দুপুর-বিকেলের পার্থক্য বুঝা যাচ্ছে না আকাশে মেঘের ঘুরাঘুরিতে। তবে এতসময় পরও দুপুর থাকার তো কথা নয়। সূয্যিমামাকে দেখা গেলেও এতক্ষণে অবশ্যই তিনিও টাটা-বাইবাই হওয়ার পথে থাকত। কিন্তু মেঘ সূয্যিমামার সাথে ভালোভাবেই আড়ি জমিয়েছে; যে তার যাওয়ার সময়ও তাকে দেখতে না দেওয়ার পণ এটেছে। সে যাইহোক, এজন্য আবার আযিয বাড়ির আয়োজনে কমতি পরে যায় নি।
ইনামাদের বাড়ির উঠোনের দিকটায় বড় রান্নাঘরটাতে সব রান্নার জোগার চলছে। রাইনিকাদের রান্নাঘর পেরিয়ে গেলে কয়েক কদম পরেই ইনামাদের বাড়ির সীমানায় পা পড়ে। আজিজুলের বড়ঘরে ঢুকার প্রধান দরজাটা হলো পশ্চিম হয়ে। আর বড়ঘরের উত্তরের দরজা বারান্দা হয়ে যায়, দক্ষিণের দরজা বাইরের রান্নাঘরে নিয়ে যায়। এই রান্নাঘরের পিছনেই সীমানা ঘিরা দেওয়া দেওয়ালে ছোটকরে ফটক তৈরি করা হয়েছে ভাইয়ের বাড়িতে সহজে পৌছানোর উছিলা নিয়ে। এই দরজাই বেশীরভাগ বউ-মেয়েরা ব্যবহার করে তাদের সুবিধার্থে কখোনবা ছেলেমেয়েদের খেলায় আলাদা মজা নিয়ে আসতে।
বৃষ্টি বোধহয় আরোএকবার নামবে। বৃষ্টি নামার আগেই সব বউরা তৈ-তরকারি গুছিয়ে নিচ্ছে, রান্নাঘরে। কিছু বাড়িতে না থাকলে আনানোর জন্য বাড়ির পুরুষদের পাঠানো হচ্ছে। আফজাল আগেই চলে গিয়েছে বাড়ি সাজানোর জন্য কেনা-কাটা করতে, যতটুকু সম্ভব। বাকিটুকু ইরহান এসে দেখবে। এখনই সাজাতে হবে। কারন আযিয বংশের বড় মেয়ের জন্মদিনের পাশাপাশি বিয়ে, একই মহাক্ষনে। কতবড় ব্যপার-স্যাপার, সবাইকে জানাতে হবে না? "আরমান সাহেবের শশুড়বাড়ি থেকে মানুষ নাকি রওনা দিয়ে দিয়েছে?" কুলসুম এসে বেডশীট বদলাতে ব্যস্ত মরিয়মকে একথা জানালো।
মরিয়ম ক্ষনকাল আওয়াজ করে না, যেন শুনতে পান নি কিছু বলা হয়েছে।
কুলসুম কিন্তু থামে না, সে কক্ষের জানালায় নতুন ধরনের নীলাবৃত পর্দা লাগাতে লাগাতে আবার বলে, " আঙ্গ বাড়িত তারা কইছে অনেও রেডি হইতাছে তারা, আইতে আইতে রাইত হইব। আফা তুমার বাড়িত যে কতা কইলা না?"
মরিয়ম এবারো উত্তর দেন না প্রশ্নের, বরংচ পাল্টা প্রশ্ন করেন, " আলমিরা থেকে খাটের সফেদ পর্দা বের করেছিস?"
কুলসুম আগের প্রশ্নটার উত্তর না জেনেই আলমিরা থেকে বের করা সুভ্র-কোমল পাতলা কাপড়টা মরিয়মের হাতে দেয়। কাপড়টার দুটি অংশ। মরিয়ম উপরের ভাজকরা অংশটা বেডে রেখে নিচেরটার ভাজ খুলেন, কুলসুমকে ইশারা করেন খাটের উপরের স্ট্যান্ডে রাখা কাপড়চোপড় নামিয়ে রাখতে। কুলসুম বুঝে সেটা, খাটের ওপরে কাঠের স্ট্যান্ডে রাখা কাপর নামিয়ে নেয়। মরিয়ম এবার খাটের ওপরের সেই চারকোণা স্ট্যান্ডে হাতের সফেদ, চিকন সুতার কাজ করা পর্দার ফিতাগুলো বাঁধতে শুরু করেন। ঐ শুভ্র পাতলা পর্দা দিয়ে খাটের চারপাশ ঢেকে গেলে, এক-এক করে খাটের চারদিকের কাঠের চার খুঁটিতে পর্দাগুলো বেঁধে দেন। অতঃপর রেখে দেওয়া অন্য অংশটা হাতে নেন, মেলে দেন সেটা খাটের উপরের স্ট্যান্ডের চারদিকে, যেটার কারুকার্য করা অংশের কিছুটা তার চারপাশে ঝুলে থাকে।
বিয়ের সময় এই কাঠের খুটিতে এই পর্দার সাথে ফুলের তোরা প্যাচানো হবে। ফুলের কারুকাজ চলবে এই খাটজুড়ে। আপাতত এই ঘরগুলোর সব কভার-কুশন-শীট-পর্দা নতুন দিয়ে পরিবর্তন করা হয়েছে বিয়ে উপলক্ষে। প্রতিটা ভাইয়ের বাড়িতেই একই কাজ করা হবে। এটা একটা নিয়মের মতো হয়ে গিয়েছে যেখানে বাড়িতে কোনো আয়োজনে নতুন-সুন্দর-মাধুর্যমন্ডিত পোষাকে মোড়ানো হয় বাড়িকে, নিত্যব্যবহার্য বদলায়ে।
মরিয়ম এবার রান্নাঘরের উদ্দেশ্য বেরিয়ে যান, কুলসুমের দায়িত্ব পরে ঘরের সব থালাবাসন-কোঁসন পরিষ্কারের। যেখানে অলরেডি অনিভের আম্মু অর্ধেকের মতো ধুয়ে ফেলেছেন। কুলসুম যোগ দেয় সেখানে। এতগুলো থালাবাসন একার দ্বারা কষ্টকর হয়ে যাবে। কুলসুম হাতে গ্লাভস লাগিয়ে কাজে লেগে যায়।
~~
এতকিছুর মাঝখানে বাইরে ছেলেমেয়েরা উঠান পেরিয়ে গ্যারেজের সামনে দৌড়ে এসেছে। তীক্ষ্ণ চোখে বিএমডব্লিউটা এখানে দাড়িয়ে। অনিভ আগে আগে দৌড়ে যায়। আবেশ পিছন থেকে কী ট্যাপ করে লক খুলে দেয়, অনিভের ডোর টেনে ধরার আগেই। অনিভ ডোর খুলতে গেলেই, অনিশা ওকে পিছন থেকে টেনে ধরে। পিছন থেকে আবেশের আওয়াজ শোনা যায় ,
" এইযে ছাও-পোনা! বুঝেশুনে! আপনাদের দাদা-পরদাদার ভিটেমাটি দিয়ে উসুল করা হবে আমার কালাচাঁদের একেকটা স্ক্র্যাচ।"
আবেশের শব্দ শোনামাত্র থেমে যায় দুজন। কিন্তু পিছনে একজন আরেকজনের কাপড় শক্ত মুঠিতে ধরে আছে যাতে একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে আগে না উঠে যায়। মুঠিতে শক্তি প্রয়োগের প্রতিফলন কিছুটা তাদের মুখেও দেখা যায়। মুখ শক্ত করে চেপে দুজন দাঁড়িয়ে।
আবেশ এগিয়ে এসে ডোর ওপেন করলে, অনিভ অনিশাকে জোর করে ধরে আগে আগে উঠে যায়। পরপরই অনিশা উঠে সাথে অনিজা। অনিজা একটু ভিতু প্রকৃতির, যদিও চেনাজানা মানুষ থাকলে তার অন্যরুপ সামনে আসে। কিন্তু অচেনা অজানা মানুষ- জায়গা কঠিন করে দেয় ওর খোলস ছাড়তে। সময় লাগে।
ফাইজা বের হতে চায় নি। ও ঘরের এককোনায় বসে পড়া এগিয়ে নেওয়ায় ব্যাস্ত। সামনের কয়েকদিন বিয়ের ঝামেলায় ওর পড়া নাকি মিস হয়ে যাবে। ইনামাও জোর করে নি। এগুলোরে সাথে নিলে ঘুরতে যাওয়া মাটি হয়। ইনামা আর রাইনিকা একসঙ্গে হেটে আসছে। ইনামা ফ্রন্ট সিটে বসতে চায়, ফ্রন্ট সিটে বসার একটা আলাদাই মজা আছে। ও ডোর ওপেন করার আগেই পিছনে কোত্থেকে ফারহান উড়ে এসে ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সিটে বসে পরে। ইনামা উপায় না পেয়ে ব্যাকসিটেই বসার জন্য ভিতরে ঢুকে। আবেশ এখনো ডোরের সামনে দাড়িয়ে, তার কিছুটা সামনেই রাইনিকা বুকে হাত ভাজ করে অন্যদিকে শক্ত করে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে।
আবেশের একমাত্র বউ হিসেবে সামনে আবেশের পাশের সিটটা রাইনিকার নয় কি? তাহলে আরেকজনকে কেন সামনে বসতে দিল আবেশ? কি হচ্ছে এসব আজকাল ওর সাথে? বাড়িতে আসার পর যেন ওর গুরুত্বই কমে গিয়েছে। এমন কেন হবে?
রাইনিকার ভাবনার মাঝেই আবেশ ব্যাকসিটের খোলা ডোরটা লাগিয়ে দেয়। হঠাৎ ডোর লাগানোর শব্দে ভেতরে থাকা মনুষ্যগুলো অবাক হয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি দেয়। বাড়ির দিকে জানালার ওপাশে উৎসুক দৃষ্টি সবগুলোর।
এক কদম এগিয়েছে আবেশ রাইনিকার দিকে। রাইনিকা ঢোক গিলে, পিছু হটতে চেয়েও পিছোয় না। কিন্তু শরীর কিছুটা পিছন দিকে হেলে গিয়েছে আবেশের স্পর্শ এড়ানোর জন্য। আর মুখটা আপনাতেই একদম নিচু হয়ে এসেছে, চিবুক গলায় লাগার উপক্রম। দুরত্ব বেশী না, যতটুকু থাকলে এক শরীর বিপরীত শরীরের ছোয়াটা শুধু না পায়; অনুভূতির সমস্ত রন্ধ্র তড়াক করে নড়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট দুরত্ব। সামনে ঐ কঠিন মানব-শরীরের উপস্থিতির, রাইনিকাতে লোম দাড় করিয়ে কাটা দেওয়ার জন্য যতটুকু নির্মম দুরত্ব প্রয়োজন ততটুকুই বিরাজমান।
রাইনিকার মুখ বরাবর নুইয়ে নেয় নিজেকে আবেশ,
" তুমি চাইলে আমি তোমাকে কোলে নিয়ে ড্রাইভিং সিটেই বসতে পারি?"
