#পর্ব_২২
#হৃদয়_প্রনয়সক্তি
#লেখিকা_আরিফা_বিনতে_মায়া
সকাল ৮টা.....
হাসপাতালের করিডোর তখন ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছে। চারপাশে হালকা নীরবতা থাকলেও তার ভেতরে লুকিয়ে আছে ব্যস্ততার শব্দ। নার্সরা সাদা পোশাকে একে একে ওয়ার্ডে ঢুকছে, কারো হাতে ওষুধের ট্রে, কারো হাতে রিপোর্টের ফাইল। এক ওয়ার্ডে রোগীর রক্তচাপ মাপা হচ্ছে, অন্যদিকে কারো ইনজেকশন দেওয়া চলছে।
এরমধ্যেই আদিবা আদিবা ধীরে ধীরে চোখ খুলতে শুরু করল। চারপাশে সাদা আলো, যন্ত্রের শব্দ, নার্সদের নরম কণ্ঠ — সবকিছু ঝাপসা মনে হচ্ছিল। মাথার পাশে স্যালাইনের বোতল ঝুলছে, মৃদু টপটপ শব্দ হচ্ছে।
তার চোখ খোলার সাথে সাথেই এক সেকেন্ড অপেক্ষা করল না। করিডোর দিয়ে বের হয়ে গেল।
আর রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে ভাবলো -
সে হসপিটালে কি করে আসলো?
হঠাৎ একটা গাড়ি তার সামনে ক্রস করে গেল, আর এতে আদিবা ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল।
একটু পরে চোখ খোলে দেখল গাড়ি থেকে একজন সুদর্শন পুরুষ নেমে আসল।
লম্বা গড়ন, প্রশস্ত কাঁধ, গভির চোখে রহস্যময় দৃষ্টি। ঘন চুল,সোজা নাক আর ঠোটের কোণে হালকা হাসি তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
সুদর্শন পুরুষটি ধীরে ধীরে আদিবার সামনে এসে দাড়াল।তার গভীর চোখ ছিল ভরসার দৃষ্টি। মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো, তারপর সে সামান্য ঝুকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল।
হালকা হাসি দিয়ে বলল,
" Hi. আমার নাম সাফাত, ' Nice to meet you.
আদিবা বোকার মত তাকিয়ে থাকলো, জীবনে প্রথম কোন ছেলে কে দেখল এভাবে হাবলার মত পরিচয় দিতে
এরপরে ছেলেটি আদিবার চোখের উপর তুরি বাজালো, তাতে ওর ধ্যান ফিরে এলো আর বলল-
" তা আমি কি করবো? আর এভাবে পরিচয় দেওয়ার মানে কি।
আরে মিস ' হ্যালো পরিচয় না দিলে তো ওই পিছনে দেখুন। এখনই আপনাকে তুলে নিয়ে যেত।
আদিবা ঠিকই দেখল পিছনে কিছু মুখোস পরিধান লোক, দেখতে কেমন অদ্ভুত।
আরে মিস ' আপনার নাম কি?
আচ্ছা আমি আপনাকে "ঝাঝবতি বলে ডাকবো। কথায় কথায় এত রেগে যান কেন?
শুনুন এখানে বেশিসময় থাকা সেফ না। আমার সাথে গাড়িতে উঠুন। না হলে কিন্তু আপনারি সর্বনাশ।
আদিবা ভেবে দেখল, এখন যদি এই লোকটির সাথে না যায়, তাহলে ও কোন বিপদে পড়তে পারে।
তাই আর দেরি না করে গাড়িতে উঠে পড়ল, আর ওদিকে সাফাত সেও উঠে গাড়ি স্টাট করল।
আদিবা অনবরত পিছন দিক দিয়ে দেখতে লাগলো, লোকগুলো তাকে ফলো করছে কিনা।
হঠাৎ এক আওয়াজে ভিমরি খেল।
কারন সাফাত বলল-
" ভয় নেই ঝাঝবতি! ওরা আসবে না, আমরা বাউন্টারির অনেক পিছনে এসে পড়েছি।
তা আপনি কি বেশি অসুস্থ , হসপিটালের ছিলেন।
আদিবা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল লোকটা কেমনে জানল? ও হসপিটালে ছিল।
আর সময় নষ্ট না করে উওর দিল—
এই যে মিস্টার, বিটকেল। আপনি কি করে জানলেন আমি হসপিটালে ছিলাম।
- আরে এত প্রেসারে কি আছে ঝাঝপতি, আপনার হাতের ক্যানালক দেখে বুঝে গেছি, আপনি কোন হসপিটাল রোগী। কাউকে কিছু না বলে, পালিয়ে এসেছেন নিশ্চয়ই।
তা মেডাম পালানোর কারন টা কি?
এই যে বিটকেল, আমি কেন হসপিটালের থেকে পালাবো শুনি। আমার কাজ শেষ তাই বের হয়েছি।
তাছাড়া রিকসা খুজার সময় তো আপনি আপনার গাড়ি সামনে নিয়ে হাজির হলেন।
এতে কি কোন দোষ নেই আপনার, যদি মরে যেতাম তখন কি হত?
- আরে এত চাপ নেওয়া কিছু হয় নি। একটু ঠান্ডা হন তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তা ঝাঝবতি কোথায় যাবেন, এড্রেস দিন পৌছে দিব।
একদম আমাকে এই নামে ডাকবে না, না হলে খবর আছে বলে দিলাম। গাড়ি থামান বলছি, আমি নামবো।
"অনবরত চিল্লিয়ে কথা গুলো বলে আদিবা
- আরে আপনাকে বেশি হাইপার হতে মানা করলাম না, তাহলে এমন করছেন কেন?
আপনি কি চান পিছনের লোক আপনাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাক।
আর তাছাড়া এখন আপনি আমার গাড়িতে, আপনি আমার দায়িত্ব, মাঝখান থেকে যদি নামিয়ে দি।পরে যদি কোন বিপদ হয়, তখন তো পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।
না বাবা এত বড় রিস্ক নিতে পারবো না। জলদি এড্রেস বলুন, আমার আবার কাজ আছে।
আদিবা যখন দেখল লোকটার কথায় নিজে ফেসে গেছে, তাই বেশি বাড়াবাড়ি না করে, বলে দিল।
আর ঐ এড্রেসে গাড়িটা কিছু টা দূরে দাড় করিয়ে হাতের ইশারা বলল-
" সো 'ঝাঝবতি, চলে আসলাম আপনার বর্তমান মুল ঠিকানা। নেমে পড়ুন।
আদিবা আর একটা শুনবে না বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
তখন পিছন থেকে আবার বলল-
"ঝাঝবতি, আগের থেকে কিন্তু বেশি ঝাঝে পরিনত হয়েছো, নিশ্চয়ই বর অনেক আদর করে। তাইনা
আমার আগের ঝাঝবতিকে পছন্দ, এই ঝাঝবতি কে না।
এই কথা বলে আর এক সেকেন্ড দাঁড়ালো না সোজা গাড়ি চালিয়ে হাওয়া।
আর আদিবা একটা ইট নিয়ে ফিক্কা মেরে বলল-
" বিটকেলের বাচ্চা, তোরে আমি দেখাইয়া নিমু। ফাজিল ব্যাটা, সব সময় আমার পিছনে লাগে।
দাড়া বলছি।
একবারে তোরে পাই, হারে হারে বুঝামু বর আদর করার কি জিনিস?
ফালতু লোক সব সময় আমার পিছনে পড়ে।
না আর দাড়িয়ে থাকা সম্ভব না, মাথা ঘুরছে।
পরে এটাকে দেখে নেব।
এখন যাই, নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলে ভালো লাগবে।
আর এক সেকেন্ড দেরি না করে সোজা বাড়ি যাওয়ার পথে হাটা ধরলো, আর ভাবলো। এখন গেলে কি না প্রশ্নউওরে সম্মুখীন হওয়া লাগে।
------------------------------------------
হাসপাতালের দৃশ্য....
ইলেকট্রিক নীরবতা, দূরে মনিটরের বীপ।
রোহার্ড বারান্দায় এসে থামে, ধীরে ধীরে ডাক্তার রুমে প্রবেশ করে, সোজা ডাক্তারের চেয়ারের সামনে বসে পায়ের উপর পা দিয়ে।
আর হাতের ইশারা করে কিছু একটা।
আর ডাক্তার তার ইশারা বুঝে, তার সামনে একটা ফাইল তুলে ধরে৷
ফাইলটা খুলার পর দেখার সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে যা ছিল সব ভেঙে ঘুরিয়ে দেয়। আর অনবরত চিৎকার করে বলতে থাকে।
" কেন তোকে আমি বারবার কাছে পেয়ে হারিয়ে ফেলি, হার্টট্রিস?"
"আমি যা সন্দেহ করি তা কেন বার বার মিথ্যে প্রমানিত হয়। কেন?
ভেবেছিলাম, এবার মনে হয় তোকে পেয়ে যাব।
কিন্তু তা হলো কই?
তোকে খোজার জন্য এতবড় গ্যাংষ্টার অর্কিডের লিডার আজ সামান্য বিজনেস ম্যানের ছদ্মবেশে রয়েছে।
শুধু তোকে কাছে পাওয়ার আশা, ছোয়ার আশা।
কিন্তু কোথায়, না পারছি ছুতে, না পারছি তোকে অনুভব করতে।
কেন যাওয়ার আগে শিখিয়ে দিয়ে গেলি না, তোকে ছাড়া কিভাবে বেচে থাকবো, আর অনভব করবো তোর নিঃশ্বাসের প্রতিটা স্বপন্হে।
কেন আমায় এমন মরন যন্ত্রনা দিয়ে, হারিয়ে গেলি, হার্টট্রিস?"
এই গুলো বলে অনবরত দেয়ালে ঘুষি মারতে লাগলো।
কিছুক্ষণে পরে দেয়ালের থেকে হাত সরিয়ে "বাকা হাসি দিয়ে মনে মনে বলল-
" চিন্তা নেই 'হার্টট্রিস! তোকে যে বা যারা আমার কাছ থেকে আড়াল করতে চাইছে। তাদের কে আমি খুব শ্রীঘ্রই আমার আসল রুপ দেখাবো।
তুই যদি সাত আসমান, সাত জমিনের নিচে থাকিস, তবুও আমি তোকে খুজে বের করবো।
কারন তুই আমার 'রেড ওয়াইন, আমার ড্রাগস, আমার আসক্ত, আমার আত্মা, সব --সব কিছু, কাউকে বুঝাতে পারবো না।
একবার কাছে পাই, সারাজীবন আমার কয়েদখানা বন্ধি করে রাখবো। কাউকে আর দেবো না তোকে।
আর বাজি সেটা সব সময় আমি জিতি, আজ পযন্ত কোন বাজিতে রোহার্ড এড্রিয়ান হারিনি।
আর তুই ব্লাডশেড, নিশ্চিত তুই হারবি। যে বাজি দিয়েছিস তা কখনো তর হবে না। সে শুধু আমার, আর আমার জিনিসের ভাগ কাউকে দি না।
না নিজের আপনজনকে, না নিজের পোশা কু*ওাদের কে।
আর আমার জিনিসের উপর কারো নজর যদি পড়ে, তাহলে তার চোখে আমি উপরে ফেলতে দুইবার ভাববো না।
"গুনতে থাক ব্লাডশেড, গুনতে থাক।
এবার যে রক্ত নিয়ে এক বাজি খেলা শুরু হবে, হয়তো তুই মরবি নয় তো আমি?
গুন, আজ থেকে তোর সময় স্টাট, আমাকে হারানো।
দেখি তোর বুকে বলির পাঠা কতখাানি?
এই বলে হসপিটালের পড়ে থাকা সোফাকে উঠিয়ে, সেখানে পায়ের উপর পা তুলে, পকেট থেকে সিগারেট বের করে মুখের মধ্যে নিয়ে, নিজের assistan কে ইশারা করে।
আর এসিস্টেন্ট লাইটার মুখের সামনে এসে সিগারেট ধরিয়ে দে, আর রোহার্ড এড্রিয়ান সিগারেট এক টান দিয়ে মুখের ভেতরে ধোঁয়া উপরে উঠিয়ে,
বাকা হাসি দিয়ে নিজের মত করে প্ল্যান করতে লাগলো।
আচ্ছা আদৌ কি যেটা ভাবছে সেটা সম্পুর্ণ ভুল প্রমানিত হবে, নাকি সন্দেহ টা সত্যি হবে কোনটা?
নাকি সামনে কোন বড় মোর আসতে চলছে দুজনের জীবনে।
নাকি রোহার্ড 'হার্টট্রিস কে পেয়েও হারিয়ে ফেলবে।
আর যদি পেয়েও যায়, তাহলে কি একে অপরেকে চিনে দুই #হৃদয়_প্রনয়সক্তি গঠবে?
নাকি দুজনে এক অপরকে না চিনতে পেয়ে ভুল বুঝে দূরে সরে যাবে।
আর আদিবা সে যে দৌটানার মধ্যে ভুগছে, তা আদৌ কি কোন সলিউশন আছে, নাকি তার উপর কোন বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
দুজনের জীবনে কোন মোড় আসতে চলছে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, আর গুনতে হবে হিসেবের খাতা। "
চলবে......