#প্রফেসর_আরশাদ_আলভিন_চৌধুরী
#লেখিকা_আরিয়া_আলম
#পর্ব_২
আরশাদ বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই মাহির বাইক চালিয়ে এসে আরশাদের সামনে বাইকটা থামাল।
বাইক থেকে নেমে হেলমেটটা খুলতে খুলতে মাহির আরশাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— নাও চাচ্চু বাইক! কিন্তু তুমি এত সকালে চট্টগ্রামে কী করছো? তোমার না ঢাকায় থাকার কথা?
আরশাদ কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বলল,
— এমনিই এসেছি।
বলেই মাহিরের হাত থেকে বাইকের চাবিটা নিয়ে নিল। তারপর বাইকে উঠে এক মুহূর্তও দেরি না করে বাইক স্টার্ট দিল।
মাহির কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশাদ বাইক নিয়ে চলে যেতে শুরু করল।
মাহির হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
— আরে চাচ্চু! কোথায় যাচ্ছো? আরে আমাকে নিয়ে যাও! তুমি তোমার ভাতিজাকে ভুলে যাচ্ছো!
কিন্তু আরশাদ পেছন ফিরে তাকালও না। নিজের মতো বাইক চালিয়ে চলে গেল।
আর বেচারা মাহির হা করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চাচ্চু যে তাকে এভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে চলে যাবে, সেটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি!
মাহির নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখল। পকেট একদম ফাঁকা।
— ইশশ! এত সকালে তো টাকাও নিয়ে আসিনি!
কিছুক্ষণ অসহায়ের মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল সে। এরপর রাস্তার দিকে তাকাতেই একটা রিকশা চোখে পড়ল।
আর কোনো কিছু না ভেবে হাত তুলে রিকশাটা থামাল মাহির। তারপর রিকশায় উঠে বসতে বসতে বলল,
— চাচা, চলেন।
রিকশা চলতে শুরু করল।
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
— চাচ্চু না, আস্ত একটা শত্রু! নিজের ভাতিজাকেই ফেলে রেখে চলে গেল!
কিছুক্ষণ পর আবার নিজের কথাতেই হেসে ফেলল সে।
— বাসায় গিয়ে আগে মাকে সব বলব। তারপর চাচ্চুর খবর আছে!
এদিকে আরশাদ তখন বহুদূর চলে গেছে। পেছনে যে তার অসহায় ভাতিজা রিকশায় বসে তাকে গালি দিতে দিতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে তার কোনো ধারণাই নেই।
---
তালুকদার বাড়িটা যেন আর তালুকদার বাড়ি নেই। পুরো বাড়িজুড়ে এক অস্থিরতা। ইতিমধ্যেই তালুকদার বাড়ির সব পুরুষ আর যুবকরা মিলে চারদিকে রিমঝিমকে খুঁজে এসেছে। কিন্তু কোথাও রিমঝিমের দেখা মেলেনি।
রিমঝিম বিয়ে করেছে কি করেনি—এ নিয়ে কারো তেমন চিন্তা নেই। চিন্তা একটাই, তালুকদার বাড়ির একমাত্র রাজকুমারী, সবার আদরের দুলালী মেয়েটা একা কোথায় চলে গেল!
যে মেয়ে কোনোদিন পরিবার ছাড়া কোথাও যায়নি, সেই মেয়েই কিনা কাউকে কিছু না বলে একা বেরিয়ে পড়েছে!
বাড়ির সবাই চিন্তায় শেষ।
এদিকে রিমঝিমের বাবা রায়হান তালুকদার স্ত্রীর আড়ালে বেশ কয়েকবার স্ত্রীকে বকেছেন। অবশ্য সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার সাহস তার নেই। যত যাই হোক, বউকে তিনি বড্ড ভয় পান!
তবুও একমাত্র মেয়ে বলে কথা। চিন্তা তো হচ্ছেই। তবে মেয়ে যে পালিয়েছে, তাতেই রায়হান তালুকদার মনে মনে বেশ খুশি। এত তাড়াতাড়ি মেয়েকে শশুড় বাড়ি দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না।
কিন্তু তার স্ত্রী নাজমা বেগম যে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য একেবারে উঠে-পড়ে লেগেছেন!
নাজমা বেগম রায়হান তালুকদারের দিকে তাকিয়ে কটমট করে বললেন,
_আজ যদি মেয়েটাকে এত আদরের দুলালী না বানাতে, তাহলে কি আর আজ এই দিন দেখতে হতো? ইস! কাল সবার সামনে আমার নাক কাটা গেলো!
রায়হান তালুকদার মুখটা গম্ভীর করে মিনমিন করে বললেন,
_ভালোই হয়েছে আমার মেয়ে পালিয়েছে। এই জল্লাদ মহিলার শখ কত আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার!
কথাটা বলেই তিনি দ্রুত স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন।
নাজমা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
_এই! কী বললে? আবার বলো তো!
রায়হান তালুকদারের বুকটা ধক করে উঠল।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর বদলে মিষ্টি করে বললেন,
_আরে না না, কী বলবো! হ্যাঁ, তাই তো বলছিলাম—মেয়েটা আমার পালালো কেন? পালিয়েছে যখন, আমাকে বললেই তো হতো। আমি ব্যাগ ভরে সোনা দিয়ে দিতাম! ইস, মেয়েটা আমার কোথায় আছে, কেমন আছে কে জানে!
নাজমা বেগম কটমট করে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রায়হান তালুকদারও মুখটা কাঁচুমাচু করে চুপ হয়ে গেলেন।
মনে মনে শুধু একটাই কথা বললেন,
‘আল্লাহ, আমার মেয়েকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দাও। আর এই মহিলার হাত থেকে আমাকে বাঁচাও!’
---
মানুষ মানুষের সুখ সহ্য করতে পারে না। কোথাও একটু সুখের দেখা পেলেই যেন তাদের বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব—অথচ কখনো কখনো এই মানুষই হয়ে ওঠে সবচেয়ে অবুঝ, সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রাণী। অন্যের ভালো থাকা, অন্যের হাসি, অন্যের সুখ—কেন যেন কিছু মানুষের চোখে তা একদমই সহ্য হয় না।
তেমনি এক সুখী পরিবারের নাম তালুকদার বাড়ি।
রায়হান তালুকদাররা চার ভাই। চার ভাইয়ের কারোরই কোনো বোন নেই। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তারা একসঙ্গেই, একই ছাদের নিচে বসবাস করেন। বর্তমান যুগে যেখানে সুখী যৌথ পরিবার খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর, সেখানে তালুকদার বাড়ির মানুষগুলো এখনো একে অপরকে আঁকড়ে ধরে যৌথ পরিবার হিসেবেই বসবাস করে আসছে।
রিমঝিমের মা তার জায়েদের সঙ্গে কখনো শুধু জা হয়ে থাকেননি, বরং বোনের মতো করে সংসার করে এসেছেন। চার ভাইয়ের বউয়ের মধ্যে এতটাই ভালোবাসা যে বাইরের কেউ দেখলে বিশ্বাসই করতে চাইবে না, তারা আসলে চারজন আলাদা পরিবারের মানুষ।
আর সেই সংসারের সবচেয়ে আদরের কন্যা রিমঝিম।
রিমঝিম তাদের বংশের একমাত্র মেয়ে। চার চাচার কোনো মেয়ে নেই। তার ওপর রিমঝিম সবার ছোট। ফলে বংশের একমাত্র মেয়ে আর পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য—দুই দিক থেকেই সে যেন সবার চোখের মণি।
রিমঝিমের বাবা-চাচা মিলে তাদের সাতটি ছেলে। সাত ভাইয়ের মধ্যে কারোরই কোনো বোন নেই। শুধু রিমঝিম—সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন।
তাই তার আদরও একটু বেশিই।
সাত ভাইয়ের ভালোবাসা আর আগলে রাখার ছায়ায় বড় হয়েছে মেয়েটা। ছোটবেলা থেকেই তার কোনো কিছুর অভাব ছিল না। পড়াশোনায় ভালো, স্বভাবেও ভীষণ চঞ্চল। তার ওপর বাচালতায় যেন সে এক নম্বর। সারাক্ষণ মুখে কথার ফুলঝুরি।
তবে পরিবারের মানুষদের কাছে রিমঝিমের সেই বকবকানিও বিরক্তিকর নয়। বরং তাদের কাছে মনে হয়, মেয়েটা বুঝি রূপকথার কোনো রাজ্যের গল্প শোনাচ্ছে।
কিন্তু মানুষের সুখ তো আর সবার সহ্য হয় না।
তালুকদার বাড়ির এই সুন্দর সম্পর্কেও নজর পড়ল কিছু মানুষের।
পাড়া-প্রতিবেশীদের মুখে নানান কথা উঠতে শুরু করল।
—এতগুলো ছেলের মধ্যে একটা মেয়ে!
—এক বাড়িতে এতগুলো চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে থাকে, কে জানে ভেতরে ভেতরে কী সম্পর্ক!
—মেয়ে মানুষ, এত ছেলেদের সঙ্গে থাকছে—খারাপ কিছু যে হয়নি, তার নিশ্চয়তা কী?
কথাগুলো এক কান থেকে আরেক কানে ছড়াতে লাগল। অথচ সেই কথাগুলোর একটিও সত্যি ছিল না।
রিমঝিম তার সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন। তাদের সম্পর্ক ছিল একেবারেই ভাই-বোনের মতো—নির্মল, পবিত্র আর ভালোবাসায় ভরা।
কিন্তু মানুষের মুখ তো বন্ধ করা যায় না।
এইসব কথা শুনতে শুনতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতেন রিমঝিমের মা নাজমা বেগম।
অনেকেই এসে তাকে বুঝিয়ে বলত—
—আপনার মেয়েকে একটু সামলে রাখুন। এত ছেলের সঙ্গে বড় হচ্ছে, মানুষ কী বলবে?
কেউ কেউ তো আরও একধাপ এগিয়ে সরাসরি বলত, রিমঝিম নাকি তার চাচাতো ভাইদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্কে জড়িয়েছে।
নাজমা বেগম জানতেন, এসবের একটিও সত্যি নয়। তিনি নিজের মেয়েকে যেমন চিনতেন, তেমনি নিজের ভাসুরের ছেলেদেরও চিনতেন। তাদের সম্পর্ক যে কতটা সুন্দর, সেটা তিনি ভালোভাবেই জানতেন।
কিন্তু রিমঝিম তার একমাত্র মেয়ে।
মানুষের মিথ্যা কথাগুলো সত্যি না হলেও সমাজে কথার রেশ থেকে যায়। আর সেই কথার রেশ যদি কোনোভাবে তার মেয়ের ভবিষ্যতের ওপর পড়ে?
এই ভয়টাই ধীরে ধীরে নাজমা বেগমকে অস্থির করে তুলল।
শেষ পর্যন্ত তিনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন।
নিজের ছোটবেলার বান্ধবী আয়শা চৌধুরীর ছেলের সঙ্গে রিমঝিমের বিয়ে দেবেন।
আয়শা চৌধুরী ও আরহান চৌধুরীর ছোট ছেলে আরশাদ আলভিন চৌধুরী।
আরশাদের বয়স আটাশ বছর। ছোটবেলা থেকেই বিদেশে পড়াশোনা করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সেখানেই নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। পরে দেশে ফিরে বাবার ব্যবসার দায়িত্বও সামলাতে শুরু করেছে।
নাজমা বেগম প্রস্তাবটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আয়শা চৌধুরী রাজি হয়ে গেলেন। রিমঝিমকে তিনি আগে থেকেই খুব পছন্দ করতেন। তার ওপর নিজের ছোটবেলার বান্ধবীর মেয়ে—তাই মেয়েটাকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে পেতে তার আপত্তি থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
স্বামী আরহান চৌধুরীকেও কথাটা জানালেন।
স্ত্রী যখন রাজি, তখন তিনিও আর আপত্তি করলেন না।
কিন্তু আসল বিপত্তি হলো আরশাদকে নিয়ে।
বিয়ের কথা শুনেই আরশাদ সাফ জানিয়ে দিল—
সে বিয়ে করবে না।
তার বয়স আটাশ। আর সতেরো বছরের একটা মেয়েকে সে কোনোভাবেই বিয়ে করতে রাজি নয়। তার ওপর এই মুহূর্তে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।
এমনকি বিয়ের ব্যাপারে তার অনীহা এতটাই ছিল যে সে কনের নাম পর্যন্ত জানতে চায়নি।
---
ওদিকে রিমঝিমও কম যায় না।
বিয়ে করবে না বলে মায়ের সঙ্গে কত কথাই না বলেছে। কতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে সে এখনই বিয়ে করতে চায় না।
কিন্তু নাজমা বেগমও নিজের সিদ্ধান্তে অটল।
রায়হান তালুকদার পর্যন্ত স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
—মেয়েটা যখন রাজি না, তাহলে এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দেওয়ার কী দরকার?
কিন্তু নাজমা বেগম কোনো কথাই শুনলেন না।
তার একটাই কথা—
মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে।
শেষ পর্যন্ত শত চেষ্টা করেও বিয়েটা আটকানো গেল না।
দুজন মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর নাম পর্যন্ত না জেনেই বিয়ের আসরে বসে গেল।
আরশাদ অন্তত নিজের বউয়ের নামটা শুনেছিল।
কিন্তু বেচারি রিমঝিম?
বিয়ের আসরে কী বলা হচ্ছে, কে তার বর—এসব বোঝার আগেই চারপাশের পরিস্থিতিতে কবুল বলে ফেলেছিল সে।
তারপরই যেন শুরু হলো আসল নাটক।
রাতে বর-কনেকে নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে ফেরার কথা।
কিন্তু বরও নেই, কনেও নেই!
কোথায় গেল দুজন?
মুহূর্তের মধ্যে পুরো চৌধুরী বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। চারপাশের এলাকা খুঁজে ফেলা হলো। আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন—যার পক্ষে সম্ভব, সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করল।
কিন্তু আরশাদ নেই।
রিমঝিমও নেই।
শেষ পর্যন্ত আরশাদের বাবার ফোনে একটা মেসেজ এলো।
আরশাদ লিখেছে—
“তোমাদের কথায় বিয়ে করেছি। এখন তোমরাই ওই মেয়েকে নিয়ে সংসার করো। খবরদার, আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবে না। কারণ আমি আরশাদ আলভিন চৌধুরী, ওই মেয়েকে কখনো বউ হিসেবে মেনে নিতে পারব না। সো বাই।”
মেসেজটা পড়ে আরহান চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে বললেন—
—ওই মেয়েকে নিয়ে আমরা সংসার করব?
আয়শা চৌধুরীও হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
—সংসার করব কীভাবে? মেয়েটাই তো নিখোঁজ!
একজন আত্মীয় অসহায় মুখে বলল—
—আর বিয়েটা তো আমরাও করিনি। বিয়ে করেছে আরশাদ!
আরহান চৌধুরী এবার কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
একদিকে ছেলে পালিয়েছে।
অন্যদিকে নতুন বউ নিখোঁজ।
আর ছেলে মেসেজ দিয়ে বলে গেছে—ওই মেয়েকে নিয়ে সংসার করতে!
কিন্তু বউটাই যদি না থাকে, তাহলে সংসার করবে কার সঙ্গে?
পাতার সঙ্গে?
শেষ পর্যন্ত চৌধুরী পরিবারের সবার একই প্রশ্ন—
বিয়েটা করেছে আরশাদ, বউ নিয়ে পালিয়েছে আরশাদ, আর সংসার করার দায়িত্বটা দিয়ে গেছে পুরো চৌধুরী পরিবারের ওপর!
অথচ যে মেয়েকে নিয়ে সংসার করতে বলছে, সেই মেয়েটাই এখন কোথায়—তার কোনো হদিস নেই।
---
নাজমা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত ভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন,
—এই অকর্মা! এখানে বসে না থেকে গিয়ে আমার মেয়েটাকে খুঁজে আন। না জানি আমার বাচ্চা মেয়েটা কোথায় কী করছে! ঠিকমতো খেয়েছে কি না, সেটাও তো জানি না।
মায়ের কথা শুনে রিহান ভীষণ বিরক্ত হলো। সে কীভাবে অকর্মা হয়? সে একজন ডাক্তার। তাও আবার সাধারণ কোনো ডাক্তার নয়, একজন সম্মানিত হার্ট সার্জন। অথচ নিজের বাড়িতেই তার কোনো দাম নেই!
একজন সম্মানিত হার্ট সার্জনের যদি নিজের বাড়িতেই সম্মান না থাকে, তাহলে বাইরের মানুষ জানলে কী বলবে—ভাবতেই রিহানের মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল।
বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে রিহান ল্যাপটপটা বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আম্মা, তুমি একদম আমাকে অকর্মা বলবে না। আমি একজন ডক্টর। আমাকে অন্তত সম্মান দিয়ে কথা বলো।
ছেলের কথা শুনে নাজমা বেগম আরও বিরক্ত হলেন। কোমরে হাত দিয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ডক্টর হয়েছিস, সেটা নিয়ে এত গর্ব করার কী আছে? বাড়িতে তোকে ডাক্তার বলে কেউ কাজ করায় না, তাই না? আর আমি তোকে অকর্মা বললে এত গায়ে লাগে কেন? নিজের মায়ের একটা কথা শুনে বোনটাকে খুঁজতে যেতে পারিস না?
রিহান মুখটা ছোট করে বললো,
—আবার শুরু করলে!
—হ্যাঁ, শুরু করেছি। এখন ল্যাপটপ বন্ধ করেছিস যখন, তখন ওই ল্যাপটপের মতো নিজের মাথাটাও একটু বন্ধ করে আমার মেয়েটাকে খুঁজতে যা।
রিহান মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—এতই যখন মেয়ের দরদ, তাহলে জোর করে বিয়ে দিতে যাচ্ছিলে কেন? আমার ওইটুকুনি খরগোশের বাচ্চার মতো বোনটাকে নাকি বিয়ে দেবে! এখন আমি পারব না যেতে। বিয়ে দেওয়ার আগে একবারও মনে ছিল না যে মেয়েটা এখনো ছোট? তখন তো কারো কোনো কথা মনে পড়েনি। এখন যাও, গিয়ে নিজেই তোমার মেয়েকে খুঁজে আনো।
কথাগুলো বলেই রিহান আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বিরক্তিতে মুখ কালো করে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নাজমা বেগম কোমরে হাত রেখে ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন,,,
—একটাও আমার কথা শুনল না! সব কটা অকর্মা! একটা ছেলে আমার কথা শোনে না, আরেকটা মেয়ে তো আমার মাথাই খেয়ে ফেলছে!
বলেই তিনি বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে রুমের এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগলেন। মুখে যতই রাগ দেখান, বুকের ভেতর ততই নিজের মেয়েটার জন্য দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগল।