ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাজল্লাতার মেঘ

১ম পর্ব

লেখক: Rahmatunnesa

লেখিকার নাম: রহমাতুন্নেছা

উপন্যাসের নাম: কাজললাতার মেঘ ☁️
প্রথম পর্ব
রোদের মিষ্টি আলোয় সকালের স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। রাস্তায় মানুষের চলাফেরা বেশ জমজমাট। বোরকা পরা একটি মেয়ে হেঁটে চলছে ইস্কুল পানে। বয়সটা সবেমাত্র ষোলোর কোঠায়—আজ থেকে ঠিক দুই বছর পর যার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা। 
অর্থাৎ, 
সে এখন নবম শ্রেণীতে পড়ছে। তার পুরো নাম জান্নাতুল ফেরদৌস, তবে কাছের সবাই তাকে ভালোবেসে "জানু" বলেই ডাকে!
মুখজুড়ে তার চঞ্চলতার ছাপ, মেকআপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একরাশ দুষ্টুমি আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। বোরকা পরা হলেও তার হাঁটার ধরনে আর চোখের পলকে বোঝা যায়, সে মোটেও শান্তশিষ্ট কোনো সাধারণ মেয়ে নয়; বরং ভেতরে ভেতরে ভীষণ ডানপিটে আর চঞ্চল। বান্ধবীদের সাথে সবসময় হাসাহাসি, রাস্তাঘাটে ফাজলামো করা কিংবা টিচারদের নিয়ে কানাঘুষা করা—এসব তার বাঁহাতের খেলা!
মেয়েটা সাথে রয়েছে আরও তিন-চারজন বান্ধবী। তারা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই ঘটে গেল এক অবাক করা ঘটনা।
রাস্তার মাঝখানে এসে হঠাৎ পথ আগলে দাঁড়াল একটি ছেলে। শ্যামলা গায়ের রঙের লম্বা ছিপছিপে গড়নের একটি ছেলে—যেন একটু পাটকাঠি মার্কা স্লিম! তার মাথার চুলগুলো সুন্দর কোঁকড়ানো। ছেলেটি হঠাৎ বোরকা পরা সেই মেয়েটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল এবং হাতে একটি লাল গোলাপ বাড়িয়ে দিল।
চারপাশের মানুষ থমকে গেল। বান্ধবীরা সবাই একসঙ্গে আঁতকে উঠল, "আরে! এ কী হচ্ছে!"
মেয়েটি নিজেও পলকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশে তখন পিনপতন নীরবতা। ঠিক তখনই ছেলেটি ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত রোমান্টিক সুরে কবিতার ছন্দে বলতে শুরু করল—
"তোমার চোখের ওই চঞ্চল পলকে,
হারিয়ে গেছি আমি কোনো অচিন দেশে।
বোরকার ওই মায়াবী আড়ালে লুকিয়ে কোন পরি,
তোমাকেই ভালোবেসে এ জীবন দিতে পারি।"
কবিতা শুনে মেয়েটির বুকটা হঠাৎ কেমন যেন দুলে উঠল। মেকআপ করা মুখের আড়ালে তার গাল দুটো লাল হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, "বাহ! ছেলেটা তো বেশ রোমান্টিক! আর বাহ্যিক গঠনটাও তো মন্দ না—মাশাল্লাহ, বেশ সুন্দর দেখতে! এই ছেলেটাকে তো একসেপ্ট করা যেতেই পারে!"
কিন্তু তার এই মিষ্টি ভাবনা মুহূর্তের মধ্যে চুরমার হয়ে গেল। ছেলেটি গোলাপটি হাতে রেখেই হুট করে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং এক চিলতে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে উঠল—
"সরি মিস! 
আসলে আমার বন্ধু একটা মেয়েকে প্রপোজ করবে কিন্তু সে সাহস পাচ্ছে না। ওকে একটু সাহস জোগানোর জন্য আর প্রপোজের কায়দাটা দেখানোর জন্যই আপনাকে এভাবে প্রপোজ করলাম! আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না!"
এই কথা শোনার পর মেয়েটি এবং তার বান্ধবীরা রীতিমতো কাঠ হয়ে গেল। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটির আরও পাঁচ-ছয়জন বন্ধু। ছেলেটি তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল এবং চোখের পলকে তাদের ভিড়ে মিশে সেখান থেকে হেঁটে চলে গেল।
বান্ধবীরা সমস্বরে বলে উঠল, "এসব কী হলো রে জানু! লোকটা এ কী ফাজলামো করল!"
জান্নাত তখন রাগে আর লজ্জায় গলে গিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "অশিক্ষিত একটা! আস্ত একটা বাঁদর! রাস্তায় পেয়ে আমাকে নিয়ে প্র্যাকটিস করা হচ্ছে? এত সুন্দর একটা কবিতা শোনাল, আর শেষে কিনা বলল প্র্যাকটিসের জন্য করেছে! মাথাটা চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে লোকটার! যাওয়ার আগে ওই গোলাপ ফুলটা আমাকে দিয়ে যেতে পারতো, ওই গোলাপ ফুলটা কি দিয়ে ওই মেয়েটাকে প্রপোজ করবে? ছি ছি, বাবা কি কিপটা! আমাকে গোলাপ ফুলটা দিয়ে বলতে পারতো আমি না হয় একটি চকলেট কিনে দিতাম। আমি আবার বড়লোক তো, কম দামের কাউকে কিছু দিতে পারি না!"
তবে সত্যি বলতে কী, ছেলেটা দেখতে কিন্তু বেশ মাশাল্লাহ! শ্যামলা গায়ের রঙ, একটু যেন পাটকাঠির মতো রোগা-পাতলা হলেও তার শরীরের গঠন বেশ আকর্ষণীয়। কোঁকড়ানো চুলগুলো তার কপালে এসে পড়েছিল, যা তাকে দেখতে একদম কোনো গল্পের হিরোর মতো লাগছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার সেই বাঁকা হাসিটা... সত্যি বলতে, হাসিটা বেশ মায়াবী, দেখলেই মনটা কেমন যেন একটু নরম হয়ে যায়। যাক, বেশি বর্ণনা দেওয়া যাবে না, না হলে আপনারা আবার প্রেমে পড়ে যাবেন!
যাই হোক, রাগ ঝেড়ে ফেলে আমরা আবার ইস্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ইস্কুলের গেটে পৌঁছানোর পর বান্ধবীদের সাথে শুরু হলো দুষ্টুমি আর হাসাহাসি। বান্ধবীরা বারবার সেই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে, আর জান্নাতও মেকি রাগ দেখিয়ে তাদের তাড়া করছে।
তবে সবার অজান্তে মনের একটা কোণে সামান্য একটু বিষণ্ণতাও জমেছিল। মনটা একটু খারাপ হচ্ছিল এই ভেবে যে—ইশ! ছেলেটার ওই কবিতাগুলো যদি সত্যি সত্যি আমার জন্য হতো! ছেলেটা যদি সত্যি আমাকে ভালোবেসে ওই গোলাপটা দিত, মন্দ হতো না তো!
পুরো ঘটনাটায় ছেলেটির আসল নাম তো জানা নেই। তাই জান্নাত মনে মনে তার একটা সুন্দর নাম দিয়ে দিল—"কবি সাহেব"। কারণ সে যেভাবে কবিতা শুনিয়ে প্রপোজ করেছে, তাতে এই নাম ছাড়া তাকে আর কিছু মানায়ই না!
ইস্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জান্নাত আনমনে ভাবল, আবার কি কবি সাহেবের সাথে কখনো দেখা হবে? নাকি এই সকালের নাটক এখানেই শেষ?
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর সাড়ে তিনটা। ইস্কুলের ছুটি হলো কিছুক্ষণ আগে। আজ ছিল তার জীবনের প্রথম দিন—মানে নবম শ্রেণীর প্রথম ক্লাস। কিন্তু সত্যি বলতে, প্রথম দিনটার অবস্থা একদম কপালে উঠে যাওয়ার মতো! একে তো ক্লাস নাইনে ওঠার পর কলেজের এই গ্যাঁড়াকল, তার ওপর সকালেই ওই ‘কবি সাহেব’-এর ফাজলামো—সব মিলিয়ে আজকের দিনটা তার মনের মতো মোটেও ভালো কাটেনি।
ইস্কুলের গেট পার হয়ে বান্ধবীদের সাথে বাই বাই বলে জান্নাত এখন বাড়ির পথ ধরেছে। একা একা হেঁটে যাওয়ার সময় মনে হলো, আরে মশাই! নিজের মুখেই তো পুরো পরিচয়টা ঠিকমতো দেওয়া হয়নি! 
বান্ধবীগুলোর নাম বলা হলো না, বাবা-মা বা ভাইয়ের নামও তো জানানো হয়নি! কোথায় থাকে, সেটাও তো অজানা। এভাবে পরিচয় গোপন রাখলে আপনারা চিনবেন কী করে বলুন তো? তো চলুন, আজ খোলসা করেই সব বলে দিই।
বাসাটা হলো বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার একটা ছোট্ট মফস্বল এলাকায়, যেখানে সবুজের সমারোহ। ছোট্ট এই শহরটার চারপাশটা বেশ ছিমছাম। বাসাটা খুব বেশি বড় বা রাজপ্রাসাদ নয়, আবার খুব গরিবও নয়—একেবারে নিখাদ এক মধ্যবিত্ত গোছের বাড়ি।
বাড়িটা দেখলে গ্রামের খাঁটি একটা রূপ পাবেন। টিনের বেড়া চালের একটি ঘর। চারপাশের বেড়াগুলো টিনের, ওপরের চালও টিনের আর ঘরের মেঝেটা পুরোপুরি পাকা নয়, লাল মাটি দিয়ে লেপা মাটির মেঝে! সেই মাটির মেঝেই সবসময় পরিপাটি করে গোছানো থাকে।
পুরো ঘরটা মোটে তিনটে রুমের। এর মধ্যে একটা রুমে জান্নাত একা থাকে—যেটা তার ছোট্ট রাজ্য। সেখানে তার বইপত্র, ডায়েরি আর মনের জমানো সব পাগলামির বাক্স বন্দি থাকে। দ্বিতীয় রুমটায় থাকেন তার আব্বা আর আম্মা। আর তৃতীয় রুমটায় থাকে তার বড় ভাই।
ফ্যামিলির সবার নামগুলোও এবার জেনে নিন:
আম্মা: ফাতেমা বেগম
আব্বা: মোসলেম উদ্দিন (আব্বা মানুষটা ভীষণ গম্ভীর আর কড়া প্রকৃতির। বাইরের দুনিয়ায় যত্ত বড় চঞ্চল বা বাঁদরই হোক না কেন, আব্বার সামনে গেলে একদম ইঁদুরের মতো সঁধিয়ে যায়! আব্বাকে সে ভীষণ ভয় পায়। আব্বা যখন বাড়ি আসেন, তখন দুষ্টুমিগুলো নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। সে তখন ঘরের কোণে অত্যন্ত ভদ্র, সিস্টার ও শান্তশিষ্ট টাইপের ইসলামিক মেয়ে বনে যায়!)
তবে আব্বার আড়ালে আম্মা আর ভাইয়ের সামনে শুরু হয় তার আসল রূপ! আম্মার সাথে সবসময় লুকোচুরি খেলা, রান্নার সময় একটু-আধটু জিনিস চুরি করে খাওয়া আর আম্মার বকুনি খাওয়া—এটাই তার নিত্যদিনের রুটিন।
আর সেই বড় ভাইটার কথা না বললেই নয়! তার থেকে চার বছরের বড়। ভাইয়ের নাম আরিফ। ভাইটার সাথে সম্পর্কটা হলো টক-ঝাল-মিষ্টি আচারের মতো। সে সারাক্ষণ নানা নামে পচাতে ভালোবাসে। বিশেষ করে, চুল উসকোখুসকো থাকলে বা সকালে ঘুম থেকে উঠলে সে এক লহমায় "মেসি ভূত" বলে ডেকে ওঠে!
আজকেও বাড়ি ফেরার পথে ভাইটার কথা মনে পড়ে ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি চলে এল। হয়তো বাড়ি ঢুকতেই সে বলবে, "কিরে মেসি ভূত, তোর ওই ফেসের মেকআপ কি রোদে গলে গেছে নাকি?" ভাই-বোনের এই খুনসুটি আর মারামারি ভরা মিষ্টি মুহূর্তগুলোই এই পরিবারটার আসল প্রাণ।
বোরকার আড়ালে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন মনে মনে ভাবল—সকালের সেই কবি সাহেবের হম্বিতম্বি যতই মাথা নষ্ট করুক না কেন, দিনশেষে এই মাটির মেঝের টিনের ঘরটাই তার আসল শান্তি।
দরজায় কড়া নাড়তেই রান্নাঘর থেকে আম্মার গলা ভেসে এল—"জান্নাতুল, এসেছিস রে?"
"জি আম্মা!"
জুতো খুলতে খুলতে জান্নাত মনে মনে ভাবল, আচ্ছা, ওই কবি সাহেবের সাথে কি আর কখনো দেখা হবে? নাকি সে শুধুই একটা মিষ্টি দুর্ঘটনা? দেখা যাক, কপালে কী আছে!
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন