ফন্ট সাইজ:
থিম:
মাফিয়া বাঁধন দ্যা সিআইডি অফিসার

২৯তম পর্ব

লেখক: Ahmed Badhon
​কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
​[২৯তম খণ্ড —
​অন্ধকার পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতর গাছের গুঁড়িতে শরীর ঠেকিয়ে ফোনটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরেছিল নূর। ওপাশ থেকে বাঁধনের অস্থির আর ব্যাকুল গলার আওয়াজ পেতেই নূরের বুক চিরে কান্না উথলে উঠল। ভাঙা, কাঁপাকাঁপা গলায় কান্না জড়ানো সুর তুলে সে বলে উঠল—
​"প্লিজ মাফিয়া... আমাকে বাঁচান! ওরা... ওরা তো আমাকে আর বৃষ্টিকে মেরেই ফেলবে! আমার সাথে আমার বান্ধবীও আছে। আমি... আমি আর জীবনে আপনার অবাধ্য হব না, কোনো দিন আপনার কথা অমান্য করব না! প্লিজ, এবারের মতো আমাকে বাঁচিয়ে নিন... প্লিজ!"
​কথাগুলো বলতে বলতে নূর আর কান্না চেপে রাখতে পারল না। ঝোপঝাড়ের অন্ধকারের মধ্যে সে ছোট বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
​শত শত মাইল দূরে জার্মানির ভিলার স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে নূরের এই ভয়ার্ত আর অসহায় কান্না শুনে বাঁধনের মাথার রগগুলো মুহূর্তের মধ্যে ফুলে উঠল! তার চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এল। চারপাশের সবকিছু থমকে গেছে, আর নূরের সেই কান্নাভরা আকুতি বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল বাঁধনের মস্তিষ্কে!
​নূর ঝোপের আড়ালে ভয়ে নিজের শরীরের ছেঁড়া সিআইডি ইউনিফর্মে ফোনটা চেপে ধরে রেখেছিল, যাতে ডিসপ্লের আলো বাইরে থেকে জংলিগুলোর চোখে না পড়ে। তবে বাঁধন ঠিকই অনুধাবন করতে পারছিল তার ছোট ইঁদুরের বাচ্চাটা কত বড় মহাবিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
​একদিকে নূরের এই অবস্থা, অন্যদিকে নিজের ওপর চরম রাগ হচ্ছিল বাঁধনের! সে তো বাংলাদেশে একজনকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছিল নূরের ওপর ছায়ার মতো নজর রাখতে। সে থাকতে কীভাবে নূরের এই অবস্থা হলো? কোন সাহসে এরা তার বউয়ের দিকে হাত বাড়ানোর দুরাশা করল?
​রাগে-ক্ষোভে বাঁধনের শরীর টগবগ করে ফুটতে লাগল। বাঁধন কোনো দিন কারও কান্না সহ্য করে না, আর নূরের কান্না মানে তো পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! বাঁধনের রাগের মাত্রা এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে সে জার্মানির স্টাডি রুমেই চিৎকার করে অ্যালবার্ট আর জোসেফের ওপর চড়াও হলো। অ্যালবার্ট আর জোসেফ চুপচাপ মাথা নিচু করে রইল—
তারা ভালো করেই জানে, বস এখন যে লেভেলের ক্ষিপ্ত হয়ে আছে, সামান্য ভুলচুক হলেও বুক চিরে গুলি চালিয়ে দিতে এক সেকেন্ডও ভাববে না!
​ফোনের ওপাশ থেকে নূরের ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ আবারও ভেসে আসতেই বাঁধন নিজের চরম ক্ষোভ চেপে ধরে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নরম করার চেষ্টা করল। নূরের প্রতি ভালোবাসায় ভরা, চিন্তিত ডন-এর সেই মৃদু গলায় ভেসে এল
​"লিসেন টু মি নূর... শান্ত হও! আগে আমাকে বলো তুমি ঠিক কোথায় আছো? আশপাশের পরিবেশ কেমন? চারপাশটা ভালো করে দেখে আমায় সব বলো! লোকেশন বা চিহ্ন যা দেখতে পাচ্ছ, সব আমাকে জানাও! আই প্রমিস ইউ নূর... তোমার এই বাঁধন বেঁচে থাকতে ওই নরপশুগুলোর একটাকেও তোমার শরীরের একটা লোমও ছুঁতে দেব না! জাস্ট বিলিভ মি নূর!"
​নূর নিজের কান্না সামলাতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে আবারও বলে উঠল—
"আমি জানি না আমরা কোথায় আছি! চারিদিকে শুধুই বিশাল বিশাল নির্জন পাহাড়... কোনো বাড়িঘর নেই, আলো নেই! কেন জানি আমার মনে হচ্ছে আজ আমি আর বাঁচব না বাঁধন... আমার মনে হয় আপনার সাথে আর কোনো দিন আমার কথা বলা হবে না! আপনার কথা না শুনে, আপনাকে না জানিয়ে এভাবে সিক্রেট মিশনে এসে আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি... প্লিজ আমাকে বাঁচান আপনি, মিস্টার মাফিয়া!"
​নূরের মুখে 'মরে যাব' কথাটি শুনতেই বাঁধনের হূৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল! তার হৃদয়ের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল, মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। রক্তচক্ষু মাফিয়া ডন বাঁধন মির্জা, যে পৃথিবীর কাউকে পরোয়া করে না—আজ যেন এক নারীর অসহায়ত্ব আর ভালোবাসার সামনে নিজেকে বড্ড নিস্ব ও ব্যাকুল অনুভব করল!
​কিন্তু সে যে বাঁধন মির্জা! নূরের ক্ষতি করা মানে পুরো বাংলাদেশ কেন, পুরো বিশ্বকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া! বাঁধন নূরের ওপর রাগে-অভিমানে আর উদ্বেগে চিল চিৎকার করে উঠল—
​"প্লিজ বউ, শান্ত হও! কেঁদো না আর... আমাকে সব খুলে বলো! প্লিজ ওপেন ইউর মাউথ! আশপাশটা ভালো করে দেখো, কোনো চেনা চিহ্ন বা পাহাড়ি মাইলস্টোন দেখা যায় নাকি তা ট্র্যাক করার চেষ্টা করো! টেল মি ইউর লোকেশন!"
​কিন্তু অপর প্রান্তে থাকা নূরের মনের ভেতরে যে কী পরিমাণ আতঙ্ক কাজ করছিল, তা দূর করার মতো অবস্থা নূরের ছিল না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল—
"আপনিই বলুন, আমি তো একজন সিআইডি অফিসার! আমি নিজেই নিজের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারছি না, কোনো নেটওয়ার্ক ঠিকমতো পাচ্ছি না, তাহলে কীভাবে আপনাকে আমি সঠিক জায়গা জানাব বলুন?! আমাকে বাঁচিয়ে নিন বাঁধন... আমি আর কোনো দিন এমন ভুল করব না! কেন যে এই মিশনে আসলাম! আমার শরীরে আর এক ফোঁটা শক্তি নেই... আমার ডান পায়ে ওরা ছুরি মেরেছে বাঁধন মির্জা! প্রচণ্ড রক্ত পড়ছে..."
​'পায়ে ছুরি মেরেছে'—নূরের মুখ থেকে এই শব্দ কটি বের হওয়া মাত্রই মাফিয়া বাঁধন মির্জার মস্তিষ্কের শেষ সুস্থ রগটিও যেন ছিঁড়ে গেল!
​হাতের আধপোড়া দামি চুরুট আর গ্লাস ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে অন্ধের মতো পাশে থাকা ইটের অলঙ্কৃত করিডোরের দেওয়ালে নিজের ডান হাত দিয়ে সজোরে ঘুসি মারল!
​— ঠাসসস!
​দেওয়াল ফেটে রক্ত ছিটকে এল, বাঁধনের হাতের চামড়া চিরে গলগল করে তাজা রক্ত ঝরতে লাগল! কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। রাগে তার দুটো চোখ আগ্নেয়গিরির মতো লাল টকটকে হয়ে উঠেছে! ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে পশুদের মতো গর্জন করে উঠল বাঁধন—
​"হু দ্য হেল আর দে?! কোন কুত্তার বাচ্চা... কোন শুয়োরের বাচ্চার এত বড় সাহস যে বাঁধন মির্জার ওয়াইফের গায়ে ছুরি চালায়?! সব কটাকে আজ আমি জ্যান্ত মাটির নিচে পুড়ব! একটা পশুর লাশও মাটিতে স্থায়ী হতে দেব না!"
​পাগলের মতো গলার রগ ফুলিয়ে আবার নূরের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল—
"আর তুই! তুই বেয়াদবের চরম সীমানায় চলে গেছিস নূর! তুই ওখানে কী করছিস?! তুই আমার অবাধ্য কেন হলি বল?! জবাব দে আমাকে! আমার ধৈর্যের সাথে খেলা করছিস তুই?! তুই বুঝিস না আমি তোকে কতটা ভালোবাসি?! আমি চাইলে এই এক সেকেন্ডে তোর একটা কষ্টের জন্য পুরো বাংলাদেশকে মাটির সাথে মিশিয়ে ছারখার করে দিতে পারি! আমার রাগ আর ভালোবাসার পরীক্ষা নিবি না নূর... একদম না!"
​কথাটা বলতে বলতেই হঠাৎ করে সিগন্যাল ড্রপ করে ফোনটা 'টুট টুট' শব্দ করে কেটে গেল!
​ফোন কেটে যেতেই বাঁধনের রাগ এবার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল। সে রক্তে রাঙানো হাত উঁচিয়ে ভিলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অ্যালবার্টের উদ্দেশ্যে নরকের শয়তানের মতো আদেশ দিল—
​"অ্যালবার্ট! লিসেন টু মি! পুরো বাংলাদেশ... বাংলাদেশ আর্মি থেকে শুরু করে কমাণ্ডো, স্পেশাল ফোর্স, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সহ যত সিক্রেট ডিপার্টমেন্ট আছে—সবাইকে ইমিডিয়েট মেসেজ দে! আমার নূরকে চাই! যদি নূরের এক ফোঁটা রক্ত বিফলে যায় বা নূরকে না পাই, তবে পুরো বাংলাদেশকে আমি শ্মশান বানিয়ে দেব! ধ্বংস করে দেব সবকিছু!"
​অ্যালবার্ট জানে তাদের বস আজ কতটা ভয়ানক রূপ নিয়েছে। সে এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল—
"জি স্যার! এখনই ব্যবস্থা করছি!"
​এরপর বাঁধন ঘুরে জোসেফের দিকে রক্তচক্ষু তুলে তাকাল—
"অ্যান্ড লিসেন জোসেফ! আমার পার্সোনাল গানশিপ হেলিকপ্টার এখনই রেডি কর! আমার সব হেভি মেশিনগান আর আর্মার্ড স্কোড সাথে নে! আজ পুরো বাংলাদেশকে আমি মৃত্যুর আসল খেলা দেখাব! আজ ওরা বুঝবে মাফিয়া বাঁধন মির্জার রানিকে আঘাত করার পরিণতি কী হয়!"
​এদিকে পাহাড়ে অবস্থানরত নূরের ফোনে যখন কল কেটে গেল, সে আতঙ্কে 'হ্যালো... হ্যালো বাঁধন!' বলে চিৎকার করতে চেষ্টা করল। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল নেটওয়ার্ক পুরো গায়েব এবং ব্যালেন্সও শেষ! ফোনের আলোটাও নিভে গেল।
​ঠিক সেই মুহূর্তে গুহার মতো এক পাহাড়ি খাঁজের আড়ালে নূরের মুঠোফোনটি বেজে ওঠার আগেই কাটাকাটি শব্দ করে সাইলেন্ট ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠল! অন্ধকারের মধ্যে নেটওয়ার্কের এক অদ্ভুত ফ্ল্যাশে একটি ইনকামিং কল আসতেই নূর কোনো মতে ভয়ে ভয়ে স্ক্রিনে আঙুল ঘষে রিসিভ করল।
​হ্যালো বলার আগেই নূরের গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল!
​গুহার ঠিক বাইরেই বেশ কিছু ভারী বুটের দাপাদাপি আর উগ্র জংলি গুন্ডাদের পাহাড়ি চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক ভাষার বিশ্রী চিৎকার ভেসে আসতে লাগল! ওরা একদম গুহার মুখের কাছাকাছি চলে এসেছে!
​নূর ভয়ে দুই হাতে ফোনটি বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল। গুহার বাইরে থেকে গুন্ডাদের প্রধান সাগরেদ চেঁচিয়ে বলে উঠল—
​"এই খোঁজ খোঁজ! এই দিকেই মোবাইল বাজে ফোনর আওয়াজ পাওয়া গিয়াছে! এই খাঁজের ভেতরেই আছে মনে হয় মাগি দুটো! পাইলে একবারে শেষ কইরা ফালামু, কি বলস তোরা?! আজকে এই দুডারে নিয়ে এমন ফুর্তি করুম যে জিন্দেগীতে ভুলবি না! হাহা!"
​তার সেই নোংরা কথায় বাকি সব কটা নেশাখোর উল্লাসে বিকট হেসে উঠল এবং গুহার ভেতর হাতড়ে ঢুকতে শুরু করল!
​

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন