#আমি_সেই_নীতু
#পর্ব_৩৬
#আনাবিয়া_বৃষ্টি
নীলাঞ্জনা ......... বউ.............
মুখোশ পরা লোকটি সামনে এগিয়ে আসে। চোখ দুটোতে তাচ্ছিল্যের আগুন, কণ্ঠে ব্যঙ্গ।
সে হেসে বলে ওঠে,
ডাকাত :মাইয়া হইয়া বেডা মানুষগো সাথে লড়াই করতে আহোস? মাইয়া মানুষগো শরীরে এত শক্তি আছে নি!
চারপাশের মানুষ থমকে যায়। কেউ কেউ ফিসফিস করে, কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
নীতু এক পা এগিয়ে আসে। চোখে ভয় নয়, বরং দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। ঠোঁটে হালকা, কিন্তু দৃপ্ত হাসি। শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সে বলে,
নীতু: কার শক্তি কতটুকু, তা কি মুখ দেখলেই বোঝা যায়? সেটা তো কাজে করে দেখাতে হয়।
এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল।
মুহূর্তের মধ্যেই নীতু ঝাঁপিয়ে পড়ে। লোকটা বন্দুক তুলতে গিয়েও পুরোটা পারে না।কৌশলে নীতু তার হাতের কবজিতে ধাক্কা দেয়। ধাতব শব্দে বন্দুকটা মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যায়। চারদিক থেকে “ওহ!” বলে উঠতে থাকে মানুষ।
ভিড় যেন হঠাৎ থিয়েটারে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করেছে ,কেউ চিৎকার করছে, কেউ আবার উত্তেজনায় হাততালি দিচ্ছে।
একজন নয়, বাকি দু’জন মুখোশধারী এগিয়ে আসে। কিন্তু নীতু থামে না। একের পর এক আঘাত, নিখুঁত মুভমেন্ট, চোখের পলকে পাশ কাটানো। ঘুষি, লাথি...সবকিছুতেই প্রশিক্ষণের ছাপ। মাটিতে ধুলো উড়ছে, মানুষের চিৎকার আর করতালিতে চারপাশ গমগম করছে।
শাহমীর ভাই আর ফুয়াদ ভাই পাশে আছে ঠিকই, কিন্তু তারা শুধু প্রয়োজনে সাহায্য করছে। পুরো লড়াইটাই নীতু একাই সামলাচ্ছে। শাহমীর ভাই ইচ্ছে করেই পেছনে..সে.গ্রামের মানুষদের দেখাতে চেয়েছে,
মেয়ে জাতি কারো থেকে কম নয়। চাইলে সে নিজেই নিজের ঢাল হতে পারে।
কিছুক্ষণ পর তিনজন মুখোশধারীই মাটিতে কাবু। তাদের মুখোশ খুলে পড়ে..ভীত, ঘেমে ওঠা মুখ। লোকজন তখন আর চুপ করে থাকে না। করতালিতে ফেটে পড়ে পুরো এলাকা।
তখনই সত্যিটা সামনে আসে...
এরা নতুন ডাকাত দলের সদস্য। ভেবেছিল তালুকদার বাড়ির অনুষ্ঠানে সবাই ব্যস্ত, গ্রাম ফাঁকা..সহজেই ডাকাতি করবে। সেই ব্যক্তি দেখে ফেলায় তাকে মারধর করেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।
মাটিতে পড়ে থাকা বন্দুকগুলো তুলে দেখা যায়..সব নকল। মেলা থেকে কেনা, শুধু ভয় দেখানোর জন্য। কিন্তু নীতুদের আসল পিস্তলের ঝলক দেখেই ওদের বুক কেঁপে উঠেছিল, যদিও কারো গায়ে গুলি ছোড়া হয়নি।
ঠিক তখনই দূর থেকে সাইরেনের শব্দ। পুলিশের গাড়ি এসে থামে। ভিড় সরে যায়। ডাকাতদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
একজন পুলিশ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে,
পুলিশ:আপনারা কারা? এইভাবে ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করলেন?
ফুয়াদ ভাই হেসে, মজার ছলে বলে ওঠেন,
ফুয়াদ: এইসব চুনোপুটি আমাদের কাছে পিঁপড়ার মতো। এদের আমরা গোনায় ধরি না।
পুলিশদের মুখে আরও সন্দেহ,
পুলিশ:আপনারা সত্যিই কারা? এখানে এসে মারামারি করছেন, আপনারাও ডাকাত দলের লোক নন তো?
নীতু শান্তভাবে নিজের আইডি কার্ড বের করে দেয়। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
নীতু:ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট। অফিসার নীলাঞ্জনা চৌধুরী।
তারপর শাহমীর ভাইয়ের দিকে ইশারা করে,
— উনি আমাদের হেড—এডিজি শাহমীর ফাইয়াজ চৌধুরী স্যার।
আর ফুয়াদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে,
— উনি আইজি মাহতাব ফুয়াদ চৌধুরী।
মুহূর্তেই পুলিশের ভঙ্গি বদলে যায়। সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট করে।
পুলিশ: সরি ম্যাডাম, সরি স্যার। আপনাদের নাম পত্রিকায় অনেক পড়েছি। চিনতে পারিনি। কিছু মনে করবেন না।
ভিড়ের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারো চোখে গর্ব, কারো চোখে অনুপ্রেরণা। শুধু ডাকাত ধরা পড়েনি,
গ্রামের মানুষের মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেছে একটাই কথা..
শক্তি লিঙ্গে নয়, সাহসে।
ফাইয়াজ : এটা আপনাদের ডিউটি অফিসার..
সেই সময় বড় আব্বু , চাচারা , ফুপা আসে , এসে বড় চাচা বলে ..
বড় চাচা: ওদের আরো একটা পরিচয় আছে, এরা আমাদের বাড়ির সন্তান!!
পুলিশ : আরে তালুকদার সাহেব যে,, হ্যাঁ আপনি তো বলে ছিলেন আপনার বোনের ছেলে মস্ত বড় অফিসার..
বড় চাচা: এই ডাকাত দের যেনো কঠিন শাস্তি দেয়া হয় ..
পুলিশ : এই ব্যবস্থা আমরা করছি আপনি চিন্তা করবেন না .. আমরা এখন আসি ..
বড় চাচা: আসুন ...
ফাইয়াজ : বড় আব্বু যে লোকটিকে মারা হয়েছিল সেই লোকটি কোথায় ?
বড় আব্বু : লোকটিকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে ..
ফাইয়াজ : লোকটির চিকিৎসার সমস্ত খরচ আমি দিবো , লোকটির চিকিৎসার যেনো কমতি না থাকে ...
বড় আব্বু : আমি সব করে দিয়েছি তুমি চিন্তা করো না শাহমীর..
সবাই বাড়ির দিকে রওনা হল.. তাদের পিছনে গ্রামের মানুষ নানা কথা বলছে ,,, মেয়েটি অনেক সাহসী , কিছু অল্প বয়সী মেয়ে বলছে বড় হয়ে এই আপুটির মত হবো .. বাড়িতে পৌঁছে দোতলায় ফ্রেশ হতে চলে যায় তারা। বাড়ির পুরুষ বাকিদের সব খুলে বলে ,নীতু তার ঘরে ঢুকতেই হাসিকে দেখতে পেয়ে বলে ...
নীতু : হাসি আপু তুমি এখানে কি করছো? মেয়েটি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে
খুশি : আমি হাসি না আমি খুশি , হাসির যমজ বোন ..
নীতু : ও তুমি কখন এলে? আর আমার ঘরে কি করছ ?
খুশি : আসলে বড় আম্মা ফাইজুল ভাইরে খুজতাছিল , আমি ফাইজুল ভাইরে ডাকতে আইসা দেখি ফাইজুল ভাই এই ঘরে , ফাইজুল ভাই বের হওয়ার পর দেখি ঘর এলোমেলো তাই ঘরটা গুছাইয়া দিলাম .. আমি কি বড় অন্যায় করছি ভাবী ?
নীতু : না অন্যায় করনি !! তুমি আমায় ভাবী কেনো বললে ?
খুশি : আমি জানি আপনি শাহমীর ভাইয়ের হবু বউ ,, আর শাহমীর ভাইয়ের বউ তো আমগো ভাবী হইব ..
নীতু : হুম ,, তবে ফাইজুল ভাই কেনো আমার ঘরে আসবে ? তুমি কি কিছু দেখেছো ?
খুশি: না আমি ফাইজুল ভাইরে দেখে ঘরে ডুকে দেখি ভাইয়া কি জানি খুজতাছে ,,, জিজ্ঞেস করতে বলে কিছু না .. এই বলে চলে যায় ... ঘর এলোমেলো ছিল তাই ভাবলাম গুছাইয়া দেই ..
নীতু : ধন্যবাদ আপু ..
খুশি : ভাবী তুমি অনেক সুন্দর , শাহমীর ভাইয়ের পছন্দ আছে কইতে হইব ,, শাহমীর ভাই যে রাগি ,,একটা কথা জিজ্ঞেস করি ? কিছু মনে কইরো না
নীতু : বলো
খুশি : শাহমীর তো অনেক রাগি তোমায় কিছু কয় না ?
নীতু : তোমাদের শাহমীর ভাই নারিকেলের মতো !! ওপরের অংশ শক্ত হলেও ভিতরের টা নরম .. উনি মানুষটা খুব ভালো ...
খুশি : টা ঠিক .. আচ্ছা আমি যাই , অনেক কাজ পইড়া আছে .. ভাবী তুমি রেস্ট লও আমি গেলাম
নীতু : আচ্ছা যাও ..
নীতু ভাবতে শুরু করে, এসব কি তাহলে ফাইজুল ভাইয়ের প্ল্যান ছিল ? মাঠে ও তো ফাইজুল ভাইকে দেখতে পায়নি তারা !! তার ঘরে কি খুঁজতে এসেছিল ? শাহমীর ভাইয়ের সাথে কথা বলতে হবে ,, এই গুলো ভেবে গোসল করতে চলে যায় .....
গোসল করে বের হয়ে দেখে শাহমীর আর ফুয়াদ ভাই তার ঘরে বিছানায় শুয়ে আছে... সে জিজ্ঞেস করে,আপনারা এখানে কেনো ?, তারা বলে কিছু ইম্পর্টেন্ট কথা আছে ..সে জিজ্ঞেস করে, কি ?
ফাইয়াজ : আজকে যা ঘটলো সব ফাইজুলের প্রি প্ল্যান , সেই ডাকাতদের দেখে আমার কেনো জানি সন্দেহ হচ্ছিল .. ডাকাত পুরান হোক কিংবা নতুন , এত বোকা নিশ্চয়ই হবে না ,দিনের বেলায় ডাকাতি করতে আসবে ?
নীতু : রাইট .. আমার মনে একই প্রশ্ন এসেছিল ..
ফুয়াদ: তাই আমরা থানায় গিয়ে ডাকাতদের আবার জিজ্ঞেস করি , তারা স্বীকারোক্তি দেয় ,, একটা লম্বা মত ছেলে তাদের এই কাজ করতে বলেছে .. তাকে তারা চিনে না তাদের ডাকাত সাজিয়ে এই গ্রামে নিয়ে এসেছে .. তারা অন্য গ্রামের চাষা বাদী করে ..
ফাইয়াজ : বাড়িতে এসে দেখি আমার ঘরের সকল জিনিস এলোমেলো..
নীতু : আমিও ঘরে এসে খুশিকে দেখি ওর থেকে জানতে পারি ফাইজুল ভাই ঘরে এসেছিল , ঘর নাকি এলোমেলো ছিল তাই খুশি ঘর গুছিয়ে দিয়ে গেছে ...
ফুয়াদ : তাইলে তো এই কাজ ফাইজুল ভাইয়েরই..
ফাইয়াজ : খুজে কোনো লাভ হবে না আমরা কোনো প্রমাণ রাখিনি ..
সেই সময় তাদের খুশি এসে জানায় , নীচে অনেক লোক এসেছে, তাদের সাথে কথা বলতে চায় ...তারা নিচে গিয়ে দেখে কিছু অল্প বয়সী মেয়ে ও তাদের বাবা - মা এসেছে ... তারা জানায়,নিজেদের রক্ষার জন্য তাদের কাছে লড়াই করা শিখতে চায় ,, বিভিন্ন এলাকায় মায়েরা কিডন্যাপ হয়ে যাচ্ছে তাই নিজেদের সুরক্ষার জন্য তাদের কাছে এসেছে, প্রথমে নীতু না করলেও পরে মেয়েদের কথা চিন্তা করে রাজি হয়ে যায় ... মেয়েদের বাবা মা চায় তাদের মেয়েরা যেনো নিজেদের রক্ষা নিজেরাই করতে পারে.. নীতু বলে, যত দিন গ্রামে আছি তত দিন শেখাতে পারবো, তারা তাতে রাজি হয়ে যায় ... তারা জিজ্ঞেস করে নীতুকে বেতন কত দিতে হবে ?সে তাদের বলে,আমি তোমাদের টাকার বিনিময়ে শিখাবো, আমি চাই মেয়ে জাতি হিসেবে তোমাদের ও স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার আছে .. তোমরা নিজেকে রক্ষা করতে পারলেই আমার পরিশ্রম সাফল হবে ... সবাইকে বলে আগামী কাল থেকে তাদের সকালে ক্লাস নিবে ...
বাড়ির সকলে তাঁদের পিছনে চুপ চাপ দাঁড়িয়ে ছিল ,, হুট করে ফুপা নীতুকে বলে উঠে , তোমাদের সাথে আমাদের কিছু কথা আছে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে , নাস্তার টেবিলে সবাই এক সাথে আলোচনা করব চলে এসো ....
চলবে ?.........