ফন্ট সাইজ:
থিম:
মাফিয়া বাঁধন দ্যা সিআইডি অফিসার

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: Ahmed Badhon
​কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
​[৬ষ্ঠ খণ্ড]
​মির্জা বাড়িতে সকালটা শুরু হলো নূরের ফোনের কর্কশ আওয়াজ দিয়ে। সকাল-সকাল এত ভোরে কার ফোন হতে পারে, তা নূরের খুব ভালো করেই জানা। তাই সে ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিল। কিন্তু ফোন তো আর মানুষ নয়, ওটা একটা যান্ত্রিক মেশিন; যা নাছোড়বান্দার মতো বারবার বেজেই চলল। অবশেষে নূরের দুই চোখের পাতা হালকা খুলল, যদিও ঘুমের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সে খাটের ওপর আলসেমি ভেঙে বসল। মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘ হাই তুলে ফোনটা রিসিভ করেই ওপাশ থেকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—
– প্রবলেমটা কী আপনার? আমি না বলেছি আমাকে একদম ডিস্টার্ব করবেন না? এরপর যদি আবার ফোন দিয়েছেন, তবে সরাসরি লকআপে পুরে থেরাপি দেব!
​কিন্তু ওপাশে থাকা ছেলেটি নূরের এই হুমকিতে মোটেও দমে গেল না। ছেলেটির নাম রিশাদ। সে নূরকে মনে-প্রাণে প্রচন্ড ভালোবাসে। নূর সিআইডিতে যোগ দেওয়ার অনেক আগে থেকেই রিশাদ তাকে পাগলের মতো পছন্দ করে। এই নিয়ে রিশাদকে কতবার যে নূর বুঝিয়েছে যে সে তাকে ভালোবাসে না, তার কোনো হিসেব নেই। কিন্তু আরমান শেখ রিশাদ একরঁকা ছেলে, নূরের জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত। নূরকে পাওয়ার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
​একবারের ঘটনা—
রাস্তার পাশে বৃষ্টির কাদা জমে জল থৈ থৈ করছিল। নূর রাস্তা পার হতে পারছিল না দেখে রিশাদ নিজের গায়ের দামি শার্ট খুলে সেই কাদার ওপর বিছিয়ে দিয়েছিল এবং নিজে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েছিল, যাতে নূরের পায়ে কাদা লেগে কষ্ট না হয়! কিন্তু নূর এতটাই কঠিন হৃদয়ের মেয়ে যে সে সেদিনও রিশাদের প্রস্তাবে রাজি হয়নি।
​নূরের এক কথা—
সে ভালোবাসা নামক এই ফালতু জিনিসে মোটেও বিশ্বাস করে না। তার কাছে এসব শুধু একটা ন্যাকামি আর সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ সে জানে, যদি সে একবার কারো মায়ায় জড়িয়ে পড়ে এবং পরে তাকে না পায়, তবে তার পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে। তাই ভালোবাসা নামক অনুভূতিটা তার কাছে অতি তুচ্ছ ও অর্থহীন।
​ফোনের ওপাশ থেকে রিশাদ আকুল হয়ে বলে উঠল, 
– এমন করছ কেন নূর? 
– তোমাকে তো আমি অনেক আগে থেকেই ভালোবাসি। প্লিজ, একবার আমার ভালোবাসাটা একসেপ্ট করো না! কতদিন ধরে তোমার পেছনে ঘুরছি বলো তো?
​– আপনি আমাকে ভালোবাসেন তো আমি কী করব? আমি কি আপনাকে বলেছি আমাকে ভালোবাসতে? এসব ফালতু টাইম পাস আমার সাথে করবেন না, ওকে? আমার ভীষণ বিরক্ত লাগে!" নূর কড়া গলায় বলল।
​– আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছি নূর, আর তো কিছু চাইনি। প্লিজ বাসনা নূর, তুমি যা বলবে আমি তাই করতে রাজি!"
​নূর কিছুটা উপহাসের সুরে বলল, 
–তাই?
–  আমি যা বলব তাই করবেন?"
​"হ্যাঁ!
– একবার বলেই দেখো না, তোমার জন্য আকাশের চাঁদটাও এনে দিতে পারি। আর তুমি ছাড়া আমি অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলেও তাকাব না, প্রমিস!"
​"তাহলে একটা কাজ করুন—
– আমাকে বিরক্ত করা ছেড়ে দিন আর নিজের চরকায় তেল দিন! কারণ কখনোই আপনি আমার মন পাবেন না, আর ওই মন জিনিসটা আমি কাউকে দেওয়ার জন্য বসে নেই। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু একজন সিআইডি অফিসার! আপনার একটুও ভয় ডর করে না?"
​রিশাদ হেসে বলল,
 – তোমার জন্য আমি সব করতে পারি নূর। সিআইডির ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। তুমি সিআইডি অফিসার হও বা রাস্তার ফকির, তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। প্লিজ আমার হয়ে যাও তুমি!"
​"ওকে, পরে দেখা যাবে। এখন ফোন রাখছি!"
​এই বলে নূর এক ঝটকায় ফোনটা কেটে দিল। লোকটা সকাল-সকাল তার সুন্দর ঘুমটাই মাটি করে দিল। এই রিশাদের কাজই হলো প্রতিদিন তাকে কোনো না কোনোভাবে বিরক্ত করা—
কখনো রাস্তায়, কখনো বা সিআইডি অফিসের গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকা। তাকে নিয়ে নূরের ভীষণ মাথাব্যথা, কিন্তু রিশাদের চোখে কোনো ভয় নেই। বিগত দুই বছর ধরে সে নূরের পেছনে এভাবেই আঠার মতো লেগে আছে।
​এসব ফালতু চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নূর ফ্রেশ হতে চলে গেল। কারণ আজ তার সিআইডি হেডকোয়ার্টারে জরুরি কাজ আছে। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে সে নিচে নেমে এল। নিচে গিয়ে দেখল তার মা তাসলিমা আক্তার আর বাবা রিফাতুল জিদান মির্জা সোফায় বসে টিভির খবর দেখছেন। মেয়েকে নাস্তা না করেই বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নামতে দেখে মা তাসলিমা আক্তার চিন্তিত মুখে বলে উঠলেন—
"কী রে নূর? 
– খাবার না খেয়েই চলে যাচ্ছিস? একটু মুখে দিয়ে যা মা। আর তোকে কতবার বলেছি রাতে জলদি ফিরবি? তোকে নিয়ে আমাদের খুব চিন্তা হয় রে!"
​নূর মায়ের পেছনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং আলতো করে মায়ের গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
 "মা! 
– এত চিন্তা করো কেন বলো তো? আমার কিচ্ছু হবে না। আমি একজন সিআইডি অফিসার! কারো এত বড় কলিজা নেই যে আমার গায়ে হাত তুলবে। আর আজ অফিসে একটা জরুরি কেস আছে, তাই জলদি যেতে হবে।"
​এবার বাবা রিফাতুল জিদান মির্জা খবরের কাগজটা রেখে বলে উঠলেন, 
"আরে নূর মা, 
– তোকে নিয়েই তো আমাদের যত চিন্তা! তুই-ই তো আমাদের একমাত্র মেয়ে। তোর যদি কিছু হয়ে যায়, তবে আমরা কীভাবে বাঁচব বল? কাজ শেষ করে জলদি ফিরে আসবি, আর এখন নাস্তাটা খেয়ে যা।"
​বাবা-মায়ের এত ভালোবাসাময় জোরাজোরিতে নূর আর না করতে পারল না। সে চুপচাপ সবার সাথে টেবিল বসে সকালের খাবার শেষ করল। তারপর নিজের মূল দায়িত্ব পালনের জন্য স্কুটি স্টার্ট দিয়ে সিআইডি হেডকোয়ার্টারের দিকে রওনা দিল।
________________>>>>><<<<<<<<<__________________
                            ☆☆☆☆☆☆☆☆☆
​অপরদিকে, জার্মানির এক রাজকীয় প্রেক্ষাপট...
​এক শান্ত অথচ ঘুমন্ত হায়নার মতো গম্ভীর হয়ে বসে আছে এক যুবক। তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে তার দুই বিশ্বস্ত ও দুর্ধর্ষ বডিগার্ড—এ
কজনের নাম অ্যালবার্ট এবং অন্যজনের নাম জোসেফ। তারা জার্মানির একটি বিলাসবহুল বড় ক্যাফেতে বসে আছে। যুবকের মুখে কোনো কথা নেই, কেবল চোখ দুটোতে জ্বলছে প্রতিশোধের এক লেলিহান শিখা। সে পরম শান্তিতে দামি সিগারেটে শেষ টান দিচ্ছে।
​হঠাৎ করেই এক সুন্দরী যুবতী দৌড়ে এসে সেই হায়নাটার সামনে দাঁড়াল। দুই বডিগার্ড তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না, কারণ তারা এই মেয়েটিকে খুব ভালো করেই চেনে। মেয়েটি এসে যুবকের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ অভিমানী সুরে বলল—
"বাঁধন! 
– তোকে আমি এত ভালোবাসি, অথচ তুই আমাকে একটুও গুরুত্ব দিস না কেন রে? আমি কোন দিক দিয়ে পারফেক্ট নই, একটু বলবি?"
​মেয়েটির নাম নীলিমা। তার বাবা জার্মানির একজন নামকরা ও অত্যন্ত প্রভাবশালী বড় ব্যবসায়ী। নীলিমা ছোটবেলা থেকেই বাঁধনের বান্ধবী এবং তার সাথেই বড় হয়েছে। কিন্তু বাঁধন জন্মগতভাবেই চরম গম্ভীর ও রহস্যময় স্বভাবের, সে কারো সাথেই অতিরিক্ত কথা বলে না। বড় হওয়ার সাথে সাথে নীলিমা এই পাথর হৃদয়ের ছেলেটির প্রেমে পড়ে যায়। হাজারবার প্রপোজ করার পরও বাঁধন কোনোদিন তার প্রস্তাবে রাজি হয়নি, উল্টো তাকে এড়িয়ে চলে। বাঁধন যত কম কথা বলে, ততটাই তার ডন ইমেজের জন্য ভালো।
​হ্যাঁ, এই শান্ত ছেলেটিই আজ জার্মানির আন্ডারওয়ার্ল্ডের মুকুটহীন সম্রাট—মোস্ট ওয়ান্টেড মাফিয়া বাঁধন! যার এক নামে পুরো ইউরোপ কাঁপে। যাকে দেখলে বড় বড় অপরাধীরাও মাটির নিচে লুকিয়ে পড়তে চায়। কারণ তারা জানে, বাঁধনের শত্রুদের কোনো ক্ষমা নেই; সে জ্যান্ত মানুষকে কবরে পুঁতে ফেলতেও দ্বিতীয়বার ভাবে না।
​নীলিমার এত আবেগী কথার জবাবে বাঁধন সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে মাত্র একটা বাক্য বলল—
"আই ডোন্ট লাইক ইউ।"
​বাঁধনের পাশে বডিগার্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা জোসেফ আর অ্যালবার্টকে দেখে নীলিমা রাগে ফেটে পড়ল। সে নিজের ক্ষোভ ঝাড়ার জন্য বডিগার্ডদের উদ্দেশ্যে বলল, 
— তোরা দুটো মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন রে? দুইটা চামচা কোথাকার! এখান থেকে দূর হ। দেখছিস না আমরা পার্সোনাল কথা বলছি? তোদের এখানে কী কাজ?"
​তাদের দুজনের মধ্যে অ্যালবার্ট বুক ফুলিয়ে বলে উঠল,
 – আমরা শুধু ভাইয়ের অর্ডার ছাড়া এক পা-ও নড়ি না। আপনিই বরং এখান থেকে ভাগুন! সারাক্ষণ ভাইয়ের পিছু পিছু ঘুরঘুর করেন!"
​অ্যালবার্টের মুখে এই কথা শুনে নীলিমা পুরো রাগে ফায়ার হয়ে গেল! সে আর নিজের হাত সামলাতে না পেরে অ্যালবার্টের মাথায় কষে একটা থাপ্পড় মারল এবং তাকে মারতে মারতে বলল, 
– কী বললি তুই আমাকে? আমি ওর পিছু পিছু ঘুরি? তোর এত বড় সাহস! তুই একটা বডিগার্ড শালা, স্টুপিড, ননসেন্স কোথাকার!"
​ক্যাফেতে নীলিমার সাথে বডিগার্ডদের এই ঝগড়া কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিদিনই নীলিমা এসে এভাবে জোসেফ আর অ্যালবার্টের সাথে তুলকালাম কাণ্ড বাধায়। আর প্রতিবারই বাঁধনের ধমক খেয়ে তাকে চলে যেতে হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
​বডিগার্ডদের ওপর নীলিমার চিল চিৎকার শুনে বাঁধন এবার মারাত্মক রেগে গেল। সে জোরে টেবিলের ওপর একটা থাপ্পড় মেরে সিংহের মতো গর্জে উঠল—
– "আই জাস্ট সেড শাট আপ!
অ্যান্ড নাও গো, নীলিমা!"
​বাঁধনের এই রুদ্ররূপ দেখে নীলিমা এবার একটু দমে গেল, কিন্তু যাওয়ার আগে রাগে ফায়ার হয়ে বলল,
 "যাচ্ছি যাচ্ছি! 
– তোর এই বডিগার্ড দুটোকে আমি পরে দেখে নেব। আর তোকে তো আমি ভালোবেসেই ছাড়ব, দেখে নিস!"
​এই বলে নীলিমা আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে হিল জুতো খটখট করে রাগে কাঁপতে কাঁপতে ক্যাফে থেকে চলে গেল। নীলিমা চলে যেতেই বাঁধন তার চেয়ার ছেড়ে উঠল। সে তার দামি গোল্ডেন মার্সিডিজ গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে জোসেফ আর অ্যালবার্টকে ইশারা করল। তারা দুজন ভাইয়ের পেছনে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিল এবং গাড়িটি এক ঝটকায় হাইওয়ের দিকে রওনা দিল। বাঁধনের চোখের সেই শীতলতা যেন ইঙ্গিত দিচ্ছিল, সামনে বড় কোনো ঝড় আসতে চলেছে!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন