পুতুল বউ
পর্ব—২৭
ভোরের আজানের মধুর ধ্বনিতে ফারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল।
চোখ মেলে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে। পাশে তাকাতেই দেখল জাহিদ এখনও ঘুমিয়ে আছে।
ফারিয়া ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে গেল।
গোসল সেরে সুন্দর একটা পোশাক পরে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করল।
নামাজ শেষে কিছুক্ষণ দোয়া করে জায়নামাজ গুছিয়ে রাখল।
আজ তার কুমিল্লায় ফিরে যাওয়ার দিন।
মনের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে।
নিচে এসে ফারিয়া সবার সঙ্গে দেখা করল।
মিথিলা, নাহিদ খান, হামিদ খান, সফিক খান—সবাই তাকে অনেক আদর করে বিদায় দিতে লাগল।
মিথিলা ফারিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— নিজের যত্ন নিস মা। আর সুযোগ পেলেই চলে আসবি।
ফারিয়া মাথা নেড়ে বলল,
— আসব মামানি।
জাহিদ দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছিল।
ফারিয়া সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠল।
জাহিদও তার সঙ্গে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
---
রাস্তায় যেতে যেতে জাহিদ হঠাৎ গাড়ি থামাল।
ফারিয়া অবাক হয়ে বলল,
— কী হলো?
জাহিদ কিছু না বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এল দুই হাতে অনেকগুলো ফুল নিয়ে।
ফারিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
— এত ফুল!
জাহিদ ফুলগুলো তার হাতে দিয়ে বলল,
— তোর ফুল ভালো লাগে না?
ফারিয়া মৃদু হেসে বলল,
— লাগে।
— তাহলে রাখ।
ফারিয়া ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
তারপর সারাটা পথ ফুলগুলো কোলে নিয়ে বসে রইল।
---
কিছুক্ষণ পর তারা কুমিল্লায় পৌঁছে গেল।
জাহিদ নিজেই ফারিয়াকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল।
সালমা ইসলাম দরজার সামনে এসে বললেন,
— জাহিদ, আজকে থেকে যা না বাবা।
জাহিদ হেসে বলল,
— না ফুফি মনি। আরেকদিন আসব। আজকে অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।
সালমা বললেন,
— আচ্ছা বাবা, সাবধানে যাস।
— জি ফুফি মনি।
তুমি তোমার যত্ন নিও।
ফারিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে জাহিদ বলল,
— নিজের খেয়াল রাখিস।
ফারিয়া মাথা নেড়ে বলল,
— আপনিও।
জাহিদ গাড়িতে উঠে চলে গেল।
ফারিয়া অনেকক্ষণ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
---
বিকেলের দিকে হঠাৎ ফারিয়ার বান্ধবীরা একসঙ্গে তার বাড়িতে এসে হাজির হলো।
অনামিকা, বৃষ্টি, তাসপ্রিয়া আর নিহা—অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে ফারিয়াকে দেখে খুশিতে চিৎকার করে উঠল।
— ফারিয়া!
ফারিয়াও হাসতে হাসতে সবাইকে জড়িয়ে ধরল।
অনামিকা বলল,
— আরে তুই তো একদম হারিয়েই গিয়েছিলি!
তাসপ্রিয়া বলল,
— এতদিন কোথায় ছিলি বল তো?
ঢাকা নাকি অন্য কোনো দেশে।
সবাই গল্প করতে করতে ফারিয়ার ঘরে চলে গেল।
হঠাৎ অনামিকার চোখ ফারিয়ার গলার দিকে গেল।
সে চোখ বড় বড় করে বলল,
— কিরে! তোর গলায় এগুলো কী?
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে আঁচল দিয়ে গলা ঢেকে ফেলল।
— কিছু না।
বৃষ্টি কাছে এসে বলল,
— কিছু না আবার! এত দাগ!
ফারিয়ার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে গত রাতের কথা ভেসে উঠল।
লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেল।
অনামিকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিরে? কোথায় চলে গেলি?
ফারিয়া কোনো উত্তর দিল না।
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগল।
তাসপ্রিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— ওহ্... বুঝেছি!
বৃষ্টি হেসে বলল,
— আমরাও বুঝেছি!
ফারিয়া লজ্জায় বলল,
— তোরা চুপ কর!
অনামিকা হেসে বলল,
— এতদিন পর ঢাকার বউ দেখে মনে হচ্ছে, কুমিল্লায় আসার আগে বেশ ভালোই সময় কাটিয়ে এসেছিস!
সবাই হেসে উঠল।
ফারিয়া লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলল।
---
অন্যদিকে ঢাকায় জাহিদের অফিসের মিটিং শেষ হলো।
মিটিং শেষ হওয়ার পর নাহিদ খান জাহিদকে বললেন,
— তোকে আমেরিকা যেতে হবে। ওখানকার বিজনেসের অবস্থা একটু দেখে আসতে হবে।
হামিদ খান বললেন,
— হ্যাঁ, তুই গিয়ে সবকিছু দেখে আয়।
জাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— ঠিক আছে।
সফিক খান তখন বললেন,
— জাহিদ একা যাবে না। রাফিদকেও সঙ্গে দে।
নাহিদ খান সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— আমার ছেলের চেয়ে আমার ভাইয়ের ছেলে বেশি এই কাজের জন্য অনেক যোগ্য।
তাই জাহিদ এই যাবে।
সফিক খান হেসে বললেন,
— তবুও রাফিদ যাবে। দুজন মিলে কাজটা ভালোভাবে দেখে আসতে পারবে।
নাহিদ খান বললো
আমি বেশি কথা পছন্দ করি না।
বড় ভাইয়ের মুখের উপর আর কেউ কিছু বললো না।
জাহিদও আর কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
---
সন্ধ্যার পর জাহিদ বাড়িতে ফিরে বন্ধুদের ফোন করল।
— তোরা সবাই এখনই আমার বাসায় আয়।
সাওন জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে?
— আগে আয়। তারপর সব বলব।
কিছুক্ষণ পর সাওন, সাব্বির, রাকিব আর আবির সবাই এসে হাজির হলো।
জাহিদ তখন খাবার খাচ্ছিল।
বন্ধুরা আসতেই সে বলল,
— তোরা বস। খাওয়া শেষ করি।
খাওয়া শেষ হলে সবাই মিলে উপরে চলে গেল।
জাহিদ বিছানায় বসে বলল,
— আমি আজ রাতে চলে যাচ্ছি।
চারজন একসঙ্গে বলল,
— কোথায়?
— আমেরিকা।
রাকিব অবাক হয়ে বলল,
— কবে ফিরবি?
জাহিদ হেসে বলল,
— আগে আয় বললাম না? কতদিন থাকব, আমিও জানি না। ওখানের বিজনেসের অবস্থা দেখে তারপর ঠিক হবে।
কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল।
জাহিদ বলল,
— তবে তোদের একটা কাজ আছে।
আবির বলল,
— কী কাজ?
— আমার Red Ross-এর খেয়াল রাখবি।
আবির সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— আমরা ঢাকা আর ভাবি কুমিল্লায়! কেমনে কী?
জাহিদ শান্ত গলায় বলল,
— তোরা কাল থেকে কুমিল্লায় যাবি। বড় আব্বুর সঙ্গে কথা বলে তোদের ওখানকার কোম্পানিতে ট্রান্সফর করে দেব।
রাকিব সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আমি আছি।
সাওন বলল,
— আমিও।
সাব্বির হেসে বলল,
— আমরাও আছি।
জাহিদ মুচকি হেসে বলল,
— ভালো। তাহলে আমার চিন্তা একটু কমল।
---
রাতের দিকে সবাই মিলে জাহিদকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে গেল।
বিদায়ের সময় সবার মুখেই একটা অদ্ভুত মন খারাপের ছাপ।
সাওন জাহিদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— সাবধানে যাস।
সাব্বির বলল,
— আর আমাদের ভুলে যাস না।
জাহিদ হেসে বলল,
— তোদের ভুলে যাওয়ার মতো শান্তি আমার কপালে নেই।
সবাই হেসে উঠল।
কিন্তু বিদায়ের মুহূর্তটা আবারও ভারী হয়ে গেল।
জাহিদ এয়ারপোর্ট এই প্রবেশ করার আগে ওদের শান্ত গলায় একটা কথা বলে যায়।
— আর শোন, আমার Red Ross-এর যদি কোনো সমস্যা হয়...
সে একটু থেমে সবার দিকে তাকাল।
— তোদের কাউকেই কিন্তু ছাড়ব না। মনে রাখিস!
আমি ওই খানে বসে বসে তোদের কবর খুড়ার ব্যবস্থা করব।
আবির হেসে বলল,
— আরে ভাই, তুই নিশ্চিন্তে যা। ভাবির কিছু হবে না।
জাহিদ গম্ভীর মুখে বলল,
— এই কথাটাই যেন সত্যি হয়।
তারপর সবার দিকে শেষবার তাকিয়ে এয়ারপোর্ট দিকে চলে গেলো।
ধীরে ধীরে এয়ারপোর্টের ভেতরের দিকে চলে গেল জাহিদ।
বন্ধুরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অন্যদিকে কুমিল্লার বাড়িতে ফারিয়া তখন জানালার পাশে বসে জাহিদের দেওয়া ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার ঠোঁটে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।
সে জানত না, এই বিদায়ের পর তাদের জীবনে আবারও নতুন কোনো অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
চলবে... ❤️🤐