আবেশের নিজের লম্বা শরীর বাঁকিয়ে নামানো মুখের অতল গভীর চোখ, সম্পুর্ন দৃষ্টি দেয় রাইনিকার বারবার পাতা ঝাপটানো পলকের দিকে,
"নতুন কিছু নয়। শুধু আমাদের চারপাশের উপস্থিতি একটু ভারী হবে। অনুমতি পাওয়া যাবে? "
এহেন প্রশ্নে মাথা নোয়ানো অবস্থাতেই রাইনিকা দ্রুতভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকানোর চেষ্টা করে। বিপদে পড়ে যায় মেয়েটা, চারদিকে চেয়েও সামনে আবেশের বুকে জরানো ব্ল্যাক হুডিটাই নিচু নজরের সীমানায় আসছে। ফাক-ফোকরও নেই ওর জন্য পিছনের প্রকৃতি দেখার, পরিস্থিতি এড়ানোর। আবেশের বলা প্রশ্ন নিয়ে ও ভাবতে পারে না। ওর মাথা সম্পুর্ন কাজ করছে কিভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যায়? অবশেষে ভাজ থেকে হাত খুলে, ক্ষমা-চাওয়ার ভঙ্গিমায় একসাথে জড়ো করে দুই হাত। সেই জড়ো করা দুই হাতের সাহায্যে সামনে দাড়ানো আবেশের শক্ত পুরুষদেহ ঠেলে। কাজ হয় না। বেয়াদবটাকে এতটুকুও নড়ানো যায় না। উপায় না পেয়ে রাইনিকা কোনোমতে পিছন ঘুরে আবেশকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যায়।
ডোরখুলে ইনামার সাথে ব্যাকসিটে বসে যায়।
ইনামা বুঝতে পারে না কি হলো, রাইনিকার এমন জরো-সরো ভাবভঙ্গিমায় মাথা নুইয়ে গাড়িতে ঢুকার কারন কি? সামনে শুধু তারা আবেশের পৃষ্ঠদেশই দেখতে পেয়েছে, রাইনিকার অস্তিত্ব ঢেকে গিয়েছিল সেটার পিছনে।
ফলস্বরূপ অবাক দৃষ্টিতে সবগুলো এখন রাইনিকার দিকে তাকিয়ে।
আবেশ ঘুরে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছে। তার চোখমুখ ফুরফুরা। যেমনটা সবসময় থাকে।
এতক্ষণ দাড়িয়ে থাকা ব্ল্যাক বিএমডব্লিউটা বাড়ির সীমানা পেড়িয়ে বেরিয়ে যায়। বড়ঘরে সোফায় বসা ফাইয়াজ চলন্ত গাড়িটার শেষ চিহ্নের সাক্ষী হয়। তাকে ফারহান অবশ্য বলেছিল যাওয়ার কথা, সেই যায় নি। তার এই হুটহাট সম্পর্ক একদমই ভালো লাগছে না।
~~
ঢাকা সেনানিবাস,
কমান্ডার'স অফিস।
জারিফ তার আসনে বসে রেকর্ডস ঘাটছে। কক্ষের নীরব, নিস্তব্ধতাকে ভেঙে বুটের শব্দ এগিয়ে আসে। রিয়াদ এসে উপস্থিত হয় জারিফের সামনে। জারিফ ফাইলে চোখ রেখেই আওয়াজ দেয়,
"বলো।"
রিয়াদ কিছুটা উশখুশ করলেও, শান্ত-শক্তভাবেই বলল, "কমান্ডার, মিশন লাইট ফেইলড!...তখন খবর পাওয়া গিয়েছিল সবকিছু ঠিকঠাকভাবে এগিয়েছে। কোনো ত্রুটি নেই। এমনকি মিশন সাকসেসফুলি কমপ্লিটও হয়েছিল। দ্যে ইভেন সেন্ট দ্যা প্রুফ। বাট আফটার অল অফ দ্যাট, এখন অন্য সুত্র বলছে, সে....এখনো জীবিত! একদম সুস্থ-সমেত।"
জারিফ চোখ তুলে তাকায়। রিয়াদের সেই ধারালো চোখে চোখ পরতেই, ভরকায় সে। দ্রুততার সাথে চোখ সড়ায় রিয়াদ। জারিফ হাতের ফাইল বন্ধ করে, পুর্নদৃষ্টি দেয় রিয়াদের ওপর,
"ডিটেইলস!"
রিয়াদ হাতে থাকা কালশিটে পড়া শুকনো রক্তের রঙা মোটা কভারের ফাইলটা এগিয়ে দেয় জারিফের কাছে,
জারিফ সেটার পেইজ উল্টায়, একের পর এক, সব ডিটেইলস নিখুঁত এটাতে। কোনো ভুল নেই। একটা পেইনড্রাইভ অ্যাটাচড্ এখানে। জারিফ সেটা কানেক্ট করে তার কম্পিউটারের সাথে,
সিসিটিভি ফুটেজ এইটা।
সাউদার্ন স্টেট পার্কওয়ে, নিউইয়র্ক। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য এটা 'ব্লাড অ্যালেই' হিসেবে পরিচিত। ইংরেজি শব্দ অ্যালেই, বাংলায় সরুপথ কিংবা উদ্যানপথ দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। এখানেও অ্যালেই ব্যবহার করার কারন একই। পুরোটা ঘন গাছগাছালিতে ঘেরা সরু আঁকাবাকা একটা হাইওয়ে, যেখানে বর্ষ পুরোনো ধাঁচের নিচু পাথরের ওভারপাসগুলো মাথার ওপর দিয়ে ঝুঁকে থাকে জায়গায় জায়গায়। আর অ্যালেই এর সাথে 'ব্লাড' যুক্ত হয়েছে এই হাইওয়ের বছরের পর বছর মানুষ গি'লে খা*/ও*য়ার জন্য। বিশ্রি দুর্ঘটনায় কত-শত মানুষের র'ক্ত শুকিয়েছে এই পিচের রাস্তায় তার ইয়ত্তা নেই। সেই থেকেই এটা নাম কামিয়েছে, 'দ্যা ব্লাড অ্যালেই'।
সিসিটিভি ফুটেজে সময় দেখাচ্ছে রাত 23:44। ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি তারিখ। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে একটার পর একটা যান ছুটে চলে যাচ্ছে ল্যাম্পপোস্টের আলো-আধারের মধ্যে জ্বলজ্বল করে। তখনই হঠাৎ তীব্র গতিতে একটা ব্ল্যাক ভ্যান ফুটেজের স্ক্রিনের সীমানায় ঢুকে, পরপরই ফুটেজ হিজিবিজি হয়ে যায়। আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। পরের ক্লিপ এই সময়ের দু ঘন্টা পরের। এই মাঝখানের দু ঘন্টার কোনো ক্লিপ নেই।
অসন্তোষ জারিফের চোখেমুখে স্পষ্ট, " মিশন লাইটের দায়িত্বরত অমনিক্স & সিলেক্স? "
" মিশন কমপ্লিট হওয়ার পর মাঝখানে একবার তাদের সাথে যোগাযোগ করা গিয়েছে। তখন বিডিতে ফিরার কথা ছিল তাদের ডকুমেন্টস সহ। এরপর টোটালি কানেকশন অফ হয়ে যায়।" মাঝখানে থামে রিয়াদ। তারপর স্থির-ধীর কণ্ঠে জানায়,
"গতকাল রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনরক্ষীরা....আর এখানে এই ডকুমেন্টস পৌছিয়েছে আমাদের কাছে।"
শেষ লাইনটাতে জারিফের ভিতর থেকে অদ্ভুতরকমের হাসি বের হয়ে আসে,
"Sent the void documents!……After killing our spies. The DGFI spies."
জারিফ শান্ত ভঙ্গিতে ফুটেজ এগিয়ে আবার শুরুতে নিয়ে এসে দেখতে থাকে। প্রশ্ন করে,
"কি বুঝাতে চাচ্ছে, এটা দিয়ে রিয়াদ?"
রিয়াদ জারিফের ডেস্ক থেকে কয়েকহাত দুরে দাড়িয়ে, তটস্থের সাথে তার কমান্ডারকে দেখছে। সে যেই ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই হচ্ছে। জারিফের এই অশান্তভাবে শান্ত থাকা, ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এভাবে পুনঃ পুনঃ একই ফুটেজ বারবার এগিয়ে নিয়ে দেখা অপ্রকৃতস্থের মতো লাগছে রিয়াদের কাছে। রিয়াদের মুখ থেকে শব্দ বের হতে চায় না এই অবস্থায়।
জারিফের আবার আওয়াজ পাওয়া যায়, "রিয়াআয়াআদ?"
রিয়াদের জমে থাকা ঘাম জারিফের সুরেলা ডাকে কপাল বেয়ে পরতে শুরু করে। এরকম অতিরিক্ত শান্ত-সুরেলা কণ্ঠ বের হলেই বুঝা যায় জারিফের মাথার নষ্ট পোকারা যে কিলবিল করে উঠছে। মুখ ভিজানোর জন্য ঢোক গিলতে চায় রিয়াদ, কিন্তু লালার অভাবে শুকনো তার কণ্ঠনালিতে ঢোক কাজ করে না। তার ধ*র কা*টা র*ক্ত পরার আগেই রিয়াদ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জবাব দেয়,
"চ্যালে...ঞ্জ করেছে আ-আপনাকে, কমান্ডার। ও-পেন চ্যা..লেঞ্জ!"
"কে করেছে বললি না? শুয়োওওর! "
"কি-কিরন এডওয়ার্ড!"
"ঐ শ্লা! খান*কির*বাচ্চার সাহস বাইরা গেছে কয়েক বছরে।.... আবেশরে কল লাগা।"
রিয়াদ আবারও ফাঁকা ঢোক গিলতে চায়, কিন্তু ঠিকঠাকভাবে ঢোক গিলতে না পারার কারনে অস্বস্তি যেন আরো বাড়ে এতে। এভাবে জারিফের সাধারণ অভিব্যাক্তির বাইরে এই রুপ দেখা দেওয়া দুষ্কর ঘটনা। ভয়ঙ্কর কিছু হতে চলছে! পকেট থেকে ফোন বের করে আবেশকে কল দিয়ে স্পিকারে দেয় সে।
রিং হচ্ছে। কিন্তু ফোন তুলছে না ওপাশ থেকে। রিয়াদ ভিতর ভিতর বাজে কতগুলো গালি দেয় আবেশকে। সময় খারাপ হলে সবদিকেই একসাথে ডুবে। ভয়ার্ত চোখে তাকায় সে সামনে জারিফের দিকে।
জারিফ উঠে আসে সিট থেকে, রিয়াদ দ্রুততার সাথে nix'এ ট্যাপ করতে যায়। কিন্তু জারিফ ওকে পাশ কাটিয়ে বাইরে বের হয়ে যায় বড় বড় পা ফেলে।
রিয়াদ হাফ ছেড়ে বাচে জারিফের প্রস্থানে।
কিন্তু অস্থির চিন্তারা ভির করতে থাকে তার মাথায়। কি হতে চলছে সামনে? তার পাগলাটে কমান্ডার কি ফন্দি আঁটবে এইবার, কিরনকে আয়ত্তে আনতে?....আবেশের দিন মনে হয় শেষ রিয়াদের মনে হয়। যেভাবে বের হয়ে গেল, আবেশরে বিনা সার্ফএক্সেলে খঁচার জন্য। ম্যাম থাকলে হয়তোবা শান্ত করতে পারতো তার কমান্ডারকে।
রিয়াদের মাথায় হঠাৎ ক্লিক করে।
কমান্ডার কি ম্যাম'এর কাছে গিয়েছে? রিনহা'তে?
রিয়াদ বের হয়ে যায় জারিফের পিছু পিছু।
~~
উপরের কালো মেঘের পিছনে ঢলে পড়া লাল সূর্যের আস্তরণ, হলুদ-কমলার মিশেলে অদ্ভুত আবরণ তৈরি করেছে নিচের ভূখন্ডের পিচের রাস্তায়। আবেশের ছুটে চলা ব্ল্যাক বিএমডব্লিউ ও তার সরু ধারালো চোখ সেখানে ব্ল্যাক প্যানথারের মতোই লাগছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে উঠা পিচের, প্রসস্থ রাস্তার একপাশের বিশাল বৃক্ষ আরেকপাশের বৃক্ষরাজির পাতা ছুয়েছে রাস্তার মাঝ বরাবর, একরকম সবুজ পল্লবের ছাউনি তৈরি করে ফেলেছে রাস্তায় চলমান যান'এর ওপরের দিকে। এই বৃক্ষরাজির বেশীরভাগই রেইনট্রি যেগুলোর পল্লবরাশির ফাঁকে ফাঁকে সেই অদ্ভুত রঙা আকাশ উঁকি দিয়ে বেড়াচ্ছে।
ব্ল্যাক প্যানথার রুপী বিএমডব্লিউর আশেপাশে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আরো যান শোঁ শোঁ করে ছুটছে। কিন্তু এই ব্ল্যাক প্যানথারের অবশ্য গন্তব্য নেই আজ। ছুটছে অজানার উদ্দেশ্যে। যেদিকে চোখ যাচ্ছে সেদিকেই গতি বাড়িয়ে চলেছে। ভির নেই একদমই রোডের লেনে, ঢাকার রাস্তার লেন না এটা। নরসিংদী কোনো একটা সবুজে ঘেরা মেইন রোডের লেন। যেই সবুজের ভিতর দিয়ে এখন বিচরন করছে আবেশের ব্ল্যাক বিএমডব্লিউ। যাদের ওপর ছায়া ফেলেছে মেঘে ঢাকা টকটকে গোধূলি আকাশ।
গাড়ির ভিতরে গান বাজছে উচ্চশব্দে,
বন্দে মায়া লাগাইছে,
পিরিতি শিখাইছেএএ...
বন্দে মায়া লাগাইছে
পিরিতি শিখাইছেএএ...
কি জাদু করিয়ারে বন্দে...
কি টান একেকজনের গানের প্রতি লাইনে! ফারহান, অনিজা, অনিশা, ইনামা, রাইনিকা একসাথে বড় বড় টান লাগাচ্ছে। সিটে থাকার অবস্থা নেই একজনেরও। হাত-মুখ সমানে কাজ করছে গানের সুরে।
গাড়ির গতির সাথে গানের সুর সমান তালে বাজছে। সাথে তাদের গলা মেলানোর আওয়াজ।
সিট যথেষ্ট বড়। ইনামা, রাইনিকা একসিটে আর অনিজা, অনিশা একসিটে। অনিভকে এরা মাঝখানে নিয়ে এসেছে। অনিভের তো মনে হচ্ছে না এতে সাই আছে।
রাইনিকার মুখে গানের কলি নিয়েই চোখ যায় আড়াআড়ি সামনের ড্রাইভিং সিটে। আবেশের পড়নে অফ-হোয়াইট লুজ কম্ফোর্টেবল ট্রাউজার আর উপরে ব্ল্যাক হুডি। মাথায় তোলা কালো হুডের নিচে আবার ব্ল্যাক ক্যাপ, কিছুটা নিচু করা। বাইরে ছিল না। গাড়িতে ঢুকে মাথায় ক্যাপ লাগিয়েছে হুডের নিচে। তার যতসব আলাদা ভাব। এই হুড আর ক্যাপের জন্য আবেশের মুখের আধোপাশটা রাইনিকার দৃষ্টিতে আসছে না। এক হাত চলন্ত গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করা স্টিয়ারিং এ রেখেছে। আরেক হাত রেস্টে তার উরুর ওপর।
ফারহানের আবেশের সাথে ভালো ভাব জমেছে বোঝা যাচ্ছে। প্রথমদিকে রাইনিকা খেয়াল করেছে ফারহানের কথা বলতে চেয়েও না পারার বিষয়টা। স্বাভাবিক। কারোর ড্রেস আপ যদি এমন কালো-গম্ভীর প্রকৃতির হয়, সাথে এমন সুদর্শন চেহারায় যদি হাসি না থাকে, অল্পক্ষণের জন্য হলেও, তাহলে এই সুদর্শন চেহারাই কেমন ভয় তৈরি করে। কিন্তু এরই মাঝখানে আবেশ ফারহানকে কিছু বলে। কি বলল তা শুনতে পায় নি রাইনিকা গানের শব্দে আর আশেপাশে গাড়ির আওয়াজে। কিন্তু এরপর থেকেই দেখা যাচ্ছে ফারহানের কথা ফুটেছে। কখন থেকে কি বকবক করেই যাচ্ছে গানের মাঝে মাঝে। আবেশও কিসব বলছে বিপরীতে। এতো তাড়াতাড়ি মানুষের সাথে মিশে যায় কিভাবে এ?
তখনই পিছন থেকে অনিভ চিল্লায়ে উঠে, "এই মেয়েদের সাথে আমি বসব না মেইট!"
আবেশ দৃষ্টি সামনে রেখেই সহজাতভাবে বলল, "তুমিই তো লাফায়ে উঠলা আগে আগে? তোমার জাতিবোন এরা, এই মেয়েরা কি আবার?"
"মেইট, তোমার গাড়ি ছোট!" কথা ফুরোয় না অনিভ সিট ছেড়ে উঠতে শুরু করে। অনিশা ওকে ধরতে পারার আগেই অনিভ গাড়ির ফ্রন্ট সিটের মাঝখানে পা দিয়ে দেয়। দ্রুতগামী গাড়িতে ভর সামলাতে না পেরে অনিভ পড়ে যেতে নিলেই একহাতে আবেশ ওকে ধরে। ঐ এক হাতেই ওকে উপরে তুলে তার ড্রাইভিং সিটের মাঝখানে নিয়ে আসে।
অনিভ তো মুখের হাসিই সামলাতে পারছে না। বেজায় খুশি সে এতে। আবেশের পা ফাঁক করে বসায় সিটের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় সে বসেছে। বসার পরই ওমনি সামনে রাখা আবেশের ফোনটা নিয়ে হাসিহাসি মুখে তাকায় উপরে সোজা মুখ করা আবেশের দিকে। হাসিহাসি মুখটা বুঝাচ্ছে ফোনের লকটা খুলে দেওয়ার জন্য, সে গেইম খেলবে। সে দেখছে ঐ সকালে মেইটকে গেইম খেলতে এই ফোনে।
অনিভের এই হাসিহাসি আবদারমাখা চাউনিতে আবেশের ঠোঁটের রেখা মৃদু প্রসারিত হয়। আঙুল ট্যাপ করে লক খুলে দেয়, " তাইলে মানুষ বশ করার ইলম্ তোমরা রক্তে ছাপায়া ঘুরো, ছন্ডু-মন্ডুরা?"
~~~
চলবে…
#পর্ব২২
#wrong_profile
#সেয়ারা_তিষিকা
< কয়দিন পরে পরে জাকু কাকুর মিরমিরি রোগে ধরে আর ফেসবুকের রঙ বদলায়। যত সমস্যা পরে জনগণের 🧘♀️>
<পরবর্তী পর্ব আপনের নিউজফিডে পাইতে ফলো-টলো, লাইক,কমেন্ট কইরা রাইখেন। >