#প্রফেসর_আরশাদ_আলভিন_চৌধুরী
#লেখিকা_আরিয়া_আলম
#পর্ব_৯
সময় তখন সকাল দশটা।
রিমঝিম ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখ মেলে সামনে তাকাতেই দেখল, পুরো রুম অন্ধকার। মুহূর্তেই তার মনে হলো—তার মানে কি এখনো সকাল হয়নি?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বাইরে থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ হলো।
রিমঝিম লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসল।
—কী পড়ল?
কী হয়েছে দেখার জন্য তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে করিডরে এসে দাঁড়াতেই দেখল, পুরো বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। অর্থাৎ সকাল তো হয়েই গেছে!
রিমঝিম অবাক হয়ে করিডরের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাল।
সকাল দশটা পাঁচ বাজে।
এত বেলা পর্যন্ত সে ঘুমিয়েছে অথচ কেউ তাকে ডাকেনি!
অন্যদিন হলে এতক্ষণে তার মা-জননী বেলন হাতে হাজির হয়ে যেতেন। নয়তো কুন্তি এসে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বিছানা থেকে তুলত। তারপর রিমঝিমকে নাজমা বেগমের হাত থেকে বাঁচাতে বাড়ির সবাইকে মাঠে নামতে হতো।
কিন্তু আজ?
পুরো বাড়ি কেমন যেন অস্বাভাবিক শান্ত!
রিমঝিম কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মুচকি হাসল।
যাক, অন্তত একদিন তো শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছে!
হঠাৎ মনে পড়ল—এইমাত্র যে বিকট শব্দটা হলো, সেটা কীসের?
কথাটা মনে পড়তেই আর দেরি না করে রিমঝিম দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল।
নিচে এসে দৃশ্যটা দেখে সে থমকে গেল।
ফ্লোরের ওপর একটা ল্যাপটপ পড়ে আছে। তার পাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটা স্টিলের বাসন। আর সেগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে রিহান ও নাজমা বেগম।
তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়েকে।
মেয়েটা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
রিমঝিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে দেখামাত্র বাচ্চাটা দৌড়ে এসে তার পা জড়িয়ে ধরল। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
রিমঝিম সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোলে তুলে নিল।
—কী হয়েছে মাম্মা? তুমি কাঁদছো কেন? কে বকেছে আমার মাম্মাকে?
বাচ্চাটা কিছু বলল না। বরং আরও শক্ত করে রিমঝিমের গলা জড়িয়ে ধরল।
নাজমা বেগম নিচ থেকে স্টিলের বাসনগুলো তুলতে তুলতে বললেন,
—আর বলিস না! সাবা বল নিয়ে খেলতে খেলতে দৌড়ে এসে একেবারে ধাক্কা মেরে দিল। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। বাসনপত্রের সঙ্গে তোর ভাইয়ের ল্যাপটপটাও পড়ে গেল।
রিহান নিচু হয়ে ল্যাপটপটা তুলে নিল। তারপর সেটার পাওয়ার বাটনে চাপ দিতেই বুঝল, ল্যাপটপটা বন্ধ হয়ে গেছে।
কয়েকবার চেষ্টা করেও অন হলো না।
রিহান ভ্রু কুঁচকে ল্যাপটপটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—মনে হচ্ছে বেশ জোরে পড়েছে। নষ্ট হয়ে গেল নাকি!
কথাটা শুনেই সাবা ভয়ে রিমঝিমের কাঁধে মুখ গুঁজে দিল।
ভাতিজির এমন ভীতসন্ত্রস্ত মুখ দেখে রিহানের মুখে হঠাৎ হাসি ফুটে উঠল।
রিমঝিম সাবার পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করতে করতে বলল,
—আরে পাগলি, ভয় পায় না। কেউ তোমাকে বকবে না।
তারপর তাকে নিয়ে সোফায় বসে টেলিভিশনটা অন করল। কার্টুনের চ্যানেল চালু করে সাবার হাতে রিমোটটা দিয়ে বলল,
—এই দেখো, তোমার কার্টুন। এখন আর কান্না নয়।
কার্টুন শুরু হতেই সাবার কান্না ধীরে ধীরে থেমে গেল।
রিহান একবার বোন আর ভাতিজির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর আর কিছু না বলে ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
---
সাবা—তালুকদার বাড়ির ছোট্ট রাজকন্যা। চার বছরের ফুটফুটে এই মেয়েটা সমুদ্র আর শাফার ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।
সমুদ্র আর শাফার গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে। কিন্তু সেই সাধারণ পরিচয়টাই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়।
সমুদ্র যখন প্রথম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, তখনই তার সঙ্গে পরিচয় হয় শাফার। প্রথম দেখায় হয়তো কেউই ভাবেনি, এই পরিচয় একদিন ভালোবাসায় রূপ নেবে। কিন্তু মানুষ তো নিজের ভবিষ্যৎ আগে থেকে জানে না।
প্রথমে পরিচয়।
তারপর টুকটাক কথা।
এরপর একে অপরকে জানার চেষ্টা।
আর কখন যে সেই পরিচয় ধীরে ধীরে ভালো লাগায়, আর ভালো লাগা গভীর ভালোবাসায় পরিণত হলো—তা হয়তো সমুদ্র আর শাফা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।
সমুদ্রের ব্যক্তিত্বটাই ছিল এমন—গম্ভীর, দায়িত্বশীল, নিজের কাজের প্রতি ভীষণ নিষ্ঠাবান। দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল। আর সেই কঠিন, নিয়মের জীবনের মাঝেও শাফার সঙ্গে কথা বললেই তার মধ্যে অন্যরকম একটা মানুষ বেরিয়ে আসত।
শাফা ছিল তার শান্তির জায়গা।
দিনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর ক্লান্তির পর শাফার সঙ্গে কয়েকটা কথা বললেই সমুদ্রের মন ভালো হয়ে যেত।
অন্যদিকে শাফার কাছেও সমুদ্র ছিল এমন একজন মানুষ, যার ওপর নির্দ্বিধায় ভরসা করা যায়।
দুজনের সম্পর্কটা খুব বেশি সময় লুকিয়ে থাকেনি।
অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই দুই পরিবারের সবাই জানতে পারল তাদের ভালোবাসার কথা।
তবে ভাগ্য ভালো ছিল তাদের।
দুই পরিবারের কেউই তাদের ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ছেলে-মেয়ে দুজন দুজনকে পছন্দ করে, ভালোবাসে, একসঙ্গে সংসার করতে চায়—এরপর পরিবারের আর কী-ই বা করার থাকে?
তাই বেশিদিন অপেক্ষা না করেই সবার মতামতে বিয়ে হয়ে গেল সমুদ্র আর শাফার।
তবে সেই বিয়ে ছিল একেবারে তালুকদার বাড়ির মতোই—দুমদাম করে!
সমুদ্র তখন বাড়ির বড় দুই ভাইকে পেছনে ফেলে নিজেই সবার আগে বিয়ে করে বসল।
ছোট ভাইয়ের এমন কাণ্ডে বড় দুইভাই— ফারহাদ ও রিহান হয়তো ভেতরে ভেতরে বেশ অবাকই হয়েছিল। কিন্তু ভাইয়ের মুখে যখন শাফার কথা শুনেছে, তখন আর কেউই আপত্তি করেনি।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাফা এমনভাবে তালুকদার পরিবারের সঙ্গে মিশে গেল যে, তাকে আর কখনোই বাইরের কেউ বলে মনে হয়নি।
বিয়ের পর ছয় বছর কেটে গেছে।
ছয়টা বছর!
এই ছয় বছরে কত কিছুই না বদলেছে।
সমুদ্র আর শাফার সংসারে এসেছে তাদের ছোট্ট মেয়ে সাবা।
চার বছরের সাবা এখন তালুকদার বাড়ির প্রাণ।
সারাদিন তার ছোট ছোট পায়ের শব্দে বাড়ির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত মুখর হয়ে থাকে। কখনো খেলনা নিয়ে ছুটছে, কখনো চাচাদের বিরক্ত করছে, কখনো আবার মায়ের আঁচল ধরে ঘুরছে।
আর সুযোগ পেলেই শাফার আদুরে একমাত্র ননদ রিমঝিমের কাছে ছুটে যায়।
রিমঝিমও কম যায় না।
সাবাকে দেখলেই তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে খুনসুটি, খেলাধুলা, দুষ্টুমি—সবকিছুর সঙ্গী যেন সে নিজেই।
শাফা মাঝে মাঝে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
এই একটা ছোট্ট মানুষই তো তাদের ছয় বছরের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ফল।
তবে তাদের সংসারে সুখের পাশাপাশি অপেক্ষাও আছে।
কারণ সমুদ্র একজন সেনাবাহিনী।
দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে তাকে মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। কখনো এমনও হয়, দীর্ঘ সময়ের জন্য শাফা আর সাবাকে ছেড়ে দূরে থাকতে হয় তাকে।
একজন স্ত্রীর জন্য বিষয়টা সহজ নয়।
স্বামীকে ছাড়া দিনের পর দিন কাটানো, মেয়ের হাজারো ছোট-বড় মুহূর্ত একা সামলানো, রাতে ঘুমানোর আগে ফোনের ওপাশে স্বামীর কণ্ঠ শোনা—এসবের মধ্যে একটা শূন্যতা থাকেই।
কিন্তু শাফা সেই শূন্যতাকে কখনো অভিযোগে পরিণত করেনি।
বরং সমুদ্র যখন দেশের কাজে দূরে থাকে, তখন তার মনে কষ্টের চেয়ে গর্বটাই বেশি থাকে।
কারণ তার স্বামী শুধু তার স্বামী নয়।
সে একজন দেশের রক্ষক।
যে মানুষটা নিজের পরিবারকে ছেড়ে দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য দায়িত্ব পালন করছে, তার জন্য অপেক্ষা করতে শাফার কোনো আপত্তি নেই।
বরং কেউ যখন বলে,
'তোমার তো কষ্ট হয়, এতদিন স্বামীকে ছাড়া থাকতে হয়!'
শাফা তখন মৃদু হেসে উত্তর দেয়,
'হয়। খুব কষ্ট হয়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গর্ব হয়।'
এই গর্বটাই তাকে শক্ত করে রাখে।
তবুও মাঝরাতে কখনো কখনো মনটা তো খারাপ হয়।
সাবা যখন ঘুমের মধ্যে বাবাকে খুঁজে,
'বাবা কই?'
বলে মাকে জড়িয়ে ধরে, তখন শাফার বুকটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে।
মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে সে শুধু বলে,
'বাবা আসবে মা। তোমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসবে।'
আর নিজেকেও বোঝায়—
সমুদ্র আসবে।
হয়তো আজ নয়, কাল নয়।
কিন্তু আসবে।
এই অপেক্ষার মাঝেই তো তাদের ভালোবাসা।
শাফা অবশ্য একা নয়।
সমুদ্র বাইরে থাকলেও তালুকদার বাড়ির সবাই তাকে আগলে রাখে।
শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে বউমা বলে দূরে রাখেননি। বরং মেয়ের মতোই দেখেছেন।
তার কোনো প্রয়োজন হলে বলার আগেই কেউ না কেউ এগিয়ে আসে।
কখনো শাশুড়ি নিজের মেয়ের মতো করে তার খোঁজ নেন।
কখনো বাড়ির অন্যরা সাবাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, যাতে শাফা একটু বিশ্রাম নিতে পারে।
এই বাড়িতে শাফার ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।
বরং বিয়ের পর থেকে সে ধীরে ধীরে এমনভাবে এই পরিবারের অংশ হয়ে গেছে যে, কখনো কখনো নিজের বাবার বাড়ির কথাও ভুলে যায়।
আর তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী?
তার আদুরে একমাত্র ননদ—রিমঝিম।
রিমঝিম আর শাফার সম্পর্কটা শুধুই ননদ-ভাবির নয়।
তাদের মধ্যে একটা সুন্দর বন্ধুত্ব আছে।
দুজন একসঙ্গে বসে গল্প করে, হাসাহাসি করে, কখনো আবার একে অপরের কাছে মনের কথা বলে।
সমুদ্র বাইরে থাকলে রিমঝিমই অনেক সময় শাফার একাকিত্বটা কমিয়ে দেয়।
আর সাবা তো রিমঝিমের পেছনেই ঘুরঘুর করে।
তালুকদার বাড়িতে তাই শাফা শুধু সমুদ্রের স্ত্রী নয়।
সে এই পরিবারের একজন মেয়ে।
তার হাসিতে বাড়ির মানুষ হাসে, তার মন খারাপ হলে সবাই চিন্তিত হয়, আর তার মেয়ে সাবার একটুখানি দুষ্টুমিতেই পুরো বাড়ি যেন প্রাণ ফিরে পায়।
ছয় বছর আগে শাফা এই বাড়িতে এসেছিল একজন ভালোবাসার মানুষ হয়ে।
আজ ছয় বছর পর সে এই বাড়িরই একজন।
সমুদ্রের ভালোবাসা তাকে শুধু একজন স্বামী দেয়নি, দিয়েছে একটা পরিবারও।
আর সেই পরিবারের ভালোবাসায় শাফা নিজের সংসারটাকে পরিপূর্ণ করে রেখেছে।
---
চৌধুরী বাড়ির বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে ধীরে ধীরে আরশাদের গাড়িটা থামল। গাড়ির শব্দ পেতেই গেটের পাশে থাকা দারোয়ান দ্রুত এগিয়ে এসে গেট খুলে দিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিল।
আরশাদ গাড়ির ভেতর থেকেই গম্ভীর মুখে সালামের উত্তর দিল। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, চোখেমুখে বরাবরের মতোই সেই কঠোরতা। দারোয়ানকে আর কিছু না বলে গাড়িটা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকিয়ে নিল।
চৌধুরী বাড়িটা বরাবরই বিশাল। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ গাছপালা, সাজানো বাগান আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো অথচ রাজকীয় বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায়, এই পরিবারের ঐতিহ্য কতটা পুরোনো। আরশাদ এসবের দিকে একবারও না তাকিয়ে গাড়ি নিয়ে সোজা গ্যারেজের দিকে চলে গেল।
গাড়িটা নির্দিষ্ট জায়গায় সুন্দর করে পার্ক করে ইঞ্জিন বন্ধ করল সে। তারপর দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে শার্টের হাতাটা সামান্য ঠিক করে নিল। মুখে তখনও সেই গম্ভীর ভাব।
গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে বাড়ির মূল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল আরশাদ। এক মুহূর্ত দেরি না করে কলিং বেলে চাপ দিল।
প্রথমবার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে আবার কলিং বেল চাপল।
এবার ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজাটা খুলে গেল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সারাহ।
আরশাদকে দেখেই সারাহর মুখটা মুহূর্তেই হাসিতে ভরে উঠল। ভাইকে দেখলেই তার মনে একটা আলাদা আনন্দ কাজ করে। দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিয়ে সে মিষ্টি হেসে বলল,
— ভাইয়া, এসেছো! আমার জন্য চকলেট এনেছো?
সারাহর প্রশ্ন শুনে আরশাদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখটা আরও গম্ভীর করে বলল,
— এমনিতেই দাঁতে পোকায় খেয়ে শেষ। আবার বলছিস চকলেট আনতে? এই শোন, আজ থেকে তোর চকলেট খাওয়া বন্ধ।
কথাটা বলেই সারাহর কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা না করে তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল আরশাদ।
সারাহ কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভাইয়ের এমন কথায় মুখটা ভেংচিয়ে ফেলল।
আরশাদ তখন বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। সারাহ তার পেছন পেছন যেতে যেতে ইচ্ছে করেই একটু জোরে, যেন আরশাদের কানে কথাটা ঠিকঠাক পৌঁছায়, বলল,
— বললেই তো হয় যে তোমার কাছে টাকা নেই! যতসব নাটক!
কথাটা শুনে আরশাদের পায়ের গতি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
সে ধীরে ধীরে ঘুরে সারাহর দিকে তাকাল।
সারাহ সঙ্গে সঙ্গে মুখটা স্বাভাবিক করে ফেলল, যেন কিছুই বলেনি। চোখেমুখে নির্দোষ ভাব এনে দাঁড়িয়ে রইল।
আরশাদ চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
— কী বললি?
সারাহ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— আমি? কিছুই বলিনি তো!
— তাই?
— হুম। একদম কিছু না।
আরশাদ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
— দাঁড়া, তোর সঙ্গে পরে কথা আছে।
এই বলে আবার সামনে এগিয়ে গেল সে।
সারাহ ভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসতে লাগল। আর মনে মনে ভাবল—চকলেট না আনলেও ভাইয়াকে একটু জ্বালানো তো যেতেই পারে!
---
গোসল সেরে একেবারে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল আরশাদ। পরনে ছিল সাদা রঙের একটি ফুলহাতা শার্ট, সঙ্গে কালো প্যান্ট। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে হালকা করে মুছে নিয়েছে, আর মুখে ফুটে আছে তার চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই আরশাদের চোখ গেল লিভিং রুমের দিকে। সেখানে পরিবারের প্রায় সবাই বসে আছে। কেউ গল্প করছে, কেউ আবার কাজ করছে।
আরশাদ কারও সঙ্গে কথা না বলে সোজা ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। একটা চেয়ার টেনে বসে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
— ছোটমা, খেতে দাও। বড্ড খিদে পেয়েছে।
আরশাদের কথা শুনে ফাবিহা চৌধুরী মুচকি হেসে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
আরহান চৌধুরী সকালে অফিসের কিছু জরুরি কাজ থাকায় ঠিকমতো খেতে পারেননি। তাই এখন ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছিলেন। ছেলেকে সামনে আসতে দেখে হঠাৎ করেই খাওয়া থামিয়ে দিলেন তিনি।
কয়েক মুহূর্ত ছেলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। যেন চোখ দিয়েই ছেলেকে কুটে কুটে দেখছেন।
তারপর আরশাদের মতোই গম্ভীর মুখ করে বললেন,
— তোমার না কাল আসার কথা ছিল? কাল এলে না কেন?
আরশাদ বাবার কথায় বিশেষ কোনো গুরুত্ব দিল না। হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল,
— ইচ্ছা হয়নি, তাই আসিনি।
আরহান চৌধুরীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
— তোমার ইচ্ছাই কি সব হবে নাকি?
আরশাদ এবারও কোনো উত্তর দিল না। এমন ভাব করল, যেন বাবার কথাটা সে শুনতেই পায়নি।
ঠিক তখনই ফাবিহা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে প্লেটে করে গরম ভাত নিয়ে এলেন। আরশাদের সামনে প্লেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
— নে বাবা, খেয়ে নে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।
আরশাদ ফোনটা পাশে রেখে চুপচাপ খেতে শুরু করল।
ডাইনিং টেবিলে কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করল। আরহান চৌধুরী মাঝেমধ্যে ছেলের দিকে তাকাচ্ছেন, আর আরশাদ নিজের মতো করে নিশ্চিন্তে খাবার খেয়ে যাচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে আরশাদ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর একেবারে স্বাভাবিক গলায় বলল,
— কাল থেকে আমি কলেজে জয়েন করছি।
কথাটা শুনেই আরহান চৌধুরী যেন চমকে উঠলেন। ভ্রু দুটো উঁচু করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কী এমন দিন এলো যে আবার কলেজে জয়েন করছো? নাকি মানুষেরটা দেখে যা পাশ করেছিলে, তাও ভুলে গেছো?
আরশাদ বাবার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির রেখা ফুটে উঠলেও গলায় সেই একই গম্ভীরতা।
— আমি পড়তে যাচ্ছি না, বাচ্চাদের পড়াতে যাচ্ছি। মানে, স্টুডেন্ট হয়ে নয়—প্রফেসর হিসেবে জয়েন করছি।
আরহান চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন কথাটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না।
— কী বললে? তুমি কলেজের প্রফেসর হিসেবে জয়েন করছো?
আরশাদ কোনো উত্তর না দিয়ে ডাইনিংয়ের পাশে থাকা বেসিনের দিকে এগিয়ে গেল। কল খুলে হাত ধুতে লাগলো।আরহান চৌধুরী আবার বললেন,
— তাহলে এত বড় বিজনেস কে সামলাবে?
আরশাদ হাত ধুতে ধুতে একেবারে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
— কেন? তুমি।
কথাটা শুনে আরহান চৌধুরী রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বললেন,
— এই বুড়ো বয়সে আমি এসব করব? আর তোমার বিজনেস কে দেখবে, শুনি?
আরশাদ হাতের পানি ঝেড়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে বাবার দিকে তাকাল।
— আমারগুলো আমি নিজেই দেখব। আর তোমারটা দেখার জন্য তো চাচ্চু, ভাইয়া আছেই।
আরহান চৌধুরী কিছু বলার আগেই আরশাদ সেখান থেকে চলে গেল।
ছেলের চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আরহান চৌধুরী। তারপর বিরক্তিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপালে হাত রাখলেন।
— বেয়াদব ছেলে!
পাশ থেকে আয়শা চৌধুরী স্বামীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তিনি জানেন, আরশাদ নিজের সিদ্ধান্তে কতটা অটল। একবার কোনো কিছু ঠিক করে ফেললে তাকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরানো যে সহজ নয়, সেটা তার চেয়ে ভালো আর কে জানে!