প্রথম পর্ব
আজকের দিনটা যেন আরশির জন্য বেশ সুন্দর।
কয়েকদিন পর তার বড় বোন আইরিনের বিয়ে। বিয়ের শপিং করার জন্য আরশি হোস্টেল থেকে এসেছে। তার বড় বোন ও বড় বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজনও শপিংমলে এসেছে।
আরশি তার প্রিয় বান্ধবী ইসরাতকে শপিংমলে আসতে বলেছিল। ইসরাতও আরশির সঙ্গে দেখা করতে সেখানে আসছিল।
আরশি ইসরাতের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে শপিংমলের ভেতর দিয়ে হাঁটছিল। ফোনে কথা বলায় সামনে ঠিকমতো খেয়াল করছিল না সে।
আরশি একজন ছেলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গেল।
তার হাতে থাকা কফিটা ছিটকে গিয়ে ছেলেটার জামার ওপর পড়ল।
আরশি সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা নামিয়ে বলল,
—সরি! আমি সত্যিই সরি বলছি। আমি খেয়াল করিনি।
ছেলেটা নিজের জামার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
—সামনে না তাকিয়ে হাঁটছিলেন কেন?
আরশি শান্তভাবে বলল,
—আমি তো সরি বলেছি। ইচ্ছা করে তো আর করিনি!
আরশি চলে যেতে ঘুরতেই ছেলেটা হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।
আরশি রেগে গিয়ে বলল,
—এই! আমার হাত ধরেছেন কেন? ছাড়ুন!
ছেলেটা বলল,
—আমার জামার এই অবস্থা করে শুধু সরি বলেই চলে যাবেন?
আরশির রাগ এবার আরও বেড়ে গেল।
—আমি আপনাকে সরি বলেছি, তারপরও আপনি আমার হাত ধরে রাখছেন কেন? অসভ্য! অভদ্র লোক!
এই বলে আরশি নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে ইসরাতের দিকে এগিয়ে গেল।
ছেলেটাও সেখান থেকে চলে গেল।
পরের দিন আরশিকে বাড়িতে ফিরতে হলো। কারণ, শিক্ষামন্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে তাদের স্কুলে নতুন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে আসছে।
গতকাল ট্রেনে করে বাড়ি ফিরতে হওয়ায় রাতে ঘুমাতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল আরশির। তাই সকালে ঘুম থেকেও উঠতে দেরি হয়। সবকিছু গুছিয়ে তৈরি হতে হতে তার বেশ লেট হয়ে গেল।
আজকের দিনটা যেন বেশ সুন্দর।
আরশি পরেছে নীল রঙের শাড়ি। কানে ছোট্ট একটা ঝুমকা। এবং হাঁটু সমান চুল গুলো ছাড়া বেশ সুন্দর মানিয়েছে।ইসরাত আর আরশি আগেই ঠিক করে রেখেছিল, তারা দুজনেই নীল শাড়ি পরবে। নাবিলা পরেছে পারপেল রঙের শাড়ি আর ইরা পরেছে গোল্ডেন রঙের শাড়ি।
ইরা, নাবিলা আর ইসরাত আগেই চলে এসেছিল। আরশি দেরি করায় তারা তার জন্য অপেক্ষা করছিল না। অবশ্য ইসরাত থাকতে চেয়েছিল কিন্তু আরশি তাকে জোর করে পাঠিয়েছিল তার ধারণা যদি অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায় যদি ইসরাতের লেট হয়ে যায়।
এদিকে সাকিব, তানভীর আর শুভও ভেতরে বসে ছিল। তাদের সঙ্গে তাদের নতুন বন্ধু শুদ্ধও ছিল।
আরশি তাড়াহুড়ো করে আসতে আসতে হঠাৎ একজন ছেলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গেল।
—সরি ভাইয়া!
এই বলে আরশি দৌড়ে চলে গেল।
ছেলেটা কিছু বলার সুযোগই পেল না। শুধু পিছনে ফিরে তাকিয়ে রইল নীল শাড়ি পরা মেয়েটার চলে যাওয়ার দিকে। হাঁটু সমান চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে।
অন্যদিকে ইসরাত বাইরে দাঁড়িয়ে আরশির জন্য অপেক্ষা করছিল।
কিছুক্ষণ পর আরশি হাঁপাতে হাঁপাতে ইসরাতের কাছে এসে দাঁড়াল।
—বান্ধবী, তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি!
ইসরাত অবাক হয়ে বলল,
—কী এনেছিস? আর এত লেট করলি কেন? আর তোকে অনেক সুন্দর লাগছে।
আরশি মুচকি হেসে বলল,
—দেখ বান্ধবী, তোর জন্য গাজরা এনেছি। তোর না গাজরা অনেক পছন্দ?
ইসরাত হেসে বলল,
—আমিও তোর জন্য এনেছি!
দুজন গল্প করতে করতে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ পেছন থেকে সাকিবের কণ্ঠ ভেসে এল,
—তোদের কথা বলা কি আর শেষ হবে না? ভেতরে চল। তানভীর, শুভ, ইরা আর নাবিলা সবাই ভেতরে বসে আছে।
আরশি আর ইসরাত একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
—আচ্ছা, চল।
তারা ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি ছেলের কণ্ঠ শোনা গেল,
—এই যে, তোমার নামটা কি শুনতে পারি?
আরশি থেমে পিছনে তাকাল।
ছেলেটা আবার বলল,
—তোমার নামটা বলবে, প্লিজ?
আরশি তাকে চিনে সাকিবের সাথে দেখছিল।
আরশি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আমার নাম দিয়ে তোমার কী কাজ? কাজ থাকলে বলো।
ছেলেটা হেসে বলল,
—প্লিজ বলো না।
ওখানে অনুষ্ঠান শুরু হতে চলল।
আরশি বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমার নাম আয়েশা ইসলাম আরশি।
এই বলে সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ইসরাতের সঙ্গে ভেতরে চলে গেল।
আরশি যাওয়ার সময় পিছনে ঘুরে একবার দেখল
আরশি নিজে ও জানে না সে নাম কি জন্য বলল হয়তোবা সাকিবের বন্ধু ভেবে বলে দিয়েছে
ছেলেটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে।
কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শুরু হলো।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে তাদের স্কুলে নতুন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছে—তাই তাকে স্বাগত জানানোর জন্য অনুষ্ঠানটি বেশ বড় করে আয়োজন করা হয়েছিল।
স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানস্থল জমজমাট হয়ে উঠেছিল।
মঞ্চে নতুন শিক্ষককে ডাকা হলো।
আরশি কৌতূহল নিয়ে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইল। বীর ও চেঁচামেচি তে থাকায় ভালোভাবে দেখতে পারছে না
মাইক্রোফোনে তার নাম ঘোষণা করা হলো—
—আজ আমাদের স্কুলে নতুন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন ইফতিয়াজ খান আয়ন নামটা সঠিকভাবে না শুনলেও আয়ন নামটা ঠিকই শুনছে।
নামটা শুনেই আরশি মঞ্চের দিকে ভালোভাবে তাকালো নতুন স্যারের মুখটা দেখেই বিস্মিত হয়ে গেল।
তার চোখ আটকে গেল মঞ্চের দিকে।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল মার্কেটের সেই দিনের কথা।
এই তো সেই ছেলে!
যার জামায় তার হাতের কফি পড়েছিল। যাকে সে সরি বলেছিল। আর যে আর হাত ধরেছিল এবং আরশি
তার হাত ছাড়িয়ে চলে গিয়েছিল। এবং একটু আগে তার সাথে মনে হয় ধাক্কা লেগে ছিল।
আরশি মনে মনে বলল,
—তার মানে এই ছেলেটাই আমাদের নতুন শিক্ষক!
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই আয়নের চোখ আরশির দিকে পড়ল। চোখাচোখি হতেই আরশি চোখ সরিয়ে নিল ।
আয়নও যেন তাকে চিনতে পেরে গেল।
সে রাগী দৃষ্টিতে আরশির দিকে তাকিয়ে রইল।
তখনই আরশি কী মনে করে মঞ্চে চোখ যায় দ্বিতীয় বার মতো ওই রাগি চোখের সাথে চোখাচোখি হয়ে।
আরশি আয়নের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
তখন সাকিব কে দেখলো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে
আরশি সেটা লক্ষ্য করে বিরক্ত হয়ে বলল,
—এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
—তোকে খুব সুন্দর লাগছে
আরশি কোনো উত্তর দিল না । কারন সে জানে সে যতবার শাড়ি পরে তাকে সাকিবের কথাটাই বলে। তাই এই কথা বাদ দিয়ে ইসরাত এর সাথে গল্প করতে লাগল। সাকিব শুধু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার মঞ্চের দিকে মন দিল।
আরশি এবার শাকিবের পাশে তাকিয়ে দেখল, সেই ছেলেটাও সেখানে বসে আছে—যে কিছুক্ষণ আগে তার নাম জানতে চেয়েছিল।
আরশি কৌতূহলী হয়ে সাকিবকে জিজ্ঞেস করল,
—ওর নাম কী?
সাকিব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—ওর নাম শুদ্ধ।
আরশি একবার শুদ্ধর দিকে তাকাল। তারপর আবার ইসরাত,ইরা ও নাবিলা এর সাথে গল্প করতে থাকলো। গল্প করতে করতে অনেকবারই মঞ্চের দিকে চোখ গেলে আয়নের ওই রাগি চোখের সাথে সাথে চোখাচোখি হইছে।