ফন্ট সাইজ:
থিম:
জল তরঙ্গে

১ম পর্ব

লেখক: ইরফা মাহনাজ

ডিভোর্সের ৫ বছর পর নিজের প্রাক্তন শশুর বাড়ি যাচ্ছে গুঞ্জন। যাদের সাথে পাঁচ বছর পূর্বেই সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিলো আজ সেখানেই যাচ্ছে।

কারণটা সবার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকলেও গুঞ্জনের নিকট তা একদম স্বাভাবিক। গুঞ্জনের প্রাক্তন স্বামী তরঙ্গের মেহেন্দি প্রোগ্রাম আজ।
" জল তরঙ্গে 
ঝিলিমিলি, ঝিলিমিলি 
ঢেউ তুলে সে যায়!"
গানের এই দুটো লাইন কেনো জানি গুঞ্জনের নিকট বড্ড ভালো লাগে। নজরুলের লেখা এই গানটি গুঞ্জনের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। তাই খালি গলায় একটু সুর তুললো সে।
গান গাইতে গাইতে রেডি হতে থাকলো সে। আজ গুঞ্জন সাজবে। এমন ভাবে সাজবে যাতে সবার ভুল ধারণা সে পাল্টাতে পারে। যারা ভাবে ডিভোর্স হয়ে গেলেই নারী অসহায় তারা আজ দেখবে গুঞ্জনকে।
নিজেকে শেষবারের মতো আয়নায় দেখে নিলো। তখনই ভেসে এলো এক নারী কণ্ঠস্বর,
--- তাহলে ঠিক করেই ফেললি তু্ই নিজের প্রাক্তনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবি?
আয়না থেকে মুখ ঘুরিয়ে পিছনে ফিরলো গুঞ্জন। ঠোঁটের কোণে এক আত্মবিশ্বাসি হাসি ফুটিয়ে তুলে জবাব,
--- হোয়াই নট। আমি অবশ্যই যাবো। যাবো বলেই তো এতো সাজলাম।
--- তু্ই ভীষণ অদ্ভুদ রে গুঞ্জন! মেয়েরা যেসব পরিস্থিতিতে কেঁদে কুল পায় না সেসব পরিস্থিতি তু্ই দিব্যি হেসে খেলে পার করে দিস!
আলতার কথা শুনে এবারে গুঞ্জনের চেহারার নরম আদলটা পরিবর্তন হয়ে যায়। সেখানে দেখা মিলে কাঠিন্যতা। তেজি কণ্ঠে গুঞ্জন বলে উঠে,
--- দিস বুলশিট!গুলো ইচ্ছে করেই ইনভাইট করেছে। তারা ভেবেছে গুঞ্জন নামের মেয়েটা কেঁদে ভাসাবে। বাট তারা বোধহয় বুঝতে পারেনি আগের গুঞ্জন আর এই গুঞ্জন এক না 
আলতার চোখে মুখে যেনো অবাকতার খেলা করছে। মেয়েটা বিস্মিত গলায় গুঞ্জনকে প্রশ্ন করে,
--- তার মানে এগুলো সব প্ল্যান করা!
আলতার অবাক মুখটার দিকে তাকিয়ে হাসলো গুঞ্জন। হাতের আজলে ঠোঁট রেখে ফ্লাইং কিস ছুড়ে বলল,
--- ইয়েস বেবি। এখন তাহলে যাই দেখি ওদের প্ল্যান ফ্লপ হওয়ায় রিঅ্যাকশন কেমন হয়!
--- তটিনী আপু সব জানে?
হাঁটতে থাকা গুঞ্জনের পদযুগল থেমে গেলো। অনুভূতি শূন্য চোখে নিশ্চপ্রাণ গলায় শুধালো,
--- দে আর অল সেলফিশ আলতু। তটিনী আপুর নিজের স্বার্থ ছিলো বলেই সে তার ভাইয়ের গলায় আমাকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো।
--- তার মানে কি তটিনী আপু খারাপ?
--- উঁহু। সে খারাপ সেটা কখন বললাম?
--- তুই দিন দিন এমন রহস্যময়ী হয়ে যাচ্ছিস কেনো গুঞ্জ!
হাসলো গুঞ্জন। কোনো উত্তর দিলো না। দরজার পাশে থাকা শুরেক থেকে একজোড়া হিল জুতো নিলো। এটা সে আজকের প্রোগ্রামের জন্যই কিনেছে।
পুরো বিয়ের দাওয়াত দিয়েছে। ভেবেছিলো গুঞ্জন নামের মেয়েটাকে পুরো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিবে। তবে হায়! গুঁড়ে বালি। গুঞ্জনের কিছু করার আগে ওদেরই পতন ঘটাবে গুঞ্জন।
ফোঁস করে শ্বাস ফেলেই বেরিয়ে গেলো গুঞ্জন। ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো আলতা। ওকে সাবধানে যেতে বলে সে।
*************************
আলতা হলো গুঞ্জনের ফ্রেন্ড প্লাস রুমমেট। আলতার সাথে গুঞ্জনের পরিচয় স্কুল লাইফ থেকেই। ওতো ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলো না তারা দুজন।
তবে ফ্রেন্ড ছিলো আরকি। গুঞ্জন কারো সাথে খুব একটা মিশতো না। ও নিজের মতো থাকতেই পছন্দ করতো। তাই তখন সেভাবে গুঞ্জনের সাথে ওর বন্ডিং ছিলো না।
তারপর কলেজে উঠলো। সেখানে গুঞ্জনের দেখা। ধীরে ধীরে গুঞ্জন আর ওর ফ্রেন্ডশিপ ভালো হয়। তবে তখনো অতটা গভীরে না।
এরপর তারা ভার্সিটি উঠে। তখন শুনে গুঞ্জনের বিয়ে হয়ে গেছে। দুজনের ভার্সিটি আলাদা হয়। সেই থেকে তারা আলাদা।
এরপর হুট করেই একদিন আলতার সাথে গুঞ্জনের রাস্তায় দেখা। আলতাকে বাজারের জিনিস পত্রে দোকানদার ঠকাচ্ছিলো। যেহেতু আলতার বাজার নিয়ে এতো ধারণা ছিলো না তাই দোকানদার সহজেই ওকে বোকা বানাতে পেরেছে।
কিন্তু গুঞ্জন তো সংসার করেছিলো। ওর কাছে এসব বাজারের ভালো ধারণাই আছে। আর তাতেই গুঞ্জন চট করে ধরে ফেলে ব্যাপারখানা।
সেদিন গুঞ্জন আলতাকে সেই পরিস্থিতি থেকে বাঁচায়। তারপর গুঞ্জনের থেকে আলতা শুনে সে নাকি ডিভোর্স দিয়ে চলে এসেছে। বাড়িও থাকবে না আলাদা থাকবে নিজের মতো করে নিজের জীবনটা কে গড়ে তুলবে।
এ কথা শুনে আলতা গুঞ্জনকে নিজের সাথে থাকার কথা জানালে সেদিন থেকেই গুঞ্জন আর আলতা এক সাথে। এরপরই আস্তে আস্তে গুঞ্জনের সাথে ওর সম্পর্কের উন্নতি ঘটে।
আলতার পরিবার বলতে কেউ নেই। ওর মা বহু আগেই মারা যায়। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। সৎমা দেখতে পারে না। তাই জীবনের তাগিদে এই শহরে আছে। একাই এতো কাল লড়াই করে টিকে আছে সে।
গুঞ্জনের অতীত সম্পর্কে আলতা বিশেষ কিছু জানেনা। যতটুকু গুঞ্জন তাকে জানিয়েছে ওইটুকুই।
*************************
আজ পাঁচ বছর প্রাক্তনের মুখোমুখি গুঞ্জন। ফেলে আসা অতীতকে নিজের চোখের সামনে দেখে তাচ্ছিল্যর হাসি খেলে যায় গুঞ্জনের ঠোঁটের আগায়।
তরঙ্গ একদৃষ্টিতে সামনে থাকা রমণীটির পানে তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। তার ভাবসাব এমন যে সব স্বাভাবিক। নিষ্প্রভ ভঙ্গিমায় দরজা থেকে পাশে সরে জায়গা করে দিলো তরঙ্গ।
এতক্ষন পর ভারি পুরুষালি গলায় বলে উঠলো,
--- এসো। ভিতরে গিয়ে বসো।
আজ এতগুলো বছর পর অতীতের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার কন্ঠস্বর শুনে কোথাও একটা নড়ে উঠলো গুঞ্জনের ভিতর। সে তাকিয়ে দেখলো এককালের তার ব্যাক্তিগত মানুষটার পানে।
পাঁচ বছর আগের তরঙ্গ আর এই তরঙ্গের বিস্তর ফারাক। আগের সেই তরঙ্গ এতো স্বাস্থ্যবান আর পেশিবহুল ছিলো না। এই যে তরঙ্গের পরিহিত শার্ট গলিয়ে তার ম্যাসেলগুলো উঁকি দিতে যাচ্ছে।
শরীরের সাথে শার্টটা এতোটাই আটকে আছে বোধহয় ছিঁড়েই যাবে। ফর্সা গায়ের রংটা একটু চেপে গেছে। আরো ম্যানলি ভাইব এসেছে। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো গুঞ্জন।
তরঙ্গের জায়গা করা রাস্তা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো গুঞ্জন। দরজা ধরে দাড়িয়ে আছে তরঙ্গ। গুঞ্জনের শরীরটা ঝনঝন করে উঠলো।
মনে পড়ে গেলো কিছু অতীত,
বধূ বেশে গুঞ্জন দাড়ানো। লাল জামদানি শাড়ি পড়ে একদম লাল টুকটুকে বউ। চোখে মুখে তার শশুর বাড়ি নিয়ে জল্পনা কল্পনা। সে যখন কাঁপছিলো ঠিক তখনি ভরসার হাত হিসেবে তরঙ্গ গুঞ্জনের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নেয়।
চোখে চোখ রেখে নিজের সদ্য বিয়ে করা নববধূকে ভরসা দেয়। সেদিন গুঞ্জন তরঙ্গের হাত ধরেই এই বাড়ি প্রবেশ করে।
আজকেও একই পরিস্থিতি তবে একটু ভিন্নরকম! আজকেও গুঞ্জনের পাশে তরঙ্গ দাড়ানো। তবে আজ তরঙ্গ আর গুঞ্জন চেনা হয়েও অচেনা।
না আজ গুঞ্জনের হাত ধরেনি তরঙ্গ। কারণ সেই অধিকার আর নেই। অতীত থেকে ফিরে আসলো গুঞ্জন। তরঙ্গের উদ্দেশ্য শুধু ছোট্ট করে আওড়ালো,
--- থ্যাংকস।
দরজায় কলিং বেল বাজালে দরজা খুলে দেয়। তবে দরজা খোলা ব্যক্তিটি যে পাঁচ বছর আগে ফেলে আসা সেই অতীত হবে সেটা ভাবেনি।
তরঙ্গ যেহেতু কোনোরুপ রিঅ্যাকশন দেয়নি তাই গুঞ্জনও স্বাভাবিক থেকেছে। গুঞ্জন ভিতরে প্রবেশ করতেই গুঞ্জনের যাওয়ার দিকে একবার তাকায় তরঙ্গ। পলকের মাঝে আবার চোখের দৃষ্টি ফিরিয়েও আনে। দরজা লক করে সেও চলে এলো ভিতরে।
পাঁচ বছর আগে ডিভোর্স এর পরদিনই তরঙ্গ পাড়ি জমিয়েছিলো দূর সমুদ্রে। সে তো এও ঠিক করে ফেলেছিলো বাকি জীবন জাহাজেই পাড় করবে। তবে তা সম্ভব হয়নি।
গতকাল মা ফোন করে বলে যে সে গুরুতর অসুস্থ। যখন তখন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। তরঙ্গ জানি ফিরে আসে। তারপর এসে যখন দেখলো তরঙ্গের মা স্রোত একদম সুস্থ তখনই তরঙ্গের মস্তিস্ক ব্যাপারটা ধরে ফেলে।
কিন্তু দেরি হয়ে যায়। একপ্রকার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে তরঙ্গের মা জননী তাকে রাজি করায় দ্বিতীয় বারের ন্যায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে! সব মানা গেলেও গুঞ্জনকে ইনভাইট করার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না সে।
তবে এতে তরঙ্গ কিছুই করতে পারবে না। একদিকের সম্পর্কের জাল ছিড়লে কি হবে অন্য সম্পর্কের বাঁধন তো আর অস্বীকার করা যায় না। তরঙ্গের বোন তটিনীর একমাত্র ননদ গুঞ্জন।
#সূচনা_পর্ব 
গল্প ——#জল_তরঙ্গে 
লেখিকা —#ইরফা_মাহনাজ 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন