ফন্ট সাইজ:
থিম:
Tell Me Who I Am chapter 2

৫ম পর্ব

লেখক: আয়শা ইসলাম মনি

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_৩_শেষাংশ
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
                              🍁২য় খণ্ড🍁
___________________________________________☞
কারানের এমন কথায় এবার মিরা বিছানা থেকে নেমে এলো। এগিয়ে এসে কারানের হাতের নীচ থেকে নিজের হাত বাড়িয়ে ওর বুকটা জড়িয়ে ধরল। তারপর ওর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে বলল, "তোমাকে কষ্ট দিতে নয়, রাগাতে ভালো লাগে, জাঁহাপনা।"
কারানের ঠোঁটদুটো কঠিন হয়ে ছিল। "আমাকে রাগিও না, জান। জানো না আমি কে! আমি এমন সব কাজ করেছি, যার গল্প শুনলে তোমার র*ক্ত হিম হয়ে যাবে।" কারান নিজের হাত সামান্য তুলে, সেদিকে তাকিয়ে আপনমনে বলল, "এই হাত থেকে র*ক্ত মুছতে কত রাত কেটেছে, তুমি যদি সেসব জানো, আমার ছায়াকেও ঘৃণা করবে।"
এদিকে মিরা কারানের কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। বরং আরও দৃপ্তভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে অবিচল কণ্ঠে উচ্চারণ করল, "তুমি যদি আগুন হও, তবে আমি সেই আগুনের শিখা। তুমি আমাকে পোড়াতে পারবে না। বরং আমি চাইলে তোমাকে ছাই করে দিতে পারি।"
কারান এবার ধীরে ধীরে পিছন ফিরল। কিছুক্ষণ মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই হঠাৎ মৃদু কণ্ঠে বলল, "তুমি ভয়ংকর। কেন জানি না, কখনো কখনো তোমাকে ভীষণ অপরিচিত লাগে। আমার ভালোবাসাটাকে হারিয়ে দিও না, মিরা। আমি ভেঙে যাব, বড্ড কষ্ট পাবো। হয়ত ম'রে যাব, সত্যিই ম'রে যাব, বেগম।"
মিরা চুপচাপ জড়িয়ে ধরল কারানকে, কিন্তু তার ভিতরে ভিতরে কীসের যেন ভয় হচ্ছিল। নিশ্চয়ই কোনো অনিবার্য ঘটনা দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত। হয়ত কারানের গূঢ় সত্য উন্মোচিত হবে তার সম্মুখে, অথবা মিরার নিজস্ব বিপরীত সত্য উদ্ভাসিত হবে কারানের দৃষ্টিপাতে। মিরা অজান্তেই ঢোক গিলল।
মিরা মুহূর্তটাকে হালকা করতে চাইল, "কারান, দুটো চৌধুরি বাড়ি নিয়েই আমার সন্দেহ হয়। যেন কিছু ব্যাপার আমাদের চোখের আড়ালে আছে। খুব সূক্ষ্ম কিছু, যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না, অথচ সেটা দেখা এখন সবচেয়ে জরু..."
"একটা আবদার করব?"
মিরা কথা বন্ধ করে, কারানের গলা ছেড়ে তার চোখের দিকে তাকাল। "বলো, জান।"
"সামনের ক’টা দিন শুধু আমাকে দাও, মিরা। এই কয়েকটা দিন আমরা আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে হারিয়ে যাব—যেখানে থাকবে না কোনো দায়িত্ব, কোনো ব্যস্ততা, থাকব শুধু তুমি আর আমি। আমি আবার দুবাই যাব, জানি না কবে ফিরতে পারব বা কবে আবার তোমার মুখটা দেখতে পারব। তাই এই অল্প ক’টা দিন তুমি চৌধুরি বাড়িসহ বাইরের সবকিছু ভুলে যাও। শুধু আমাকে আর আমাদের মূহুর্তগুলোকে মনে রেখো, যেগুলো একদিন বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচব তুমি আর আমি।"
"কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ যেতে হবে!"
কারান মিরার কপালের কাছের চুলগুলো আলতোভাবে সরিয়ে দিয়ে বলল, "বলেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার আগে নিজেদের হারিয়ে ফেলা টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া দরকার।"
 কারানের চোখ তৃষ্ণার্থ। সে এই মুহূর্তে মিরাকে দেখে নিজেকে আশ্বস্ত করতে চাইছে। মিরার কপোলে এক হাত রেখে কারান আপনমনে বলল, "আমি জানি না, এই জীবনের ঘূর্ণিতে আবার তোমার কাছে ফিরতে পারব কিনা। কিন্তু আমাকে ফিরতেই হবে। তোমার একটুখানি স্পর্শ, একফোঁটা অনুভব ছাড়া আমি অপূর্ণ। তাই সব বিভাজনের অন্ধকার, বাধার প্রাচীর, নিয়তির নিষ্ঠুর পথ পেরিয়ে আমি আবার তোমার কাছেই আসব।"
মিরা চোখ বন্ধ করে কারানের আলতো ছোঁয়ার শিহরনে ডুবে গেল। তার শরীর জুড়ে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘশ্বাসে জমে থাকা সব ক্লান্তি কোথাও যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল।
একটু পর কারান নরম গলায় বলল, "মিরা, তোমার একটা ইচ্ছে ছিল, আমার কোলে মাথা রেখে ‘নীল দরিয়া’ গানটা শোনার। শুনবে আজ?"
কারানের স্মৃতির এমন গভীরতা দেখে মিরা চমকে তাকাল। এতটুকুও ভুলে যায়নি? দেড় বছর আগের সেই স্মৃতিও মনে রেখেছে? সে কী এতটাই ভালোবাসে তাকে?
তার স্থবির চোখের দিকে তাকিয়ে কারান বলল, "কি হলো?"
"তোমার মনে আছে?"
 "তোমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নড়াচড়া; কী বলেছিলে, কীভাবে তাকিয়েছিলে, এমনকি কীভাবে নিশ্বাস নিয়েছিলে—সবই আমার হৃদয়ে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা থাকে, বেগম সাহেবা।"
মিরা হেসে মাথা নীচু করল। কারান আবার বলল, "চলুন, আমার কোলে শুয়ে পড়ুন।"
আর কোনো শব্দ না বলে সে মিরাকে নিজের বাহুতে তুলে নিল। বিছানায় বসে মিরাকে নিজের কোলের কাছে বসালো।
মিরা কারানের কোলে ধীরে ধীরে মাথা রেখে দিল। কারান তার চুলে আলতোভাবে আঙুল চালাতে চালাতে, বুকের গহিন থেকে উঠে আসা ব্যথা-বোনা সুরে গাইতে শুরু করল,
"ওরে নীল দরিয়া
আমায় দেরে দে ছাড়িয়া...
বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি, হায়রে
কান্দে রইয়া রইয়া..."
প্রতিটি কথা মিরার হৃদয়ের গভীরে ঢেউ তুলল। তাদের একসাথে পার হওয়া সময়ের স্মৃতি, কষ্ট আর ভালোবাসার মূহুর্তগুলো মনে পড়তে থাকলো। 
কারানের আঙুল মিরার মুখাবয়বে গড়িয়ে নামছিল। আর মিরা চোখ বন্ধ করে হাসল। বাহিরের স্নিগ্ধ হাওয়া পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
কারান ফের টান দিয়ে গাইতে শুরু করল,
"ওরে নীল দরিয়া...
আমায় দেরে দে ছাড়িয়া
বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি, হায়রে
কান্দে রইয়া রইয়া।
ওরে নীল দরিয়া..."
প্রতিটি সুর যেন কারানের গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিল বারবার। তার মুখে হালকা একটা কাঁপুনি খেলে গেল, ঠোঁটের কোণে জমে থাকা ব্যথার রেখাটা গভীর হয়ে উঠল। 
কারান গলার খাঁজে একটা ঢোক গিলে নিল। ভিতরের কষ্টটা আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না। তবুও গলার স্বর একটু কাঁপা হলেও টান ধরে আবার গাইতে শুরু করল,
"কাছের মানুষ দুরে থুইয়া...
মরি আমি ধড়-ফড়াইয়া, রে...
কাছের মানুষ দুরে থুইয়া,
মরি আমি ধড়-ফড়াইয়া, রে...
দারুণ জ্বালা দিবানিশি
দারুণ জ্বালা দিবানিশি
অন্তরে অন্তরে।"
মিরা অনুভব করল, এই মুহূর্তে কারান কেবল গাইছিল না, সে নিজেকেই খুলে দিচ্ছিল তার সামনে। 
কারানের কণ্ঠে অস্পষ্ট সুর বাজল,
"আমার এত সাধের মনোয়া পাখি হায়রে,
কি জানি কি করে..."
এই শেষ লাইনে কারানের গলা থেমে গেল। কিন্তু মিরা তখনো সেই সুরের রেশে আবিষ্ট হয়ে চোখ বন্ধ রেখেছিল। একসময় অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতায় ধাতস্থ হয়ে চোখ মেলে তাকাতেই মিরার দৃষ্টি পড়ল কারানের দিকে; সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। পর্দার ফাঁক গলে চাঁদের নরম আলো এসে কারানের মুখে পড়ল। সেই আলোয় মিরা অবাক হয়ে দেখল, তার চোখে এক বিন্দু জল ঝুলে আছে। কারানের বিবর্ণ মুখ দেখে মিরার বুকেও ব্যথা হচ্ছিল। এমন রূপ সে আগে কখনো দেখেনি।
এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে যে কোনো গভীর স্মৃতি লুকিয়ে আছে, তা মিরা অনুভব করলেও ধরতে পারল না। গানটি ছিল কারানের মায়ের সবচেয়ে প্রিয়। আজ যখন সে গাইল, তখনই সেই একটি লাইন তার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিল, 'কাছের মানুষ দূরে থুইয়া...' শৈশবের আশ্রয় হয়ে থাকা মা আজ আর নেই। গানটার প্রতিটি শব্দ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেই ফেলে আসা মুহূর্তে, যেখানে একটাই মুখের জন্য তার মন কাঙাল হয়ে থাকত। অথচ জানে, সে মুখ আর কখনো ফিরে আসবে না। এ ভারেই তার চোখ ছলছল করে উঠল।
মিরা কোল থেকে উঠে কারানের বুকে মাথা রেখে বলল, "কি হয়েছে, কারান?"
ঠিক সেই মুহূর্তেই দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ শোনা গেল। সহসা ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে এলো। জানালার কাচে টুপটাপ জলবিন্দুর কোনা বেয়ে বেয়ে পড়ছিল। 
কারানের চোখ জানালার দিকে ছুটে গেল।  
কারান হঠাৎ বলে উঠল, "একসঙ্গে বৃষ্টিবিলাস উপভোগ করবে, প্রিয়তমা?"
 "কিন্তু..."
তবে হঠাৎই কারান তার কোমল হাত ধরে টেনে তুলল। 
"চলো, মেরি জান," বলেই মিরার বাক্য অসমাপ্ত রেখেই তাকে নিয়ে এলো ছাদের দ্বারপ্রান্তে।
দু’জন দাঁড়িয়ে পড়ল বৃষ্টির ভেজা চৌকাঠে। ছাদের কার্নিশ বেয়ে অবিরাম জলধারা টুপটাপ ছুটছিল, আর এক পর্যায়ে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মিরার গালে ছুঁয়ে গেল বৃষ্টির নিখাদ জলকণা। মিরা এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠলো। 
তারপর হঠাৎ করেই তার ভেজা চুলগুলো অবাধে ছুটে এসে কারানের মুখাবরণে আছড়ে পড়ল। কারানের চোখ বুজে গেল। সে সেই আর্দ্র কেশগন্ধকে টেনে নিল। সেই সুষম সুবাস তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হয়ে তাকে অভিভূত করল।
গভীর স্বরে কারানের কণ্ঠে ঝরে পড়ল, "Let my mornings begin and nights end with your scent, baby."
কারান যখন পাশে দাঁড়িয়ে মিরাকে অনুভব করছে, তখন মিরার মন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে। বৃষ্টি বরাবরই মিরার অতী পছন্দনীয়। সে আর নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। হঠাৎ কারানের হাতছায়া থেকে নিজেকে মুক্ত করে ছাদের মাঝদিকে ছুটে গেল। তার আচরণে কারানের ভ্রূ সামান্য সংকুচিত হলো। কারণ বৃষ্টিসিক্ত হলে মিরার দেহে শীতজনিত ঠান্ডা দেখা দিতে পারে। 
কিন্তু সেই বিস্ময়দৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। অপলক দৃষ্টিতে সে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল।
ওদিকে মিরা দু’হাত আকাশের দিকে মেলে ধরল, চোখ বন্ধ করে গভীর আবেশে শ্রাবণের বর্ষাকে আলিঙ্গন করল। তার পরনের শুভ্র বসনটি ত্বকের সাথে লেপ্টে মিরার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। ভেজা কেশরাশি ছড়িয়ে আছে কাঁধের ও গলার উপত্যকায়, প্রতিটি কেশপথ ধরে জলকণাগুলি গড়িয়ে পড়ছিল।
মিরার এমন সৌন্দর্য দেখে কারান শুকনো ঢোক গিলল। তার দৃষ্টি আটকালো মিরার শরীরের ভেজা ভাঁজে। এই মূহুর্তে মিরাকে যেন বারিষা রূপসীর মতো অপূর্ব লাগছিল।
কারান এক পা ছাদের উপর রাখল, মুহূর্তেই আকাশ থেকে ঝরে পড়া শ্রাবণের ফোঁটাগুলো তার দেহাবরণে মেলামেশা করতে লাগল। সে মিরার দিকে এগিয়ে গেয়ে উঠল, 
"ও আগে কত বৃষ্টি যে,
দেখেছি শ্রাবণে; 
জাগে নিতো এত আশা,
ভালোবাসা এ মনে..."
বৃষ্টি বিলাসে মগ্ন মিরা হঠাৎ করেই গাঢ় পুরুষালি গানের সুর শুনে নিজস্ব জগৎ থেকে সটকে বেরিয়ে এলো। চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকালো কারানের বৃষ্টিতে ভেজা সাদা শার্টের দিকে। যা তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে প্রতিটি মাংসপেশির সূক্ষ্ম রেখা আবির্ভূত করেছিল; কারানের বুকের ভাঁজগুলো যেন হাতে আঁকা এক অনবদ্য আর্টওয়ার্ক। তার উপর তার নেশায় মগ্ন দৃষ্টি উপলব্ধি করে দূর থেকেই মিরার হৃদয় অধিক স্পন্দিত হতে লাগল।
কারান এগিয়ে এসে মিরার সামনে দাঁড়াল। মিরা পিছপা হওয়ার আগেই, সে শক্ত হাতে তার কোমর আঁকড়ে ধরল। টাল সামলাতে না পেরে মিরার মাথা ঠেকল তার বুকে। মিরা মাথা উঁচিয়ে কারানের মুখপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। অবরত বর্ষণের ধারাগুলি কারানের চুল বেয়ে মিরার বিমুগ্ধ মুখাবয়বে গড়িয়ে পড়তে থাকল। কারান মিরার কোমর ঘিরে ধরে আলতো হাতে দোলাতে শুরু করল। মিরাও কারানের সাথে তাল মিলিয়ে কোমর দোলাতে লাগল।
পুনরায় কারান গেয়ে উঠল, 
"সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে, 
সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী, 
আজ ভিজতে ভালো লাগে, 
শূন্য মনে জাগে প্রেমের কামিনী... 
সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে, 
সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী, 
আজ ভিজতে ভালো লাগে, 
শূন্য মনে জাগে প্রেমের কামিনী..."
কারান বাম হাতে মিরার হাত তুলে ঘুরাতে লাগল। কারানের স্পর্শে তার মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠলো। 
এরমধ্যেই ছাদের একপাশে জমে থাকা পানির দিকে দুজনেরই দৃষ্টি পড়ল। মিরা মুহূর্তেই ছুটে গেল। শিশুর মতো পানির মাঝে লাফাতে শুরু করল। ভিন্ন কোনো প্রেক্ষণে হলে কারান হয়ত মিরাকে বকাবকি করত কিংবা তাকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেত। কিন্তু এই মুহূর্তে সেও মিরার পাশে এসে সেই পানির মাঝে লাফাতে লাগল।
কারান হেসে মিরার গালের ভেজা চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিল, কানের লতিতে একটি কোমল চুমু দিলো। চুমুর স্পর্শে মিরা অজান্তেই কাঁপতে লাগল। কারান পূর্ণ আবেগ নিয়ে মিরার কানের কাছে সুর তুলল, 
"এলো মেঘ যে এলো ঘিরে বৃষ্টি সুরে সুরে;
সোনায় রাগিণী,
মনে স্বপ্ন এলোমেলো একি শুরু হলো;
প্রেমের কাহিনি...
রিমঝিম এ ধারাতে চাই মন হারাতে,
রিমঝিম এ ধারাতে... চাই মন হারাতে..."
হঠাৎ করেই কারান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে বৃষ্টির ভেতর তাকে ঘুরাতে থাকল। মিরা প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরমুহূর্তে সে কারানের কাঁধ আঁকড়ে ধরে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস নিয়ে হেসে উঠল। তারপর বৃষ্টিভেজা আকাশের দিকে হাত দুটি মেলে দিল।
একটু পর কারান তাকে নিচে নামিয়ে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টির বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ছিল তাদের ললাটে, কপোলে, চোখের কোণে। মিরার বুকের প্রতিটি কোমল স্পন্দন কারানের কঠিন বুকে এসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে উঠল।
তখন কারান তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে উঠল,
"তুমি আমার শ্রাবণের অনুপম অভিসার,
মেঘবিহ্বল গগনে কুজন তোলো অপার।
তুমি বসন্তের কুসুমঘন গোপন অভিমান,
সুরভিত হেমন্তে জাগাও অনিবার্য প্রাণ।
শরতের স্নিগ্ধ নীলিমা; তুমি মনের ঊর্ধ্বে ছায়া,
যেথা মিশে যায় অনন্তের স্বপ্নরাশিমালা মায়া।
চৈত্রের উজ্জ্বল তেজে তুমি দিগন্তপারে দীপ্তি,
তব দৃষ্টিতে জ্বলে ওঠে প্রেমের অন্তহীন নীতি।
বৈশাখি দুরন্ততায় তুমি বিদ্যুতের ইঙ্গিত,
ঝঞ্ঝার মাঝে তোমার বুকে পাই প্রশ্রয়ের সংগীত। 
আশ্বিনের কাশফুলের শুভ্রতায় তুমি নিঃশব্দ স্মৃতি, 
কার্তিকের কুয়াশা হয়ে আসো মায়াবী প্রভাতবৃত্তি।
তুমি পৌষের রাতের নিস্তব্ধতায় নিবিড় অভ্যর্থনা, 
শীতের গহন স্তব্ধতায় তুমি আত্মার গোপন তপস্যা। 
তুমি ঋতুচক্রে অনিঃশেষ এক প্রতিচ্ছবি, 
প্রেমের ভাষ্যে রচো তুমি চিরন্তন কবি।
ভালোবাসি তোমায়; কালের অতল ছায়াপথে,
যেথা আমার ভাষা বিলীন, তব নাম উচ্চারিত প্রাতে। 
তুমি আমার হৃদয়ের অর্ঘ্য, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কাব্য,
নিয়তির অনুচ্চারিত রাগরাগিণীর অন্তর্যামী শ্রব্য।
আমার ভালোবাসার সীমা শব্দে ধরা যায় না, বউ।
সমস্ত শব্দকোষ নিঃশেষ করেও তোমার জন্য যথাযথ ভাষা খুঁজে পাই না আমি৷
অথচ আমার প্রতিটি নিশ্বাসে অনুপম ভালোবাসার মানে হয়ে জেগে থাকো তুমি।"
মিরা অভিভূত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নীরব তাকিয়ে রইল। কারানের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীরতম কুঠুরিতে অমোচনীয় ছাপ ফেলে গেছে। তার চাহনির নিবিষ্ট গভীরতা মিরাকে প্রতিবারই অবিরাম আকর্ষণে বাঁধে। বরং চিরকাল এই দৃষ্টির বন্দিত্বেই থাকতে চায় সে। মিরার মনজুড়ে অনাবিল প্রশান্তি নেমে আসল। 
কারানও আঁখি মেলে একই মোহাবিষ্টতায় তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর মিরা অনির্বচনীয় আবেগে বলল,
"নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতায়, যদি শেষবারের মতো তোমার কোলের উষ্ণ আশ্রয়ে মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারি, তবে মৃ*ত্যুও হয়ে উঠবে আমার প্রিয়তম অতিথি। তখন এই জীবনকে আর কিছু চাওয়ার সাহসও করব না। সেই মুহূর্তেই আমার সমস্ত আক্ষেপ, সব না-পাওয়ার যন্ত্রণা; সবকিছু নিশ্চুপ হয়ে যাবে। মৃ*ত্যুকে তখন মনে হবে আশীর্বাদের মতো। কারণ শেষটুকু যে তোমার সান্নিধ্যে শেষ হয়েছে।
তুমি তো শুধু মানুষ নও, তুমি আমার পূর্ণতা। তোমার চোখে আমি নিজেকে নতুন করে চিনেছি, তোমার ভালোবাসায় আমি প্রতিবার পুনর্জন্ম পেয়েছি।
এই ভালোবাসার ঋণ... তা কি কখনো শোধ করা যায়? এ ঋণ তো হৃদয়ের, আত্মার; যেখানে কোনো হিসেব চলে না। আমি শুধু এইটুকু চাই, যদি জন্ম বলে কিছু থাকে পরপারে, তবে প্রতিবারই যেন আমি জন্ম নিয়ে তোমারই ভালোবাসায় ডুবে যেতে পারি।"
কারান মুহূর্তকাল মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরটা দুর্দমনীয় আবেগে টালমাটাল। তার হৃদয় চিৎকার করে বলতে চাইল, 'জড়িয়ে ধরতে চায় তাকে, বিলীন হতে চায় মিরার হৃদয়ে, আর কাঁদতে চায় বুকভরে।' 
কিন্তু না, মিরার সামনে ভাঙা মুখ কখনোই তুলে ধরবে না সে।
দুজনেই নীরবতায় মগ্ন। তাদের মন বলে, এই মুহূর্ত যেন অনন্তকাল স্থায়ী হয়; প্রেমের যে কুসুম ফুটেছে, তা যেন কোনোদিন ঝরে না পড়ে। 
অনেকটা সময় পর মিরার ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। সে এগিয়ে এসে কারানকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল। কারানও চোখ বন্ধ করে তাকে সেই একই রকম আকুলতায় জড়িয়ে ধরল। একটু পর কারান ফিসফিস করে বলল, "You are my red rose, sweetheart."
মিরা হেসে কারানের গালে একটুখানি আলতো চুমু এঁকে দিল। একটু পরই সেই চুমু সরে এলো ঠোঁটে। একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে, আবেশে তারা ক্রমশ ডুবে যেতে লাগল। চুমুর গভীরতায় দুজনের শ্বাস গাঢ় হয়ে উঠছিল। কখনো ধীরে, কখনো বা বিদ্যুৎগতিতে। মিরার বুক উঠছে-নামছে। তার নখ কারানের ঘাড় আঁকড়ে ধরেছে। আর অন্যদিকে কারানের হাত শক্ত হয়ে জাপটে ধরেছে মিরার কোমর।
কিন্তু এই বৃষ্টিভেজা প্রেমিলতায় কে যেন আছে। একজন তৃতীয় ব্যক্তি, যে চুপচাপ অন্ধকারের গভীরে কোথাও বসে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। তার চোখ শিকারির মতো ঠান্ডা। আর ঠোঁটে ধরা সিগারেট থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার ঘরটায় হালকা কমলা রঙের আলো জ্বলছে। ঘরের এক কোণায় পড়ে থাকা টেডি বিয়ারের চোখ উপড়ে ফেলা রয়েছে।
তার সামনে উন্মুক্ত ল্যাপটপের স্ক্রিনে ঝলমল করছে সেই ছাদের দৃশ্য। সেখানে মিরা আর কারানের আবেশে ভেজা শরীর, মিরার বক্ষের ছন্দোময় ওঠানামা, কারানের গলায় মিরার আঙুলের কামনাবদ্ধ ছোঁয়া, কারানের কোমর আঁকড়ে ধরা, ঠোঁটের গভীরতায় নিমগ্ন দুটি আত্মা, মৃদু নেশাগ্রস্ত হাসি, ঠোঁটের ক্ষণিক কম্পন, দুজনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা— সবই স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার পরনে শুধু একটি ট্রাউজারমাত্র।  
ল্যাপটপের পর্দায় অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে। তারপর হঠাৎই গম্ভীর, গা-ছমছমে কণ্ঠে বলে উঠল, "And you are my Black Rose, little fire..."
তার ঠোঁটের কোণে পিশাচী হাসি ফুটে উঠল। সিগারেটের জ্বলন্ত আগুনটা আচানক নিজের বুকের বাঁ পাশে ঠেসে ধরল। চামড়ার আস্তরণ উঠে লালচে মাংস বেরিয়ে এসেছে, তবুও তার মুখ নিস্তব্ধ, কোনো ব্যথার ছাপ নেই। মুহূর্ত পর চুলগুলো পেছনে ঠেলে একপ্রকার ব্যর্থ আত্মসংযমের চেষ্টা করল, কিন্তু হাত কাঁপছিল। প্রচণ্ড রকমের ব্যর্থতা তার চোখে-মুখে দেখা গেল। চোয়ালের পেশি এতটা শক্ত হয়ে ছিল যে দাঁত কিঞ্চিৎ ভেঙে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে একবার শ্বাস নিল। 
খুললে দেখা গেল, তার চোখদুটি রক্তাভ, বিকারগ্রস্ত। মনে হচ্ছে, মুহূর্তেই চোখের কোণে সঞ্চিত রক্ত ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়বে। ঘাড়ের পেশিগুলো সংকোচনে ফুলে নীল বর্ণ ধারণ করেছে। হঠাৎ সে ক্ষিপ্রতায় সামনের র*ক্তরঞ্জিত টেবিলের ওপর একের পর এক ঘুসি মারতে লাগল। কাঠের গায়ে ধাক্কা খেয়ে হাত কাঁপছিল, তবু সে থেমে নেই। হাতটা লাল হয়ে নীল, এরপর ধীরে ধীরে র*ক্তাক্ত হলো। হাতের চামড়া ছিঁ*ড়ে, হাড়ের সংযোগস্থলে ফাটল ধরল। ত্বক ছিঁ*ড়ে গিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে এলো। ফোঁটা ফোঁটা র*ক্ত টেবিলের গায়ে গড়িয়ে পড়ছিল। তবু তাতে তার অন্তর্লীন অগ্নিদাহ প্রশমিত হলো না। 
পরমুহূর্তে সে চকচকে একটি ছু*রি হাতে তুলে, বা পা-টা চেয়ারের উপর রাখল। হঠাৎই পায়ের ছোট আঙুলটায় ছু*রির ধার বসিয়ে দিল। হাড় ফেটে মাংস ছিঁ*ড়ে গিয়ে কেবল চামড়ার শেষ টুকরোটা ধরে ছিল। একটানে সেটাও ছিঁড়ে ফেলল। আঙুলটা মেঝেতে ছিটকে পড়ে র*ক্তে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে লাফিয়ে উঠল। র*ক্ত সাপের মতো টাইলসের উপর ছড়িয়ে পড়ল। 
অথচ তার চোখে না আছে বেদনা, না বিস্ময়। সে নীচু হয়ে আঙুলটা হাতে তুলে নিল। তখনো আঙুলটা ছটফট করছিল। স্থির চোখে সেটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হয়, সে যেন হিপনোটাইজড হয়ে গেছে।
ক্ষণকাল পর ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এলো। সেখান থেকে সুঁই বের করল। সুঁইটার মাথায় শুকিয়ে যাওয়া র*ক্তের ছোপ লেগে ছিল, আগেও হয়ত এটা ব্যবহৃত হয়েছিল। এবার সে সেই আঙুলটা আবার পায়ে সেলাই করতে শুরু করল। ছুঁচটা মাংসের ভেতর ঢুকছিল, আবার বের হচ্ছিল। তবুও সে নির্বিকার। কিন্তু ব্যর্থ হলো। যতই সেলাই করে, আঙুলটা ততই নড়তে থাকল।
রাগে উন্মাদ হয়ে সে ছুঁচটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছিল, চোখ দুটো র*ক্তাক্ত আগুনে জ্বলছিল। তাই সেই কা*টা আঙুলটা মুখের মধ্যে পুরে ফেলল। চোয়াল শক্ত করে চিবোতে শুরু করল। মুহূর্তেই কচকচে শব্দ হলো। চামড়া ছিঁ*ড়ে যাওয়া, হাড় ভাঙার আওয়াজ সমস্ত ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। তার মুখ ধাপে ধাপে কঠিন হয়ে উঠছিল। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই র*ক্ত জিভ দিয়ে চেটে খেয়ে নিল সে। কা*টা আঙুলটার নখটা ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিল, তবে পারল না।
সে উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। ভেতরে থরে থরে সাজানো আছে কা*টা মাথা, ছিন্ন ভ্রূ*ণ, নীলচে পু*রু*ষা*ঙ্গ, কাটা স্ত**ন, কিডনি, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, যৌ*না*ঙ্গ, অ*ন্ড*কো*ষ। সে ঠান্ডা হিমায়িত একটি পা টেনে বের করল। 
চেয়ার টেনে বসে সেই পা থেকে ছোট আঙুলটা নিখুঁতভাবে কে*টে নিল। এরপর নিজের পায়ের সঙ্গে সেটি সেলাই করে দিতে দিতে বলল, "তোমাকে জাস্ট একটু সুযোগ দিয়েছি, লিটল ফায়ার। আর তুমি কিনা তার এমন নষ্ট ব্যবহার করছ? তোমার শরীরে কারানের ঠোঁট যতবার পড়েছে, তার থেকে হাজারগুণ বেশি আমার পড়বে। আর প্রতিবার এতটাই গভীরে চুম্বন করব, যেন তোমার আত্মায় চিৎকার ওঠে। কাঁদতে থাকবে তুমি, গলা ফাটিয়ে আমাকে থামাতে চাইবে, কিন্তু আমি... আমি তোমাকে মুক্তি দেব না।"
ব্যান্ডেজ লাগাতে লাগাতে সে গুনগুন করে আবার বলে উঠল, "আর কত খু*ন করাবে তুমি আমার হাত দিয়ে, বলো? এই নিয়ে তোমার নামেই একুশটা লা*শ পড়ল, বেবি। আরো একটা খু*ন করতে চলেছি আমি। কিন্তু এর পরেরটা? এর পরেরটা হবে কারানের।" অকস্মাৎ গলা চিরে শ'য়তানি হাসি বেরিয়ে এলো। 
 অনেকটা সময় পেরিয়ে, ধীরে ধীরে একে অপরের মুগ্ধ বাহুডোর থেকে মিরা ও কারান বিচ্ছিন্ন হলো। চারপাশে নিবিড় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। বারিধারাও থিতিয়ে পড়েছে খানিকটা, কেবল কারানের সিক্ত শার্টের ভাঁজে মিরার আঙুলের সূক্ষ্ম স্পর্শ, আর বাতাসে উড়ে বেড়ানো তার চুলের মৃদুমন্দ সুগন্ধ তাদেরকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। মিরার অধরে চপল হাসি খেলে গেল। সে মাথা নীচু করে পুনরায় কারানের চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।
স্বর নীচু করে বলল, "স্বামী..."
 কারান মিরার কপাল থেকে ভেজা চুলের গোছা সরিয়ে কানের পাশে পরিপাটি করে গুঁজে দিয়ে অম্লান হাসিতে বলল, "জি, বেগম।"
মিরা একরাশ শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে বলে উঠলো, "আমার ইচ্ছেগুলো না সব সিনেমেটিক।"
"হোক, বলো জান। কী ইচ্ছে?"
মিরা ধীরে ধীরে কারানের বুকে আঙুল দিয়ে চাপ দিতে দিতে বলল, "টাইটানিক মুভির ওই সিনটা ট্রাই করি? ওই যে, দুজন হাত ছড়িয়ে দাঁড়ায়..."
"আচ্ছা, যেদিন জাহাজে ভ্রমণে নিয়ে যাব, সেদিন করব। বিশাল নীল জলরাশি, হাওয়ার মাঝে তুমি আর আমি হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুহূর্তটা উপভোগ করব।"
মিরার মুখভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গেল। ভ্রূ কুঁচকে বলল, "না, এখনই।"
"এখন? কীভাবে?"
"ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। ঠিক রোজের মতো হাওয়ার তালে উড়বে আমার ড্রেস। তুমি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর তোমার দুই হাতে আমাকে জড়িয়ে রাখবে। কোনো জাহাজ লাগবে না।"
এবার কারানের মুখাবয়ব গম্ভীর হয়ে উঠল। তার চোখের মাধুর্য মিলিয়ে গিয়ে একরাশ উদ্বেগ জেগে উঠল। ভারী স্বরে বলল, "আমি এত তাড়াতাড়ি ম'রতে চাই না, সোনা। অনেক কাজ বাকি, তোমার সঙ্গে অনেক স্বপ্ন দেখা বাকি।"
 "ধুর! ম'রবে কেন? চারপাশে শক্ত টেম্পারড গ্লাসের রেলিং আছে তো, কিচ্ছু হবে না। প্লিজ, চলো না হানি।"
"না, জান। জানোই তো, আমার অ্যাকরোফোবিয়া আছে। কি দরকার জেনেশুনে বিপদে পা বাড়ানো।"
"প্লিজ, কারান।"
কারান কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলল। গলা খানিকটা চড়িয়ে বলল, "তোমার এই বাচ্চামো স্বভাবটা কবে যাবে, মিরা? একটা কথা বললে বোঝো না কেন?"
কারানের মুখভঙ্গি ছিল কঠোর, কথাও কাটা কাটা। যা দেখে মিরার ঠোঁট থেকে হাসি মুছে গিয়ে মুখশ্রীতে একটুকরো অভিমান জমলো। তবুও মিরা থামল না। হঠাৎ করেই সে এগিয়ে এসে কারানের গালে একটা চুমু আঁকল। লাজুক হেসে বলল, "যেদিন আমাদের বাচ্চার আগমন হবে, সেদিন আমার বাচ্চামো শেষ হবে। এবার চলো।"
চোখে দুষ্টুমির ঝলক নিয়ে সে কারানের হাত টেনে হাঁটতে শুরু করল। কারান গভীর নিশ্বাস ফেলে কপাল কুঁচকে বলে উঠলো, "তুমি আমার কথাগুলো সিরিয়াসলি নিচ্ছো না, মিরা।"
কিন্তু মিরা তখন ছাদের দিকে এগিয়ে চলেছে। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসল, "তুমি শুধু উপরের দিকে তাকিয়ে থেকো। আমি তো আছিই, কিছুই হবে না।"
তার চোখে ছিল বিশালতার খিদে, আকাশ ছোঁয়ার অনিঃশেষ স্পৃহা। ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে মিরা দু’হাত বাতাসের দিকে প্রসারিত করল। তার চুলগুলো প্রলয়ঝড়ের মতো হাওয়ায় ছুটে বেড়াল, ড্রেসের প্রান্তগুলো পাখার মতো উড়ছিল।
কারান বুকের গভীর গহ্বর থেকে এক টান দিয়ে শ্বাস নিল। তার পা চলতে চাইল, কিন্তু মনের অতলে হিমস্রোতের মতো ভয় গুঁড়িয়ে দিল সাহসকে। তবুও সে মিরার দিকে এগিয়ে গেল। কারান দ্বিধা নিয়ে পেছনে দাঁড়াল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সজাগ করার চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটি চিৎকার ভেসে এলো, "কারাআআআআন!"
মিরার পা পিছলে গেছে। কারান চোখ মেলে তাকাল। তার হৃৎকম্পন যেন র'ক্তে আগুন ধরিয়ে দিল, মাথার ভেতরে যেন সহস্র গ্রেনেড একসাথে ফেটে পড়ছিল।
ঠিক ততটাই বিভ্রান্ত আর বিস্ময়ে কারানও চিৎকার করে উঠল, "মিরাআআআআ!"
তার চিৎকার ছাদ ভেদ করে আকাশে মিলিয়ে গেল। দূরের রাস্তায় এক কুকুর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। যেন সে-ও বুঝে গিয়েছে, কিছু একটা ভয়াবহ ঘটেছে।
ওদিকে শেফ ঠিক সেই মুহূর্তে পরবর্তী খু*নের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। টেবিলের ওপর সাজিয়ে নিচ্ছিল একেকটি সরঞ্জাম। হাতে একটা চামড়ার দস্তানা পরতে পরতে সে হঠাৎ চমকে উঠল। কারান ও মিরার ভয়ানক চিৎকার ল্যাপটপ স্ক্রিন ছাপিয়ে সরাসরি তার স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করল। শেফ হঠাৎ স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার চোখ ছানাবড়া, ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেছে। সেও চিৎকার করল, "ব্ল্যাকরোওওওজ..."
_______
কয়েকদিন আগের এক বিকেলের কথা।
থানার দেয়ালের রং বহুদিন আগেই উঠে গেছে। কোনায় লালচে পানের ছোপ আর বিড়ির ছাইয়ের স্তূপ পড়ে ছিল। সিলিং ফ্যান বেকায়দায় ঘুরছিল, অথচ ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া বাতাস একদম নেই। দূরে ডিটেনশন কক্ষে হাতকড়ার ঠকঠক শব্দ ধরা দিচ্ছিল। 
ক্লান্তি ও হতাশায় ভারাক্রান্ত শাহানার দেহ ঘামের জলে ভিজে উঠেছে। তার বয়স তেমন বেশি নয়, হয়ত পঁচিশের মুখোমুখি। মুখ শুষ্ক, চোখগুলো ফোলা এবং ঝিমধরা। বোঝা গেল, টানা দু-তিন রাতের অনিদ্রা ও চোখের জল তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। ওড়না শ্লথ হয়ে গলা থেকে সরে গেছে। 
থানার এক কোণে দাঁড়িয়ে বারবার অনুনয় করে কাঁপা কণ্ঠে সে বলল, "আমার মালকিনকে খুঁজে দিন, স্যার। উনি গর্ভবতী ছিলেন। আমার মালিক বিদেশে, উনি ফিরে এলে আমাকে আস্ত রাখবেন না। আমার মালকিন রেহেনুমা ফরিদকে খুঁজে দিন। স্যার, দয়া করে খুঁজে দিন। আপনাদের পায়ে পড়ি, খুঁজে দিন ম্যাডামকে।"
পলাশ অনেকদিন ধরে এই দৃশ্যের সাক্ষী। শাহানার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও তার অন্তর আগুনের মতো জ্বলে উঠছিল, কারণ সে এই কয়দিনে শাহানার জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তের কথাগুলো শুনেছে।
গলায় আকুতি নিয়ে প্রতিদিন সে থানায় আসে। কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বরে দম প্রায়ই ফুরিয়ে যায়। চোখের আতঙ্ক প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। অথচ মেয়েটির অসহনীয় আর্তনাদের প্রতিদিনের দৃশ্য আমান দেখেও দেখে না। 
আমান ডেস্কে বসা অবস্থায়ই শাহানার দিকে লালসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু নিজেকে কঠিনভাবে সামলে রেখেছে। এই মুহূর্তে তার আঙুলে লেগে থাকা সিগারেটের দাগ ঘষে ঘষে তুলছিল। সামনে রিপোর্ট, তদন্তের দলিলের কাগজ ছড়ানো। আমান হঠাৎ চোখ তুলে বলল, "আজকেও কিছু হয়নি। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে সময় লাগে, বুঝলেন তো? আপনি বরং এখন বাড়ি যান।"
শাহানা তার পানে চেয়ে থাকল। এই মানুষের মুখে কোনও সহানুভূতি নেই, নেই একটুও আশ্বাস। 
সেই মুহূর্তে থানার এক কোণে একটা মশা মারার ব্যাট গোঁ গোঁ শব্দ তুলে জ্বলতে থাকল। আমান তখনও নির্বিকার ভঙ্গিতে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। ঠোঁটে সেই চিরচেনা বিদ্রুপের রেখা নিয়ে বলল, "সব কিছু তো নিয়ম মেনেই চলে, তাই না? কেসগুলো তাড়াহুড়ো করলে ভুল হয়। তবে কেউ যদি... একটু কৃতজ্ঞ হয়, কিছু ব্যবস্থা আমি নিজেই দেখে নিতে পারি।"
পলাশ বুঝল, এই লোকটা প্রতিদিনই শাহানার দুঃখকে পুঁজি করে নিজের হাতভরে টাকা নিচ্ছিল। এমন সময় তার মস্তিষ্কে বেমক্কা ঝাঁকুনি দিয়ে ফিরে আসল সেই ভয়ানক সন্ধ্যা।
সেদিন দুপুরে শাহানা এসে থানায় রিপোর্ট দিয়েছিল। আর ঠিক সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে, শহরের এক ফাঁকা গলির ডাস্টবিনে পাওয়া যায় একটা নারীর র*ক্তাক্ত কা*টা যৌ*না*ঙ্গ। কা*টা অংশে র*ক্ত দিয়ে লেখা ছিল OWL।
প্রথমে সবাই ধরে নিয়েছিল, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে হয়ত OWL নামক সেই বিকৃত মানসিকতার সিরিয়াল কি*লার ধরে নিয়ে এমন ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু পরের দিন ফরেনসিকের ডিএনএ রিপোর্টে দেখা গেল, ওই কাটা অংশটি শাহানার মালকিন রেহেনুমারই। খুব সম্ভবত গর্ভস্থ সন্তানসহ তাকে নির্মমভাবে হ*ত্যা করা হয়েছে।
তবু আমান প্রতিদিনই শাহানাকে মিথ্যে আশ্বাসে ফিরিয়ে দিত। 
আজও ঠিক তাই করল। তবে আজ আর শাহানা বাড়ি ফেরেনি। সে থানার মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে, হাত পা ছুড়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকারে বলে উঠল, "স্যার! আমার মালকিনকে খুঁজে দিন। দয়া করে খুঁজে দিন। কালকে মালিক রাশিয়া থেকে ফিরে আসবে। আমি মা'রা যাব, স্যার! আমাকে জানে মে'রে ফেলবে। আমি কি করব? হে আল্লাহ, আমি কি করব?"
তার মুখ বিবর্ণ, নাক-মুখে, গলায় কান্নার পানিতে একাকার হয়ে গেছে। চোখের নিচে দগদগে দাগ। অথচ চারপাশে পুলিশ সদস্যরা নীরব, নড়েও না। 
অমান বিরক্ত মুখে হাত তুলে এক মেয়ে পুলিশকে ইশারা করল। সে এগিয়ে আসল। তার হাত পড়ল শাহানার কাঁধে। আলেয়া নামের সেই পুলিশ মেয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, "আপনি আপনার স্যারের নামে একটা রিপোর্ট লিখিয়ে বাসায় ফিরে যান। আমরা মিসেস রেহেনুমাকে খুঁজছি। এটা সময়সাপেক্ষ, বুঝতে হবে আপনাকে।"
কিন্তু শাহানা হঠাৎ সেই মেয়ে পুলিশটার পা জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নীচু করে বলল, "ম্যাডাম... আমার মালকিনটা খুব ভালো ছিল। অনেক ভালো ছিল। তাকে খুঁজে দিন, প্লিজ। খুঁজে দিন তাকে..."
আলেয়া অবাক হয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। মুখে শিরশিরে অস্বস্তি খেলে গেল, কিন্তু সে আর কিছু বলল না।
এদিকে শাহানার এমন খামখেয়ালি, অগোছালো অবস্থা দেখে এবার আমান খেপে গেল। ডেস্কের উপর রাখা লাঠিটা তুলে একবার টঙ্ক করে মারল টেবিলে। "ওই মেয়ে, এখান থেকে যাবে নাকি অন্য ব্যবস্থা নিব? থানাকে কি তোমার বাপদাদার বাড়ি ভেবেছো? এখানে বসে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছো কেন? বের হও এখান থেকে! নাহলে তোদের মতো লোকের জায়গায় পাঠিয়ে দিব একদম!"
তার কণ্ঠের রুক্ষতায় শাহানার চোখ কেঁপে উঠল। ওড়নার ভেজা প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। 
সে থানা থেকে বের হতে উদ্যত হল। কিন্তু শাহানার শূন্য, অস্থির চোখের দৃষ্টি পলাশের চোখে এসে ধরা দিল। শাহানার হেঁটে যাওয়া দেখে বুকের মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কা র*ক্তের মতো চুঁইয়ে পড়ল। ভাঙা টেবিলঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা ছুঁই ছুঁই। এই রাতে শহরের রাস্তায়, যেখানে একের পর এক নারী নিখোঁজ হচ্ছে, সেখানে মেয়েটিকে একা পাঠানো মানে মৃ*ত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। পলাশের বুকের ভেতরটা ধক ধক করে উঠল। 
এই মেয়েটির বেদনা এত গভীর যে মধ্যরাতেও তার কান্না থামেনি। সেই বিকেল থেকে শুরু করে অবিরত অশ্রু পলাশের হৃদয়ে অনুরাগের সঞ্চার ঘটালো। তাই আজ আর সে নীরব থাকতে পারল না। সে সামনে এগিয়ে এসে বলল, "স্যার, আমি মেয়েটাকে বাসায় দিয়ে আসি। এই গভীর রাতে একলা গেলে বিপদে পড়তে পারে।"
আমান কটমট করে তাকাল পলাশের দিকে, ঠোঁটে হালকা বিদ্রুপ নিয়ে বলল, "বড় দায়িত্ববান হয়েছেন দেখছি!"
পলাশ চোখ নামিয়ে নীচু স্বরে বলল, "স্যার, যেহেতু থানা থেকে বের হয়েছে, মেয়েটা এখন যদি কোনো বিপদে পড়ে, দায় তো আমাদেরই নিতে হবে। তাছাড়া ইসহাক স্যার কাল আসবেন থানা দেখতে।"
এই নাম শুনে আমান থতোমতো খেল। তারপর দৃষ্টি খোলা দরজার দিকে ফিরিয়ে কটাক্ষ করে বলল, "যান। পৌঁছে দিন। যদিও ও মেয়ে নরকে যাক কিংবা নিজ ঘরে, আমাদের তো কিছু আসে যায় না। এখন নিজেদের বাঁচানোই আসল বিষয়।"
আমানের এমন নিষ্ঠুর, হৃদয়শূন্য রূপ দেখে পলাশের ইচ্ছে হচ্ছিল, এখনই কিছু একটা করে ফেলতে। কিন্তু ক্ষমতার সিঁড়িতে সে এখনো অনেক নিচে। গিলে ফেলতে হল অপমান, রাগ, ক্ষোভ সবকিছু। অগত্যা ঠোঁট কামড়ে স্যালুট ঠুকে বাহিরে বের হয়ে এলো পলাশ। গেট পেরোতেই থমথমে রাতের বাতাসে কেঁপে উঠল সে। থানা চত্বরের করিডোরটা আলোঝলমলে, সিসি টিভির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল কিছু আনমনা পুলিশ।
পলাশ বিড়বিড় করল, "আল্লাহ, হেদায়েত দিন আমান স্যারকে। একটুখানি মায়া দেখালে কি এমন ক্ষতি হতো? র‍্যাংকটা ছোট বলেই কিচ্ছু করতে পারছি না, এই অসহায়ত্বই শেষমেশ মানুষকে ভিতর থেকে গিলে ফেলে।"
এমন সময় তার চোখে পড়ল শাহানা। তার শরীর অবশ, সে ফোপাঁতে ফোপাঁতে ধীরে ধীরে পা ফেলে যাচ্ছে। পলাশ তার কাছে এগিয়ে গেল। গলা নামিয়ে বলল, "চলো মা, আমি তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি।"
শাহানা প্রথমে আঁতকে উঠল। ভয়ে চোখ কুঁচকে পলাশের দিকে তাকালো। তারপর চেহারা চিনে বুকে থু থু দিয়ে বলল, "স্যার, আমার ম্যাডাম কবে ফিরবেন?"
তার কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো অসহায়তা স্পষ্ট বোঝা গেল।
পলাশ দাঁতে দাঁত চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "গাড়িতে ওঠো। যেতে যেতে সব বলছি।"
মেয়েটি উভয় হাতের আঙুলে চোখের জল মুছে পদক্ষেপ নিল। পলাশের অনুগামী হয়ে থানা গেট অতিক্রম করল। বাহিরটা যেন আরও বিভীষিকাময়; বাতি নিভু নিভু জ্বলছে। এক কোণে ছিঁড়ে যাওয়া একটি বিবর্ণ পোস্টার ঝুলছে, তাতে লেখা, ‘গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে তথ্য দিন।’
পলাশ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে চুপচাপ উঠে বসল। তার পাশেই কান্নাভেজা মুখে শাহানা উঠে বসলো। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি অন্ধকার গলির বুকে যাত্রা শুরু করল। 
শাহানা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আফসোস নিয়ে বলে উঠল, "জানেন স্যার, বিশ বছর... পুরো বিশটা বছর ম্যাডাম এই বাচ্চার জন্য কষ্ট পেয়েছেন। আর এখন? এখন শেষ মুহূর্তে কেউ জানেও না উনি কোথায়!"
পলাশের গলা শুকিয়ে গেল। চোখ ছলছল করতে লাগল, তবুও শক্ত করে নিজেকে সামলে আপনমনে বলল, "যারা এটা করেছে, আমি শুধু একবার ওদের মুখটা দেখতে চাই। কতটা পশু, কতটা জা*নোয়ার হলে কেউ একটা প্রেগন্যান্ট মাকেও ছাড়ে না!" তারপর গলা আরও নীচু করে বলল, "ওদের মৃ*ত্যু যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মৃ*ত্যু হয়। যেন ওদের বুকে গলগল করে আগুনের লাভা ঢেলে দেওয়া হয়, যেন ওদের আর্তনাদে পৃথিবীর সমস্ত দরজাও কেঁপে উঠে বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ যেন ওদের উপর এমন গজব নামান, যা দেখে সব পাপী যেন ভয় পেয়ে কেঁদে কেঁদে তওবা করে। আমিন।"
অকস্মাৎ গাড়ির বাইরে অন্ধকার গলিতে কোথা থেকে একটা কুকুর ডেকে উঠল। বাতাসটা ঠান্ডা, অথচ ঘামে পলাশের হাত ভেজা। দূর থেকে ভেসে আসছিল কোনো পাগলের অস্পষ্ট আর্তচিৎকার, কিন্তু গায়ের লোম খাড়া করে দেয়।
নীরব রাতের নিরেট নিস্তব্ধতা চিরে তাদের গাড়ি ছুটে চলছিল। আকাশ আজ নিঃচন্দ্র। শাহানা জানালার বাইরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার ফ্যাকাশে ঠোঁট কাঁপছে। মাঝে মাঝে গোঙানির মতো মৃদু শব্দ শোনা গেল। 
তবে শাহানা কান্নার মাঝেই কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, তা পলাশও জানে না। সহসা কিছু একটা অবলোকন করে পলাশের ভিতর অস্থির হৃৎকম্পন তীব্র হয়ে উঠল।
দূরে কুয়াশাময় আলোয় তিনটি রহস্যময় অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রথমদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ছায়ামূর্তি, কিন্তু পলাশ নিঃসংশয়ে বুঝে নিল, এরা OWL। সেই দুর্বোধ্য, কালো হুডির নিচে অদৃশ্য মুখ, যেখানে কেবল জ্বলজ্বলে চোখ আর রক্তরঞ্জিত রামদার ঝিলিক দেখা গেল। নিঃসন্দেহে তারা শিকারের খোঁজে এসেছে। OWL-দের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত উপস্থিতি দেখে পলাশের বুকটা খচ করে উঠলো।
একদিকে গলির পাশে সারিবদ্ধভাবে বন্ধ দোকানপাট, অপরদিকে গলির মুখে একটি অর্ধভগ্ন বাতি দপ করে জ্বলে আবার নিভে যাচ্ছে।
পলাশ ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, "না... না, এখানে থামলে আমি ম'রব, মেয়েটাও ম'রবে।"
সে ভাবল গাড়ি চালিয়ে ওদের উপর দিয়েই চলে যাবে। কিন্তু OWL-দের অস্ত্রের ঝলকানি আর তাদের মৃতমানবের মতো ধীর পায়ে এগিয়ে আসা, এই দুটি দৃশ্য তার হাত কাঁপিয়ে দিল। তবে সে ভিতরে ভিতরে কাঁপলেও মনোবল শক্ত রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু অকস্মাৎ সে ঘামতে শুরু করল। ভিতরে ভিতরে কেমন যেন অতীতের ভাবনা গুলো কয়েক সেকেন্ডে ফিরে আসল।
আলী আবসার স্যারের ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীর, তার স্ত্রীর চোখ থেকে দেহের সবকিছু উপড়ে নেওয়া মৃ*তদেহ, তার সন্তানের গুম হয়ে যাওয়া—সব যেন ভয়াবহ সিনেমার দৃশ্য হয়ে তার চোখে ভেসে উঠল।
তার গলা শুকিয়ে এলো। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বিড়বিড় করে বলল, "আলী আবসার স্যারের মতো একজন ট্যাকটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের চিফ যদি না বাঁচেন, তাহলে আমি আর কি? হে আল্লাহ, আজ আমার শেষ রাত নয় তো?"
মনোবল শক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল পলাশ, তবু বুকের ভিতর ধুকপুকুনি কাজ করছিল। জীবনে অসংখ্য অপরাধী দেখেছে সে; খু*নি, ধ*র্ষক, চাঁদাবাজ এমন অভাব নেই। কিন্তু এই চক্রটা আলাদা। 
আগেও পুলিশ ফোর্সের মধ্যে কানাঘুষা চলেছে, 'OWL' নামে একটা গ্রুপ শহরের কিছু নির্জন এলাকায় সক্রিয়। কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি, কেউ দিতে গিয়েও নাকি চাকরি খুইয়েছে, বদলি হয়েছে হঠাৎ করেই। এই কেসের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার পর তদন্তকারীর পরিবারকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, এমনকি নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনাও এক-দুইবার ঘটেছে।
এসব কারণেই আমান তাদের নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন না। তার এক কথা, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম।’
শুরুতে সরকার বেশ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখন একজন সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার আলী আবসার সেই অভিযানে গিয়ে তার স্ত্রী ও মেয়েকে হারান, তখন তদন্ত একপ্রকার থেমেই যায়। তখন থেকেই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেন। হয়ত আরও কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে আজ পরিস্থিতিটা অন্যরকম হতো, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার লোকই নেই। থাকবেই বা কি করে, ভেতরে ভেতরে তো দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের সম্ভার।
পলাশ ভেবেছিল সে নিজে থেকেই একটু খোঁজখবর নেবে, কিন্তু এখন বোঝে, ওদের কাছাকাছি যাওয়া মানেই বিপদ।
এখন যেভাবে একা বেরিয়ে পড়েছে, সেটাও বোকামি ছিল। সে গাড়ি ঘুরিয়ে চলতে শুরু করল। তার মোবাইলটার চার্জও তখন প্রায় শেষের পথে।
তবু দেরি না করে একটানে মেসেজ টাইপ করতে লাগল, "হুমায়ুন, যদি আর ফিরতে না পারি, দয়া করে মিডিয়াকে জানিয়ে দিও, OWL চক্রের লোকজন আবার সক্রিয় হয়েছে। আজ রাতে এক মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে আমি পথে নেমেছি। কিন্তু এখন আর বসে থাকা চলবে না। মেয়েটাকে ওরা নেবে। থানায় তথ্য পাঠিয়ে দিব, জানি কিছু লাভ হবে না। ওদেরও ভয় লেগে যায় OWL-এর নাম শুনলে। কিন্তু আমি চুপ করে থাকব না। তুমি অন্তত চেষ্টা করো যেন আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে নিভে না যায়। তোমার উপর ভরসা রইল।"
সে টেক্সট পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন ইউনিট ৫-এ রেডিও কল করল।
"আমি কনস্টেবল পলাশ। ৩৫ নম্বর সোনাপুর সড়কে সন্দেহভাজন OWL স্পটেড। অবিলম্বে ব্যাকআপ দরকার; জরুরি অবস্থা। গাড়ির নম্বর DHA-28-0077, লোকেশন পাঠাচ্ছি। দ্রুত আসুন, দেরি করবেন ন..."
কিন্তু বাক্য শেষ হওয়ার আগেই গুলির শব্দ ছিন্নভিন্ন করে দিল নিশুতি। গাড়ির সামনের বাম চাকা মুহূর্তেই উড়ে গেল, ধাতব ছিন্নাংশ চারদিকে ছিটকে পড়ল। গাড়ি প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ভারসাম্য হারিয়ে একপাশে হেলে পড়ল। পলাশ দু’হাতে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরল।
শাহানা চোখ দুটোতে জমাট ভয় নিয়ে জেগে উঠল। আতঙ্কিত স্বরে বলল, "কিক-কি হয়েছে, স্যার?"
এদিকে অন্ধকার বিদীর্ণ করে OWL-এর সদস্যরা একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। কারও হাতে শীতল লোহার রড, কারও হাতে ধারালো চাপাতি। কারো আদল খোলা, কারো মুখাবয়ব অন্ধকারে ঢেকে গেছে। হিংস্রতায় তাদের চোখ দুটো জ্বলছিল।
পলাশ ঢোক গিললো। ভিতরের ধুকপুক শব্দটা চাপা দিয়ে ভাবল, যদি আজ তার ফেরা না হয়, হুমায়ুন যেন থেমে না যায়। কিন্তু আবারও কি একটি নারীর জীবন নিঃশেষ হতে যাচ্ছে? নাকি নিয়তির অন্ধকার এই বৃত্তে এবার ছেদ পড়বে? এই রাত কি আবারও শুধু শোক হয়ে ফিরবে, নাকি উন্মোচিত হবে প্রতিশোধের উন্মত্ত সকাল?
🍁চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন