ফন্ট সাইজ:
থিম:
মাফিয়া বাঁধন দ্যা সিআইডি অফিসার

২৭তম পর্ব

লেখক: Ahmed Badhon
​কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
​[২৭তম খণ্ড —
​পায়ের কাটা জায়গা থেকে অনবরত তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। প্রতি পদক্ষেপে যেন শত শত বিষাক্ত সুঁচ এক সাথে ফুটছিল নূরের শরীরে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নূরের পায়ের তেজ আর দৌড়ের গতি দুটোই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা কমে এসেছিল।
​আর ঠিক সেই অসহায়ত্বের সুযোগটাই হাতছাড়া করল না পেছনের সেই হিংস্র, রক্তচক্ষু নেশাখোর লোকটা!
​এক বিশাল লাফ দিয়ে সে নূরের একদম ঘাড়ের কাছে চলে এল। নূর নিজেকে সামলে নেওয়ার কোনো সুযোগ পাওয়ার আগেই, লোকটা নিজের থাবার মতো খসখসে হাত বাড়িয়ে সজোরে নূরের মাথার একমুঠো চুল শক্ত করে চেপে ধরল!
​— হ্যাঁচকা টান!
​টানের চোটে নূরের মাথা পেছনের দিকে খাড়া হয়ে গেল, গলার নালী টানটান হয়ে তীব্র যন্ত্রণায় বুক ফেটে গেল। কিন্তু অনবরত গালিগালাজ করতে থাকা লোকটার তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। সে নূরের চেহারার কাছে নিজের মদ আর সিগারেটের দুর্গন্ধযুক্ত মুখটা এনে অত্যন্ত বিশ্রী, জঘন্য ভাষায় গালি দিতে দিতে বিকট উল্লাসে গর্জে উঠল—
​"খানকি! অনেক দৌড়াইছিস না রে?! অনেক জ্বালাইছিস আমাদের! আজ তোদের মতো রূপসী মায়াদের অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেব! দেখব আজ তোকে বাঁচাতে কোন মাফিয়া বা কোন সিআইডি আফিসার আসে! আজ তোদের কপালে কী আছে তা তুই ভাবতেও পারবি না!"
​এক হাতে নূরের মাথার চুল মুচড়ে ধরে রেখে, অন্য হাত বাড়িয়ে ধড়ফড় করে ওঠার চেষ্টা করা বৃষ্টিকে সজোরে ঝাপটে ধরল লোকটা। তারপর পাহাড়ের ওপরের অন্ধকারের দিকে মুখ তুলে তার বাকি সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বিকট শয়তানি কণ্ঠে চিৎকার করে বলতে লাগল—
​"এই তোরা কই রে ভাই?! তোরা জলদি নিচে নাম! দুইটা ছেমরিকেই একসাথে কায়দা করে ধইরা ফেলছি! আজ সারা রাত ডাবল ফুর্তি হইবো... আয় তোরা! আমা...
 আহাহাহাহাহ!"
​লোকটি তার বাকি নোংরা ও হিংস্র কথাগুলো শেষ করার আর কোনো সুযোগই পেল না!
​মৃত্যুর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নূরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা এক হিংস্র বাঘিনী যেন জেগে উঠল। তীব্র যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতেই নূরের হাত চলে গেল পিচঢালা রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একখানা ধারালো, ভারী ভাঙা ইটের ওপর। সিআইডির স্পেশাল ক্লোজ-কমব্যাট আর সেলফ-ডিফেন্সের ট্রেনিং নূরের রগে রগে বইছে। সে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি, রাগ আর বাঁচবার অদম্য আকুতি এক করে, পিছন ফিরে না তাকিয়েই সেই ধারালো ইটখানা লোকটার কপাল আর চোখের সংযোগস্থলে সোজা আছড়ে মারল!
​— ঠাসসস! ফিনকি দিয়ে উঠল রক্ত!
​মরণঘাতী ইটের প্রচণ্ড আঘাতে লোকটার চোখের চামড়া ফেটে মাংস বেরিয়ে এল, আর ঘিলু নাড়িয়ে দেওয়া ব্যথায় সে আর্তচিৎকার করে উঠল—"
আআআআহহহ! আমার চোখ! আমার চোখ গেল রে!"
​লোকটা এক মুহূর্তের মধ্যে নূরের চুল ছেড়ে দিয়ে নিজের রক্তে রাঙানো মুখে দুই হাত চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে পাকা রাস্তায় আছড়ে পড়ল।
​নূর এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ও নষ্ট করল না। সে মাটিতে আতঙ্কে জমে যাওয়া বৃষ্টির হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তুলে দাঁড় করাল। নূরের নিজের ডান পা থেকে তখনো টপটপ করে রক্ত ঝরছে, কিন্তু সেদিকে তাকানোর সময় বা মানসিকতা নূরের ছিল না। সে বৃষ্টিকে নিয়ে পুনরায় কালকূট অন্ধকারের মধ্যে দৌড় শুরু করল।
​দৌড়াতে দৌড়াতে নূরের হাঁপাতে থাকা কণ্ঠ থেকে যেন আগ্নেয়গিরির উত্তাপ বের হচ্ছিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে পাশের কান্নাভেজা বৃষ্টিকে উদ্দেশ করে বলতে লাগল—
​"আজ আমাদের বাঁচানোর মতো এই অচেনা পাহাড়ে আর কেউ নেই রে বৃষ্টি! সিআইডি টিম, আমাদের সহকর্মী বা আমাদের পরিবার—কেউ জানে না আমরা কত বড় বিপদের মুখে আছি! আমাদের নিজেদের প্রাণের এই শেষ লড়াই আজ আমাদের নিজেদেরই লড়তে হবে! যা কিছু হয়ে যাক
, মন শক্ত রাখ আর পা থামাবি না... শুধু পা চালিয়ে যা!"
​দীর্ঘ সময় ধরে লাগাতার মৃত্যুর মুখ থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে দুজনেই চরম ক্লান্তিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। ফুসফুসে বাতাস নেওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, বুক ফেটে যেন শেষ নিঃশ্বাসটুকু বেরিয়ে যেতে চাইছে। শরীরে অগুনতি কাটাছেঁড়ার দাগ, ডালপালার আঁচড় আর নূরের ডান পা বেয়ে অবিরাম গলগল করে বের হওয়া রক্তে সিআইডি ইউনিফর্মের নিচের অংশ পুরোপুরি লাল হয়ে ভিজে একাকার!
​প্রতি পদক্ষেপে নূরের ডান পায়ের কাটার জায়গায় যেন জ্বলন্ত আগুন ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল। তবুও নূরের অদম্য জেদ আর মানসিক শক্তির কাছে সেই শরীরী যন্ত্রণা হার মানতে বাধ্য হচ্ছিল।
​পাশে দৌড়াতে থাকা বৃষ্টির চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসছিল। সে আর সহ্য করতে না পেরে হাঁপাতে হাঁপাতে একদম ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলে উঠল—
​"নূর... আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে রে! বুকটা কেমন খালি হয়ে যাচ্ছে... আমি আর পারছি না! যেকোনো সময় হয়তো জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ব! আজ মনে হয় আমাদের কেউ বাঁচাতে পারবে না... এই নরপশু গুন্ডারা আমাদের ধরে ফেললে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে রে নূর!"
​নিজের শরীরের অসহ্য যন্ত্রণার মাঝেও বৃষ্টির এমন আশাহীন কথা শুনে নূরের চোখ থেকেও দুই ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সিআইডি অফিসার নূর কখনো পরাজয় মেনে নিতে শেখেনি! সে নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে বৃষ্টির বরফের মতো ঠান্ডা হাতটা আরও শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে গলার শেষ জোর দিয়ে বলল—
​"একদম চুপ কর বৃষ্টি! ওপরের মহান আল্লাহকে ভরসা কর! যতক্ষণ বুকে শেষ নিঃশ্বাস আছে, ততক্ষণ হাল ছাড়বি না! আল্লাহ চাইলে এই নরক থেকেও আমাদের বের হওয়ার রাস্তা তৈরি করে দেবেন! আর শোন... আজ যদি আমাদের মরা লিখাই থাকে, তবে নিজেদের ইজ্জত আর সিআইডি অফিসারদের সম্মান বাঁচিয়ে বীরের মতো লড়ে মরব! কিন্তু এই নোংরা পাহাড়ি কুকুরের মতো জংলিদের সামনে নিজেদের সঁপে দিয়ে হার মানব না! চল আমার সাথে!"
​সারি সারি প্রকাণ্ড পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া এই আঁকাবাঁকা নির্জন রাজপথ। দিনের আলোতে চট্টগ্রামের এই পাহাড়ি এলাকাগুলো চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো সুন্দর দেখায়—মনে হয় এক পাহাড়ি টিলা যেন ভালোবেসে হেলান দিয়ে আছে আরেক প্রকাণ্ড পাহাড়ের গায়ে! কিন্তু রাত আড়াইটার এই ভয়ঙ্কর চাঁদহীন ঘুটঘুটে অন্ধকারে সেই পাহাড়গুলোই যেন একেকটা বিশালকায় খিদে পাওয়া রাক্ষসের রূপ ধারণ করেছে! চারপাশের পরিবেশ এতটাই ছমছমে আর থমথমে যে কোনো মানুষের উপস্থিতি তো দূরের কথা, আলোর কোনো ক্ষুদ্রতম কণাও নজরে পড়ে না।
​যেখানে কোনো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা একদম শূন্য, সেখানে কেবল নিস্তব্ধ পাহাড়ের বুকে জমাট বাঁধা হাহাকার আর দূর-দূরান্ত থেকে ভেসে আসা হাজারো ঝিঁঝিঁ পোকার বিকট একঘেয়ে আওয়াজ পাড়ার নীরবতাকে আরও ভয়াল করে তুলছে। তারা চট্টগ্রামের ঠিক কোন পয়েন্টে আছে, সীমান্ত এলাকা কতদূরে, কিংবা এই পাহাড়ের শেষ কোথায়—তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নূরের মাথায় ছিল না।
​এদিকে চোখের সামনে তাদের সঙ্গীকে নূরের হাতে রক্তাক্ত হতে দেখে পাহাড়ি টিলার ওপর থাকা বাকি ৬-৭ জন হিংস্র গুন্ডা ক্ষোভে ও উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে গেল! তারা হাতের রামদা, লাঠি আর পাহাড়ি দেশি পিস্তল উঁচিয়ে বিকট গালিগালাজ করতে করতে পাহাড়ি খাঁদ বেয়ে সোজা পিচঢালা রাস্তার দিকে ঝড়ো গতিতে নেমে আসতে শুরু করল।
​তাদের হিংস্র হুংকার আর ভারী বুটের দাপাদাপি শুনে নূর বুঝতে পারল—আর বেশি সময় তাদের হাতে নেই। নূর তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি খাটিয়ে সোজা পাকা রাস্তা ধরে দৌড়ানো বন্ধ করে দিল। কারণ সে জানে, পিচঢালা দীর্ঘ সোজা রাস্তায় দৌড়ালে গুন্ডারা অনায়াসেই তাদের গতিপথ চিনে ফেলবে এবং কিছু দূর এগিয়েই ঘিরে ফেলবে।
​তাই নূর সোজা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে হাতের ডান পাশে থাকা খাড়া, দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল ও কাঁটাঝোপের ভেতর বৃষ্টিকে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল!
​ঘন গাছগাছালি, বিষাক্ত ডালপালা আর পাথুরে খাদের ভেতর দিয়ে পথ করে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সামান্য ভুল পদক্ষেপ মানেই সোজা হাজার ফুট নিচের খাদের পাথরে আছড়ে পড়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুঁড়ো হয়ে যাওয়া! একদিকে রক্তাক্ত শরীর, অন্যদিকে নিশ্বাস আটকে আসা ক্লান্তি—সব মিলিয়ে এই কালকুটে রাতে ঘন পাহাড়ি জঙ্গলে আত্মগোপন করে প্রাণ বাঁচানো ছাড়া নূর আর বৃষ্টির কাছে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন