কাজল চোখের মায়া
লেখিকা: আরিহা জান্নাত
মাহির রহমান ভিলায় আসার পর যেন বাড়ির পরিবেশই বদলে গেল।
সবার মুখে একটাই কথা—
"মাহির এসেছে।"
সকালে নাশতার টেবিলে দাদি নিজ হাতে মাহিরের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
নাসরিন চৌধুরী বারবার বলছেন,
— "ওখানে ঠিকমতো খেতে পারতিস তো?"
মাহির হালকা হেসে উত্তর দিল,
— "মা, এত বছর পরও একই প্রশ্ন?"
রাশেদ চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
— "আজ অফিসে যেতে হবে না। পরিবারের সঙ্গে থাক।"
— "জি, আব্বু।"
মাহিরের কথাবার্তা সবসময় পরিমিত। কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলে না। সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলে।
---
অন্যদিকে...
দোতলার বারান্দা থেকে আয়াত সবকিছু দেখছিল।
তার পাশে নোভা দাঁড়িয়ে।
নোভা হেসে বলল,
— "কী দেখছিস?"
— "কিছু না।"
— "মাহির ভাইকে?"
আয়াত মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— "উফ! ওকে দেখব কেন?"
— "তাহলে নিচে তাকিয়ে আছিস কেন?"
আয়াত উত্তর না দিয়ে ভেতরে চলে গেল।
---
দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে।
রহমান ভিলার নিয়ম—যতটা সম্ভব সবাই একসঙ্গে খাবে।
আয়াত চুপচাপ খাচ্ছিল।
হঠাৎ তার গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে গেল।
পানি পুরো টেবিলে ছড়িয়ে পড়ল।
সবাই একবার তার দিকে তাকাল।
আয়াত অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
— "আমি... ইচ্ছা করে করিনি।"
মাহির কোনো কথা না বলে পাশে রাখা টিস্যুর বাক্সটা তার দিকে এগিয়ে দিল।
— "হাত কেটে যায়নি তো?"
আয়াত একটু অবাক হলো।
সে ভেবেছিল বকা খাবে।
কিন্তু মাহির শুধু এটুকুই বলল।
— "না... ঠিক আছি।"
---
বিকেলে রহমান ভিলার উঠানে ছোটরা ক্রিকেট খেলছে।
রিদওয়ান বলল,
— "আয়াত আপু, খেলবেন?"
— "অবশ্যই!"
প্রথম বলেই আয়াত এমন জোরে শট মারল যে বল গিয়ে পড়ল বাড়ির বাইরে।
সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই মাহির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল।
বলটা গড়িয়ে এসে তার পায়ের কাছে থামল।
সে নিচু হয়ে বলটা তুলে নিল।
আয়াত মনে মনে বলল,
"এবার শুরু হবে..."
কিন্তু মাহির শুধু বলটা রিদওয়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
— "খেলো। তবে রাস্তার দিকে বল মারবে না।"
এরপর সে ভেতরে চলে গেল।
আয়াত অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নোভা কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বলল,
— "আজ তোকে বকা দিল না!"
আয়াত ফিসফিস করে বলল,
— "মানুষটা বদলে গেছে নাকি?"
---
রাত।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
রহমান ভিলার ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে মাহির।
দূরে গোপালগঞ্জ শহরের আলো জ্বলছে।
সে পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করল।
চাবিটা অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে দেখল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
Unknown Number
মাহির কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শান্ত গলায় একজন বলল,
— "তুমি দেশে ফিরে বড় ভুল করেছ, মাহির।"
মাহিরের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে ধীরে বলল,
— "আমি ভুল ঠিক করতেই ফিরেছি।"
ওপাশ থেকে শুধু একটি বাক্য শোনা গেল—
— "তাহলে প্রস্তুত থেকো... খেলা আবার শুরু হয়েছে।"
কল কেটে গেল।
মাহির কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচে রহমান ভিলার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
— "এবার কাউকে আমি হারাতে দেব না..."
তার অজান্তেই ছাদের অন্য প্রান্তে কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল...
অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু বোঝা যাচ্ছিল—
সে অনেকক্ষণ ধরে মাহিরের প্রতিটি কথা শুনছিল
রাত প্রায় একটা।
রহমান ভিলার চারপাশে নিস্তব্ধতা।
শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝেমধ্যে কুকুরের ঘেউ-ঘেউ।
মাহির এখনও ছাদে দাঁড়িয়ে।
অজানা নম্বর থেকে আসা ফোনকলটা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে আরেকটি মোবাইল বের করল। ফোনটি পরিবারের কেউ কখনো দেখেনি।
স্ক্রিনে কয়েকটি অপঠিত বার্তা।
«"স্যার, আমরা গোপালগঞ্জে পৌঁছে গেছি।"
"আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আছি।"»
মাহির কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাত্র একটি উত্তর লিখল—
"কেউ কোনো পদক্ষেপ নেবে না। আমি নিজে সব দেখছি।"
ফোনটি আবার বন্ধ করে পকেটে রেখে দিল।
---
এদিকে...
ঘুম আসছিল না আয়াতের।
সারাদিনের ঘটনাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল।
সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
হালকা বাতাস বইছে।
হঠাৎ তার চোখ গেল ছাদের দিকে।
অন্ধকারে একটি মানুষের অবয়ব।
ভালো করে তাকিয়ে বুঝল—
মাহির।
আয়াত নিজের মনেই বিড়বিড় করল,
— "মানুষটা রাত জেগে ছাদে কী করে?"
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে আবার ঘরে ফিরে গেল।
---
পরদিন সকাল।
রহমান ভিলা আবার আগের মতোই ব্যস্ত।
ডাইনিং টেবিলে সবাই নাশতা করছে।
মেহরাব বলল,
— "মাহির ভাই, আজ আমাকে বাইকে একটু ঘুরতে নিয়ে যাবেন?"
মাহির হেসে বলল,
— "আজ না। অন্যদিন যাব।"
রিদওয়ান মুখ ফুলিয়ে বলল,
— "আমাকেও নিয়ে যাবেন।"
— "তোমাকেও।"
দাদি হেসে বললেন,
— "দেখছো, আসার একদিনেই সবাইকে নিজের ভক্ত বানিয়ে ফেলেছে।"
সবাই হেসে উঠল।
শুধু আয়াত চুপচাপ রুটি খাচ্ছিল।
মাহির তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আজ কলেজে যাচ্ছ?"
— "হুম।"
— "ড্রাইভার তোমাদের নামিয়ে দেবে।"
আয়াত সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "না, দরকার নেই। আমরা অটোতেই যাব।"
— "অটোতে ভিড় বেশি থাকে।"
— "আমার সমস্যা হবে না।"
মাহির আর কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়ে আবার নাশতা করতে লাগল।
দাদি মুচকি হেসে সব দেখছিলেন।
---
কলেজে যাওয়ার পথে নোভা হঠাৎ বলল,
— "তুই খেয়াল করেছিস?"
— "কী?"
— "মাহির ভাই তোকে আগের মতো বকা দেয় না।"
আয়াত ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "এখনও পুরোপুরি শুরু করেনি।"
দুজনেই হেসে ফেলল।
---
অন্যদিকে...
গোপালগঞ্জ শহরের একটি নিরিবিলি ক্যাফেতে একজন মধ্যবয়স্ক লোক বসে ছিল।
তার সামনে রহমান ভিলার একটি পুরোনো ছবি।
লোকটি ছবির ওপর আঙুল রেখে ধীরে ধীরে বলল,
— "ছয় বছর অপেক্ষা করেছি..."
ঠিক তখনই আরেকজন এসে তার সামনে বসল।
— "স্যার, মাহির দেশে ফিরে এসেছে।"
লোকটির ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
— "আমি জানি।"
— "এখন কী করবেন?"
লোকটি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— "এবার পুরোনো হিসাব মেটানোর সময়।"
সে ছবিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
ছবির কোণায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—
রহমান ভিলা
আর ছবির এক পাশে ছোট্ট একটি ছেলে...
১৭ বছর বয়সের মাহির।
চলবে...