চেয়ার ঠেলে, রাইনিকা উঠে দাড়াতে— "ক্যাঁচ! ক্যাঁচ!!" শব্দে চেয়ারের স্টীলের পাঁয়া টাইলসে ধপ করে লাফিয়ে সরে আসে!আচমকা এই ঘটনায় রাইনিকা বসে পরতে বাধ্য হয় চেয়ারটায়, চেহেরায় প্রথমে ভীতি স্পষ্ট থাকলেও, সামনের মানুষটার মুখ দেখামাত্র অভিমান গ্রাস করে ওর ছোটো গোলগাল মুখটায়।
আবেশ রাইনিকার চেয়ারের দুই পাশের হাতলে শক্ত করে ধরে ঝুকে ওর দিকে, "তারাতাড়ি ফিরব!" আবেশ হাত গলিয়ে দেয় রাইনিকার গাল বরাবর চুলে কাছে টেনে অন্যগালে শব্দ করে চুমু খায়।
যেভাবে ঝড়ের বেগে এসেছিল সেইভাবে ঝড়ের বেগেই বের হয়ে যায় সে।
ঘটনা এত তাড়াতাড়ি ঘটে রাইনিকার শরীর প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে যায়। স্ট্যাচুর মতো জমে ও। প্রসেস করছে, কি হলো মাত্র ওর সাথে?
"মিউউউউ" –লাফিয়ে উঠে আসে বিড়ালটা রাইনিকার কোলে।
~~~
রিনহা ম্যানশন। রিন্সেল থেকে 'রিন' এবং হায়দারি থেকে 'হা'— রিনহা। নামটা রেখেছে জারিফ হায়দারি। যদিও জারিফকে এখানে ততটা পাওয়া যায় না। সে বেশীরভাগ সময় ক্যান্টনমেন্টেই থাকে, তার জন্য বরাদ্দ বিশেষায়িত রুমটায়। তার আগমন হুটহাট হয় এই ম্যানশনে। বলা বাহুল্য অনুপমা রিনহাতে থাকলে জারিফকে যখন-তখন ম্যানশনে পাওয়া যেতে পারে।
এই রাজকীয় ম্যানশন এর নির্মাতা জারিফ হায়দারি; ম্যানশনের ধুলিকনা পর্যন্ত তার বাধ্যগত। তবে ম্যানশনের আদেশ-নিষেধের দায়িত্ব বর্তিয়েছে অনুপমা রিন্সেলের ওপর, জারিফ হায়দারি'র স্ত্রীর উপর। জারিফই ম্যানশনের দায়িত্বভার অনুপমাকে দিয়েছে। কারন ছিল অনুপমা রিন্সেল স্বয়ং। অনুপমার জন্যই জারিফের এই ম্যানশন নির্মাণ!
এখন প্রত্যক্ষভাবে এই ম্যানশনে চলমান সকল হুকুম-আদেশ অনুপমা থেকেই আসে।
ম্যানশনটার সীমানা দেখা যায় ঢাকার রাজপথ থেকে পাশের পিচ-কালো সরু রাস্তার শেষে। যেখান থেকে ম্যানশনের পুরোটা ঘেরাও করা কংক্রিটের নকশা করা দেওয়াল দিয়ে। দেওয়ালের বাইরে সিভিল পোশাকে ১০ থেকে ২০ জন পাহারায় নিয়োজিত আছে। মেইন গেইট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই ফ্রন্ট ইয়ার্ড নজরে আসে, সারিবেধে কতগুলো লম্বা নারিকেল গাছ দাড়িয়ে সেখানে। বিশাল এই ফ্রন্ট ইয়ার্ডের চারপাশে বিচিত্র কয়েকধরনের ফুলগাছও পাওয়া যাবে তবে এই গাছগুলো গুল্ম প্রকৃতির নয়, বড় দানব আকৃতির। কিন্তু ফুলগুলো দেয় এরা নরম-কোমল পাপড়ির ক্ষুদ্রাকৃতির যেগুলো বাতাসের আলতো নাড়াতেই ঝড়ে পড়ে। এরকম একটা গাছ এই ম্যানশনটার একদম সাথে, প্রধান দড়জার পাশে ভিতরে ঢুকার পথে; জ্যাকারান্ডা মিমোসিফোলিয়া। এই গাছের ফুল বেগুনি রঙের, ঝেঁকে আসে আর একবারই আসে বছরে। এপ্রিল থেকে জুনের মাঝামাঝি সময়টাতে এই গাছ বেগুনিতে পরিপূর্ণ থাকে, মেঘের মতো দেখায় তখন গাছটিকে যা বাতাসের হালকা স্পর্শে এর নিচের ঘাস আর ম্যানশনের সামনের অর্ধেকটা বেগুনিতে ঢেকে দেয়।
এই ম্যানশনে কর্মরত আছেন মোট পঞ্চাশ জন মানুষ। নাহ্! ম্যানশনের দেখভারের জন্য নয়। অনুপমা'র দেখভারের জন্য। আর প্রতিটা মানুষ জারিফ স্বয়ং নিয়োগ দিয়েছে, নিজের বিশ্বাসভাজন থেকে। এদের কিছু বাড়ির পুরো ফ্রন্ট ইয়ার্ড জুড়ে পাহারায় থাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিন্তু ভিতরে ঢুকার অনুমতি নেই কারোরই। শুধুমাত্র একজন বাদে, রিয়ানা। ওকে অনুপমা নিজে নিয়োগ দিয়েছে, অনুপমার পার্সনাল অ্যাসিসটেন্ট। ওই একমাত্র যে ম্যানশনের ভিতরে বাইরে সবজায়গায় যাওয়াআসা করে।
পুরোপুরি ভিন্নধর্মী নেইম-প্লেটের একটা ব্ল্যাক বিএমডব্লিউ এসে থামে মেইন গেইটের সামনে। সেটা থেকে দুইজন সুঠামদেহী যুবক বের হয়ে আসে। একজনের পড়নে লিনেন এর সাদা-কালো লাইনার শার্ট, ইন করা না সাথে ফাঁটা-ছিরা ঢিলা জিন্স আর এলোমেলো সিল্কি চুল। আরেকজন আরেকটু এগিয়ে, পড়নে ঢিলা ব্যাগি শর্টস, জিন্সের। ওপরে ঢিলা-ফোলা জিপড আপ ব্ল্যাক জ্যাকেট। সাথে নাইকি'র ইনিশিয়েটর সুজ। আর চুলগুলো কপালে পড়ে যা একটু পরপর হাতে পিছনে ঠেলছে সে।
এখন, এই জ্যাকেট'টা তার কার থেকে নেওয়া আর শর্টস আগেরই ছিল। সকালে নামাজে অসুবিধা হয় নি কারন শর্টস'টা হাটুর নিচে যায় আরকি, ভালোভাবেই।
গেইটের কাছাকাছি গেলে, দাড়িয়ে থাকা একজন পালাক্রমে দুজনার রেটিনা স্ক্যান করায়; ভিতরে ঢুকার জন্য মেইন গেইটটা অ্যটোম্যাটিক্যালি খুলে যায়।
নারিকেল গাছের সারিগুলো মাহিম-আবেশ পেরিয়ে চলেছে।— বেগুনি সিল্কের শাড়ি পরিহিত নারী বের হয়ে আসে, অনুপমা। পরপরই রিয়ানা টা/নতে টা/নতে একটা ছেলেকে বের করে আনে।
আবেশ ও মাহিম ততক্ষণে ম্যানশনের প্রধান দড়জার কাছে চলে গিয়েছে। আবেশ এসবের তোয়াক্কা না করে ভেতরে চলে যায়, মাহিম দেখে কিন্তু ভেতরে যায় না। কারন সে এই সীন মিস করতে চায় না। তাই সে প্রধান দড়জার দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়ায়; আবেশ চলে এসেছে, হাতে টুল। সে টুল নিয়ে আরাম করে বসে পিছনের দেয়ালে পিঠ ঠেকায়। খাওয়ার জন্য কিছু একটা থাকলে ভালো হতো, জ্যাকেটের পকেটে হাত দেয়; ওহ! আছে, বাদাম। চুইঙ্গামও থাকে মাঝেমাঝে, আজ নেই।
এমনই হুটহাট তার কাছে আরও অনেক জিনিসই পাওয়া যাবে। আপাতত সে কিচেন থেকে আনা উঁচু টুল এ বসে দুই পা নাচাচ্ছে আস্তেধীরে, আর একটু পরপর পকেট থেকে এনে বাদাম মুখে দিচ্ছে, চোখ সামনে। ভাব এমন মুভি দেখতে বসেছে। খুব এক্সাইটেড।
রিয়ানা টানতে টানতে ঐ ছেলেটাকে প্রধান দড়জার বাইরে এনে ফ্রন্ট ইয়ার্ডে ফেলায়। পাশেই দাড়ানো দুজন শক্তপোক্ত পুরুষকে ইশারা করতেই, দুজন ঐ ছেলেকে উঠিয়ে ধরে দাড় করায়।
অনুপমার সাথে আরো একটা মেয়ে দাড়িয়ে, লম্বা এলোমেলো চুলগুলো; যেনো বাঁধা খোপাটা মাত্রই খুলেছে। বয়স চৌদ্দ-পনেরো হবে। পড়নে পুরোনো সুতির একটা থ্রি-পিস। যার ওড়নাটা ও আষ্টেপৃষ্টে এলোপাতাড়ি কোনোরকম বুকে জড়িয়ে। ফর্সা চোখমুখ কিন্তু তাতে যত্ন নেওয়া হয় বলে মনে হয় না, আর এখন সেখানে অস্বাভাবিকভাবে ভয় জড়িয়ে।
অনুপমার লম্বা ব্রাউনিশ বেণী পিছনে, সামনে চুলগুলো এলোমেলো তবে খুব যত্ন-নিয়মের সাথে পড়ে আছে যা হালকা বাতাসে ওর গাল ছুয়ে দিচ্ছে বারবার। তবে ওর মুখের ভাব অসম্ভব শান্ত, রিয়ানার দিকে মুখ ফিরায় অনুপমা, "বনু হকিস্টিক আর বেসবল ব্যাটটা স্টোর রুমে পাবি, নিয়ে আয় তো?"
রিয়ানা দৌড় লাগায়।
~(কিছুক্ষণ আগে)~
রিনহা ম্যানশনের ব্যাকইয়ার্ড, এখানে বিভিন্ন রঙের টিউলিপ রয়েছে। বেলী নামের মেয়েটা রিনহাতে নতুন। ম্যানশনের প্রধার দড়জার ভিতরে পুরুষ নিষিদ্ধ গুটিকয়েকজন বাদে। বেলী নতুন বলে ওকে ভারি কোনো কাজ দেওয়া হয় নি, ব্যাকইয়ার্ড এর টিউলিপ নামক ফুলগাছ গুলোর দেখাশোনার জন্যে পাঠানো হয়েছে।
নীল রঙের অনেকগুলো টিউলিপ ফুটেছে। বেলী এসব ফুল এভাবে সরাসরি কখনো দেখিনি। নিচের সবুজের মাঝে ওপরে নীল-নীল ফুলগুলো। কি সুন্দর! একবার ছুয়ে দিলে কেমন হবে? গন্ধ কেমন হবে এদের? বেলী এগিয়ে যায় নীল রঙের সদ্যফোঁটা একটা টিউলিপের দিকে— শিড়শিড় করে ওঠে কোমড়! বেলী ছিটকে ঘুড়ে দাড়ায়।
সামনে বিচ্ছিরি একটা হাসি নিয়ে এক পুরুষমানব দাঁড়িয়ে!
ভয়ে বেলীর লোমকূপের প্রতিটা লোম দাড়িয়ে যায়। মুখ শব্দ হারায়। কিন্তু শরীর প্রতিক্রিয়া দেখায়, কাঁপা কাঁপা পাদুটো পিছাতে থাকে।
গ্রামে মায়ের আঁচলের নিচে থাকা বেলী কখনো এমন পরিস্থিতির শিকার হয় নি। মা সবসময় চোখে চোখে রাখতো যে। আর বাইরে বের হলে বাবা তো ছিলই ওর সাথে।
কিন্তু সামনের পুরুষদেহীর ভাবের কোনো পরিবর্তন নেই; মুখের মজাদার হাসিটা তার এখনো ঝুলছে। সে সামনে এক পা বাড়িয়ে হেঁচকা টান লাগায় বেলীর গায়ে জড়ানো ওড়না বরাবর; খুলে হাতে চলে আসে তার। বেলীর বুঝে ওঠার আগেই পুরুষটা সোজা টান দেয় বেলীকে ওর কামিজের গলা ধরে— স্টিলের শক্ত কিছু সজোরে তার কান-মাথায় আ*ঘাত করে। বেলী তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে যেতেই অনুপমা ওকে ধড়ে। ধস্তাধস্তিতে বেলীর বাঁধা চুলগুলোর মোটা খোপাটা খুলে যায়।
রিয়ানা ঐ পুরুষটাকে টানতে টানতে প্রধান দড়জার দিকে এগিয়ে যায়।
(বর্তমান)
রিয়ানা চলে এসেছে হকিস্টিক আর বেসবল ব্যাট নিয়ে।
ঐ পুরুষ এখন ছেলেতে পরিণত হয়েছে, একদম ভিজা বেড়াল। মাথা নুইয়ে রেখেছে। একবার ফাঁকা ঢোক গিলে। এসব নাকি জারিফের বিশ্বাসভাজন! আরো দুজন পুরুষ এই ছেলেকে ধরে মুখচোখ শক্ত করে দাড়িয়ে।
অনুপমা সামনে ঐ ছেলেটাকে ধরে রাখা দুজনের দিকে তাকায়, "প্যান্ট খুলেন তার! "
জোড় হাত তালির শব্দ আসে।
রিয়ানা পিছনে তাকায়, আবেশ টুলে বসে জোড়ে জোড়ে হাত তালি দিচ্ছে; সিটিও বাজাচ্ছে মুখ সামনে বাড়িয়ে। মুভি জমে উঠেছে। কিন্তু মাহিম হতচকিত।
খালি মাহিম না এখানকার সবাই হতচকিত, বেলীসহ। শুধু আবেশ, অনুপমা আর উপরে ব্যালকনিতে দাড়ানো ব্যাক্তিটা বাদে। ব্যালকনিতে দাড়ানো লোকটার এক হাতে একটা ক্যান, আরেক হাত র্যালিংএ; ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটেছে তার। বাঁকা হাসিটা নিচের বেগুণী শাড়ির মানবীতে তার বাজেভাবে আসক্তির কথা বলছে।
সবাই হতভম্ব দাড়িয়ে। ছেলেটা ভয় পাচ্ছে যেন, চোরা চোখ উপরে তাকাতে চাচ্ছে। পাশের দুজনের চোখদুটো কোটর থেকে বের হয়ে আসবে এমন অবস্থা, কানকে বিশ্বাস করাতে পারছে না তারা।
অনুপমা ব্যাঙ্গাত্মক হাসে, " যেহেতু লজ্জা নারীর ভূষণ, তাহলে নির্লজ্জতা অবশ্যই পুরুষের? সেটাই তো করতে বলছি। অবাকের কি আছে? খুলুন! "
এই নারী ভয়ঙ্কর, তারা জানে। এর কথার নড়চড় হয় না। আর তার আদেশের এস্পার-ওস্পার হওয়া আর ধড়ে মাথা না থাকা সমান। সৌন্দর্য্য খালি সামনের মানুষের চোখ জুরানোর জন্য, নয়তো আগা-গোড়া পুরাটাই পাগল এই মহিলা।
ছেলেটার ঘাম ছেড়েছে এতক্ষণে। হাত শক্ত করে ধরা প্যান্টের বেল্টে, একমাত্র ভূষণ তার।
পাশের দুজনের একজন ছেলেটার প্যান্টের দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু ছেলেটা শক্ত করে হাতের বাধন। অনুপমা ভ্রু কুচকায়, " আমার বাকি জীবন এখানেই পাড় করাবেন দেখছি! হাতে মেহেদী লাগিয়ে আসছেন দুজন? "
পুরুষ আত্মসম্মানে লাগে মালকিনের শেষ কথা। ফলাফল, পরপরই একজন ছেলেটার দুই হাত শক্ত করে ধরে পেছনমোড়া করে। আরেকজন ঐ ছেলের প্যান্ট নামায়ে দেয় সাথেসাথে।
তৎক্ষনাৎ বেলী মাথা নুইয়ে নেয়।
অনুপমা রিয়ানার হাত থেকে স্টিক আর ব্যাটটা নেয়। "আবার মাথা নুয়ায় মেয়েটা, আরে এইটা পশু; মানুষ নাতো! আর এইসব পশুর তোমার মতো মেয়ের বাপ-ভাই হওয়ার সক্ষমতা নাই। এইটা ধরো।" অনুপমা বেলীর হাতে বেস বলের ব্যাট'টা ধরিয়ে দেয়, "ব্যাট যাতে সোজা বলে লাগে। পুরা শরীরের শক্তি দিয়ে মারবে। একদম ছক্কা!"
বেলী ধরে। ওর দাঁত পিষে আসতেছে রাগে-ঘৃণায়। কিন্তু মাথা তুলতে পারে না। মাথা তুলে ঐ বিকৃত দৃশ্য দেখা সম্ভব হচ্ছে না ওর দ্বারা। তারপরও এক পা দুই পা করে সামনে আগায়। ব্যাট উঁচু করে; ওর হাত কেঁপে কেঁপে ওঠছে থেকেথেকে —ওমনি হকিস্টিকের সর্বোচ্চ গতিতে বারি পড়ে ছেলের দুই পায়ের মাঝে।
"নাও। সহজ করে দিলাম।"
হকিস্টিকের জোড়ালো শব্দটা করে অনুপমা খুব স্বাভাবিকভাবে বেলীর জন্য জায়গা করে দেয়; সামনে চলে আসা চুলগুলো হাতে পেছনে নেয়।
বারি দিতেই ব্যাথায় কুকড়ে ওঠে ছেলেটা; শরীর নুইয়ে যেতে নেয়, দুই পা চিপে ধরে একসাথে করে হাটু ভেঙে আসে। পাশের দুজন তখন শরীর সাঁট করে ধরে। —পরপরই একের পর এক ব্যাটের আঘাত করতে শুরু করে বেলী; একই জায়গায়! হঠাৎই!
অনুপমার প্রথম করা আঘাত যেন বেলীর হাতে শক্তি দিয়েছে! বেলীর আচমকা প্রথম আঘাতে ছেলের ভিতরটা একেবারে নড়ে ওঠে। এতগুলো শক্ত কাঠের ভারি আঘাতে জায়গাতে কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকার কথা না। পরপরই বেলী সজোড়ে লাথি দেয় একই জায়গায়, ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করে, "মায়ের গর্ভ লজ্জিত হয় তোগো জন্যে! জানোয়ার!"
ছেলেটা আাবার এক পা ভেঙে বসে পড়ে, শরীরের পুরো ভর ছেড়ে দেয়। আরদুজন তার দুই হাত ধরে তাকে একেবারে পড়ে যেতে বাধা দিচ্ছে।
" ঐটার দুই পায়ের মাঝখানের অংশ কেটে নিবেন। তারপর আগুন জ্বালাবেন তাতে। ঝলসে যওয়া অংশটা কুকুরকে দিতে পারেন। নষ্ট জিনিস কুকুর না খেলে আবার জোর করিয়েন না।" কথাটুকু বলে অনুপমা দাড়ায় না। সোজা রিনহাতে ঢুকে।
রিয়ানা বেলীকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে।
ভেঙে পড়া অচেতন ছেলের শরীরকে দুজন নিয়ে যায় কাটাইখানার দিকে।
~~~
জারিফের নিজস্ব স্টাডি রুম,
এখানে বড়সড় একটা সোফা আছে দেওয়াল ঘেষে। অন্য দেওয়ালে অনেকগুলো বইয়ের লম্বা বড় একটা কাচের বুকশেলফ। যেখানে সারিতে সাজানো বইগুলো। এটার সামনেই জারিফের স্টাডি টেবিল, সাথে তার চেয়ার। আর তার পাশে দেওয়াল পুরোটাই গ্লাসের। যেখানে শুভ্র পর্দা ঝুলানো আছে।
আবেশ এখন সোফাটায় বসে, হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে। মাথা পেছনে এলানো। মাহিমও তার পাশেই বসে আছে।
জারিফ রুমে ঢুকে। তার পড়নে সাদা শার্ট, রোলড আপ স্লিভ, টাই আর ওপরে ব্ল্যাক টুইড ওয়েস্টকোট।
আবেশ এলিয়ে দেওয়া মাথা ঐভাবে রেখেই বলে,
"এখন বুঝতাম পারি, আপনে ক্যান বাড়িতে ঘুরঘুর করেন।"
জারিফের কোনো উত্তর নেই। সে তার চেয়ারে যেয়ে বসে। মাহিম সোজা হয়ে বসেছে।
জারিফ গম্ভীর গলায় বলে "কাম টু দ্যা পয়েন্ট।"
আবেশ উঠে আসে সোফা থেকে, সোজা জারিফের টেবিলে চড়ে বসে, "ইউএসএ'র আপকামিং মিশনের জন্য আরো একজনের স্পেশাল ভিসা দরকার।"
জারিফ খুব পরিচিত আবেশের অসভ্যতার সাথে। তার ভাবের কোনো পরিবর্তন হয় না। সে আবেশের কথায় ঠোঁটে বাঁকা হাসি টানে, " নেকড়ের স্ত্রীর জন্যে? "
"বিয়ে যখন করেছি, হানিমুনটাও করা উচিত।" আবেশ টেবিল থেকে ওয়ার্ল্ড গ্লোবটা হাতে নিয়ে ঘুরাচ্ছে।
মাহিম চুপচাপ সোফায় বসে এতক্ষণ। এবার মিনমিন করে শব্দ তুলে, " আমার বিয়েটা-" কথা শেষ করতে পারে না বেচারা টেবিলে থাকা দুজন একসাথে চোখ রাঙায়ে তাকায় তার দিকে। ছেলেটার মুখ আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যায়।
আবেশ বলে, "তোর বউ পালার বয়স হয় নাই, তোরেই এখন আমরা পালতাছি। দরকার হলে বল ছুটি ক্যানসেল করে এখনই ইউএসএ পাঠাই ড্যেটা কালেক্ট করতে।"
মাহিম সরু চোখে তাকায়, " দরকার নাই। তোমরাই বউ পালো।"
আবেশ গ্লোবটা রেখে উঠে দাড়ায়, "ছুটির বাকি চারদিন আমি ঢাকায় থাকব না।"
" মাহিমকেও নিয়ে যাবি দেশের বাড়িতে।" জারিফ টেবিলের পাশে রাখা ফাইলগুলো থেকে ফাইল বের করে।
"এই পোলা এমনেও পিছু ছাড়ার মানুষ না।" আবেশ সামনে দড়জার দিকে পা বাড়ায়, "আমি আসি। আপনি আপনার জ্বলন্ত আগুনে ধীরেসুস্থে পানি ঢালিয়েন।" —সঙ্গেসঙ্গে একটা রাবার বল আবেশের মাথায় আঘাত করে।
আবেশ মাথায় ব্যাথা লাগা জায়গায় হাত ডলে পেছন ঘুরে তাকায়; জারিফ ফাইল ঘাটছে। আবেশ বলে, "আপনের যতসব ভালোমানুষি মুখোশ! খুলে ফেলব কিন্তু আমি।"
জারিফের চোখ ফাইলে," এইসব আজকালকার বাচ্চা-কাচ্চা আমার বালও ছিড়তে পারবে না।"
"বাল ছিড়ার পরেও একই গীত গাইয়েন।" বলেই আবেশ সোজা ছুড়ে মারে বলটা জারিফ বরাবর, জারিফ পাশ কাটায়, কিন্তু বলটা ছুড়ে এসে যেদিকে পাশ কাটায় সেদিক বরাবরই তীক্ষ্ণ গতিতে তার কপালে লাগে।
আবেশ তো বল ছুড়ার পড়ে আর দাড়ায় নি, এক দৌড়ে রিনহার বাইরে। মাহিমও দৌড়!
নয়তো জারিফ তাকে ধরবে।
হাল ছেড়ে দেয় জারিফ। এসব নতুন না। সে দুই পাশে ঘাড় নাড়ায়ে শব্দ করে, ফাইলে মনোযোগ দেয়। এইসব রাবার বলের আঘাত তার ইস্পাত-সম কপালের জন্য কিছুই না।
~~~
(জারিফের স্টাডি রুমে আসার আগে)
অনুপমার বেডরুম। ভুল; জারিফ আর অনুপমার বেডরুম। অনুপমার হাতে এখনো ঐ হকিস্টিকটা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্রাউন বেণীটা পেছনে ঝুলে, অগোছালো লম্বা কয়েকটা চুলগুচ্ছো মুখে পড়ে আছে।
অনুপমা দড়জার শুভ্র পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকে। বেলকনি বরাবর ঐ সুঠাম পুরুষ অবয়বটা দেখা যাচ্ছে। অনুপমা বড়সড় একটা শ্বাস ভেতরে টেনে নেয়। শান্ত করে নিজেকে। হকিস্টিকটা দড়জার বাইরে ছুড়ে ফেলে। শব্দ হয়তোবা হয়েছে বাইরে। কিন্তু ঐ শব্দ ভেতর পর্যন্ত আসে না। মাথা অস্বাভাবিকভাবে দুইদিকে মৃদু নাড়ায়; চোখ বুজে।
চোখ মেলে ধীর পায়ে এগোয় বেলকনি বরাবর।
পুরুষ অবয়বের টুইড কাপড়ের ওয়েস্ট কোটের প্রশস্ত পিঠ দেখা যাচ্ছে, হাতের ক্যানে মুখ লাগাচ্ছে একটু পরপর। এরকম অনেকগুলো দুমড়ানো-মুচড়ানো ক্যান ব্যালকনির মেঝের কার্পেটের ওপর পরে আছে। সবগুলো খালি, খাওয়ার পর হাতে মুচড়ে নিচে ফেলানো হয়েছে। এখন এই হাতেরটাই লাস্ট। অনুপমা এসে পাশে দাড়িয়েছে। ওর বেগুণী সিল্কের শাড়ির আঁচল হালকা বাতাসে উড়ছে, সাথে ওর গালে পড়ে থাকা চুলগুচ্ছ। বাতাসের দিকে চোখ করে থাকায় চোখের পাতাগুলোও ঘনঘন ঝাপটাচ্ছে। বিকেল হতে শুরু করেছে। সূর্য নেমে গিয়েছে। চারপাশের আভা কমলা রঙের।
জারিফ চোখ ফিরায় তার পাশটায়। অনুপমা সামনে তাকিয়ে।
জারিফের পাশের রমণীটি খুবই ফর্সা। জারিফের থেকেও। খেয়াল করলে ওর গালের পাশে গোলাপি-নীল চিকন চিকন শিরাগুলোও চোখে পড়ে। খাড়া নাক। ঘন পাপড়ির চোখদুটো; যা এখন ঝাপটাচ্ছে বারবার, বাতাসের গতির সাথে যুদ্ধে নেমেছে। ও পারলে চোখগুলো বুজে নিলেই তো হয়, তাহলেই তো আর এতবার চোখ ঝাপটাতে হয় না। কিন্তু না। এতে যে ও হেরে যাবে বাতাসের শক্তির কাছে। এমন সামান্য বিষয়েও এত জেদ! আজিব রমণী তার। জারিফের এই জেদী রমণীকেই খুব ভালো লাগে।
জারিফের দৃষ্টি সময় ছাড়াচ্ছে। একপর্যায়ে তার হাত অনুপমার চিবুকে যায়, মুখ ঘুরিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসে তার শক্ত-পোক্ত মুখ বরাবর। অনুপমার চোখের পাতা ঝাপটানো বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তবে চোখে পানি জমেছে অনেকক্ষণ বাতাসের সাথে যুদ্ধে। এখন একবার চোখের পাতা নামালেই জমা পানি চোখ ছাড়িয়ে কপোল বেয়ে পড়বে। তবে অনুপমা চোখ বুজে না একবারও। ঐভাবেই তাকিয়ে থাকে। ঠোটে হাসির কোনো রেখা নেই। কোনো অনুভূতিই নেই মুখে। কেউ এই চেহারা দেখে বলতে পারবে না এই অপরুপ চেহারায় কোনো অনুভব রয়েছে। যেন মুখমণ্ডল থেকে অনুভবের জন্য স্নায়ুর তার সব ছিড়ে গিয়েছে, মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌছায় নি। যার কারনে সুন্দর এই চেহারায় কোনো অনুভূতি ফুটছে না।
জারিফের হাত এখনো চিবুকে, সে দেখছে সামনেরটুকু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। চিবুকের হাত এগিয়ে যায় সরু নরম গলা বরাবর, সাথে জারিফের মাথা নুইয়ে আসে অনুপমার মুখের কাছে।
জারিফের ঠোঁট অনুপমার ডান চোখ ছোঁয় যত্নের সাথে; বুজে যায় অনুপমার চোখ, গড়িয়ে গাল বেয়ে পড়ে চোখের জমে থাকা পানি। জারিফের ঠোঁট জায়গা পরিবর্তন করে; অনুপমার ওষ্ঠের স্বাদ গ্রহন করে। অনুপমা এখনো চোখ বুজে; শুধু মুঠো করে থাকা হাতের তীক্ষ্ণ ধারালো নখগুলো হাতের তালুর ভিতরে ঢুকতে শুরু করছে। যেখান থেকে তাজা রক্তও বেরিয়ে এসেছে খানিক।
তবে জারিফের ঠোঁটের বাধন নরম হয় নি; তার দুই থাবা দেওয়া হাত এখন অনুপমার গলা-ঘাড়ের পুরো আয়ত্ব নিয়েছে। আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়েছে জারিফের ঠোঁটের বিপরীতে।
সময় গড়ায়; অনুপমার হাতের রক্তের প্রবাহ লম্বা হচ্ছে।
একসময় জারিফের হাত অনুপমার গলা ছেড়ে দেয়, কাধে নামে, আস্তে আস্তে নেমে যায় বাহু বরাবর। হাতের মুঠোয় যেয়ে থামে। ওর শক্ত হাতের মুঠি নরম করে জারিফের খসখসে পোক্ত হাতের লম্বা আঙুল, পাশাপাশি নরম হয় তার ঠোঁটের বাঁধন।
জারিফের ঠোঁট অনুপমার মুখ থেকে বের হয়ে আসে; ধীরে অনুপমার ঠোঁটযুগলও ছেড়ে আসে। চোখ খুলে সে। মুহূর্ত তাকায় সে, তার রক্তাক্ত মুঠোর রমনীর লাল ঠোঁটের দিকে, কপোল ভিজে আসা ঐশ্বর্যমন্ডিত চেহারায়।
অনুপমার হাতের আঙুলে জারিফের আঙুল জরিয়ে অনুপমার হাতের রক্তাক্ত মুঠো খোলা।
জারিফের চেহেরায় তাতে ভাবাবেগের কোনো পরিবর্তন হয় না। অন্তত সেটা জারিফের চেহারা দেকে বোজা অসাধ্য। সে অনুপমাকে কোলে তুলে নেয়, বেলকনি থেকে ভিতরের দিকে পা বাড়ায়।
বেডে আলতো করে বসায় ওকে, পাশে টেবিল ল্যাম্প এর ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড এর বক্স বের করে। অ্যান্টিসেপ্টিক লাগায় রক্তাক্ত তালুতে ধীরে-সুস্থে, বেডের নিচে পায়ের তালুতে ভর দিয়ে বসে। তারপর তাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়।
বের হয়ে আসে রুম থেকে।
~~~
আবেশের যাওয়ার পর রাইনিকা একাএকাই পুরো ফ্ল্যাটটা আবিষ্কার করেছে, আর ওর পিছন পিছন ঐ বিড়ালটা মিউ মিউ করেই চলেছে। ও একবারো কোলে নেয়নি ঐটাকে। তখন কোলে উঠে আসছিল, ও ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিয়েছিল ঐটাকে। একবার ভেবেছিল খাবার দিবে, কিন্তু মিউ মিউ করে বিরক্তি ধরিয়ে দিয়েছে। তাই রাগে খাবারও দেয় নি। তারপরও বিড়ালটা পিছু ছাড়ছে না।
রাইনিকা সব ঘুরে যা পেলো, তা হলো সব সাদাকালো। সবকিছুর মধ্যে স্টুডিও রুমটা ওর একটু বেশীই খালি খালি লেগেছে। বড় একটা রুম সাথে সুইমিংপুল; কিন্তু ভেতরে তেমন কিছুই নেই। অন্যান্য রুমের লাইটিং থেকে স্টুডিওর লাইটিং আরো ধীমি। মানে আলো নেই বললেই চলে।
এতোটা সাদাকালো ওর ভালো লাগে না; কিছু পরিবর্তন দরকার। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট থেকে জীবন বাচাতে হবে।
সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। রাইনিকা সজাগ-সবোধে থাকা কালীন এই প্রথম এই পুরো ফ্ল্যাটে সন্ধ্যা নেমেছে। রাইনিকা অবশ্যই এই ফ্ল্যাটের লাইটিং সিস্টেম বা যাইহোক কোনো বিষয়েই ধারনা রাখে না।
পুরো ফ্ল্যাটে বাইরের গোধুলির রঙ ছরিয়েছে; কেমন হলুদ-কমলা হয়েছিলো এতক্ষণ। এবার মাগরিবের আজানও দিয়ে দিল। কিন্তু ফ্ল্যাটে কোনো আলো নেই। অন্ধকার হয়ে আসছে ফ্ল্যাট; রাইনিকা সুইচগুলো ও খেয়াল রাখে নি কোথায় কোথায় আছে। তারওপরে ওর কাছে ফোনও নেই। শুধু পাশে বিড়াল মিউ মিউ করে যাচ্ছে। ফ্ল্যাটের সব জানালা দরজা বন্ধ। স্টুডিওর সাথের গ্লাস ডোরটাও ও খোলে নি একবারো শুধু দেখেছে ঐপাশে সুইমিংপুল আছে।
বেলকনির ডোর-টোর লাগায়ে এখন রাইনিকা জড়োসড়ো হয়ে বেডে বসে আছে, বেডের সেকেন্ড লেয়ারটায় ঐ বিড়ালটা বসে। চারপাশে অন্ধকার অন্ধকার ভাব। খুব রাগ উঠতেছে আবেশের ওপর। জানেনা বাসায় রাইনিকা একা?— দুম করে সব লাইট জ্বলে উঠল। সাথেসাথে রাইনিকা আৎকে উঠে, বিড়ালও লাফায়ে ওর কোলে উঠে আসে ভয়ে।
~~~
চলবে~~
#পর্ব১৬
#wrong_profile
#সেয়ারা_তিষিকা
( #পর্ব১৬'র আরো একটা বড় অংশ আসবে আজ রাতেই, এবার যত রাতই হোক। সজাগ থাকবেন তো আপনারা? পুরোটা একসাথে দিতে না পারার জন্য ক্ষমা!! লেখা নিজের মন মতো না হলে দেওয়া যায় না :(