#আমি_সেই_নীতু
#পর্ব_৩৯
#আনাবিয়া_বৃষ্টি
সকাল থেকেই বাড়িটা অন্যরকম ব্যস্ত। ঘরের ভেতর..বাইরে মানুষের আনাগোনা, কথার কোলাহল, আর বিয়ের কেনাকাটার উত্তেজনায় যেন পুরো বাড়িটাই নড়েচড়ে উঠেছে। সবাই ঢাকা যাবে কেনাকাটা করতে। বড় আব্বু নীতুকেও আর শাহমীর ভাইকেও সবার সঙ্গে যেতে বলেছে।
এক এক করে সবাই গাড়িতে উঠতে শুরু করল। কিন্তু শাহমীর ভাইয়ের গাড়িতে বসা নিয়ে যেন আলাদা যুদ্ধ! মারিয়াম আর ফুয়াদ ভাই অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো..শাহমীর ভাই কাওকেই তার গাড়িতে বসতে দিল না। শেষমেশ বিরক্ত মুখে তারা অন্যদের গাড়িতে উঠে গেল।
নীতু চুপচাপ এসে শাহমীর ভাইয়ের গাড়ির পিছনের সিটে বসে পড়ল।
গাড়ি স্টার্ট দিতেই ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগল। জানালার বাইরে সকালের আলো ছায়ার সাথে মিশে যাচ্ছে। নীতু মনমরা হয়ে পিছনের সিটে বসে আছে। হঠাৎ খেয়াল করল.শাহমীর ভাই লুকিং গ্লাসে বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর সে নিজেই নীরবতা ভাঙল,
ফাইয়াজ: নীল, তুই রিং পরানোর পর থেকে খুব চুপচাপ হয়ে গেছিস। এত কী ভাবিস?
নীতু একটু থেমে বলল..
নীতু: তেমন কিছু না… শুধু ভাবছি, আমরা কি খুব তাড়াহুড়া করছি? আমরা ভুল করছি না তো? আচ্ছা, আমাদের বিয়ের কথাটা প্রথম কে তুলেছিল?
ফাইয়াজ:শুনেছি ফাইজুলই সবাইকে বলেছে এই বাড়িতেই আমাদের বিয়ে হবে।
একটু থেমে সে যোগ করল..
ফাইয়াজ: নিশ্চয়ই ওর কোনো প্ল্যান আছে। তবে আমার মনে হয়, ফাইজুল আমাদের কাজটা আরও সহজ করে দিয়েছে।
নীতু কৌতূহলী হয়ে তাকাল..
নীতু: কীভাবে?
শাহমীর ভাই হালকা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল..
ফাইয়াজ:বলতে পারি… কিন্তু তার আগে আমার পাশে এসে বস। গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার পিছনে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে।
গাড়ি থামতেই নীতু সামনে এসে তার পাশের সিটে বসে পড়ল। সে আবার গাড়ি চালু করল। রাস্তায় গাড়ি চলতে চলতেই সে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল,
ফাইয়াজ: দেখ, ফাইজুলের প্ল্যান যাই থাকুক, আমাদের প্ল্যান সে জানে না। এই বিয়ের সময় সবাই এমনিতেই ব্যস্ত থাকবে। আমরা ফাইজুলকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখব। সেই সুযোগে ওর ঘর তল্লাশি করব। সঙ্গে বড় মামা আর মেজো মামার ঘরেও। কিছু না কিছু তো নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।
নীতু মাথা নাড়ল..
নীতু: হুম… কথাটা মন্দ বলেননি।
কিছুক্ষণ নীরবতা। গাড়ির ভেতর শুধু ইঞ্জিনের শব্দ।
হঠাৎ শাহমীর ভাই জিজ্ঞেস করল,
ফাইয়াজ: তাহলে বল, মন খারাপ কেন তোর?
নীতু জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলল..
নীতু:মন খারাপ না… শুধু যারা অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না।
শাহমীর একটু আবার বলল,
ফাইয়াজ:তুই এই বিয়েতে খুশি নোস, তাই না?
নীতু : হালকা হাসল..
কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই
নীতু :আমার আর খুশি! তবে মানুষ হিসেবে আপনি খুব ভালো। কপাল ভালো না হলে আপনার মতো মানুষ কি জীবনে আসে? আপনি নিজেও তো খুশি নন, তাও সব মেনে নিচ্ছেন। আমি কেন পারব না?
শাহমীর ভাই এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মনে মনে বলল..
ফাইয়াজ:আমি খুশি নই..তোকে কে বলল? আমি খুব খুশি। নিজের ভালোবাসার মানুষকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পাচ্ছি…
কথাটা শেষ করল না সে।
কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতেই লুকিয়ে রইল না বলা হাজারো অনুভূতি।
গাড়ি চলতে থাকল সামনে..ঠিক যেমন তাদের জীবনও এগিয়ে যাচ্ছে এক অজানা মোড়ের দিকে।
তারা কথা বলতে বলতে কখন যে মার্কেটে পৌঁছে গেছে, খেয়ালই ছিল না। তালুকদার বাড়ির সবাই আজ এখানেই..কে কোথায় কী কিনছে, সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। বাজারের কোলাহল, দোকানিদের ডাক, রঙিন কাপড়ের সারি..সব মিলিয়ে একটা ব্যস্ত অথচ অদ্ভুত চাপা উত্তেজনার পরিবেশ।
হঠাৎ শাহমীর ভাই নীতুকে একটা শাড়ির দোকানের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। দোকানের ভেতরে ঝুলে থাকা নীল রঙের একটা শাড়িতে তার চোখ আটকে গেল। শাড়িটা হাতে নিয়ে নীতুর সামনে এসে মুচকি হেসে বলল..
ফাইয়াজ:এই শাড়িটা তোকে খুব মানাবে, দেখিস।
নীতু একটু হেসে মাথা নেড়ে বলল...
—আমি তো শাড়ি পরি না।
শাহমীর ভাই সহজ স্বরে বলল..
— কোনো দিন যদি ইচ্ছে হয়, তখন না হয় পরিস।
এই কথাটুকুর মধ্যেই যেন অনেক না বলা অনুভূতি লুকিয়ে ছিল। তারপর সে তাকে বাকিদের কাছে রেখে কোথায় যেন চলে গেল।
মার্কেটের ভিড়ের মধ্যে নীতু একা দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তখনই মারিয়াম আর ফুয়াদ দৌড়ে এসে হাজির। মারিয়াম উত্তেজিত কণ্ঠে বলল..
— আপু, দেখতো! এই শাড়িটা তোমার বিয়ের জন্য পছন্দ করেছি, কেমন হয়েছে?
ওদের হাতে লাল রঙের একখানা বেনারসি শাড়ি..ভারী কাজ, রাজকীয় আভিজাত্য। নীতু শাড়িটা ভালো করে দেখে হালকা হাসি দিয়ে সম্মতি জানাল। আড়াল থেকে ফুয়াদ আর মারিয়াম চোখাচোখি করে শাহমীর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল তুলে ‘ডান’ জানাল। দূর থেকে শাহমীর ভাই মুচকি হেসে সেটা দেখে নিল, তারপর নিঃশব্দে সরে গেল।
ঠিক তখনই চোখে পড়ল ফাইজুল ভাইকে।নীতু চমকে উঠল।
ফাইজুল তো বাড়িতেই ছিল..এখানে এল কখন?
নীতু দূরে দেখে, শাহমীর ভাই বড় আব্বুর সাথে আলাদা করে কিছু কথা বলছে। কথাবার্তা শেষ করে সে তার কাছে এসে নিচু স্বরে বলল..
— ফাইজুল এখন বাড়িতে নেই। এই সুযোগে ওর ঘরে তল্লাশি নেয়া দরকার। কিন্তু আমরা এখনই গ্রামে যেতে পারবো না, সময় লাগবে।
ঠিক তখনই ফুয়াদ আর মারিয়াম এগিয়ে এসে বলল..
— হাসি আর আসমান ভাই তো তালুকদার বাড়িতেই আছে। আসমান ভাইকে বললে ঘরে তল্লাশি নিতে পারবে। কেউ সন্দেহও করবে না।
শাহমীর ভাই এক মুহূর্ত দেরি না করে আসমান ভাইকে ফোন দিল। ওপাশ থেকে ফোন ধরতেই আসমান ভাই যেন সব বুঝে ফেলেছে এমন কণ্ঠে বলল..
— আমি জানি কেন ফোন দিয়েছো। আমি বড় মামা আর শ্বশুরমশাইয়ের ঘর থেকে অনেক পুরনো কাগজ পেয়েছি। এখন শুধু ফাইজুলের ঘরে ঢোকা বাকি।
শাহমীর ভাই দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— ওয়েল ডান, আসমান। আমরা এখন অনেকটাই নিশ্চিত।
প্রায় এক ঘণ্টা পর আসমান ভাইয়ের কল এলো। সে জানাল..
— অনেক প্রমাণ পেয়েছি। কিন্তু মূল এভিডেন্সগুলো নেই। ফাইজুলের ঘরে একটা লকার আছে, চাবি ওর কাছেই।
শাহমীর ভাই শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল..
— যা পেয়েছো, সব সাবধানে রেখে দাও। বাকিগুলো আমরা বের করবো।
কেনাকাটা শেষ হলে সবাই গ্রামের দিকে রওনা দিল। জিনিসপত্র আনার জন্য বড় আব্বু ফাইজুলকে আলাদা গাড়ি নিয়ে আসতে বলেছিল, তাই সেও তাদের সাথে এসেছে।
গ্রামে তালুকদার বাড়িতে পৌঁছাতেই সবাই যার যার ঘরে চলে গেল। রাত গভীর হওয়ায় বাড়িটা দ্রুত নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।
এই সুযোগে নীতু, মারিয়াম, ফুয়াদ আর আসমান ভাই চুপিচুপি শাহমীর ভাইয়ের ঘরে গেল। আসমান ভাই একে একে যে প্রমাণগুলো পেয়েছে, সব শাহমীর ভাইয়ের হাতে তুলে দিল।
শাহমীর ভাই ধীরে ধীরে প্রতিটি কাগজ পড়ছিল। কাগজগুলোতেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সত্য..
এত বছর ধরে কতজন মেয়ে পাচারের শিকার হয়েছে, কোন কোন দেশে তাদের পাঠানো হয়েছে..সবকিছুর বিস্তারিত হিসাব।
কিন্তু তাতেই শেষ নয়।
এই প্রমাণ যথেষ্ট নয়।
কারা কারা এই অপরাধে সরাসরি জড়িত, তাদের নাম কোথাও লেখা নেই।
ঠিক তখনই নীতুর চোখ একটা কাগজে আটকে গেল।
সেখানে লেখা..
আগামী বছর একসাথে অনেকগুলো মেয়েকে পাচার করা হবে।
তাদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আরও ভয়ংকর বিষয়..
এই কাজে দেশ-বিদেশের নামী-দামি মানুষের নাম জড়ানো।
ফুয়াদ ইতিমধ্যে কম্পিউটারের সাহায্যে তাদের সকল তথ্য বের করে ফেলেছে।
কেউ মন্ত্রী,
কেউ আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়ী..
যাদের চারদিকে সম্মান আর সুনামের মোড়ক।
কাজটা অসম্ভব কঠিন।
বিপদ ভয়ংকর।
কিন্তু এই লড়াই শুধু তাদের না..
এটা তাদের দেশের জন্য।
আর এই লড়াই তাদের লড়তেই হবে।
_________________
এক সপ্তাহ কেটে গেছে চোখের পলকে।
এই কয়েকটা দিন যেন ব্যস্ততার মাঝেই চলে গেছে। প্রতিদিন ভোরবেলা বাচ্চাদের জন্য কিছুটা সময় আলাদা করে রাখা হয়..শরীরচর্চা আর ফাইটিং শেখানোর জন্য। সকালে শিশির ভেজা মাটিতে তাদের ছোট ছোট পা ছুটে বেড়ায়, হাঁপাতে হাঁপাতে তারা শিখে নিচ্ছে আত্মরক্ষা, শিখে নিচ্ছে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে।
আজ সকালটা কিন্তু অন্যরকম।
আজ সকালে বিদেশ থেকে এসে পৌঁছেছেন মারিয়ামের বাবা-মা..যাঁরা এখন নীতুরও বাবা-মা। নিজেদের অসংখ্য ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও, কাজ ফেলে রেখে, শুধুমাত্র তার জন্যই তাঁরা এই দেশে এসেছেন। তাঁদের চোখে ক্লান্তি থাকলেও, তার চেয়েও বড় ছিল আনন্দ আর তৃপ্তি। সেই ভালোবাসা দেখলে বুকটা অজান্তেই ভরে ওঠে।
আজ নীতু আর শাহমীর ভাইয়ের গায়ে হলুদ।
পুরো তালুকদার বাড়ি যেন রূপকথার প্রাসাদে বদলে গেছে। চারপাশ জুড়ে হলুদের আভা..গাঁদা, রজনীগন্ধা, বেলির মালায় সাজানো উঠোন। বাঁশের খুঁটিতে রঙিন কাপড়, আলো ঝলমল করে জ্বলছে ঝাড়বাতি। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কাঁচা হলুদের গন্ধ আর আগরবাতির মিষ্টি ধোঁয়া।
হয়তো এই গ্রামে এই প্রথম এত বড় বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে।
রূপগঞ্জ আর আশেপাশের গ্রামের মানুষদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে গরীব, দুঃখী মানুষদের..যেন এই আনন্দে কেউ বাদ না পড়ে। উঠোনে একপাশে বিশাল হাঁড়িতে রান্না চলছে, অন্যপাশে মেয়েরা হাসতে হাসতে গান ধরেছে। ঢোলের তালে তালে চারদিক মুখর।
এই বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করছে শাহমীর ভাই।
সে নিজেই স্পষ্ট করে এই কথা বলেছে..কোনো দ্বিধা ছাড়াই। তার কণ্ঠে ছিল দায়িত্ব আর গর্বের মিশেল, যেন এই আয়োজন তার হৃদয়েরই অংশ।
সন্ধ্যার দিকে নীতুকে সাজাতে বসে সবাই।
হলুদ শাড়ি, ফুলের গয়না, চুলে বেলির মালা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখে । হলুদের আলোয় মুখটা অন্যরকম লাগছে..চেনা, আবার অচেনা। চোখের ভেতর জমে আছে কত স্মৃতি, কত প্রশ্ন।
এটা তার জীবনের দ্বিতীয় গায়ে হলুদ।
গতবার গায়ে হলুদ হয়েছিল, কিন্তু বিয়ে হয়নি। সেই স্মৃতি আজও কোথাও একটা খচখচ করে। আজ সব কিছু এত বড় করে হচ্ছে, এত মানুষের ভিড়, এত আলো..তবুও মনের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কা চুপচাপ বসে আছে।
এবার?
নিজের অজান্তেই প্রশ্নটা মনে ভেসে ওঠে।
ঠিক তখনই, ভাবনার মাঝখানে..
পিছন থেকে হঠাৎ কেউ ডেকে ওঠে।
“ধ্বংসবতী………!”
চলবে ? ..........