ফন্ট সাইজ:
থিম:
পুতুল বউ

২০তম পর্ব

লেখক: Binti Fariya islam
পুতুল বউ
পর্ব—২০
বিয়ের পরের সকাল
রাতের সব নীরবতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
খান বাড়ির চারপাশে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের হালকা আলো এসে ঘরের মেঝেতে পড়েছে।
ফারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল।
কিছুক্ষণ সে চুপচাপ বিছানায় বসে রইল। চারপাশে তাকাতেই গত রাতের কথা মনে পড়ে গেল।
বিয়ের পর প্রথম রাত।
অথচ জাহিদের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি।
অথয এই রাত নিয়ে ফারিয়া কতো শত সপ্ন ছিলো এগুলো। ফারিয়া ভাবতে থাকলো আসলে জীবনে সব সপ্ন পুরন হয় নাহ।
একই ঘরে থেকেও দুজন যেন দুজনের থেকে অনেক দূরে।
এগুলো ভাবতে ভাবতে ফারিয়া চোখ দিয়ে দুই পোঁটা পানি গরিয়ে পড়ে বিছানায়।ফারিয়া চোখ মুছে একটা।
 দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে অজু করতে চলে গেল।
অজু করে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ল।
নামাজ শেষে দুহাত তুলে অনেকক্ষণ দোয়া করল।
তার চোখের কোণে আবারও পানি জমে উঠল।
মনে মনে বলল,
“আল্লাহ, আমার জীবনটা যেন সহজ করে দেন। আমি যেন কাউকে কষ্ট না দিই, আর কেউ যেন আমাকে ভুল না বোঝে।”
দোয়া শেষে ফারিয়া চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল।
আজ ১৬ আগস্ট।
আজ তার আর জাহিদের বিয়ের দ্বিতীয় দিন।
গতকাল পর্যন্ত সে ছিল সবার আদরের ফারিয়া।
আজ সে খান বাড়ির বউ।
ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
ফারিয়া আলমারি খুলে একটা সুন্দর শাড়ি বের করল। 
আজ সে নিজেই শাড়ি পরবে।
যদিও শাড়ি পরায় তার খুব একটা অভ্যাস নেই, তবুও নতুন বউ হওয়ার কারণে অন্য কারও সাহায্য না নিয়ে নিজে নিজে শাড়ি পরার চেষ্টা করল।
অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করার পর কোনোভাবে শাড়িটা পরল।
কিন্তু আঁচলটা ঠিক করতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়ছে।
একবার ডানদিকে যায়, আবার বাঁদিকে চলে যায়।
ফারিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
— উফ! শাড়ি পরা যে এত কঠিন কে জানত!
ঠিক তখনই দরজার কাছে একটা শব্দ হলো।
ফারিয়া আয়নার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল।
জাহিদ ঘুম থেকে উঠে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
জাহিদও কোনো কথা বলল না।
তার চোখ অনিচ্ছায় ফারিয়ার দিকে গেল।
শাড়িটা পুরোপুরি ঠিক না থাকায় কোমরের সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল।
জাহিদ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেও দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
ফারিয়া সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে আঁচলটা টেনে নিজের শরীর ঢেকে নিল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কেউ কিছু বলল না।
জাহিদও চুপচাপ ওয়াসরুমে চলে গেল।
ফারিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে বৃষ্টির গলা শোনা গেল—
— ফারিয়া! উঠেছিস?
বৃষ্টি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ফারিয়ার শাড়ির অবস্থা দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে ফেলল।
— এ কী অবস্থা তোর?
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— আমি নিজেই পরেছি।
বৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল,
— সেটা দেখেই তো বুঝলাম!
ফারিয়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
— আমি চেষ্টা করেছি তো!
— চেষ্টা করেছিস ঠিক আছে, কিন্তু এভাবে নিচে গেলে সবাই ভাববে নতুন বউ শাড়ি পরতে ভুলে গেছে!
বৃষ্টি ফারিয়ার কাছে এসে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে শুরু করল।
— দাঁড়া, আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অনামিকা আর নিহাও ঘরে ঢুকল।
অনামিকা ফারিয়াকে দেখে চোখ বড় করে বলল,
— ও মা! আমাদের পুতুল বউ তো আজ একেবারে অন্যরকম লাগছে!
নিহা মুচকি হেসে বলল,
— বউ হওয়ার পর তো সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেছে!
ফারিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— তোরা শুরু করিস না আবার।
অনামিকা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— কেন? আমরা তো কাল রাতের খবর নিতে এসেছি!
ফারিয়া থমকে গেল।
— কী খবর?
বৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল,
— বাসর ঘরের খবর!
ফারিয়ার মুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল।
— তোরা যা!
নিহা হেসে বলল,
— আচ্ছা বল, বর সাহেব কী বলল?
ফারিয়া মাথা নিচু করে চুপ করে রইল।
অনামিকা ফারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী হলো? চুপ কেন?
ফারিয়া ধীরে বলল,
— কিছুই হয়নি।
আর ভাবতে থাকলো জাহিদ এর বলা কথা গুলো। 
অনামিকা বলে কিরে কি ভাবছিস।
ফারিয়া বলে কিছু না।
বৃষ্টি অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
— কিছুই হয়নি?
— হুম।
— মানে একদমই কিছু হয়নি?
ফারিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোরা আমাকে আর জ্বালাস না।
সবাই হেসে উঠল।
অনামিকা বলল,
— ঠিক আছে, আজকে আর কিছু জিজ্ঞেস করব না।
তারপর একটু কাছে এসে ফারিয়ার কানে কানে বলল,
— তবে পুতুল বউ, তোর মুখ কিন্তু সব বলে দিচ্ছে!
ফারিয়া কিছু না বলে অনামিকাকে হালকা ধাক্কা দিল।
নিহা বলল,
— আচ্ছা চল, নিচে যাই। সবাই অপেক্ষা করছে।
বৃষ্টি শেষবারের মতো ফারিয়ার শাড়ি ঠিক করে দিয়ে বলল,
— এবার একদম ঠিক হয়েছে।
ফারিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল।
কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে চুড়ি, গলায় বিয়ের গয়না আর শাড়ির আঁচল—
নিজেকে দেখে তার নিজেরই অচেনা লাগল।
অনামিকা বলল,
— চল পুতুল বউ।
চার বান্ধবী একসঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
---
ডাইনিং রুমে
নিচে তখন সকালের নাস্তার আয়োজন চলছে।
মিথিলা খান ফারিয়ার জন্য নাস্তা সাজিয়ে দিচ্ছিলেন।
জরিফা খানও সবার দিকে নজর রাখছিলেন।
তাহমিনা খান সবাইকে খাবার বেরে দিচ্ছেন।
ফারিয়া সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামল।
নতুন বউকে দেখে বাড়ির সবাই মুচকি হাসল।
হাকিম খান বললেন আমার পুতুল বউ আসছে।
ফারিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করে মায়ের পাশে গিয়ে বসল।
সালমা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— আয় মা, নাস্তা কর। সকাল থেকে কিছু খাসনি।
ফারিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
— হুম আম্মু।
মিথিলা নিজের হাতে ফারিয়ার প্লেটে নাস্তা তুলে দিলেন।
— আগে এটা খা।
ফারিয়া নাস্তা খেতে শুরু করল।
অন্যদিকে জাহিদ তার বন্ধুদের সঙ্গে বসে ছিল।
সাওন একবার জাহিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— কী রে বর সাহেব?
জাহিদ তাকাল না।
সাব্বির বলল,
— কী হয়েছে? কালকে বিয়ে হয়েছে, আজকে দেখি মুখটা এমন করে রেখেছে যেন পরীক্ষায় ফেল করেছে!আর কয়েক জন তোকে ধরে বেধে মারছে।
আবির হেসে বলল,
— আরে ভাই, একটু হাস। আজ কিন্তু তুই নতুন বর!
নাহিম বলল,
— কাল পর্যন্ত জাহিদ আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিত, আর আজকে এত চুপচাপ!
রাকিব মজা করে বলল,
— বিয়ের পর বুঝি বন্ধুত্বের দিন শেষ?
সাওন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— না না, এখন থেকে আমাদের বন্ধুর নতুন পরিচয়—জাহিদ খান, ইসলাম বাড়ির জামাই!
সবাই হেসে উঠল।
জাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোরা নাস্তা করবি, নাকি সারাদিন আমাকে নিয়েই পড়ে থাকবি?
জাহিদ বললো ভাই তোরা আয় আমি নাস্তা করতে যাচ্ছি। 
বন্ধুরা জাহিদ এর পিছে পিছে নিচে ডাইনিং এই চলে গেলো। 
সাব্বির বলল,
— ওহ! রাগ দেখাচ্ছে!
আবির বলল,
— বউয়ের সামনে বেশি রাগ দেখাস না ভাই। প্রথম দিনেই ভয় পেয়ে যাবে!
জাহিদ এবার একবার ফারিয়ার দিকে তাকাল।
মিথিলা তখন ফারিয়া কে নাস্তা খাওয়াই দিচ্ছিল।
জাহিদের চোখ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে আটকে রইল।
লম্বা চুল গুলো শাড়ির গোনটার মাঝে দেখা যাচ্ছে। নীল শাড়ি তে ফারিয়াকে এক কথায় পরির মতো লাগছে।
জাহিদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
কিন্তু ফারিয়া সেটা বুঝতে পারেনি।
হঠাৎ বৃষ্টি ফারিয়ার পাশে বসে বলল,
— কিরে, এত চুপচাপ কেন?
— কিছু না।
— কাল রাতে ঘুম হয়েছে?
ফারিয়া একটু থেমে বলল,
— হুম।
অনামিকা পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,
— ঘুম হয়েছে তো?
ফারিয়া বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তোরা আবার শুরু করেছিস!
চারজন বান্ধবী হেসে উঠল।
এদিকে সাওন আবার জাহিদকে বলল,
— ভাই, একটা কথা বলি?
— বল।
— কাল রাতে বাসর ঘরে গিয়ে কী করলি?
জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
— এসব নিয়ে কথা বলিস না।
সাব্বির হেসে বলল,
— ওহ! ব্যাপারটা তাহলে সিরিয়াস!
আবির বলল,
— বুঝলি? বর সাহেবের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে!
তখন সাব্বির তখন বললো উঠল।
তুমি দিও না গো বাসর ঘরে বাতি নিবিয়া আমি
অন্ধ ঘরে বন্ধ হয়ে যাবো মরিয়া।
এর পর আবির আর সাওন এক সাথে গেয়ে উঠলো। তুমি ভয় কেন পাও প্রান সজনী আমায় দেখিয়া।
জাহিদ বললো তোদের বাসর ঘর এর মায়েরে বাপ সালা। 
এরপর সবাই চুপ
জাহিদ আর কোনো উত্তর দিল না।
সে চুপচাপ নাস্তা করতে লাগল।
কিন্তু তার মনটা বারবার চলে যাচ্ছিল ফারিয়ার দিকে।
আর ফারিয়ার মনেও একইভাবে গত রাতের নীরবতাটা ঘুরছিল।
দুজনেই একে অপরকে ভুল বুঝে আছে।
কেউ কারও কাছে সত্যিটা জানতে চাইছে না।
কেউ নিজের মনের কথাটাও বলছে না।
শুধু দূর থেকে একবার চোখাচোখি হয়—
আর দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেয়।
সবার হাসি-ঠাট্টার মাঝেও তাদের দুজনের মাঝখানের দূরত্বটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন