ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমি সেই নীতু

৪৭তম পর্ব

লেখক: আনাবিয়া বৃষ্টি

#আমি_সেই_নীতু

#পর্ব_৪৭

#আনাবিয়া_বৃষ্টি

নিশ্ছিদ্র রাত।

চাঁদের আলো বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে ফাইজুলের ঘরে ঢুকে পড়েছে। সে চৌকির ওপর আড়াআড়ি শুয়ে,পায়ের ওপর পা, মাথার নিচে দু’হাত...... আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। নক্ষত্রগুলো আজ যেন একটু বেশি নীরব, একটু বেশি দূরে। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো গলার কাছে এসে থেমে যায়, আর সে ধীরে ধীরে গুনগুন করে ওঠে,

🎤

ঝাপসা মনের খামে চেনা চেনা বদনামে

অচেনা ধুসর যেনো সব

প্রিয় সেই চিরকুটে অভিমান আজও জোটে

কত হয়েছে অনুভব (2x)

কি আশায় রাত্রি হলো দিন?

পোষ হয়েছে আষিন

চৌচির বুকেরই জমিন

তবু তুমি উদাসীন

হারানোর আর কিছু নাই বাকি

গান থেমে যায়।

ফাইজুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশের দিকে তাকিয়েই সে কথা বলে,।

— কেন বুঝলে না, ধ্বংসবতী?

আমি যে তোকে ভীষণ ভালোবাসি। কেন আবার ফিরে এলে আমার জীবনে।শুধু বিরহের আগুন জ্বালাতে? তুই তো একদিন আমারই ছিলি… আজ কী করে অন্যের ঘরে চলে গেলি?

তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। চোখের কোণে জমে থাকা জল চাঁদের আলোয় চিকচিক করে।

আমি ভুল করেছি, মানি। তবু তোর জন্য সব ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম আমি। তাহলে কেন ফিরলি না? কেন আমাকে একা রেখে গেলে? তুই তো এখনও শান্তি খুঁজে পাচ্ছিস না..সবই যেন নামের সুখ। আমি কী দোষ করেছিলাম বল?

কিছুক্ষণ চুপ। শুধু দূরের কুকুরের ডাক, আর বাতাসে পাতার মর্মর।

আমায় ভালোবেসে পাশে থাকলে কি তোর জীবনের খুব বড় ক্ষতি হয়ে যেত? জানিস, তোর জন্য আমি সবকিছু উজাড় করতে পারতাম..নিজেকে পর্যন্ত। আমি শুধু চাইতাম,তুই আমার হো..কারণ তুই আমার হোক… অন্তত আমার ভালোবাসাটুকু বুঝিস।

বারান্দার আলোটা ঝিমিয়ে আসে।

শেষবারের মতো সে ফিসফিস করে বলে,

হয়তো কিছু গল্প অপূর্ণই থাকার জন্য হয়।

হয়তো কিছু ভালোবাসা শুধু মনে থাকার জন্য।

তবু জানিস ধ্বংসবতী...

এই আকাশ, এই রাত, এই নীরবতা…

সবকিছুর ভেতর আজও তুই আছিস।

ফাইজুল চোখ বন্ধ করে।

আকাশটা ঝাপসা হয়ে যায়।

ফাইজুল আবার চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নক্ষত্রগুলো নির্বিকার।

রাত আরও ঘন হয়, আর তার বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো নীরবে চোখের জলে গলে পড়ে।

____________

কিছু দিন কেটে যায়…

ফুপি আগের মতো নেই। ঠিকমতো খাচ্ছে না, কারও সঙ্গে কথাও বলছে না। সারাক্ষণ যেন এক অদৃশ্য শূন্যতার ভেতর ডুবে থাকে। মুখে কিছু না বললেও চোখের ভাষা খুব স্পষ্ট এই বাড়িতে তার দমবন্ধ হয়ে আসছে।

এই অবস্থা দেখে বাড়ির সবাই চিন্তিত। একসময় সিদ্ধান্ত হয় ঢাকা যেতে হবে। যদিও নীতুদের মিশন এখনো শেষ হয়নি, তাদের এখানেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু ফুপি আর এই বাড়িতে থাকবে না, এটাই শেষ কথা। তার এই অবস্থার কাছে সব যুক্তি হার মানে।

আর ঢাকায় যাওয়ার আরেকটা বড় কারণ আছে, ফুয়াদ আর মারিয়ামের বিয়ে।

বড় আব্বু ভেবেছেন, বাড়িতে আবার যদি হাসি-আনন্দ, অনুষ্ঠান আর হইহুল্লোড় ফিরে আসে, তাহলে হয়তো সব কিছু আগের মতো হয়ে যাবে। সেই আশায় তিনি মারিয়ামের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা এই বিয়েতে রাজি।

ফলে সিদ্ধান্ত পাকাপাকি।বিয়ের উপলক্ষে তালুকদার বাড়ির সবাই ঢাকা যাবে।

ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো সবাই।

দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তিকর সফরের পর অবশেষে তাদের গাড়ি ঢাকায় এসে পৌঁছায়। সন্ধ্যার আলো তখন শহরের আকাশে মিশে গেছে। বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থামতেই দারোয়ান দৌড়ে এসে গেট খুলে দেয়। ভারী লোহার গেট ধীরে ধীরে খুলে গেলে গাড়ি ভেতরে ঢুকে পড়ে।

গাড়ি থেকে নেমে সবাই যে যার মতো নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। বাড়ির কাজের লোক বড় চাচাদের গেস্ট রুম দেখিয়ে দেয়। তারাও বিশ্রামের জন্য ঘরে চলে যান।

শাহমীর ভাই এসেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে সেদিনের পর থেকে তাকে আরও চুপচাপ মনে হয়। কথা কম, চোখে গভীর এক ক্লান্তি।

ফুপি এখন একা থাকতে পছন্দ করে। কারও সঙ্গে বিশেষ মিশছে না।

বাড়ির সব দায়িত্ব যেন হঠাৎ করেই বড় আম্মুর কাঁধে এসে পড়েছে।

নীতু জানে এই বাড়ির বউ হিসেবে তারও একটা দায়িত্ব আছে। তাই সন্ধ্যায় নিজেই সবার জন্য নাস্তা তৈরি করতে রান্নাঘরে চলে যায়।

রান্নাঘরে তখন গরম চায়ের সুবাস, ভাজা খাবারের মচমচে শব্দ সব মিলিয়ে একটা আপন অনুভূতি।

খাবার তৈরি করে যখন টেবিলে সাজাচ্ছিল, ঠিক তখনই বড় আম্মু এসে দাঁড়ালেন।

তিনি একটু অবাক হয়েই বললেন,

— একি! তুমি এগুলো কেন করতে গেলে? আমি তো করতে আসছিলাম।

নীতু হালকা হাসি নিয়ে বলল,

— তা কি করে হয়? আমিও তো এই বাড়ির বউ। আমারও তো কিছু দায়িত্ব আছে, তাই না? তার ওপর শাহমীরের মা খুব অসুস্থ। সব কাজ আপনি একা করবেন কী করে?

বড় আম্মু মৃদু হেসে চোখে একটু শাসনের ছাপ এনে বললেন,

— বরের মা’কে এইভাবে বলে? শাহমীরের মা তো তোমারও মা।

নীতু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে শুধু বলল,

— জ্বি…

এক এক করে সবাই নিচে নেমে আসে।

ডাইনিং টেবিল ঘিরে পরিবারের মানুষগুলো বসে। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, নাস্তার গন্ধে ঘর ভরে গেছে। সবাই মন দিয়ে খাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর চারদিক থেকে প্রশংসার শব্দ ভেসে আসে,

—খুব ভালো হয়েছে

—আজকের নাস্তা দারুণ!

এই প্রশংসায় বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করে নীতু।

ঠিক তখনই বড় চাচা কথা বলেন,

— তাইলে ভাইজান, বিয়ের কেনাকাটি তো এহনো বাকি। মানুষগো দাওয়াত দিতে হইবো, বাড়ি সাজানো সবই তো বাকি। বিয়ের দিন তো ঘনিয়ে আসছে।

বড় আব্বু গম্ভীর কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলেন,

— হ্যাঁ, কাল থেকেই সবাই কাজে লেগে পড়বেন। সবাই হাতে হাতে কাজ করলে খুব তাড়াতাড়ি সব এগিয়ে যাবে।

_________

সকালের আলো ঠিকরে পড়তেই পুরো বাড়িটা যেন এক নিমিষে বদলে গেল।

আজ গায়ে হলুদ

বাড়ির প্রতিটা কোণে ব্যস্ততার ছোঁয়া।

আঙিনায় মহিলাদের ভিড়,

কেউ শাড়ি ভাঁজ করছে, কেউ গয়নার বাক্স খুলে আবার বন্ধ করছে,

কেউ রান্নাঘরে ঢুকে ঢেকে রাখা হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে স্বাদ নিচ্ছে।

হলুদ, মেহেদি, আতরের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

বাড়ির পুরুষেরা কেউ ফুলের মালা ঝুলাচ্ছে,

কেউ রঙিন লাইট লাগাচ্ছে ছাদের কার্নিশে,

কেউ আবার বিশাল হাঁড়িতে মাংস বসানোর তদারকিতে ব্যস্ত।

অথচ

যাদের বিয়ে, তাদের কোনো হদিস নেই!

ঠিক সেই সময়,

ফুয়াদ হঠাৎ করেই মারিয়ামের হাত চেপে ধরে প্রায় জোর করেই ছাদের দিকে নিয়ে যায়।

ছাদের দরজা বন্ধ হতেই মারিয়াম বিরক্ত গলায় বলে ওঠে,

— আমায় ছাদে আনলে কেনো? মানুষ দেখলে কী ভাববে?

ফুয়াদ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলে,

— কে কী ভাবলো তাতে আমার কী? আমি আমার বউকে নিয়ে এসেছি। কে কী বলবে?

— এখনো বউ হইনি, বুঝলেন?( মারিয়ামের চোখে রাগ আর লজ্জা একসাথে।)

— তাতে কী? দু’দিন পর তো হবেই। তবে আমার একটা প্ল্যান আছে।

মারিয়াম সন্দেহভরা চোখে তাকায়,

— কি প্ল্যান?

ফুয়াদ ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে নিচের উঠোনের দিকে তাকিয়ে বলে,

— এই যে দেখো, শাহমীর ভাই আর ভাবির বিয়ের তিন-চার মাস হয়ে গেল, এখনো কিছু করলো না। কিন্তু আমরা ওদের আগেই বাচ্চা নিয়ে নিবো। এবার আর ভাইয়ার থেকে পিছিয়ে থাকবো না।

মারিয়াম আঁতকে ওঠে,

— মাথা খারাপ হয়েছে তোমার?

ফুয়াদ গম্ভীর গলায় বলে,

— ভাবো তো..বাবা এই বাড়ির বড় ছেলে হয়েও ভাইয়া আগে জন্ম নিলো। বড় অফিসার হলো, আমার আগে বিয়ে করলো। এবার অন্তত এই জায়গাটায় আমি এগিয়ে থাকবো।

— তোমার মাথা পুরোপুরি গেছে!

— চলো, নিচে যাই।

ফুয়াদ হাত ধরে থামাতে চায়,

— দাঁড়াও, কিছু কথা বলি…

— তোমার দুষ্টু-মাখা কথা শুনতে ইচ্ছা করছে না। আমার শাহমীর ভাইয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে।

ফুয়াদ একটু অবাক

— কেনো?

মারিয়ামের কণ্ঠ নরম হয়ে আসে,

— ভাইয়ার হৃদয়ে কত কষ্ট জমে আছে দেখো। ভালোবাসার মানুষকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পেয়েও সুখী হতে পারলো না। নিজের বাবাকে নিজের হাতে শেষ করলো… জানাজা পর্যন্ত দিলো না। মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে,ভাইয়ার হৃদয়ে কি সত্যিই বলার মতো কিছু নেই?

ফুয়াদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে,

— আছে। কিন্তু ভাইয়া এমনই। চুপচাপ। কাউকে নিজের মনের কথা বলে না।

— শুনেছি ছোটবেলায় সে এমন ছিল না। আমার মতোই দুষ্টু ছিল।

মারিয়াম মনোযোগ দিয়ে শোনে।

— একদিন একটা অনুষ্ঠানে সবাই বাহিরে যায়। ভাইয়া তখন অসুস্থ ছিল, জোর করেই বাড়িতে থাকে। আমি তখন খুব ছোট।

— ফিরে এসে সবাই দেখে,ভাইয়া নিচে পড়ে আছে। জ্বরের তাপে শরীর পুড়ছে। টানা এক মাস সেই জ্বর। তারপর থেকেই সে বদলে যায়। একদম শান্ত।

মারিয়ামের চোখে অজানা আশঙ্কা,

— কিছু তো একটা হয়েছিল, তাই না?

— হ্যাঁ…

ফুয়াদ গলার স্বর নামিয়ে আনে।

— চলো, নিচে যাই। আমারও মনটা খারাপ হয়ে গেল।

________

হঠাৎ

বুম!

কে বা কারা যেন গুলি করে।

শাহমীর ভাই ছিটকে নিচে পড়ে যায়।

চারিদিকে রক্ত…মানুষের চিৎকার…

হুট করে ঘুম ভেঙে যায় নীতুর।হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশে তাকায়।শাহমীর নেই।

ভয়ে বুক ধকধক করতে থাকে।

খাট থেকে নামতেই দরজা খুলে শাহমীরয়ের ঘরে ঢোকে।

নীতু দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।

শাহমীর মুচকি হাসে।

— কি হয়েছে?

— আপনি ঠিক আছেন?

— আমি ঠিক আছি। কী হয়েছে?

সে নীতুর বাহুতে হাত রাখে।

— আমি দুঃস্বপ্ন দেখেছি। আপনাকে কেউ গুলি করেছে…

— আমার কিছু হয়নি। এই যে আমি ঠিক আছি। কে মারবে আমায়?

কিছুক্ষণ পর,

নীতু একটু শান্ত হলে শাহমীর বলে,

— আমি বের হচ্ছি। রাতে ফিরবো। অফিসে কাজ আছে।

— আজ কিসের কাজ? আজ তো ফুয়াদ ভাইয়ের গায়ে হলুদ!

— সন্ধ্যায় চলে আসবো।

— ঠিক আছে। সাবধানে থাকবেন।

— জ্বি ম্যাডাম,আসছি...

নীতু দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে....তার মনের ভেতর অজানা শঙ্কা জমে ওঠে।

চলবে ? ................

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন