#জেহের_এ_ইস্ক ৪
#সানজিদা_বিনতে_সফি
রূপকথা নিখোঁজ। পুরো এলাকায় এই একটা বাক্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেছে। নিয়াজ মাস্টার মেয়ে কে পাগলের মতো খুঁজছে চারিদিকে। চারিদিকে কানাঘুষো। মেয়েটা নিশ্চিত জমিদার বাড়ির কাজের লোক হওয়ার ভয়ে পালিয়েছে। কেউ কেউ আবার বলছে জমিদাররাই হয়তো গুম করে দিয়েছে। এতো সাহস দেখিয়েছে এই মেয়ে! মুখের উপর গালাগালি করেছে। কাল তো শেহরোজ শেখের মাথা ই ফাটিয়ে দিয়েছে! এমনি এমনি ছেড়ে দিবে ভেবেছো? নিশ্চিত মেরে গুম করে দিয়েছে।
সকালের নাশতা সেরে শেহরোজ বেরিয়েছে ঢাকার উদ্দেশ্যে। দারোয়ান তার ব্যাগ এনে গাড়িতে রাখছে। শেহরোজ জমিজমার বিষয় নিয়ে গাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে কথা বলছে শাহ আলমের সাথে। ঠিক তখনই নিয়াজ মাস্টার ছুটে এসে শেহরোজের সামনে হাত জোর করে কাদতে কাদতে বলল,
“আমার মেয়েটা কে খুঁজে দিন মেজো সাহেব৷ আমার মেয়েটা রাত থেকে নিখোঁজ! একটা মাত্র মেয়ে আমার। থানা থেকে কোন সাহায্য করছে না৷ আপনি ই কিছু করুন। দয়া করুন আমাদের উপর।”
শেহরোজ শান্ত গলায় বলল,
“থানায় যান। আমি ফোন করে দিচ্ছি৷ পুলিশ অবশ্যই সাহায্য করবে।”
নিয়াজ মাস্টার নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইলেন। সে জানে, এইকাজ শেহরোজ ছাড়া আর কেউ করে নি৷ কিন্তু সে তো এই কথা মুখেও আনতে পারবে না। মেয়েটা যে এখনো তাদের জিম্মায়! শাহ আলমের মুখে বাকা হাসি। নিয়াজ মাস্টার শেহরোজের সামনে হাতজোড় করে বলল,
“মেয়েটা কে পেলে আমি এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবো সাহেব। আমি কথা দিচ্ছি। আপনি আমার মেয়েটাকে এনে দিন। ওর সব অন্যায়ের জন্য আমি ক্ষমা চাইছি। ক্ষমা করে দিন আমার মেয়েটাকে। ছোট মানুষ, অত কিছু বুঝে কথা বলে না। নিয়ম নীতি জানে না৷ আপনারা বড়ো মানুষ। ছোট ভেবে ক্ষমা করে দিন। আমি আপনার পায়ে ধরছি।”
নিয়াজ মাস্টার শেহরোজের পায়ে হাত দিতে নিতেই শেহরোজ তাকে থামিয়ে দিল।
নিয়াজ মাস্টারের কাঁপা কাঁপা হাত দুটো নিজের হাতের স্পর্শে আটকে দিল শেহরোজ। বৃদ্ধ একজন শিক্ষক তার সামনে নতজানু হচ্ছেন, দৃশ্যটা দেখে এক মুহূর্তের জন্য শেহরোজের পাথরের মতো শক্ত মনেও কোথাও যেন একটু চিড় ধরল। তবে পরক্ষণেই রূপকথার দেয়া চোট আর কালকের বিষাক্ত গালিগুলোর কথা মনে পড়ে গেল তার।
শেহরোজ হাত ছেড়ে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"মাস্টার সাহেব, বয়সের দিক থেকে আপনি আমার বাবার বয়সী। আপনার হাত আমার পায়ে শোভা পায় না। আর রইল আপনার মেয়ের কথা, আমি তো কালই বলেছিলাম, ওকে ভালো কোনো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। ওর মাথায় গোলমাল আছে। এখন কাল রাতে সে যদি নিজের খেয়ালে বাড়ি ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাকে, তার দায়ভার তো আর জমিদার বাড়ি নেবে না?"
শাহ আলম এবার পাশে থেকে কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে বলে উঠল,
"মাস্টার, তোমার মাইয়া কোনো পুতুল নাকি যে কেউ আইসা চুরি কইরা লইয়া যাইবো? নির্ঘাত হেই কালরাতেই কোনো নাগরের লগে কাইট্যা পড়ছে! এমনেই তেজের সীমা আছিল না, এখন আবার কুলটাগিরি শুরু করছে। নিজের মাইয়ারে সামলাইতে পারো নাই, এখন এইখানে আইছো ভ্যানভ্যান করতে?"
শাহ আলমের এমন বিষাক্ত কথায় নিয়াজ মাস্টারের চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি নিঃশব্দে কেবল মাথা নিচু করে রইলেন। শেহরোজ আড়চোখে একবার বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল। ভাইয়ের ওপর বিরক্তি বাড়লেও মুখে কিছু বলল না সে। সে গাড়ির পেছনের সিটের দরজা খুলে বসতে বসতে নিয়াজ মাস্টারের উদ্দেশ্যে বলল,
"আমি ওসি সাহেবকে বলে দিচ্ছি। পুলিশ ওদের মতো চেষ্টা করবে। আপনি বাড়ি যান।"
কথা শেষ করেই ড্রাইভারে উদ্দেশ্যে গাড়ি ছাড়ার ইশারা দিল সে। কালো রঙের দামি গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে জমিদার বাড়ির উঠোন পেরিয়ে মেইন রোডে উঠে গেল।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই শেহরোজ পকেট থেকে ফোন বের করল। তবে ওসিকে নয়, সে ফোন করল আজগরকে।
"আজগর, সব ঠিক আছে?"
ওপাশ থেকে আজগর নিচু স্বরে বলল,
"জি ভাই। সব ঠিক আছে। মাইয়াডা সকাল থেইক্কা এক ফোঁটা পানিও মুখে দেয় নাই। ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র ভাইঙ্গা চুরমার করতাছে। ওরে সামলানো কঠিন হয়া যাইতাছে ভাই।"
শেহরোজের ঠোঁটের কোণে হিমশীতল হাসি ফুটে উঠল।
"করতে দে। ভুলেও বাঁধন খুলবি না। আমি ৩-৪ দিনের জন্য ঢাকা যাচ্ছি। আর শোন, মাস্টারের ওপর যেন কোনো পুলিশি দৌড়ঝাঁপ না হয়, ওসিকে বলে দে তদন্ত যেন নামকাওয়াস্তে চলে।"
"ঠিক আছে ভাই।"
ফোন রেখে শেহরোজ গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। জমিদার বাড়ির বিরুদ্ধে লড়াই করবে? এত সোজা? এই ৪-৫ দিনের নির্জনবাসেই রূপকথার রক্তে থাকা সব তেজ আর অহংকার বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।
এদিকে ধানের বিলের মাঝখানের নির্জন খামারবাড়ির অন্ধকার ঘরে রূপকথা। ঘুম ভাঙ্গতেই শরীরে অসহ্য ব্যথা আর নিজের শরীরের হাল দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে৷ জানোয়ার টা ঠিক নিজের রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। সে তো সব ধরনের ক্ষতির জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিল৷ তবে কেন আজ বুকের ভেতর এতো যন্ত্রণা হচ্ছে৷
রূপকথা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো। এত সহজে হার মানার পাত্রী নয়। একবার সুযোগ হোক, ওই জমিদারের মেশিন কেটে নপুংসক করে দেবে সে। জাউরা একটা আস্ত শুয়োর।
রূপকথা নিজের সমস্ত রাগ উগরে দিচ্ছে। আজগর বাইরে বসে বিড়ি টানছিল। রূপকথার গালি শুনে সে বিড়ি টানতে ভুলে গেল।
“শুয়োরের বাচ্চা, সাহস থাকলে আমার হাত খোল! সব কয়টার মুণ্ডু কেটে যদি ফুটবল না খেলছি, আমার নাম ও রূপকথা না। কাপুরুষের বাচ্চা, মেয়ে মানুষ দেখলেই কুত্তার মতো ঝাপায়ে পড়তে ইচ্ছে করে? একবার শুধু আমার সামনে আয় তুই শুয়োর, আমি তোর **** কেটে নেবো বদমায়েশের জাত।”
আজগর চোখ মুখ বন্ধ করে কল করলো শেহরোজের কাছে। কারণ কাল শেহরোজ শক্ত গলায় বলে গিয়েছে, কেউ যেন রূপকথার গায়ে হাত দেয়ার দুঃসাহস না করে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে এই মেয়ের মুখ বন্ধ না করলে তো ইজ্জত কফিনে পুরে পেরেক মেরে দিবে এই দজ্জাল।
শেহরোজের চোখ লেগে এসেছিল৷ ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো তার। আজগরের নম্বর দেখে সাথে সাথেই কল রিসিভ করলো সে।
“হ্যাঁ, বল।”
“ভাই, মাইয়া তো চিল্লায় বাড়ি মাথায় তুলছে। আশেপাশে ধানের জমি। কামলারা কাম করতাছে। চিল্লানি শুইনা এইদিকে আইয়া পড়লে তো ঝামেলা হইয়া যাইবো!”
শেহরোজ মনে মনে হাসলো।
“কান্নাকাটি করছে?”
আজগর হড়বড় করে বলল,
“না ভাই। আপনেরে যেই গালি দিতাছে! বাবা রে বাবা! শুয়োর থেইক্কা কুত্তা কিছু কওয়া বাদ দেয় নাই।”
আজগর গলার স্বর আরেকটু খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ভাই, হেয় তো আপনেরে কাপুরুষ ও কইছে। আরো কইছে আপনের নু** কাইটা কুত্তা দিয়া খাওয়াইবো, মাথা কাইট্টা ফুটবল খেলবো। কসম!”
শেরোজের মেজাজ খারাপ হলো। মুখটাও গম্ভীর হয়ে গেছে তার। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ঠান্ডা স্বরে বলল,
“মুখ বেধে দে।”
“আইচ্ছা ভাই।”
“নিজের মুখটাও কন্ট্রোলে রাখতে শিখ।”
“ঠিক আছে ভাই।”
শেহরোজ প্রচন্ড মেজাজ খারাপ নিয়ে কল কাটলো। এই মেয়ে কে সহজে শায়েস্তা করা যাবে না, সে পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। তবে সেও হাল ছাড়ার পাত্র না। প্রয়োজনে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিবে৷ তবুও বেয়াদবি সহ্য করবে না। বেঁচে থাকার সুযোগ তো দিয়েছে সে। এখন যেচে মরতে চাইলে তার ই বা কি করার আছে?
রূপকথার হাত বাঁধা থাকলেও সে বুদ্ধি খাঁটিয়ে খাটের কোণায় বারবার ঘষে নিজের হাতের বাঁধন সামান্য ঢিলে করে ফেলেছে। দরজার বাইরে দুই পাহাদার বসে চা খাচ্ছে আর তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।
রূপকথা হাত থেকে দড়িটা এক টানে খুলে ফেলল। তারপর নিঃশব্দে দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা কাঠের ভাঙা পাইপটা শক্ত করে হাতে তুলে নিল সে।
শেহরোজ শেখ ভেবেছে তাকে আটকে রেখে সে নিশ্চিন্তে ঢাকা চলে যাবে? রূপকথা তো আগেই বলেছে, সে জমিদার বাড়ি ধ্বংসের কালবৈশাখী হয়ে এসেছে। আর এই কালবৈশাখীর প্রথম ঝাপটাটা পড়বে আজ এই খামারবাড়ির ওপর!
রূপকথা বিরবির করে বলল,
“আমাকে ছুয়ে বড্ড বেশি ভুল করে ফেলেছো জমিদার পুত্র। তোমার এই ছুয়ে দেয়াই কাল হবে তোমার শালা লম্পট কোথাকার!”
*****
রাত প্রায় দুটো। শেহরোজ নিজের অফিসেই ছিল৷ হুট করে তার ফোনে আজগরের কল দেখে বিরক্ত হলো সে। মেয়েটা নিশ্চিত আবার কোন ঝামেলা করেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোন রিসিভ করলো সে। ওপাশ থেকে আজগর হায় হায় করে বলল,
“ভাই, ওই মাইয়া তো পুরো বাড়িতে আগুন লাগায় দিছে। গরু বাছুর, হাস মুরগী সব শেষ! খোয়ার খুইলা দিছে সব। হাস মুরগী গরু কিছু বাইর হইতে পারলেও বাকি গুলা খোয়ারের ভিতরেই।”
শেহরোজ সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেছে। রাগে থরথর করে কাপছে সে।
“তোরা কি করতাছোস? আগুন নিভা জলদি।”
শেহরোজ রীতিমতো চিৎকার করছে। আজগর কাচুমাচু করে বলল,
“ভাই, মাইয়া তো আমাগো ঘরের ভিতরে আটকায় বাইরে দা লইয়া খাড়ায় আছে। বাইর হইলে নিশ্চিত কো বাইবো!’’
শেহরোজ চোখ বন্ধ করে ফেললো। রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“আমি আসছি। শালি রে ওই পোড়া ছাইয়ের ভেতরেই কবর দিবো আমি।”
শেহরোজ গাড়ির চাবি নিয়ে একপ্রকার দৌড়ে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে।
রূপকথা দা হাতে দাঁড়িয়ে। অবিন্যস্ত চুল আর পোশাকে তাকে ধ্বংসের দূত মনে হচ্ছে। আজগর আরেকবার দরজা খোলার চেষ্টা করতেই রূপকথা অগ্নিদৃষ্টিতে তকালো দরজার দিকে। আজগর থেমে গেল। থরথর করে কেপে উঠলো তার পুরো শরীর। এই রূপ যে তার চেনা! তবে কি এই মেয়ে ই সে!?
চলবে,৷