ফন্ট সাইজ:
থিম:
ক্ষমতার নেশা

১ম পর্ব

লেখক: SADIYA AFRIN

#ক্ষমতার_ নেশা

#সাদিয়া_ আফরিন 
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ]
পর্ব ১
চট্টগ্রাম 
সকাল থেকেই চট্টগ্রাম শহরের বাতাসে একটা অন্যরকম ব্যস্ততা আর উত্তেজনা।
প্রধান সড়কের দুই পাশে বিশাল বিশাল রঙিন ব্যানার টাঙানো। কোথাও দলের লাল-সাদা পতাকা, কোথাও রাজনৈতিক পোস্টার। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট দলীয় কর্মীদের জটলা। কেউ হাতে লিফলেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ আবার মাইকে সাউন্ড বাজিয়ে আজকের সমাবেশের ঘোষণা দিচ্ছে।
শহরের রাজনৈতিক পরিবেশ গত কয়েকদিন ধরেই বেশ গরম। আজ বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী দল জনঐক্য পরিষদ-এর বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশ।
আজকের সমাবেশকে ঘিরে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটা নাম—Zarif Rehan Talukdar।
তরুণ রাজনৈতিক নেতা, বয়স মাত্র ত্রিশ। কিন্তু এই অল্প বয়সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে সে।
তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে Rezaul Rehan Talukdar-এর ছেলে।
রেজাউল রেহান তালুকদার বহু বছর ধরে দেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা আর রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে দলের ভেতরে তার অবস্থান খুবই মজবুত।
তবে জারিপ শুধু বাবার পরিচয়ে থেমে থাকতে চায় না। সে নিজের আলাদা একটা পরিচয় তৈরি করতে চায়। আর সেই পথ মোটেই সহজ নয়। কারণ রাজনীতিতে ক্ষমতার পাশে যেমন অনেক সমর্থক থাকে, তেমনি থাকে অসংখ্য গোপন প্রতিপক্ষ।
Talukdar Residence
চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় অবস্থিত বিশাল তালুকদার রেসিডেন্স। বাড়িটির বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায়, এটা শুধু একটা প্রভাবশালী পরিবারের বাড়ি নয়—এখানে রাজনীতি প্রতিদিনের জীবনেরই একটা বড় অংশ।
সকালের পর থেকেই বাড়ির ভেতরে কাজের চাপ। কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ জরুরি কাগজপত্র নিয়ে আসা-যাওয়া করছে। মূল ফটকের সামনে নিরাপত্তারক্ষীরা কড়া পাহাড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়ির ভেতরের বড় স্টাডি রুমে তখন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছে। লম্বা টেবিলের একপাশে বসে আছেন রেজাউল রেহান তালুকদার। তার সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে দলের রাজনৈতিক রিপোর্ট, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বর্তমান অবস্থা আর বিরোধীদের গোপন কার্যক্রম।
দলের এক সিনিয়র নেতা রিপোর্ট হাতে নিয়ে বললেন—
—“স্যার, গণঅধিকার মঞ্চ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের কয়েকটা এলাকায় ওদের প্রচারণা ভালো সাড়া পাচ্ছে।”
রেজাউল ধীরে চোখ তুললেন।
—“আমাদের মাঠের অবস্থা কেমন?”
—“শক্তিশালী। তবে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগটা আরও বাড়ানো দরকার।”
আরেকজন নেতা বললেন—
—“এই জায়গায় জারিপকে সামনে আনা যেতে পারে। ওর চিন্তাভাবনা তরুণদের দ্রুত টানে।”
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভারী কাঠের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকল একজন যুবক।
কালো ফরমাল শার্ট আর গাঢ় ছাইরঙা ট্রাউজার্স। হাতে দামি ঘড়ি। চেহারায় কোনো বাড়াবাড়ি প্রকাশ নেই—চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু বেশ তীক্ষ্ণ।
Zarif Rehan Talukdar।
সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বাবার পাশের খালি চেয়ারটিতে বসল। তারপর টেবিলের ওপর থাকা রিপোর্টগুলোর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল—
—“আমাকে নিয়ে কেন কথা উঠল..?”
রেজাউল ছেলের দিকে তাকালেন।
—“আজকের সমাবেশের পরিকল্পনা আর সাউথ জোনে গণঅধিকার মঞ্চের প্রভাব নিয়ে কথা বলছিলাম।”
জারিপ কথা না বাড়িয়ে ফাইলটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করল। ঘরের সবাই চুপ। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ফাইল বন্ধ করে সে বলল—
—“ওরা যেখানে যেখানে সফল হয়েছে, ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে।”
একজন নেতা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—
—“কিন্তু আমাদের তো ওদের চেয়ে অনেক বেশি কর্মী আছে!”
জারিপ ধীর চোখে তার দিকে তাকাল।
—“কর্মী বেশি থাকলেই যে সাধারণ মানুষের সমর্থন বেশি থাকবে, তা নয়। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা আর বিপদে যদি আমরা পাশে না থাকি, তাহলে হাজার কর্মী দিয়েও লাভ হবে না।”
লোকটি চুপ হয়ে গেল। জারিপ আবার বলল—
—“পোস্টার, মিছিল আর স্লোগান দিয়ে সাময়িক পরিবেশ তৈরি করা যায়। কিন্তু মানুষের সমস্যাগুলো না বুঝলে আস্থা পাওয়া যায় না। রাজনীতি যদি শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য হয়, তবে মানুষ একদিন সেই ক্ষমতা কেড়ে নেয়। কিন্তু মানুষের আস্থা ধরে রাখলে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য আলাদা করে লড়াই করতে হয় না।”
ঘরে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। রেজাউল রেহান তালুকদারের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
—“তুই রাজনীতিটা বেশ ভালোই বুঝতে শিখেছিস।”
জারিপ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল—
—“আপনার কাছ থেকেই তো শেখা।”
রেজাউল কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—
—“আজকের সমাবেশে তুই আমার সাথেই মঞ্চে থাকবি।”
জারিপ মাথা নেড়ে বলল—
—“থাকব।”
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে যাওয়ার আগে হঠাৎ থেমে গিয়ে পেছনে ফিরল।
—“আর একটা কথা। দলের ভেতরে কে কোন দিকে ঝুঁকছে, সেটাও নজরে রাখবেন।”
রেজাউলের চোখ সরু হয়ে এল।
—“কাউকে সন্দেহ করছিস?”
জারিপ মৃদু হাসল।
—“রাজনীতিতে সবাইকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করাটা বোকামি।”
বলেই সে বের হয়ে গেল।
গাজীপুর
চট্টগ্রামের এই রাজনৈতিক উত্তাপ থেকে অনেক দূরে গাজীপুরের এক শান্ত বাড়িতে সকালটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ডাইনিং টেবিলে বই খুলে বসে আছে Sadiya Afrin। সামনে খোলা বই, হাতে কলম। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে ফোনের দিকেই তার মন বেশি।
সামিরা আফ্রিন (সাদিয়ার মা) রান্নাঘর থেকে এসে তার সামনে নাশতার প্লেট রাখলেন।
—“সাদিয়া, ফোনটা নামিয়ে আগে খা তো।”
সাদিয়া চোখ না তুলে বলল—
—“এক মিনিট মা।”
সামিরা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
—“তোর ওই এক মিনিট কখনো এক মিনিট হয়?”
পাশ থেকে বড় বোন সাফা হেসে উঠল।
—“মা, ওকে বলে লাভ নেই।”
সাদিয়া এবার মাথা তুলে তাকাল।
—“আপু, তুমি সবসময় আমার বিরুদ্ধে কেন?”
সাফা মুচকি হেসে বলল—
—“আমি তো সত্যিটাই বললাম। তুই পড়ার সময় পড়িস না, খাওয়ার সময় ফোন দেখিস, আর বের হওয়ার সময় বলিস সময় নেই।”
সাদিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল—
—“আমার জীবন নিয়ে এত গবেষণা করার দরকার নেই।”
সামিরা মাথা নেড়ে বললেন—
—“তোর একটা গুণ আছে।”
সাদিয়া কৌতূহলী হয়ে তাকাল।
—“কী?”
—“সবার সঙ্গে র্তক করার!”
সাফা হেসে বলল—
—“হ্যাঁ, ও খুব শান্তভাবে বুঝিয়ে বলে!”
সাদিয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল—
—“আপু!”
ডাইনিং টেবিলে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। সাদিয়া আবার ফোনের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই টিভিতে খবর শুরু হলো—
“আজ চট্টগ্রামে জনঐক্য পরিষদের বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দলের প্রবীণ নেতা রেজাউল রেহান তালুকদারের পাশাপাশি তরুণ নেতা জারিপ রেহান তালুকদারকে ঘিরেও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে...”
সাদিয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও টিভিতে তাকাল। পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য জারিপের ছবি ভেসে উঠল।
সাদিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল—
—“সকাল সকাল টিভিতেও সেই রাজনীতি!”
সাফা বলল—
—“রাজনীতি থেকে কেউই পুরোপুরি দূরে থাকতে পারে না রে।”
সাদিয়া নাশতা করতে করতে বলল—
—“আমি মানব। আমার এসব রাজনৈতিক ঝামেলা একদম পছন্দ না।”
—“এত নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ, একদম।”
সাফা রহস্যময়ভাবে হেসে বলল—
—“দেখা যাক।”
সাদিয়া আর কিছু বলল না। তার কাছে রাজনীতি মানেই ছিল টিভির চিল্লাচিল্লি, নেতাদের ভাষণ আর মিছিল। সে জানত না—একদিন এই রাজনৈতিক জগতের মানুষের সঙ্গেই তার নিজের জীবন জড়িয়ে যাবে!
🏛️ চট্টগ্রাম | বিকেল
বিকেল গড়াতেই সমাবেশস্থল মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে গেল। চারদিকে দলীয় পতাকা, হাজার হাজার মানুষ, সাংবাদিকদের ক্যামেরা। মাইকে একের পর এক স্লোগান উঠছে।
মঞ্চের পেছনের একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল জারিপ। তার পাশে বন্ধু আরহাম।
আরহাম নিচু গলায় বলল—
—“আজকের সমাবেশটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দলের ভেতরেও অনেক হিসাব চলছে তোকে নিয়ে।”
জারিপ চোখ না সরিয়েই বলল—
—“জানি।”
—“তুই সব শান্তভাবে সামলাচ্ছিস কীভাবে?”
জারিপ আবার বাইরে তাকাল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি।
—“আমি কথা কম বলি। মানুষকে লক্ষ্য করি বেশি।”
একটু থেমে বলল—
—“চলো।”
আরহাম জিজ্ঞেস করল—
—“কোথায়?”
জারিপ দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
—“দাবার বোর্ডে প্রথম চাল দিতে।”
দরজা খুলে গেল। সামনে বিশাল মঞ্চ, হাজারো মানুষ আর ক্যামেরার আলো। জারিপ ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।
সে জানে—রাজনীতিতে একটা ভুল চাল পুরো খেলা বদলে দিতে পারে। আর আজ সে যে প্রথম চালটা দিতে যাচ্ছে, সেটা শুধু একটা বক্তব্য নয়, তার নিজের পরিচয় তৈরির প্রথম ধাপ।
অন্যদিকে গাজীপুরে সাদিয়া নিজের পড়ার টেবিলে ব্যস্ত। সে এখনো জানে না, চট্টগ্রামের সেই রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির সঙ্গে তার পথ একদিন একই জায়গায় এসে মিলবে।
(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন