সদ্য জন্ম নেওয়া স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো। তবুও তিনি পিছুপা হোন না, তিনি নিজের কথা না ভেবে তার পরিবারের কথা চিন্তা করেন। আরও তিনটা জীবন তার হাতে। নিজের স্বপ্ন মাটিচাপা দিয়ে পরিবারের এবং ব্যবসার হাল ধরেন তিনি। অনেক পরিশ্রম করে পুনরায় আবার ব্যবসা দাড় করালেন কিন্তু অনেক লোকসান হওয়ায় সেগুলো পুষে আসতে সময় লাগবে বছর কয়েক। এভাবেই কাটতে থাকলো দিনের পর দিন। হঠাৎ এক রাতে মুনিয়া সরকারের পেইন উঠলো এবং মুনিয়া সরকার গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মুফতী সরকার কোনো রকমে প্রতিবেশি এক চাচির কাছে রেখে গেলো ছোট ভাই আনোয়ার কে।
মুফতী সাথে গেলো তার মামা মুয়ায শিকদার। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গেলো। এতো রাতে প্রাই ডক্টরই চলে গেছে। হাতে গোনা কয়েকজন ডক্টর আছে। তাঁদের ভিতর থেকে ডক্টর সামির পেসেন্টকে দেখে নার্সকে বল্লেন,,
___তাড়াতাড়ি অপারেশনের ব্যবস্হা করো। উনাকে ইমারজেন্সি অপারেশন করতে হবে। আর আপনারা চিন্তা করবেন না আমরা যথা সম্ভব চেষ্টা করবো। এখন বাকিটা সৃষ্টিকর্তার উপর।
বলেই ডক্টর সামির দ্রুত পায়ে চলে গেলেন অপারেশন থিয়েটারে। নেমে এলো ঘোর নিস্তব্ধতা। পৃথিবী যেনো থমকে গিয়েছে আজ। মুফতী সরকার বা তার মামা কেউ একটা কথাও বল্লেন না শুধু তদের নিশ্বাসের উঠা নামা বোঝা গেলো।
মিনিট ৩০ পর ভেসে আসলো একটা কান্নার শব্দ। বোঝা গেলো বাচ্চা সুস্থ মতো পৃথিবীতে এসেছে। একটু পর নার্স বাচ্চাটা কোলে নিয়ে এসে দিলো মুফতীর হাতে। মুফতী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কি অপূর্বই না হয়েছে তার বোন। ভাবতে ভাবতেই ডক্টর সামিরর কন্ঠস্বর শুনে ঘোর কাটলো মুফতী সরকারের।ডক্টর সামির বল্ল,,
___আ'ম সরি মি.মুয়ায শিকদার! আমি আপনার বোন কে বাঁচাতে পানি নি।
শব্দটা মুফতী সরকারের কানে গেলো কিনা কে যানে। পুরো হাসপাতালে নিস্তব্ধতা ভর করলো। ছোট ছেলেটা এবার সৃষ্টি কর্তার কাছে আকুল আবেদন জানালো,
__কিসের শাস্তি দিচ্ছেন আপনি আমায়। প্রথমে বাবাকে কেরে নিলেন আমি তখনো কোনো অভিযোগ করি নি। এখন আবার আম্মুকে কেরে নিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছেন আপনি। আপনি আমাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে চাচ্ছেন? আমি ভাঙ্গবো না আমি ঘুরে দারাবো।
এসব ভাবনার মাঝেই সে উপলব্ধি করলো কেউ তার কাধে হাত রাখছে। কাধে হাত রাখা লোকটা আর কেউ নয় তার মামা।মুয়ায শিকদার ভাগিনাকে শান্তনা দেওয়া ভাষা খুজে পেলেন না। অতঃপর নিরবতা ভেঙে তিনি বল্লেন
___চলো বেশি দেরি করা যাবে না তোমার আম্মুকে বাসায় নিয়ে যেতে হবে বলেই তিনি। হাসপাতালের যতো ফর্মালিটি আছে সব পূরণ করতে গেলেন।
মুফতী সরকার শুধু নিঃপলক ফেলে বোন কে দেখছেন কতোটা অভাগিনী তার বোন। অবশেষে সব নিয়ম কানন মেনে তার মাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো। সকাল ১০ টাই জানাযা শেষ করে তিনি বাসায় ফিরলেন। ছোট্র ভাই এবং বোনকে বুকে জরিয়ে রাখলেন। ছোট্ট বোনটার নাম রাখলেন আয়না সরকার। তার জন্য একটি পার্সোনাল নার্স রাখা হলো। এভাবেই ভাইদের আদরের দুলালী হয়ে বড় হতে লাগলো আয়না সরকার।
কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। এখন ব্যবসাও প্রাই মোটামুটি ভাবে আগের অবস্থানে ফিরে এসেছে। ছোট্ট ভাইটাও অনার্স ২য় বর্ষে পড়ালেখা করতিছে। ছোট্ট বোনটাও মেট্রিক পরিক্ষা দিয়েছে। এসময় ভাই এবং বোন মুফতী সরকারের কাছে আবদার করলো তাদের ভাবি লাগবে। মুফতী সরকার তাদের আবদার ফেলতে না মেরে গ্রামের একটি সহজ সরল মেয়েকে বিয়ে করলেন। মেয়েটি একদম সাদা সিধা। তার নাম জুমাইরাহ রহমান।
এভাবে কেটে গেলো আরও দুইটা বছর। বোন এখন এইচ এস সি পরিক্ষা দিয়ে ফেলেছে। এর ভিতর তার একটি মেয়েও হয়ছে তার নাম রাখা হয়েছে মাহি সরকার। আস্তে আস্তে মুফতী সরকার চিন্তাই পড়ে গেলেন তার বোনপর বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। যোগ্য জীবনসঙ্গী খুজে দিতে হবে।
হঠাৎ একদিন আহনাব চৌধুরী তার ছোট ভাইয়ের সাথে মুফতী সরকারের বোনের বিবাহের প্রস্তাব দিলেন।
ছেলে লন্ডন থেকে পড়াশোনা শেষ করে ওখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আয়াত চৌধুরী। বিয়ের পর পরিবারসহ ওখানেই থাকবে। মুফতী সরকার এতো ভালো সমন্ধ পেয়ে না করলেন না। বাড়ি এসে বনের সাথে কথা বলে বিয়ের কথা ফাইনাল করলো সে।
আগামী শুক্রবার বোনের বিয়ে। তার বুকের ভিতর ঝড় বয়ে গেলো। এতো আদরের বোনকে দূরে সরে দিয়ে সে কিভাবে থাকবে। এভাবেই তার বোনের বিয়েটা হয়ে গেলো।
২ মাস পর তাকে নিয়ে লন্ডন চলে গেলো আয়াত চৌধুরী। তারপর থেকে মাঝে মাঝে আশা পরে তবে আর আগের মতো ভাইবোন একসাথে থাকতে পারে না।
হঠাৎ কারো একটা ডাকে অতীত থেকে বেরিয়ে এলেন মুফতী সরকার। মুচকি হাসি দিয়ে তিনি ভাবলেন আজ সেই ছোট্ট বোনটা বড়ো হয়ে গিয়েছে। তার ছোট্ট মেয়েটাও বড়ো হয়ে গিয়েছে। আজ সেই ছোট্ট মেয়েটার বিয়ে।
অতঃপর বড়ো আব্বুর কোনো উত্তর না পেয়ে রিতি মতো চিল্লাই উঠেছে অহোনা সরকার। মেয়েটা খুব চনচল। এই বাড়ির সব থেকে ছোট সদস্য হওয়াই সবাই তাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। মেয়েটা এবার মেট্রিক পরিক্ষা দিবে।
চলবে............