে।

রাইনিকা মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করে না, চোখ তুলে তাকায় আবেশের দিকে।

আস্তে করে, আলতোভাবে রাইনিকার ছোট শরীর কোলে নিয়ে বের হয় আবেশ। রাইনিকা আবেশের সাদা শার্টটায় মুখ গুজে শার্ট খামছে ধরে আছে বাইরের আলো থেকে বাচার জন্য।

সে ওকে ঐভাবেই কোলে নিয়ে ভরা ঘরটায় সোফায় গিয়ে বসে,শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলে "কাজী ডাকেন!"

একটা কয়েক মাসের ছোট বাচ্চাকে যেভাবে কোলে নিয়ে বসা হয় রাইনিকাকে নিয়ে আবেশ ঐভাবেই বসা। রাইনিকার পড়নে ঐদিনের পড়া সাদা কলেজ ড্রেসটা যা এখন ময়লায় পরিপূর্ণ হয়ে আবেশের সাদা শার্টটাতেও মাখছে। ক্রস বেল্টটা পর্যন্ত এখনো গায়ে। শুধু চুলগুলো খোলা। ঐভাবেই কোলে বসে আবেশের ঘাড়ে মুখ গোজা। এইপর্যন্ত বাইরে এসে একবারো চোখ খুলে নি। লম্বা চুল গুলো বেণী খুললে যেভাবে থাকে ঐভাবেই আছে কিন্তু অনেকটা সময় থাকার কারনে জট পেকে গিয়েছে।

বাড়ির তিন মহিলা দুইজন পুরুষ তাদের এভাবে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। আজিজুলের রাগ শব্দে ঝড়ে পরে, শুধু প্রস্ফুটিত হতে পারে না, " আমার মেয়ে কিন্তু এটা আমি ভেবে তোমার কাছে গিয়েছে। আর তুমি এর ফায়দা নিচ্ছ।"

-" একটা স্বাভাবিক বাচ্চাও যত্ন আদর বোঝে। সেটা বোঝে বলেই আমার কাছে আছে।" আবেশের কণ্ঠে ঘৃণা আর আক্রোশ উপচে আসছে,"আপনারা নিজের স্বাভাবিক মেয়েকে রোগী বানিয়ে ফেলেছেন!!...আমি এখন জিজ্ঞেস করবো না এসব কতদিন ধরে চলছে? কেন চলছে??… এই হিসেব পরে মিটাবো। এখন আপনার বলা 'ফায়দা' লিগ্যাল করে আমি ওকে এইখান থেকে বের করতে চাই। "

আবেশ রাইনিকাকে কোলে নিয়ে হিসহিসিয়ে ওঠে,

"কাজী ডাকুন!!"

চলবে~~

#পর্ব০৬

#wrong_profile

#সেয়ারা_তিষিকা

< তোহ! আমরা মেইন প্লটে ঢুকে যাচ্ছি। আরও কিছুটা বাকি। ওহ্ কাল কিন্তু বিয়ে! রাই-আবেশের।। আপনাদের দাওয়াত 🍱🍽️ >

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন